সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ

বর্ণনা

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: এ কাজটি দীনের অবশ্য করণীয় বিষয়। দীনের মৌলিক স্তম্ভবিশেষ, এর মাধ্যমে উম্মতের সদস্যগণ নিজেরা সঠিক থাকবে অপরকে সঠিক রাখবে। এর মাধ্যমে হক্ব উপরে উঠবে, বাতিল বিচূর্ণ হবে, শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকবে। তার রয়েছে শরী‘আতগত পরিচিতি, তাৎপর্য, শর্ত, আদব ও যুগান্তকারী ফলাফল। এ প্রবন্ধ সংক্ষেপে তা তুলে ধরেছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ

    الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر

    < بنغالي >

    ইকবাল হোছাইন মাসুম

    إقبال حسين معصوم

    —™

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ

    আল-আমরু বিল মা‘রূফ বা সৎ কাজের আদেশ। এখানে মা‘রূফ শব্দটির আভিধানিক অর্থ, জ্ঞাত ও জানা বস্তু বা বিষয়। কারণ, عرف يعرف معرفة وعرفانا এর অর্থ জানা। আর মুনকার শব্দের অর্থ হচ্ছে অজ্ঞাত, অজানা, অপরিচিত বস্তু। সে হিসেবে ‘আল-মা‘রূফ হচ্ছে, অজ্ঞাত ও অপরিচিত এর বিপরীত বিষয়াদি। তাছাড়া আল-মা‘রূফ শব্দটি মা‘রিফাহ বা জানা এবং মুস্তাহসান বা উত্তম ও কল্যাণকর উভয়কে শামিল করে।

    শরী‘আতের পরিভাষায় মা‘রূফ হচ্ছে:

    اسم جامع لكل ما عرف من طاعة الله والتقرب إليه بفعل الواجبات والمندوبات.

    “এমন সকল ফরয ও নফল কাজের সামষ্টিক নাম, যাতে আল্লাহর আনুগত্য ও নৈকট্য আছে বলে জানা যায়।”

    পক্ষান্তরে মুনকার হচ্ছে মা‘রূফের বিপরীত আর তা হচ্ছে,

    وهو كل ما قبحه الشرع وحرمه وكرهه.

    “এমন কথা ও কাজ যাকে শরী‘আত ঘৃণিত, হারাম ও অপছন্দনীয় সাব্যস্ত করেছে।

    উপরোক্ত সংজ্ঞাদ্বয়কে সামনে রাখলে আমরা দেখতে পাব যে শরী‘আতের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক সব বিষয় যেমন আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদত, আখলাক-সুলুক ও মু‘আমালাত-ফরয হোক বা হারাম, মুস্তাহাব কিংবা মাকরূহ-সবই উভয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর মধ্যে যা ভালো ও কল্যাণকর তা মা‘রূফের অন্তর্ভুক্ত আর যা খারাপ ও অকল্যাণকর তা মুনকারের অন্তর্ভুক্ত।

    ‘আমার বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ ওয়াজিব। এ মর্মে অনেক আয়াত ও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এটি ওয়াজিবে কেফায়া। উম্মতের যথেষ্ট পরিমাণ অংশ এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যদের থেকে গুনাহ রহিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:-

    ﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤﴾ [ال عمران: ١٠٤]

    “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা সৎকাজের প্রতি আহ্বান করবে, নির্দেশ করবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হলো সফলকাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]

    আয়াতে (ولتكن) শব্দটি أمر তথা নির্দেশ সূচক বাক্য। যা আবশ্যকীয়তাকে প্রমাণ করে। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:

    ﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ سَيَرۡحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٧١﴾ [التوبة: ٧١]

    “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে। যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তা‘আলা দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৭১]

    আর মুনাফেক সম্পর্কে বলেছেন :

    ﴿ٱلۡمُنَٰفِقُونَ وَٱلۡمُنَٰفِقَٰتُ بَعۡضُهُم مِّنۢ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمُنكَرِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمَعۡرُوفِ﴾ [التوبة: ٦٧]

    “মুনাফিক নর, মুনাফিক নারী একে অপরের অনুরূপ। অসৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং সৎকর্মে নিষেধ করে।” [সূরা তাওবাহ, আয়াত: ৬৭]

    আল্লাহ তা‘আলা ‘আমর বিল মা‘রূফ এবং নেহি আনিল মুনকার’-কে (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) মুমিন ও মুনাফেকদের সাথে পার্থক্যকারী নিদর্শন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

    আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

    «سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: من رأى منكم منكرا فليغيره بيده، فإن لم يستطع فبلسانه، فان لم يستطع فبقلبه، و ذلك أضعف الإيمان».

