লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তসমূহ

বর্ণনা

অত্র ফাতওয়ায় জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তসমূহ

    شروط لا إله إلا الله

    < بنغالي- Bengal - বাঙালি>

    শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

    الشيخ محمد صالح المنجد

    —™

    অনুবাদক: সানাউল্লাহ নজির আহমদ

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: ثناء الله نذير أحمد

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তসমূহ

    প্রশ্ন: আমাকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর শর্তগুলো বুঝিয়ে বলুন?

    প্রশ্ন: শাইখ হাফেয হিকমী রহ. ‘সুল্লামুল উসূল’ গ্রন্থে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাতটি শর্ত উল্লেখ করেছেন। ইলম, ইয়াকীন, কবূল, ইনকিয়াদ, সিদক, ইখলাস ও মুহব্বত। নিম্নে সবকটি শর্তের ব্যাখ্যা পেশ করছি:

    প্রথম শর্ত, ইলম: ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমায় দু’টি অংশ রয়েছে: ইতিবাচক ও নেতিবাচক, উভয় অর্থের ইলম বা যথার্থ জ্ঞান হাসিল করা প্রথম শর্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ ١٩﴾ [محمد : ١٩]

    “অতএব জেনে রেখো, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই”[সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৯]

    অপর আয়াতে তিনি বলেন:

    ﴿إِلَّا مَن شَهِدَ بِٱلۡحَقِّ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ ٨٦﴾ [الزخرف: ٨٦]

    “তবে তারা ছাড়া যারা জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়”[সূরা আয-যুখরূফ, আয়াত: ৮৬]

    এখানে সত্য সাক্ষ্য দ্বারা উদ্দেশ্য ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, আর জেনে-শুনে অর্থ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর সাক্ষ্য দেওয়ার সঙ্গে অন্তর দ্বারা তার অর্থের জ্ঞান হাসিল করা। সহীহ গ্রন্থে উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، دَخَلَ الْجَنَّةَ».

    “যে এমতাবস্থায় মারা গেল যে, সে জানে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”[1] অতএব, মুসলিম হওয়ার জন্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লার অর্থ জানা জরুরি।

    দ্বিতীয় শর্ত, ইয়াকীন: অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, শুধু জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, আর সন্দেহপূর্ণ জ্ঞানের তো কোনো মূল্যই নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ لَمۡ يَرۡتَابُواْ وَجَٰهَدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ١٥﴾ [الحجرات: ١٥]

    “মুমিন কেবল তারাই যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করে নি”[সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৫]

    এ আয়াতে ঈমানের জন্য আল্লাহ সন্দেহ মুক্ত হওয়া শর্তারোপ করেছেন। কারণ, সন্দেহ পোষণকারী মুনাফিক, মুমিন নয়। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، لَا يَلْقَى اللَّهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ فِيهِمَا، إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ»

    “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, এ দু’টি বাক্যে সন্দেহ পোষণ ব্যতীত কোনো বান্দা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে না, তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে”[2]

    অপর বর্ণনায় এসেছে:

    «لَا يَلْقَى اللَّهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ، فَيُحْجَبَ عَنِ الْجَنَّةِ»

    “কোনো বান্দা এ দু’টি সাক্ষ্যসহ, সন্দেহমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাত করবে, আর তাকে জান্নাত থেকে দূরে রাখা হবে, এরূপ হবে না”[3]

    একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহুকে নিজের দু’টি জুতাসহ প্রেরণ করে বলেন:

    «فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطِ، يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ، فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ»

    “এই দেয়ালের পশ্চাতে যার সাথে তুমি সাক্ষাত করবে, যে অন্তরের অন্তস্থল থেকে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান কর”[4]

    অতএব, জান্নাতে লাভের জন্য সন্দেহ মুক্ত সাক্ষ্য হওয়া জরুরি, অন্যথায় তাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

    তৃতীয় শর্ত, কবুল: অর্থাৎ কালেমার অর্থ ও দাবিকে বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নিকট অতীত জাতির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যারা এ বাক্য গ্রহণ করেছে তাদের তিনি মুক্তি দিয়েছেন এবং যারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন,

