পানাহারের আদব

বর্ণনা

আল্লাহর বান্দাদের ওপর যতগুলো অনুগ্রহ আছে তার মাঝে অন্যতম প্রধান অনুগ্রহ হলো পানাহার। মানুষের শরীর গঠন, বর্দ্ধন ও টিকে থাকার মূল উপাদান হচ্ছে পানাহার। এ নি‘আমতের দাবি হলো এর দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। পানাহারের অনেকগুলো আদব ও বিধান রয়েছে বক্ষমান প্রবন্ধে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    পানাহারের আদব

    আখতারুজ্জামান মুহাম্মাদ সুলাইমান

    সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    آداب الطعام والشراب

    (باللغة البنغالية)

    أختر الزمان محمد سليمان

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    সংক্ষিপ্ত বর্ণনা.............

    আল্লাহর বান্দাদের ওপর যতগুলো অনুগ্রহ আছে তার মাঝে অন্যতম প্রধান অনুগ্রহ হলো পানাহার। মানুষের শরীর গঠন, বর্দ্ধন ও টিকে থাকার মূল উপাদান হচ্ছে পানাহার। এ নি‘আমতের দাবি হলো এর দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। পানাহারের অনেকগুলো আদব ও বিধান রয়েছে বক্ষমান প্রবন্ধে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

    পানাহারের আদব

    আল-হামদুলিল্লাহ ওয়াসসলাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ.....

    আল্লাহর বান্দাদের ওপর যতগুলো অনুগ্রহ আছে তার মাঝে অন্যতম প্রধান অনুগ্রহ হলো পানাহার। মানুষের শরীর গঠন, বর্দ্ধন ও টিকে থাকার মূল উপাদান হচ্ছে পানাহার। এ নি‘আমতের দাবি হলো এর দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আর এ কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর দেওয়া বিধান পালন করার মাধ্যমে আদায় করা যেতে পারে। এ নি‘আমতের আরো একটি দাবি হচ্ছে, এর সহায়তায় আল্লাহর নাফরমানি করা যাবে না।

    পানাহারের অনেকগুলো আদব ও বিধান রয়েছে, যাকে দুইভাবে ভাগ করা যেতে পারে:

    প্রথমত: যে বিষয়গুলোর গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। যেমন,

    (১) খাদ্য ও পানীয় জাতীয় জিনিসের ইহতেরাম করা আর এ বিশ্বাস রাখা যে এগুলো আল্লাহর নি‘আমত যা আল্লাহ তা‘আলা তাকে দিয়েছেন।

    (২) খাদ্য জাতীয় জিনিসকে অবহেলা-অসম্মান না করা; ডাস্টবিন ও ময়লা আবর্জনার ভিতরে না ফেলা।

    (৩) খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। বিশুদ্ধ অভিমত হলো: খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব, কেননা অনেকগুলো সহীহ এবং সুস্পষ্ট হাদীস এ নির্দেশই করে। আর এ নির্দেশের বিপরীত কোনো হাদীস নেই। এ মতের বিরুদ্ধে সর্বসম্মত ঐক্যমত্যও সৃষ্টি হয় নি যে, এর প্রকাশ্য অর্থ থেকে বের করে দিবে। আর যে ব্যক্তি পানাহারের সময় বিসমিল্লাহ বলবে না তার ওয়াজিব ত্যাগ করা হবে।

    বিসমিল্লাহ ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণসমূহ:

    এক. উমার ইবন আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন,

    «يَا غُلاَمُ، سَمِّ اللَّهَ، وَكُلْ بِيَمِينِكَ، وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ»

    “হে বৎস! বিসমিল্লাহ বল এবং ডান হাত দিয়ে খাও। আর খাবার পাত্রের যে অংশ তোমার সাথে লাগানো সে অংশ থেকে খাও।”[1]

    দুই. হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,

    «إِنَّ الشَّيْطَانَ يَسْتَحِلُّ الطَّعَامَ أَنْ لَا يُذْكَرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ»

    “শয়তান ঐ খাবারকে নিজের জন্য হালাল মনে করে যার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হয় নি।”[2]