    “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি তোমাদের কেউ অন্যায় অশ্লীল কর্ম দেখলে শক্তি দ্বারা প্রতিহত করবে। যদি সমর্থ না হও তাহলে কথার দ্বারা প্রতিহত করবে, এতেও সমর্থ না হলে মন থেকে তা প্রতিহত করবে। আর এটিই হচ্ছে সবচে দুর্বল ঈমান।”

    হাদীসে বর্ণিত فليغيره শব্দটি নির্দেশ সূচক বাক্য যা আবশ্যকীয়তার দাবিদার।

    আর এ বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্যও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইমাম নাওয়াওয়ী রহ. বলেন:

    وقد تطابق على وجوب الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر الكتاب والسنة والإجماع.

    “‘আমার বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে কুরআন, সুন্নাহ, এবং ইজমা অভিন্ন মত পোষণ করেছে।”

    বাকি থাকল ওয়াজিবে কেফায়া হওয়া। এটিও জমহুরে উম্মতের মতামতের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, আল্লামা ইবনুল আরাবী মালেকী রহ. আল্লাহর বাণী ولتكن منكم أمة প্রসঙ্গে বলেন: ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ যে ফরযে কেফায়া তার প্রমাণ এ আয়াতের মধ্যেই বিদ্যমান।

    ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর তিনটি তাৎপর্য:

    এক. সৃষ্টির বিরুদ্ধে আল্লাহর হুজ্জত তথা প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ﴾ [النساء: ١٦٥]

    “সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী রাসূল প্রেরণ করেছি যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ আরোপ করার মতো অবকাশ না থাকে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৫]

    দুই. আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণকারী ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’- পালন করার মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া। যেমন, শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের ভালো ও সৎ লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

    ﴿قَالُواْ مَعۡذِرَةً إِلَىٰ رَبِّكُمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ ١٦٤﴾ [الاعراف: ١٦٤]

    “তারা বলল, তোমাদের পালনকর্তার নিকট দায়িত্ব-মুক্তির জন্য এবং যাতে তারা সাবধান হয় এ জন্য।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৬৪]

    তিন. যাকে সৎ কাজের আদেশ দেওয়া হয় বা অসৎ কাজ থেকে বারণ করা হয় তার উপকারের প্রত্যাশা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿وَذَكِّرۡ فَإِنَّ ٱلذِّكۡرَىٰ تَنفَعُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٥﴾ [الذاريات: ٥٥]

    “আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কারণ, উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসবে।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৫]
    আমর বিল মারূফ ও নেহি আনিল মুনকারের ফযীলত:

    ‘আমর বিল মা‘রূফ এবং নেহি আনিল মুনকার’ ইসলামের একটি অত্যবশ্যকীয় দায়িত্ব। একটি মৌলিক স্তম্ভ এবং এ ধর্মের অনন্য বৈশিষ্ট্য। সংস্কার ও সংশোধনের বিশাল মাধ্যম। তার মাধ্যমে সত্যের জয় হয় এবং মিথ্যা ও বাতিল পরাভূত হয়। তার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধির বিস্তার ঘটে। কল্যাণ ও ঈমান বিস্তৃতি লাভ করে। যিনি আন্তরিকতা ও সততার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ পারিতোষিক।

    কুরআনে অসংখ্য আয়াত ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অগণিত হাদীস এর প্রমাণ বহন করে। এর অল্প কিছু নিচে প্রদত্ত হলো।

    ১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَيُطِيعُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ سَيَرۡحَمُهُمُ ٱللَّهُۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٧١﴾ [التوبة: ٧١]

    “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক-সুহৃদ। তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। সালাত প্রতিষ্ঠিত করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ রহম ও দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭১]

    আয়াতে পরিষ্কার দেখা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর ওপর রহমতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

    ২. মহান রাব্বুল আলামীন ‘আমর বিল মারূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর দায়িত্ব পালনকারীদের প্রশংসা এবং তাদের পরিণাম ও শেষ ফল কল্যাণময় বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

    ﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤﴾ [ال عمران: ١٠٤]

    “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই সফলকাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]

    ৩. ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ পার্থিব মুসীবত ও পরলৌকিক শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়। আল্লাহ বলেছেন:

    ﴿فَلَمَّا نَسُواْ مَا ذُكِّرُواْ بِهِۦٓ أَنجَيۡنَا ٱلَّذِينَ يَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلسُّوٓءِ وَأَخَذۡنَا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ بِعَذَابِۢ بَ‍ِٔيسِۢ بِمَا كَانُواْ يَفۡسُقُونَ ١٦٥ ﴾ [الاعراف: ١٦٥]

