মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন

বর্ণনা

এ প্রবন্ধে মানুষ মারা গেলে তার দাফন কাফন, উপস্থিত লোকজন ও আত্মীয় স্বজনের করণীয়, মাইয়্যেতের গোসল, কাফন পড়ানো, জানাযার সালাত আদায় ও কবর যিয়ারতসহ আরো অনেক বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন

আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

أحكام دفن الميت

(باللغة البنغالية)

عبد الله المأمون الأزهري

مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

সূচিপত্র

ভূমিকা... 3

১- মৃত্যুর সাথে সাথে উপস্থিত লোকদের করণীয়: 6

২- উপস্থিত লোকদের যেসব কাজ করা জায়েয. 14

৩- মাইয়্যেতের আত্মীয় স্বজনের করণীয়. 17

৪- মাইয়্যেতের আত্মীয় স্বজনের জন্য যেসব কাজ করা হারাম. 25

৫- মাইয়্যেতের উত্তম পরিণতির কিছু আলামত.. 32

৬- মাইয়্যেতের প্রতি মানুষের প্রশংসা.. 44

৭- মাইয়্যেতকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি... 47

৮- কাফন পড়ানো.... 59

৯- জানাযা সালাত আদায় পদ্ধতি... 63

১০- মাইয়্যেতকে বহন করা ও দাফনের হুকুম. 69

১১- দাফন কাজে মজুরী গ্রহণের হুকুম. 70

১২- জানাযা বহনের নিয়ম. 70

১৩- মাইয়্যেত দাফনের নিয়মাবলি.. 76

১৪- কবর খননের হুকুম ও কবরের বৈশিষ্ট্য.. 83

১৫- গর্ভবতী নারী দাফনের বিধিবিধান. 94

১৬- কবর যিয়ারত.. 96


সংক্ষিপ্ত বর্ণনা.............

এ প্রবন্ধে মানুষ মারা গেলে তার দাফন কাফন, উপস্থিত লোকজন ও আত্মীয় স্বজনের করণীয়, মাইয়্যেতের গোসল, কাফন পড়ানো, জানাযার সালাত আদায় ও কবর যিয়ারতসহ আরো অনেক বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

 ভূমিকা

আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি মানুষ তথা প্রাণিকে নির্দিষ্ট সময় সীমা দিয়ে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। সে সময় সীমা পেরিয়ে গেলে সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। কেউ এ অমোঘ বিধান থেকে পালাতে পারবে না। আল্লাহ বলেছেন,

﴿كُلُّ نَفۡسٖ ذَآئِقَةُ ٱلۡمَوۡتِۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٣٥﴾ [الانبياء: ٣٥]

“প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”[সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫]

﴿كُلُّ نَفۡسٖ ذَآئِقَةُ ٱلۡمَوۡتِۖ ثُمَّ إِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٥٧﴾ [العنكبوت: ٥٧]

“প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে”[সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৫৭]

﴿أَيۡنَمَا تَكُونُواْ يُدۡرِككُّمُ ٱلۡمَوۡتُ وَلَوۡ كُنتُمۡ فِي بُرُوجٖ مُّشَيَّدَةٖۗ وَإِن تُصِبۡهُمۡ حَسَنَةٞ يَقُولُواْ هَٰذِهِۦ مِنۡ عِندِ ٱللَّهِۖ وَإِن تُصِبۡهُمۡ سَيِّئَةٞ يَقُولُواْ هَٰذِهِۦ مِنۡ عِندِكَۚ قُلۡ كُلّٞ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِۖ فَمَالِ هَٰٓؤُلَآءِ ٱلۡقَوۡمِ لَا يَكَادُونَ يَفۡقَهُونَ حَدِيثٗا ٧٨﴾ [النساء : ٧٨]

“তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। আর যদি তাদের কাছে কোনো কল্যাণ পৌঁছে তবে বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’। আর যদি কোনো অকল্যাণ পৌঁছে, তখন বলে, ‘এটি তোমার পক্ষ থেকে’। বলুন, ‘সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে’। সুতরাং এই কাওমের কী হলো, তারা কোনো কথা বুঝতে চায় না!” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭৮]

﴿كَلَّآ إِذَا بَلَغَتِ ٱلتَّرَاقِيَ ٢٦ وَقِيلَ مَنۡۜ رَاقٖ ٢٧ وَظَنَّ أَنَّهُ ٱلۡفِرَاقُ ٢٨ وَٱلۡتَفَّتِ ٱلسَّاقُ بِٱلسَّاقِ ٢٩ إِلَىٰ رَبِّكَ يَوۡمَئِذٍ ٱلۡمَسَاقُ ٣٠﴾ [القيامة: ٢٦، ٣٠]

“কখনই না, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। আর বলা হবে, ‘কে তাকে বাঁচাবে’? আর সে মনে করবে, এটিই বিদায়ক্ষণ। আর পায়ের গোছার সঙ্গে পায়ের গোছা জড়িয়ে যাবে। সেদিন তোমার রবের কাছেই সকলকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে”[সূরা আল-কিয়ামা, আয়াত: ২৬-৩০]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ».

“তোমরা বেশি করে স্বাদ হরণকারী বিষয় অর্থাৎ মৃত্যুর আলোচনা করবে”[1]

মানুষ মারা গেলে তাকে দাফন কাফন করা ও সসম্মানে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়া অন্য মুসলিমের ওপর ফরযে কিফায়া। কিছু সংখ্যক লোক তা আদায় করলে অন্যদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হবে। কোনো মুসলিম মারা গেলে অন্যদের ওপর নিম্নোক্ত কাজগুলো করা অত্যাবশ্যকীয়:

 ১- মৃত্যুর সাথে সাথে উপস্থিত লোকদের করণীয়:

ক- মৃত্যু ব্যক্তির চোখ বন্ধ করে দেওয়া। তার জন্য কল্যাণকর দো‘আ করা। কেননা আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন মারা যান, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চোখ বন্ধ করে দিয়েছেন।

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«دَخَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى أَبِي سَلَمَةَ وَقَدْ شَقَّ بَصَرُهُ، فَأَغْمَضَهُ، ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ الرُّوحَ إِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ»، فَضَجَّ نَاسٌ مِنْ أَهْلِهِ، فَقَالَ: «لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ إِلَّا بِخَيْرٍ، فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ يُؤَمِّنُونَ عَلَى مَا تَقُولُونَ»، ثُمَّ قَالَ: اللهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمَهْدِيِّينَ، وَاخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِي الْغَابِرِينَ، وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ، وَافْسَحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ، وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। তখন তার চোখগুলো উল্টো ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখগুলো বন্ধ করে দিলেন এবং বললেন, রূহ যখন নিয়ে যাওয়া হয়, তখন চোখ তৎপ্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এ কথা শুনে তার পরিবারের লোকেরা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলেন। তিনি বললেন, তোমরা নিজেদের জন্য অমঙ্গলজনক কোনো দো‘আ করো না। কেননা ফিরিশতাগণ তোমাদের কথার ওপর আমীন বলে থাকেন। তিনি তারপর বললেন হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামাকে মাফ করে দাও, হিদায়াতপ্রাপ্তদের মধ্যে তার দরজাকে বুলন্দ করে দাও এবং তার উত্তরাধিকারীদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নিযুক্ত কর। হে রাব্বুল আলামীন! আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও, তার জন্য কবরকে প্রশস্ত করে দাও এবং তার কবরকে আলোকময় করে দাও”[2]

খ- মৃত ব্যক্তিকে চাদর দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে দেওয়া। আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

«أَنَّ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخْبَرَتْهُ، قَالَتْ: أَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَلَى فَرَسِهِ مِنْ مَسْكَنِهِ بِالسُّنْحِ حَتَّى نَزَلَ، فَدَخَلَ المَسْجِدَ، فَلَمْ يُكَلِّمِ النَّاسَ حَتَّى دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، فَتَيَمَّمَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُسَجًّى بِبُرْدِ حِبَرَةٍ، فَكَشَفَ عَنْ وَجْهِهِ، ثُمَّ أَكَبَّ عَلَيْهِ، فَقَبَّلَهُ، ثُمَّ بَكَى، فَقَالَ: «بِأَبِي أَنْتَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ، لاَ يَجْمَعُ اللَّهُ عَلَيْكَ مَوْتَتَيْنِ، أَمَّا المَوْتَةُ الَّتِي كُتِبَتْ عَلَيْكَ فَقَدْ مُتَّهَا»

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আমাকে বলেছেন, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর পেয়ে) আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘সুন্‌হ’-এ অবস্থিত তার বাড়ি থেকে ঘোড়ায় চড়ে চলে এলেন এবং নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে লোকদের সাথে কোনো কথা না বলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ঘরে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে অগ্রসর হলেন। তখন তিনি একখানি ‘হিবারাহ’ ইয়ামানী চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল উন্মুক্ত করে তাঁর ওপর ঝুকে পড়লেন এবং চুমু খেলেন, তারপর কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, ইয়া নবীয়্যাল্লাহ! আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু একত্রিত করবেন না। তবে যে মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল তা তো আপনি কবুল করেছেন”[3]

গ- তবে মুহরিম হলে তাকে ঢাকা হবে না। কেননা মুহরিমের চেহারা ও মাথা ঢাকা হয় না। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«بَيْنَمَا رَجُلٌ وَاقِفٌ بِعَرَفَةَ، إِذْ وَقَعَ عَنْ رَاحِلَتِهِ، فَوَقَصَتْهُ - أَوْ قَالَ: فَأَوْقَصَتْهُ - قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اغْسِلُوهُ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ، وَكَفِّنُوهُ فِي ثَوْبَيْنِ، وَلاَ تُحَنِّطُوهُ، وَلاَ تُخَمِّرُوا رَأْسَهُ، فَإِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ القِيَامَةِ مُلَبِّيًا»

“এক ব্যক্তি আরাফাতে ওয়াকূফ অবস্থায় হঠাৎ তার উটনী থেকে পড়ে যায়। এতে তার ঘাড় মটকে গেল অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তাঁর ঘাড় মটকিয়ে দিল। (এতে সে মারা যায়)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দু’ কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না। কেননা কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে”[4]

ঘ- মৃত ব্যক্তিকে গোসল, জানাযার সালাত এবং দাফনের ক্ষেত্রে দ্রুততা অবলম্বন করা। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أَسْرِعُوا بِالْجِنَازَةِ، فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ تُقَدِّمُونَهَا، وَإِنْ يَكُ سِوَى ذَلِكَ، فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ»

“তোমরা জানাযা নিয়ে দ্রুতগতিতে চলবে। কেননা, সে যদি সৎলোক হয়, তবে এটা উত্তম, যার দিকে তোমরা তাকে এগিয়ে দিচ্ছ আর যদি সে অন্য কিছু হয়, তবে সে একটি অকল্যাণ, যাকে তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে দ্রুত নামিয়ে ফেলছ”[5]

ঙ- মৃত ব্যক্তি যে এলাকায় মারা যাবে তাকে সেখানেই দাফন করা। কেননা উহুদ যুদ্ধের শহীদদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেই দাফন করেছিলেন। জাবির ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ جَاءَتْ عَمَّتِي بِأَبِي لِتَدْفِنَهُ فِي مَقَابِرِنَا، فَنَادَى مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رُدُّوا القَتْلَى إِلَى مَضَاجِعِهِمْ»

“উহুদের দিন আমার ফুফু আমার (শহীদ) পিতাকে আমাদের কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষক ঘোষণা দিলেন, নিহতদের শাহাদাতের স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে এসো”[6]

চ- মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা। মৃত ব্যক্তির পরিবার যদি তা আদায়ে অক্ষম হয় তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আদায় করে দিতে হবে। অন্য কোনো দানশীল ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে আদায় করে দিলেও আদায় হয়ে যাবে। সা‘দ উবনুল আতওয়াল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«أَنَّ أَخَاهُ مَاتَ وَتَرَكَ ثَلَاثَمِائَةِ دِرْهَمٍ، وَتَرَكَ عِيَالًا، فَأَرَدْتُ أَنْ أُنْفِقَهَا عَلَى عِيَالِهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَخَاكَ مُحْتَبَسٌ بِدَيْنِهِ، فَاقْضِ عَنْهُ» ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ أَدَّيْتُ عَنْهُ إِلَّا دِينَارَيْنِ، ادَّعَتْهُمَا امْرَأَةٌ وَلَيْسَ لَهَا بَيِّنَةٌ، قَالَ: «فَأَعْطِهَا فَإِنَّهَا مُحِقَّةٌ»

“তার ভাই মারা গেলেন এবং তিনশত দিরহাম ও কতক অসহায় সন্তান রেখে যান। আমি সেগুলো তার সন্তানদের জন্য খরচ করতে মনস্থ করলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার ভাই দেনার কারণে আটক রয়েছে। অতএব, তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করো। সা‘দ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তার পক্ষ থেকে সব দেনা শোধ করেছি, কেবল এক মহিলার দাবিকৃত দু’টি দীনার বাকী আছে। কিন্তু তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বলেন, তা তাকে দিয়ে দাও, কারণ সে সত্যবাদিনী”।[7]

সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جِنَازَةٍ فَقَالَ: «أَهَا هُنَا مِنْ بَنِي فُلَانٍ أَحَدٌ؟» ثَلَاثًا، فَقَامَ رَجُلٌ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا مَنَعَكَ فِي الْمَرَّتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ أَنْ لَا تَكُونَ أَجَبْتَنِي؟ أَمَا إِنِّي لَمْ أُنَوِّهْ بِكَ إِلَّا بِخَيْرٍ، إِنَّ فُلَانًا لِرَجُلٍ مِنْهُمْ مَاتَ مَأْسُورًا بِدَيْنِهِ»