    ﴿ٱحۡشُرُواْ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ وَأَزۡوَٰجَهُمۡ وَمَا كَانُواْ يَعۡبُدُونَ ٢٢ مِن دُونِ ٱللَّهِ فَٱهۡدُوهُمۡ إِلَىٰ صِرَٰطِ ٱلۡجَحِيمِ ٢٣ وَقِفُوهُمۡۖ إِنَّهُم مَّسۡ‍ُٔولُونَ ٢٤﴾ [الصافات : ٢٢، ٢٤]

    (ফিরিশতাদেরকে বলা হবে), ‘একত্র কর যালিম ও তাদের সঙ্গী-সাথীদেরকে এবং যাদের ইবাদাত তারা করত আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদেরকে, আর তাদেরকে আগুনের পথে নিয়ে যাও, আর তাদেরকে থামাও, অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে”[সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ২২-২৪]

    অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿إِنَّهُمۡ كَانُوٓاْ إِذَا قِيلَ لَهُمۡ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسۡتَكۡبِرُونَ ٣٥ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوٓاْ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرٖ مَّجۡنُونِۢ ٣٦﴾ [الصافات : ٣٥، ٣٦]

    “তাদেরকে যখন বলা হত, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই’, তখন নিশ্চয় তারা অহঙ্কার করত। আর বলত, ‘আমরা কি এক পাগল কবির জন্য আমাদের উপাস্যদের ছেড়ে দেব”? [সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৩৫-৩৬]

    আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিয়েছেন। কারণ, তারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহকে অহঙ্কার ভরে ত্যাগ করেছে, আল্লাহর দা‘ঈর ওপর তারা মিথ্যারোপ করেছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাবি মোতাবেক তারা (অন্য মাবুদদের) প্রত্যাখ্যান ও (একমাত্র আল্লাহকে) গ্রহণ করে নি; বরং তারা বিদ্বেষ ও অহঙ্কার থেকে বলেছে:

    ﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ ٥ وَٱنطَلَقَ ٱلۡمَلَأُ مِنۡهُمۡ أَنِ ٱمۡشُواْ وَٱصۡبِرُواْ عَلَىٰٓ ءَالِهَتِكُمۡۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٞ يُرَادُ ٦ مَا سَمِعۡنَا بِهَٰذَا فِي ٱلۡمِلَّةِ ٱلۡأٓخِرَةِ إِنۡ هَٰذَآ إِلَّا ٱخۡتِلَٰقٌ ٧﴾ [ص : ٥، ٧]

    “সে কি সকল উপাস্যকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয় এ তো এক আশ্চর্য বিষয়! আর তাদের প্রধানরা চলে গেল একথা বলে যে, ‘যাও এবং তোমাদের উপাস্যগুলোর ওপর অবিচল থাক। নিশ্চয় এ বিষয়টি উদ্দেশ্য প্রণোদিত’। আমরা তো সর্বশেষ ধর্মে[5] এমন কথা শুনি নি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয়”। [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৫-৭]

    আল্লাহ তাদের মিথ্যারোপ ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন, তিনি বলেছেন,

    ﴿بَلۡ جَآءَ بِٱلۡحَقِّ وَصَدَّقَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ ٣٧﴾ [الصافات : ٣٧]

    “বরং সে সত্য নিয়ে এসেছিল এবং সে রাসূলদেরকে সত্য বলে ঘোষণা দিয়েছিল”[সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৩৭]

    অতঃপর যারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহকে মেনে নিয়েছে, তাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন,

    ﴿إِلَّا عِبَادَ ٱللَّهِ ٱلۡمُخۡلَصِينَ ٤٠ أُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ رِزۡقٞ مَّعۡلُومٞ ٤١ فَوَٰكِهُ وَهُم مُّكۡرَمُونَ ٤٢ فِي جَنَّٰتِ ٱلنَّعِيمِ ٤٣﴾ [الصافات : ٤٠، ٤٣]

    “অবশ্য আল্লাহর মনোনীত বান্দারা ছাড়া; তাদের জন্য থাকবে নির্ধারিত রিযিক, নি‘আমত-ভরা জান্নাতে ফলমূল; আর তারা হবে সম্মানিত”[সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ৪০-৪৩]

