আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ

বর্ণনা

আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ : প্রবন্ধটিতে পবিত্র কুরআনের আলোকে মানুষ ও মানবজাতির স্বরূপ, প্রকৃতি ও বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
মূল প্রবন্ধটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ
    [বাংলা - Bengali - البنغالية]

    লেখক: ড. মোঃ আবদুল কাদের

    সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    2011- 1432

    ﴿ حقيقة الإنسان في ضوء القرآن ﴾

    « باللغة البنغالية »

    محمد عبد القادر

    مراجعة: د. أبو بكر محمد زكريا

    2011- 1432


    আল-কুরআনের আলোকে মানুষের স্বরূপ বিশ্লেষণ

    মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মানব জাতির কল্যাণের আঁধার। মানুষের সঠিক পথের দিশা দিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ হলো আল-কুরআন। এটি সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতির আবর্তে মানুষের কল্যাণ সাধনের নিমিত্তে গাইড বুক হিসেবে নাযিল হয়েছে। এতে মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের সমস্যা ও তার সমাধানের বর্ণনা বিবৃত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

    مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ

    কিতাব (কুরআনে) কোন কিছুই আমি বাদ দেইনি।’’[1]

    মানুষ আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে এক অনন্য ও অসাধারণ সৃষ্টি। বুদ্ধিবৃত্তিক ও জীবকে দেয়া হয়েছে ভাল ও মন্দের মাঝে পার্থক্য সুচিত করার এক অসুপম ক্ষমতা। মানুষই একমাত্র সৃষ্টিজীব যাদের রয়েছে বিবেক ও বোধশক্তি। এ বিবেকই তাদের চালিকাশক্তি এবং আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণের অনুসন্ধানী। ফলে মানুষকে তিনি আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীবরূপে ঘোষণা দিয়েছেন।[2]

    এ পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে, তার সবই মানুষের কল্যাণের জন্য। মহান আল্লাহ আপন কৃপায় সেসব সৃষ্টিজীবকে মানুষের অনুগত ও বশ্য করে দিয়েছেন। যদিও তারা আকার-আকৃতিতে, শক্তি ও দেহাবয়বের দিক থেকে মানুষের চেয়ে অনেক বড়। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন:

    أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ

    ‘‘তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন পৃথিবীতে যা কিছু আছে তৎসমূদয়কে।’’[3]

    মানুষের সৃষ্টি মূলে যে মহান আল্লাহর একক ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র, সেই মহান আল্লাহ দু’ধরনের উপাদান দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।[4]

    প্রথমত: মাটি থেকে, অত:পর তাতে রূহ প্রবেশ করিয়েছেন যেমন: হযরত (আ.) এর সৃষ্টি। কুরআনে এসেছে:

    الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِنْ طِينٍ - ثُمَّ جَعَلَ نَسْلَهُ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ مَاءٍ مَهِينٍ

    ‘‘যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন উত্তমরূপে এবং কর্দম হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অত:পর তিনি তার বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস হতে। পরে তিনি তাকে করেছেন সুঠাম এবং তাতে ফুঁকিয়ে দিয়েছেন তাঁর রূহ হতে এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্ত:করণ, তোমরা অতি সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’’[5]

    অন্যত্র সরাসরি পৃথিবীতে মানব আদম(আ.) এর সৃষ্টি সম্পর্কে তিনি বলেন:

    وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ - فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ

    ‘‘স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেস্তাদেরকে বললেন, আমি গন্ধযুক্ত কর্দমের শুস্ক ঠনঠনা মৃত্তিকা হতে মানুষ সৃষ্টি করেছি, যখন আমি তাকে সুমাঠ করব এবং তাতে আমার পক্ষ হতে রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হইও।’’ [6]

    দ্বিতীয়ত: বীর্ষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে:

    وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ - ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ - ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ فَتَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ

    ‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকার উপাদান হতে, অত:পর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি ‘আলাক-এ, অত:পর ‘আলাককে পরিণত করি পিন্ডে এবং পিন্ডকে পরিণত করি অস্থি-পাঞ্জরে অত:পর অস্থি পাঞ্জরকে ঢেকে দেই গোশত দ্বারা; অবশেষে তাতে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান।’’[7]

    অন্যত্র সৃষ্টি সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে:

    يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ذَلِكُمُ اللهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ

    ‘‘তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃ-গর্ভের ত্রিবিধ অন্ধকারে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আললাহ; তোমাদের প্রতিপালক; সর্বময় কর্তৃত্ব তারই; তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তবে তোমরা মৃখ ফিরিয়ে কোথায় চলছ?’’[8]

    মূলত: মানুষকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর তা থেকে তার সঙ্গীর সৃষ্টি হয়েছে। অত:পর তাদের উভয়ের মাধ্যমে অসংখ্য নারী-পুরুষের বিস্তৃতি লাভ করেছে। মহান আল্লাহ সূরা নিসার শুরুতে ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে:

    يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

    ‘‘হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তা হতে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেন। যিনি তাদের দুইজন হতে বহু নব-নারী ছড়িয়ে দেন।’’[9]

    মানুষ সৃষ্টি করে মহনা আল্লাহ ক্লান্ত হননি বরং তাদের দিয়েছেন ভাল ও মন্দের মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতা, মুক্ত ও স্বাধীনভাবে জমীনে বিচরণের অধিকার, চিন্তার স্বাধীনতা প্রভৃতি। তিনি বলেন:

    وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا - فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا - قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا - وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا

    ‘‘শপথ মানুষের এবং তার, যিনি তাকে সুঠাম করিয়েছেন, অত:পর তাকে তার অসৎকর্ম এবং অসৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে-ই সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।’’[10]

    প্রকৃতপক্ষে মানুষের শ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার মূলে যে বৈশিষ্ট্যটি খুবই গুরুত্বের দাবীদার তা হলো জ্ঞান। তিনি মানুষকে জ্ঞানের ভান্ডার দান করেছেন, শুধু তাই নয়, এ জ্ঞানের দ্বারাই মানুষ ফিরিশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এ মর্মে তিনি ইশরাদ করেন:

    اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ- الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ - عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

    ‘‘পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’’[11]

    সূরা আল-বাকারাতে এসেছে:

    وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاء إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ - قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

    ‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমূদয় ফিরিশতাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘‘এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বলল ‘আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তাছাড়া আমাদেরতো কোন জ্ঞান নেই।’’[12]

    এতদ্ব্যতীত জ্ঞানের যেসব উপদান রয়েছে, তা সবই তিনি স্বীয় অনুগ্রহে মানুষকে দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন:

    وَجَعَلَ لَكُمْ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

    ‘‘তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’’[13]

    কুরআনের অন্যত্র এসেছে:

    أَلَمْ نَجْعَلْ لَهُ عَيْنَيْنِ - وَلِسَانًا وَشَفَتَيْنِ

    ‘‘আমি কি তার জন্য সৃষ্টি করি নাই দুই চক্ষু? আর জিহবা ও দুই ওষ্ঠ?[14] এছাড়াও তিনি মানুষকে বয়ান বা কথা বলা শিখিয়েছেন। সূরা আর-রহমানে এসেছে:

    الرَّحْمَنُ - عَلَّمَ الْقُرْآنَ- خَلَقَ الْإِنسَانَ- عَلَّمَهُ الْبَيَانَ

    ‘‘দয়াময় আল্লাহ তিনিই শিক্ষা দিয়েছে কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’’[15]

    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নি‘আমত দ্বারা মানুষকে ভুষিত করা হয়েছে তা হলো যুগে যুগে প্রেরিত আসমানী গ্রন্থসমূহ। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী গ্রন্থের ধারণ করা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:

    إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا

    ‘‘আমি তো আসমান, যমীন ও পবর্তমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল; সে তো অতিশয় জালিম, অতিশয় অজ্ঞ।’’[16]

