মুসলমানের চারিত্রিক গুণাবলী

বর্ণনা

আধুনিক অন্যান্য চিন্তা ও কর্মতৎপরতার সাথে ইসলামের পার্থক্য হচ্ছে ইসলামের রয়েছে এক প্রাকটিক্যাল রূপ, যা লালনে মানুষ একজন পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। ইসলামের চারিত্রিক মৌলিকত্বগুলো কী, কীভাবে এর সফল রূপায়ণ সম্ভব, অন্যান্য চারিত্রিক রুলের সাথে ইসলামিক চারিত্রিক রুলের কোথায় ছেদ ও সংযোগ ইত্যাদি বিষয়ের একটি সারগর্ভ বর্ণনা রয়েছে এ লেখাটিতে, আশা সকলের ভাল লাগবে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    একজন মুসলিমের চারিত্রিক গুণাবলি

    ড. আহমাদ আল-মাযইয়াদ

    ড. আদেল আশ-শিদ্দী

    অনুবাদক : সাইফুল্লাহ আহমদ

    সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    أخلاق المسلم

    (باللغة البنغالية)

    د/ أحمد المزيد

    د/ عادل الشدي

    ترجمة: سيف الله أحمد

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    সংক্ষিপ্ত বর্ণনা............

    আধুনিক অন্যান্য চিন্তা ও কর্মতৎপরতার সাথে ইসলামের পার্থক্য হচ্ছে ইসলামের রয়েছে এক প্রাকটিক্যাল রূপ, যা লালনে মানুষ একজন পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। ইসলামের চারিত্রিক মৌলিকত্বগুলো কী, কীভাবে এর সফল রূপায়ণ সম্ভব, অন্যান্য চারিত্রিক রুলের সাথে ইসলামিক চারিত্রিক রুলের কোথায় ছেদ ও সংযোগ ইত্যাদি বিষয়ের একটি সারগর্ভ বর্ণনা রয়েছে এ লেখাটিতে, আশা করি সকলের তা ভালো লাগবে।

    بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

    সমস্ত প্রশংসা এককভাবে আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম তাঁর ওপর নাযিল হউক যার পর আর কোনো নবী নেই, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবীদের ওপর প্রতিদান দিবস পর্যন্ত সালাত ও সালাম নাযিল হউক।

    শরী‘আত হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি যা সকল দিক থেকে সার্বিকভাবে মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনকে গঠন করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে, এসব দিকের মধ্যে গুণাবলী শিষ্টাচার ও চরিত্রের দিকটি অন্যতম। ইসলাম এদিকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। তাইতো আক্বীদা ও আখলাকের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «أَكْمَلُ المُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا»

    “মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী”[1]

    সুতরাং উত্তম চরিত্র হচ্ছে ঈমানের প্রমাণবাহী ও প্রতিফলন, চরিত্র ব্যতীত ঈমান প্রতিফলিত হয় না; বরং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁকে প্রেরণের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দেওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»

    “আমি তো কেবল চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দিতে প্রেরিত হয়েছি”। ইমাম আহমাদ ও বুখারী আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেছেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা উত্তম ও সুন্দরতম চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤﴾ [القلم: ٤]

    “এবং নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত”[সূরা আল-ক্বালম, আয়াত: ৪]

    কোথায় এটা বর্তমান বস্তুবাদী মতবাদ ও মানবতাবাদী মানুষের মনগড়া চিন্তা চেতনায়? যেখানে চরিত্রের দিককে সমপূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, তা শুধু সুবিদাবাদী নীতিমালা ও বস্তুবাদী স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও তা অন্যদের ওপর যুলুম বা নির্যাতনের মাধ্যমে হয়। অন্য সব জাতির সম্পদ লুন্ঠন ও মানুষের সম্মান হানীর মাধ্যমে হয়।

