ইসলামী মিডিয়ার উৎস, মূলনীতি ও ভিত্তিসমূহ

বর্ণনা

ইসলামী মিডিয়া কিসের থেকে উৎপন্ন হয়েছে, কিসের উপর তার ভিত্তি, আর তার মূলনীতি কি হওয়া উচিত, প্রবন্ধকার তা বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়াস পেয়েছেন।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    ইসলামী মিডিয়ার উৎস, মূলনীতি ও ভিত্তিসমূহ

    [ বাংলা – Bengali – بنغالي ]

    ড. মো: আব্দুল কাদের

    সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    2012 - 1434

    الإعلام الإسلامي : المصادر والأصول والأسس

    « باللغة البنغالية »

    د. محمد عبد القادر

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    2012 - 1434

    ইসলামী মিডিয়ার উৎস, মূলনীতি ও ভিত্তিসমূহ

    ইসলামী মিডিয়া একটি বিশেষায়িত মিডিয়া। যার উৎসমূল অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এর মূলভিত্তি প্রধান দু’টি বিষয়ের দিকে নিবদ্ধ। আর তা হল, কুরআনুল কারীম ও রাসূলের সুন্নাহ্‌। মিডিয়া মানুষের এক ধরনের প্রচেষ্টা ও তৎপরতা, যা যোগাযোগের সকল মাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার উপর ভিত্তি করে এটি পরিচালিত হয়। যেসব মৌলিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে ইসলামী মিডিয়া পরিচালিত হবে, তা-ই ইসলামী মিডিয়ার ভিত্তি। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হল:

    ক.ইসলামী মিডিয়ার উৎসমূহ

    প্রত্যেক মিডিয়ার উৎসমূল রয়েছে যার দ্বারা মিডিয়া পরিচালিত হয়। ইসলামী মিডিয়াও অনুরূপ উৎসের অধিকারী। এর উৎসসমূহ ইসলামের উৎসের মত। আর এটি একটি বিশেষায়িত মিডিয়া। নিম্নে এর উৎসসমূহ বিস্তারিত আলোকপাত করা হল:

    প্রথমত: কুরআনুল কারীম

    মহাগ্রন্থ আল্-কুরআন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এর অলৌকিকত্ব অত্যন্ত ব্যাপক, ভাষা উচ্চারণ, বর্ণনা ভঙ্গিমা,
    অর্থ প্রভৃতি ক্ষেত্রে এটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। যেহেতু এটি মানবজাতির হেদায়াতের নিমিত্তে নাযিলকৃত, সেহেতু এতে দুনিয়া ও আখেরাতের সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿مَّا فَرَّطۡنَا فِي ٱلۡكِتَٰبِ مِن شَيۡءٖۚ ٣٨ ﴾ [الانعام: ٣٨]

    ‘‘এ কিতাবে আমরা কোন কিছুই বাদ দেইনি।’’ [1]

    অতএব, আল-কুরআন রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রেরিত রিসালাত যা মানবজাতির পূর্ণ হিদায়াতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে এটি মিডিয়া বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও প্রভাবিত একটি গ্রন্থ। যাতে মানুষের মাঝে প্রভাব সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন মাধ্যম ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। আর মুসলিমগণ মানুষের পরস্পরের মাঝে যে কোনো সংবাদ বা ইসলামী দা‘ওয়াতী মেসেজ পৌঁছে দিতে কুরআন থেকেই উপর্যুক্ত পদ্ধতি ও মাধ্যম অন্বেষণ করে। কুরআনুল কারীম বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী মিডিয়াও মানব অন্তরের গভীরে যেতে চায় তার স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখে। সুতরাং এর মূলভিত্তি প্রধান দু’টি বিষয়ের দিকে নিবদ্ধ। আর তা হল, কুরআনুল কারীম ও রাসূলের সুন্নাহ্‌। বিদায় হজ্জের ভাষণে এ দু’টি বিষয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তৎকালীন অন্যতম গণমাধ্যম বক্তৃতার মাধ্যমে লাখ জনতার উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী ও অনুপস্থিত সকল মুসলিমকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন -

    «تَركْتُ فيكُمْ أَمْرَيْنِ لنْ تَضِلُّوا ما تَمسَّكْتُمْ بهما: كتابَ الله وسنّة رسولِهِ»

    ‘‘আমি তোমাদের কাছে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না যতক্ষণ সেগুলো আঁকড়ে ধরে রাখ- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত[2]।’’

    ইসলামী মিডিয়ার অবশ্য কর্তব্য হলো উপর্যুক্ত দু’টি বিষয়কে আবশ্যক করে নেয়া, চাই তা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হোক অথবা বাস্তবিক অনুশীলনের ক্ষেত্রে হোক। অন্যথায় এটি ইসলামী মিডিয়া বলে গণ্য হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا ٣٦ ﴾ [الاحزاب: ٣٦]

    ‘‘আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ের ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হবে।’’[3]

    ইসলামের সকল বিধি-বিধানের প্রধান উৎস আল কুরআন। চাই তা ইবাদতের ক্ষেত্রে হোক অথবা মু‘আমিলাতের ক্ষেত্রে হোক। উসূলবিদগণের নিকট কুরআন হলো,

    "كلام الله تعالى المنزّل على رسول الله صلى الله عليه وسلم المنقول عنه نقلا متواترا بلا شبهة والمكتـوب في المصاحف وهو اسم للنظم والمعنى جميعا"

    অর্থাৎ ‘‘মহান আল্লাহর সে বাণী, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং অসংখ্য ধারাবাহিক সূত্রে সন্দেহাতীতভাবে বর্ণিত হয়েছে; আর যা সহীফাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এটি শব্দ ও অর্থ উভয়টির নাম’’।

    এর তেলাওয়াত ব্যতীত সালাত শুদ্ধ হয় না। আল্লাহ বলেন,

    ﴿ ۞ فَٱقۡرَءُواْ مَا تَيَسَّرَ مِنۡهُۚ ٢٠ ﴾ [المزمل: ٢٠]

    ‘‘তোমরা কুরআনের সহজ অংশ তেলাওয়াত কর।’’[4]

    কুরআনের তেলাওয়াত ইবাদাত এবং গবেষণামূলক অধ্যয়ন মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে। যারা তা অস্বীকার করে তারা কাফির হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এটি ইসলামী শরীয়তের যে কোনো দলীল-প্রমাণাদির ক্ষেত্রে প্রথম উৎস। আর এটি প্রধান সংবিধান ও প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত।[5]

    উপরে বর্ণিত কুরআনের সংজ্ঞা আরো স্পষ্ট করে দেয় যে, কুরআনের শব্দ ও অর্থ উভয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। আর রাসূলের দায়িত্ব হলো শুধু তা পৌঁছে দেওয়া। যাকে আমরা ‘‘الإعلام بالرسالة’’ বলতে পারি।

    কুরআনুল কারীম আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ قُرۡءَٰنًا عَرَبِيّٗا لَّعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ ٢ ﴾ [يوسف: ٢]

    ‘‘নিশ্চয় আমরা কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি।’’ [6]

    অর্থাৎ কুরআনের অনুবাদ কুরআন নয়, আর তা দিয়ে কোনো হুকুমও সাব্যস্ত হবে না। সালাত শুদ্ধ হবে না। ইসলামী শরীয়তের এটি উৎসও হবে না। এছাড়াও কুরআনের মত ধারাবাহিক বর্ণনায় নাযিলকৃত অকাট্য বিশ্বাসসহ অবতীর্ণ কোনো কিছু এর সমান হতে পারে না । অতএব, এ অর্থে এটি সকল গবেষক, ফকীহ ও মুজতাহিদের নিকট প্রধান উৎস। পবিত্র কুরআনের বর্ণিত যাবতীয় বিধি-বিধান, শিক্ষা, শিষ্টাচার, আখলাক ইসলামী মিডিয়ার প্রধান উৎস। প্রত্যেক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অথবা মিডিয়া সংস্থার উচিত হলো কুরআনুল কারীমের উপরোক্ত বিষয়াদির সাথে একাত্মতা পোষণ করা। ফলে ইসলামী মিডিয়ার বার্তা স্থির; যা পরিবর্তনীয় নয়। কেননা অন্যান্য মিডিয়ার উৎস মানব হওয়ায় তা পরিবর্তনীয়। কিন্তু ইসলামী মিডিয়ার উৎস কুরআন যা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। অতএব, মুসলিম মিডিয়া কর্মীর দায়িত্ব হলো- কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন ব্যতিরেকে রিসালাতের প্রচার চালানো।[7]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রচার কাজ ও ইসলামী মিডিয়া একই সূত্রে গাঁথা। যদিও সময় ও পারিপার্শ্বিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল। তথাপিও নূহ ‘আলা্ইহিস সালাম, লূত ‘আলা্ইহিস সালাম, ইব্রাহীম ‘আলা্ইহিস সালাম, শু‘আইব ‘আলা্ইহিস সালাম, হুদ ‘আলা্ইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-সহ নবী-রাসূলগণ মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