“আমরা এক জানাযায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলাম। তিনি তিনবার জিজ্ঞাসা করলেন: এখানে অমুক গোত্রের কেউ আছে কি? এক ব্যক্তি দাঁড়ালে তিনি বললেন, তুমি প্রথম দুইবার উত্তর দাও নি কেন? আমি তোমার ভালোর জন্যই ডেকেছি। এরপর তিনি তাদের এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, সে তো মারা গেছে, কিন্তু সে দেনার দায়ে আবদ্ধ রয়েছে”[8]

২- উপস্থিত লোকদের যেসব কাজ করা জায়েয:

মাইয়্যেতের চেহারা খুলে দেখা, চুম্বন করা, তিন দিন পর্যন্ত কান্না করা জায়েয। জাবির ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَمَّا قُتِلَ أَبِي جَعَلْتُ أَكْشِفُ الثَّوْبَ عَنْ وَجْهِهِ أَبْكِي، وَيَنْهَوْنِي عَنْهُ، وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ يَنْهَانِي، فَجَعَلَتْ عَمَّتِي فَاطِمَةُ تَبْكِي، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَبْكِينَ أَوْ لاَ تَبْكِينَ مَا زَالَتِ المَلاَئِكَةُ تُظِلُّهُ بِأَجْنِحَتِهَا حَتَّى رَفَعْتُمُوهُ»

(উহুদ যুদ্ধে) আমার পিতা (আব্দুল্লাহ) শহীদ হয়ে গেলে আমি তার মুখমণ্ডল থেকে কাপড় সরিয়ে কাঁদতে লাগলাম। লোকেরা আমাকে নিষেধ করতে লাগল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিষেধ করেন নি। আমার ফুফী ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাও কাঁদতে লাগলেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কাঁদ বা না-ই কাঁদ (উভয় সমান), তোমরা তাকে তুলে নেওয়া পর্যন্ত ফিরিশতাগণ তাদের ডানা দিয়ে ছায়া বিস্তার করে রেখেছেন”[9]

আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা আমাকে বলেছেন,

«أَقْبَلَ أَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَلَى فَرَسِهِ مِنْ مَسْكَنِهِ بِالسُّنْحِ حَتَّى نَزَلَ، فَدَخَلَ المَسْجِدَ، فَلَمْ يُكَلِّمِ النَّاسَ حَتَّى دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، فَتَيَمَّمَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُسَجًّى بِبُرْدِ حِبَرَةٍ، فَكَشَفَ عَنْ وَجْهِهِ، ثُمَّ أَكَبَّ عَلَيْهِ، فَقَبَّلَهُ، ثُمَّ بَكَى، فَقَالَ: «بِأَبِي أَنْتَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ، لاَ يَجْمَعُ اللَّهُ عَلَيْكَ مَوْتَتَيْنِ، أَمَّا المَوْتَةُ الَّتِي كُتِبَتْ عَلَيْكَ فَقَدْ مُتَّهَا»

(রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর পেয়ে) আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘সুন্‌হ’-এ অবস্থিত তাঁর বাড়ি থেকে ঘোড়ায় চড়ে চলে এলেন এবং নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে লোকদের সাথে কোনো কথা না বলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ঘরে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে অগ্রসর হলেন। তখন তিনি একখানি ‘হিবারাহ’ ইয়ামানী চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখমণ্ডল উম্মুক্ত করে তার উপর ঝুকে পড়লেন এবং চুমু খেলেন, তারপর কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দুই মৃত্যু একত্রিত করবেন না। তবে যে মৃত্যু আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল তা তো আপনি কবুল করেছেন”[10]

আব্দুল্লাহ ইবন জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمْهَلَ آلَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا أَنْ يَأْتِيَهُمْ، ثُمَّ أَتَاهُمْ، فَقَالَ: «لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ»

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফর পরিবারকে কান্নাকাটি করার জন্য তিন দিন সময় দিলেন। অতঃপর তিনি জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারের কাছে এসে বললেন, তোমরা আমার ভাইয়ের জন্য আজকের দিনের পরে আর কাঁদবে না”[11]

৩- মাইয়্যেতের আত্মীয় স্বজনের করণীয়:

ক- মাইয়্যেতের আত্মীয় স্বজন মৃত্যুর খবর দ্রুত জানিয়ে দিবে।

খ- আল্লাহর ফয়সালায় ধৈর্যধারণ করা ও সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ বলেছেন,

﴿وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥ ٱلَّذِينَ إِذَآ أَصَٰبَتۡهُم مُّصِيبَةٞ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦ أُوْلَٰٓئِكَ عَلَيۡهِمۡ صَلَوَٰتٞ مِّن رَّبِّهِمۡ وَرَحۡمَةٞۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُهۡتَدُونَ ١٥٧﴾ [البقرة: ١٥٥، ١٥٧]

“আর আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৫৫-১৫৭]

আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَتَى عَلَى امْرَأَةٍ تَبْكِي عَلَى صَبِيٍّ لَهَا، فَقَالَ لَهَا: «اتَّقِي اللهَ وَاصْبِرِي»، فَقَالَتْ: وَمَا تُبَالِي بِمُصِيبَتِي فَلَمَّا ذَهَبَ، قِيلَ لَهَا: إِنَّهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَخَذَهَا مِثْلُ الْمَوْتِ، فَأَتَتْ بَابَهُ، فَلَمْ تَجِدْ عَلَى بَابِهِ بَوَّابِينَ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللهِ لَمْ أَعْرِفْكَ، فَقَالَ: «إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ أَوَّلِ صَدْمَةٍ»، أَوْ قَالَ: «عِنْدَ أَوَّلِ الصَّدْمَةِ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি কবরের পাশে কাঁদছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং সবর কর। মহিলাটি বললেন, আমার কাছ থেকে চলে যান। আপনার ওপর তো আমার মতো মসীবত আসে নি। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেন নি। পরে তাকে বলা হলো, তিনি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লানের কাছে হাযির হলেন, তাঁর কাছে কোনো পাহারাদার পেলেন না। তিনি আরয করলেন, আমি আপনাকে চিনতে পারি নি। তিনি বললেন: সবর তো বিপদের প্রথম অবস্থাতেই”[12]

কারো সন্তান মারা গেলে সে ধৈর্যধারণ করলে তার বিনিময় অনেক। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنَ النَّاسِ مِنْ مُسْلِمٍ، يُتَوَفَّى لَهُ ثَلاَثٌ لَمْ يَبْلُغُوا الحِنْثَ، إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الجَنَّةَ بِفَضْلِ رَحْمَتِهِ إِيَّاهُمْ»

“কোনো মুসলিমের তিনটি সন্তান বালিগ হওয়ার পূর্বে মারা গেলে তাদের প্রতি রহমতস্বরূপ অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতে দাখিল করবেন”[13]

আবূ সা‘ঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«أَنَّ النِّسَاءَ قُلْنَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اجْعَلْ لَنَا يَوْمًا فَوَعَظَهُنَّ، وَقَالَ: «أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَ لَهَا ثَلاَثَةٌ مِنَ الوَلَدِ، كَانُوا حِجَابًا مِنَ النَّارِ»، قَالَتِ امْرَأَةٌ: وَاثْنَانِ؟ قَالَ: «وَاثْنَانِ»

“মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দিন। তারপর তিনি একদিন তাদের ওয়ায-নসীহত করলেন এবং বললেন, “যে স্ত্রীলোকের তিনটি সন্তান মারা যায়, তারা তার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হবে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করলেন, দু’সন্তান মারা গেলে? তিনি বললেন, দু’সন্তান মারা গেলেও”[14]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لاَ يَمُوتُ لِمُسْلِمٍ ثَلاَثَةٌ مِنَ الوَلَدِ، فَيَلِجَ النَّارَ، إِلَّا تَحِلَّةَ القَسَمِ» قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ: ﴿وَإِن مِّنكُمۡ إِلَّا وَارِدُهَاۚ﴾ [مريم: ٧١]

“কোনো মুসলিমের তিনটি (নাবালিগ) সন্তান মারা গেলে তারপরও সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে -এমন হবে না। তবে শুধু কসম পূর্ণ হওয়ার পরিমাণ পর্যন্ত। আবূ আব্দুল্লাহ (ইমাম বুখারী রহ. কসম পূর্ণ হওয়ার সময় বলতে বুঝিয়ে) বলেন, আল্লাহ তা‘আলার বাণী ﴿وَإِن مِّنكُمۡ إِلَّا وَارِدُهَاۚ[مريم: ٧١] “তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে”[15]

গ- মৃত সংবাদ শোনে إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ‘ইন্না লিল্লাহ ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন বলা’।

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ، فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللهُ: ﴿إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ﴾ [البقرة: ١٥٦] اللهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا، إِلَّا أَخْلَفَ اللهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا، قَالَتْ: فَلَمَّا مَاتَ أَبُو سَلَمَةَ، قُلْتُ: أَيُّ الْمُسْلِمِينَ خَيْرٌ مِنْ أَبِي سَلَمَةَ؟ أَوَّلُ بَيْتٍ هَاجَرَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ إِنِّي قُلْتُهَا، فَأَخْلَفَ اللهُ لِي رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَتْ: أَرْسَلَ إِلَيَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاطِبَ بْنَ أَبِي بَلْتَعَةَ يَخْطُبُنِي لَهُ، فَقُلْتُ: إِنَّ لِي بِنْتًا وَأَنَا غَيُورٌ، فَقَالَ: «أَمَّا ابْنَتُهَا فَنَدْعُو اللهَ أَنْ يُغْنِيَهَا عَنْهَا، وَأَدْعُو اللهَ أَنْ يَذْهَبَ بِالْغَيْرَةِ»

“কোনো মুসলিম যখন কোনো বিপদে পতিত হয়, তখন সে যদি আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাহি রাজি‘উন” বলে এবং এ দো‘আ পাঠ করে “হে আল্লাহ! আমাকে বিপদে ধৈর্যধারণের সাওয়াব দান কর এবং এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দিয়ে ধন্য কর”। তবে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিয়ে ধন্য করবেন। যখন আবূ সালামার (তার স্বামী) মারা গেলো তখন আমি বললাম, আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে কে উত্তম হতে পারে? তাঁর পরিবারই প্রথম পরিবার যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হিজরত করেছিল। এরপর আমি ঐ দো‘আ পাঠ করলাম। ফলে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার জন্য দান করলেন। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমার নিকট হাতিব ইবন আবি বালতা‘আকে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহের পয়গাম পাঠালেন। আমি বললাম, আমার একটি মেয়ে রয়েছে আর আমি একটু অভিমানী। তিনি বললেন, তোমার মেয়ের জন্য আমি দো‘আ করছি যেন আল্লাহ তার সুব্যবস্থা করে দেন এবং এটাও দো‘আ করছি যে, তিনি তোমার অভিমানকে দুর করে দেন”।[16]

ঘ- ধৈর্যধারণ করা মানে এটা নয় যে, নারীরা সম্পূর্ণরূপে সাজসজ্জা পরিহার করবে। সন্তান বা অন্যদের ক্ষেত্রে তিন দিন শোক পালন করবে, আর স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।

যায়নাব বিনতে আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَمَّا جَاءَ نَعْيُ أَبِي سُفْيَانَ مِنَ الشَّأْمِ، دَعَتْ أُمُّ حَبِيبَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا بِصُفْرَةٍ فِي اليَوْمِ الثَّالِثِ، فَمَسَحَتْ عَارِضَيْهَا، وَذِرَاعَيْهَا، وَقَالَتْ: إِنِّي كُنْتُ عَنْ هَذَا لَغَنِيَّةً، لَوْلاَ أَنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لاَ يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ، أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلاَثٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ، فَإِنَّهَا تُحِدُّ عَلَيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا»

“যখন শাম (সিরিয়া) থেকে (তাঁর পিতা) আবূ সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছাল, তার তৃতীয় দিন উম্মে হাবীবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হলুদ বর্ণের সুগন্ধি আনলেন এবং তাঁর উভয় গাল ও বাহুতে মাখলেন। তারপর বললেন, অবশ্য আমার এর কোনো প্রয়োজন ছিল না, যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা বলতে না শোনতাম, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ এবং কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা হালাল নয়। অবশ্য স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে”[17]

৪- মাইয়্যেতের আত্মীয় স্বজনের জন্য যেসব কাজ করা হারাম:

মানুষ যখন মারা যায় তখন তার জন্য যেমন করণীয় রয়েছে, তেমনি বর্জনীয়ও রয়েছে। অতএব, এসব কাজ জানা প্রত্যেকটি মুসলিমের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। নিম্নে এসব আলোচনা করা হলো:

ক- মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা হারাম। আবূ মালিক আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ، لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: الْفَخْرُ فِي الْأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ، وَالْاسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ " وَقَالَ: «النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا، تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ، وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ»

“আমার উম্মাতের মধ্যে জাহেলিয়াত বিষয়ের চারটি জিনিস রয়েছে যা তারা ত্যাগ করছে না। বংশ মর্যাদা নিয়ে গর্ব, অন্যের বংশের প্রতি কটাক্ষ, গ্রহ-নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা এবং মৃতদের জন্য বিলাপ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, বিলাপকারিনী যদি তার মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিনে তাকে দাঁড় করানো হবে, তখন তার দেহে আলকাতরার আবরণ থাকবে এবং খোস-পাঁচড়ার পোষাক থাকবে”[18]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন,

«لَمَّا جَاءَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَتْلُ ابْنِ حَارِثَةَ وَجَعْفَرِ بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَعَبْدِ اللهِ بْنِ رَوَاحَةَ، جَلَسَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْرَفُ فِيهِ الْحُزْنُ، قَالَتْ: وَأَنَا أَنْظُرُ مِنْ صَائِرِ الْبَابِ - شَقِّ الْبَابِ - فَأَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ نِسَاءَ جَعْفَرٍ، وَذَكَرَ بُكَاءَهُنَّ، فَأَمَرَهُ أَنْ يَذْهَبَ فَيَنْهَاهُنَّ، فَذَهَبَ، فَأَتَاهُ فَذَكَرَ أَنَّهُنَّ لَمْ يُطِعْنَهُ، فَأَمَرَهُ الثَّانِيَةَ أَنْ يَذْهَبَ فَيَنْهَاهُنَّ، فَذَهَبَ، ثُمَّ أَتَاهُ فَقَالَ: وَاللهِ، لَقَدْ غَلَبْنَنَا يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَتْ فَزَعَمَتْ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اذْهَبْ فَاحْثُ فِي أَفْوَاهِهِنَّ مِنَ التُّرَابِ» قَالَتْ عَائِشَةُ: فَقُلْتُ: أَرْغَمَ اللهُ أَنْفَكَ، وَاللهِ، مَا تَفْعَلُ مَا أَمَرَكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَا تَرَكْتَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْعَنَاءِ

“যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যায়েদ ইবন হারিসা, জাফর ইবন আবূ তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের শাহাদতের সংবাদ পৌঁছল। তখন তিনি বসে পড়লেন। তার চেহারা মুবারকে দুঃখ ও চিন্তার চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী ও পরিবারের মহিলারা কান্নাকাটি করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি গিয়ে তাদেরকে নিষেধ কর। সে গেলো এবং পুনরায় ফিরে এসে বললো, তারা তার কথা শুনে নি। তিনি দ্বিতীয়বার তাকে নির্দেশ দিলেন, সে যেন গিয়ে তাদের নিষেধ করেন, সে গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে বললো, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারাই আমাদের ওপর প্রবল রইলো। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, যাও, তুমি তাদের মুখে মাটি ঢুকিয়ে দাও। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমি (মনে মনে) বললাম, আল্লাহ তোমার নাক ধুলি ধুসরিত করুন। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে নির্দেশ তোমাকে দিয়েছেন তা তুমি করতেও পারবে না আর তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও বিরক্ত করতে ছাড় নি”[19]

উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: ﴿يُبَايِعۡنَكَ عَلَىٰٓ أَن لَّا يُشۡرِكۡنَ بِٱللَّهِ شَيۡ‍ٔٗا .....وَلَا يَعۡصِينَكَ فِي مَعۡرُوفٖ ١٢﴾ [الممتحنة : ١٢] يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَنْ لَا يُشْرِكْنَ بِاللهِ شَيْئًا وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ قَالَتْ: كَانَ مِنْهُ النِّيَاحَةُ، قَالَتْ: فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِلَّا آلَ فُلَانٍ، فَإِنَّهُمْ كَانُوا أَسْعَدُونِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَا بُدَّ لِي مِنْ أَنْ أُسْعِدَهُمْ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِلَّا آلَ فُلَانٍ»

“যখন এ আয়াত নাযিল হলো, “হে নবী! মুমিন মহিলারা যখন তোমার কাছে এসে বাই‘আত করে এ মর্মে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো শরীক করবে না এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না”... [সূরা আল-মুমতাহিনাহ, আয়াত: ১২] উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, তন্মধ্যে বিলাপও ছিল। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক পরিবার ব্যতীত। কারণ, তারা জাহেলিয়াতের যুগে আমাকে বিলাপে সহানুভূতি দেখিয়েছিল। তাই তাদের প্রতি সহানূভুতি দেখান আমার জন্য জরুরী। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “অমুক পরিবার ব্যতীত”[20]

খ- গাল চাপড়ানো হারাম। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الخُدُودَ، وَشَقَّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ»

“যারা (মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশে) গাল চাপড়ায়, জামার বুক ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলিয়াত যুগের মতো চিৎকার দেয়, তারা আমাদের তরিকাভুক্ত নয়”[21]

গ- শোকে মাথার চুল কামানো। আবূ বুরদা ইবন আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

«وَجِعَ أَبُو مُوسَى وَجَعًا شَدِيدًا، فَغُشِيَ عَلَيْهِ وَرَأْسُهُ فِي حَجْرِ امْرَأَةٍ مِنْ أَهْلِهِ، فَلَمْ يَسْتَطِعْ أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهَا شَيْئًا، فَلَمَّا أَفَاقَ، قَالَ: أَنَا بَرِيءٌ مِمَّنْ بَرِئَ مِنْهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَرِئَ مِنَ الصَّالِقَةِ وَالحَالِقَةِ وَالشَّاقَّةِ»

“আবূ মূসা কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। এমন কি তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। তখন তার মাথা তার পরিবারস্থ কোনো এক মহিলার কোলে ছিল। তিনি তাকে কোনো জওয়াব দিতে পারছিলেন না। চেতনা ফিরে পেলে তিনি বললেন, সে সব লোকের সঙ্গে আমি সম্পর্ক রাখি না যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সব নারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কথা প্রকাশ করেছেন- যারা চিৎকার করে কাঁদে, যারা মাথা মুড়ায় এবং যারা জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে”[22]

ঘ- শোকে মাথার চুল এলোমেলো করে রাখা। উসাইদ ইবন আবূ উসাইদ জনৈক বাই‘আত গ্রহণকারী মহিলা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ فِيمَا أَخَذَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَعْرُوفِ الَّذِي أَخَذَ عَلَيْنَا أَنْ لَا نَعْصِيَهُ فِيهِ: «أَنْ لَا نَخْمُشَ وَجْهًا، وَلَا نَدْعُوَ وَيْلًا، وَلَا نَشُقَّ جَيْبًا، وَأَنْ لَا نَنْشُرَ شَعَرًا»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছ থেকে যেসব উত্তম ব্যাপারে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, তার মাঝে এ ছিল যে, আমরা তাঁর নাফরমানী করব না, আমাদের চেহারা নখ দিয়ে আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত করব না, ধ্বংসের আহ্বান করব না, জামার বক্ষদেশ ফেঁড়ে ফেলব না এবং মাথার চুল অবিন্যস্ত করব না[23]

৫- মাইয়্যেতের উত্তম পরিণতির কিছু আলামত:

মানুষের শেষ পরিণতি ভালো-মন্দ হওয়ার ব্যাপারে শরী‘আত প্রণেতা কিছু নিদর্শন দিয়েছেন। কারো মধ্যে এসব ভালো আলামত পাওয়া গেলে তার উত্তম পরিণতির সুসংবাদ, তবে এসব কিছু মহান আল্লাহ তা‘আলার ওপরই ছেড়ে দিতে হবে।

ক- যার সর্বশেষ বাক্য কালেমায় শাহাদাত হবে তার ব্যাপারে হাদীসে উত্তম পরিণতির শুভসংবাদ এসেছে। মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»

“যার সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”[24]

মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি অসুস্থ অবস্থায় বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কিছু কথা শুনেছি যা এতদিন গোপন রেখেছিলাম। তাঁকে বলতে শুনেছি,

«مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ»

“যার সর্বশেষ বাক্য হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে”[25]

খ- মৃত্যুর সময়ে ললাট ঘর্মাক্ত হওয়া মুমিনের আলামত। আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদাহ রহ. তার পিতা বুরায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

«مَوْتُ الْمُؤْمِنِ بِعَرَقِ الْجَبِينِ»

“মুমিন ব্যক্তি ঘর্মাক্ত ললাটের সাথে মারা যায়”(মৃত্যুর সময়ে ললাট ঘর্মাক্ত হওয়া মুমিনের আলামত।)[26]

গ- জুমু‘আর দিনে বা রাতে মারা গেলে। আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلَّا وَقَاهُ اللهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ »

“কোনো মুমিন যদি জুমু‘আর দিন বা রাতে মারা যায়, তবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে কবরের ফিতনা বা পরীক্ষা থেকে রক্ষা করবেন”[27]

ঘ- যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হওয়া।

﴿وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٰتَۢاۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ عِندَ رَبِّهِمۡ يُرۡزَقُونَ ١٦٩ فَرِحِينَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ وَيَسۡتَبۡشِرُونَ بِٱلَّذِينَ لَمۡ يَلۡحَقُواْ بِهِم مِّنۡ خَلۡفِهِمۡ أَلَّا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ١٧٠ ۞يَسۡتَبۡشِرُونَ بِنِعۡمَةٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَضۡلٖ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ١٧١﴾ [ال عمران: ١٦٩، ١٧١]

“আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিযিক দেওয়া হয়। আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ করেছেন, তাতে তারা খুশি। আর তারা উৎফুল্ল­ হয়, পরবর্তীদের থেকে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয় নি তাদের বিষয়ে। এজন্য যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নি‘আমত ও অনুগ্রহ লাভে খুশি হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭১]

মিকদাম ইবনে মা‘দীকারিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لِلشَّهِيدِ عِنْدَ اللَّهِ سِتُّ خِصَالٍ: يَغْفِرُ لَهُ فِي أَوَّلِ دُفْعَةٍ مِنْ دَمِهِ، وَيُرَى مَقْعَدَهُ مِنَ الْجَنَّةِ، وَيُجَارُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَيَأْمَنُ مِنَ الْفَزَعِ الْأَكْبَرِ، وَيُحَلَّى حُلَّةَ الْإِيمَانِ، وَيُزَوَّجُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ، وَيُشَفَّعُ فِي سَبْعِينَ إِنْسَانًا مِنْ أَقَارِبِهِ »

“শহীদের জন্য আল্লাহর নিকট ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তার দেহের রক্তের প্রথম ফোঁটাটি বের হতেই তিনি তাকে ক্ষমা করেন এবং জান্নাতে তার ঠিকানা তাকে দেখানো হয়; কবরের আযাব থেকে তাকে রক্ষা করা হয়; (কিয়ামতের) ভয়ংকর ত্রাস থেকে সে নিরাপদ থাকবে; তাকে ঈমানের চাদর পরানো হবে; আয়তলোচনা হুরের সাথে তার বিবাহ দেওয়া হবে এবং তার নিকট আত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তরজনের পক্ষে তাকে শাফা‘আত করার অনুমতি দেওয়া হবে”[28]

ঙ- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে গাজী হয়ে ফিরে আসার পরে মারা গেলে, প্লেগ রোগে মারা গেলে, পেটের পীড়ায় ও পানিতে ডুবে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে বা গর্ভাবস্থায় মারা যাওয়া শহীদ এবং মুমিনের তা শুভ লক্ষণ।

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

«مَا تَعُدُّونَ الشَّهِيدَ فِيكُمْ؟» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، مَنْ قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، قَالَ: «إِنَّ شُهَدَاءَ أُمَّتِي إِذًا لَقَلِيلٌ»، قَالُوا: فَمَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: «مَنْ قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ مَاتَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ مَاتَ فِي الطَّاعُونِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ مَاتَ فِي الْبَطْنِ فَهُوَ شَهِيدٌ»، قَالَ ابْنُ مِقْسَمٍ: أَشْهَدُ عَلَى أَبِيكَ فِي هَذَا الْحَدِيثِ أَنَّهُ قَالَ: «وَالْغَرِيقُ شَهِيدٌ»

“তোমরা তোমাদের মধ্যকার কাদেরকে শহীদ বলে গণ্য কর? তারা বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় সেই তো শহীদ। তিনি বললেন, তাহলে তো আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা অতি অল্প হবে। তখন তারা বললেন, তা হলে তারা কারা ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ জিহাদের ময়দানে নিহত হয় সে শহীদ। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় গিয়ে মারা যায় সেও শহীদ। যে ব্যক্তি প্লেগে মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি উদরাময়ে মারা যায় সেও শহীদ। ইবন মিকসাম বলেন, আমি তোমার পিতার ওপর এ হাদীসের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আরও বলেছেন, এবং পানিতে ডুবে মারা যায় এমন ব্যক্তিও শহীদ”[29]

জাবির ইবন আতীক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ يَعُودُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ ثَابِتٍ، فَوَجَدَهُ قَدْ غُلِبَ، فَصَاحَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَمْ يُجِبْهُ فَاسْتَرْجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَالَ: غُلِبْنَا عَلَيْكَ يَا أَبَا الرَّبِيعِ، فَصَاحَ النِّسْوَةُ، وَبَكَيْنَ فَجَعَلَ ابْنُ عَتِيكٍ يُسَكِّتُهُنَّ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «دَعْهُنَّ، فَإِذَا وَجَبَ فَلَا تَبْكِيَنَّ بَاكِيَةٌ» قَالُوا: وَمَا الْوُجُوبُ؟ يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «الْمَوْتُ» قَالَتِ ابْنَتُهُ: وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لَأَرْجُو أَنْ تَكُونَ شَهِيدًا، فَإِنَّكَ كُنْتَ قَدْ قَضَيْتَ جِهَازَكَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَوْقَعَ أَجْرَهُ عَلَى قَدْرِ نِيَّتِهِ، وَمَا تَعُدُّونَ الشَّهَادَةَ؟» قَالُوا: الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " الشَّهَادَةُ سَبْعٌ سِوَى الْقَتْلِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ: الْمَطْعُونُ شَهِيدٌ، وَالْغَرِقُ شَهِيدٌ، وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيدٌ، وَالْمَبْطُونُ شَهِيدٌ، وَصَاحِبُ الْحَرِيقِ شَهِيدٌ، وَالَّذِي يَمُوتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيدٌ، وَالْمَرْأَةُ تَمُوتُ بِجُمْعٍ شَهِيدٌ »

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর রোগের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য আসেন। এ সময় তিনি তাঁকে বেহুশ অবস্থায় পান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জোরে ডাকেন, কিন্তু তিনি কোনো জওয়াব দেন নি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন’ পাঠ করেন এবং বলেন, হে আবূ রাবী! আমি তোমার ব্যাপারে পরাস্ত হয়েছি। এ কথা শুনে মহিলারা চীৎকার দিয়ে কাঁদা শুরু করে। তখন ইবন আতীক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের শান্ত হতে বলেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাদের ছেড়ে দাও (অর্থাৎ কাঁদতে দাও)। অবশ্য যখন ওয়াজিব হবে, তখন যেন কোনো ক্রন্দনকারী আর না কাঁদে। তখন তারা জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওয়াজিব হওয়ার অর্থ কী? তিনি বলেন, মৃত্যু”(বর্ণনাকারী বলেন) তখন আব্দুল্লাহ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার তো এরূপ ধারণা ছিল যে, তুমি শহীদ হবে। কেননা, তুমি যুদ্ধের জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করছিলে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তার নিয়তের সাওয়াব প্রদান করবেন। তোমরা শাহাদত বলতে কী মনে কর? তিনি বলেন, আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়ে যাওয়াকে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ছাড়াও আরো সাত ধরনের শহীদ আছে যথা, মহামরীতে যে মারা যায় সেও শহীদ, পানিতে ডুবে যে মারা যায় সেও শহীদ, পক্ষাঘাতে যে মারা যায় সেও শহীদ, পেটের রোগের কারণে (কলেরা, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে) যে মারা যায় সেও শহীদ, অগ্নিদগ্ধ হয়ে যে মারা যায় সেও শহীদ, কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে যে মারা যায় সেও শহীদ এবং যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যাবে, সেও শহীদ”।[30]

