মুসলিম মা ও বোনদের প্রতি আহবান

বর্ণনা

আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়া আঁকড়ে ধরা, আল কুরআন ও সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ ইত্যাদির প্রতি নারীকে উৎসাহ প্রদানই আলোচ্য প্রবন্ধের লক্ষ্য। আল্লাহর নির্দেশর বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়া ও পাপ-গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পরিণতি কী সে ব্যাপারেও উক্ত প্রবন্ধে আলোচনা উঠে এসেছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    মুসলিম মা ও বোনদের প্রতি আহ্বান

    رسالة إلى المرأة

    <بنغالي>

    চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ

    أبو الكلام أزاد

    —™

    সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী

    مراجعة: د/ محمَّد منظور إلهي

    মুসলিম মা ও বোনদের প্রতি আহবান

    আলকুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَن يُعۡرَفۡنَ فَلَا يُؤۡذَيۡنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٥٩﴾ [الاحزاب: ٥٩]

    “হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিনদের স্ত্রীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়, এতে করে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯]

    প্রিয় মুসলিম বোনেরা....

    ইসলাম নারী জাতিকে দান করেছে এক বিশেষ মর্যাদা। একমাত্র ইসলামই প্রতিষ্ঠা করেছে নারীর পূর্ণ অধিকার। তাকে দিয়েছে তার নিজস্ব গণ্ডিতে ব্যাপক স্বাধীনতা। মহান রবের পক্ষ থেকে নারী পুরুষের মাঝে সাওয়াব ও প্রতিদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার তারতম্য সৃষ্টি করা হয় নি। আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٩٧﴾ [النحل: ٩٧]

    “যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের আমলের প্রাপ্য পুরস্কার দিব।” [সূরা আন-নহল, আয়াত: ৯৭]

    পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল নারীদেরকে পৌঁছে দিয়েছে পতন ও ধ্বংসের চূড়ান্ত স্তরে। যে নারী ছিল সম্মান ও মর্যাদার আবরণে আবৃত, সে নারী আজ নগ্ন কিংবা অর্ধনগ্ন। যে নারী ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মর্যাদাকর বেষ্টনীতে, সে নারী আজ নিরাপত্তাহীনতা ও লাঞ্ছনাকর আতংকের খোলা ময়দানে। যে নারী ছিল কন্যা, জায়া, জননীর সম্মানজনক আসনে, সে নারী আজ হোটেল ও শপিং মলের রিসেপশনে।

    আমার বোনেরা...

    পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নারীরা আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে তাদের স্বাধীনতার প্রকৃত রূপ। ঐ সংস্কৃতি তাদেরকে দিয়েছে এমন এক স্বাধীনতা যা বাহ্যিকভাবে স্বাধীনতা মনে হলেও প্রকৃত অর্থে পরাধীনতার অক্টোপাস।

    বর্তমান দুনিয়ার যাবতীয় নোংরা ও নিকৃষ্ট কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে নারী। হোটেল-রেস্তোঁরায় আগন্তুকদের মনোরঞ্জন, দোকানে ক্রেতা আকর্ষণ, অফিস আদালতে বসদের সঙ্গে অবকাশযাপন, এটাই তাদের স্বাধীনতা ও সম্মানের রূপ। স্বাধীনতার কি আজব সংজ্ঞা!

    নারী পুরুষের উন্মুক্ত মেলামেশা, অশ্লীল বিনোদন, চরিত্র বিধ্বংসী শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার কারণে পাশ্চাত্য সমাজ এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, পশুত্বকেও হার মানিয়েছে তারা। কামনার আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে উম্মাদ পশুর আচরণ করছে। শুধু প্যারিস শহরে প্রতিদিন দশ হাজার সতী নারী সম্ভ্রম হারাচ্ছে। তার চেয়েও লজ্জার কথা হলো, ফ্রান্সের মেডিকেল বোর্ড ঘোষণা দিয়েছে, “ফ্রান্সবাসীকে এ জন্য গর্ব করা উচিত যে, অচিরেই ফ্রান্সে আর কোন সতী নারী পাওয়া যাবেনা”। তাদের মনুষ্যত্ববোধ কত নিচে নেমে গেছে তা কল্পনাও করা যায় না। এরূপ নারী স্বাধীনতাকে ধিক্কার, শত ধিক্কার।

    প্রিয় বোনেরা আমার...

    পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রবক্তারা ইসলামী সংস্কৃতিকে নারীদের জন্যে অত্যাচার বলে প্রচার করছে। ইসলামকে প্রগতির পথে অন্তরায় বলে চিৎকার চেঁচামেচি করছে।

    কিন্তু ইসলামের স্বর্ণোজ্জল অবদান আজও ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নারীদের প্রেরণা যোগায়। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা একাই ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করে হাদীসের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। অসংখ্য জটিল মাসআলার সমাধান দিয়ে উম্মতকে দীনের পথে চলা সহজ করে দিয়েছেন। ইসলামী রীতি-নীতির অনুসরণ করে রাবেয়া বসরী রহ. হয়েছেন বিশ্বাসী নারীদের আদর্শ। খলীফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী যুবাইদা শিক্ষা-দীক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে নারীকূলের জন্য আজও অনুকরণীয় হয়ে আছেন। এরকম হাজার হাজার দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে নারীরা পরিপূর্ণ ইসলামের গণ্ডিতে অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

    বোনেরা আমার.....