    কুরআনুল কারীমে দা‘ওয়াহ সংক্রান্ত, (إعلام) বা প্রচার-প্রোপাগান্ডা সংক্রান্ত, যোগাযোগ সংক্রান্ত অসংখ্য আয়াতের অবতারণা হয়েছে। এসব আয়াতে বর্ণিত পদ্ধতি ও বাচনভঙ্গি কুরআনের ভাষায় মিডিয়ার মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হওয়াকে আরো সুদৃঢ় করেছে। ফলে কুরআন অধ্যয়ন ও তার যথার্থ অনুধাবন ইসলামী মিডিয়ার অন্যতম প্রধান কাজ। কুরআনুল কারীম মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। নিম্নে সেসব পদ্ধতির বর্ণনা উপস্থাপিত হল।[8]

    এক. কিসসা (القصة)

    পবিত্র কুরআনের এক গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাধারা হলো কিসসা কাহিনী। মানব জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে এসব কিসসা বর্ণিত হয়েছে। ইউসূফ ‘আলা্ইহিস সালাম এর জীবন কাহিনীকে সর্বোত্তম কিসসা হিসেবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এগুলোর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে শিক্ষা দেয়া। ফলে মানুষের মাঝে কুরআনের নির্দেশনা পৌঁছে দিতে এটি অন্যতম একটি পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত রয়েছে। এসব বর্ণনা ও কাহিনী সত্য। কুরআনের এসব কিসসা কাহিনী মিডিয়ার উদ্দেশ্যকে বিভিন্নভাবে সুস্পষ্ট করে তোলে। যেমন:

    ক. সংবাদ (أخبار) : এক্ষেত্রে আদম ‘আলা্ইহিস সালাম এর জীবনী ও এ ধরাধামে তার সন্তানদের কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও মূসা ‘আলা্ইহিস সালাম, হারূন ‘আলা্ইহিস সালাম ও তাদের বিরুদ্ধাচরণকারী ফিরআউনের ঘটনাবলীসহ অনেক ঘটনা বিবৃত হয়েছে।

    খ. প্রশিক্ষণ (تربية) : কুরআন কিসসা কাহিনী বর্ণনাকে তারবিয়া বা প্রশিক্ষণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিভাবে মানুষ তাদের জীবন অতিবাহিত করবে এবং কিসে তাদের মুক্তি ও কিসে তাদের সফলতা রয়েছে তা উপস্থাপন করা হয় কিসসার মধ্যে। এক্ষেত্রে ইউসূফ ‘আলা্ইহিস সালাম এর কাহিনী ও মিশরের রাজার স্ত্রী জোলায়খার ঘটনা অন্যতম।

    গ. দৃঢ়ীকরণ (تثبيت) : কুরআনের কাহিনীর অন্যতম টার্গেট হলো মু’মিনের অন্তরকে দৃঢ় করা এবং কষ্ট ও দুঃখের কারণে মানব মনে যেসব দুশ্চিন্তা, দুঃখ, বেদনা, কষ্ট, সৃষ্টি হয় তা হতে বিরত রাখা। কুরআনুল কারীমে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্তরকে সুদৃঢ় করার জন্য অনেক কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যেগুলোর মাধ্যমে ইসলামী দা‘ওয়াহর পথে যুদ্ধ-বিগ্রহ অশান্তি ও তার সাহাবীদের কষ্ট দেখে বিচলিত না হয়ে দ্বীনের উপর অটল অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

    ঘ. শিক্ষা (تعليم) : কুরআনে বর্ণিত অধিকাংশ কিসসা-কাহিনী মানুষকে তাদের দ্বীনের মূল ভিত্তি ও শিষ্টাচার সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। কিরূপে মানুষ তাদের সন্তানদের সাথে আচরণ করবে, কিভাবে অপরাধীর প্রতিশোধ নিবে এবং মুহসিন বা সৎ মানুষ হওয়া যাবে এসব শিক্ষা দেয়। এক্ষেত্রে হাবিল কাবিলের কাহিনী ও শু‘আইব এর কন্যাদ্বয়ের সাথে মূসা ‘আলা্ইহিস সালাম এর আচরণ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও ইসলামী দা‘ওয়াত ও আখলাকের মূলনীতি এবং পবিত্র জীবনের ভিত্তি সম্পর্কেও কিসসা ও কাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

    দুই. সংলাপ (الحوار)

    কুরআনের অনেক স্থানে (الحوار) সংলাপের পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে যা মিডিয়ার অন্যতম কাজ। এর নীতিমালা আমরা ইবরাহিম ‘আলা্ইহিস সালাম ও তাঁর রবের মধ্যকার সংলাপের মধ্যে দেখতে পাই। যেমন আল্লাহ বলেন:

    ﴿ وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِ‍ۧمُ رَبِّ أَرِنِي كَيۡفَ تُحۡيِ ٱلۡمَوۡتَىٰۖ قَالَ أَوَ لَمۡ تُؤۡمِنۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِن لِّيَطۡمَئِنَّ قَلۡبِيۖ قَالَ فَخُذۡ أَرۡبَعَةٗ مِّنَ ٱلطَّيۡرِ فَصُرۡهُنَّ إِلَيۡكَ ثُمَّ ٱجۡعَلۡ عَلَىٰ كُلِّ جَبَلٖ مِّنۡهُنَّ جُزۡءٗا ثُمَّ ٱدۡعُهُنَّ يَأۡتِينَكَ سَعۡيٗاۚ وَٱعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٢٦٠ ﴾ [البقرة: ٢٦٠]

    ‘‘আর যখন ইব্রাহীম বলল, ‘হে আমার রব! কিভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন আমাকে দেখান’, তিনি বললেন, ‘তবে কি আপনি ঈমান আনেন নি?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই হাঁ, কিন্তু আমার মন যাতে প্রশান্ত হয়!’ আল্লাহ্ বললেন, ‘তবে চারটি পাখি নিন এবং তাদেরকে আপনার বশীভূত করুন। তারপর সেগুলোর টুকরো অংশ এক এক পাহাড়ে স্থাপন করুন। তারপর সেগুলোকে ডাকুন, সেগুলো আপনার নিকট দৌড়ে আসবে। আর জেনে রাখুন, নিশ্চয় আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ [9]

    অনুরূপ ভাবে মূসা ‘আলা্ইহিস সালাম ও ফির‘আউনের মধ্যকার সংলাপ কুরআনে এসেছে।

    ﴿ قَالَ فِرۡعَوۡنُ وَمَا رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٣ قَالَ رَبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا بَيۡنَهُمَآۖ إِن كُنتُم مُّوقِنِينَ ٢٤ قَالَ لِمَنۡ حَوۡلَهُۥٓ أَلَا تَسۡتَمِعُونَ ٢٥ قَالَ رَبُّكُمۡ وَرَبُّ ءَابَآئِكُمُ ٱلۡأَوَّلِينَ ٢٦ قَالَ إِنَّ رَسُولَكُمُ ٱلَّذِيٓ أُرۡسِلَ إِلَيۡكُمۡ لَمَجۡنُونٞ ٢٧ قَالَ رَبُّ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَمَا بَيۡنَهُمَآۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ ٢٨ قَالَ لَئِنِ ٱتَّخَذۡتَ إِلَٰهًا غَيۡرِي لَأَجۡعَلَنَّكَ مِنَ ٱلۡمَسۡجُونِينَ ٢٩ ﴾ [الشعراء: ٢٣، ٢٩]

    ‘‘ফির‘আউন বলল, ‘সৃষ্টিকুলের রব আবার কী? মূসা বললেন, ‘তিনি আসমানসমূহ ও যমীন এবং তাদের মধ্যবর্তী সব কিছুর রব, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। ফির‘আউন তার আশেপাশের লোকদের লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা কি ভাল করে শুনছ না?’ মূসা বললেন, ‘তিনি তোমাদের রব এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও রব।’ ফির‘আউন বলল, ‘তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসূল তো অবশ্যই পাগল।’ মূসা বললেন, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং তাদের মধ্যবর্তী সব কিছুর রব; যদি তোমরা বুঝে থাক!’ ফির‘আউন বলল, ‘তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্যকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর আমি তোমাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করব’।’’[10]