চ- কেউ নিজের অধিকার তথা জীবন, সম্পদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই ইত্যাদির কারণে মারা গেলে শহীদ। আর শহীদ হয়ে মারা যাওয়া শুভ লক্ষণ। আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

«مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ»

যে ব্যক্তি নিজের ধন-সম্পদ রক্ষার্থে নিহত হয়, সে শহীদ[31]

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أُتِيَ عِنْدَ مَالِهِ، فَقُوتِلَ فَقَاتَلَ فَقُتِلَ، فَهُوَ شَهِيدٌ»

কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ধন-সম্পদ লুট করতে চাইলে সে তাতে বাঁধা দিতে গিয়ে তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিহত হলে শহীদ গণ্য হয়[32]

ছ- আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত পাহারা দেওয়ার সময় মারা গেলে শহীদ। সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

«رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ، وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ، وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ، وَأَمِنَ الْفَتَّانَ»

একটি দিবস ও একটি রাতের সীমান্ত প্রহরা একমাস সিয়াম পালন এবং ইবাদতে রাত জাগার চাইতেও উত্তম। আর যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে, তাতে তার এ আমলের সাওয়াব জারী থাকবে, তার (শহীদ অবস্থায়) রিযিক অব্যাহত রাখা হবে এবং সে ব্যক্তি ফিতনাসমূহ থেকে নিরাপদে থাকবে[33]

ফুদালা ইবন উবায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كُلُّ مَيِّتٍ يُخْتَمُ عَلَى عَمَلِهِ إِلَّا الَّذِي مَاتَ مُرَابِطًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَإِنَّهُ يُنْمَى لَهُ عَمَلُهُ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ، وَيَأْمَنُ مِنْ فِتْنَةِ القَبْرِ»، وَسَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «المُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ»

“প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে তার আমলের পরিসমাপ্তি হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে পাহারা দানরত অবস্থায় মারা যায় আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত পর্যন্ত তার আমল বৃদ্ধি করতে থাকেন এবং তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদে রাখবেন। (তিনি আরো বলেন,) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি যে, প্রকৃত মুজাহিদ হলো সেই, যে স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে”[34]

৬- মাইয়্যেতের প্রতি মানুষের প্রশংসা:

কোনো মুসলিম মারা গেলে অন্য মুসলিমের উচিত তার দোষ-ত্রুটি না খুঁজে ভালো গুণাবলীর জন্য প্রশংসা করা। সৎ লোকের প্রশংসা জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম করে দেয়। আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«مُرَّ بِجَنَازَةٍ فَأُثْنِيَ عَلَيْهَا خَيْرًا، فَقَالَ نَبِيُّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَجَبَتْ، وَجَبَتْ، وَجَبَتْ»، وَمُرَّ بِجَنَازَةٍ فَأُثْنِيَ عَلَيْهَا شَرًّا، فَقَالَ نَبِيُّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَجَبَتْ، وَجَبَتْ، وَجَبَتْ»، قَالَ عُمَرُ: فِدًى لَكَ أَبِي وَأُمِّي، مُرَّ بِجَنَازَةٍ، فَأُثْنِيَ عَلَيْهَا خَيْرٌ، فَقُلْتَ: «وَجَبَتْ، وَجَبَتْ، وَجَبَتْ»، وَمُرَّ بِجَنَازَةٍ، فَأُثْنِيَ عَلَيْهَا شَرٌّ، فَقُلْتَ: «وَجَبَتْ، وَجَبَتْ، وَجَبَتْ»؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَثْنَيْتُمْ عَلَيْهِ خَيْرًا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ، وَمَنْ أَثْنَيْتُمْ عَلَيْهِ شَرًّا وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ، أَنْتُمْ شُهَدَاءُ اللهِ فِي الْأَرْضِ، أَنْتُمْ شُهَدَاءُ اللهِ فِي الْأَرْضِ، أَنْتُمْ شُهَدَاءُ اللهِ فِي الْأَرْضِ»

“একবার একটি জানাযা বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লোকেরা প্রশংসা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার ‘ওয়াজাবাত’ বললেন। অর্থাৎ ওয়াজিব হয়ে গেছে। তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার ওপর আমার মা-বাবা কুরবান হোক। একটা জানাযা অতিক্রম করলে তার প্রতি ভালো মন্তব্য করা হলে আপনি তিনবার ‘ওয়াজাবাত’ বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা যার সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করেছ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর যার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করেছ তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে। তোমরা জমিনের বুকে আল্লাহর সাক্ষী, তোমরা জমিনের বুকে আল্লাহর সাক্ষী, তোমরা জমিনের বুকে আল্লাহর সাক্ষী”[35]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَيَشْهَدُ لَهُ أَرْبَعَةُ أَهْلِ أَبْيَاتٍ مِنْ جِيرَتِهِ الْأَدْنَيْنَ أَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ إِلَّا خَيْرًا إِلَّا قَالَ اللَّهُ جَلَّ وَعَلَا: قَدْ قَبِلْتُ عِلْمَكُمْ فِيهِ، وَغَفَرْتُ لَهُ مَا لَا تَعْلَمُونَ»

“কোনো মুসলিম মারা গেলে তার জন্য তার চারজন নিকটতম প্রতিবেশী এ সাক্ষ্য দেয় যে, তারা তার ব্যাপারে ভালো ছাড়া কিছু জানে না, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তারা যা জানে আমি তাদের জানা জ্ঞানকে কবুল করলাম। তোমরা যা জানো সে হিসেবে আমিও তাকে ক্ষমা করে দিলাম, আর তোমরা যা জানো না তাও আমি ক্ষমা করে দিলাম”[36]

৭- মাইয়্যেতকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি:

ক- মৃতব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, কাফন পড়ানো, জানাযার সালাত পড়া ও তাকে কবরস্থ করা ফরযে কিফায়া।

খ- গোসল দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সেই ব্যক্তি হকদার, যার ব্যাপারে মৃত ব্যক্তি অসীয়ত করে গিয়েছে। তারপর তার পিতা। তারপর অপরাপর নিকটাত্মীয়। আর মহিলার গোসলে প্রথম হকদার হলো তার অসীয়তকৃত মহিলা। তারপর তার মা। তারপর তার মেয়ে। তারপর অন্যান্য নিকটাত্মীয় মহিলাগণ।

গ- স্বামী-স্ত্রী পরষ্পরকে গোসল দিতে পারবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«رَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْبَقِيعِ، فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي، وَأَنَا أَقُولُ: وَا رَأْسَاهُ، فَقَالَ: «بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ» ثُمَّ قَالَ: «مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي، فَقُمْتُ عَلَيْكِ، فَغَسَّلْتُكِ، وَكَفَّنْتُكِ، وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ، وَدَفَنْتُكِ»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকী‘ গোরস্থান থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বললাম, হে আমার মাথা! তিনি বলেন: হে ‘আয়েশা! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হে আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন: তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোনো ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পরাতাম, তোমার জানাযার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম”[37]

ঘ- মৃত ব্যক্তি নারী হোক বা পুরুষ তার বয়স যদি সাত বছরের কম হয়, তবে যে কোনো পুরুষ বা মহিলা তার গোসল দিতে পারবে। আর গোসলের জন্য পুরুষের ক্ষেত্রে পুরুষ আর নারীর ক্ষেত্রে নারী যদি না পাওয়া যায় তবে তার গোসল দিবে না। বরং তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে। এর পদ্ধতি হলো, উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন তার হাত দু’টি পাক মাটিতে মারবে। তারপর তা দ্বারা মৃতের মুখমণ্ডল ও উভয় হাত কব্জী পর্যন্ত মাসেহ করে দিবে। আর কোনো কাফেরকে গোসল দেওয়া এবং দাফন করা মুসলিমের ওপর হারাম।

ঙ- গোসল দেওয়ার সুন্নাত পদ্ধতি হলো, প্রথমে তার লজ্জাস্থান ঢেকে দিবে, তারপর তার সমস্ত কাপড় খুলে নিবে। অতঃপর তার মাথাটা বসার মতো করে উপরের দিকে উঠাবে এবং আস্তে করে পেটে চাপ দিবে, যাতে করে পেটের ময়লা বেরিয়ে যায়।

চ- এরপর বেশি করে পানি ঢেলে তা পরিস্কার করে নিবে। তারপর হাতে কাপড় জড়িয়ে বা হাত মোজা পরে তা দিয়ে উভয় লজ্জাস্থানকে (দৃষ্টি না দিয়ে) ধৌত করবে। তারপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে এবং সালাতের ন্যায় অযু করাবে। তবে মুখে ও নাকে পানি প্রবেশ করাবে না। বরং ভিজা কাপড় আঙ্গুলে জড়িয়ে তা দিয়ে তার উভয় ঠোঁটের ভিতর অংশ ও দাঁত পরিস্কার করবে। একইভাবে নাকের ভিতরও পরিস্কার করবে।

ছ- পানিতে কুল পাতা মিশিয়ে তা ফুটিয়ে গোসল দেওয়া মুস্তাহাব। বরই পাতা দিয়ে ফোটানো পানি দ্বারা মৃতের মাথা ও দাঁড়ি ধৌত করতে হবে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«بَيْنَمَا رَجُلٌ وَاقِفٌ بِعَرَفَةَ، إِذْ وَقَعَ عَنْ رَاحِلَتِهِ، فَوَقَصَتْهُ - أَوْ قَالَ: فَأَوْقَصَتْهُ - قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اغْسِلُوهُ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ، وَكَفِّنُوهُ فِي ثَوْبَيْنِ، وَلاَ تُحَنِّطُوهُ، وَلاَ تُخَمِّرُوا رَأْسَهُ، فَإِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ القِيَامَةِ مُلَبِّيًا»

“এক ব্যক্তি আরাফাতে ওয়াকুফ অবস্থায় হঠাৎ তার উটনী থেকে পড়ে যায়। এতে তার ঘাড় মটকে গেল অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তার ঘাড় মটকিয়ে দিল। (এতে সে মারা যায়)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না। কেননা কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে”[38]

জ- প্রথমে শরীরের ডান পাশের সামনের দিক ধৌত করবে। তারপর পিছন দিক তারপর বাম দিক ধৌত করবে। উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যার গোসলের ব্যাপারে বলেছেন,

«ابْدَأْنَ بِمَيَامِنِهَا، وَمَوَاضِعِ الوُضُوءِ مِنْهَا»

“তোমরা তার ডান দিক থেকে এবং অযুর স্থানসমূহ থেকে শুরু করবে”[39]

এভাবে তিনবার গোসল দিবে। প্রতিবার হালকাভাবে পেটে হাত বুলাবে এবং ময়লা কিছু বের হলে পরিস্কার করে নিবে।

ঝ- গোসলের সময় সাবান ব্যবহার করতে পারে এবং প্রয়োজন মোতাবেক তিনবারের বেশি সাত বা ততোধিক গোসল দিতে পারে। শেষবার কর্পুর মিশ্রিত করে গোসল দেওয়া সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা যায়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহার শেষ গোসলে কর্পুর মিশ্রিত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«تُوُفِّيَتْ إِحْدَى بَنَاتِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «اغْسِلْنَهَا ثَلاَثًا، أَوْ خَمْسًا أَوْ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ، إِنْ رَأَيْتُنَّ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ، وَاجْعَلْنَ فِي الآخِرَةِ كَافُورًا - أَوْ شَيْئًا مِنْ كَافُورٍ - فَإِذَا فَرَغْتُنَّ، فَآذِنَّنِي» قَالَتْ: فَلَمَّا فَرَغْنَا آذَنَّاهُ، فَأَلْقَى إِلَيْنَا حِقْوَهُ، فَقَالَ: «أَشْعِرْنَهَا إِيَّاهُ» وَعَنْ أَيُّوبَ، عَنْ حَفْصَةَ، عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، بِنَحْوِهِ، وَقَالَتْ: إِنَّهُ قَالَ: «اغْسِلْنَهَا ثَلاَثًا، أَوْ خَمْسًا أَوْ سَبْعًا، أَوْ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ، إِنْ رَأَيْتُنَّ» قَالَتْ حَفْصَةُ: قَالَتْ أُمُّ عَطِيَّةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: وَجَعَلْنَا رَأْسَهَا ثَلاَثَةَ قُرُونٍ

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যাগণের মধ্যে একজন মারা গেলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে গেলেন এবং বললেন, তোমরা তাকে তিনবার পাঁচবার অথবা যদি তোমরা প্রয়োজনীয় মনে কর, তবে তার চাইতে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবারে কর্পুর (অথবা তিনি বলেন) ‘কিছু কর্পুর’ ব্যবহার করবে। গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর চাদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটি তার ভিতরের কাপড় হিসেবে পরাও। আইয়ূব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হাফসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সূত্রে উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন এবং তাতে তিনি (উম্মে আতিয়্যাহ) বলেছেন, তিনি বলেছেন, তাকে তিন, পাঁচ, সাত বা প্রয়োজনবোধে তার চাইতে অধিকবার গোসল দাও। হাফসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আমরা তার মাথার চুলকে তিনটি বেণী বানিয়ে দিই”[40]