    এসকল নি‘আমতের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন, তাঁর বিধি-বিধানের আনুগত্য করা, তাঁকে সিজদা করা প্রভৃতি। এসব অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে স্বয়ং রাসূল (সা) সিজদায় অবনত হয়েছেন। সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে, তিনি বলেন:

    مجد وجهى للذي خلقه وصوره وشق يحعه وبصره تبارك الله أحسن الخالقين

    ‘‘আমার চেহারা সিজদা করেছে ঐ সত্তার জন্য যিনি তা সৃষ্টি করেছেন, অবয়ব দিয়েছেন এবং দিয়েছেন তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি। আল্লাহ অতীব বরকতময়, সবচেয়ে উত্তম স্রষ্টা।’’[17]

    কিন্তু মানুষ অতিশয় অকৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহ এসব অনুগ্রহের স্বীকৃতি দিতে চায় না এবং চেষ্টাও করে না। মহান আল্লাহ বলেন: إِنَّ الْإِنسَانَ لَكَفُورٌ ‘‘মানুষ তো অতিমাত্রায় অকৃতজ্ঞ।’’[18]

    আল-কুরআন নানা ধরনের দীনি বিষয়ের বর্ণনার সাথে সাথে মানুষের বিভিন্ন প্রকারের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকেও সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান চিত্র তুলে ধরেছে। যা সর্ব যুগের সর্বকালের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। মানুষের এ স্বরূপগুলো স্থায়ী। কোন জাতি বা কোন গোত্রই এ সকল বৈশিষ্ট্যের বাইরে নয়।

    পবিত্র কুরআনে যেসব মানুষের প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি নিন্দাও করা হয়েছে। তাকে একদিকে যেমন আসমান, জমিন ও ফিরিশতার চাইতেও মহীয়ান-গরীয়ান করা হয়েছে, অপরদিকে তেমনি তাকে চতুষ্পদ জন্তু, শয়তানের চেয়েও হীন ও নিকৃষ্টতর প্রাণীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। ফিরিশতার উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারে এরাই, অথাপি এরা এত দুর্বল যে, নিকৃষ্টতম অবস্থানেও নেমে যেতে পারে। তাই কুরআনে তাদেরকে অত্যন্ত স্বৈরাচারী ও মুর্খরূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

    وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنْ الْجِنِّ وَالْإِنسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُوْلَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَئِكَ هُمْ الْغَافِلُونَ

    ‘‘আমি তো বহু জ্বিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তদের কর্ণ আছে তা দ্বারা তারা শ্রবণ করে না, তারা পশুর ন্যায় বরং তারা অধিক বিভ্রান্ত, তারাই গাফিল।’’[19]

    কুরআনের অন্যত্র আরো বলা হয়েছে:

    لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيم - ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ - إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ

    ‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে, অত:পর আমি তাদেরকে হীনতাগ্রস্থদের হীনতমে পরিণত করি। কিন্তু তাদেরকে নয় যারা মু’মিন ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।’’[20]

    অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেখে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের স্বরূপ নির্ণয়ে পবিত্র কুরআন দু’ধরণের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছে। যেমন-

    ১. ভাল বৈশিষ্ট্য, ২. মন্দ বৈশিষ্ট্য। এগুলোকে আমরা দুভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। এক. ইতিবাচক দিক( যা কল্যাণকর ও অজর্নীয়), দুই. নেতিবাচক দিক (যা অকল্যাণকর ও বর্জনীয়)

    ১. ইতিবাচক দিক:

    এক. মানুষ দুনিয়াতে আল্লাহর খলিফা

    খলিফা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো প্রতিনিধি, উত্তরাধিকারী।[21] মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে মানুষকে স্বীয় খলিফা মনোনীত করেছেন। যে তারা দুনিয়ার তাঁর দীন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। এ মর্মে সৃষ্টির প্রারম্ভেই তিনি ফেরেশতাদের করে ঘোষণা দিয়েছেন:

    وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ

    ‘‘স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশতাদের বললেন, ‘‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতেছি; তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটানে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্ততিগান ও পবিত্রতা ঘোষনা করি। তিনি বললেন, আমি জানি যা তোমরা জান না।’’ [22]

    তিনি (আল্লাহ) শুধু খলিফা হিসেবেই সৃষ্টি করেননি; বরং তাদেরকে পরীক্ষার জন্য একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ

    ‘‘তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কতজকে কতকের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’’[23]

    এছাড়াও খলিফা হিসেবে একজন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিধৃত করতে গিয়ে তিনি তাঁর মনোনীত বান্দা দাউদ (আ.) কে লক্ষ্য করে বলেন: ‘‘হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর এবং খেয়াল খুশির অনুসরণ করিও না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে।[24]

    এখানে প্রতিনিধি হিসেবে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি তার দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা মহান আল্লাহকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রমাণিত করতে হলে তাঁর আইনকেই শুধু মানুষের মাঝে পরিচালিত করতে হবে অন্যথায় তা হবে ব্যক্তি পুজা বা প্রবৃত্তির অনুসরণ। আর দাউদ (আ.) এ ধরনেরই একজন শাসক ছিলেন।

    দুই. সর্বশ্রেষ্ঠ নি‘আমত জ্ঞানের অধিকারী

    মানুষ বোধশক্তি সম্পন্ন প্রাণী। মহান আল্লাহ মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যার সাহায্যে ভাল ও মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ প্রভৃতির মাঝে পার্থক্য সুচিত করা যায়। এ জ্ঞান দ্বারাই মানুষ ফিরিশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করেছে। অতএব জ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষ সকল প্রাণীর সেরা। পবিত্র কুরআনে এসেছে:

    وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاء إِنْ كُنتُمْ صَادِقِينَ- قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ- قَالَ يَاآدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنتُمْ تَكْتُمُونَ

    ‘‘আর তিনি আদম কে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন তারপর ফিরিশতাদের সামনে সেগুলো প্রকাশ করলেন এবং বললেন ‘এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, ’ যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বলল, আপনি মহান পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া আমাদের তো কোন জ্ঞান নেই। বস্ত্তত আপনি জ্ঞানমত ও প্রজ্ঞাময়। তিনি বললেন ‘‘হে আদম! তাদেরকে এসকল নাম বলে দাও’। সে তাদেরকে এ সবের নাম বলে দিল।’’[25]

    জ্ঞানে মাধ্যমেই মানুষ প্রভৃত কল্যাণের অধিকারী হয়েছে। এজন্যই পবিত্র কুরআনে বারবার জ্ঞান আহরণে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বলা হয়েছে-মহান আল্লাহ বলেন:

    وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا

    যাকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তার প্রভৃত কল্যাণ সাধিত হয়েছে।[26]

    তিনি আরো বলেন:

    وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمْ بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَى أَجَلٌ مُسَمًّى ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

    ‘‘বল অন্ধ ও চক্ষুম্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না?’’[27]

    তিন. মানুষ মুক্ত ও স্বাধীন

    মানুষ সাধারণত স্বাধীন চেতা ও মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় চলা-ফেরা করতে পছন্দ করে। কিসে কল্যাণ এবং কিসে তাদের অকল্যাণ তা জ্ঞাত হবার পরও তা গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থাশীল হওয়া পয়গম্বরী মিশন পরিচালনার প্রয়োজনীয় গুণাবলীতে মানব জীবন বিমন্ডিত। তারা দায়িত্বশীল জীব। উদ্যোগ ও কঠোর শ্রমের মাধ্যমে জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য মানুষের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। সমৃদ্ধি বা বিপর্যয় যে কোন একটিকে বেছে নেয়ায় তার রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। হয় সে সঠিক পথে চলে সমৃদ্ধির পানে বাড়াবে অথবা অকৃজ্ঞ হয়ে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাবে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন:

    إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا- إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

    ‘‘আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে, তাকে পরীক্ষা করার জন্য এজন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।[28]