    এছাড়াও পবিত্র কুরআনে মিডিয়ার পরিধি অত্যন্ত ব্যপক। মানব জীবনের বিভিন্ন অংশে এটি ব্যাপৃত।[11] যেমন:

    1. আকীদা সংক্রান্ত (الإعلام عن العقيدة الربانيّة)
    2. ইবাদাত ও মু‘আমালাত (الإعلام عن العبادات والمعاملات)
    3. চরিত্র (الإعلام عن الأخلاق)
    4. জিহাদ (الإعلام عن الجهاد)
    5. শাস্তির বিধান (الإعلام عن نظام الحدود والعقوبات)
    6. পারিবারিক ব্যবস্থা (الإعلام عن نظام الأسرة)
    7. অদৃশ্য ও পূর্ববর্তী উম্মতদের অবস্থা (الإعلام عن المغيبات وأحوال الأمم السابقة)
    8. জীবনের বিভিন্ন দিক (الإعلام عن نواحي الحياة)

    দ্বিতীয়ত:সুন্নাহ

    ইসলামী শরী‘আতের দ্বিতীয় উৎস হলো সুন্নাহ। আর তা হলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, কাজ ও সমর্থনের সমষ্টি। এটি তিন ভাগে বিভক্ত।

    ক. সুন্নাতে মুয়াক্কিদাহ: যা পবিত্র কুরআনে বিধৃত হয়েছে। আর রাসূলের সুন্নাতে সেটাকে তাকিদ দেওয়া হয়েছে।

    খ. সুন্নাতে মুবাইয়্যেনাহ: যার কিছু অংশ কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। আবার কিছু অংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং কিয়দাংশ মুতলাক। হাদীসে সেটাকে বিস্তারিত বর্ণনা করেছে। কিংবা সেটার শর্তহীনতাকে শর্তযুক্ত করেছে। অথবা সেটার সাধারণ নির্দেশকে বিশেষায়িত করেছে।

    গ. সুন্নাহ মুশাররি‘আহ: এমন সব বিধান যা শুধু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে কুরআন নিরব। কিন্তু এতে কুরআনের সাথে কোনো বৈপরিত্য দেখা যায় না।

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দা‘ওয়াতী মিশনের সাথে সংশ্লিষ্ট হল সুন্নাত। প্রত্যেক রাসূলের আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়বদ্ধতা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿وَلَقَدۡ وَصَّلۡنَا لَهُمُ ٱلۡقَوۡلَ لَعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُونَ ٥١ ﴾ [القصص: ٥١]

    “আর অবশ্যই আমরা তাদের জন্য বাণীকে বিস্তৃত বণনা করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।” [12]

    ফলে রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে, বান্দা ও আল্লাহর মাঝে দূত ছিলেন। মানুষের জন্য যা কল্যাণকর তার নির্দেশনা দান ও হেদায়াতের আলোকবর্তিকা দেখানো নবী-রাসূলের একমাত্র কাজ। আর এটি ইসলামী মিডিয়ারও অন্যতম কাজ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

    রাসূলগণের এতদসংক্রান্ত কার্যাবলীকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি।

    প্রথমতঃ আল্লাহর বাণীর প্রচার করা (إبلاغ كلمات الله)

    দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর বাণী বর্ণনা করা (بيان كلمات الله)

    উপর্যুক্ত প্রথমটি দ্বিতীয়টির সাথে সম্পৃক্ত। রাসূল ও মানুষের মাঝে যে যোগাযোগ রয়েছে, সেটি যার মাধ্যমে প্রভাবিত হয় তা শুধু প্রচার দ্বারাই সম্ভব নয়। বরং একে আরো সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা অত্যন্ত জরুরী।

    দীনের আলোচ্য বিষয় মানব জাতি। আর যোগাযোগ হল দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী প্রাপ্ত হয়ে দীনের এ মহান কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতঃ তাদের হেদায়াত অন্বেষণ করতেন। মক্কার মুশরিকরা রাসূলের চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে তাঁকে এ কাজ হতে বাধা দিলেও তিনি দা‘ওয়াতের এ মিশন থেকে বিরত হন নি।[13]

    ইসলামী মিডিয়ার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এক অনুপম আদর্শ। তিনি ব্যক্তি যোগাযোগের মাধ্যমে অসংখ্য মুশরিককে ঈমানের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন। নবুওয়ত লাভের পর ইসলাম প্রচারে সকল উপকরণ কার্যত করার মাধ্যমে তিনি দীনের প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থ ও সুন্নাত কোষ অধ্যয়নের মাধ্যমে তার এমন চারিত্রিক গুণাবলী ফুটে উঠে, যা মূলতঃ ইসলামী দা‘ওয়াহ প্রচারকারী বা মিডিয়া ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি।

    ‘‘তিনি নম্র প্রকৃতির ছিলেন, উত্তম কথা বলতেন, বাজে কথা পরিহার করতেন। প্রত্যেক মানুষকে তাদের জ্ঞান অনুযায়ী সম্বোধন করতেন। তিনি পরিচিত সকল গোত্রের সাথে আলাপচারিতা করতেন। তিনি কঠোর ছিলেন না, মন্দের জবাবে ভাল ব্যবহার করতেন, অধিক দানশীল ছিলেন, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে মানুষকে দেখতেন। আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসতেন। সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। বিধবা ও মিসকীনদের প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসতেন, কষ্ট সহিষ্ণু ছিলেন। গরীব ও অভাবীদের সাথে নিয়ে পানাহার করতেন, বাজার থেকে নিজ হাতে দ্রব্যসামগ্রী বহন করে আনতেন।’’[14]

    উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন ইসলামী মিডিয়া কর্মীর সৃষ্টিগত, চারিত্রিক, ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিভিন্ন গুণাবলী নির্দিষ্ট করা হয়েছে।[15]

    ক. সৃষ্টিগত গুণ

    যেমন নম্র কথা, উত্তম শব্দ। গণ মাধ্যমের ক্ষেত্রে এ দু’টো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন দৃশ্যমান ও শ্রুত গণমাধ্যমসমূহ।

    খ. চারিত্রিক গুণ

    কাউকে বর্জন না করা, বাজে কথা না বলা, সহজ ও বোধগম্য শব্দ চয়ন করা এবং কঠোরতা পরিহার করা।

    গ. ব্যক্তিত্ব

    মন্দের বিপরীতে খারাপ কথা ও মন্দ পরিহার করা, দয়া পরবশ থাকা, বঞ্চিতকে দান করা, জালিমকে ক্ষমা করে দেওয়া, আর আল্লাহকে ভয় করা। এগুলো মুসলিম ব্যক্তিকে উত্তম সংবাদ দানে এবং সংঘাত এড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।

    ঘ. বাস্তবিক গুণাবলী:

    মুসলিমের উপর অত্যাবশ্যক হল রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গুণাবলী অর্জন করা, বিশেষতঃ মিডিয়ার ক্ষেত্রে। সর্বসাধারণ সম্পর্কে জানা, তারপর প্রত্যেকের জ্ঞান অনুযায়ী সম্বোধন করা। বর্তমান যুগের মনস্তাত্ত্বিকদের নিকট এ পদ্ধতি সাধারণের উপর প্রভাব ফেলতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমাদের দেখিয়ে গেছেন।

    ইসলামী দা‘ওয়াহ ও মিডিয়ার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা নিম্নরূপ:

    এক. বক্তৃতা

    খুতবা বা ভাষণ মিডিয়ার অন্যতম মাধ্যম। বক্তৃতার মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের পাশাপাশি প্রভাব সৃষ্টি করাও সম্ভব হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অনেক বড় খতীব। যুগে যুগে তাঁর খুতবার প্রভাবে মানব সমাজে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে দীনের দা‘ওয়াত দিতে খুতবাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। রাসূলের জুমআর খুতবা, বিদায় হজ্বের ভাষণ সর্বস্তরের মানুষের জন্য এক নির্দেশনা।

    দুই. পত্র প্রেরণ

    পত্র প্রেরণের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রক্রিয়া সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দা‘ওয়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পত্র প্রেরণ করেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে ইসলামের দা‘ওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করতেন। তন্মধ্যে রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াস ও পারস্যের বাদশাহ কায়সারের কাছে প্রেরিত পত্র উল্লেখযোগ্য। হিরাক্লিয়াসকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন,

    «بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ: سَلاَمٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الهُدَى أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلاَمِ أَسْلِمْ تَسْلَمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ الأَرِيسِيِّينَ " وَ ﴿يَا أَهْلَ الكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَنْ لاَ نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ﴾»

