ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

বর্ণনা

ইসলামের পূর্ব থেকে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মধ্যে যিয্য়াহ প্রথার বিধান ছিল। সব যুগেই বিজয়ী জাতি পরাজিত জাতি থেকে কর ও জিয্য়াহ আদায় করে আসছে। ইসলামও তা বহাল রেখেছে, কিন্তু বিভিন্ন জাতির ন্যায় ইসলাম এটাকে যুলম বা নির্যাতনের হাতিয়ার বানায়নি, বরং ইসলাম এটাকে সম্মানসূচক একটির চুক্তির রূপ দিয়েছে, সামান্য জিয্য়ার বিনিময়ে মুসলিমগণ অমুসলিমদের স্বার্থে তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে বদ্ধ পরিকর। এর ফলে যিম্মিরা ইসলামি রাষ্ট্রে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা এবং ধর্মের স্বাধীনতা ভোগ করে। ইতিহাস ও বাস্তবতার নিরিখে তারই ব্যাখ্যা এ নিবন্ধে পেশ করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

    ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

    [ البنغالية - বাংলা - bengali ]

    ড. মুনকিয বিন মাহমুদ আস-সাক্কার

    অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

    সম্পাদনা : ড. আবু বকর মোঃ যাকারিয়া

    2011 - 1432


    ﴿ الجزية في الإسلام ﴾

    (( البنغالية ))

    د. منقذ بن محمود السقار

    ترجمة: ثناء الله بن نذير أحمد

    مراجعة: د. أبو بكر محمد زكريا

    2011 - 1432


    ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

    ভূমিকা :

    জিযয়াহ্ সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

    ﴿قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ﴾ (سورة التوبة: 29)

    ‘তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযয়াহ্‌ দেয়।’ [সূরা আত-তাওবাহ্ : ২৯]

    জিযয়াহ্‌ সম্পর্কে কেউ কেউ বলে, মুসলিম উম্মাহর বশ্যতা-স্বীকারকারীদের উপর কুরআনের এ আয়াত যুলম করেছে; তাদের এ আপত্তি অসার ও অমূলক। এতে সন্দেহ নেই, ইসলাম জিযয়াহ্‌র বিনিময়ে যেসব দায়িত্ব ও অধিকারের যিম্মাদারী গ্রহণ করেছে, এ অভিযোগকারী সে সম্পর্কে অজ্ঞ ও গাফেল। মূলত সে পূর্বাপর অন্যান্য মতাদর্শের ন্যায় ইসলামকেও একটি মতাদর্শ জ্ঞান করেছে, অথচ অন্যান্য ধর্মে যিম্মীদের উপর যুলম ও অত্যাচার করার যে রীতি প্রচলিত ছিল, ইসলাম তা থেকে একেবারে মুক্ত। আমি দৃঢ় আশাবাদি, এ নিবন্ধ পাঠ করলে খুব সহজে একজন পাঠকের নিকট তা স্পষ্ট হবে, তাই কয়েকটি ধাপে বিন্যস্ত করে আমি জিযয়াহ্‌র আলোচনা আরম্ভ করছি।

    প্রথমত : জিযয়াহ্‌র আভিধানিক অর্থ :

    জিযয়াহ্‌ আরবি শব্দ, আরবি (ج ز ي) তিনটি অক্ষর দ্বারা গঠিত। নিজের উপর কৃত অনুগ্রহ, ইহসান ও দয়ার প্রতিদান দেয়ার সময় আরবরা : "جزى ، يجزي" ক্রিয়া ব্যবহার করে। আর الجزية مشتق على وزن فِعلة من المجازاة، অর্থ : সে তোমাকে যে নিরাপত্তা দিয়েছে, তুমি তার বিনিময় দান কর। মুতাররিযী বলেন: الجزية শব্দের উৎপত্তি الإجزاء শব্দ থেকে, কারণ এ জিযয়াহ্‌ যিম্মিকে তার অন্যান্য সকল প্রকার দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে।[1]

    দ্বিতীয়ত : ইসলাম পূর্বে জিযয়াহ্‌ :

    পৃথিবীর বুকে ইসলাম যেমন নতুন নয়, তেমনি মুসলিমগণ তাদের অধীনদের উপর জিযয়াহ্‌ নতুন করে আরোপ করেন নি, বরং আদিকাল থেকেই বিজয়ী জাতি পরাজিত জাতির উপর জিযয়াহ্‌ আরোপ করে আসছে, মানব ইতিহাস তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

    নিউটেস্টামেন্টে (বাইবেল) জিযয়াহ্‌ প্রথার প্রচলন :

    মাসিহ সিমোনকে বলেন : ‘হে সিমোন! বাদশাহ যাদের কাছ থেকে কর বা জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করে, তারা কি বাদশাহর প্রজাভুক্ত, না পরদেশি? পিটার্‌স তাকে বললেন : তারা পরদেশি। যিশু তাকে বললেন: তবে তাদের সন্তানেরা স্বাধীন।’ [মথি ১৭ : ২৪-২৫]

    নবীগণ যখন আল্লাহর ইচ্ছা ও তার সাহায্যে কোন দেশের উপর বিজয় লাভ করেছেন, তখন তারা পরাজিত জাতির উপর জিযয়াহ্‌ আরোপ করেছেন, এমনকি তাদেরকে দাসে পরিণত করেছেন, যেমন নবী যশোয়া বিজয় লাভ করে কিনআনীদের দাসে পরিণত করেছেন:(ফিলিস্তিনের) ‘গেজের’-নিবাসী কিনআনীদেরকে তারা তাড়িয়ে দেন নি, বরং তারা আজ পর্যন্ত ‘এফ্রাইম’ -এর মধ্যে বসবাস করছে, তারা জিযয়াহ্‌ প্রদান করে দাসত্ব মেনে নিয়েছিল। [যশোয়া ১৬ : ১০] নবী যশোয়া তাদের উপর দাসত্ব এবং জিযয়াহ্‌ উভয় আরোপ করেন।

    খ্রিষ্টধর্ম ইহুদি ধর্মে কোন পরিবর্তন আনে নি, বরং ইহুদি-ধর্মের পূর্ণতা দান করার জন্য ঈসা আলাইহিস সালাম আগমন করেছেন। [দেখুন, মথি ৫ : ১৭] তাই আমরা বলতে পারি, ইহুদি-ধর্মে প্রচলিত জিযয়াহ্‌ প্রথা খ্রিষ্টধর্মেও বিদ্যমান ছিল। অধিকন্তু মাসিহ তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা রোমানদের জিযয়াহ্‌ প্রদান করে, তিনি নিজে তা সবার আগে প্রদান করেছেন। যেমন তিনি সিমোনকে বলেছেন : ‘তুমি সমুদ্রে গিয়ে বড়শি ফেল এবং প্রথম যে মাছটি ধরা পড়ে তা হাতে নাও, মাছটির মুখ খুলে তুমি তার মধ্যে মুদ্রা পাবে, তা নিয়ে তুমি আমার ও তোমার পক্ষ থেকে তাদেরকে (রোমান) প্রদান কর।’ [মথি ১৭ : ২৪-২৭]