    আবু মূসা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ، كَمَثَلِ الْغَيْثِ الْكَثِيرِ أَصَابَ أَرْضًا فَكَانَ مِنْهَا نَقِيَّةٌ قَبِلَتِ الْمَاءَ، فَأَنْبَتَتِ الْكَلَأَ وَالْعُشْبَ الْكَثِيرَ، وَكَانَتْ مِنْهَا أَجَادِبُ أَمْسَكَتِ الْمَاءَ، فَنَفَعَ اللَّهُ بِهَا النَّاسَ فَشَرِبُوا وَسَقَوْا وَزَرَعُوا، وَأَصَابَتْ مِنْهَا طَائِفَةً أُخْرَى إِنَّمَا هِيَ قِيعَانٌ لَا تُمْسِكُ مَاءً وَلَا تُنْبِتُ كَلَأً، فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقُهَ فِي دِينِ اللَّهِ وَنَفَعَهُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ فَعَلِمَ وَعَلَّمَ، وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأْسًا وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللَّهِ الَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ»

    “আল্লাহ আমাকে যে হিদায়াত ও ইলমসহ পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ মুষলধারার বৃষ্টির ন্যায়, যা কোনো জমিনে বর্ষিত হয়েছে। তাতে কিছু উর্বর জমি ছিল, যা পানি গ্রহণ করেছে, ফলে তৃণলতা ও প্রচুর ঘাস জন্মিয়েছে। তাতে কিছু ছিল শক্ত জমি, যা পানি আটকে রেখেছে, আল্লাহ তার দ্বারা মানুষদের উপকৃত করেছেন, ফলে তারা পান করেছে, পশুদের পান করিয়েছে ও সেচ কার্য আঞ্জাম দিয়েছে। আর সে পানি জমির অপর অংশে পতিত হয়েছে, যা ছিল পাথরি জমি, যা না পানি আটকে রাখে এবং না কোনো তৃণলতা জন্মায়।

    এটাই তার উদাহরণ যে দীনের ইলম অর্জন করল, আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার দ্বারা তিনি তাকে উপকৃত করলেন, ফলে সে জ্ঞানার্জন করল ও অন্যকে শিখাল এবং তার উদাহরণ, যে তার প্রতি মাথা তুলে তাকায়নি ও আল্লাহর হিদায়াত গ্রহণ করে নি, যা দিয়ে আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে”।[6]

    চতুর্থ শর্ত, ইনকিয়াদ: অর্থাৎ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাবিকে বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَمَن يُسۡلِمۡ وَجۡهَهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ وَهُوَ مُحۡسِنٞ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰۗ وَإِلَى ٱللَّهِ عَٰقِبَةُ ٱلۡأُمُورِ ٢٢﴾ [لقمان: ٢٢]

    “আর যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহর কাছে নিজকে সমর্পণ করে, সে তো শক্ত রশি আঁকড়ে ধরে। আর সকল বিষয়ের পরিণাম আল্লাহরই কাছে”[সূরা লুকমান, আয়াত: ২২]

    আল্লাহর নিকট নিজেকে সমর্পণ করার অর্থ তার তাওহীদকে বিনা বাক্যে মেনে নেওয়া, যে মেনে নিল না ও ইহসান প্রদর্শন করল না, সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে নি। এ কথাই আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে বলেছেন,

    ﴿وَمَن كَفَرَ فَلَا يَحۡزُنكَ كُفۡرُهُۥٓۚ إِلَيۡنَا مَرۡجِعُهُمۡ فَنُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوٓاْۚ ٢٣﴾ [لقمان: ٢٣]

    “আর যে কুফরী করে, তার কুফরী যেন তোমাকে ব্যথিত না করে; আমার কাছেই তাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তারা যে আমল করত আমি তা তাদেরকে জানিয়ে দেব”[সূরা লুকমান, আয়াত: ২২]

    একটি সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ»

    “তোমাদের কেউ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত বিষয়ের অনুসারী না হবে”। এটাই পরিপূর্ণ আনুগত্য ও নিজেকে সমর্পণ করা।