    “যে উপদেশ তাদের দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা বিস্মৃত হয়ে গেল। তখন আমি সে সব লোকদের মুক্তি দান করালাম যারা মন্দ কাজ থেকে বারণ করত। আর পাকড়াও করলাম গুনাহ্‌গার যালিমদেরকে নিকৃষ্ট ‘আযাবের মাধ্যমে তাদের নাফরমানির ফলস্বরূপ। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৬৫]

    ৪. ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ পরিত্যাগ করা আল্লাহর লা‘নত, গযব ও ঘৃণার কারণ এবং এ কারণেই দুনিয়া ও পরকালে কঠিন শাস্তি নেমে আসবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿لُعِنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۢ بَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ عَلَىٰ لِسَانِ دَاوُۥدَ وَعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَۚ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَواْ وَّكَانُواْ يَعۡتَدُونَ ٧٨ كَانُواْ لَا يَتَنَاهَوۡنَ عَن مُّنكَرٖ فَعَلُوهُۚ لَبِئۡسَ مَا كَانُواْ يَفۡعَلُونَ ٧٩ ﴾ [المائ‍دة: ٧٨، ٧٩]

    “বনী ঈসরাইলের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে দাউদ ও মারইয়াম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না যা তারা করত। তারা যা করত অবশ্যই মন্দ ছিল। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৭৮-৭৯]

    মন্দ কাজে বাধা প্রদান ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলি:

    প্রথমত: আদেশদান ও বাধা প্রদানকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি:

    ১. ঈমান: অমুসলিমদের ওপর এ দায়িত্ব ওয়াজিব নয়।

    ২. মুকাল্লাফ বা শরী‘আত কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়া: অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানকারীকে বুদ্ধিমান (عاقل) ও প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। নির্বোধ ও অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ওপর আদেশ ও নিষেধ করা ওয়াজিব নয়।

    ৩. সামর্থ্য: যিনি এ কাজে ক্ষমতা রাখেন তার উপরই ওয়াজিব। আর যার ক্ষমতা নেই, অক্ষম ও অসমর্থ তার উপর ওয়াজিব নয়। তবে তাকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে ও অপছন্দ করতে হবে। করা আবশ্যক।

    দ্বিতীয়ত: অসৎ কাজ (যা প্রতিহত করা হবে তার সাথে) সংশ্লিষ্ট শর্তাবলি:

    ১. কাজটি মন্দ ও নিষিদ্ধ এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। ধারণা ও সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে বাধা প্রদান বা প্রতিহত করণ জায়েয হবে না।

    ২. যে মন্দ কাজ প্রতিহত করার ইচ্ছা তাকে সম্পাদনকারী সহ প্রতিহত করার সময় কাজে লিপ্ত অবস্থায় পাওয়া যেতে হবে।

    ৩. প্রতিরোধ উদ্দিষ্ট অসৎকর্মটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হতে হবে। অনুমান নির্ভর হলে প্রতিহত করণ জায়েয হবে না। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ولا تجسسوا তোমরা দোষ ও গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না। [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

    তাছাড়া ঘর ও এ জাতীয় (সংরক্ষিত) জিনিসের একটি স্বকীয় মর্যাদা আছে। শর‘ঈ কোনো কার্যকারণ ব্যতীত সেটি বিনষ্ট কর বৈধ হবে না।

    ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ সম্পাদনকারীর কিছু আদব:

    ১. ইখলাস ও আন্তরিকতা:

    কারণ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের বাধা প্রধান একটি অন্যতম শীর্ষ ইবাদত। আর ইবাদত প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:

    ﴿فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ﴾ [الزمر: ٢]

    “অতএব আপনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত করুন।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২]

    ২. ইলম তথা প্রয়োজনীয় জ্ঞান:

    ইলম ব্যতীত অসৎ কাজে বাধা প্রদান করতে যাবে না। কারণ, এতে শর‘ঈ নিষিদ্ধ কাজসমূহে পতিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿ قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ﴾ [يوسف: ١٠٨]

    “বলে দিন, এটিই আমার পথ, আমি আল্লাহর দিকে বুঝে শুনে সজ্ঞানে আহ্বান করি -আমি এবং আমার অনুসারীরা।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৮]

    ৩. ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর ক্ষেত্রে হক স্পষ্ট করার পাশাপাশি হিকমত ও সুকৌশল, সদুপদেশ এবং সূক্ষ্ম পন্থার সাহায্য নেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ﴾ [النحل: ١٢٥]

    “আপনি মানুষদের আপনার রবের পথে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫]