    একজন মুসলিমের ওপর তার আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে, অন্য মানুষের সাথে এমনকি নিজের সাথে কী করা ওয়াজিব, ইসলাম তার এক অভিনব চকমপ্রদ চিত্র অংকন করে দিয়েছে। যখনই একজন মুসলিম বাস্তবে ও তার লেনদেনে ইসলামী চরিত্রের অনুবর্তন করে তখনই সে অভিষ্ট পরিপূর্ণতার অতি নিকটে পৌঁছে যায়, যা তাকে আরো বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও উচ্চ মর্যাদার সোপানে উন্নীত হতে সহযোগিতা করে। পক্ষান্তরে, যখনই একজন মুসলিম ইসলামের চরিত্র ও শিষ্টাচার থেকে দূরে সরে যায় সে বাস্তবে ইসলামের প্রকৃত প্রাণ চাঞ্চল্য, নিয়ম-নীতির ভিত্তি থেকে দূরে সরে যায়, সে যান্ত্রিক মানুষের (রবোকব, রোবট) মতো হয়ে যায়, যার কোনো অনুভূতি এবং আত্মা নেই।

    ইসলামে ইবাদতসমূহ চরিত্রের সাথে কঠোরভাবে সংযুক্ত। যে কোনো ইবাদতই একটি উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায় না, তার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহর সামনে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় সালাত একজন মানুষকে অশ্লীল অপছন্দ কাজসমূহ হতে রক্ষা করে, আত্মশুদ্ধি ও আত্মার উন্নতি সাধনে এর প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِ﴾ [العنكبوت: ٤٥]

    “নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও অপছন্দনীয় কাজ থেকে নিষেধ করে”[সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪৫]

    অনুরূপভাবে সাওম বা রোযা তাক্কওয়ার দিকে নিয়ে যায়। আর তাক্বওয়া হচ্ছে মহান চরিত্রের অন্যতম। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣﴾ [البقرة: ١٨٣]

    “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওমকে ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া লাভ করতে পার”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩]

    সাওম অনুরূপভাবে শিষ্টাচার, ধীরস্থিরতা, প্রশান্তি, ক্ষমা, মুর্খদের থেকে বিমুখতা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটায়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ، فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ»

    “তোমাদের কারো সিয়ামের দিন যদি হয়, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, হৈ চৈ অস্থিরতা না করে, যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করে সে যেন বলে আমি সাওম পালনকারী”[2]

    যাকাতও অনুরূপভাবে অন্তরকে পবিত্র করে, আত্মাকে পরিমার্জিত করে এবং তাকে কৃপণতা, লোভ ও অহংকারের ব্যধী হতে মুক্ত করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا﴾ [التوبة: ١٠٣]

    “তাদের সম্পদ হতে আপনি সাদকাহ গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিমার্জিত করবেন”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩]

    আর হজ হচ্ছে একটি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণশালা আত্মশুদ্ধি এবং হিংসা বিদ্ধেষ ও পঙ্কিলতা থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধি ও পরিমার্জনের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلۡحَجِّۗ﴾ [البقرة: ١٩٧]

    “যে এ মাস গুলোতে নিজের ওপর হজ ফরয করে নিল সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া বিবাদ হজের মধ্যে না করে”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ، وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ»

    “যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা-বার্তা ও পাপ কর্ম না করে হজ পালন করল সে তার পাপ রাশি হতে তার মা যেদিন জন্ম দিয়েছে সে দিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরে এল”[3]

    ইসলামী চরিত্রের মৌলিক বিষয়সমূহ:

    ১. সত্যবাদিতা:

    আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল ইসলামী চরিত্রের আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অন্যতম হচ্ছে সত্যবাদিতার চরিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَكُونُواْ مَعَ ٱلصَّٰدِقِينَ ١١٩﴾ [التوبة: ١١٩]

    “হে ঈমানদারগণ আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৯]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ صِدِّيقًا»

    “তোমরা সত্যবাদিতা গ্রহণ কর, কেননা সত্যবাদিতা পূণ্যের পথ দেখায় আর পূণ্য জান্নাতের পথ দেখায়, একজন লোক সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার প্রতি অনুরাগী হয়, ফলে আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়”[4]