    ‘‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ হতে রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। সৎ পথ প্রাপ্তের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তৎপর, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। ইসলাম গ্রহণ কর, নিরাপত্তা পাবে। আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দিবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও; তবে নিশ্চয় অধীনস্থদের অপরাধও তোমার উপর বর্তাবে। আর (আল্লাহ বলেন) ‘আপনি বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! এস সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি।’ তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম’[16]।’’

    তিন. সংলাপ

    সংলাপ যোগাযোগ প্রক্রিয়া হিসেবে খুব প্রাচীন। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছেন; যা সংলাপের একমাত্র উপাদান। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিক, ইয়াহূদী, নাসারা সকলের সাথে সংলাপ করেছেন। তারা তাঁকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করতেন এবং তিনি তাদের সেসব প্রশ্নের জবাব দিতেন। ইসলামী মিডিয়ায় সংলাপকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামী সভ্যতার প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। ফলে অনেক আলিম, শিক্ষাবিদ, পন্ডিত, আহলে কিতাবদের সাথে সংলাপের আয়োজন করেছেন। সকল নবী রাসূলের প্রাথমিক উপাদান ছিল সংলাপ। তাঁরা অমুসলিমদের সাথে ডায়ালগ আদান-প্রদান করেই তাদেরকে ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছেন।

    খ. ইসলামী মিডিয়ার মূলনীতিসমূহ

    মিডিয়া মানুষের এক ধরনের প্রচেষ্টা ও তৎপরতা, যা যোগাযোগের সকল মাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে। চাই তা সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগ হোক বা সামাজিক হোক। মিডিয়া কর্মী তা পরিবেশনে কৌশল ও পদ্ধতি অবলম্বন করে যা সংশ্লিষ্ট সংবাদ পৌঁছাতে সহায়তা করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিডিয়া পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। তবে সেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কতিপয় নীতিমালা থাকে যার উপর ভিত্তি করে মিডিয়া পরিচালিত হয়। অনুরূপভাবে ইসলামী মিডিয়াও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। আর সেগুলো হলো:

    ক. ইসলামী আকীদা

    ইসলামী মিডিয়া মানুষের এমন সব আকীদা-বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট যা কুরআন সুন্নাহর সাথে সংগতিপূর্ণ। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের আকীদা পোষণ করা আবশ্যক। যাকে তাওহীদ বা একত্ববাদ বলে। আর এটি উলূহিয়াত, রুবুবিয়াত ও আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্দেশ করে।

    রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহর পক্ষ হতে ‘ওহী’ প্রাপ্ত হয়ে রিসালাতের অধিকারী হয়েছেন। আর তাঁর বড় ওহী হচ্ছে আল্-কুরআন। এতে করণীয় ও বর্জনীয় সকল কাজ সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা প্রাপ্ত হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করা নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছিলেন। ফলে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ও তা প্রচার-প্রসারে জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তারপর খুলাফায়ে রাশেদীনও তাঁর অনুসৃত নীতি কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে বাস্তবায়ন করে গেছেন। তবে তাদের সকল প্রচেষ্টা ছিল ঈমান ও আকীদা সম্পর্কে মানুষকে সজাগ করা। ইসলামী বিধি-বিধানের অনুসরণ করা এবং তার অনুগত হওয়া।

    খ. স্বাধীনতা ও জবাবদিহীতা

    মানুষ এক স্বাধীনসত্তা। ইসলাম তাকে আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা দিয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ যাবতীয় কাজে মানুষের অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে। তবে এ স্বাধীনতা লাগামহীন নয়। এর রয়েছে জবাবদিহিতা, যাতে করে জনসাধারণের কল্যাণ ও ইসলামী বিধানের অনুসরণ হয়। ফলে ইসলাম প্রদত্ত স্বাধীনতায় কোনো বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন থাকে না। এ মর্মে আল্লাহ বলেন:

    ﴿ وَلَا تَعۡتَدُوٓاْۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِينَ ١٩٠ ﴾ [البقرة: ١٩٠]

    ‘‘কিন্তু সীমালংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।’’ [17]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘‘তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর অন্যের জন্যও তা করবে।’’

    ইসলামী মিডিয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন আকীদার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা। বিভিন্ন যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের সাহায্যে মানুষ সাধারণতঃ তার স্বাধীনতা চর্চা করে থাকে। যেমন: বক্তৃতা-বিবৃতি, কবিতা, কিসসা-কাহিনী বর্ণনা ইত্যাদি। আর মানুষ তার মত অনুযায়ী নিজ নিজ আকীদার অনুশীলন করে। তবে এক্ষেত্রে জোর-জবরদস্তির কোনো স্থান নেই। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে অনেক আয়াত বিদ্যমান। যেমন:

    ﴿ لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ ٢٥٦ ﴾ [البقرة: ٢٥٦]

    ‘‘দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’’ [18]

    এছাড়া আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন:

    ﴿ ۚ أَفَأَنتَ تُكۡرِهُ ٱلنَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُواْ مُؤۡمِنِينَ ٩٩ ﴾ [يونس: ٩٩]

    ‘‘তবে কি আপনি মুমিন হওয়ার জন্য মানুষের উপর জবরদস্তি করবেন?’’[19]

    সাহাবীগণ তাদের জীবনে স্বাধীন ও জবাবদিহীমূলক সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে গেছেন। যেমন: ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন জেরুজালেম শহরের জন্য বিজয়ী মুসলিমদের সাথে নিয়ে শান্তি চুক্তি ও সন্ধি স্থাপন করতে গেলেন, তখন তিনি সেখানে দেখতে পেলেন ইয়াহূদীদের একটি মন্দির। আর তা মাটি দ্বারা ঢাকা ছিল এবং উপরের অংশটুকু দৃশ্যমান ছিল। তারপর তিনি অতিরিক্ত কাপড়সহ আসলেন। আর কিছু স্তুপীকৃত মাটি তুলে নিলেন। মুসলিম সৈন্যগণ তাঁকে অনুসরণ করতে লাগল। এভাবে মন্দিরটির ঢাকনা তুলে ফেলা হল এবং সেখানে ইয়াহূদীদের ধর্মীয় নিদর্শন প্রকাশ পেল।[20]

    উক্ত সফরে নামাযের সময় উপস্থিত হল, মুসলিমগণ বায়তুল মাকদাস গীর্জার পাশে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাদেরকে বারণ করলেন। সেখানে নামায আদায় করতে তিনি তাদেরকে গীর্জা দূরবর্তী স্থানে নামায আদায় করতে আহ্বান জানান। অতঃপর তাকে বলা হল- সেখানে নামায আদায় বৈধ নয় কী? প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন- আমার আশংকা হল যে, এখানে নামায আদায় করলে পরবর্তীতে মুসলিমগণ গীর্জা ভেঙ্গে ফেলবে এবং সেখানে মসজিদ বানাবে। পরবর্তীতে জেরুজালেম ভ্রমণকারীগণ স্বাক্ষী দিয়েছেন যে, সে স্থানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে যা মসজিদে ওমর ইবন্ খাত্তাব নামে পরিচিত। অতএব ওমরের আশংকা সঠিক ছিল। আর তিনি গীর্জার বাইরে অন্যত্র নামায আদায় করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার মূলনীতি বাস্তবায়ন করেছেন।

    অনুরূপভাবে মহিলাদের মহর ধার্য নিয়ে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর মতামতের বিপক্ষে একজন নারী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল কুরআনের আয়াতের অনুরূপ, তিনি (মহিলা) বলেছিলেন, ওমর কী ﴿ وَءَاتَيۡتُمۡ إِحۡدَىٰهُنَّ قِنطَارٗا [النساء: ٢٠]আয়াত পড়নি? ওমর তুমি কি জান قنطار কী? তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন- মহিলার মত সঠিক এবং ওমরের মত ভুল। এভাবে স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার উপর ভিত্তি করে ইসলামী মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    গ. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত

    ইসলাম আকীদাহ, শরী‘আত ও আখলাকের উপর প্রতিষ্ঠিত। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ মানুষের চরিত্র সংশোধনের নিমিত্তে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের চরিত্র সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق»

    ‘‘নিশ্চয় আমি তোমাদের চরিত্রকে পূর্ণতাদানকারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।[21]’’

    উপর্যুক্ত হাদীসটি দীনের অন্যতম মূলনীতি। ইসলামী রাষ্ট্র সর্বদা এ মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। চারিত্রিক গুণাবলী রক্ষা করতে গিয়ে একজন মুসলিম কখনো অপর মুসলিমের সম্মান, সম্পদ ও রক্তহানি ঘটাতে পারে না। এ দিকে লক্ষ্য করেই মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাঁর সেনা নেতা ইয়াযিদ ইবন্ আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন-