ঞ- মৃতের মোচ বা নখ যদি বেশি বড় থাকে তবে তা কেটে দেওয়া মুস্তাহাব। তবে বগল বা নাভীর নিচের চুল কাটা যাবে না। মৃতের চুল আঁচড়ানোর দরকার নেই। তবে নারীর ক্ষেত্রে তার চুলগুলোতে তিনটি বেণী বেঁধে তা পিছনে ছড়িয়ে দিবে।

উম্মে আতিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّهُنَّ جَعَلْنَ رَأْسَ بِنْتِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثَلاَثَةَ قُرُونٍ نَقَضْنَهُ، ثُمَّ غَسَلْنَهُ، ثُمَّ جَعَلْنَهُ ثَلاَثَةَ قُرُونٍ»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যার মাথা তিনটি বেণী করে দেন। তারা তা খুলেছেন, এরপর তা ধুয়ে তিনটি বেণী করে দেন”[41]

ট- সাত বার গোসল দেওয়ার পরও যদি পেট থেকে ময়লা (পেশাব বা পায়খানা) বের হতেই থাকে তবে উক্ত স্থান ধুয়ে সেখানে তুলা বা কাপড় জড়িয়ে দিবে। তারপর তাকে অযু করাবে। কাফন পরানোর পরও যদি ময়লা বের হয়, তবে আর গোসল না দিয়ে সেভাবেই রেখে দিবে। কেননা তা অসুবিধার ব্যাপার।

ঠ- হজ বা ওমরায় গিয়ে ইহরাম অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, তবে তাকে কুল পাতা মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল দিবে। কিন্তু কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করবে না এবং পুরুষ হলে কাফনের সময় তার মাথা ঢাকবে না। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«بَيْنَمَا رَجُلٌ وَاقِفٌ بِعَرَفَةَ، إِذْ وَقَعَ عَنْ رَاحِلَتِهِ، فَوَقَصَتْهُ أَوْ قَالَ: فَأَوْقَصَتْهُ - قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اغْسِلُوهُ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ، وَكَفِّنُوهُ فِي ثَوْبَيْنِ، وَلاَ تُحَنِّطُوهُ، وَلاَ تُخَمِّرُوا رَأْسَهُ، فَإِنَّهُ يُبْعَثُ يَوْمَ القِيَامَةِ مُلَبِّيًا»

“এক ব্যক্তি ‘আরাফাতে ওয়াকূফ অবস্থায় হঠাৎ তার বাহন থেকে পড়ে যায়। এতে তার ঘাড় মটকে গেল অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তার ঘাড় মটকিয়ে দিল। (এতে সে মারা যায়)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল করাও এবং দু’কাপড়ে তাকে কাফন দাও। তাকে সুগন্ধি লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না। কেননা কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে”[42]

ড- আল্লাহর রাস্তায় শহীদ ব্যক্তিকে গোসল দিবে না এবং তাকে তার সাথে সংশ্লিষ্ট কাপড়েই দাফন করবে। কেননা হাদীসে এসেছে,

»أن النبي صلى الله عليه وسلم " أمر بدفن شهداء أحد في دمائهم ولم يُغسلهم»

“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদদেরকে তাদের রক্তমাখা কাপড় নিয়েই দাফন করতে নির্দেশনা দেন, তিনি তাদেরকে গোসল দেন নি।”[43]

ঢ- গর্ভস্থ সন্তান যদি চার মাস অতিক্রম হওয়ার পর পড়ে যায়, তবে তার গোসল ও জানাযার সালাত আদায় করবে। আর তার বয়স যদি চার মাসের কম হয়, তবে তাতে প্রাণ না থাকার কারণে সাধারণ একটি গোশতের টুকরা গণ্য হবে। যা কোনো গোসল বা জানাযা ছাড়াই যে কোনো স্থানে মাটিতে গেড়ে দেওয়া হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، ثُمَّ يَكُونُ فِي ذَلِكَ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ فِي ذَلِكَ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يُرْسَلُ الْمَلَكُ فَيَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ، وَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ: بِكَتْبِ رِزْقِهِ، وَأَجَلِهِ، وَعَمَلِهِ، وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ، فَوَالَّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا إِلَّا ذِرَاعٌ، فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ، فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ، فَيَدْخُلُهَا، وَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ، حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَهَا إِلَّا ذِرَاعٌ، فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ، فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَيَدْخُلُهَا "

“তোমাদের প্রত্যেকের শুক্র তার মাতৃ উদরে চল্লিশ দিন জমাট থাকে। এরপর অনুরূপ চল্লিশ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। এরপর অনুরূপ চল্লিশ দিনে তা একটি গোশত পিণ্ডের রূপ নেয়। এরপর আল্লাহ তা‘আলার তরফ থেকে একজন ফিরিশতা পাঠানো হয়। সে তাতে রূহ ফুকে দেয়। আর তাকে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর তা হলো, তার রিযিক, তার মৃত্যুক্ষণ, তার কর্ম এবং তার বদকার ও নেককার হওয়া। সেই সত্তার কসম যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ জান্নাতবাসীদের মতো আমল করতে থাকে, অবশেষ তার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র একহাত ব্যবধান থাকে। এরপর তাকদীরের লিখন তার ওপর জয়ী হয়ে যায়। ফলে সে জাহান্নামীদের কাজ-কর্ম শুরু করে। এরপর সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়। আর তোমাদের মধ্যে কোনো কোনো ব্যক্তি জাহান্নামের কাজ-কর্ম করতে থাকে। অবশেষে তার ও জাহান্নামের মাঝখানে একহাত মাত্র ব্যবধান থাকে। এরপর ভাগ্যলিপি তার ওপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতীদের ন্যায় আমল করে। অবশেষে জান্নাতে দাখিল হয়”[44]

সাঈদ ইবন মুসাইয়্যিব রহ. মৃত গর্ভপাত সম্পর্কে বলেন,

«إِذَا نُفِخَ فِيهِ الرُّوحُ صُلِّيَ عَلَيْهِ، وَذَلِكَ لِأَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ»

“চার মাস হলে তাতে রূহ ফুক দেওয়া হয় তখন জানাযা পড়া হবে”[45]

ন- মৃত ব্যক্তি আগুনে পুড়ে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার কারণে বা পানি না পাওয়ার কারণে যদি তাকে গোসল দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে পূর্ব নিয়মে তাকে তায়াম্মুম করিয়ে দিবে।

৮- কাফন পড়ানো:

- মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানো ওয়াজিব। আর তা হবে তার পরিত্যাক্ত সম্পত্তি থেকে। যাবতীয় ঋণ, অসীয়ত এবং মীরাস বন্টনের আগে কাফনের খরচ তার সম্পত্তি থেকে গ্রহণ করতে হবে। মৃতের সম্পত্তি থেকে যদি কাফনের খরচ না হয় তবে তার পিতা বা ছেলে বা দাদার ওপর দায়িত্ব বর্তাবে। যদি এমন কাউকে না পাওয়া যায় তবে বায়তুল মাল থেকে প্রদান করবে। তাও যদি না পাওয়া যায় তবে যে কোনো মুসলিম প্রদান করতে পারে।

খাব্বাব ইবন আরাত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«هَاجَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَبِيلِ اللهِ، نَبْتَغِي وَجْهَ اللهِ، فَوَجَبَ أَجْرُنَا عَلَى اللهِ، فَمِنَّا مَنْ مَضَى لَمْ يَأْكُلْ مِنْ أَجْرِهِ شَيْئًا، مِنْهُمْ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ، قُتِلَ يَوْمَ أُحُدٍ، فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ شَيْءٌ يُكَفَّنُ فِيهِ إِلَّا نَمِرَةٌ، فَكُنَّا إِذَا وَضَعْنَاهَا عَلَى رَأْسِهِ، خَرَجَتْ رِجْلَاهُ، وَإِذَا وَضَعْنَاهَا عَلَى رِجْلَيْهِ، خَرَجَ رَأْسُهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ضَعُوهَا مِمَّا يَلِي رَأْسَهُ، وَاجْعَلُوا عَلَى رِجْلَيْهِ الْإِذْخِرَ»، وَمِنَّا مَنْ أَيْنَعَتْ لَهُ ثَمَرَتُهُ، فَهْوَ يَهْدِبُهَا

“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হিজরত করলাম। অতএব, আল্লাহর কাছে আমদের পুরস্কার পাওয়াটা অনিবার্য হয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এভাবে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন যে তার পুরস্কারের কোনো কিছুই তিনি ভোগ করেন নি। মুস‘আব ইবন ‘উমাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের অন্যতম। তিনি উহুদ যুদ্ধের সময়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাকে কাফন দেওয়ার মতো একটি চাদর ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় নি। আমরা যখন তা দিয়ে তার মাথা ঢাকলাম তার পা বেরিয়ে আসল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা চাদরটা এভাবে পরাও যাতে তা মাথা জড়িয়ে থাকে আর তার পা ‘ইযখির’ (একপ্রকার ঘাস) নামক ঘাস দিয়ে ঢেকে দাও। আর আমাদের মধ্যে কারো কারো ফল পেকে গেছে, যা তারা আহরণ করেছে”[46]

খ- পুরুষকে তিনটি লেফাফা বা কাপড়ে কাফন পরানো মুস্তাহাব। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুতী সাদা তিনটি কাপড়েই কাফন দেওয়া হয়েছিল। কাফনের কাপড়ে সুগন্ধি মিশ্রিত করা মুস্তাহাব। প্রথমে সাতটি ফিতা বিছিয়ে দিবে। তারপর (ফিতাগুলোর উপর) কাপড় তিনটি একটির উপর অন্যটি বিছাবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كُفِّنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي ثَلَاثَةِ أَثْوَابٍ بِيضٍ سَحُولِيَّةٍ، مِنْ كُرْسُفٍ، لَيْسَ فِيهَا قَمِيصٌ، وَلَا عِمَامَةٌ، أَمَّا الْحُلَّةُ، فَإِنَّمَا شُبِّهَ عَلَى النَّاسِ فِيهَا، أَنَّهَا اشْتُرِيَتْ لَهُ لِيُكَفَّنَ فِيهَا، فَتُرِكَتِ الْحُلَّةُ، وَكُفِّنَ فِي ثَلَاثَةِ أَثْوَابٍ بِيضٍ سَحُولِيَّةٍ» فَأَخَذَهَا عَبْدُ اللهِ بْنُ أَبِي بَكْرٍ، فَقَالَ: لَأَحْبِسَنَّهَا حَتَّى أُكَفِّنَ فِيهَا نَفْسِي، ثُمَّ قَالَ: لَوْ رَضِيَهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لِنَبِيِّهِ لَكَفَّنَهُ فِيهَا، فَبَاعَهَا وَتَصَدَّقَ بِثَمَنِهَا»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (সিরিয়ার) সাহুল নগরীর সাদা তিন কাপড় দ্বারা কাফন দেওয়া হয়। তন্মধ্যে জামা ও পাগড়ি ছিল না। (তাঁর নিকট সংরক্ষিত) ‘জোড়া কাপড়’ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল যে, তা কাফনের উদ্দেশ্যে খরিদ করা হয়েছিল কিনা? তাই তা রেখে দেওয়া হল এবং সাহুল নগরীর সাদা তিন কাপরেই কাফন দেওয়া হলো। এদিকে আব্দুল্লাহ ইবন আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জোড়াটা নিয়ে বললেন, আমি অবশ্যই তা সংরক্ষণ করব এবং আমি নিজেকে এর দ্বারা কাফন দিব। তিনি পুনরায় বললেন আল্লাহ তা‘আলা যদি এটা তাঁর নবীর জন্য পছন্দ করতেন, তবে তিনি অবশ্যই তা দিয়ে কাফনের ব্যবস্থা করতেন। অতঃপর তিনি তা বিক্রি করেন ও তার মূল্য তিনি সদকা করে দিলেন।[47]

গ- মহিলাকে পাঁচটি কাপড়ে কাফন দিবে। লুঙ্গি যা নিচের দিকে থাকবে, খেমার বা ওড়না যা দিয়ে মাথা ঢাঁকবে, কামীছ (জামা) এবং দু’টি বড় লেফাফা বা কাপড়। (অবশ্য তিন কাপড়েও তাকে কাফন দেওয়া জায়েয)

৯- জানাযা সালাত আদায় পদ্ধতি:

ঘ- জানাযা সালাত আদায় করা ফরযে কেফায়া। সুন্নাত হলো, ইমাম পুরুষের মাথা বরাবর দাঁড়াবে। আর মহিলার মধ্যবর্তী স্থান বরাবর দাঁড়াবে। সামুরা ইবন জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«صَلَّيْتُ خَلْفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَصَلَّى عَلَى أُمِّ كَعْبٍ، مَاتَتْ وَهِيَ نُفَسَاءُ، «فَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلصَّلَاةِ عَلَيْهَا وَسَطَهَا»

“আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে জানাযার সালাত পড়লাম। তিনি উম্মু কা‘আবের জানাযা পড়ছিলেন। তিনি নিফাস অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়ার সময়ে তার লাশের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়েছিলেন”[48]

ঙ- চার তাকবীরের সাথে জানাযা আদায় করতে হয়। আবূ হুরায়ারা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَعَى لِلنَّاسِ النَّجَاشِيَ فِي الْيَوْمِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ، فَخَرَجَ بِهِمْ إِلَى الْمُصَلَّى، وَكَبَّرَ أَرْبَعَ تَكْبِيرَاتٍ»

“যেদিন নাজ্জাশীর বাদশাহ মারা গেলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের তার মৃত্যু সংবাদ শুনালেন। অতঃপর তাদেরকে নিয়ে সালাতের স্থানে গিয়ে চারটি তাকবীর উচ্চারণ করলেন (জানাযা পড়লেন)[49]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ: نَعَى لَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّجَاشِيَ صَاحِبَ الْحَبَشَةِ، فِي الْيَوْمِ الَّذِي مَاتَ فِيهِ، فَقَالَ: «اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ» قَالَ ابْنُ شِهَابٍ: وَحَدَّثَنِي سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيِّبِ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ حَدَّثَهُ، «أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَفَّ بِهِمْ بِالْمُصَلَّى، فَصَلَّى فَكَبَّرَ عَلَيْهِ أَرْبَعَ تَكْبِيرَاتٍ»

“আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশীর মৃত্যুর খবর জানালেন, যেদিন তিনি মারা গেলেন, তারপর বললেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা কর’। ইবন শিহাব বলেন, সা‘ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে নিয়ে মুসাল্লা বা জানাযা ও ঈদের সালাত আদায়ের স্থানে কাতার করে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন এবং তার ওপর চার তাকবীর দিয়ে সালাত শেষ করলেন।[50]

চ- প্রথম তাকবীর দিয়ে আঊযুবিল্লাহ্… বিসমিল্লাহ্… পাঠ করে সূরা আল-ফাতিহা তারপর ছোট কোনো সূরা পাঠ করবে। দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দুরূদে ইবরাহীম (যা সালাতে পাঠ করতে হয়) পাঠ করবে। এরপর তৃতীয় তাকবীর দিয়ে জানাযার জন্য বর্ণিত যে কোনো দো‘আ পাঠ করবে। নিম্নোক্ত দো‘আটি পাঠ করা যেতে পারে:

«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا، وَمَيِّتِنَا، وَصَغِيرِنَا، وَكَبِيرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِيمَانِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِسْلَامِ، اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلَا تُضِلَّنَا بَعْدَهُ»

“ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের জীবিত ও মৃতদের ক্ষমা করুন। আমাদের ছোট ও বড়, পুরুষ ও স্ত্রী, উপস্থিত ও অনুপস্থিত সকলকে ক্ষমা করুন। ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের মাঝে যাকে জীবিত রাখেন, তাকে ঈমানের ওপর জীবিত রাখুন এবং যাকে মৃত্যু দেন, তাকে ইসলামের ওপর মৃত্যু দান করুন। ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের বিনিময় হতে মাহরূম করবেন না এবং এরপর আর আমাদের গুমরাহ করবেন না”[51]

অথবা এ দো‘আটিও পড়া যেতে পারে:

«اللهُمَّ، اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ - أَوْ مِنْ عَذَابِ النَّارِ -»

“হে আল্লাহ! তাকে মাফ করে দাও ও তার প্রতি দয়া কর। তাকে নিরাপদ রাখ ও তার ত্রুটি মার্জনা কর। তাকে উত্তম সামগ্রী দান কর ও তার প্রবেশস্থলকে প্রশস্ত করে দাও। তাকে পানি, বরফ ও বৃষ্টি দ্বারা ধুয়ে মুছে দাও এবং গুনাহ থেকে এরূপ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দাও যেরূপ সাদা কাপর ময়লা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। তাকে তার ঘরকে উত্তম ঘরে পরিণত করে দাও, তার পরিবার থেকে উত্তম পরিবার দান কর, তার স্ত্রীর তুলনায় উত্তম স্ত্রী দান কর। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবর ও জাহান্নামের ‘আযাব থেকে রক্ষা কর”[52]

অথবা এ দো‘আও পড়া যায়:

«اللَّهُمَّ إِنَّ فُلَانَ بْنَ فُلَانٍ فِي ذِمَّتِكَ، فَقِهِ فِتْنَةَ الْقَبْرِ - قَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ: مِنْ ذِمَّتِكَ وَحَبْلِ جِوَارِكَ، فَقِهِ مِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ - وَعَذَابِ النَّارِ، وَأَنْتَ أَهْلُ الْوَفَاءِ وَالْحَمْدِ، اللَّهُمَّ فَاغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ »

“ইয়া আল্লাহ! নিশ্চয় অমুকের পুত্র অমুক আপনার যিম্মায়। আপনি তাকে কবরের ‘আযাব থেকে রক্ষা করুন”। বর্ণনাকারী আবদুর রহমান এরূপ দো‘আর কথা বলেছেন, “এ ব্যক্তি আপনার যিম্মায় এবং আপনার প্রতিবেশী। আপনি একে কবরের আযাবের ফিতনা ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। আপনি ওয়াদা পূরণকারী এবং প্রশংসার প্রতীক। ইয়া আল্লাহ! আপনি একে ক্ষমা করুন এবং তার ওপর রহম করুন। আপনি মহাক্ষমাশীল, মেহেরবান”[53]

ছ- এরপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে সামান্য একটু চুপ থেকে ডান দিকে সালাম ফিরাবে। বাম দিকেও সালাম ফেরাতে পারে। কারো যদি জানাযার কিছু অংশ ছুটে যায়, তবে সে ইমামের অনুসরণ করবে। আর ইমামের সালাম ফিরানোর পর লাশ উঠানোর আগে যদি সম্ভব হয় তবে বাকী তাকবীর কাযা আদায় করে নিবে। সম্ভব না হলে ইমামের সাথেই সালাম ফিরিয়ে দিবে।

১০- মাইয়্যেতকে বহন করা ও দাফনের হুকুম:

মাইয়্যেতকে বহন ও তার দাফন-কাফন সম্পন্ন করা ফরযে কিফায়া। এমনকি সে কাফির হলেও।[54] এ ব্যাপারে আল্লাহর বাণী হলো,

﴿ثُمَّ أَمَاتَهُۥ فَأَقۡبَرَهُۥ ٢١﴾ [عبس : ٢١]

“তারপর তিনি তাকে মৃত্যু দেন এবং তাকে কবরস্থ করেন”[সূরা আবাসা, আয়াত: ২১]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন,

«معناهُ: أكرمَهُ بدفنِهِ »

“এ আয়াতের অর্থ হলো, অতঃপর তিনি তাকে দাফনের মাধ্যমে কবরস্থ করে সম্মানিত করেছেন”[55]

তাছাড়া মৃত্যুব্যক্তিকে ফেলে রাখা ও তার দাফন না করা মাইয়্যেতকে অসম্মান করা। তবে মাইয়্যেতকে বহন ও তার দাফন যদি মৃত্যু ব্যক্তির কাফির ওয়ারিস করেন তবে তা সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। কেননা মাইয়্যেতের এসব কাজের জন্য ইসলাম শর্ত নয়।

১১- দাফন কাজে মজুরী গ্রহণের হুকুম:

মাইয়্যেতকে বহন, দাফন, গোসল ও কাফন কাজে মজুরী গ্রহণ করা মাকরূহ। কেননা এসব কাজ হলো মুমিনের জন্য ইবাদত। আর ইবাদতের বিনিময়ে মজুরী গ্রহণ করলে সাওয়াব পাওয়া যাবে না।

১২- জানাযা বহনের নিয়ম:

ক- হেটে চলা লোকজন জানাযার সামনে চলা সুন্নাত। তবে জানাযার পিছনে চলা মাকরূহ নয়। কেননা হাদীসে এসেছে, সালিম রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,

«رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ يَمْشُونَ أَمَامَ الْجَنَازَةِ»

“আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বকর এবং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে জানাযার আগে আগে যেতে দেখেছি”[56]

ইমাম যুহুরী রহ. বলেন, সালিম রহ. তাকে বর্ণনা করেছেন যে,

«أَنَّ أَبَاهُ كَانَ يَمْشِي أَمَامَ الجَنَازَةِ».

“তার পিতা (আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু) জানাযার সামনে চলতেন”[57]

আর আরোহীর জন্য সুন্নাত হলো জানাযার পিছনে চলা। মুগীরা ইবন শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার ধারণা, যিয়াদের লোকেরা এরূপ বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الرَّاكِبُ يَسِيرُ خَلْفَ الْجَنَازَةِ، وَالْمَاشِي يَمْشِي خَلْفَهَا، وَأَمَامَهَا، وَعَنْ يَمِينِهَا، وَعَنْ يَسَارِهَا قَرِيبًا مِنْهَا، وَالسِّقْطُ يُصَلَّى عَلَيْهِ، وَيُدْعَى لِوَالِدَيْهِ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرَّحْمَةِ»

“আরোহীর উচিৎ জানাযার পশ্চাতে পশ্চাতে গমন করা। আর পদব্রজে গমনকারী জানাযার আগে, পিছে, ডানে ও বামে যেতে পারে এবং সাথে সাথেও চলতে পারে। গর্ভপাত হওয়ার ফলে যে শিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তার জানাযার সালাত পড়তে হবে এবং তার মাতা-পিতার জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দো‘আ করা হবে”[58]

তবে আরোহী ব্যক্তি জানাযার সামনে চলা মাকরূহ। কেননা সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একটি জানাযায় বের হলাম। তখন তিনি কিছু লোককে আরোহী অবস্থায় চলতে দেখে বললেন,

«أَلَا تَسْتَحْيُونَ إِنَّ مَلَائِكَةَ اللَّهِ عَلَى أَقْدَامِهِمْ وَأَنْتُمْ عَلَى ظُهُورِ الدَّوَابِّ»

“তোমাদের কি লজ্জা করে না, আল্লাহ ফিরিশতারা তো পায়ে হেটে চলছেন আর তোমরা চলছ পশুর পিঠে সাওয়ার হয়ে”[59]

সালাতের মধ্যে যেমন ইমামের নিকটবর্তী থাকা উত্তম তেমনি জানাযার সময়ও মাইয়্যেতের নিকটবর্তী থাকা উত্তম। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«مَنِ اتَّبَعَ جِنَازَةً فَلْيَحْمِلْ بِجَوَانِبِ السَّرِيرِ كُلِّهَا؛ فَإِنَّهُ مِنَ السُّنَّةِ، ثُمَّ إِنْ شَاءَ فَلْيَتَطَوَّعْ، وَإِنْ شَاءَ فَلْيَدَعْ»

“যে ব্যক্তি লাশ বহন করে, সে যেন খাটের চারদিক ধারণ করে। কারণ, এটা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর সে চাইলে আরো ধরতে পারে, আর চাইলে ত্যাগও করতে পারে”[60]

খ- জানাযার সম্মানে দাঁড়ানো মাকরূহ। মাসউদ ইবন হাকাম আনসারী রহ. আলী ইবন আবূ তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জানাযার ব্যাপারে বলতে শুনেছেন,

«إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ، ثُمَّ قَعَدَ» وَإِنَّمَا حَدَّثَ بِذَلِكَ لِأَنَّ نَافِعَ بْنَ جُبَيْرٍ رَأَى وَاقِدَ بْنَ عَمْرٍو قَامَ، حَتَّى وُضِعَتِ الْجَنَازَةُ»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে দাঁড়াতেন ও পরের দিকে বসে থাকতেন। নাফে‘ ইবন জুবায়ের কথাটা এ জন্য বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ওয়াকিদ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলেন যে, তিনি লাশ নিচে রাখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন”।[61]

গ- জানাযার সময় উচ্চস্বরে আওয়াজ করা, চিৎকার করা, এমনকি উচ্চস্বরে যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করাও মাকরূহ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَا تُتْبَعُ الْجَنَازَةُ بِصَوْتٍ، وَلَا نَارٍ» زَادَ هَارُونُ: «وَلَا يُمْشَى بَيْنَ يَدَيْهَا»

“জানাযার পেছনে চিৎকার করতে করতে এবং আগুন নিয়ে যাবে না। বর্ণনাকারী হারুন অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন ‘জানাযার আগে আগেও গমন করবে না[62]

কায়েস ইবন আব্বাদ রহ. বলেন,

«كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْرَهُونَ رَفْعَ الصَّوْتِ عِنْدَ الْجَنَائِزِ»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ জানাযার সময় উচ্চ আওয়াজ করতে অপছন্দ করতেন[63]

১৩- মাইয়্যেত দাফনের নিয়মাবলি:

- কবর গভীর ও প্রশস্ত হওয়া সুন্নাত। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের যুদ্ধের সাহাবীগণকে বলেছিলেন,

«احْفِرُوا، وَأَوْسِعُوا، وَأَحْسِنُوا، وَادْفِنُوا الِاثْنَيْنِ وَالثَّلَاثَةَ فِي قَبْرٍ وَاحِدٍ، وَقَدِّمُوا أَكْثَرَهُمْ قُرْآنًا»

“বড় এবং প্রশস্ত করে কবর খনন কর এবং সৌজন্যমূলক আচরণ কর আর এক এক কবরে দুই/তিনজন করে দাফন কর। কুরআন সম্পর্কে যে অধিক জ্ঞাত তাকে অগ্রবর্তী করবে”[64]

এখানে (التّوسعةُ) বলতে দৈর্ঘ ও প্রস্থ প্রশস্তকে বুঝানো হয়েছে। আর দ্বারা (العمقُ) গভীরতাকে বুঝানো হয়েছে। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। কেননা হাদীসের অনির্দিষ্টভাবে এভাবেই এসেছে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. বলেছেন, পুরুষ ও নারী উভয়ের কবর বুক বরাবর গভীর করা হবে। হাসান ও ইবন সিরীন রহ. কবর বুক বরাবর গভীর করা পছন্দ করতেন।

হিংস্রজন্তুর আক্রমণ ও দুর্গন্ধ দুর হয় এতটুকু গভীর হলেই যথেষ্ট। কেননা এতে মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়।

খ- বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া শুকনো কাঠ দিয়ে কবর দেওয়া মাকরূহ। এছাড়া যেসব জিনিস আগুনে স্পর্শ করেছে বা পোড়ানো হয়েছে, যেমন ইট (এ বিশ্বাসে যে আগুন মাইয়্যেতকে স্পর্শ করবে না) ইত্যাদি দ্বারা কবর দেওয়াও মাকরূহ। সিন্দুক বা বাক্সে দাফন করাও মাকরূহ; এমনকি মহিলা হলেও। ইবরাহীম নাখঈ‘ থেকে বর্ণিত,

«كَانُوا يَسْتَحِبُّونَ اللَّبِنَ، وَيَكْرَهُونَ الْآجُرَّ، وَيَسْتَحِبُّونَ الْقَصَبَ، وَيَكْرَهُونَ الْخَشَبَ»

“আলেমগণ কাচা ইট ও বাঁশ দিয়ে কবর দেওয়া মুস্তাহাব মনে করতেন, আর পোড়া ইট ও শুকনো কাঠ দিয়ে কবর দেওয়া অপছন্দ করতেন’।[65]

গ- মাইয়্যেতকে কবরে বিছানায় শোয়ানো বা তার মাথার নিচে বালিশ রাখাও মাকরূহ। কেননা এ ধরনের কাজ সালফদের থেকে বর্ণনা পাওয়া যায় না। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّهُ كَرِهَ أَنْ يُلْقَى تَحْتَ الْمَيِّتِ فِي القَبْرِ شَيْءٌ».