    আল্লাহ তা‘আলা মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে ফিরআউনকে দাওয়াত দেওয়ার কৌশল শিক্ষা দিয়ে বলেছেন:

    ﴿فَقُولَا لَهُۥ قَوۡلٗا لَّيِّنٗا لَّعَلَّهُۥ يَتَذَكَّرُ أَوۡ يَخۡشَىٰ ٤٤﴾ [طه: ٤٤]

    “অতঃপর তোমরা তার সাথে নম্র কথা বলবে এতে করে হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৪৪]

    আমাদের নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন:

    ﴿وَلَوۡ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ ٱلۡقَلۡبِ لَٱنفَضُّواْ مِنۡ حَوۡلِكَۖ﴾ [ال عمران: ١٥٩]

    “আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯]

    ৪. ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আমিল মুনকার’-এর ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য সর্বাপেক্ষা জরুরি বিষয় হচ্ছে সবর-ধৈর্য এবং সহনশীলতা। লোকমান আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন:

    ﴿يَٰبُنَيَّ أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱنۡهَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَآ أَصَابَكَۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ١٧﴾ [لقمان: ١٧]

    “হে বৎস! সালাত কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও। মন্দ কাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর, এটিই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” [সূরা লোকমান, আয়াত: ১৭]

    ৫. কল্যাণ ও অকল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা। সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ তখনই করবে যখন অকল্যাণের চেয়ে কল্যাণের দিকটি প্রবল থাকে আর যদি অবস্থা বিপরীত হয় যে এটি করতে গেলে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণের সম্ভাবনাই বেশি তাহলে ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’ জায়েয হবে না। কারণ, এতে অপেক্ষাকৃত ছোট মুনকার দূর করতে গিয়ে আরো বড় মুনকারে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।

    ৬. মুনকার ও অসৎ কাজ দূর করার ক্ষেত্রে সবচে সহজ কাজের সাথে সংগতিপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করা। সুতরাং, সংগতি পূর্ণ পন্থা ও মাধ্যম বাদ দিয়ে আরো বড় মাধ্যম গ্রহণ করা জায়েয হবে না। অর্থাৎ আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের বিন্যাস অনুযায়ী ধারাবাহিকতা ও স্তর বিবেচনায় রেখে মন্দ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের পদক্ষেপ নেওয়া।

    আবু সাইদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের কেউ মন্দ কাজ হতে দেখলে (শক্তি প্রয়োগ করে) প্রতিহত করবে, সম্ভব না হলে (মুখের মাধ্যমে) প্রতিহত করবে, এও সম্ভব না হলে মন দিয়ে প্রতিহত করবে। আর এটি হচ্ছে ঈমানের সর্ব নিম্ন স্তর।

    এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, সহজ পন্থা ও পদ্ধতিতে কাজ সম্ভব হলে কঠোর পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই। বরং এটি ঠিকও হবে না। যেমন, যে মন্দ কাজ প্রতিবাদের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব সেখানে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিহত করা শরিয়তের দৃষ্টিতে ঠিক নয়। এ নীতিমালা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

    ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর উপকারিতা:

    সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানে অনেক ফায়দা ও উপকারিতা রয়েছে, তার কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হলো:

    ১. মন্দ ও অন্যায় দেখে তা প্রতিরোধ ও প্রতিহত করার পদক্ষেপ না নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআন ও হাদীসে এ ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী এসেছে। সুতরাং ‘আমার বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর মাধ্যমে আল্লাহর সে শাস্তি থেকে দূরে থাকা যায় ও পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

    ২. আল্লাহ তা‘আলা কল্যাণ ও নেক কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করার উৎসাহ বরং নির্দেশ দিয়েছেন। ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নেহি আনিল মুনকার’-এর মাধ্যমে উক্ত নির্দেশের বাস্তবায়ন হয় এবং কল্যাণ ও নেকের

    কাজে সহযোগিতা হয়।

    ৩. সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কারণ, এর মাধ্যমে যাবতীয় অকল্যাণ ও অনিষ্ট বিদূরিত হয়। ফলে মানুষ স্বীয় দ্বীন-জান-সম্পদ ও সম্মানের ব্যাপারে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা বোধ করে।

    ৪. এর মাধ্যমে অন্যায় ও অনিষ্টের হার হ্রাস পায়। সমাজ থেকে মন্দ ও অশ্লীল কাজের প্রতিযোগিতা প্রদর্শনী বিলুপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যেগুলো মূলত সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করত। ফলে সমাজ শান্তি শৃঙ্খলা, মিল-মহব্বত ও সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠে।

    সমাপ্ত

    বিষয়ভিত্তিক ক্যাটাগরি:

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