    চার. মহত্ত্ব ও মর্যাদার বিভুষিত

    জন্মগতভাবেই মহত্ব ও মর্যাদার গুণাবলীতে মানুষ বিভুষিত। বাস্তবেই আল্লাহ অপরাপর অসংখ্য প্রাণীর উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সে তার আসল সত্ত্বাকে তখনই আবিস্কার করতে পারে, যখন সে তার মহত্ত্ব ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারবে এবং নিজকে সকল নীচতা, দাসত্ত্ব, অধীনতা ও ভোগ লালসার ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে স্থাপন করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنْ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا

    ‘‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমূদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর মানুষদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’’[29]

    পাঁচ: নৈতিক চেতনাবোধ সম্পন্ন

    মানুষের নৈতিক চেতনা আছে। তারা প্রকৃতিগতভাবেই ভালো আর মন্দ বুঝে নিতে পারে। কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। মানুষের সত্তার মাঝেই এ সুপ্ত নৈতিক চেতনা লুকিয়ে আছে। কুরআনে বলা হয়েছে:

    وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا- فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا

    ‘‘শপথ মানুষের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। তাকে(মানুষকে) তার অসৎকর্ম ও তার সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন।[30]

    ছয়. আল্লাহর স্মরণে মানসিক প্রশান্তি লাভ

    আল্লাহ স্মরণ ব্যতীত মানুষের হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে না। মানুষের আকাঙ্খা, চাহিদা সীমাহীন। তথাপি কোন কিছুর আধিক্য তাদের মধ্যে একঘেয়েমীর সৃষ্টি করে। আধিক্য লাভে তারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে থাকে। বিপরীত দিকে মহান আল্লাহর চিরন্তন সত্তার সাথে মিলনের পথে তারা যত এগিয়ে যায়, তাদের ব্যগ্রতা আরো বেড়ে যায়। মহান আল্লাহর স্মরণ মানুষকে এসব ক্ষেত্রে একমাত্র প্রশান্তির পায়রা হয়ে আবর্তিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন:

    الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

    ‘‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশাস্ত হয়; জেনে রেখ আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।’’[31]

    অতএব, মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এবং মানুষের প্রশান্তির অন্যতম উপায় হলো আল্লাহর যিকির।

    সাত: আল্লাহর ইবাদত পালনকারী

    আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্য প্রদর্শন করার নিমিত্তে। এটাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِي

    আমার ইবাদতের জন্যই আমি সৃষ্টি করেছি মানুষ এবং জ্বীনকে।[32]

    কিন্তু মানুষ যদি আল্লাহর ইবাদত না করে এবং তাঁর সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা না করে তাহলে তারা নিজেদের চিনতে পারবে না। আল্লাহর ব্যাপারে গাফেল হলে তারা নিজেদেরও ভুলে যাবে। এ পরিস্থিতিতে তারা বুঝতে পারবে না তাদের নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে; তাদের সৃষ্টি ও অস্তিত্বের পেছনে কি উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে তাও ভুলে যাবে। এ বিষয়ে সর্তক করে দিয়ে ধমকের সুরে মহান আল্লাহ বলেন:

    وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمْ الْفَاسِقُونَ

    ‘‘আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে; ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। তারাই তো পাপাচারী।’’[33]

    আট. পরকালীন সফলতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান

    মানুষ বস্ত জাগতিক প্রেরণা বা উদ্দেশ্য নিয়েই বাঁচে না। অর্থাৎ বস্তগত চাহিদা বা প্রয়োজনই মানুষের সকল কর্মের পেছনে একমাত্র প্রেরণা নয় বরং তারা মহত্তর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আশা-আকাঙ্খা পুরণের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। আর তা হলো পরকালীন সফলতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান। অতএব, কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে তাদের সামনে আর কোন লক্ষ্যই থাকে না। এদিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনুল কারীমে ঘোষিত হয়েছে মহাবাণী:

    يَاأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ - ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً - فَادْخُلِي فِي عِبَادِي- وَادْخُلِي جَنَّتِي

    ‘‘হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে আস সন্তুষ্ট ও সন্তোষ ভাজন হয়ে। আমার বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হও আর আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’’[34]

    নয়: মজবুত ঈমান:

    ঈমান মানে বিশ্বাস, প্রত্যয়, ধর্মীয় বিশ্বাস[35] অন্তরের বিশ্বাস[36] । এক কথায় বলতে গেলে ঈমান হচ্ছে: স্বীকৃতি প্রদান। পরিভাষায়: ইসলামের মূল বিষয়গুলো মনে প্রাণে বিম্বাস করে মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী আমল করার নাম ঈমান।

    মানুষের মধ্যে এমন কতক মানুষ আছে যারা আল্লাহ তাঁর রাসূল, ফিরিশতা, আসমানী গ্রন্থাবলী ও সদৃশ্য বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখে। কোন অত্যাচারী শাসকের রক্ষচক্ষু ও তাদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না। এমন ঈমানের এক জীবন্ত মডেল হিসাবে বিশ্বের বুকে সমাদৃত রয়েছেন, মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা)। রাসূল (সা) এর প্রতি তাঁর এম বেশী অগাধ আস্থা ছিল যে, মিরাজের ঘটনার বিবরণ শুনামাত্রই তিনি তা বিশ্বাস করে ফেলেন। পবিত্র কুরআন মানুষকে দুভাবে ভাগ করেছে। ১. ঈমানদার ২. যারা ঈমান আনেনি এমন। তবে যারা ঈমান আনে তাদের অধিকাংশই মজবুত ঈমানের অধিকারী হওয়া বাঞ্চনীয়। অন্যথায় তারা বিশেষ বিশেষণে বিশেষিত হতে বাধ্য। তাইতো এরশাদ হয়েছে: যারা বরে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ; অত:পর অবিচলিত থাতে তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফিরিশতা এবং বলে তোমার ভীত হইও না, চিন্তিত হইও না এবং তোমাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও।’’[37]

    এ ধরনের ঈমানের অধিকারী যারা তারাই সফলকাম ও বিজয়ী হবে। তাদের জন্যেই মহান আল্লাহ পরকালে মহাপুরুস্কারের ঘোষনা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمْ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

    ‘‘তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখিত হইও না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মু’মিন হও।’’[38]

    দশ. দরিদ্র অথচ অল্পে তুষ্ট

    সমাজে দু’ শ্রেণীর মানুষ বাস করে। এক. ধনী, দুই. দরিদ্র। ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য দুরীকরণার্থে ইসলামে যাকাতের বিধান রয়েছে যা ধনীদের সম্পদ থেকে উত্তোলণ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করতে হয়। কেননা ইসলাম সুসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে যাকাতের বিধান রাখা হয়েছে যেন সম্পদ এক শ্রেণীর হাতে আবদ্ধ না হয়ে পড়ে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

    كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ

    ‘‘যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই সম্পদ আবর্তন না করে।’’[39]

    এতদসত্ত্বেও এমন কতিপয় মানুষ রয়েছে যারা অভাবগ্রস্থ হওয়া সত্বেও সন্তুষ্ট চিত্তে জীবন যাপন করে। তথাপিও মানুষের কাছে হাত পারে না এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা বানায় না। পবিত্র কুরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:

    لِلفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمْ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنْ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا

    ‘দান সাদকা তো ঐসব গরীব লোকদের জন্য, যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘুরাফিরা করতে পারে না, অথচ লোকেরা হাত না পাতার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে; তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের নিকট কাকুতি মিনতি করে ভিক্ষা করে ভিক্ষা চায় না। [40] মূলত: অল্পে তুষ্টতাই শান্তির নিয়ামক। রাসূল (স.) বলেন:

    الغنى غنى النفس

    ‘‘অন্তরের প্রাচুর্যতাই প্রকৃত প্রাচুর্য।’’ [41]

    এগার. তাকওয়া সম্পন্ন

    তাকওয়া আরবী শব্দ। অর্থ হলো আল্লাহর ভয়, পরহেযগারি, দ্বীনদারী, ধার্মিকতা।[42] যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদেরকেই মুত্তাকী বলা হয়। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কেবল মুত্তাকীদের জন্যই পথ প্রদর্শক। কুরআনের বিভিন্নস্থানে মানুষকে লক্ষ্য করে পরিপূর্ণ তাকওয়াবান হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:

    يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ

    ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যেভাবে ভয় করা উচিত সেরূপ ভয় কর এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’’[43]

    এ তাকওয়ার গুণে গুনান্বিত করার জন্য মানুষের উচিত, অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করা এবং সকল কাজ তাঁর দেয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা। এ সব লোকদের প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آياتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

    ‘মু’মিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে।’’[44]

    প্রকৃত পক্ষে মহান আল্লাহর নিদের্শিত পন্থায় যারা জীবন অতিবাহিত করে এবং তাঁর নিষিদ্ধ বিষয় ও কাজ সমূহ থেকে নিজেকে বাuঁচয়ে রাখে তারাই মুত্তাকী। এ সব লোকদের জন্যই মহান আল্লাহ চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন।

    বার. বিনয়ী ও ভদ্র

    বিনয় ও নম্রতা মানুষের অন্যতম চারিত্রিক ভূষণ। বিনয় মানুষকে উচ্চ আসনে সমাসীন করতে এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে সহায়তা করে। বিনীয়কে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

    وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمْ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

    ‘‘রামমানের’ বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা শান্তি কামনা করে (তর্কে অবতীর্ণ হয় না)।’’[45] শুধু তাই নয়, একজন বিদগ্ধ পন্ডিত ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা লুকমানও তার পুত্রকে একই আদেশ দিয়েছেন: ‘‘(প্রিয় বৎস) পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না।’’[46]

    তের. দানশীল ও উদার

    এ দুটি উত্তম চারিত্রিক গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর মানুষ হচ্ছে তার ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মাত্র। অতএব, সম্পদকে পুঞ্জিভুত করে না রেখে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া কতক মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহবায়ে কেরাম এক্ষেত্রে অনুকরণীয় আদর্শ। দানের ক্ষেত্রে তাঁরা আমাদের জন্য কিয়ামত অবধি মডেল হয়ে থাকবে। দানশীল লোকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:

    وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا، إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا

    ‘‘আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্থ, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে এবং বলে, কেবল আললাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি। আমরা তোমাদের নিকট হতে কোন প্রতিদান চাই না। কৃতজ্ঞতাও নয়।’’[47]

    চৌদ্দ. ধৈর্যশীল

    ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। ধৈর্যশীলকে মহান আল্লাহ ভালবাসেন। মানুষ এ পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের বাধা-বিপত্তি ও কষ্টের সম্মুখীন হয় যা দ্বারা মূলত: তাদের পরীক্ষা করা হয়। আর তা হলো ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ধ্বংস, জীবন ও সম্মানহানি প্রভৃতি। এক্ষেত্রে ধৈর্যশীলগণ খুব সহজেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সক্ষম হন। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنْ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرْ الصَّابِرِينَ - الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

    ‘‘আমি তোমাদের কিছু ভয়; ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে। যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’’[48]

    পনের. অপরকে অগ্রাধিকার দান

    মানুষের স্বভাব হলো অন্যের উপর নিজের প্রাধান্য বিস্তার করা। তথাপিও আল্লাহর একান্ত অনুগত কতক বান্দা রয়েছে; যারা নিজেদের আমিত্বকে ভুলে গিয়ে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দানে মহত্বের পরিচয় দিয়ে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন এ দৃষ্টান্তের মূর্ত প্রতীক। বিশেষত: আনসারগণ সকল সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে এক্ষেত্রে নিজেদের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُفْلِحُونَ

    ‘‘মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এ নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদের ভালবাসা এবং মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্খা পোষণ করে না। আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও। যাদেরকে অন্তরের কার্পন্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম।’’ [49]

    ষোল, ক্রোধ দমনকারী

    ক্রোধ মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে দেয়। ক্রোর্ধের বশবর্তী হয়ে মানুষের পরস্পরের প্রতি ঘৃণাবোধ জন্ম নেয়। এমনকি অন্যায় পথে পা বাড়াতেও এ ক্রোধ মানুষকে সাহায্য করে। অতএব, ক্রোধ হলো বিভ্রান্তিকর একটি মানবিক দুর্বলতার নাম। মুমিনগণ এ ক্রোধকে দমন করে স্বীয় কাজে সিদ্ধহস্ত হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে তাদের এ গুণটির উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘তারা নিজেদের ক্রোধকে সবরণ করে।[50] এ মনের অধিকারী ব্যক্তিগণই হলেন সৎকর্মপরায়ণ।

    সতের. ক্ষমাশীল

    ক্ষমা অন্যতম একটি মানবিক গুণাবলী। যা মানুষকে বড় মনের অধিকারী বানাতে সাহায্য করে এবং ক্রোধ সংবরণে সহায়তা করে। ক্রোধের সাথে ক্ষমা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। ক্রোধের সাথেই ক্ষমাশীলতার উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

    أُوْلَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ

    ‘‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন।’’[51]

    এসব গুণাবলীর অধিকারী যেসব মানুষ রয়েছে, মুলত: তাদের জন্যেই মহান আল্লাহ স্বীয় গুণে গুণান্বিত হয়ে ক্ষমা ও চিরস্থায়ী সুখময় জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন। উপরোল্লিখিত আয়াতের পূর্বোক্ত আয়াতে সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে:

    وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

    ‘‘তোমরা ধাবমান হও তোমদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়। যা প্রস্ত্তত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।’’[52]

    ২. নেতিবাচক দিক:

    মানুষের স্বভাবের এমন কতিপয় দিক রয়েছে যে এগুলোর প্রভাবে মানুষ নিজ নিজ গুণাবলী ও মর্যাদা বিচ্যুৎ হয়ে অন্য নামে আখ্যায়িত হয় সেগুলোই তার নেতিবাচক দিক। এক কথায় বলতে গেলে, যেসব মৌলিক ও অসৎগুণাবলীর সংমিশ্রণ রয়েছে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিতে যা বর্জন করা একজন মানুষ হিসেবে সকলের কর্তব্য সেগুলো হলো:

    এক. স্বার্থপরতা

    মানুষ বড় Selfish বা স্বার্থপর। কোথাও বা কোন কাজে তার স্বার্থ ও সুযোগ সুবিধা জড়িয়ে না থাকলে সে কাজ সিদ্ধ করে না। এজন্যেই পবিত্র কুরআনে তাকে অসংখ্যবার জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যেন সে তা অর্জনের আশায় দুনিয়ায় বৈধ পথে চলাচল করে। মানুষ বিপদ আসলে সর্বদা আল্লাহকে ডাকে, আর বিপদ কেটে গেলে তাঁকে উপেক্ষা করে চলে। এ চরিত্র বর্ণনায় কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنْبِهِ أَوْ قَاعِدًا أَوْ قَائِمًا فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُ ضُرَّهُ مَرَّ كَأَنْ لَمْ يَدْعُنَا إِلَى ضُرٍّ مَسَّهُ كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْمُسْرِفِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

    ‘‘আর মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে বসে অথবা দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে, অত:পর আমি যখন তার দুঃখ-দৈন্য, দুরীভূত করি, সে এমন পথ অবলম্বন করে, যেন তাকে যে দুঃখ-দৈন্য, স্পর্শ করেছিল তার জন্য সে আমাকে ডাকেনি।’’[53] কুরআনে আরো এসেছে:

    إِنَّ الْإِنسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا، إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا، وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا

    ‘‘মানুষতো সৃজিত হয়েছে অতিশয় অস্থির চিত্তরূপে, যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী। আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ।’’[54]