“আলেমগণ কবরে মাইয়্যেতের শরীরের নিচে কিছু বিছানো মাকরূহ মনে করতেন”[66]

ঘ- মাইয়্যেতকে কবরে নামানো ব্যক্তি এ দো‘আ পড়া সুন্নাত। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أُدْخِلَ الْمَيِّتُ الْقَبْرَ، قَالَ: «بِسْمِ اللَّهِ، وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللَّهِ» وَقَالَ أَبُو خَالِدٍ مَرَّةً: إِذَا وُضِعَ الْمَيِّتُ فِي لَحْدِهِ قَالَ: «بِسْمِ اللَّهِ، وَعَلَى سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ» ، وَقَالَ هِشَامٌ فِي حَدِيثِهِ: «بِسْمِ اللَّهِ، وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللَّهِ»

“লাশ কবরে রাখার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন: ‘‘বিসমিল্লাহ ওয়াআলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ’’। আবূ খালিদ রহ. বলেন, লাশকে তার কবরে রাখার সময় তিনি বলতেন, ‘‘বিসমিল্লাহি ওয়াআলা সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ’’। হিশাম রহ. তার হাদীসে বলেন, ‘‘বিসমিল্লাহি ওয়া ফী সাবীলিল্লাহি ওয়াআলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ’’।[67]

ঙ- মাইয়্যেতকে কিবলামুখী করে রাখা ওয়াজিব। ‘উবায়দ ইবন ‘উমায়র রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি সাহাবী ছিলেন, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَجُلًا سَأَلَهُ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الْكَبَائِرُ؟ فَقَالَ: «هُنَّ تِسْعٌ»، فَذَكَرَ مَعْنَاهُ زَادَ: «وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ الْمُسْلِمَيْنِ، وَاسْتِحْلَالُ الْبَيْتِ الْحَرَامِ قِبْلَتِكُمْ أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا»

“একদা এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কবীরা গুনাহ কোনগুলো? তিনি বলেন, “তা নয়টি। তখন তিনি উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত গুনাহগুলোর কথা উল্লেখ করেন এবং অতিরিক্ত এ-ও বলেন, মুসলিম পিতা-মাতাকে কষ্ট দেওয়া এবং আল্লাহর ঘরকে অসম্মান না করা, যা তোমাদের জীবনে ও মরণে কিবলা”[68]

তাছাড়া ডান কাতে শোয়ানো সুন্নাত, কেননা মাইয়্যেত ঘুমন্ত ব্যক্তির ন্যায়; আর ঘুমন্ত ব্যক্তি ডান কাতে শোয়া সুন্নাত। এমনকি কোনো কোনো ‘আলেমের মতে তাকে ডান কাতে শোয়ানো ওয়াজিব।

চ- বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত একই কবরে একাধিককে একসাথে কবর দেওয়াও মাকরূহ। যেমন, মৃত সংখ্যা অনেক ও কবরদানকারীর সংখ্যা কম হলে একসাথে কবর দেওয়া মাকরূহ হবে না। হিশাম ইবন আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা উহুদের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অভিযোগ করে বললাম,

«يَا رَسُولَ اللَّهِ، الْحَفْرُ عَلَيْنَا لِكُلِّ إِنْسَانٍ شَدِيدٌ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «احْفِرُوا وَأَعْمِقُوا وَأَحْسِنُوا، وَادْفِنُوا الِاثْنَيْنِ وَالثَّلَاثَةَ فِي قَبْرٍ وَاحِدٍ»، قَالُوا: فَمَنْ نُقَدِّمُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «قَدِّمُوا أَكْثَرَهُمْ قُرْآنًا»، قَالَ: فَكَانَ أَبِي ثَالِثَ ثَلَاثَةٍ فِي قَبْرٍ وَاحِدٍ

ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের পক্ষে প্রত্যেক মানুষের জন্য কবর খনন করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কবর খনন করো এবং কবরকে গভীর করো আর মৃতদের উত্তম রূপে দাফন করো এবং দু’জন, তিনজনকে এক এক কবরে দাফন করো। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কাকে প্রথমে রাখব? তিনি বললেন, যে কুরআন বেশি জানে তাকে প্রথমে রাখো। বর্ণনাকারী বলেন, এভাবে আমার পিতা একই কবরের তিনজনের অন্যতম ছিলেন[69]

ছ- উপস্থিত সকলের মাইয়্যেতের কবরে তিনবার করে মাটি ছিটিয়ে দেওয়া সুন্নাত। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«صَلَّى عَلَى جِنَازَةٍ، ثُمَّ أَتَى قَبْرَ الْمَيِّتِ، فَحَثَى عَلَيْهِ مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ ثَلَاثًا»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির জানাযার সালাত পড়লেন, অতঃপর মৃতের কবরের নিকট এসে তার মাথার দিকে তিনবার মাটি ছড়িয়ে দিলেন[70]

অতঃপর মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া। কেননা মাইয়্যেতকে সমাহিত করা ফরয। আর সবাই মিলে মাটি ছিটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাহিত করণের উক্ত ফরযটিতে অংশীদার হওয়া যায়।

১৪- কবর খননের হুকুম ও কবরের বৈশিষ্ট্য:

ক- কবরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া ও মাটি সংরক্ষণের জন্য ছোট ছোট পাথরের টুকরো ঢেলে দেওয়া সুন্নাত। জাফর ইবন মুহাম্মাদ তার পিতার থেকে বর্ণনা করেন,

«أنّ النّبيّ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ رَشَّ عَلَى قَبْرِ ابْنِهِ إِبْرَاهِيمَ مَاءً، ووَضَعَ عَلَيْهِ حَصْبَاءَ »

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুত্র ইবরাহীমের কবরে পানির ছিটে দিয়েছেন ও পাথরের টুকরো বিছিয়ে দিয়েছেন[71]

খ- কবর এক বিঘত পরিমাণ উঁচু করা সুন্নাত। জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ رُفِعَ قَبْرُهُ مِنَ الْأَرْضِ نَحْواً مِنْ شِبْرٍ»

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর এক বিঘত পরিমাণ উঁচু করা হয়েছে[72]

তবে এক বিঘতের বেশি উঁচু করা মাকরূহ। আবূ হাইয়াজ আল-আসাদী রহ. বলেন, আমাকে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«أَلَا أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ «أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ»

আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাবো না যে কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হচ্ছে কোনো (জীবের) প্রতিকৃতি বা মূর্তি বা ছবি দেখলে তা চূর্ণ বিচূর্ণ না করে ছাড়বে না। আর কোনো উঁচু কবর দেখলে তা ও সমান না করে ছাড়বে না[73]

গ- কবরকে সুসজ্জিত করা, সৌধ বানানো, আগরবাতি বা অন্য কিছু দিয়ে ধোঁয়া দেওয়া নিষেধ। হাদীসে এসেছে, জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«نَهَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ، وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ، وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ»

“রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর পাকা করতে, কবরের উপর বসতে ও কবরের উপর গৃহ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন[74]

কেননা এসব হলো দুনিয়ার সৌন্দর্য; আর মৃত্যু ব্যক্তির এসবের প্রয়োজন নেই।

ঘ- কবরে চুমো খাওয়া নিষেধ। কেননা এটা করা বিদ‘আত। জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ، وَعَلَا صَوْتُهُ، وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ، حَتَّى كَأَنَّهُ مُنْذِرُ جَيْشٍ يَقُولُ: «صَبَّحَكُمْ وَمَسَّاكُمْ»، وَيَقُولُ: «بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ»، وَيَقْرُنُ بَيْنَ إِصْبَعَيْهِ السَّبَّابَةِ، وَالْوُسْطَى، وَيَقُولُ: «أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ، وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ» ثُمَّ يَقُولُ: «أَنَا أَوْلَى بِكُلِّ مُؤْمِنٍ مِنْ نَفْسِهِ، مَنْ تَرَكَ مَالًا فَلِأَهْلِهِ، وَمَنْ تَرَكَ دَيْنًا أَوْ ضَيَاعًا فَإِلَيَّ وَعَلَيَّ».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা (ভাষণ) দিতেন তখন তাঁর চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করতো, কণ্ঠস্বর জোরালো হতো এবং তাঁর রোষ বেড়ে যেতো, এমনকি মনে হতো, তিনি যেন শত্রুবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর বলছেন, তোমরা ভোরেই আক্রান্ত হবে, তোমরা সন্ধ্যায়ই আক্রান্ত হবে। তিনি আরও বলতেন, আমি ও কিয়ামত এই দু’টির ন্যায় প্রেরিত হয়েছি, তিনি মধ্যমা ও তর্জনী মিলিয়ে দেখাতেন। তিনি আরও বলতেন, অতঃপর, উত্তম বাণী হলো- আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথ। অতীব নিকৃষ্ট বিষয় হলো (দীনের মধ্যে) নতুন উদ্ভাবন (বিদআত)। প্রতিটি বিদআত ভ্রষ্ট। তিনি আরও বলতেন, আমি প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির জন্য তার নিজের থেকে অধিক উত্তম (কল্যাণকামী)। কোনো ব্যক্তি সম্পদ রেখে গেলে তা তার পরিবার-পরিজনের প্রাপ্য। আর কোনো ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তান রেখে গেলে সেগুলোর দায়িত্ব আমার[75]

ঙ- কবর ঘিরে তাওয়াফ করা হারাম। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম রোগশয্যায় বলেন,

«لَعَنَ اللَّهُ اليَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ»، لَوْلاَ ذَلِكَ أُبْرِزَ قَبْرُهُ غَيْرَ أَنَّهُ خَشِيَ - أَوْ خُشِيَ - أَنَّ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا وَعَنْ هِلاَلٍ، قَالَ: «كَنَّانِي عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ وَلَمْ يُولَدْ لِي»

ইয়াহূদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লানত হোক। কারণ, তারা নিজেদের নবীগণের কবরকে সাজদাহ’র স্থানে পরিণত করেছে। (বর্ণনাকারী উরওয়া বলেন) এরূপ আশংকা না থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরকে (ঘরের বেষ্টনীতে সংরক্ষিত না রেখে) খোলা রাখা হতো। কিন্তু তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আশংকা করেন বা আশংকা করা হয় যে, পরবর্তীতে একে মসজিদে পরিণত করা হবে। বর্ণনাকারী হিলাল রহ. বলেন, উরওয়া আমাকে (আবূ আমর) কুনিয়াতে ভূষিত করেন আর তখন পর্যন্ত আমি কোনো সন্তানের পিতা হই নি[76]

চ- কবরে হেলান দিয়ে বসা নিষেধ। উমারাহ ইবন হাযম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«انْزِلْ مِنَ الْقَبْرِ لَا تُؤْذِ صَاحِبَ الْقَبْرِ وَلَا يُؤْذِيكَ»

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কবরের উপর বসা দেখে বললেন, কবর থেকে নেমে পড়ো, কবরবাসীকে কষ্ট দিওনা; আর কবরবাসীও তোমাকে কষ্ট দিবে না”[77]

ছ- কবরে রাত যাপন, হাসি তামাশা করা, দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা নিষেধ। কেননা এসব কবরের মত স্থানে সমীচীন নয়।

জ- কবরের উপর লেখা, বসা, ঘর বানানো হারাম। জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,

«نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُجَصَّصَ القُبُورُ، وَأَنْ يُكْتَبَ عَلَيْهَا، وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهَا، وَأَنْ تُوطَأَ»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে চুনা লাগাতে এবং তাতে লিখতে, এর উপর ঘর নির্মাণ করতে ও তা পদদলিত করতে নিষেধ করেছেন”[78]

ঝ- কবরের মাঝে জুতা পায়ে হেঁটে যাওয়াও নিষেধ; তবে কাঁটা বা ক্ষতিকর কিছুর আশঙ্কা থাকলে ভিন্ন কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আযাদকৃত গোলাম বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

عَنْ بَشِيرٍ، مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَانَ اسْمُهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ زَحْمُ بْنُ مَعْبَدٍ، فَهَاجَرَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَا اسْمُكَ؟» قَالَ: زَحْمٌ، قَالَ: «بَلْ، أَنْتَ بَشِيرٌ»، قَالَ: بَيْنَمَا أَنَا أُمَاشِي رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِقُبُورِ الْمُشْرِكِينَ، فَقَالَ: «لَقَدْ سَبَقَ هَؤُلَاءِ خَيْرًا كَثِيرًا» ثَلَاثًا ثُمَّ مَرَّ بِقُبُورِ الْمُسْلِمِينَ، فَقَالَ: «لَقَدْ أَدْرَكَ هَؤُلَاءِ خَيْرًا كَثِيرًا» وَحَانَتْ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَظْرَةٌ، فَإِذَا رَجُلٌ يَمْشِي فِي الْقُبُورِ عَلَيْهِ نَعْلَانِ، فَقَالَ: «يَا صَاحِبَ السِّبْتِيَّتَيْنِ، وَيْحَكَ أَلْقِ سِبْتِيَّتَيْكَ» فَنَظَرَ الرَّجُلُ فَلَمَّا عَرَفَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَلَعَهُمَا فَرَمَى بِهِمَا

