জামাআতে সালাতের গুরুত্ব ; প্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ

বর্ণনা

জামাআতে সালাতের গুরুত্ব ; প্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ : জামাআতে সালাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন ও হাদীসে জামাআতে সালাত আদায়ের বর্ণনা কিভাবে এসেছে-জামাআতে সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফযীলত কি, জামাআতভূক্তিতে সালাতের ব্যাপারে সালফে সালেহীনের আচরণ কিরূপ ছিল-রচনাটি ইত্যাদি বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণবন্ত আলেখ্য হতে পারে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    জামা‘আতে সালাত আদায়ের গুরুত্ব, পরিপ্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ

    أهمية الصلاة مع الجماعة

    < بنغالي >

    আবুল কালাম আজাদ

    أبو الكلام أزاد

    —™

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    জামা‘আতে সালাত আদায়ের গুরুত্ব, পরিপ্রেক্ষিত বর্তমান সমাজ

    আল্লাহ তা‘আলা সালাতের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সালাতের প্রতি যত্নবান ও জামা‘আতভুক্ত হয়ে সালাত আদায়ের আদেশ করেছেন। সালাতকে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرۡكَعُواْ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ ٤٣ ﴾ [البقرة: ٤٣]

    “আর সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং সালাতে রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৩]

    আর এর প্রতি অবমাননা এবং তা আদায়ে অলসতা মুনাফিকের আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ﴾ [النساء: ١٤٢]

    “মুনাফিকরা অবশ্যই প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে অথচ তারা প্রকারান্তরে নিজেদেরই প্রতারিত করছে। বস্তুত তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তারা দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪২]

    অন্যত্র বলা হচ্ছে:

    ﴿وَلَا يَأۡتُونَ ٱلصَّلَوٰةَ إِلَّا وَهُمۡ كُسَالَىٰ﴾ [التوبة: ٥٤]

    “তারা সালাতে আসে কেবল আলস্যভরে।” [সূরা আত-তওবাহ, আয়াত: ৫৪]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন। যুদ্ধ কি শান্তি, সুস্থ কি অসুস্থ সকল অবস্থায় এমনকি মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায়ও তিনি সালাত আদায়ে বিন্দুমাত্র অবহেলা করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ ও পরবর্তীতে তাবে‘ঈন ও উত্তম পূর্বপুরুষগণ সালাতের প্রতি ছিলেন বর্ণনাতীতভাবে ঐকান্তিক এবং একনিষ্ঠ। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি রীতিমতো ঘাবড়ে দেওয়ার মতো।

    বর্তমানে অনেক মুসলিম-ই সালাত আদায়ে ভীষণভাবে উদাসীন। জুমু‘আর সালাতে মসজিদে উপচে-পড়া ভীড় হচ্ছে ঠিকই; তবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে মসজিদের অধিকাংশ জায়গাই থাকে মুসল্লিশূন্য। সালাত বিষয়ে মুসলিমদের অবহেলার আদৌ কোনো কারণ থাকতে পারে না। সালাত বিষয়ে অবহেলার অর্থ ঈমানের একটি মৌলিক দাবি ও ইসলামের একটি রুকন ও প্রধানতম নিদর্শন বিষয়ে অবহেলা। আর যারা এ ধরনের অবহেলা প্রদর্শনে অভ্যস্ত তাদের অপেক্ষায় থাকবে মর্মন্তুদ শাস্তি, কঠিন নারকীয় আযাব।

    আমাদের পূর্বপুরুষগণ জামা‘আতভুক্ত হয়ে সালাত আদায়ের প্রতি ছিলেন খুবই যত্নশীল। তাদের নিকট এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম; এমনকি জামা‘আত ছুটে গেলে খুবই মর্মাহত হতেন তারা। মনোকষ্টে অশ্রু ঝরাতেন। সমবেদনা জানাতেন একে অপরকে জামা‘আত ছুটে যাওয়ার কারণে।

    জামা‘আতভুক্ত হয়ে সালাত না আদায়ের ফলে সালফে সালেহীনের মনোবেদনা:

    হাতেম আল-আসাম্ম রহ. বলেন: আমি জামা‘আতে সালাত আদায়ে সক্ষম না হওয়ায় শুধুমাত্র আবু ইসহাক আল-বুখারীই সমবেদনা জানান। অথচ যদি আমার সন্তান মারা যেত, তাহলে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ আমাকে সমবেদনা জানাত। কেননা দীনের ওপর আপতিত মুসীবত তাদের নিকট দুনিয়ার মুসীবতের চেয়েও সহজ।

    জামা‘আতে সালাত আদায় তাদের নিকট দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অথচ আমরা মরিয়া হয়ে দুনিয়ার পিছনেই লেগে রয়েছি। দুনিয়া অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ ভয়ে অনেক সময় সালাতও আদায় করছি দেরী করে। শুধু তাই নয়; বরং আমাদের মাঝে এমন অনেকই আছেন, যারা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্যের পিছনে তাড়িত হয়ে সালাত আদায়ই ছেড়ে দিয়েছে সম্পূর্ণভাবে।

    মায়মুন ইবন মেহরান রহ. মসজিদে এলে তাকে বলা হলো, সমস্ত লোক চলে গিয়েছে। তিনি বললেন:

    إنا لله وإنا إليه راجعون

    “ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।” এ সালাতের মর্যাদা আমার নিকট ইরাকের গভর্ণর হওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয়।

    ইউনূস ইবন আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, আমার যদি মুরগী হারিয়ে যায়, তবে আমি তার জন্য চিন্তিত হই অথচ সালাত ছুটে গেলে তার জন্য চিন্তিত হই না।

    সালাফে সালেহীনগণ সালাতের আওয়াজ শোনার সাথে সাথে মসজিদে যাবার জন্য প্রতিযোগিতা করতেন। ইমামের সাথে প্রথম তাকবীরে উপস্থিত হবার জন্য তারা সকলে ছিলেন প্রচণ্ড আগ্রহী। সা‘ঈদ ইবন মুসায়্যিব রহ. বলেন, পঞ্চাশ বৎসর ধরে আমার প্রথম তাকবীর ছুটে নি। পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত আমি ফরয সালাতে মানুষের ঘাড় দেখি নি। অর্থাৎ তিনি পঞ্চাশ বৎসর ধরে প্রথম কাতারেই শামিল ছিলেন।

    ওকী‘ ইবন জাররাহ রহ. বলেন, প্রায় সত্তর বৎসর পর্যস্ত আ‘মাশ রহ.-এর প্রথম তাকবীর ছুটে নি। ইবন সামা‘আহ রহ. বলেন, চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত আমার তাকবীরে উলা ছুটে নি। শুধু যে দিন আমার মায়ের মৃত্যু হয় সে দিন ছুটেছিল।

    প্রিয় ভাই! আমাদের অবস্থা আর সালফে সালেহীনের অবস্থার মাঝে অনেক ব্যবধান। তাদের নিকট সালাতের গুরুত্ব ছিল আপরিসীম আর আমরা এর অবমাননা করছি হরহামেশা। তারা এর প্রতি যত্নবান ছিলেন আর আমরা করছি অলসতা। তারা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী চাকচিক্যের উপর সালাতকে প্রাধান্য দিয়েছেন আর আমরা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি এবং একে (সালাতকে) পিছনে ফেলে রেখেছি। এর গুরুত্বপূর্ণ সাওয়াব ও অফুরন্ত ফযীলতের প্রতি তাদের উৎসাহ ছিল অপরিসীম আর আমরা এ থেকে বিমুখ।

    জামা‘আতে সালাত আদায়ের ফযিলত ও ফলাফল:

    জামা‘আতে সালাত আদায়ের ফযীলত ও মর্যাদা অনেক। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:

    ১। সালাত পাপমোচন এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «ألا أدلكم على ما يمحو الله به الخطايا ويرفع به الدرجات؟ قالوا: بلى يا رسول الله قال: إسباغ الوضوء على المكاره وكثرة الخطا إلى المساجد وانتظارالصلاة بعد الصلاة فذلكم الرباط».

    “আমি কি তোমাদের এমন বিষয় জানাব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? সাহাবায়ে কেরাম বললেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন: তা হচ্ছে কষ্টের সময়ে যথাযথভাবে অযু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি পদচারণ করা এবং এক সালাতের পর অন্য সালাতের অপেক্ষায় থাকা। ‌এটাই হলো সীমান্ত প্রহরা”[1]

    অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «من راح إلى مسجد الجماعة فخطوة تمحو سيئة وخطوة تكتب له حسنة ذاهبا وراجعا».