    ইহুদিরা যখন (বাইবেলের ভাষ্যমতে) জিযয়াহ্‌ প্রদানের ব্যাপারে তার (মাসিহের) অভিমত জানতে চায়, তখন তিনি জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা সিজারের অধিকার স্বীকার করেন। তার কাছে তাদের ছাত্রদের হেরোদের সাথে এ মর্মে প্রেরণ করে : ‘হে শিক্ষক, আমরা জানি আপনি সত্যবাদী, আর আপনি আল্লাহর দীন সম্পর্কে সত্য-শিক্ষা দেন, আপনি কারো পরোয়া করেন না, কারণ আপনি মানুষের চেহারার দিকে তাকান না। আপনি আমাদেরকে বলুন আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে, সিজারকে জিযয়াহ্‌ প্রদান করা বৈধ কি না? … তিনি বললেন : এ-প্রতিকৃতি ও এ-লেখা কার? তারা বলল : সিজারের। তিনি বললেন : যা সিজারের, তা সিজারকে প্রদান কর, আর যা আল্লাহর, তা আল্লাহকে প্রদান কর।’ [মথি ২২ : ১৬-২১]

    রোমানদের পক্ষ থেকে যারা জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করত, তাদের সাথে উঠাবসা করা ও তাদেরকে ভালবাসা মাসিহ কোনরূপ দোষণীয় মনে করেন নি। [মথি ১১ : ১৯] এমনকি তিনি কর-আদায়কারী মথিকে তার বার শিষ্যের একজন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। [মথি ৯ : ৯]

    নিউ-টেস্টামেন্টের মতে বাদশাহদেরকে জিযয়াহ্‌ প্রদান করা একটি বৈধ অধিকার; বরং এটাকে পবিত্র এবং ধর্মীয় কাজ মনে করা হয়েছে। যেমন পল বলেন : ‘প্রত্যেকের উচিত বাদশাহর অধীনতা মেনে নেওয়া, ... কারণ বাদশাহি ও ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত। যে কেউ এ-বিধানকে অস্বীকার করে, সে আল্লাহ্‌ যা নিয়োগ করেছেন তার বিরোধিতা করে। আর যারা তেমন বিরোধিতা করে, তারা নিজেদের উপর শাস্তি অবধারিত করে। ... কারণ, সে আল্লাহর প্রতিনিধি; যে খারাপ কর্ম করে, তার থেকে ক্রোধের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। সুতরাং তার অধীনতা মেনে নেয়া আবশ্যক, শুধু ক্রোধের ভয়ে নয়, বরং সদ্বিবেকের খাতিরেই তার অধীনতা মেনে নেয়া আবশ্যক। এ জন্য তোমরা তাকে জিযয়াহ্ও প্রদান করে থাক, কারণ তারা আল্লাহর নিযুক্ত সেবক, তাদের উপর প্রদত্ত কাজই তারা করে যায়। অতএব যার যা প্রাপ্য, তা তাকে দাও; যাকে জিযয়াহ্‌ দিতে হয়, তাকে জিযয়াহ্‌ প্রদান কর; যাকে কর দিতে হয়, তাকে কর প্রদান কর; যাকে ভয় করা উচিত তাকে ভয় কর; যাকে সম্মান করতে হয়, তাকে সম্মান কর।’ [রোমীয় ১৩ : ১-৭]

    তৃতীয়ত : ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান :

    ইসলাম সহজ ও সরল একটি দীন, এ দীন সকলের অধিকার যথাযথ সংরক্ষণ করেছে এবং সবাইকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করেছে, কি মুসলিম কি অমুসলিম কারো উপরই সে অনৈতিক কিছু চাপিয়ে দেয় নি, বরং পূর্বের দীনে বিদ্যমান কঠিন ও কষ্টকর বিধানগুলো সংস্কার ও পরিশুদ্ধ করে মানব জাতিকে উন্নত ও পরিমার্জিত করেছে। এটাই তার স্বাভাবিক রীতি ও বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের আলোকে ইসলাম জিযয়াহ্‌ প্রথার মধ্যেও সংশোধনী এনেছে, তা শুধু করের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে নি, যা পরাজিতরা বিজয়ীদের প্রদান করে, বরং তাকে একটি চুক্তিতে রূপান্তরিত করেছে, যা মুসলিম এবং তাদের অধীনতা স্বীকারকারী সম্প্রদায়ের মাঝে সম্পাদিত হয়। এটা উভয়পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি, যা রক্ষা করা এবং যার প্রতি সম্মান দেখানোর নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন, যারা তা ভঙ্গ করে ও তার অধিকার বিনষ্ট করে তাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। ইসলামের দেয়া ‘আহলে যিম্মাহ’ পরিভাষার ফলে তা আরও স্পষ্ট হয়, কারণ এ যিম্মাহ ভঙ্গ করা হারাম, পূর্ণ করা ওয়াজিব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যিম্মাহ সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অধিকন্তু যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম, কেবল তাদের উপরই জিযয়াহ্‌ আরোপ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

    (قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ) (سورة التوبة: 29)

    ‘তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযয়াহ্‌ দেয়।’ [সূরা আত-তাওবাহ্ : ২৯]

    ইমাম কুরতুবি বলেছেন : ‘আমাদের আলেমগণ বলেছেন : কুরআনের ভাষ্যমতে তাদের থেকেই জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা হবে, যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত যে, জিযয়াহ্‌ শুধু স্বাধীন সাবালক পুরুষ থেকে গ্রহণ করা হবে, অর্থাৎ যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম। নারী, বাচ্চা, দাস, পাগল ও খুব বৃদ্ধ ব্যক্তি থেকে জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা যাবে না।[2]

    ওমর রা. সেনা প্রধানদের নিকট এ মর্মে নির্দেশ জারি করেন : ‘নারী ও বাচ্চাদের উপর জিযয়াহ্‌ নির্ধারণ করবে না, যারা সাবালক হয়েছে একমাত্র তাদের উপরই জিযয়াহ্‌ নির্ধারণ করবে।[3]

    আবার জিযয়াহ্‌র পরিমাণও এতো বেশি ছিল না যে, পুরুষরা তা আদায় করতে অক্ষম, বরং তা খুবই কম ও সহজ ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যার পরিমাণ বাৎসরিক এক দিনারের বেশি ছিল না। উমাইয়া খিলাফতকালে যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক চার দিনার।

    ইয়ামানে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিনিধি মু‘আয রা. প্রত্যেক সাবালক থেকে এক দিনার করে জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন : ‘ইয়ামানে প্রেরণকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন : ত্রিশটি গরু থেকে একটি এক বছরের বাছুর এবং চল্লিশটি গরু থেকে একটি দুই বছরের বাছুর গ্রহণ করবে। (উল্লেখ্য, মুসলিমদের উপর নির্ধারিত যাকাতের পরিমাণও তাই) আর প্রত্যেক সাবালকের উপর এক দিনার অথবা তার সমপরিমাণ কাপড় জিযয়াহ্‌ আরোপ করার নির্দেশ দিয়েছেন’।[4]

    ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর যুগে স্বর্ণকারদের উপর চার দিনার এবং রৌপ্যকারদের উপর চল্লিশ দিরহাম জিযয়াহ্‌ ধার্য ছিল, এর সাথে ছিল মুসলিমদের উপর সদকা করা এবং কমপক্ষে তিন দিন তাদের মেহমানদারি করা’।[5]