    এ যুগে প্রয়োজন এমন নিবেদিতপ্রাণ নারীর, যিনি স্বামীভক্তিতে হবেন উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ন্যায়, যে মহিয়সী দ্বীন ও ইসলামের উন্নতিকল্পে সহায়তা করেছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বস্ব উজাড় করে। ধৈর্য, সংযম ও আল্লাহ প্রেমে হবেন ফাতেমা বিনতে খাত্তাবের ন্যায়, যার ঈমানী দৃঢ়তা দেখে ওমরের মত অগ্নিপুরুষও ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রাণ উৎসর্গে হবেন সুমাইয়ার ন্যায়, যিনি ঈমান ত্যাগ না করার কারণে আবু জাহেলের বর্শার আঘাতে ইসলামের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

    প্রিয় বোনেরা........

    আমরা চাই আপনিও তাদের অনুসরণ করে জান্নাতুল ফিরদাউসের চিরস্থায়ী অধিবাসী হবেন। স্মরণ করুন নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী :

    «إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ»

    “নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, মাহে রমযানের সাওম পালন করবে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করবে এবং স্বামীর আনুগত্য করবে, তাকে বলা হবে তুমি তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী জান্নাতের দরজাসমূহের যে কোনো দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো।[1]

    একজন মুসলিম নারী হিসাবে আপনাকে সর্বপ্রথম সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    «إِنِّي فَرَضْتُ عَلَى أُمَّتِكَ خَمْسَ صَلَوَاتٍ وَعَهِدْتُ عِنْدِي عَهْدًا أَنَّهُ مَنْ جَاءَ يُحَافِظُ عَلَيْهِنَّ لِوَقْتِهِنَّ أَدْخَلْتُهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يُحَافِظْ عَلَيْهِنَّ فَلَا عَهْدَ لَهُ عِنْدِي إِنْ شِئْتُ عَذَّبْتُهُ، وَإِنْ شِئْتُ غَفَرْتُ لَهُ»

    “হে নবী, আমি তোমার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছি, যে ব্যক্তি সময়মত গুরুত্ব সহকারে তা আদায় করবে আমি তাকে নিজ জিম্মায় জান্নাতে প্রবেশ করাব, আর যে সালাতের ব্যাপারে যত্নবান হবেনা তার প্রতি আমার কোন দায়-দায়িত্ব নেই। ইচ্ছা করলে ক্ষমা করব, নচেৎ শাস্তি দিব”[2]

    সালাতের পরপরই একজন মুসলিমের জন্য মাহে রমযানের সাওম পালন করা একান্ত জরুরী। সাওমের ফযিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»

    “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় মাহে রমযানের সাওম পালন করবে, তার পিছনের সব গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে”[3]

    সালাত ও সাওমের সাথে সাথে পর্দার ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। হিজাব তথা পর্দার বিধান গ্রহণ করার মাধ্যমেই একজন নারী তার সম্মান ও মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে পারে। বলা হচ্ছে,

    ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ يُدۡنِينَ عَلَيۡهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدۡنَىٰٓ أَن يُعۡرَفۡنَ فَلَا يُؤۡذَيۡنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٥٩ ﴾ [الاحزاب: ٥٩]

    “হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিনদের স্ত্রীদেরকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়, এতে করে তাদেরকে চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৯]

    আধুনিক নারীরা মনে করছে পাশ্চাত্যের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে পারলেই বুঝি উন্নতির উচ্চ চূড়ায় পৌঁছতে পারবে। একবারও কি তারা ভেবে দেখেছেন, যে পথে তারা চলছেন সে পথ থেকে কখনও ফিরে আসতে পারবেন কি-না? আপনারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন কোথায় গিয়ে থামবে আপনাদের জীবনভেলা?

    চিন্তা করে দেখুন, কোন পথ গ্রহণ করবেন। এখনও সময় আছে। এখনও আপনারা অতীতের গৌরবদীপ্ত কীর্তিসমূহের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন। আজও আপনাদের থেকে জন্ম নিতে পারে দিগ্বিজয়ী বীর সেনানী, যুগের সাহসী নকীব, মুহাদ্দিস, মুফাসসির। আপনাদের কোল থেকে তৈরী হতে পারে মুসলিম জাতির কান্ডারী। তাই আসুন, আমরা সে পথেই অগ্রসর হই। আল্লাহ সকলের প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমীন!!

    সমাপ্ত

    [1] মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ১৬৬১

    [2] সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩০

    [3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