    “যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে যায়, তার আসা এবং যাওয়ায় প্রতি পদক্ষেপে গুনাহ মিটে যায় এবং প্রতি পদক্ষেপে নেক ‘আমল লেখা হয়”[2]

    ২। সালাত বান্দাকে শয়তান থেকে হিফাজত করে এবং তার প্ররোচনা থেকে নিরাপদ রাখে:

    হাদীসে আছে,

    «ما من ثلاثة في قرية ولابدو لا تقام فيهم الصلاة إلا قد استحوذ عليهم الشيطان، فعليكم بالجماعة فإنما يأكل الذئب القاصية».

    “যে জনপদ কিংবা মরুপ্রান্তরে তিনজন লোক অবস্থান করে অথচ তারা জামা‘আত কায়েম করে সালাত আদায় করে না, শয়তান তাদের উপর চড়ে বসে। কাজেই জামা‘আতে সালাত আদায় করা একান্ত অপরিহার্য। কারণ, বাঘ দলছুট বকরীটিকেই উদরস্থ করে”[3]

    ৩। নিফাক থেকে পরিত্রাণ এবং জাহান্নাম খেকে মুক্তি:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «أثقل صلاة على المنافقين صلاة العشاء والفجر».

    “ইশা ও ফজরের সালাত মুনাফিকদের নিকট সবচেয়ে বেশি ভারী বোঝা বলে মনে হয়”[4]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন:

    «من صلى أربعين يوما في جماعة يدرك التكبيرة الأولى كتب له براءتان : براءة من النار وبراءة من النفاق».

    “যে ব্যক্তি একাধারে চল্লিশ দিন পর্যন্ত প্রথম তকবীরের সাথে জামা‘আতে সালাতে আদায় করে, তার জন্য দু’টি মুক্তি রয়েছে: জাহান্নাম থেকে মুক্তি আর নিফাক থেকে মুক্তি”[5]

    ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

    «ولقد رأيتنا وما يتخلف عنها إلا منافق معلوم النفاق».

    “এক সময় আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে, একমাত্র প্রকাশ্য মুনাফিক ব্যতীত আর কেউ জামা‘আতে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকে নি”[6]

    ৪। কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «بشر المشائين في الظلم إلى المساجد بالنور التام يوم القيامة».

    “অন্ধকার রাতে মসজিদে গমনকারীদের জন্য ক্বিয়ামত দিবসে পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও”[7]

    ৫। জামা‘আতে সালাত আদায়কারী আল্লাহর হিফাযতে:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

    «ثلاثة كلهم ضامن على الله عز وجل (ومنهم) ... ورجل راح إلى المسجد فهو ضامن على الله حتى يتوفاه فيدخله الجنة أو يرده بما نال من أجر وغنيمة».

    “তিন ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মায়। ... আর মসজিদে গমনকারী ব্যক্তি। সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে; এমনকি, তার মৃত্যু হলে তাকে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অথবা তাকে ছাওয়াব বা গনীমত প্রদান করে (বাড়ীতে) ফিরিয়ে দিবেন”[8]

    তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «من صلى الصبح في جماعة فهو في ذمة الله فمن أخفر ذمة الله كبه الله في النار لوجهه».

    “যে ব্যক্তি সকালের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করে, সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে। যে আল্লাহর জিম্মাকে অবমাননা করবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”(দারেমী, হাদীস নং ৩৩৬৭)

    একটু ভেবে দেখুন! যে ব্যক্তি সকল ফরয-সালাত জামা‘আতের সাথে মসজিদে আদায় করে তার অবস্থা কত কল্যাণময় হতে পারে?

    ৬। ঘরে সালাত আদায়ের চেয়ে মসজিদে সালাত আদায় অধিক সাওয়াবের উপযোগী বানায়:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «صلاة الرجل في جماعة تضعف على صلاته في بيته وفي سوقه خمسا وعشرين ضعفا وذلك أنه إذا توضأ فأحسن الوضوء ثم خرج إلى المسجد لا يخرجه إلا الصلاة لم يخط خطوة إلا رفعت له بها درجة وحط عنه بها خطيئة فإذا صلى لم تزل الملائكة تصلى عليه ما دام في مصلاه: اللهم صل عليه اللهم ارحمه ولا يزال أحدكم في صلاة ما انتظر الصلاة».