    এক : যিম্মিদের উপর অত্যাচারের ব্যাপারে সতর্কবাণী :

    আল্লাহ তা‘আলা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ে যিম্মিদের সাথে সদ্ব্যবহার ও তাদের প্রতি ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামি শরি‘আত তাদের উপর যুলম ও সীমালঙ্ঘনকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। যেসব কিতাবি সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ, যারা মুসলিমদের উপর সীমালঙ্ঘন করে না, তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও ইহসান প্রদর্শনের জন্য কুরআন উদ্বুদ্ধ করেছে। ইরশাদ হচ্ছে :

    )لا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ) (سورة الممتحنة: 8(

    ‘দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।’ [সূরা আল-মুমতাহানা : ৮]

    পারস্পরিক সম্পর্কের সর্বোত্তম আদর্শকে আরবিতে البر (আল-বিরর) বলে। পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা এ শব্দই কুরআনে ব্যবহার করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন : (( البر حسن الخلق )) ‘সদ্ব্যবহারই বিরর।[6]’ যিম্মিদের সাথেও সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে এ البر (বিরর) শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে কুরআনে।

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিম্মিদের উপর যুলম ও তাদের অধিকার খর্ব করা সম্পর্কে বলেন : যে কেউ কোন চুক্তিবদ্ধ লোকের উপর যুলম করল, অথবা তার অধিকার খর্ব করল, অথবা সামর্থের অতিরিক্ত তার উপর বোঝা চাপিয়ে দিল, অথবা তার থেকে জবরদস্তি কিছু গ্রহণ করল, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে অবস্থান নেব।’[7]

    তিনি আরো বলেন : ‘যে ব্যক্তি কোন চুক্তি বদ্ধকে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুঘ্রান পাবে না, অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও জান্নাতের সুঘ্রান পাওয়া যায়।’[8]

    মুসলিমদের কেউ যখনই যিম্মিদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, মুসলিম আলেমগণ তার জোরালো প্রতিবাদ করেছে। যেমন হিশাম ইবন হাকিম ইবন হিযামের ঘটনা, একদা তিনি নাবাত্বি (শাম-দেশীয় অনারব কৃষক) সম্প্রদায়ের কতিপয় লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, যাদেরকে জিযয়াহ্‌ না দেয়ার কারণে রৌদ্রে দাঁড় করে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন : তাদের অপরাধ কি? তারা বলল : জিযয়াহ্‌র কারণে তাদেরকে রৌদ্রে দাঁড় করে রাখা হয়েছে। হিশাম বলেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি : ‘আল্লাহ তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি দেবেন, দুনিয়াতে যারা মানুষকে শাস্তি দেয়। তিনি বলেন : তখন তাদের আমির উমাইর বিন সা‘দ ফিলিস্তিনে ছিল, তিনি তার কাছে যান এবং তার সাথে কথা বলেন, ফলে আমির তাদেরকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন, তারা মুক্ত হয়’[9]

    আয়াতে বর্ণিত وهم صاغرون এর অর্থ :

    আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও ইনসাফের যে দীক্ষা দেখেছি এবং তাদের উপর অন্যায় আচরণ ও যুলম করার যে সতর্কবাণী পড়েছি, কুরআনে বর্ণিত وهم صاغرون দ্বারা তা-ই উদ্দেশ্য, অন্য কোন আচরণ বুঝানো হয়নি। আলেমগণ এটাই বুঝেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন : এর অর্থ তাদের উপর ইসলামি সাধারণ বিধান আরোপ করা হবে। মূলত জিযয়াহ্‌ এটাই প্রমাণ করে যে, পরাজিত জাতি বিজয়ী জাতির অধীনতা মেনে নিয়েছে।

    ইবনে আব্বাস রা.-এর মাওলা তাবেয়ি ইকরিমা রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন : এটা জিযয়াহ্‌ প্রদানের একটি অবস্থা, যেমন তিনি বলেন : ‘জিযয়াহ্‌ প্রদানকারী দাঁড়িয়ে জিযয়াহ্‌ প্রদান করবে, আর গ্রহণকারী বসাবস্থায় তা গ্রহণ করবে।’ কারণ দাতার হাত উত্তম, তাই দেয়ার সময়ও তাদেরকে গ্রহণকারীদের শ্রেষ্ঠত্ব মানতে বাধ্য করা হয়েছে, যেন তারা জিযয়াহ্‌ প্রদানের সময় দাতা হিসেবে নিজেদের উত্তম মনে করতে না পারে।

    কুরতুবি রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন : ‘আল্লাহ তা‘আলা সদকার ক্ষেত্রে দাতার হাতকে উত্তম ঘোষণা দিয়েছেন, আর জিযয়াহ্‌র ক্ষেত্রে উত্তম ঘোষণা দিয়েছেন গ্রহণকারীর হাতকে ।[10]

    দুই. ইসলামি রাষ্ট্রে যিম্মি চুক্তির কিছু পরিভাষা :

    ইসলাম যিম্মিদেরকে নিরাপত্তাসহ এমন কিছু অধিকার প্রদান করেছে, মানব ইতিহাসে অন্য কোন ধর্ম ও আদর্শে যার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই, ভবিষ্যতেও ইসলাম ও মুসলিম ব্যতীত অন্য কোনো মতবাদ বা ব্যক্তি এরূপ নমুনা পেশ করতে সক্ষম হবে না। অথচ এ অধিকার ও নিরাপত্তা সামান্য অর্থের বিনিময়ে তারা ভোগ করে, যা শুধু যুদ্ধে সক্ষম যিম্মিরাই আদায় করে। তারা মুসলিমদের পক্ষ থেকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা লাভ করে, অধিকন্তু তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মের নিরাপত্তা তো আছেই।

    মুসলিম খলিফাগণ গভর্নরদের প্রতি যে নির্দেশ জারি করেছেন, তাতে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিদ্যমান, যার চাক্ষুষ সাক্ষী মুসলিম ও যিম্মিদের মাঝে সম্পাদিত চুক্তি। আমি এখানে সম্মানিত পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, আপনারা একটু লক্ষ্য করুন, মুসলিমগণ কতটুকু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়ভার কাঁধে নিয়েছে এবং তার মোকাবিলায় যিম্মিরা কি পরিমাণ জিযয়াহ্‌ প্রদান করেছে।