    (৪) বান্দা খাবার পাত্রের যেদিক তার সাথে লাগানো সেদিক থেকে খাবে। উপরে বর্ণিত উমার ইবন আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসের কারণে। আর খাবার যদি বিভিন্ন ধরনের হয় তাহলে অন্যদিক -যা তার সাথে লাগোয়া নয়- থেকে খাওয়াতে কোনো দোষ নেই।

    (৫) যদি খাবারের কোনো লোকমা পড়ে যায় তবে উঠিয়ে খাবে, যদি ময়লা লাগে ধুয়ে ময়লা মুক্ত করে খাবে। কারণ, এটিই সুন্নাত এবং এর মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের অনুসরণ করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الْأَذَى وَلْيَأْكُلْهَا، وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ»

    “যদি তোমাদের কারো খাবারের লোকমা পড়ে যায় তবে তার থেকে ময়লা দূর করবে এবং তা খেয়ে ফেলবে, শয়তানের জন্য রেখে দিবে না।”[3]

    (৬) খাবারের প্লেট পরিষ্কার করবে এবং তার ভিতরে যা কিছু থাকবে মুছে খাবে। জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

    «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِلَعْقِ الْأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ، وَقَالَ: «إِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيِّهِ الْبَرَكَةُ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙ্গুল এবং প্লেট চেটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা জানো না কোন অংশে বরকত রয়েছে।”[4]

    আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্লেট চেটে খাবার নির্দেশ দিয়ে বলেন,

    «فَإِنَّكُمْ لَا تَدْرُونَ فِي أَيِّ طَعَامِكُمُ الْبَرَكَةُ»

    “তোমরা জানো না তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে।”[5] বরকত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যার দ্বারা উপকার এবং পুষ্টি লাভ হয়।

    (৭) আঙ্গুল ধোয়ার পূর্বে চেটে খাবে। কা‘ব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

    «أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْكُلُ بِثَلَاثِ أَصَابِعَ، فَإِذَا فَرَغَ لَعِقَهَا»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন আঙ্গুল দিয়ে খেতেন এবং খাওয়া শেষে আঙ্গুল চেটে খেতেন।”[6]

    আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফূ‘ হাদীসে বর্ণিত,

    «إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَلْعَقْ أَصَابِعَهُ، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي فِي أَيَّتِهِنَّ الْبَرَكَةُ»

    “যখন তোমাদের কেউ খাবার খায় তখন সে যেনো তার আঙ্গুলগুলো চেটে খায়। কেননা সে জানে না কোন আঙ্গুলে বরকত রয়েছে?”[7]

    আলেমগণ বলেন, নির্বোধ-মূর্খ লোকদের আঙ্গুল চেটে খাওয়াকে অপছন্দ করা ও একে অভদ্রতা মনে করাতে কিছু যায় আসে না। তবে হ্যাঁ, খাওয়ার মাঝখানে আঙ্গুল চেটে খাওয়া উচিৎ নয়। কেননা আঙ্গুল আবার ব্যবহার করতে হবে আর আঙ্গুলে লেগে থাকা লালা ও থুতু প্লেটের রয়ে যাওয়া খাবারের সাথে লাগবে আর এটি এক প্রকার অপছন্দনীয়ই বটে।

    (৮) খাবারের প্রশংসা করা মুস্তাহাব, কেননা এর মাধ্যমে খাবার আয়োজন ও প্রস্তুতকারীর ওপর একটা ভালো প্রভাব পড়বে। সাথে সাথে আল্লাহর নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো এমন করতেন। জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

    «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَأَلَ أَهْلَهُ الْأُدُمَ» فَقَالُوا: «مَا عِنْدَنَا إِلَّا خَلٌّ» فَدَعَا بِهِ، فَجَعَلَ يَأْكُلُ بِهِ وَيَقُولُ: «نِعْمَ الْأُدُمُ الْخَلُّ، نِعْمَ الْأُدُمُ الْخَلُّ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পরিবারের নিকট তরকারী চাইলেন। তারা বললেন, আমাদের কাছে সিরকা ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি সিরকা আনতে বললেন এবং তার দ্বারা খেতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, সিরকা কতইনা উত্তম তরকারী; সিরকা কতইনা উত্তম তরকারী।”[8]