    ‘‘তাদের (সেনাদের) উপর গোয়েন্দাগিরি করবে না, তাহলে তারা তোমাকে লাঞ্ছিত করবে। তাদের গোপন বিষয় প্রকাশ করবে না, প্রকাশ্যে যা আছে তা যথেষ্ট মনে করবে।’’[22]

    এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীসের বক্তব্যের অনুরূপ, তিনি বলেন:

    «كل مسلم على المسلم حرام عرضه وماله ودمه»

    “প্রতিটি মুসলিমের সম্মান, সম্পদ ও জান অপর মুসলিমের উপর হারাম”[23]

    আলোচ্য হাদীসে যে নির্দেশনাগুলো পাই সেগুলো মিডিয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী মিডিয়া সর্বদা এসব অনুসরণ করে পরিচালিত হবে। মুসলিমগণের দোষ-ত্রুটি ও গোপন বিষয় অনুসন্ধানের চেষ্টা করবে না। গোয়েন্দাগিরি করবে না, বিনা প্রয়োজনে মানুষের দোষ অন্বেষণ করবে না। গীবত, চোগলখুরী ও অপবাদ দেয়া হতে বিরত থাকবে। এ মর্মে কুরআনে এসেছে-

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمۡ أَن يَأۡكُلَ لَحۡمَ أَخِيهِ مَيۡتٗا فَكَرِهۡتُمُوهُۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ تَوَّابٞ رَّحِيمٞ ١٢ ﴾ [الحجرات: ١٢]

    ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান পাপ এবং তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আর তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।’’ [24]

    এছাড়াও কোনো সংবাদ প্রাপ্ত হলে তার সত্যতা যাচাই করা ব্যতীত প্রচার না করা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন-

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإٖ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوۡمَۢا بِجَهَٰلَةٖ فَتُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلۡتُمۡ نَٰدِمِينَ ٦ ﴾ [الحجرات: ٦]

    ‘‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন বার্তা নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখ, এ আশঙ্কায় যে, অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।’’ [25]

    উপরোক্ত আয়াত, হাদীস ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর অছিয়াত থেকে আমরা যা পাই তা ইসলামী মিডিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর এতে মানুষের গোপন বিষয় প্রকাশ না করা, গোয়েন্দাগিরি না করা, প্রয়োজন ব্যতীত প্রকাশমান বিষয়কে যথেষ্ট মনে করার দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত যেসব খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, বুকলেট আমরা পড়ি এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে আমরা যা দেখি তা উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নয়। বিশেষ করে উচ্চ শ্রেণী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এসব বিষয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে ইসলাম মিডিয়াকে এসব খারাপ গুণাবলী পরিহার করে বড় মনের পরিচয় দিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা রাখতে নির্দেশ করে।

    ঘ. আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বব্যাপী

    মিডিয়ার কাজ হলো বিশ্বের সকল মানুষের কাছে সংবাদ পরিবেশন করা; আর ইসলামী মিডিয়ার লক্ষ্য হলো বিশ্বের সর্বসাধারণের কাছে সত্য ও সঠিক সংবাদ পৌঁছানো যা সাধারণের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়।[26]

    ইসলামী মিডিয়া সর্বদা দয়াপরবশ হয়ে দা‘ওয়াতী চরিত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী আহ্বান জানায়। এদিকে ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧ ﴾ [الانبياء: ١٠٧]

    ‘‘আর আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।’’ [27]

    অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহমত উৎসর্গ করা হয়েছে। আর তাবলীগ বা প্রচারের শর্ত হলো উত্তম কথা। এ মর্মে কুরআনের নির্দেশনা হলো:

    ﴿ ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِۦ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ ١٢٥ ﴾ [النحل: ١٢٥]

    ‘‘আপনি মানুষকে দা‘ওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করবেন উত্তম পন্থায়। নিশ্চয় আপনার রব, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্বন্ধে তিনি বেশী জানেন এবং কারা সৎপথে আছে তাও তিনি ভালভাবেই জানেন।’’ [28]

    কুরআনের অন্যত্র এসেছে:

    ﴿ وَقُولُواْ لِلنَّاسِ حُسۡنٗا ٨٣ ﴾ [البقرة: ٨٣]

    ‘‘মানুষের সাথে সদালাপ করবে।’’ [29]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের দা‘ওয়াতী মিশন বিশ্বের সকল মানুষের প্রতি নিবিষ্ট ছিল। আর এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইসলামী মিডিয়া আন্তর্জাতিক ও বিশ্বব্যাপী তাত্ত্বিক ও ফলিত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী দা‘ওয়াহ প্রচারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সাহাবীকে বিশ্বের অন্যান্য ভাষা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি যায়দ ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কে সুরিয়ানী ভাষা শিখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অতএব, এ নির্দেশনা ইসলামী মিডিয়া আন্তর্জাতিক হওয়ার পথকে সুগম করেছে।[30]

    এছাড়াও মুসলিম সর্ববৃহৎ সম্মেলন যা প্রত্যেক বছর হজ্বের সময় অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে বিশ্বের সকল দেশের মুসলিমগণ একত্রিত হন, যদিও তাদের ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল ভিন্ন। আর সেখানে ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী ও অনুপস্থিতদের জন্য নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়।

    গ. ইসলামী মিডিয়ার ভিত্তিসমূহ

    প্রত্যেক বিষয়ের একটি ভিত্তি থাকে। খুঁটি ছাড়া যেমন কোনো ভবন হয় না, তদ্রুপ ইসলামী মিডিয়াও কতিপয় ভিত্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যেসব মৌলিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে ইসলামী মিডিয়া পরিচালিত হবে, তা-ই ইসলামী মিডিয়ার ভিত্তি। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিসমূহ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা প্রদত্ত হলো:

    এক. ঈমান

    ইসলামী মিডিয়া এক আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নকে আবশ্যক করে। ফলে একনিষ্ঠ তাওহীদ মানব জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। কেননা এটি উলুহিয়াত ও ইবাদততত্ত্বের প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে। এছাড়াও এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মাঝে সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা এবং জগত ও জীবনের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। অনুরূপভাবে ফিরিশতা, আসমানী কিতাব, রিসালাত, পরকাল, তাকদীর প্রভৃতির প্রতি বিশ্বাস রেখে এ মিডিয়া পরিচালিত হবে। কেননা ঈমান আনয়নের পর ঈমানের উপর অটল-অবিচল থাকা আবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ فَٱسۡتَقِمۡ كَمَآ أُمِرۡتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطۡغَوۡاْۚ إِنَّهُۥ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ١١٢ وَلَا تَرۡكَنُوٓاْ إِلَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ ٱلنَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِنۡ أَوۡلِيَآءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ ١١٣ ﴾ [هود: ١١٢، ١١٣]

    ‘‘কাজেই আপনি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছেন তাতে অবিচল থাকুন এবং আপনার সাথে যারা তাওবা করেছে তারাও; এবং তোমরা সীমালংঘন করো না। তোমরা যা কর নিশ্চয় তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা। আর যারা যুলুম করেছে তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না; পড়লে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। এ অবস্থায় আল্লাহ্ ছাড়া তোমাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। তারপর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না।’’ [31]

    এছাড়াও হাদীসে এসেছে,

    عن سفيان بن عبد الله الثقفي قال قلت يا رسول الله قل لي في الإسلام قولا لا أسئل عنه أحدا بعدك قال«قل آمنت بالله فاستقم»

    ‘‘সুফিয়ান ইবন আব্দুল্লাহ আস্-সাকাফী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আমাকে ইসলামের’ এমন বিষয়ে বলুন, যার পরে আর কাউকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে হবে না। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি বল! আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি, অতঃপর তার উপর দৃঢ় থাক।’’[32]

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপরোক্ত বাণীটি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের অনুরূপ। মহান আল্লাহ বলেন-

    ﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ قَالُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُ ثُمَّ ٱسۡتَقَٰمُواْ فَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ١٣ ﴾ [الاحقاف: ١٣]

    ‘‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ্’ তারপর অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’’ [33]

    দুই. জ্ঞান

    الإعلام (ই’লাম)تعليم (তা’লীম) শব্দদ্বয় একই মূল থেকে উদগত। তবে الإعلام(ই’লাম) দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের সাথে নির্দিষ্ট। আর تعليم (তা’লীম) পূণরাবৃত্তি ও অধিকের সাথে সম্পৃক্ত যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি হয়।[34]