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিম্মিদের সাথে যে চুক্তি করেছেন, ইতিহাস থেকে আমি সর্বপ্রথম তাই উল্লেখ করছি। ইবনে সা‘দ স্বীয় গ্রন্থ ‘তাবকাতে’ রাবি‘আ আল-হাদ্‌রামিকে লেখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি চিঠির বর্ণনা দেন, সেখানে তিনি বলেন : ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাবি‘আ ইবন্‌ যি-মারহাব আল-হাদ্‌রামি এবং তার ভাই ও চাচা-মামাদের প্রতি লেখেন যে, হাদ্‌রামাউতে বিদ্যমান তোমাদের সম্পদ, খেজুর-গাছ, গোলাম, কুঁপ, বৃক্ষরাজি, পুকুর, ঘাট, কৃষি-জমি ও সেচের নালা এবং যি-মারহাব বংশের সকল সম্পদ তোমাদেরই থাকবে। আর তোমাদের বন্ধক রাখা জমির ফল, গাছ ইত্যাদি বন্ধকের অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তোমাদের উত্তম সম্পদ সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞাসা করবে না, তা থেকে আল্লাহ ও তার রাসূল সম্পূর্ণ মুক্ত। আর জি-মারহাব বংশকে সাহায্য করা সকল মুসলিমের কর্তব্য। তাদের জমি, সম্পদ ও জীবন নিরাপদ, তাদের উপর কোন যুলম করা হবে না। ...।[11]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ‘জি-মারহাব বংশের সুরক্ষার দায়িত্ব সকল মুসলিমের উপর।’ এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, মুসলিমগণ তাদের জীবন, রূহ ও রক্ত তাদের জন্য উৎসর্গ করবে, যারা তাদের অধীনতা মেনে নেবে ও তাদের যিম্মার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নিশ্চয় এটা হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসূলের যিম্মা এবং চুক্তি। কারাফি বলেন : ‘এটা এমন একটি চুক্তি যা বাস্তবায়ন করার জন্য জীবন ও সম্পদ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে হয়, নিশ্চয় এটা একটি সম্মানিত চুক্তি।[12]

    অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজরানের নাসারাদের সাথে যিম্মি চুক্তি সম্পাদন করেছেন। ইবনে সাদ স্বীয় গ্রন্থ ‘তাবকাতে’ বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসকাফ ইবন হারেস ইবন কাব, নাজরানের সর্দার, তাদের যাজক ও যাজকদের অনুসারী এবং তাদের সংসারবিমুখদের উদ্দেশ্যে চিঠিতে লিখেন, যার যে সম্পদ রয়েছে তার মালিক সেই, তোমাদের গীর্জা, উপাসনালয় এবং সংসারবিরাগী ব্যক্তিবর্গ আল্লাহ ও তার রাসূলের যিম্মায়। কোন দায়িত্বশীলকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে না, কোন সংসারবিরাগীকে তার অধ্যবসায় থেকে বিরত রাখা হবে না, কোন যাজককে তার পেশা থেকে বঞ্চিত করা হবে না, তাদের কোন অধিকার খর্ব করা হবে না, তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হবে না, তাদের অবস্থাতেই তাদেরকে বিদ্যমান রাখা হবে, যে পর্যন্ত তারা মুসলিমদের শুভ কামনা করে, নিজেদের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে এবং যুলুম ও অন্যায় পরিহার করে।[13]

    পরবর্তীতে সাহাবাগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও আদর্শই বাস্তবায়ন করেছেন। তারা যিম্মিদের যে দায়ভার নিয়েছেন, তার বেশ কিছু নমুনা ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন। উদাহরণত এখানে পেশ করা যায় ওমর রা.-এর চুক্তি, যা তিনি কুদসবাসীদের জন্য লিখেছিলেন, তাতে রয়েছে :

    "بسم الله الرحمن الرحيم ؛ هذا ما أعطى عبد الله عمر أمير المؤمنين أهل إيلياء من الأمان ، أعطاهم أماناً لأنفسهم وأموالهم ، ولكنائسهم وصلبانهم وسقيمها وبريئها وسائر ملتها، أن لا تُسكن كنائسهم ولا تُهدم ولا يُنتقص منها ولا من حيزها ، ولا من صليبهم ولا من شيء من أموالهم . ولا يكرهون على دينهم، ولا يُضار أحد منهم ، ولا يُسَكَّن بإيلياء معهم أحد من اليهود ، وعلى أهل إيلياء أن يعطوا الجزية كما يعطي أهل المدائن، وعليهم أن يُخرجوا منها الروم واللصوص ، فمن خرج منهم فإنه آمن على نفسه وماله حتى يبلغ مأمنه ، ومن أقام منهم فهو آمن، وعليه مثل ما على أهل إيلياء من الجزية ...ومن شاء سار مع الروم ، ومن شاء رجع إلى أهله فإنه لا يؤخذ منهم شيء حتى يحصد حصادهم. وعلى ما في هذا الكتاب عهد الله وذمة رسوله وذمة الخلفاء وذمة المؤمنين إذا أعطوا الذي عليهم من الجزية ، شهد على ذلك خالد بن الوليد ، وعمرو بن العاص ، وعبد الرحمن بن عوف، ومعاوية بن أبي سفيان ، وكتب وحضر سنة خمس عشرة".

    অর্থ : ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, ইলিয়াবাসীদের প্রতি আমিরুল মুমিনিন ওমরের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, ওমর তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছে তাদের জীবন ও সম্পদের, গীর্জা ও ক্রুসের এবং তাতে বসবাসকারী সুস্থ, অসুস্থ এবং সকল ধর্মের অনুসারীদের। তাদের গীর্জাগুলো বর্ধিত কিংবা ধ্বংস করা হবে না, তার কোন অংশ কিংবা তার সীমানা ছোট করা হবে না, তাদের উপাসনালয় কিংবা তাদের কোন সম্পদ দখল করা হবে না, তাদের কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা হবে না, তাদের কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, ইলিয়াতে তাদের সাথে কোন ইহুদি থাকতে পারবে না, মাদায়েনবাসী যেরূপ জিযয়াহ্‌ প্রদান করে, তারাও অনুরূপ জিযয়াহ্‌ প্রদান করবে। তাদের দায়িত্ব চোর ও রোমকদের ইলিয়া থেকে বের করে দেয়া, তাদের থেকে যে চলে যাবে, গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত তার জান ও মাল নিরাপদ থাকবে, এখানে যে অবস্থান করবে সে নিরাপদ, তবে তার উপর জিযয়াহ্‌ প্রদান করা আবশ্যক, যেরূপ ইলিয়াবাসী জিযয়াহ্‌ প্রদান করে। যার ইচ্ছা রোমকদের সাথে চলে যাবে, যার ইচ্ছা এখানে চলে আসবে, তাদের কারো থেকে কিছু গ্রহণ করা হবে না, যতক্ষণ না তারা ক্ষেতের ফসল তুলে। এ যিম্মা আল্লাহ ও তার রাসূল এবং খলিফা ও মুমিনদের পক্ষ থেকে, যে পর্যন্ত তারা জিযয়াহ্‌ প্রদান করে। এর সাক্ষী খালেদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান।[14]’ লুদবাসীদের জন্যও ওমর রা. অনুরূপ চুক্তি লিখে দেন।[15]

    খালেদ বিন ওয়ালিদ যখন দিমাশক জয় করেন, তখন তিনিও তার অধিবাসীদের জন্য অনুরূপ চুক্তিনামা লিখেন, যেমন :

    "بسم الله الرحمن الرحيم ، هذا ما أعطى خالد بن الوليد أهل دمشق إذا دخلها أماناً على أنفسهم وأموالهم وكنائسهم وسور مدينتهم لا يهدم، ولا يسكن شيء من دورهم ، لهم بذلك عهد الله وذمة رسول الله صلى الله عليه وسلم والخلفاء والمؤمنين، لا يُعرض لهم إلا بخير إذا أعطوا الجزية".