    (৯) পানি পানকারীর জন্য সুন্নাত হলো, তিন শ্বাসে পান করা। একটু পান করার পর পাত্র মুখ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে শ্বাস নিবে। অতঃপর দ্বিতীয়বার, এরপর একইভাবে তৃতীয়বার। যেমন, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বর্ণিত হাদীসে এসেছ,

    «كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَنَفَّسُ فِي الشَّرَابِ ثَلَاثًا، وَيَقُولُ: «إِنَّهُ أَرْوَى وَأَبْرَأُ وَأَمْرَأُ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার মাঝে তিনবার শ্বাস নিতেন এবং বলতেন: এভাবে পান করা অধিক পিপাসা নিবারণকারী অধিক নিরাপদ অধিক তৃপ্তিদায়ক।”[9]

    পানাহারের শেষে আল্লাহর নি‘আমতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ তাঁর প্রশংসা করবে। সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে অন্তত ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «إِنَّ اللهَ لَيَرْضَى عَنِ الْعَبْدِ أَنْ يَأْكُلَ الْأَكْلَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا أَوْ يَشْرَبَ الشَّرْبَةَ فَيَحْمَدَهُ عَلَيْهَا»

    “যে ব্যক্তি খাবারের পর আল্লাহর প্রশংসা করে। অনুরূপ পান করার পর আল্লাহর প্রশংসা করে। আল্লাহ সে বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন।”[10]

    আর যদি হাদীসে বর্ণিত কোনো দো‘আ পড়ে তাহলে তা হবে সর্বোত্তম। সবচেয়ে বিশুদ্ধ দো‘আ যা সাহাবী আবূ উমামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, যখন দস্তরখান উঠানো হতো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,

    «الحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ، غَيْرَ مَكْفِيٍّ وَلاَ مُوَدَّعٍ وَلاَ مُسْتَغْنًى عَنْهُ، رَبَّنَا»

    “পবিত্র বরকতময় অনেক অনেক প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে আমাদের রব, এ থেকে কখনো বিমুখ হতে পারবো না, বিদায় নিতে পারবো না এবং এ থেকে অমুখাপেক্ষী হতেও পারবো না।”[11]

    (১০) যখন অনেক লোকের সাথে বসে পান করবে আর পান করার পর কাউকে দিতে চাইবে তাহলে ডান পার্শ্বে বসা ব্যক্তিকে দিবে, সে যদি বয়সে ছোট হয় আর বাম পার্শ্বস্থজন তার থেকে বড়, তবুও। হ্যাঁ, যদি ছোট থেকে অনুমতি নিয়ে বড়কে দেওয়া হয় তাহলে কোনো দোষ নেই । আর যদি অনুমতি না দেয় তাহলে তাকেই দিবে। কারণ, সেই আগে পাওয়ার বেশি অধিকার রাখে।

    এর প্রমাণ হলো সাহাবী সাহল ইবন সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস,

    «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِشَرَابٍ، وَعَنْ يَمِينِهِ غُلاَمٌ، وَعَنْ يَسَارِهِ أَشْيَاخٌ، فَقَالَ لِلْغُلاَمِ: «أَتَأْذَنُ لِي أَنْ أُعْطِيَ هَؤُلاَءِ» ، فَقَالَ الغُلاَمُ: لاَ وَاللَّهِ لاَ أُوثِرُ بِنَصِيبِي مِنْكَ أَحَدًا، فَتَلَّهُ فِي يَدِهِ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু পানীয় আনা হলো। তাঁর ডান দিকে একটি ছোট ছেলে বসা ছিল এবং বামদিকে বয়স্ক ব্যক্তিবর্গ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেটিকে বললেন, তুমি কি তোমার আগে তাদেরকে দেওয়ার অনুমতি দিবে? তখন ছেলেটি বলল, না, কখনও নয়। আল্লাহ শপথ! আমি আমার অংশের ওপর আপনি ব্যতীত অন্য কাউকে প্রাধান্য দিব না। তিনি (পানপাত্র) ছেলেটির হাতে দিয়ে দিলেন।”[12]

    আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত অপর এক সহীহ হাদীসে এসেছে,

    «أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُتِيَ بِلَبَنٍ قَدْ شِيبَ بِمَاءٍ، وَعَنْ يَمِينِهِ أَعْرَابِيٌّ، وَعَنْ يَسَارِهِ أَبُو بَكْرٍ، فَشَرِبَ، فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللهِ أَعْطِ أَبَا بَكْرٍ ، فَأَعْطَاهُ الأَعْرَابِيَّ الَّذِي عَلَى يَمِينِهِ، ثُمَّ قَالَ: «الأَيْمَنَ فَالأَيْمَنَ»

    “এক মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পানি মিশ্রিত কিছু দুধ নিয়ে আসা হলো। তাঁর ডানে ছিলেন এক বেদুঈন সাহাবী এবং বামে আবূ বকর। যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান শেষ করলেন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আবূ বকরকে দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডানে বসা উক্ত বেদুঈনকে দিলেন এবং বললেন, (নিয়ম হচ্ছে) আগে ডান অতঃপর ডান। অর্থাৎ প্রথমে ডান পাশের জন পাবে অতঃপর তার ডান পাশের জন এবং এভাবেই।”[13]

    সহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে,

    «الْأَيْمَنُونَ، الْأَيْمَنُونَ، الْأَيْمَنُونَ» قال أنس رضي اللّه عنه: «فَهِيَ سُنَّةٌ، فَهِيَ سُنَّةٌ، فَهِيَ سُنَّةٌ»

    তিনি বলেন, ডান দিকের লোক ডান দিকের লোক ডান দিকের লোক। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এটিই সুন্নাত, এটিই সুন্নাত, এটিই সুন্নাত।[14]

    দ্বিতীয়ত: যে বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক:

    ১। পানাহারে অহেতুক খরচ করা, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ وَلَا تُسۡرِفُوٓاْۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُسۡرِفِينَ ٣١﴾ [الاعراف: ٣١]

    “খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৩১]

    ২। প্রয়োজন ছাড়া বাম হাতে খাওয়া হারাম। বেশ কিছু হাদীস এর প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে।

    (ক) বাম হাতে খাওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। যেমন, জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «لَا تَأْكُلُوا بِالشِّمَالِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِالشِّمَالِ»

    “তোমরা বাম হাতে খেয়ো না, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়।”[15]

    (খ) ডান হাতে খাওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ। যেমন, ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত মারফু‘ হাদীসে এসেছে,

    «إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَأْكُلْ بِيَمِينِهِ، وَإِذَا شَرِبَ فَلْيَشْرَبْ بِيَمِينِهِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ، وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ»

    “তোমাদের কেউ যখন খাবে ডান হাতে খাবে যখন পান করবে ডান হাতে পান করবে, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়, বাম হাতে পান করে।”[16]

    এ ধরনের নির্দেশের অর্থ হলো বাম হাতে খাওয়া হারাম।

    (গ) বাম হাতে খেলে শয়তানের সাথে সাদৃশ্য হয়। যেমন, পূর্বের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং অমুসলিমদের সাথেও সাদৃশ্য হয়। আর শরী‘আতের নির্দেশ মোতাবেক উভয়টিই নিষিদ্ধ ও হারাম।

    (ঘ) বাম হাতে খাবার গ্রহণকারী জনৈক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদ-দো‘আ করা এবং এর কারণ বর্ণনা করা যে এটি অহংকার মূলক কাজ। সালামা ইবন আকওয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

    «أَنَّ رَجُلًا أَكَلَ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشِمَالِهِ، فَقَالَ: «كُلْ بِيَمِينِكَ» ، قَالَ: لَا أَسْتَطِيعُ، قَالَ: «لَا اسْتَطَعْتَ» ، مَا مَنَعَهُ إِلَّا الْكِبْرُ، قَالَ: فَمَا رَفَعَهَا إِلَى فِيهِ»