    ২. আমানতদারিতা:

    মুসলিমদের যে সমস্ত ইসলামী চরিত্রের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে আরেকটি হচ্ছে আমানতসমূহ তার অধিকারীদের নিকট আদায় করে দেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا﴾ [النساء: ٥٨]

    “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট আদায় করে দিতে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট ‘আল-আমীন’ উপাধী লাভ করেছিলেন, তারা তাঁর নিকট তাদের সম্পদ আমানত রাখতো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর অনুসারীদের মুশরিকরা কঠোরভাবে নির্যাতন শুরু করার পর যখন আল্লাহ তাকে মক্কা থেকে মদীনা হিজরত করার অনুমতি দিলেন তিনি আমানতের সমস্ত মাল তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া ব্যতীত হিজরত করেন নি, অথচ তারা সকলেই কাফির ছিল; কিন্তু ইসলাম তো আমানত তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে যদিও তারা কাফির হয়।

    ৩. অঙ্গিকার পূর্ণ করা:

    ইসলামী মহান চরিত্রের অন্যতম হচ্ছে অঙ্গিকার পূর্ণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡ‍ُٔولٗا﴾ [الاسراء: ٣٤]

    “আর তোমরা অঙ্গিকার পূর্ণ কর। কেননা অঙ্গিকার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে”[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৪]

    আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

    ﴿ٱلَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهۡدِ ٱللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ ٱلۡمِيثَٰقَ ٢٠﴾ [الرعد: ٢٠]

    “যারা অঙ্গিকার পূর্ণ করে এবং প্রদত্ত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে না”[সূরা আর-রা‘আদ, আয়াত: ২০] আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা নিফাকের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য করেছেন।

    ৪. বিনয়:

    ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে একজন মুসলিম তার মুসলিম অপর ভাইদের সাথে ধনী হোক বা গরীব হোক বিনয়ী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَٱخۡفِضۡ جَنَاحَكَ لِلۡمُؤۡمِنِينَ﴾ [الحجر: ٨٨]

    “তুমি তোমার পার্শ্বদেশকে মুমিনদের জন্য অবনত করে দাও”[সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৮৮]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «وَإِنَّ اللهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ، وَلَا يَبْغِي أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ»

    “আল্লাহ তা‘আলা আমার নিকট অহী করেছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে একজন অপরজনের ওপর গর্ব না করে, একজন অপর জনের ওপর সীমালঙ্গন না করে”[5]

    ৫. মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার:

    মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার উত্তম চরিত্রের অন্যতম। আর এটা তাদের হক মহান হওয়ার কারণে, যে হক আল্লাহ হকের পর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا﴾ [النساء: ٣٦]

    “আর তোমরা আল্লাহ ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]

    আল্লাহ তা‘আলা তাদের আনুগত্য, তাদের প্রতি দয়া ও বিনয় এবং তাদের জন্য দো‘আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَٱخۡفِضۡ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحۡمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤﴾ [الاسراء: ٢٤]

    “তাদের উভয়ের জন্য তোমার দয়াবনতির ডানা অবনত করে দাও এবং বল, হে আমার রব তাদের প্রতি আপনি করুণা করুন তারা যেভাবে আমাকে ছোট বেলায় লালন-পালন করেছে”[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৪]

    «جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: «أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَبُوكَ»

    “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞেস করল: “হে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উত্তম সাহচর্যের সবচেয়ে বেশি অধিকারী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন: তোমার মা। অতঃপর জিজ্ঞেস করল তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন: তোমার মা। অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? তিনি উত্তর দিলেন তোমার মা। অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? উত্তর দিলেন: তোমার পিতা”[6]

    মাতা-পিতার প্রতি এ সদ্ব্যবহার ও দয়া অনুগ্রহ অতিরিক্ত বা পূর্ণতা দানকারী বিষয় নয় বরং তা হচ্ছে সকল মানুষের ওপর ইজমার ভিত্তিতে ফরযে আইন।

    ৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা:

    আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। আর তারা হচ্ছে নিকটাত্মীয়গণ যেমন, চাচা, মামা, ফুফা, খালা প্রমূখ। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, আর তা ছিন্ন করা জান্নাতে প্রবেশ থেকে বঞ্চিত ও অভিশাপের কারণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فَأَصَمَّهُمۡ وَأَعۡمَىٰٓ أَبۡصَٰرَهُمۡ ٢٣[محمد: ٢٢، ٢٣]

    “যদি তোমরা প্রত্যাবর্তন কর তবে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, তারা তো ঐ সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন এতে তিনি তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন এবং তাদের অন্তরদৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন”[সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২২-২৩]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «لاَ يَدْخُلُ الجَنَّةَ قَاطِعٌ»

    “আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না”[7]

    ৭. প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার:

    প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। প্রতিবেশী হচ্ছে সে সব লোক যারা তোমার বাড়ীর আশেপাশে বসবাস করে। যে তোমার সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সুন্দর ব্যবহার ও অনুগ্রহের সবচেয়ে বেশি হকদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلۡجَنۢبِ﴾ [النساء: ٣٦]

    “আর মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন নিকটতম প্রতিবেশী ও পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীর প্রতিও”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]

    এতে আল্লাহ নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ওসিয়ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «مَا زَالَ يُوصِينِي جِبْرِيلُ بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

    “জিবরীল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে ওসিয়ত করছিল, এমনকি আমি ধারণা করছি যে প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দিবে”[8]

    অর্থাৎ আমি মনে করেছিলাম যে ওয়ারিশদের সাথে প্রতিবেশীর জন্য মিরাসের একটি অংশ নির্ধারিত করে দেবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেন,

    «يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً، فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ»

    “হে আবু যর! যখন তুমি শুরবা পাক কর তখন পানি বেশি করে দাও, আর তোমার প্রতিবেশীদের অঙ্গিকার পূরণ কর”[9] প্রতিবেশীর পার্শ্বোবস্থানের হক রয়েছে যদিও সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাসী কাফির হয়।

    ৮. মেহমানের আতিথেয়তা:

    ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মেহমানের আতিথেয়তা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

    «وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ»

    “আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে”[10]

    ৯. সাধারণভাবে দান ও বদান্যতা:

    ইসলামী চরিত্রের অন্যতম হচ্ছে দান ও বদান্যতা। আল্লাহ তা‘আলা ইনসাফ, দান ও বদান্যতাকারীদের প্রশংসা করে বলেন,

    ﴿ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ ثُمَّ لَا يُتۡبِعُونَ مَآ أَنفَقُواْ مَنّٗا وَلَآ أَذٗى لَّهُمۡ أَجۡرُهُمۡ عِندَ رَبِّهِمۡ وَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٢٦٢﴾ [البقرة: ٢٦٢]

    “যারা আল্লাহ রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে অতঃপর যা খরচ করেছে তা থেকে কারো প্রতি অনুগ্রহ ও কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্য করে না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাও করবে না”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৬২]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ، فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ، وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلٌ مِنْ زَادٍ، فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ»

    “যার নিকট অতিরিক্ত বাহন থাকে, সে যেন যার বাহন নেই তাকে তা ব্যবহার করতে দেয়। যার নিকট অতিরিক্ত পাথেয় বা রসদ রয়েছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে সাহায্য করে”[11]

    ১০. ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা:

    ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। অনুরূপভাবে মানুষকে ক্ষমা করা, দুর্ব্যবহারকারীকে ছেড়ে দেওয়া, ওযর পেশকারীর ওযর গ্রহণ করা বা মেনে নেওয়াও অন্যতম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ٤٣﴾ [الشورى: ٤٣]

    “আর যে ধৈর্য্য ধারণ করল এবং ক্ষমা করল তার জন্য, নিশ্চয় এটা কাজের দৃঢ়তার অন্তর্ভুক্ত”[সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪৩]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا، أَلاَ تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ»

    “তারা যেন ক্ষমা করে দেয় এবং উদারতা দেখায়, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া কি তোমরা পছন্দ কর না”?