    অতএব الإعلام (ই’লাম)تعليم (তা’লীম) শব্দদ্বয় যোগাযোগের রূপ বা আকৃতি। প্রত্যেকটি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আর উভয়ে ইলম এবং মা‘আরেফাতের দিকে মুখাপেক্ষী।[35]

    ইসলামী মিডিয়া উপরোক্ত প্রশাখার উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃত অবস্থা ও লক্ষ্যের দৃষ্টিতে উভয়টি একই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿ فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ وَٱسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۢبِكَ ۡ ١٩ ﴾ [محمد: ١٩]

    ‘‘কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ্ নেই। আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্য।’’ [36]

    ইমাম বুখারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু স্বীয় গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে আলোচ্য আয়াত দিয়ে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন। যার নাম হল (باب العلم قبل القول والعمل) ‘‘কথা ও কাজের পূর্বে জ্ঞান’’। অতএব علم (ইলম) দ্বারা তিনি শুরু করেছেন যা সৎকাজের (আমালে সালিহ) মূলনীতি। আর ‘আমালে সালিহ হল মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড। আল্লাহ বলেন:

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣ ﴾ [الحجرات: ١٣]

    ‘‘হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’’ [37]

    অতএব, তাকওয়া হল ‘আমালে সালিহ’-এর ফল। ফলে إعلام (ই‘লাম) বা মিডিয়া প্রকৃত অর্থে জ্ঞান ও শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ইসলামী মিডিয়ার ক্ষেত্রে জ্ঞানের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী। কারণ ইসলাম আল্লাহর নিকট হতে প্রবর্তিত এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রচার-প্রসারে ব্রতী হয়েছেন। যেহেতু এ মিডিয়া ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত থাকে, সেহেতু ইসলামের খুঁটি-নাটি সব বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান লাভ অত্যাবশ্যক। এছাড়াও বিভিন্ন ভাষা সম্পর্কেও মিডিয়া কর্মীদের ধারণা থাকতে হবে। তাহলেই মিডিয়ার সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন ভাষা শিখতে সাহাবীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। প্রত্যেক জাতির নিকট প্রেরিত সকল নবী-রাসূল স্বজাতীয় ভাষা নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِهِۦ لِيُبَيِّنَ لَهُمۡۖ فَيُضِلُّ ٱللَّهُ مَن يَشَآءُ وَيَهۡدِي مَن يَشَآءُۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٤ ﴾ [ابراهيم: ٤]

    ‘‘আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, অতঃপর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ [38]

    অতএব, ভাষাজ্ঞান, অলঙ্কারিত্ব, যোগাযোগ মাধ্যম, স্পষ্ট ও অস্পষ্টতার মধ্যকার অর্থ উদঘাটনের জ্ঞান প্রভৃতি ইসলামী মিডিয়া কর্মীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। ফলে জ্ঞান ব্যতীত এ মিডিয়া কল্পনা করা অমুলক।

    তিন. মানবিকতা

    ইসলামী মিডিয়া ব্যাপকার্থে মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেয়। কেননা শরীর, রূহ ও ‘আকল এ তিনের সমন্বয়ে মানব প্রকৃতি গঠিত। আল্লাহ তা‘আলা সর্বোত্তমভাবে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাতে রূহ প্রবেশ করিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

    ﴿ لَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ فِيٓ أَحۡسَنِ تَقۡوِيمٖ ٤ ﴾ [التين: ٤]

    ‘‘অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।’’ [39]

    কুরআনের অন্যত্র এসেছে,

    ﴿ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ بِٱلۡحَقِّ وَصَوَّرَكُمۡ فَأَحۡسَنَ صُوَرَكُمۡۖ وَإِلَيۡهِ ٱلۡمَصِيرُ ٣ ﴾ [التغابن: ٣]

    ‘‘তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ ও যমীন যথাযথভাবে এবং তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর তোমাদের আকৃতি করেছেন সুশোভন। আর ফিরে যাওয়া তো তাঁরই কাছে।’’ [40]

    ইসলামী মিডিয়া সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টিকারী স্রষ্টার ইবাদত করার জন্য বান্দার সাথে আল্লাহর এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে। কেননা মানুষ সৃষ্টির মূলে স্রষ্টার একমাত্র উদ্দেশ্য হল তাঁর (আল্লাহ) ইবাদত। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে,

    ﴿ وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ ﴾ [الذاريات: ٥٦]

    ‘‘আর আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন এবং মানুষকে এজন্যই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।’’ [41]

    আর মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে ভাতৃত্ববোধের উপর পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, ন্যায়বিচার ও ইহসান-এর ভিত্তিতে। মহান আল্লাহ এদিকে ইঙ্গিত করেই বলেন,

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ ١٣ ﴾ [الحجرات: ١٣]

    ‘‘হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’’ [42]

    কুরআনের অন্যত্র এসেছে,

    ﴿ وَقُولُواْ لِلنَّاسِ حُسۡنٗا ٨٣ ﴾ [البقرة: ٨٣]

    ‘‘আর মানুষকে উত্তম কথা বল।’’ [43]

    অতএব, ইসলামী মিডিয়ার অন্যতম কাজ হল উত্তম কথা বা বক্তব্য উপস্থাপন। তবে এটি তখনই নিশ্চিত হবে উত্তম বলে, যদি তা ইনসাফপূর্ণ ও সত্য বক্তব্য হয়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতি আহ্বান জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُونُواْ قَوَّٰمِينَ لِلَّهِ شُهَدَآءَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا يَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَ‍َٔانُ قَوۡمٍ عَلَىٰٓ أَلَّا تَعۡدِلُواْۚ ٱعۡدِلُواْ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ ٨ ﴾ [المائ‍دة: ٨]

    ‘‘হে মুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকবে; কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করবে, এটা তাক্ওয়ার কাছাকাছি। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ্ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।’’[44]

    এ পৃথিবীতে যত সৃষ্টি আছে সবই মানব কল্যাণে নিয়োজিত। মহান আল্লাহ অধিকাংশ সৃষ্টিকে মানুষের অধীন করে দিয়েছেন, যেন তা মানুষের কল্যাণে আসে। প্রাণীকুল, জীবজন্তু, মাটির উপর উদগত গুল্ম- সবকিছু সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে একমাত্র মানুষ, যাতে তা নিজেদের উপকারে কাজে লাগানো যায়। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ [لقمان: ٢٠] ‘‘তোমরা কি দেখো না? নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে।’’ [45]

    ইসলামী মিডিয়া মানুষের পারস্পরিক উপরোক্ত সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টি রেখেই জীবন, জগৎ, আখেরাত প্রভৃতির প্রভূত কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়। তবে এক্ষেত্রে যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় এটা মূলতঃ আল্লাহর সুন্নাহর অন্তর্গত। তিনি কাউকে কাফির আবার কাউকে মু’মিন হিসেবে এ সমাজে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু মানবিকতা বিচারে প্রত্যেকেই তাঁর আলো, বাতাস, অক্সিজেনসহ নি‘আমতরাজি ভোগ করছে। আল্লাহ বলেন:

    ﴿ هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ فَمِنكُمۡ كَافِرٞ وَمِنكُم مُّؤۡمِنٞۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٢ ﴾ [التغابن: ٢]

    ‘‘তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কতক কাফির এবং কতক মুমিন। আর তোমরা যে আমল করছো আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।’’ [46]

    ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহু বলেন- নিশ্চয় মানুষের পূর্ণতার পরিধি দু’টি মূলের উপর। বাতিল থেকে হককে জানা। হক বাস্তবায়ণ করা। সৃষ্টির স্থান সম্পর্কে যে ভিন্ন রূপ আল্লাহর নিকট দুনিয়া ও আখেরাতে পরিলক্ষিত হয় তা একমাত্র দু’টি মূলের ভিন্নতার কারণে তাদের মর্যাদায় হয়ে থাকে। আর উভয়টিকেই অনুগ্রহ করে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীগণকে দিয়েছেন। তিনি বলেন,

    ﴿وَٱذۡكُرۡ عِبَٰدَنَآ إِبۡرَٰهِيمَ وَإِسۡحَٰقَ وَيَعۡقُوبَ أُوْلِي ٱلۡأَيۡدِي وَٱلۡأَبۡصَٰرِ ٤٥ ﴾ [ص: ٤٥]

    ‘‘আর স্মরণ করুন, আমাদের বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়া‘কূবের কথা, তাঁরা ছিলেন শক্তিশালী ও সূক্ষ্মদর্শী।’’ [47]