    অর্থ : ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, এটা খালেদ বিন ওয়ালিদের পক্ষ থেকে দিমাশকবাসীদের জন্য নিরাপত্তা প্রদান, তারা যখন এ চুক্তিতে প্রবেশ করবে, জান, মাল ও গীর্জার নিরাপত্তা ভোগ করবে, তাদের নগরের সীমানা পরিবর্তন করা হবে না, তাদের ঘর-বাড়িতে কাউকে বসতি স্থাপন করানো হবে না। এর মাধ্যমে তাদের জন্য থাকবে আল্লাহর অঙ্গীকার, আর তাঁর রাসূল এবং খলিফা ও মুমিনদের পক্ষ থেকে, তাদের সাথে সদাচারণ করা হবে, যে পর্যন্ত তারা জিযয়াহ্‌ প্রদান করে।[16]

    উবাদা বিন সামেত যখন কিবতিদের সর্দার মুকাউকিসের নিকট ইসলামের বর্ণনা দেন, তখন তিনি জিযয়াহ্‌ সম্পর্কে ইসলামের এ আদর্শ উল্লেখ করেন, তিনি বলেন : ‘যদি তোমরা ইসলামের আহ্বানে সাড়া দাও, তুমি ও তোমার সাথীবৃন্দ তা কবুল কর, তাহলে তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করবে, আর আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকব, তোমাদের কষ্ট দেয়া ও পিছু নেয়া আমাদের জন্য হারাম। আর যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ না করে জিযয়াহ্‌ প্রদানে সম্মত হও, তাহলে তোমরা আমাদেরকে জিযয়াহ্‌ প্রদান কর, আমাদের অধীনতা মেনে নাও। প্রতি বছর আমরা তোমাদের সাথে সে আচরণ করব, যার প্রতি থাকবে আমাদের ও তোমাদের সন্তুষ্টি, যতদিন আমরা উভয়ে জীবিত থাকি। যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তোমাদের জমি, রক্ত ও সম্পদের পিছু নেবে, আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব এবং তোমাদের প্রতিনিধিত্ব করব, যতক্ষণ তোমরা আমাদের যিম্মায় থাকবে, এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য অঙ্গীকার রইল।[17]

    এখানে একটি বিষয়ের প্রতি আমরা দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দেই, একজন মুসলিম কিভাবে যিম্মিদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে এবং তার জন্য সে নিজের জান ও মাল কুরবান করে দেয়। যেমন তিনি বলেছেন : ‘যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে, তোমাদের জমি, রক্ত ও সম্পদের পিছু নেবে, আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব এবং তোমাদের পক্ষে আমরা তাদের মোকাবিলা করব।’

    তিন. যিম্মি চুক্তি বাস্তবায়নে মুসলিমদের যত্ন ও গভীর মনোযোগ।

    যেন কোন মুসলিম যিম্মিদের অধিকার বিনষ্ট না করে এ ব্যাপারে খলিফাগণ সতর্ক থাকতেন এবং বরাবর খোঁজখবর নিতেন। তাবারি তার তারিখে উল্লেখ করেন, যিম্মিদের একটি দল ওমর রা.-এর নিকট আগমন করলে, তিনি তাদেরকে বলেন : ‘হয়তো মুসলিমরা তোমাদের কষ্ট দেয় এবং তাদের কিছু আচরণের কারণে তোমাদের অধিকার খর্ব হয় ? তারা বলল : না, আমরা ওয়াদার বাস্তবায়ন ও সুন্দর আচরণই ভোগ করছি।[18]

    ওমর রা.-এর নিকট যখন ট্যাক্সের সম্পদ পেশ করা হয়, তিনি তার উসুল প্রক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, যেন কেউ এর জন্য যুলম ও অবিচার না করে। যেমন তার একটি ঘটনা : ‘একবার তার কাছে অনেক সম্পদ আসলো, মনে হচ্ছে ... জিযয়াহ্‌ থেকে, তখন তিনি বললেন : আমার ধারণা তোমরা মানুষদের ধ্বংস করেছ ? তারা বলল : না, আল্লাহর শপথ আমরা সন্তুষ্টি চিত্ত্বে ও অধিরিক্ত সম্পদ থেকেই গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন : শাস্তি ও হুমকি ব্যতীত ? তারা বলল : হ্যাঁ। তিনি বললেন : আল্লাহর প্রশংসা, তিনি আমার হাতে, আমার রাজত্বে যুলম ও অন্যায়ের সম্পদ জমা করেন নি।[19]

    ওমর রা. যিম্মিদের অধিকারের বিষয়টি শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং পরবর্তী খলিফাদের পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে অসিয়ত করে গেছেন। তিনি বলেন : ‘আমার পরবর্তী খলিফাদের অসিয়ত করছি, তারা যেন যিম্মিদের কল্যাণ কামনা করে, তাদের সাথে কৃত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে, তাদের সুরক্ষার জন্য জিহাদ করে এবং তাদের উপর সামর্থের অধিক বোঝা না চাপায়।[20]

    আলী রা. তার প্রত্যেক গভর্নরকে খাজনার বিষয়ে লিখেন : ‘তাদের নিকট তুমি যখন যাবে, (খাজনা আদায়ের জন্য) তাদের শীত বা গ্রীষ্মকালীন কোন পোশাক বিক্রি করবে না, তাদের খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করবে না, তাদের পশু বিক্রি করবে না, যা দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করে এবং এক দিরহামের জন্য কাউকে শাস্তি দেবে না, এক দিরহামের জন্য কাউকে পায়ের উপর দাঁড় করে রাখবে না, খাজনার জন্য তাদের কোন জিনিস বিক্রি করবে না, কারণ আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, তুমি যদি আমার এ নির্দেশ অমান্য কর, তাহলে আমার অবর্তমানে আল্লাহ তোমাকে পাকড়াও করবেন, আর যদি আমি জানতে পারি, তাহলে আমি তোমাকে বরখাস্ত করব।[21]

    ওয়ালিদ ইবন ইয়াজিদ সাইপ্রাস থেকে নাসারাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল, এ আশঙ্কায় যে তারা রোমকদের সাহায্য করতে পারে, পরবর্তীতে তার ছেলে ইয়াজিদ ইবন ওয়ালিদ খলিফা হয়ে তাদেরকে ফিরিয়ে আনেন। ইসমাইল ইবন আইয়াশ ওয়ালিদের কর্ম সম্পর্কে বলেন : ‘মুসলিমরা ওয়ালিদের তাড়িয়ে দেয়াকে ভাল চোখে দেখেনি, আলেমগণও এটাকে বড় অন্যায় হিসেবে দেখেছেন। পরবর্তীতে ইয়াজিদ ইবন ওয়ালিদ খলিফা হয়ে তাদেরকে যখন ফিরিয়ে আনেন, মুসলিমরা তার কর্মকে সুনজরে দেখেন এবং এটাকে ইনসাফ বলেন।[22]

    খলিফা আব্দুল মালিক নাসারাদের থেকে ইউহোন্না গীর্জা জোরপূর্বক গ্রহণ করে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, মুসলিমরা এটা আত্মসাৎ হিসেবেই গণ্য করেছে, পরবর্তীতে যখন ওমর ইবন আব্দুল আজিজ খলিফা হন, তার নিকট নাসারাগণ অভিযোগ করেন, ফলে তিনি গভর্নরকে নির্দেশ দেন, গীর্জার যে অংশ মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, তা ফেরৎ দেয়ার জন্য।[23]