    “জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বাম হাতে খাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি ডান হাতে খাও’। সে বলল আমি পারব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আর কখনও পারবেও না। একমাত্র অহংকারই তাকে ডান হাত দিয়ে খাওয়া থেকে বিরত রাখল। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে আর কখনো মুখের কাছে হাত উঠাতে পারে নি।”[17]

    ৩। দাঁড়িয়ে পানাহার করা মাকরূহ, সুন্নাত হলো বসে পানাহারকার্য সম্পন্ন করা। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

    «أَنَّهُ نَهَى أَنْ يَشْرَبَ الرَّجُلُ قَائِمًا» ، قَالَ قَتَادَةُ: فَقُلْنَا فَالْأَكْلُ، فَقَالَ: «ذَاكَ أَشَرُّ أَوْ أَخْبَثُ»

    “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা বললাম তাহলে দাঁড়িয়ে খাওয়ার হুকুম কী? আনাস বললেন, সেটাতো আরো বেশি খারাপ আরো বেশি দূষণীয়।”[18]

    ৪। কোনো কিছুর উপর হেলান দিয়ে আহার করা মাকরূহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «أَمَّا أَنَا فَلَا آكُلُ مُتَّكِئًا»

    “আমি হেলান দিয়ে আহার করি না।”[19]

    ইবন হাজার রহ. বলেন: খাওয়ার জন্য বসার মোস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে। দুই হাঁটু গেড়ে, দুই পায়ের পিঠের উপর বসা। অথবা ডান পা খাড়া করে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা।

    ৫। খাওয়ার পাত্রে ফুঁ দেওয়া এবং তার ভিতর নিঃশ্বাস ফেলা মাকরূহ। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,

    «نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُتَنَفَّسَ فِي الْإِنَاءِ، أَوْ يُنْفَخَ فِيهِ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার পাত্রে ফুঁ দেওয়া বা শ্বাস ফেলা থেকে নিষেধ করেছেন।”[20]

    আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করছেন,

    «لَا يُمْسِكَنَّ أَحَدُكُمْ ذَكَرَهُ بِيَمِينِهِ وَهُوَ يَبُولُ، وَلَا يَتَمَسَّحْ مِنَ الْخَلَاءِ بِيَمِينِهِ، وَلَا يَتَنَفَّسْ فِي الْإِنَاءِ»

    “তোমাদের কেউ যেন প্রস্রাব করার সময় পুরুষাঙ্গ ডান হাত দ্বারা স্পর্শ না করে এবং ডান হাত দ্বারা যেন ইস্তেঞ্জা না করে। অনুরূপ খাবার পাত্রে যেন শ্বাস না ফেলে।”[21]

    ৬। খাবারের দোষ বের করা ও বর্ণনা করা মাকরূহ; বরং আগ্রহ হলে খাবে, মনে না চাইলে দোষ ধরা ব্যতীত বাদ দিবে। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

    «مَا عَابَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَعَامًا قَطُّ، كَانَ إِذَا اشْتَهَى شَيْئًا أَكَلَهُ، وَإِنْ كَرِهَهُ تَرَكَهُ»

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেন নি, মনে চাইলে খেতেন। অপছন্দ হলে রেখে দিতেন।”[22]

    সমাপ্ত

    [1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৯৫৮।

    [2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০১৭।

    [3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৩।

    [4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৩।

    [5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৪।

    [6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩২।

    [7] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৫।

    [8] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৫২।

    [9] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০২৮।

    [10] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৩৪।

    [11] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৮৪৯।

    [12] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬০৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩০।

    [13] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৬১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০১৯।

    [14] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০২৯।

    [15] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০১৯।

    [16] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০২০।

    [17] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০২১।

    [18] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০২৪।

    [19] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩৯৮।

    [20] সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৭২৮।

    [21] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৭।

    [22] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৬৪।

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