    আলোচ্য আয়াতে الأيدي বলতে সত্য বাস্তবায়নের শক্তি-সামর্থকে বুঝানো হয়েছে। الأبصار বলতে দ্বীনের ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টি দানকে বুঝায়। অতএব, এগুলো দ্বারা হককে পরিপূর্ণ পাওয়া ও তা বাস্তবায়নকে বুঝায়। এক্ষেত্রে মানুষকে চারভাগে বিভক্ত করা যায়। উপরোক্ত শাখাটি সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হিসেবে বিবেচিত।

    দ্বিতীয়ত: উপরোক্ত শাখার বিপরীত যার দ্বীনের ব্যাপারে কোনো দূরদৃষ্টি নেই এবং হক বাস্তবায়নের কোনো ক্ষমতা নেই। এ প্রকারের মধ্যে সৃষ্টির অধিকাংশ মানুষ অন্তর্ভুক্ত।

    তৃতীয়ত: তাদের দীনের ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে এবং জ্ঞানও আছে। কিন্তু তার (দীনের) প্রতি আহ্বান জানানোর বা হক বাস্তবায়নের কোনো শক্তি নেই। এ স্তরে দুর্বল মুমিনগণ অন্তর্ভুক্ত।

    চতুর্থত: যাদের শক্তি ও সাহস উভয়টি রয়েছে। কিন্তু দীনের কোনো জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টি নেই। তারা রহমানের বন্ধু ও শয়তানের বন্ধুর মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে না। তাদের দৃষ্টিতে সবাই সমান।[48]

    তবে উপর্যুক্ত প্রথম প্রকারকেই মহান আল্লাহ নেতৃত্বের জন্য মনোনীত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

    ﴿ وَجَعَلۡنَا مِنۡهُمۡ أَئِمَّةٗ يَهۡدُونَ بِأَمۡرِنَا لَمَّا صَبَرُواْۖ وَكَانُواْ بِ‍َٔايَٰتِنَا يُوقِنُونَ ٢٤ ﴾ [السجدة: ٢٤]

    ‘‘আর আমরা তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমাদের নির্দেশ অনুসারে হেদায়াত করত; যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর তারা আমাদের আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।’’ [49]

    ইমাম কুরতুবী রাহেমাহুল্লাহ্‌ বলেন: جعلنا منهم أئمة অর্থাৎ নেতা সৃষ্টি যাদের আনুগত্য করা হয়। আর তারা হলো নবীগণ ‘আলা্ইহিমুস সালাম। তাঁরা হককে বাতিলের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তারাই মডেল বা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। কেননা তারা মানুষের সাথে প্রকৃত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সহজাত প্রবৃত্তি, আল্লাহর উলুহিয়াত, রুবুবিয়াত প্রভৃতির প্রকৃত অর্থ নিয়ে আহ্বান জানিয়েছেন।[50]

    চার. সামাজিকতা

    রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে ইসলাম মানব জীবনের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে। অতএব, ইসলাম আকীদা, শরী‘আত ও জীবন পদ্ধতির নাম। মানুষের বিভিন্ন কর্মতৎপরতা ও তার পরিধি যুগে যুগে একটি দীনের প্রতি মুখাপেক্ষী ছিল; যাতে তাদের লক্ষ্য ও উত্তম উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট হয় এবং বিধিসম্মত পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বনে সচেষ্ট হয়। আল্লাহ তা‘আলা নবী-রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,

    ﴿ لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَأَنزَلۡنَا ٱلۡحَدِيدَ فِيهِ بَأۡسٞ شَدِيدٞ وَمَنَٰفِعُ لِلنَّاسِ ﴾ [الحديد: ٢٥]

    ‘‘অবশ্যই আমরা আমাদের রাসূলগণকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সংগে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়ের পাল্লা, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমরা আরও নাযিল করেছি লোহা যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।’’ [51]

    শায়খুল ইসলাম ইবন্ তাইমিয়্যা রাহেমাহুল্লাহ্‌ বলেন, كتاب (কিতাব) দ্বারা ‘ইলম ও দীন প্রতিষ্ঠিত হয় আর ميزان (মীযান) দ্বারা হকসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর হাদীদ কাফির ও মুনাফিকদের ব্যাপারে حد প্রতিষ্ঠা করে।[52]

    কুরআন ও হাদীসে নেতার আনুগত্য করাকে ওয়াজিব করা হয়েছে। সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজে নিষেধ করা, জিহাদ, ন্যায় বিচার, ঐক্যবদ্ধ থাকা, হজ্ব, ঈদ উদযাপন ও অপরাধের শাস্তি বিধান করা নেতৃত্ব ব্যতীত সম্ভব নয়। আর নেতার আনুগত্য করা ওয়াজিব ও তা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জিত হয়।[53]

    হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «نضر الله أمرأ سمع منا حديثا فحفظه حتى يبلغه غيره فإنه رب حامل فقه ليس بفقيه ورب حامل فقه إلى من هو أفقه منه ثلاث خصال لا يغل عليهن قلب مسلم أبدا إخلاص العمل لله ومناصحة ولاة الأمر ولزوم الجماعة فإن دعوتهم تحيط من ورائهم»

    ‘‘আল্লাহ তাকে সমুজ্জল করুন যে আমার কোনো হাদীস শুনেছে অতঃপর তা অন্যের নিকট পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করে। আর এমন কতক সংরক্ষণকারী আছে যারা ফকীহ নয়, আবার এমন অনেক আছেন যারা তাদের থেকে অধিক জ্ঞানী লোকদের মুখাপেক্ষী। তিনটি স্বভাব যা থেকে মুমিনের অন্তর বিচ্যুত হয় না তা হলো, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য কাজ করা, নেতৃবৃন্দের জন্য নসীহত, জামাতবদ্ধ হওয়া। নিশ্চয় তাদের দো‘আ তাদেরকে বেষ্টন করে আছে।’’ [54]

    মুসলিম সমাজে ইসলামী মিডিয়া ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অংশ বিশেষ। আর এটা স্বাধীন ও জবাবদিহীমূলক ব্যবস্থা যা শরী‘আতের নিয়ম নীতি দ্বারা অর্থনৈতিক আন্দোলনকে এবং আধুনিক মানব রচিত ব্যবস্থার বিপরীতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা উন্নয়ন করে।[55]

    মুসলিম সমাজের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ইসলামী মিডিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস, শরী‘আত ও জীবন প্রণালীকে ঠিক রেখে ইসলামী রাজনৈতিক জীবনকে সামঞ্জস্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রে মিডিয়া অবদান রাখতে পারে। ইসলামী মিডিয়ার লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান, অনুরূপভাবে ইসলামী রাজনীতির উদ্দেশ্যও তাই। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি মানবকল্যাণ সাধন এর লক্ষ্য। অতএব, সামাজিক ভিত্তির উপর এ মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।

    পাঁচ. কার্যক্ষমতা ও প্রায়োগিকতা

    ইসলামী মিডিয়া শুধুমাত্র তাত্ত্বিক কোন পদ্ধতি ও চিন্তাপ্রসূত নয়। বরং একে প্রায়োগিক ও ফলিত কার্য হিসেবে ধরা হয়। মিডিয়া কর্মীর সম্বোধন ও প্রচার মাধ্যমসমূহ পরিপূর্ণরূপে লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতঅর্থে মিডিয়া সংগঠন এক সংস্থার নাম যা সৃজনশীল সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রযুক্তি। আর এটি নিম্নের ভিত্তিসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত। যেমন:

    এক. যোগাযোগের মাধ্যমে মিডিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। মিডিয়া গবেষকগণের অধিকাংশের ঐকমত্যে মিডিয়া কর্মের উপর যোগাযোগের একটা প্রভাব থাকে।[56]

    তবে একজন ইসলামী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কার্যগত ও প্রায়োগিক ভিত্তিকে আবশ্যক করা যথেষ্ট মনে করবে না; বরং এটা আরো কিছু বিষয়ের দিকে সম্বন্ধযুক্ত হবে।

    ক. কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার ভিত্তিকে মূল্যায়ন করা। আর এটা জাতির চিন্তা-চেতনা ও প্রিয় সাংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে।

    খ. সত্যবাদিতা ও সংবাদ সংগ্রহে অবিচল থাকা। যেমন আল্লাহর বাণী,

    ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإٖ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوۡمَۢا بِجَهَٰلَةٖ فَتُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلۡتُمۡ نَٰدِمِينَ ٦ ﴾ [الحجرات: ٦]

    ‘‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন বার্তা নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখ, এ আশঙ্কায় যে, অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।’’ [57]

    নিশ্চয় আল্লাহর সাথে, আত্মার সাথে এবং মানুষের সাথে সত্যবাদিতা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার কারণ। এ সম্পর্কে রাসূলের একটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,