    চার. যিম্মিদের নিরাপত্তা বিধান ও তাদের অধিকার সুরক্ষা সম্পর্কে মুসলিম আলেমদের বাণী :

    আমরা পূর্বে দেখেছি ইসলাম যিম্মিদের অধিকার এবং তাদের ধর্ম ও উপাসনালয়ের অধিকার স্বীকার করে। قوانين الأحكام الشرعية গ্রন্থে রয়েছে : দ্বিতীয় মাসআলা : আমাদের কর্তব্য যাযিরাতুল আরব তথা হিজাজ ও ইয়ামান ব্যতীত আমাদের দেশের অন্যান্য স্থানে তাদেরকে বসবাস করার সুযোগ প্রদান করা, আমরা তাদের পিছু নেব না এবং চুক্তি মোতাবিক তাদের জান ও মালের সুরক্ষা দেব, আমরা তাদের গীর্জা, মদ ও শূকরের ব্যাপারে বাধা দেব না, যদি তারা প্রকাশ্যে না করে।[24]

    যিম্মিরা মদ পান, শূকর ভক্ষণ ও তাদের ধর্মে হালাল বস্তুর ব্যাপারে স্বাধীনতা ভোগ করবে, এ সম্পর্কে ইমাম তাহাবি রহ. ইজমা ও মুসলিমদের ঐক্য নকল করেছেন। তিনি বলেন : ‘তারা এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিম আমির যিম্মিদেরকে মদ পান, শূকর ভক্ষণ এবং যেসব ঘর-বাড়ির ব্যাপারে তারা চুক্তি বদ্ধ হয়েছে, সে ব্যাপারে তাদেরকে নিষেধ করতে পারবে না, যদি সেখানে মুসলিম বসবাস না করে। (অর্থাৎ যে শহরে যিম্মিরাই আধিক।)[25]

    ইসলামি শরিআত যিম্মির জান ও মাল সংরক্ষণ করেছে এবং তাকে হত্যাকারীর উপর কিসাসের বিধান রেখেছে। আলি রা. এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তিকে যিম্মি হত্যার দায়ে পাকড়াও করা হয়, তিনি তার উপর কিসাসের বিধান জারি করেন। মৃত ব্যক্তির ভাই এসে কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) গ্রহণ করতে সম্মত হয়। আলি রা. তাকে বলেন : খুব সম্ভব তারা তোমাকে বয়কট করেছে, অথবা শাসিয়েছে, অথবা ধমক দিয়েছে ? সে বলল : না, বরং আমি নিজেই দিয়াত গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছি, কারণ আমি জানি এ ব্যক্তিকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না, আলি রা. হত্যাকারীকে ছেড়ে দেন এবং বলেন : তুমি ভাল করেই জান, যে ব্যক্তি আমাদের যিম্মায় থাকে, তার রক্ত আমাদের রক্তের ন্যায় এবং তার দিয়াত আমাদের দিয়াতের ন্যায়।[26]

    ইসলামি শরিআত যিম্মি ও মুসলিমের সম্পদে কোন পার্থক্য করেনি, তার দিকে প্রসারিত হাত ইসলাম কর্তন করে দেয়, যদিও সে হাতটি হয় কোন মুসলিমের। বিশিষ্ট তাফসিরকারক কুরতুবি রহ. বলেন : ‘যিম্মির রক্ত সবসময় হারাম ও নিরাপদ, মুসলিমের রক্তও অনুরূপ। তারা উভয়ে দারুল ইসলামের অধিবাসী। তাই যিম্মির সম্পদ চুরি করার ফলে মুসলিমের হাত কর্তন করা হবে। এর মাধ্যমেই প্রমাণ হয় যে, যিম্মির সম্পদ মুসলিমের সম্পদের ন্যায়, উভয়ের রক্তও সমান, সম্পদের এ সম্মান মালিক সম্মানিত বলেই।[27]

    ইমাম মাওয়ারদি রহ. বলেন : ‘ইমামের কর্তব্য তাদের দুইটি অধিকার সংরক্ষণ করা : এক. তাদের থেকে বিরত থাকা। দুই. তাদেরকে সুরক্ষা দেয়া। তাদের থেকে বিরত থাকার ফলে তারা নিরাপত্তা ভোগ করবে, আর তাদেরকে সুরক্ষা দিলে তারা সংরক্ষিত থাকবে।[28]

    ইমাম নববি রহ. বলেছেন : ‘আমাদের কর্তব্য তাদের থেকে বিরত থাকা এবং জান ও মালের ক্ষতির সম্মুখীন হলে তার ক্ষতিপুরণ দেয়া, আর তাদের সাথে যারা যুদ্ধ করতে চায়, তাদেরকে প্রতিহত করা।[29]

    ইসলামের অধিকাংশ বিদ্যানগণ যিম্মির বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। ইবনুন নাজ্জার আল-হাম্বলি বলেন : ‘ইমামের কর্তব্য যিম্মিদের সংরক্ষণ করা, তাদের যারা কষ্ট দেয় তাদেরকে বাধা দেয়া, তাদের বন্দিদের মুক্ত করা ও তাদের সাথে যারা অনিষ্টের ইচ্ছা করে, তাদেরকে প্রতিরোধ করা।[30]

    হিজরির অষ্টম শতাব্দির শুরুতে তাতারিদের আমির কুতুলুশাহ দামেশক আক্রমন করে মুসলিম, নাসারা ও কতক ইহুদি যিম্মিকে বন্দি করে নিয়ে যায়। ইবনে তাইমিয়াহ রহ. আলেমদের একটি বড় জামাতসহ তার কাছে গিয়ে বন্দিদের মুক্তি দাবি করেন, তিনি মুসলিম বন্দিদের ছেড়ে দিতে সম্মত হন, কিন্তু যিম্মিদের ছেড়ে দিতে রাজি হননি। শাইখুল ইসলাম তাকে বলেন : ‘আপনার কাছে বিদ্যমান সকল বন্দিদের ছেড়ে দিতে হবে, ইহুদি ও নাসারা সবাই আমাদের যিম্মায় ছিল, আপনার কাছে একজন বন্দিকেও আমরা রেখে যাব না, না কোন মুসলিম, না কোন যিম্মি। কারণ আমাদের মাঝে শর্ত রয়েছে, আমরা যা ভোগ করব, তারাও তা ভোগ করবে, আমরা যে মুসিবতে পতিত হব, তারাও তাতে অংশিদার হবে।’ অতঃপর তাতারি আমির সকল বন্দিদের মুক্ত করে দেন’।[31]

    ইমাম কারাফি ইমাম ইবন হাযম থেকে মুসলিমদের যে ঐক্য বর্ণনা করেছেন, ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মে যার কোন নজির নেই। তিনি বলেন : ‘আমাদের যিম্মায় বিদ্যমান কাউকে যদি দারুল হারবের কেউ নিতে আসে, আমাদের উপর ওয়াজিব তাকে অস্ত্র দিয়ে হলেও রক্ষা করা, তার জন্য মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া, আল্লাহ ও তার রাসূলের যিম্মায় বিদ্যমান ব্যক্তিকে এভাবেই রক্ষা করতে হয়, এর বিপরীতে তাকে তুলে দেয়া যিম্মা চুক্তি লঙ্ঘন করার শামিল।[32]