    দুই. অহংকারী

    মানুষের জীবনের যাত্রা দুর্বলতা ও অসামর্থের তথা মাটি ও শুক্র জাতীয় দুটি দুর্বল ও অক্ষম উপাদান দিয়ে শুরু হলেও মানুষ অহংকারী স্বভাবের হয়ে থাকে। দুনিয়ার হিসেব অনুযায়ী বড় ধরনের কোন কল্যাণ প্রাপ্ত হলে তখন সে স্বেচ্চাচারী রূপ নিয়ে অহংকারবশত তাঁর অতীতকে ভুলে যেতে চেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনে তাদের চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে:

    وَلَئِنْ أَذَقْنَا الْإِنسَانَ مِنَّا رَحْمَةً ثُمَّ نَزَعْنَاهَا مِنْهُ إِنَّهُ لَيَئُوسٌ كَفُورٌ، وَلَئِنْ أَذَقْنَاهُ نَعْمَاءَ بَعْدَ ضَرَّاءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ ذَهَبَ السَّيِّئَاتُ عَنِّي إِنَّهُ لَفَرِحٌ فَخُورٌ

    ‘‘যদি আমি মানুষকে আমার নিকট হতে অনুগ্রত আস্বাদন করাই ও পরে তার নিকট হতে তা প্রত্যাহার করি তখন সে অবশ্যই হতাশ ও অকৃতজ্ঞ হবে। আর যদি দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করার পর আমি তাকে সুখ-সম্পদ আস্বাদন করাই তখন সে অবশ্যই বলবে, আমার বিপদ আপদ কেটে গেছে, আর সে তো হয় প্রফুল্ল ও অহংকারী।’’[55]

    মহান আল্লাহ আরো বলেন:

    وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأَى بِجَانِبِهِ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوسًا

    ‘‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে লয় ও দূরে সরে যায় এবং তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে।’’[56]

    তিন. ঠুনকো বিশ্বাসী

    মানুষের মধ্যে এমন এক ধরনের মানুষ আছে, যাদের বিশ্বাস খুবই ঠুনকো। যারা তাদের বিশ্বাসের উপর দৃঢ় থাকতে পারে না। এরা ততক্ষণ ঈমানের পথে থাকে যতক্ষণ নিরাপদ ও নির্ঝামেলায় তা থেকে ফায়দা লাভ করা যায়। আর যদি কোনোরূপ পরীক্ষা বা কাঠিন্য আরোপ করা হয়, সাথে সাথে তারা ঈমান ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

    وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ

    ‘‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করে দ্বিধার সাথে। তার মঙ্গল তাতে তার চিত্ত প্রশান্ত হয় এবং কোন বিপর্যয় ঘটলে সে তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ক্ষতিগ্রস্থ হয় দুনিয়াতে ও আখিরাতে; এটাই তো সুস্পষ্ট ক্ষতি।’’[57]

    ইবন আববাস রা. আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপটে বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: এক ব্যক্তি মদিনায় বাস করত। যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করত এবং তার পশুটি কোন বাচ্চা প্রসব করতে তাহলে সে বলত, দীন ইসলাম বড় চমৎকার। আর যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান না জন্মাত এবং তার পশুটিরও বাচ্চা না হত তাহলে সে বলত দীন ইসলাম খারাপ ও অপয়া।[58]

    কুরআনের অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে:

    وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللهِ وَلَئِنْ جَاءَ نَصْرٌ مِنْ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ

    ‘‘মানুষের মধ্যে কতক লোক বলে, আমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি, কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নিগৃহীত হয়, তখন তারা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মত গণ্য করে এবং তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে কোন সাহায্য আসলে তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম। বিশ্ববাসীর অন্ত:করণে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন?’’[59]

    চার. ভীরু কাপুরুষ

    কিছু লোক এমন আছে যারা সত্যকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে থাকে। সত্যের সাথে পরিচিত হতে চায় না। ফলে একদিকে তাদের জিদ ও হঠকারিতা সত্য থেকে বিরত রাখে, অপরদিকে তাদেরকে কাপুরুষতায় পেয়ে বসে। যার কারণে তারা কখনো সত্যের মুখোমুখী হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না। মহান আল্লাহর ভাষায়:

    يُجَادِلُونَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُونَ إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنظُرُونَ

    ‘‘সত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। মনে হচ্ছিল তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে, আর তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে।’’[60]

    পাঁচ. হাসি-কৌতুক উদ্রেককারী

    কতিপয় মানুষের কর্মকান্ড হাসি-তামাশায় উদ্রেক করে মাত্র। তারা খুব আজব প্রকৃতির। অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই সত্য থেকে পলায়নের চেষ্টায় তার বিভোর হয়ে পড়ে। মুলত: তারা সত্য গোপনকারী। কুরআনে এসেছে:

    فَمَا لَهُمْ عَنْ التَّذْكِرَةِ مُعْرِضِينَ، كَأَنَّهُمْ حُمُرٌ مُسْتَنْفِرَةٌ ، فَرَّتْ مِنْ قَسْوَرَةٍ

    ‘‘তাদের কি হলো যে, তারা উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? যেন তারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গর্দভ, হট্টগোলের কারণে পলায়নপর।’’[61]

    ছয়. প্রশংসাকাঙ্খী

    মানুষ সর্বদা প্রশংসিত হতে পছন্দ করে। তবে এক্ষেত্রে তারা নিজেরা করে না এমন বিষয়েও প্রশংসা কামনা করে। তাদের সম্পর্কে কুরআনে এসেছে:

    وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنْ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

    ‘‘যা নিজেরা করেনি এমন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে ভালবাসে যারা, তারা শাস্তি হতে মুক্তি পাবে-এরূপ তুমি কখনো মনে করো না। তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে।’’[62]

    সাত. সুবিধাবাদী

    এমন কিছু লোক আছে, যারা সুবিধা পেলে একদলে ভিড়ে যায় আবার সেখানে অসুবিধা হলে অন্য দলে যোগ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন:

    الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِنْ كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِنْ اللهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُنْ مَعَكُمْ وَإِنْ كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُمْ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ

    ‘‘যারা তোমাদের অমঙ্গলের প্রতীক্ষায় থাকে তারা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের জয় হলে বলে, আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না। আর যদি কাফিরদের কিছু বিজয় হয়, তবে তারা বলে আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রবল ছিলাম না এবং আমরা কি তোমাদেরকে মুমিনদের হাত হতে রক্ষা করিনি? আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করবেন এবং আল্লাহ কখনই মু’মিনরেদ বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য কোন পথ রাখবেন না।’’[63]

    আট. ধুর্ত প্রকৃতির

    মানুষের মধ্যে এমন কতিপয় মানুষ আছে যারা অত্যন্ত ধূর্ত ও চালাক প্রকৃতির। সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত কোন কাজ নিজেরা করবে এবং তা থেকে ফায়দা নেবে। যখনই সেই কাজ অন্য কেউ করে তখন তা অস্বীকার করে বসে। আল-কুরআন বিষয়টি চিত্রিত করেছে এভাবে:

    وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْكَافِرِينَ

    ‘‘তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট হতে তার সমর্থক কিতাব আসল; যদি পূর্বে সত্য প্রত্যাখানকারীদের বিরুদ্ধে তারা এর সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত, তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তার যখন তাদের নিকট আসল তখন তারা সেটা প্রত্যাখান করল। সুতরাং কাফিরদের প্রতি আল্লাহর লা’নত।[64]

    তাদের এ ধরনের আরো একটি চরিত্র বর্ণনায় কুরআনে এসেছে:

    وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ مُعْرِضُونَ، وَإِنْ يَكُنْ لَهُمْ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ

    ‘‘ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে।’’ [65]

    এমন কিছু মানুষ আছে যারা শুধু আকৃতিতেই মানুষ। এছাড়া মনুষত্বের কোন কিছু তাদের মাঝে পাওয়া যায় না। এ যেন চলমান জড় পদার্থ, যা দেখে লোকদের হাসি পায়। মূলত: এটি মুনাফিকদের অত্যন্ত আকর্ষর্ণীয় একটি চিত্র। যা বেদনা মিশ্রিত কৌতুক। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ

    ‘‘তুমি যখন তাদেরকে দেখ, তখন তাদের দেহাবয়র অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে তুমি তাদের কথা শোন। কিন্তু তারা তো প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের মত।’’[66]

    দশ. গোপনে সত্য উপেক্ষাকারী

    সমাজে এমন কতিপয় মানুষ পাওয়া যায় যারা নিজে যেমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, ঠিক তেমনিভাবে সত্যকে মেনে নিতেও পারে না। প্রতি মুর্হূতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দুদোল্যমান থাকে। এ ধরনের লোক চুপি চুপি সত্য থেকে বিমুখ হতে পছন্দ করে। মূলত: এটি দুর্বল এক শ্রেণীর মুনাফিকের চরিত্র। তাদের সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ نَظَرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ هَلْ يَرَاكُمْ مِنْ أَحَدٍ ثُمَّ انصَرَفُوا صَرَفَ اللهُ قُلُوبَهُمْ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَفْقَهُونَ

    ‘‘এবং যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তারা একে অপরের দিকে তাকায় এবং ইশারায় জিজ্ঞেস করে তোমাদেরকে কেউ লক্ষ্য করতেছে কি? অত:পর তারা সরে পড়ে। আল্লাহ তাদের হৃদয়কে সত্য বিমুখ করেছেন, কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই।’’[67]

    এগার. দ্বিমুখী নীতি

    এমন কতক মানুষ রয়েছে যারা Double Standard অবলম্বন করে সমাজে বিচরণ করে। তারা নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। বরং সর্বদা দ্বিমুখী নীতিতে বিশ্বাসী। যখন যেখানে যায় অবস্থান তখন সেখানে তার আপন জনে পরিণত হয়। আর অন্যত্র গেলে তা প্রত্যাখ্যান করে। এ মর্মে কুরআনে এসেছে:

    وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ

    ‘‘যখন তারা মু’মিনদের স্পর্শে আসে তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি, আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরাতো তোমাদের সাথেই রয়েছি; আমরা শুধু তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করে থাকি।’’[68]

    কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে:

    مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَلَا إِلَى هَؤُلَاءِ

    ‘‘দোটানায় দোদুল্যমান, না এদের দিকে না ওদের দিকে।’’[69]

    বার. নিবোর্ধ প্রতারক

    কিছু লোক আছে যারা প্রতারণা ও ভন্ডামীতে লিপ্ত। নিজেদেরকে যদিও তারা চালাক মনে করে কিন্তু তাদের মাথায় ভুষি ছাড়া আর কিছুই নেই। তারা মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করে কিন্তু মূলত: তারা নিজেরাই নিজেদের ঠকাচ্ছে। কুরানের ভাষায়:

    وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ، يُخَادِعُونَ اللهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ

    ‘‘আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনেছি; কিন্তু তারা মু’মিন নয়। আল্লাহ এবং মু’মিনদেরকে তারা প্রতারিত করতে চায়। অথচ তারা যে নিজেদেরকে ভিন্ন কাউকে প্রতারিত করে না, এটা তারা বুঝতে পারে না।’’[70]

    তের. তর্ক প্রিয়

    মানুষ স্বভাবতই তর্ক প্রিয়। মানব উম্মেষকাল থেকে মুহাম্মদ (স.) পর্যন্ত তর্কের অস্তিত্ব বিদ্যমান। আল্লাহ রাববুল আলামীন মানব সৃষ্টির সূচনালগ্নে একদল ফিরিশতার সাথে বিতাড়িত শয়তানের সাথে এবং বিভিন্ন উম্মত ও তার কাওমের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিতর্কের বর্ণনা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বিধৃত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

    وَكَانَ الْإِنسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا

    ‘‘ মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারে তর্ক প্রিয়।’’[71]

    চৌদ্দ. ঝগড়াটে

    কিছু লোক আছে যারা ঝগড়া করতে পছন্দ করে। সত্য হোক কিংবা মিথ্যা, জেনে হোক কিংবা না জেনে ঝগড়া বা গন্ডগোল তারা করবেই। কুরআনে এসেছে:

    هَا أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

    ‘‘হ্যাঁ, তোমরা তো সেসব লোক, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে সে বিষয়ে তোমারাই তো তর্ক করেছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কেন কর্ত করছ? আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নও।’’[72]

    এমর্মে অন্যত্রে ইরশাদ হয়েছে:

    وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يُجَادِلُ فِي اللهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُنِيرٍ

    ‘‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে, তাদের না আছে জ্ঞান, না আছে পথ নির্দেশ, না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব।’’[73]

    পনের. বিপর্যয় সৃষ্টিকারী

    কতক মানুষের স্বভাব হলো সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে শান্তি বিঘ্নিত করা। তারা না জেনে ও না বুঝে অনেক সময় এ ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টির পায়তারা করে। যখন তাদেরকে এ থেকে বিরত থাকতে বলা হয় তখন তারা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ، أَلَا إِنَّهُمْ هُمْ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِنْ لَا يَشْعُرُونَ

    ‘‘তাদেরকে যখন বলা হয়, পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না। তারা বলে, আমরাই তো শান্তি স্থাপনকারী। সাবধা! এরাই অশান্তি সৃষ্টিকারী। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না।’’[74]

    ঘোল. ওজর আপত্তিকারী

    মানব জীবনের যাবতীয় কার্যাবলী সাধারণত দু’টি অবস্থায় সংঘটিত হয়। একটি সহজ অবস্থা অপরটি হলো কঠিন অবস্থা বা দুঃখ দুর্দশাগ্রস্থ হওয়া। মানুষ সর্বদা সহজতর অবস্থা কামনা করে থাকে। কিন্তু যখনই কোন কাঠিন্য ও দুঃখ-দুর্দশা তাকে স্পর্শ করে তখন সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং মিথ্যে ওজর আপত্তি পেশ করে তা থেকে বিরত থাকর চেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনে নিম্নোক্তভাবে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে:

    لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لَاتَّبَعُوكَ وَلَكِنْ بَعُدَتْ عَلَيْهِمْ الشُّقَّةُ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللهِ لَوْ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ

    ‘‘আশু সম্পদ লাভের সম্ভাবনা থাকলে ও সফর সহজ হলে তারা নিশ্চয়ই তোমার অনুসরণ করত, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হল। তারা অচিরেই আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, পারলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের সাথে বের হতাম। তারা নিজেদেরকে ধ্বংস করে। আল্লাহ জানেন তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদ।’’[75]

    সতের. ভীতু বেহায়া

    ভয়-ভীতি মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাব বটে। কিন্তু এ ভীতির সঙ্গে অনেক সময় নির্লজ্জ ও ভীতু বেহায়া স্বভাবে পরিণত করে। বস্ত্তত: মিথ্যা আশ্রয় নেয়ার জন্য এটি মানুষের অন্যতম কুটকৌশল। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

    وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى النَّارِ فَقَالُوا يَالَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِآيَاتِ رَبِّنَا وَنَكُونَ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ - بَلْ بَدَا لَهُمْ مَا كَانُوا يُخْفُونَ مِنْ قَبْلُ وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ

    ‘‘তুমি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে অগ্নির পাশে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, হায়! যদি আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মু’মিনদের অন্তর্ভূক্ত হতাম। না, পূর্বে তারা যা গোপন করত তা যখন তাদের নিকট প্রকাশ পেয়েছে এবং তারা প্রত্যাবর্তিত হলেও যা করবে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল পুনরায় তারা তাই করত। আর নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।[76]

    আঠার. স্বেচ্ছাচারী

    অহংকারবশে মানুষ অনেক সময় স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। এরা নিজেদেরকে কোন নির্দিষ্ট পথের পথিক কিংবা কোন দল বা জামাআতের অন্তর্ভূক্তও মনে করে না। এ মর্মে কুরআনে এসেছে:

    أَوَكُلَّمَا عَاهَدُوا عَهْدًا نَبَذَهُ فَرِيقٌ مِنْهُمْ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