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

    «ارْحَمُوا تُرْحَمُوا، وَاغْفِرُوا يَغْفِرِ اللهُ لَكُمْ»

    “দয়া কর, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে, ক্ষমা করে দাও তোমাদেরকেও ক্ষমা করে দেওয়া হবে”[12]

    ১১. মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন:

    ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন করে দেওয়া, এটা একটি মহান চরিত্র যা ভালবাসা সৌহার্দ্য প্রসার ও মানুষের পারষ্পারিক সহযোগিতার প্রাণের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿لَّا خَيۡرَ فِي كَثِيرٖ مِّن نَّجۡوَىٰهُمۡ إِلَّا مَنۡ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوۡ مَعۡرُوفٍ أَوۡ إِصۡلَٰحِۢ بَيۡنَ ٱلنَّاسِۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ فَسَوۡفَ نُؤۡتِيهِ أَجۡرًا عَظِيمٗا ١١٤﴾ [النساء: ١١٤]

    “তাদের অধিকাংশ কানাকানির মধ্যেই কল্যাণ নেই কেবল সে ব্যক্তি ব্যতীত যে সাদকা, সৎকর্ম ও মানুষের মাঝে সংশোধনের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়, যে ব্যক্তি আল্লাহ সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এসব করে অচিরেই আমরা তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৪]

    ১২. লজ্জা:

    ইসলামী চরিত্রের অন্যতম আরেকটি চরিত্র হচ্ছে লজ্জা। এটা এমন একটি চরিত্র যা পরিপূর্ণতা ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে আহবান করে। অশ্লীল ও বেহায়াপনা হতে বারণ করে। লজ্জা আল্লাহ পক্ষ হতে হয়ে থাকে। ফলে মুসলিম লজ্জা করে আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত না দেখুক। অনুরূপভাবে মানুষের এবং নিজের থেকেও সে লজ্জা করে। লজ্জা অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ বহন করে।

    নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ»

    “লজ্জা ঈমানের বিশেষ অংশ”[13]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

    «الحَيَاءُ لاَ يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ»

    “লজ্জা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না”[14]

    ১৩. দয়া ও করুণা:

    ইসলামী চরিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গুণ হচ্ছে দয়া বা করুণা। এ চরিত্রটি অনেক মানুষের অন্তর হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের অন্তর পাথরের মতো অথবা তার চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। আর প্রকৃত মুমিন হচ্ছে দয়াময়, অনুকৃপাকারী গভীর অনুভূতিসম্পন্ন উজ্জ্বল আবেগের অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿ثُمَّ كَانَ مِنَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡمَرۡحَمَةِ ١٧ أُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡمَيۡمَنَةِ ١٨﴾ [البلد: ١٧، ١٨]

    “অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে পরস্পর পরস্পরকে ধৈর্য্য ও করুণার উপদেশ দিয়েছে তারা হচ্ছে দক্ষিণ পন্থার অনুসারী”[সূরা আল-বালাদ, আয়াত: ১৭-১৮]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم، كمثل الجسد إذا اشتكى منه عضو تداعى له سائر الجسد بالسهر والحمى»

    “মুমিনদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, করুণা, অনুকম্পার উপমা হচ্ছে একটি শরীরের মতো। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় গোটা শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়”[15]

    ১৪. ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা:

    ন্যায় পরায়ণতা ইসলামী চরিত্রের আরেকটি চরিত্র। এ চরিত্র আত্মার প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকার অপরাধ বিমোচনের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُ بِٱلۡعَدۡلِ وَٱلۡإِحۡسَٰنِ وَإِيتَآيِٕ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ﴾ [النحل: ٩٠]

    “নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ইহসান ও নিকটাত্মীয়দের দান করতে নির্দেশ দেন”[সূরা আল-নাহল, আয়াত: ৯০]

    আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿ٱعۡدِلُواْ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ﴾ [المائ‍دة: ٨]

    “ইনসাফ কর, এটা তাক্বওয়ার অতীব নিকটবর্তী”[সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «إِنَّ الْمُقْسِطِينَ عِنْدَ اللهِ عَلَى مَنَابِرَ مِنْ نُورٍ، عَنْ يَمِينِ الرَّحْمَنِ عَزَّ وَجَلَّ، وَكِلْتَا يَدَيْهِ يَمِينٌ، الَّذِينَ يَعْدِلُونَ فِي حُكْمِهِمْ وَأَهْلِيهِمْ وَمَا وَلُوا»

    “ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা আল্লাহর নিকট নূরের মিম্বরের উপর বসবে, তারা সে সব লোক যারা বিচার ফয়সালা, পরিবার-পরিজন এবং যে দায়িত্ব পেয়েছে তাতে ইনসাফ করে”[16]

    ১৫. চারিত্রিক পবিত্রতা:

    ইসলামী চরিত্রের আর একটি অন্যতম দিক হচ্ছে চারিত্রিক পবিত্রতা। এ চরিত্র মানুষের সম্মান সংরক্ষণ এবং বংশে সংমিশ্রণ না হওয়ার দিকে পৌঁছে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغۡنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِ﴾ [النور: ٣٣]

    “যারা বিবাহের সামর্থ্য পায় না তারা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা গ্রহণ করে আল্লাহ তার অনুগ্রহে তাদেরকে সম্পদশালী করা পর্যন্ত”[সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৩]

    রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «اضْمَنُوا لِي سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنْ لَكُمُ الْجَنَّةَ: اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ، وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ، وَأَدُّوا إِذَا اؤْتُمِنْتُمْ، وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ، وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ، وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ»

    “তোমরা আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের যিম্মাদার হও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের যিম্মাদার হব, যখন তোমাদের কেউ কথা বলে সে যেন মিথ্যা না বলে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন যেন খেয়ানত না করে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা যেন ভঙ্গ না করে, তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত কর, তোমাদের হস্তদ্বয় সংযত কর, তোমাদের লজ্জাস্থান হিফাযত কর”[17]

    ইসলামের এ সব চরিত্রে এমন কিছু নেই যা অপছন্দ করা যায়, বরং এসব এমন সম্মান যোগ্য ও মহৎ চারিত্রাবলী যা প্রত্যেক নিষ্কলুষ স্বভাবের অধিকারীর সমর্থন লাভ করে। মুসলিমগণ যদি (আজ) এ মহৎ চরিত্র ধারণ করত তাহলে সর্বত্র থেকে তাদের নিকট মানুষ আগমন করত এবং দলে দলে আল্লাহর দীনে তারা প্রবেশ করত যেভাবে প্রথম যুগের মুসলিমদের লেন-দেন ও চরিত্রের কারণে যেভাবে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেছিল।

    সমাপ্ত

    [1] আহমাদ: ২/২৫০; আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৬৮২; তিরমিযী, হাদীস নং ১১৬২।

    [2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯০৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৫১।

    [3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২১।

    [4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০৭।

    [5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮৬৫।

    [6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৪৮।

    [7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬৩৩।

    [8] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০১৪; সহীহ মুসলিম মুসলিম, হাদীস নং ২৬২৫।

    [9] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬২৫।

    [10] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭।

    [11] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭২৮।

    [12] আহমাদ: ১১/৯৯।

    [13] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৩।

    [14] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৭।

    [15] সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব পরিচ্ছেদ: মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুর ওপর দয়া করা বিষয়ে, ৪৩৮/১০, ৬০১১ ৫৫/১, ১২; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াসসিলাহ পরিচ্ছেদ মুমিনদের প্রতি দয়া ও নমনীয়তা বিষয়ে, ২০০০/৪, ২৫৮৬।

    [16] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮২৭।

    [17] মুসনাদে আহমাদ: ৫/৩২৩। হাদীসটি তাবারানী বর্ণনা করে হাসান বলেছেন।