    “জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় ঘরে বা বাজারের সালাতের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি সাওয়াবের অধিকারী বানায়। আর এটা এভাবে যে, যখন সে খুব সুন্দর করে অযু করে এবং (সালাতের জন্য) মসজিদের উদ্দেশো বের হয়। এ অবস্থায় সে যতবার পা ফেলে, প্রতিবারের পরিবর্তে একটি করে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি করে গুনাহ ক্ষমা করা হয়। তারপর যখন সে সালাত আদায় করতে থাকে, ফিরিশতাগণ তার জন্য রহমতের দো‘আ করতে থাকেন। যতক্ষণ সে সালাতের জায়গায় বসে থাকে ফিরিশতারা তার জন্য এই বলে দো‘আ করেন যে, হে আল্লাহ! এ ব্যক্তির ওপর রহমত নাযিল কর। হে আল্লাহ! এর ওপর সালাত পাঠ কর। আর যতক্ষণ সে সালাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, ততক্ষণ সে সালাতের অন্তর্ভুক্ত থাকে”[9]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «من غدا إلى المسجد أو راح أعد الله له في الجنة منزلا كلما غدا أو راح».

    “যে ব্যক্তি সকালে বা সন্ধ্যায় মসজিদে গমন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারীর ব্যবস্থা করেন। যতবার সে সকালে বা সন্ধ্যায় গমন করে তত বারই”[10]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «من خرج من بيته متطهرا إلى صلاة مكتوبة فأجره كأجر ه الحاج المحرم».

    “যে ব্যক্তি নিজ গৃহ থেকে পবিত্র হয়ে ফরয সালাতের জন্য বের হয়, তার সাওয়াব একজন হজ পালনকারীর সাওয়াবের সমান”[11]

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

    «أراد بنو سلمة أن يتحول إلى قرب المسجد قال: والبقاع خالية فبلغ ذلك النبي صلى الله عليه وسلم فقال يا بني سلمة دياركم تكتب آثاركم فقالوا ما كان يسرنا أن كنا تحولنا».

    “বনু সালামাহ গোত্র মসজিদের কাছে স্থানান্তরিত হতে মনস্থ করল। তিনি বলেন: জায়গা খালি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি তাদেরকে বললেন: হে বনু সালামাহ! তোমরা তোমাদের বর্তমান বাসস্থানগুলো ধরে রাখ। মসজিদে গমনাগমনের পদক্ষেপগুলো তোমাদের জন্যে লিখে রাখা হবে। তারা বললেন: স্থানান্তরিত হওয়া আমাদের কিই-বা আনন্দ দিতে পারে”?[12]

    ৭। জামা‘আতে সালাত আদায়কারী কিয়ামত দিবসে আরশের নিচে ছায়া পাবেন:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «سبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله .وذكر منهم ورجل قلبه معلق بالمساجد».

    “সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা ছায়া দান করবেন ঐ দিন, যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না... তাদের মধ্যে একজন হলো ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে লাগানো। অর্থাৎ সালাত ও জামা‘আতের প্রতি আগ্রহী”[13]

    ৮। আল্লাহ তা‘আলা মুসল্লীর আগমনে খুশী হন:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «لا يتوضأ أحدكم فيحسن وضوءه ويسبغه ثم يأتي المسجد لا يريد إلا الصلاة فيه إلا تبشبش الله إليه كما يتبشبش أهل الغائب بطلعته».

    “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পরিপূর্ণভাবে অযূ করে শুধুমাত্র সালাতের উদ্দেশ্যেই মসজিদে আসে, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি এমন খুশি হন যেরূপ নিরুদ্দেশ ব্যক্তির আচম্বিতে ফিরে আসায় তার পরিবারের সদস্যরা খুশি হয়”[14]

    ৯। জামা‘আতে সালাত একাগ্রতা অর্জন ও অন্তর বিগলিত হওয়ার উপকরণ:

    কোনো মুসলিম যখন মসজিদে প্রবেশ করে তখন দুনিয়ার সকল ব্যস্ততা থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নেয়। আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়। অতঃপর সে মসজিদে আগত মুসল্লীদের আল্লাহর সামনে রুকু-সাজদাহরত অবস্থায় দেখে। যিকির এবং কুরআন তিলাওয়াত প্রত্যক্ষ করে। আল্লাহর কালাম স্বকর্ণে শোনার সুযোগ পায়। এ সব থেকে সে বুঝতে পারে যে, এ ময়দান আল্লাহ ও তার জান্নাত লাভের উদ্দেশে প্রতিযোগিতার ময়দান। আর এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাকারীরাই আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয়।

    ১০। জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় মুসলিমদের মাঝমাঝে পারস্পরিক আন্তরিকতা ও মহব্বত সৃষ্টি করে:

    জামা‘আতে সালাতে আদায়ের মাধ্যমে মুসলিমগণ দিন ও রাতে পাঁচবার পরস্পর মিলিত হয়। তাদের মাঝে সালাম বিনিময় হয়। একে অপরের খোঁজ-খবর নেয়। হাসিমুখে একে অন্যের সাথে সাক্ষাত করে। এ সব বিষয় পারস্পরিক মহব্বত, ভালোবাসা এবং একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়।

    ১১। আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদের নিকট মুসল্লীদের নিয়ে গর্ব করেন:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

    «أبشروا هذا ربكم قد فتح بابا من أبواب السماء يباهي بكم الملائكة يقول: انظروا إلى عبادي قد قضوا فريضة وهم ينتظرون أخرى».

    “তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের প্রভু আসমানের দরজাসমূহের একটি দরজা খুলেছেন। সেখানে তোমাদের নিয়ে ফিরিশতাদের নিকট গর্ব করে বলেন, দেখ আমার বান্দাদেরকে, তারা একটি ফরয আদায় করেছে এবং আরেকটি ফরযের জন্য অপেক্ষা করছে”[15]

    ১২। অজ্ঞ লোকের জন্য রয়েছে শিক্ষা এবং বিজ্ঞলোকের জন্য রয়েছে উপদেশ:

    যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে মসজিদে সালাত আদায় করে, সে সালাতের আহকাম, আরকান, সুন্নাত ইত্যাদি বিষয়গুলো আহলে ইলম থেকে শিখতে পারে। আহলে ইলমের সালাত দেখে উক্ত ব্যক্তি নিজের ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন করে নেয়। এমনিভাবে ওয়াজ-নসীহত শুনে ভালো কাজে উৎসাহিত হয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে। এতে সে অনেক উপকৃত হয়, যা ঘরে সালাত আদায় করে আদৌ সম্ভব নয়।

    ১৩। আল্লাহ তা‘আলা জামা‘আতে সালাত আদায়ে মুগ্ধ হন:

    কতই না সৌভাগ্য ঐ ব্যক্তির, যার আমল দেখে সৃষ্টিকর্তা মুগ্ধ হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «إن الله ليعجب من الصلاة في الجمع».

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা জামা‘আতে সালাত আদায় করাতে মুগ্ধ হন”[16]

    ১৪। জামা‘আতে সালাত আদায়ের সাওয়াব লিখা এবং আসমানে উঠানোর ব্যাপারে ফিরিশতাগণ বিতর্ক করেন:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «أتاني اللية ربي تبارك وتعالى في أحسن صورة قال: أحسبه في المنام فقال يا محمد هل تدري فيم يختصم الملآ الأعلى ؟ قلت لا، قال: فوضع يده بين كتفي حتى وجدت بردها بين ثدي أو قال: في نحري فعلمت ما في السموات وما في الأرض قال: محمد هل تدري فيم يختصم الملآ الأعلى؟ قلت نعم في الكفارات، والكفارات : المكث في المساجد بعد الصلوات والمشي على الأقدام إلى الجماعات وإسباغ الوضوء على المكاره ومن فعل ذلك عاش بخير ومات بخير وكان من خطيئة كيوم ولدته أمه».