    ‘‘তবে কি যখনই তারা অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে, তখনই তাদের কোন একদল তা ভঙ্গ করেছে? বরং তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না।’’[77]

    উনিশ: গোঁয়ার ও স্থবির প্রকৃতির

    সমাজে এমন এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছে যারা অত্যন্ত গোঁয়ার এবং স্থবির প্রকৃতির। তারা নিজেরা যা বুঝে অন্যেরা তার ধারে পৌঁছাতেও সক্ষম নয় বলে ধারনা পোষণ করে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ ধরনের গোর্য়াতুমির জন্যেই একশ্রেণীর মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়া থেকে বঞ্চিত ছিল। মনে হয় যেন তাদের পা গুলো পাথর দিয়ে তৈরী। তারা এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোন চেষ্টা করেনি। মহান আল্লাহ তাদের স্বরূপ সম্পর্কে বলেন:

    وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ

    ‘‘আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ কর, তারা বলে, না বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যাতে পেয়েছি তার অনুসরণ করব। এমনকি তাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কিছু বুঝত না এবং তারা সৎপথে পরিচালিত ছিল না, তথাপিও?’’[78]

    বিশ. পার্থিব জীবনের মোহে মোহগ্রস্থ:

    এমন কিছু লোক আছে যারা পার্থিব জীবনকেই বেশী গুরুত্ব দেয়। যেখানেই থাকুক না কেন জৈবিক চাহিদাটাই তাদের কাছে বড়। তারা একে এত বেশী গুরুত্ব দেয়, প্রয়োজনে লাঞ্চনার জীবন যাপন করতে রাজি তথাপিও দুনিয়ার সহায়-সম্পদ ও লোভ-লালসায় মত্ত থাকা থেকে বিরত থাকতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে:

    وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنْ الَّذِينَ أَشْرَكُوا يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ أَلْفَ سَنَةٍ وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنْ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمَّرَ وَاللهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ

    ‘‘তুমি নিশ্চয় তাদেরকে জীবনের প্রতি সহজ সমস্ত মানুষ, এমনকি মুশরিক অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেক আকাঙ্খা করে যদি সহস্র বছর আয়ু দেয়া হত; কিন্তু দীর্ঘায়ু তাকে শান্তি হতে দূরে রাখতে পারবে না। তারা যা করে আল্লাহ তার দ্রষ্টা।’’[79]

    অন্যত্র আরো এসেছে:

    إِنَّ هَؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيلًا

    ‘‘নিশ্চয় তারা ভালবাসে পার্থিব জীবনকে এবং তারা পরবর্তী কঠিন দিবসকে উপেক্ষা করে চলে।’’[80]

    একুশ: কৃপন

    যারা প্রয়োজনের মুর্হুতে খরচ করে না, তারা কৃপন। যদি কেউ খরচ করার পর ক্ষতিগ্রস্থ হয় তখন সে বিজয়ের হাসি হেসে বলে: যাক আমি খরচ না করে ভালোই করেছি। আমার টাকাগুলো রয়ে গেল। আর যদি জিহাদে কোন কল্যাণ লাভ হয় তখন আক্ষেপ করে বলে: হায়! যদি আমিও খরচ করতাম তবে লাভ হত। ইরশাদ হয়েছে:

    وَإِنَّ مِنْكُمْ لَمَنْ لَيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُنْ مَعَهُمْ شَهِيدًا، وَلَئِنْ أَصَابَكُمْ فَضْلٌ مِنَ اللهِ لَيَقُولَنَّ كَأَنْ لَمْ تَكُنْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ مَوَدَّةٌ يَا لَيْتَنِي كُنتُ مَعَهُمْ فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا

    ‘‘তোমাদের মধ্যে এমন কতক লোক আছে, যে গড়িমসি করবেই। তোমাদের কোন মুসীবত হলে সে বলবে, তাদের সঙ্গে না থাকায় আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর তোমাদেরৃ প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ হলে, যেন তোমদের ও তার মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই এমনভাবে বলবেই, হায়! যদি তাদের সাথে থাকতাম তবে আমিও বিরাট সাফল্য লাভ করতাম।’’[81]

    বাইশ. ভেরত ও বাইরের বৈপরিত্য

    কিছু লোক আছে যাদের বাইরের ও ভেতরের কোন মিল নেই। মনে হয় সে একজন নয় দুজন মানুষ। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন:

    وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ ، وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ

    ‘‘আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকার করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়। যখন সে প্রস্থান করে তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শষ্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু নিপাতের চেষ্টা করে। আর আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’’[82]

    তেইশ. স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন

    কিছু লোক এমন স্বল্প বুদ্ধির হয়ে থাকে, তাদের সামনে কি বলা হলো না হলো সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। কুরআনের ভাষায়:

    وَمِنْهُمْ مَنْ يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ حَتَّى إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِنْدِكَ قَالُوا لِلَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مَاذَا قَالَ آنِفًا

    ‘‘তাদের মধ্যে কতক লোক আপনার কথার দিকে কান পাতে ঠিকই কিন্তু বাইরে বের হওয়া মাত্র যারা শিক্ষিত তাদেরকে বলে: এই মাত্র তিনি কি বললেন?’’[83]

    চবিবশ: মুমূর্ষু অবস্থায় তাওবাকারী

    তাওবা(توبة) অর্থ- অনুশোচনা, অনুতাপ, প্রত্যাবর্তন, ক্ষমা।[84] মানুষ সাধারণত অপরাধ প্রবণ। কোনো না কোনভাবে সে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ তা থেকে পরিত্রাণের জন্য তাওবার ব্যবস্থা রেখেছেন।

    আর এটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে করতে হয়। অথচ কতিপয় লোক ইচ্ছে মাফিক গোটা জিন্দেহী অন্যায় পথে যাপন করে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে তাওবা করে। কিন্তু তাদের এ তাওবা গ্রহণযোগ্য নয়। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে:

    إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُوْلَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا، وَلَيْسَتْ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمْ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآنَ وَلَا الَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمْ كُفَّارٌ أُوْلَئِكَ أَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

    ‘‘আল্লাহ অবশ্যই সেসব লোকদের তাওবা কবুল করবেন, যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে এবং সত্বর তওবা করে। এরাই তারা, যাদের তওবা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তওবা তাদের জন্য নয় যারা আজীবন মন্দ কাজ করে। অবশেষে তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তওবা করছি এবং তাদের জন্য নয় যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য মর্মস্ত্তদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।’’[85]

    পঁচিশ. তাড়াহুড়া প্রিয়

    মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই ত্বরাপ্রবণ। কোন কর্মের ত্বরিত ফলভোগে বিশ্বাসী। ফলে সর্বদা তাড়াহুড়া করে কোন কিছু অর্জনকেই বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তবে এটি সমুচিত নয়। কুরআনে এ চরিত্রের বর্ণনায় এসেছে:

    خُلِقَ الْإِنسَانُ مِنْ عَجَلٍ سَأُرِيكُمْ آيَاتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِي

    ‘‘মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নির্দেশাবলী দেখাব; সুতরাং তোমরা আমাকে ত্বরা করতে বলো না।’’[86] অন্যত্র মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

    وَكَانَ الْإِنسَانُ عَجُولًا

    ‘‘মানুষতো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রিয়।’’[87]

    পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষ এমন এক প্রাণী যাকে মহান আল্লাহ নিজের পছন্দ মোতাবেক সৃষ্টি করেছেন, বানিয়েছেন দুনিয়ায় তার খলিফা বা প্রতিনিধি। তার প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে আল্লাহকে চেনার, তার স্বরূপ উপলব্ধির যোগ্যতা। মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন, তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বস্ততা এবং নিজের প্রতি ও সারা বিশ্বের প্রতি দায়িত্বানুভুতি। প্রকৃতি, আকাশ ও পৃথিবীর উপর আধিপত্য বিস্তারের যোগ্যতা দান করে মানুষকে করা হয়েছে ধন্য ও মহিমান্বিত। মানুষের মধ্যে রয়েছে ভাল ও মন্দের প্রতি ঝোক প্রবাণতা। মহত্ব ও মর্যাদা তার সহজাত গুণাবলী। মানুষের যোগ্যতা ও সামর্থ সীমাহীন জ্ঞান অর্জন ও অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ও উভয় ক্ষেত্রেই। মহান আল্লাহর অসংখ্য নি‘আমত প্রাপ্ত এ প্রাণীর আল্লাহ এবং আল্লাহ কেন্দ্রিক চিন্তাধারা ছাড়া অন্য কোন কিছুর লালন সমূচিত নয়। পবিত্র কুরআনে তাদের সৃষ্টির রহস্য, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মপন্থা ও প্রদত্ত নি‘আমতরাজির বর্ণনাসহ স্ব-নামে (ইনসান) একটি সূরার অবতারণা হয়েছে, যার নির্দেশনার অনুসরণ ও অনুকরণে মানুষ পেতে পারে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি। এ মর্মে মহান আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন-‘‘ইহা এক উপদেশ, অতএব, যার ইচ্ছা সে তার প্রতিপালকের দিকে পথ অবলম্বন করুক।’’[88]

    আলোচ্য প্রবন্ধে মানুষের স্বরূপ উদঘাটনে যেসব আয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে মূলত: তার অধিকাংশই একটি বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু এর মাধ্যমে মানুষের জীবন্ত ও বাস্তব এমন কিছু চিত্র অংকিত হয়েছে যা বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে অলৌকিক ও চিরন্তর। কেননা এ চিত্রগুলো স্থান ও কালের আবর্তনে শতাব্দীর পর শতাব্দী চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে এবং তা সর্বদাই জীবন্ত, প্রাণবন্ত ও মূর্তমান।

    [1] . সূরা আল-আন‘আম: ৩৮। অন্যত্র আরো ষ্পষ্ট করে বলা হয়েছে:

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ

    ‘‘ আমি আত্মসম্পর্ণকারীদের জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ পথ নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদস্বরূপ তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করলাম। (সূরা আন-নাহল: ৮৯)

    [2] . সূরা বনী ইসরাইল:৭০।

    [3] . সুরা আল-হাজ্ব: ৬৫।

    [4] . আব্দুর রহমান আননাহলাভী, উসূলুত তারিবিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আসালিবুহা, দামেশক, দারুল ফিকর, ১৯৭৯ খ্রী. পৃ. ৩০।

    [5] . সূরা আস-সাজদা: ৭-৮।

    [6] . সূরা আল-হিজর: ২৮-২৯।

    [7] . সূরা আল-মু‘মিনুন:১২-১৪।

    [8] . সূরা আয-যুমার: ৬।

    [9] . সূরা আন-নিসা: ১।

    [10] . সূরা আশ-শামস: ৭-১০।

    [11] . সুরা আল-আলাক: ৩-৫।

    [12] . সূর বাকারা: ৯-১০।

    [13] . সূরা আন-নাহল: ৭৮।

    [14] . সূরা আল-বালাদ: ৮-৯।

    [15] . সূরা আর-রহমান: ১-৪।

    [16] . সূরা আল-আহযাব: ৭২।

    [17] . মুসলিম ইব্ন হাজ্জাক, সহীত মুসলিম, হাদীস নং: ৭৭১।

    [18] . সূরা আল-হাজ্ব: ৬৬।

    [19]. সুরা আল-আ‘রাফ: ১৭৯।

    [20] . সুরা আত-তীন: ৪-৬।

    [21] . ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আরবী-বাংলা ব্যবহারিক অভিধান, রিয়াদ প্রকাশনী, ঢাকা- চতুর্থ সংস্কার-২০০২, পৃ. ৩২২।

    [22] . সূরা আল-বাকারা: ৩০।

    [23] . সুরা আন’আম: ১৬৫।

    [24] . সূরা ছোয়াদ: ২৬।

    [25] . সূরা আল-বাকারা: ৩১-৩৩।

    [26] . সূরা আল-বাকারা: ২৬৯।

    [27] . সূরা আল-আন’আম: ৬০।

    [28] . সুরা আল-ইনসান: ২-৩।

    [29]. সুরা বনী ইসরাইল: ৭০।

    [30] . সুরা আশশামস: ৭-৮।

    [31] . সূরা আর-রাদ: ২৮।

    [32] . সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬।

    [33] . সূরা আল-হাশর: ১৯।

    [34] . সূরা আল-ফাজর: ২৭-৩০।

    [35] . ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৩।

    [36] . মুফতী আমীমুল ইহসান, কাওয়ায়েদুল ফিকহ, পৃ. ২০০।

    [37] . সূরা হা-মীম আস-সাজদা: ৩০।

    [38] . সূরা আল-ইমরান: ১৩৯।

    [39] . সুরা আল-হাশর: ৭।

    [40] . সূরা আল-বাকারা: ২৭৩।

    [41] . সহীত মুসলিম: হাদীস নং ১০৫১।

    [42] . ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৯।

    [43] . সূর আল-ইমরান: ১০২।

    [44] . সুরা আল-আরফাল:২।

    [45] . সূরা আল-ফুরকান: ৬৩।

    [46] . সুরা লুকমান: ১৮।

    [47] . সূরা আল-ইনসান: ৮-৯।

    [48] . সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৬।

    [49] . সূরআ আল-হাশর: ৯।

    [50] . সূরা আল-ইমরান: ১৪৩।

    [51] . সূরা আল-ইমরান: ১৩৬।

    [52] . সূরা আল-ইমরান: ১৩৩।

    [53] . সূরা ইউনুস: ১২।

    [54] . সূরা আল-মা‘আরিজ: ১৯-২১।

    [55] . সূর হুদা: ৯-১০।

    [56] . সুরা বনী ইসরাইল: ৮৩।

    [57] . সূরা আল-হাজ্জ: ১১।

    [58] . ইমাম বুখারী, সহীহ বুখারী, কিতাবুত্তাফসীর, হাদীস নং ৪৩৮১।

    [59] . সুরা আল-আনকাবুত: ১০।

    [60] . সূরা আল-আনফাল: ৬।

    [61] . সূর আল মুদ্দাছছির।

    [62] . সূরা আলে ইমরান: ১৮৮।

    [63] . সূরা আন নিসা: ১৪১।

    [64] . সূরা আল-বাকারা: ৮৯।

    [65] . সূরা আন-নূর: ৪৮-৪৯।

    [66] . সূরা আল-মুনাফিকুন: ৪।

    [67] . সূরা আত-তাওবা: ১২৭।

    [68] . সূরা আল-বাকারা: ১৪।

    [69] . সূরা আন-নিসা: ১৪৩।

    [70] . সূরা আল-বাকার: ৮ ও ৯।

    [71] . সূরা আল-কাহফ: ৫৪।

    [72] . সূরা আল-ইমরান: ৬৬।

    [73] . সূরা আল-হাজ্ব: ৮।

    [74] . সূরা আল-বাকারা: ১১-১২।

    [75] . সূরা আত-তাওবা: ৪২।

    [76] . সূরা আল-আন’আম: ২৭-২৮।

    [77] . সূরা আল-বাকারা: ১০০।

    [78] . সূরা আল-বাকারা: ১৭০।

    [79] . সূরা আল-বাকারা: ৯৬।

    [80] . সূরা আল-ইনসান: ২৭।

    [81] . সূরা আন-নিসা: ৭২-৭৩।

    [82] . সূরা আল বাকারা: ২০৪-২০৫।

    [83] . সূরা মুহাম্মদ: ১৬।

    [84] . ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৪।

    [85] . সূরা আল-নিসা: ১৭-১৮।

    [86] . সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৭।

    [87] . সূরা বনী ইসরাইল: ১১।

    [88] . মহান আল্লাহ বলেন:

    إِنَّ هَذِهِ تَذْكِرَةٌ فَمَنْ شَاءَ اتَّخَذَ إِلَى رَبِّهِ سَبِيلًا

    (সূরা আল-ইনসান: ২৯)

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