    পাঁচ. যিম্মিদের সাথে মুসলিমদের আচার ব্যবহারের কতিপয় নমুনা :

    মুসলিমগণ যখন যিম্মিদের অধিকার আদায় ও তাদের সুরক্ষা দিতে পারে নি, তখন তারা তাদের জিযয়াহ্‌ ফিরৎ দিয়েছিল, কারণ তারা জিযয়াহ্‌র শর্ত পুরণে সক্ষম ছিল না, অর্থাৎ তাদের সুরক্ষা দেয়া। কাজি আবু ইউসুফ ‘কিতাবুল খারাজ’ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন, আবু উবাইদার নিকট বিশ্বস্ত সূত্রে সংবাদ আসে যে, রোমকরা তাদের বিপক্ষে অভিযান পরিচালনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তিনি সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ জাতির নিকট রেখে যাওয়া প্রতিনিধিদের এ মর্মে ফরমান জারি করেন, জিযয়াহ্‌ ও খারাজ হিসেবে যে ট্যাক্স নেয়া হয়েছে, তা যেন ফেরৎ দেয়া হয়। তিনি তাদেরকে বলার নির্দেশ দেন : জিযয়াহ্‌ ফেরৎ দেয়ার কারণ এই যে, আমরা জানতে পেরেছি রোমকরা আমাদের জন্য বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করেছে, যাদের প্রতিরোধ করে তোমাদের সুরক্ষা দেয়ার সামর্থ আমাদের নেই, যে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব আমরা নিয়েছিলাম, তাই তোমাদের সম্পদ তোমাদেরকে ফেরৎ দিলাম। তবে আল্লাহ যদি আমাদের বিজয় দান করেন, তাহলে আমাদের উভয়ের শর্ত পুনরায় কার্যকর হবে।[33]

    আবার যিম্মিরা যখন দেশ রক্ষায় মুসলিমদের অংশিদার হয়েছিল, তখন মুসলিমরা তাদের থেকে জিযয়াহ্‌ মওকুফ করে দিয়েছিল। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লোরেন স্বীয় কিতাব "Armenia between Byzantium and Islam" এ উল্লেখ করেন : আর্মেনিয়রা বাইজেনটিয়ামদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সুন্দরভাবে স্বাগতম জানিয়েছে এবং খাযারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। আরবরা তাদের যে সম্পদ হস্তগত করেছিল এবং যার উপর দিয়ে তারা বিজয়ী বেশে হেঁটে গিয়েছিল, তা সব তাদের মালিকানায় পূর্ববৎ রেখে দিয়েছিল। থিয়োডর রখতুনি এবং তার সকল অনুসারীদের ৬৫৩ ইং সনে মু‘আবিয়া এ অঙ্গীকার প্রদান করেন, যে পর্যন্ত তারা এ সন্ধিতে থাকতে ইচ্ছুক। এ সন্ধিতে আরও ছিল : ‘তিন বছর তাদের থেকে কোন জিযয়াহ্‌ নেয়া হবে না, অতঃপর তারা চুক্তি অনুসারে জিযয়াহ্‌ প্রদান করবে এবং জিযয়াহ্‌র পরিবর্তে প্রয়োজন সাপেক্ষে তারা পনের হাজার অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা সাহায্য করবে। আর খলিফা আর্মেনীয়দের গোত্র প্রধানের নিকট কোন আমির, সেনা প্রধান, অশ্বারোহী ও কাজি প্রেরণ করবে না। রোমকরা যখন তাদের উপর চড়াও হবে, তখন তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। মুআবিয়া এ চুক্তির উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন।[34]

    যিম্মিদেরকে শুধু শত্রুদের থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, বরং কষ্টদায়ক সব কিছু থেকেই তাদের সুরক্ষা দিতে হবে, যদিও তা হয় একটি কথা। কারাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর তাদের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে, কারণ তারা আমাদের হিফাযত ও সুরক্ষায় বিদ্যমান। এ যিম্মা আমাদের, আল্লাহর এবং রাসূল ও ইসলামের যিম্মা। কোন বাক্য অথবা গিবত করে যারা তাদের উপর যুলম করল তারা আল্লাহর যিম্মা, রাসূলের যিম্মা ও দীন ইসলামের যিম্মা বিনষ্ট করল।[35]

    এখানেই শেষ নয়, বরং মুসলিমরা জিযয়াহ্‌র বিনিময়ে গরিব যিম্মিদের দান-সদকা দিয়ে যিম্মা চুক্তির হিফাযত করেছে। ইবন যানজুইয়া নিজ সনদে বর্ণনা করেন, ওমর ইবন খাত্তাব রা. এক যিম্মিকে দেখেন ভিক্ষা করছে, তিনি বলেন : তোমার থেকে জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করে আমরা যদি তোমার বার্ধক্য খেয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে তোমার উপর ইনসাফ হল না। অতঃপর ওমর রা. তার গভর্নরদের নিকট বৃদ্ধদের জিযয়াহ্‌ মওকুফ করা মর্মে পত্র লিখেন।[36]’ তিনি আরো নির্দেশ দেন : ‘যার জন্য জিযয়াহ্‌ কষ্টকর, তার উপর তোমরা শিথিল কর, আর যে অক্ষম তাকে তোমরা সাহায্য কর।[37]

    খলিফা ওমর ইবন আব্দুল আযিয বসরায় তার গভর্নর আদি ইবন আরতার নিকট এ মর্মে পত্র লিখেন : ‘তুমি তোমার পাশের যিম্মিদের লক্ষ্য কর, কার বয়স বেড়ে গেছে, শক্তি কমে গেছে ও কার উপার্জন হ্রাস পেয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন মোতাবিক বায়তুল মাল থেকে ভাতা নির্ধারণ কর।[38]

    তবে কোন যিম্মি যদি সামর্থ্য সত্বেও জিযয়াহ্‌ আদায় না করে, তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে, কিন্তু তার যিম্মা চুক্তি বাতিল করা হবে না। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন : ‘সামর্থ সত্বেও যদি যিম্মিরা জিযয়াহ্‌ আদায় না করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া বৈধ, তবে যার অপারগতা প্রমাণ হবে, তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না, কারণ অপারগ ব্যক্তির উপর জিযয়াহ্‌ মওকুফ, আর ধনীদেরকে বলা হবে না তোমরা গরিবদের জিযয়াহ্‌ প্রদান কর।[39]

    ইসলামি আইনজ্ঞরা জিযয়াহ্‌ ও জিযয়াহ্‌ বিষয়ে বাড়াবাড়িকে খুব গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন, তারা বলেছেন শুধু জিযয়াহ্‌ প্রদান থেকে বিরত থাকার কারণে যিম্মা চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে না। আল্লামা কাসানি হানাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর অবশ্য কর্তব্য, কোন অবস্থাতেই আমরা তা ভঙ্গ করতে পারি না, তবে তাদের ব্যাপারে এ চুক্তি জরুরী নয়।[40]

    চতুর্থত: পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের সাক্ষী :