    পশ্চম শর্ত, সিদক তথা কালেমাতে সত্যারোপ করা: অর্থাৎ অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ মুখে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿الٓمٓ ١ أَحَسِبَ ٱلنَّاسُ أَن يُتۡرَكُوٓاْ أَن يَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا وَهُمۡ لَا يُفۡتَنُونَ ٢ وَلَقَدۡ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۖ فَلَيَعۡلَمَنَّ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْ وَلَيَعۡلَمَنَّ ٱلۡكَٰذِبِينَ ٣﴾ [العنكبوت: ١، ٣]

    “আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমরা তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি, ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী”[সূরা আল-‘আনকাবুত, আয়াত: ১-৩]

    আর মুনাফিকদের ব্যাপারে তিনি বলেন,

    ﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَمَا هُم بِمُؤۡمِنِينَ ٨ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَمَا يَخۡدَعُونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمۡ وَمَا يَشۡعُرُونَ ٩ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ فَزَادَهُمُ ٱللَّهُ مَرَضٗاۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمُۢ بِمَا كَانُواْ يَكۡذِبُونَ ١٠﴾ [البقرة: ٨، ١٠]

    “আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি’, অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোকা দিচ্ছে। অথচ তারা নিজেদেরকেই ধোকা দিচ্ছে এবং তারা তা অনুধাবন করে না। তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি, সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত”[সূরা আল-বাকারাহ্‌, আয়াত: ৮-১০]

    সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহ ‘আল্লাহু বলেন,

    «مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صِدْقًا مِنْ قَلْبِهِ، إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ»

    “এমন কেউ নেই যে, অন্তরের অন্তস্থল থেকে সত্য সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, তবে আল্লাহ অবশ্যই তার ওপর জাহান্নাম হারাম করে দিবেন”[7]

    ষষ্ট শর্ত, ইখলাস: অর্থাৎ নিষ্ঠা থাকা বা সকল প্রকার শির্ক থেকে মুক্ত রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ ٣﴾ [الزمر: ٣]

    “জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]

    অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿قُلِ ٱللَّهَ أَعۡبُدُ مُخۡلِصٗا لَّهُۥ دِينِي ١٤﴾ [الزمر: ١٤]

    “বল, ‘আমি আল্লাহরই ইবাদাত করি, তাঁরই জন্য আমার আনুগত্য একনিষ্ঠ করি”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১৪]

    সহীহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ»

    “কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ দ্বারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে সে ব্যক্তি, যে নিজের অন্তরের অন্তস্থল বা মন থেকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে”[8]

    সপ্তম শর্ত, মহব্বত তথা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এ কালেমাকে মহব্বত করা: তার দাবি ও অর্থকে মহব্বত করা, তার ওপর আমলকারী ও তার শর্তসমূহ যাদের মধ্যে রয়েছে তাদেরকে মহব্বত করা এবং যারা তার ওপর আমল করে না তাদেরকে অপছন্দ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبّٗا لِّلَّهِۗ ١٦٥﴾ [البقرة: ١٦٥]

    “আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো ভালোবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর”[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৫]

    এ আয়াতে আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, ঈমানদাররা আল্লাহকে অধিক মহব্বত করে, কারণ তারা মহব্বতের ইবাদতে তার সাথে কাউকে শরীক করে নি, যেমন তার মহব্বতের দাবিদার মুশরিকরা তার সাথে শরীকদেরকেও তার ন্যায় মহব্বত করে।

    আনাস রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ، وَوَالِدِهِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

    “তোমাদের কেউ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার সন্তান, পিতা ও সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হবে”[9]

    আল্লাহ তা‘আলা ভালো জানেন।

    সূত্র: موقع الإسلام سؤال وجواب

    [1] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮১

    [2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯

    [3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০

    [4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৪

    [5] তাদের সর্বশেষ ধর্ম ছিল খৃস্টধর্ম, কারো মতে ছিল কুরাইশদের ধর্ম।

    [6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৯

    [7] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫

    [8] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯

    [9] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