“জাহেলী যুগে তার নাম ছিল যাহম ইবন মাবাদ। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হিজরত করেন। এ সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার নাম কী? তখন তিনি বলেন, যাহম। এ কথা শুনে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বরং তুমি হলে বাশীর। তিনি বলেন, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হাঁটছিলাম এবং তিনি মুশরিকদের কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরা অধিক কল্যাণপ্রাপ্তির আগে চলে গেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরূপ তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি মুসলিমদের কবরের পাশ দিয়ে গমনকালে বলেন, এরা অধিক কল্যাণ হাসিল করেছে। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পান যে, এক ব্যক্তি দু’পায়ে জুতা দিয়ে কবরস্থানের মাঝে হাঁটছে। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেন, হে দুপায়ে জুতা পরিহিত ব্যক্তি! তোমার জন্য আফসোস, তুমি তোমার দু‘পায়ের জুতা খুলে ফেল। সে ব্যক্তি লক্ষ্য করে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারলো, তখন সে তার দুপায়ের জুতা খুলে দুরে নিক্ষেপ করলো[79]

তাছাড়া কবরে জুতা খুলে প্রবেশ করলে নম্রতা, শিষ্টাচারীতা ও মুসলিম মৃতব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

ঞ- কবরে বাতি জ্বালানো, মসজিদে কবর দেওয়া, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হারাম। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ القُبُورِ، وَالمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا المَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ»

“যে সমস্ত মহিলা কবর যিয়ারত করে এবং যে সমস্ত মানুষ কবরের উপর মসজিদ বানায় ও এতে বাতি জ্বালায় তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা‘নত করেছেন”[80]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম রোগশয্যায় বলেন,

«لَعَنَ اللَّهُ اليَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ»

“ইয়াহূদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লা‘নত হোক। কারণ, তারা নিজেদের নবীগণের কবরকে সাজদাহ’র স্থানে পরিণত করেছে”[81]

তাছাড়া কবরে বাতি জ্বালানো অর্থ অপব্যয় এবং মূর্তিকে সম্মান দেখানোর মতো কবরকে সম্মান করা হয়।

ট- অন্যের জমিতে দাফন করা হারাম। বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কবর খনন করে লাশ সরানোও হারাম। জনবসতিপূর্ণ স্থানে কবর দেওয়ার চেয়ে মরুভূমি বা অব্যবহৃত জায়গায় কবর দেওয়া উত্তম। কেননা এতে কবর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের কবর বাকী‘ গোরস্থানে দিয়েছেন। সাহাবী, তাবেঈ ও পরবর্তীগণ মরুভূমিতে কবর দিয়েছেন।

১৫- গর্ভবতী নারী দাফনের বিধিবিধান:

গর্ভবতী নারী মারা গেলে সন্তান জীবিত থাকার আশঙ্কায় নারীর পেট কাটা হারাম। কেননা এতে ক্ষীণ সম্ভাবনাময় সন্তানের জন্য মাইয়্যেতের অসম্মান করা হয়। কেননা সন্তান জীবিত না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كَسْرُ عَظْمِ الْمَيِّتِ كَكَسْرِهِ حَيًّا»

মৃত ব্যক্তির হাঁড় চূর্ণ করা, জীবিত ব্যক্তির হাঁড় চূর্ণ করার মতো[82]

ইবন কুদামা রহ. বলেছেন, পেটের বাচ্চা জীবিত থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকলে শাফে‘ঈ মাযহাব মতে পেট কেটে বাচ্চা বের করা হবে। কেননা এতে মাইয়্যেতের আংশিক নষ্ট করে জীবিতকে বের করা হয়। তাই এটা জায়েয। যেমন কিছু অংশ জীবিত বের হলে বাকী অংশ যদি কাটা ছাড়া বের না হয় তখন কাটা জায়েয। তাছাড়া এতে তার শরীরের একটি অংশই শুধু কেটে বের করা হয়। অতএব, জীবিতকে রক্ষা করতে তার শরীরের অংশ কেটে বের করা অগ্রাধিকার প্রাপ্ত”।[83]

১৬- কবর যিয়ারত:

কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ কবর যিয়ারত করেছেন। কবর যিয়ারতে অনেক ফায়েদা রয়েছে, যেমন: কবর যিয়ারতের দ্বারা মৃত্যু ও আখেরাতের কথা স্মরণ হয়, কবরের আযাবের ভীতি সঞ্চারিত হয়, মানুষের হৃদয় বিগলিত হয়, চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়, অন্যায় কাজ থেকে তওবা এবং নেকীর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়, পরকালীন মুক্তির প্রেরণা সৃষ্টি হয়। উপরোক্ত উদ্দেশ্যেই কেবল কবর যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় প্রথমে কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ ছিল। পুরুষের জন্য কবর যিয়ারত করে শিক্ষাগ্রহণ করা সবার ঐকমত্যে সুন্নাত। অধিকাংশ সত্যনিষ্ঠ আলেম নারীদের উপর কবর যিয়ারত নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে আবূ হানিফা, ইবন মুবারক, শাফে‘ঈ, আহমদ এর এক মত, কারখী ও ইবন হাযমসহ অনেক আলেমের মতে নারী-পুরুষ সবার জন্য এ অনুমতি রয়েছে।[84] কারণ হাদীসে এসেছে,

«قَدْ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ، فَقَدْ أُذِنَ لِمُحَمَّدٍ فِي زِيَارَةِ قَبْرِ أُمِّهِ، فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ»

তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করা থেকে নিষেধ করেছিলাম। মুহাম্মাদকে তাঁর মাতার কবর যিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার। কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করায়[85]

উপরোক্ত হাদীসে কবর যিয়ারতের নিষেধাজ্ঞা যেমন নারী পুরুষ সকলের জন্যই প্রযোজ্য ছিল, তেমনিভাবে অনুমোদনও সকলের জন্য প্রযোজ্য হবে। অবশ্য সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ বলেন, মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, লা‘নত এসেছে, যা থেকে বুঝা যায় যে, নারীদের জন্য কোনো কবর যিয়ারত করা জায়েয নয়। তারা কবর যিয়ারত করবে না।

কারণ, হাদীসে সেসব নারীদের লা‘নত করা হয়েছে, যারা কবর যিয়ারত করে, ও সে সময় সরবে কান্নাকাটি ও বিলাপ ধ্বনি করে এবং বেশি বেশি কবর যিয়ারত করে। হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত যে,

«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ زَوَّارَاتِ القُبُورِ»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারতকারী মহিলাদের লা‘নত করেছেন[86]

মোদ্দাকথা, যিয়ারতের সময় এমন কাজ করা যাবে না, যা করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। যেমন, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা দুনিয়াবী স্বার্থে যিয়ারত করা, সেখানে ফুল দেওয়া, কবরবাসীর নিকটে কিছু কামনা করা, সেখানে বসা, সালাত আদায় করা বা সাজদাহ করা, কবরবাসীকে আহ্বান করা, কবরবাসীর উসীলায় মুক্তি প্রার্থনা করা, সেখানে দান-সাদাকা ও মান্নত করা, গরু-ছাগল-মোরগ ইত্যাদি উৎসর্গ করা বা কুরবানী করা প্রভৃতি হারাম কাজ থেকে দূরে থাকা। এককথায় সকল প্রকারের শির্কী আকীদা ও বিদ‘আতী আমল থেকে মুক্ত মন নিয়ে কেবল মৃতের জন্য দো‘আ এবং আখেরাতকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা যাবে।

কবর যিয়ারতের সময় নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে,

«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ»

“হে কবরের অধিবাসী মুমিনগণ! আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আমরাও আপনাদের সাথে এসে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ”[87]

অথবা এ দো‘আ পড়বে,

«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا، إِنْ شَاءَ اللهُ لَلَاحِقُونَ، أَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ»

“হে কবরের অধিবাসী মুমিনগণ! আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আমরাও আপনাদের সাথে এসে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ্। আমরা আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’[88]

অথবা এভাবে বলবে,

«السَّلَامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ »

“মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীদের ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের অগ্রবর্তী ও পরবর্তীদের ওপর আল্লাহ রহম করুন! আল্লাহর ইচ্ছায় তো আমরা অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছি”[89]

কবরবাসীর জন্য দো‘আ করলে আল্লাহ এর সাওয়াব কবরে পৌঁছে দেন। কেননা মানুষ জন্য মারা যায় তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তিনটি আমল জারি থাকে। তাই তারা দুনিয়াবাসীর দো‘আর দিকে তাকিয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে,

«إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ "

“মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু তিনটি আমলের সাওয়াব মৃত্যুর পরেও বন্ধ হবে না। সেগুলো হলো, সাদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দিয়ে মানুষের উপকার সাধিত হয় এবং এমন নেক সন্তান যে তার তার জন্য দো‘আ করে”[90]

সমাপ্ত

[1] তিরমিযী, হাদীস নং ২৩০৭, তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন। মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ৭৯২৫, আল্লামা শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪২৫৮, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯২০।

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৪১।

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৬৫।

[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩১৫।

[6] তিরমিযী, হাদীস নং ১৭১৭, ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আল্লামা আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[7] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৪৩৩। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[8] নাসাঈ, হাদীস নং ৪৬৮৫। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[9] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৪৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭১।

[10] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৪১।

[11] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৪১৯২। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[12] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯২৬।

[13] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৪৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৩২।

[14] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৪৯।

[15] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৫১।

[16] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯১৮।

[17] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৮০।

[18] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৩৪।

[19] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৩৫।

[20] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৩৬।

[21] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৯৪।

[22] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৯৬।

[23] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১৩১, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[24] মুসতাদরক হাকিম, হাদীস নং ১২৯৯। তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[25] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ২২০৩৪, আল্লামা শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[26] সুনান নাসাঈ, হাদীস নং ১৮২৮, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ২৩০২২, আল্লামা শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[27] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ৬৫৮২, আল্লামা শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ১০৭৪, তিনি হাদীসটিকে গরীব বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[28] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৭৯৯, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৩।

[29] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৫।

[30] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১১১। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[31] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪৮০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪১।

[32] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৮১, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[33] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৩।

[34] তিরমিযী, হাদীস নং ১৬২১। তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[35] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৪৯।

[36] ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৩০৬০; মুসতাদরক হাকিম, হাদীস নং ১৩৯৮। হাকিম রহ. হাদীসটিকে মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন, তবে ইমাম মুসলিম হাদীসটিকে তাখরিজ করেন নি। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। শুয়াইব রহ. হাদীসটিকে বিভিন্ন শাহেদের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন।

[37] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৪৬৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[38] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৬৫।

[39] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৬৫।

[40] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৫৮, ১২৫৯।

[41] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৬০।

[42] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৬৫।

[43] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৪৬।

[44] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৪৩।

[45] মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৫৯৪।

[46] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৪০।

[47] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৪১।

[48] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬৪।

[49] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৫১।

[50] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৫১।

[51] আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩২০১, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৪৯৮।

[52] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬৩।

[53] আবু দাঊদ, হাদীস নং ৩২০২। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[54] আহকামুল জানাইয, নাসিরুদ্দীন আলবানী, পৃ. ১৩২।

[55] তাফসীরে উসাইমীন, ৩০তম পারার তাফসীর, মুহাম্মদ ইবন সালিহ ইবন মুহাম্মাদ উসাইমীন, দারুস-সারাইয়া লিন-নাশরি ওয়াত-তাওযি‘, রিয়াদ, পৃ. ৬৬।

[56] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১৭৯, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[57] তিরমিযী, হাদীস নং ১০০৯।

[58] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১৮০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[59] তিরমিযী, হাদীস নং ১০১২। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, এ পরিচ্ছেদে মুগীরা ইবন শু‘বা ও জাবির ইবন সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহুমার থেকে হাদীস বর্ণিত আছে। সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণিত হাদীসটি মাওকুফ সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ রহ. বলেছেন, এ বর্ণনাটি মাওকুফ হওয়াটাই বেশি সহীহ। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৪৮০।

[60] ইবন মাজাহ, হাদীস ননহ ১৪৭৮। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন।

[61] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬২।

[62] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১৭১। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন।

[63] বায়হাকী, হাদীস নং ৭১৮২, (৪/১২৪)

[64] তিরমিযী, হাদীস নং ১৭১৩, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আবু দাউদ, হাদীস নং ৩২১৫, ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৫৬০।

[65] মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৭৭০, খ. ৩, পৃ. ২৫।

[66] তিরমিযী, সনদ ছাড়া মুয়াল্লাক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, (২/৩৫৭)

[67] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৫৫০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩২১৩, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[68] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ২৮৭৫। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[69] সুনান নাসাঈ (আস-সুগরা), হাদীস নং ২০১০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[70] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ১৫৬৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[71] মুসনাদে শাফে‘ঈ, পৃ. ৩৬০, হাদিসটি মুরসাল। মুজাম সগীর লিল-বাইহাকী, হাদীস নং ১১১৯, খ. ২, পৃ. ২৮।

[72] সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬৬৩৫। আল্লামা শুয়াইব আরনাউত বলেছেন, হাদীসের সনদটি মুসলিমের শর্তে সহীহ।

[73] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৬৯।

[74] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭০।

[75] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৬৭।

[76] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৯০।

[77] মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস নং ৬৫০২, এ হাদীসের ব্যাপারে ইমাম হাকিম ও যাহাবী কেউ কোনো মন্তব্য করেন নি। মুসনাদ আহমদ, ৩৯/৪৭৫। আল্লামা শুয়াইব আরনাউত বলেন, হাদীসের ولا يؤذيك অংশ ব্যতীত বাকী অংশ সহীহ।

[78] তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫২, ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[79] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩২৩০। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[80] তিরমিযী, হাদীস নং ৩২০, ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন।

[81] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৯০।

[82] আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩২০৭, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[83] আল-মুগনী, ২/৪১৩।

[84] বাহরুর রাইক, ২/২১০, দুররুল মুখতার, ২/২৪২, আল-উম্ম লিশ-শাফেয়ী, ১/২৭৮, রাওদাতুত-তালেবীন, ২/১৩৯, আল-মুগনী, ২/৪২২, আল-মুহাল্লা, ৩/৩৮৯।

[85] তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫৪, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

[86] তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫৪, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

[87] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৯।

[88] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৫।

[89] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৪।

[90] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১।

আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