    «إن الصدق يهدي إلى البر وأن البر يهدي إلى الحنة - وإن الرجن ليصدق حتى يكتب عن يديه صدقا وإن الكذب يهدي إلى الفجور وإن الفجور يهدي إلى النار وإن الرجل ليكذب حتى يكتب عنه كذابا»

    নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা পূন্যের পথ উম্মুক্ত করে। আর পূন্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। কোন ব্যক্তি যখন সত্য কথা বলতে থাকে এবং সত্য কথা বলার চেষ্টা অব্যহত রাখে তখন এভাবে এক সময় আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী বলে লিখিত হয়ে যায়। আর তোমরা মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকবে। কেননা মিথ্যা পাপের পথ দেখায়। আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর কোন ব্যক্তি যখন মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যা বলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে তখন এক সময় সে আল্লাহর নিকট মিথ্যাবাদি বলেই লিপিবদ্ধ হয়।[58]

    গ. সময় ও পরিবেশ বিবেচনায় আনা।

    ঘ. মিডিয়া কর্মের অলংকারিত্ব।[59]

    [1]. আল্-আন‘আম: ৩৮।

    [2] মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদীস নং ১৮৭৪; ইবন আবদিল বার, জামে‘ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহী, নং ১৩৮৯।

    [3]. সূরা আহযাব : ৩৬।

    [4]. সূরা মুযযাম্মিল : ২০।

    [5]. যাকারিয়া আলবিরী, উসূলুল ফিকহিল ইসলামী, (কায়রো : ১৯৭৭ ইং), পৃ. ১৫।

    [6]. সূরা আয্-যুখরুফ : ৩।

    [7]. মুহাম্মদ আমীন হাসান, আল মাদখাল ইলাদ দাওয়াহ ওয়াল ‘ইলাম আল ইসলামী (জর্ডান : দারুল আ’মল, প্রথম সংস্করণ, ২০০৩ ইং ) পৃ. ১১৫।

    [8]. মুহম্মাদ কামাল উদ্দীন ইমাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪২-১৪৪।

    [9]. সূরা আল্-বাকারাহ : ২৬০।

    [10]. সূরা শুআরা ২৩-২৯।

    [11]. ড. মুহাম্মদ আমীন হাসান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬।

    [12]. সূরা আল্-কাসাস : ৫১।

    [13]. মইন উদ্দিন রাকারী, ফুনুনু নাজরিয়াতুল ইসলামীয়াহ লিল ই‘লাম, মাজাল্লাতুল মুসলিম আল মু‘আছের, দশম খন্ড, পৃ. ৬২।

    [14]. ড. মুহাম্মদ কামালুদ্দীন ইমাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৬।

    [15]. প্রাগুক্ত।

    [16] বুখারী, হাদীস নং ৭; মুসলিম, হাদীস নং ১৭৭৩। আর আয়াতটি সূরা আলে ইমরানের ৬৪ নং আয়াত।

    [17]. সূরা আল্-বাকারাহ : ১৯০।

    [18]. সূরা আল্-বাকারাহ : ২৫৬।

    [19]. সূরা ইউনুস : ৯৯।

    [20]. ড. প্রফেসর আদনান আদ্-দুবসী, আল্-ই‘লামুল ইসলামী : আল আদহাফ ওয়াল ওয়ায়েফ, দারু উসামা, তা. বি, পৃ. ৪২-৪৩।

    [21] বাইহাকী ফিল কুবরা, ১০/১৯১; নং ২০৫৭১।

    [22]. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত্-তারিখ, বৈরুত: দারুল ‘ইলম লিল মালাইন, দ্বিতীয় খন্ড, তা.বি., পৃ. ৪০৫।

    [23] অর্থাৎ যাতে তা লঙ্ঘন না করা হয়। হাদীসটি ইমাম তিরমিযী উদ্ধৃত করেছেন, নং ১৯২৭।

    [24]. সূরা হুজরাত : ১২।

    [25]. সূরা হুজরাত : ৬।

    [26]. প্রফেসর আদনান আদ্-দুবাসী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭।

    [27]. সূরা আম্বিয়া : ১০৭।

    [28]. সূরা নাহল : ১২৫।

    [29]. সূরা আল্-বাকারাহ : ৮৩।

    [30]. ইবন সাদ, মুহাম্মদ, আত্-তাবাকাত, মাতবা‘আ বেরিল, ১৩২২ হি., ২য় খন্ড, পৃ. ৩৫৮।

    [31]. সূরা হুদ : ১১২, ১১৩।

    [32]. ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, ১ম খন্ড, রিয়াদ : ইদারাতুল বুহুস আল ইলমীয়াহ ওয়াল ইফতা, ওয়াদ দাওয়াহ, ১৪০০ হি. পৃ. ৬৫।

    [33]. সূরা আহকাফ : ১৩।

    [34]. ইবনু কাইয়্যেম আল জাওযিয়্যাহ, মাদারেজুস্ সালেকীন বাইনা মানাযেলে ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন, কায়রো: দারুল হাদীস, তা. বি., পৃ. ৩৫১।

    [35]. ড. সাঈদ ইবন্ আলী সাবেত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২।

    [36]. সূরা মুহাম্মদ : ১৯।

    [37]. সূরা হুজুরাত : ১৩।

    [38]. সূরা ইবরাহীম : ৪।

    [39]. সূরা আত্-তীন : ৪।

    [40]. সূরা তাগাবুন : ৩।

    [41]. সূরা আয্-যারিয়াত : ৫৬।

    [42]. সূরা হুজুরাত : ১৩।

    [43]. সূরা আল্-বাকারাহ : ৮৩।

    [44]. সূরা আল মায়িদা : ৮।

    [45]. সূরা লুকমান : ২০।

    [46]. সূরা তাগাবুন : ২।

    [47]. সূরা ছোয়াদ : ৪৫।

    [48]. ইবনুল কাইয়্যেম, আল জাওয়াবুল কাফী লিমান সা‘আলা আনিদ দাওয়ায়ে শাফী, (রিয়াদ : মাকতাবাতুর রিয়াদ আল হাদীসাহ, ১৩৮৭ হি.), পৃ. ৮২।

    [49]. সূরা আস্-সাজদা : ২৪।

    [50]. ইমাম কুরতূবী, আল্-জামি লি আহকামিল কুরআন, (বৈরুত : দারুল কিতাবিল আরাবী, তা. বি.), ৪র্থ সংস্করণ, পৃ. ১০৮।

    [51]. সূরা হাদীদ : ২৫।

    [52]. الكتاب به يقوم العلم والدين والميزان به تقوم الحقوق ـــ والحديد به تقوم على الكافرين والمنافقين

    দ্র. ইবন্ তাইমিয়্যাহ, মাজমূউল ফাতাওয়া, ৩৫তম সংস্করণ, (রিয়াদ : রিসালাতুল আম্মাহ লিল বুহুস ওয়াল ইফতা ওয়াদ দাওয়া ওয়াল ইরশাদ, ১৩৯৮ হি.), পৃ. ৩৬।

    [53]. ইবন্ তাইমিয়্যাহ (র.), আস সিয়াসাতুশ শরয়ী‘আহ ফী ইসলাহির রাঈ‘ ওয়ার রা‘ঈয়াহ, (বৈরুত : দারুল কিতাব আল আরাবী, ১৯৫১ খ্রি.), পৃ. ১৭২।

    [54]. ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, মুসনাদ, বাবু হাদীসু আবু যার গিফারী (রা.), ৫ম খন্ড, পৃ. ১৮৩, হাদীস নং ২১৬৩০।

    [55]. আব্দুল হক শুকাইরী, আত্-তানমিয়াতুল ইকতিসাদিয়া ফিল মানহাজিল ইসলামী, সিলসিলাতু কিতাবিল উম্মাহ, সংস্করণ ১৭, ১৪০৭ হি.), পৃ. ৮২।

    [56]. মুহাম্মদ করম সুলায়মান, আত্-তারীখুল ই‘লামী ফী দুয়েল ইসলাম (মানসূরাহ : দারুল ওয়াফা, ১৪০৯ হি.) পৃ. ৩২।

    [57]. সূরা হুজরাত : ৬।

    [58]. ইমাম নবুবী, রিয়াদুস সালেহীন (দামেশক : মাকতাবাতুল গাযালী, তা. বি) পৃ. ৪৪।

    [59]. ড. সাঈদ ইবন আলী ইবন্ সাবিত, আল উসূলুল ফিকরিয়্যাহ লিল ‘ইলাম (রিয়াদ : দারুল ফজিলাহ, ১ম সংস্করণ ১৪১৮ হি.), পৃ. ১৬৭।

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