    হয়তো কেউ বলতে পারে, মুসলিমরা কি এ যিম্মা রক্ষা করে তাদের নবীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছে ? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের তিনটি সাক্ষী উল্লেখ করছি, যা আমাদের মহান ঐতিহ্য।

    ওল ডোরান্ট বলেন : ‘যিম্মিরা তথা নাসারা, যরথুস্ত, ইহুদি ও সাবিয়গণ উমাইয়া খিলাফতের অধীন অনেক সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে, খ্রিষ্টান জগতে বর্তমান যুগে যার নজির নেই, তারা ধর্মের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীন ছিল, গীর্জা ও উপাসনালয়ের ব্যাপারে নিরাপদ ছিল, শুধু তাদেরকে একটি বিশেষ রঙের আলামত ব্যবহার করতে হয়েছিল এবং তাদের প্রত্যেকের উপর উপার্জন হিসেবে ট্যাক্স নির্ধারিত ছিল, যা সাধারণত দুই দিনার বা তিন দিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটা শুধু অমুসলিম যোদ্ধাদের উপর নির্ধারিত ছিল, এ থেকে পাদরি, নারী, নাবালক সন্তান, দাস, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, অন্ধ ও গরিবরা মুক্ত ছিল, তা সত্বেও যারা সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করত, তাদের উপর জিযয়াহ্‌ মওকুফ ছিল, তাদের উপর যাকাত ধার্য ছিল না, যার পরিমাণ বাৎসরিক আয়ের শতকরা আড়াই ভাগ, অধিকন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তাদেরকে হিফাযত করা।[41]

    ঐতিহাসিক ‘আদম মিতয’ স্বীয় কিতাব "Islamic Civilization" এ বলেন : ‘যিম্মিরা প্রত্যেকে তাদের সাধ্যমত জিযয়াহ্‌ প্রদান করত, এ জিযয়াহ্‌ রাষ্ট্র রক্ষার ট্যাক্সের অনুরূপ ছিল, শুধু সামর্থবানরাই তা প্রদান করত, অভাবী, যাজক কিংবা গীর্জায় অবস্থানকারীরা প্রদান করত না, তবে তাদের সামর্থ থাকলে ভিন্ন কথা।[42]

    স্যার টমাস আরনোল্ড স্বীয় কিতাব "Call to Islam" এ জিযয়াহ্‌ আরোপ করার উদ্দেশ্য এবং যাদের উপর জিযয়াহ্‌ আরোপ করা হয়েছে তাদের সম্পর্কে বলেন : ‘এ জিযয়াহ্‌ আরোপ করার উদ্দেশ্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার কারণে নাসারাদের এক প্রকার শাস্তি দেয়া কখনোই ছিল না, কতক গবেষকরা যেমন মনে করেন, বরং এটা তারা অন্যান্য যিম্মিদের ন্যায় আদায় করত। এরা ছিল অমুসলিম, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভোগের বিনিময়ে তারা এ জিযয়াহ্‌ প্রদান করত, যার যিম্মাদার ছিল মুসলিমের তলোয়ার।’

    ইতিহাস এবং নীতিবান অমুসলিম লেখকদের লিখনি থেকে এভাবেই প্রমাণিত হয় ইসলামের সাম্য ও মানবতা, ইসলাম সেসব দোষ-ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, অসাধু গবেষকগণ কল্পকাহিনীর ন্যায় ধারণার উপর নির্ভর করে যা রচনা করে।

    হে আল্লাহ ! মানুষেরা যা নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত, আমাদেরকে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়ার তাওফীক দান করুন।

    সমাপ্ত

    ১ আল-জামেউ লি আহকামিল কুরআন : (৮/১১৪), আল-মুগরিব ফি তারতিবিল মু‘রিব : (১/১৪৩), দেখুন মুখতারুস সিহাহ : (১/৪৪)

    [2] আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/৭২)

    [3] দেখুন : ইরওয়াউল গালিল, হাদিস নং : (১২৫৫)

    [4] তিরমিযি : হাদিস নং : (৬২৩), আবু দাউদ : হাদিস নং : (১৫৭৬), নাসায়ি : হাদিস নং : (২৪৫০), সহিহ তিরমিযিতে আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

    [5] মিশকাতুল মাসাবিহ : হাদিস নং : (৩৯৭০), আল-বানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

    [6] মুসলিম : হাদিস নং : (২৫৫৩)

    [7] আবু দাউদ : হাদিস নং : (৩০৫২)(৩/১৭০), আল-বানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন। অনুরূপ রয়েছে নাসায়িতে : হাদিস নং : (২৭৪৯)(৮/২৫)

    [8] বুখারি : হাদিস নং : (২২৯৫)

    [9] মুসলিম : হাদিস নং : (৩৬১৩)

    [10] আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/১১৫), তাফসীরুল মাওয়ারদি : (২/৩৫১-৩৫২)

    [11] তাবাকাতে ইবনে সাদ : (১/২৬৬)

    [12] আল-ফুরুক : (৩/১৪-১৫)

    [13] তাবকাতুল কুবরা লি ইবনে সাদ : (১/২৬৬)

    [14] তারিখে তাবারি : (৪/৪৪৯)

    [15] দেখুন : তারিখে তাবারি : (৪/৪৪৯)

    [16] ফুতুহুল বুলদান লিল বালাযুরি : (১২৮)

    [17] ফুতুহে মিসর ও আখবারুহা লি ইবন আব্দিল হাকাম : (৬৮)

    [18] তারিখে তাবারি : (২/৫০৩)

    [19] আল-মুগনি : (৯/২০৯), আহকামু আহলিয যিম্মাহ : (১/১৩৯)

    [20] বুখারি : হাদিস নং : (১৩৯২)(৩/১৩৫৬)

    [21] আল-খারাজ : (৯)

    [22] ফুতুহুল বুলদান : (১৫৬)

    [23] ফতুহুল বুলদান : (১৩২)

    [24] কাওয়ানীনুল আহকামিশ শারঈয়্যাহ : (১৭৬)

    [25] ইখতিলাফুল ফুকাহা : (২৩৩)

    [26] মুসনাদুশ শাফে‘য়ী : (১/৩৪৪)

    [27] আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (২/২৪৬)

    [28] আল-আহকামুস সুলতানিয়া ; (১৪৩)

    [29] দেখুন : মুগনিল মুহতাজ : (৪/২৫৩)

    [30] মাতালেব উলিননুহা : (২/৬০২)

    [31] মাজমুউল ফতোয়া : (২৮/৬১৭-৬১৮)

    [32] আল-ফুরুক : (৩/১৪-১৫)

    [33] আল-খারাজ : (১৩৫) দেখুন : ফুতুহুল বুলদান লিল বালাযুরি ও ফুতুহুশ শাম লিল আযরি।

    [34] ফুতুহুল বুলদান : (২১০-২১১)

    [35] আল-ফুরুক : (৩/১৪)

    [36] আল-আমওয়াল : (১/১৬৩)

    [37] তারিখু মদিনাতি দিমাশক : (১/১৭৮)

    [38] আল-আমওয়াল : (১/১৭০)

    [39] আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/৭৩-৭৪)

    [40] বাদায়েউস সানায়ে : (৭/১১২)

    [41] কিস্‌সাতুল হাদারাহ : (১২/১৩১)

    [42] আল-হাদারাতুল ইসলামিয়া : (১/৯৬)