    “এক রাতে আল্লাহ তা‘আলা এক জ্যোর্তিময় অবস্থায় (স্বপ্নে) আমার নিকট এলেন। তিনি বলেন, সম্ভবতঃ নিদ্রায় বলেছেন। এসে বললেন: হে মুহাম্মাদ! ঊর্ধ্বজগতে কী নিয়ে বিতর্ক হয় তুমি জান? আমি বললাম না। তিনি বলেন: অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন, আমি তার শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। (অথবা বললেন আমার গলায়) তখন বুঝতে পারলাম আসমান জমিনের মাঝে কি হচ্ছে? তিনি বললেন: হে মুহাম্মাদ! তুমি কি জান উপর আসমানে কী নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে? আমি বললাম: হ্যাঁ, কাফফারা সম্পর্কে। কাফফারা হল সালাতের পর মসজিদে অবস্থান করা। পায়ে হেঁটে জামা‘আতের জন্য গমন করা, কষ্টের সময়েও পুরোপুরি অযু করা। যে ব্যক্তি এটা করবে সে কল্যাণময় জীবন যাপন করবে এবং তার মৃত্যু মঙ্গলময় হবে। তার গুনাহগুলো মিটে এমন হবে যেন সে তার মায়ের উদর থেকে আজই জন্মগ্রহণ করল”[17]

    ১৫। এটা মানুষকে ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় অভ্যস্ত করে এবং নফলের প্রতি উৎসাহিত করে:

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «لو يعلم الناس ما في النداء والصف الأول ثم لم يجدوا إلا أن يستهموا عليه لاستهموا ولو يعلمون ما في التهجير لا ستهموا إليه ولو يعلمون ما في العتمة والصبح لآتوهما ولو حبوا».

    “যদি লোকেরা জানত আযান এবং প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর মধ্যে কী আছে আর লটারীর মাধ্যম ছাড়া তা অর্জন করার অন্য কোনো পথ না থাকত, তাহলে তারা অবশ্যই লটারী করত। যদি তারা জানত গরমের সময় ভর দুপুরে মসজিদে যাওয়ার কী ফযীলত তাহলে অবশ্যই তার জন্যে প্রতিযোগিতা করত। যদি তারা ইশা ও ফজরের সালাতের মধ্যে কী মর্যাদা আছে জানতে পারত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দু’টি সময়ের সালাতে শামিল হত”[18]

    নুরূপভাবে সালাতের সাথে সালাত আদায় ব্যক্তিকে নফল সালাত আদায়েও অভ্যস্ত করে তুলে। যে ব্যক্তি সালাত কায়েমের পূর্বে মসজিদে আসে, সে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায়ের সুযোগ পায়, সুন্নাত পড়ার সুযোগ পায়, কুরআন তিলাওয়াত, দো‘আ, ইসতিগফার ইত্যাদির সুযোগ পায়। আর কিছু না করলেও অন্তত সালাতের অপেক্ষায় চুপ করে বসে থাকতে পারে। আর এ সময় ফিরিশতাগণ তার জন্য এই বলে দো‘আ করতে থাকে যে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা কর, তার প্রতি রহম কর।

    আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

    «أحدكم ما قعد ينتظر الصلاة في صلاة ما لم يحدث تدعو له الملائكة اللهم اغفر له اللهم ارحمه».

    “তোমাদের কোনো ব্যক্তি যখন সালাতের জন্য নিজের মুসল্লায় অপেক্ষা করতে থাকে, তখন ফেরেশতাগণ তার জন্য দো‘আ করতে থাকে, যতক্ষণ তার অযু ভঙ্গ না হয়। ফিরিশতাগণ বলতে থাকে, হে আল্লাহ! তুমি একে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ! তুমি এর ওপর রহম কর”[19]

    [1] তিরমিযী, হাদীস নং ৪৮

    [2] আহমাদ, হাদীস নং ৬৩১১

    [3] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০

    [4] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ১৪১১

    [5] তিরমিযী, হাদীস নং ২২৪

    [6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৪৬

    [7] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৪৭

    [8] আবু দাউদ হাদীস নং ২১৩৩

    [9] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৬১১

    [10] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৬২২

    [11] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭১

    [12] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬৯

    [13] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৬২০

    [14] ইবন খুযাইমাহ, হাদীস নং ৮১৩১

    [15] আহমাদ; ইবন মাজাহ্‌, হাদীস নং ৭৯৩

    [16] আহমাদ, আলবানী এটিকে হাসান বলেছেন।

    [17] তিরমিযী, হাদীস নং ৩১৫৭

    [18] সহীহ বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৫৮০

    [19] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৬৩

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