রাসূলুল্লাহ সা. সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন, এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিকে কিভাবে প্রতিবাদ করব

বর্ণনা

কতক সূফীর ধারণা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে জীবিত এসে তার ওলীদের সাথে সাক্ষাত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন তারা শুধু এটা অবিশ্বাসই করে না, বরং তারা বলে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্তমানেও তার ওলীদের সাথে জীবিত সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন। আমরা তাদেরকে কিভাবে প্রতিবাদ করব ? ইসলামী শরীআতে এর হুকুম কী ? এরই বিস্তরিত বর্ণনা এ ফতোয়ায় প্রদান করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন, এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিকে কীভাবে প্রতিবাদ করব?

    كيف نرد على من يزعم أن النبي صلى الله عليه وسلم يزوره حيًّا؟

    < بنغالي- Bengal - বাঙালি>

    শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

    الشيخ محمد صالح المنجد

    —™

    অনুবাদক: সানাউল্লাহ নজির আহমদ

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: ثناء الله نذير أحمد

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন, এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিকে কীভাবে প্রতিবাদ করব?

    প্রশ্ন: পাকিস্তানে কতক সূফী রয়েছে, এরা মূলত সকল অনিষ্টের মূল, আমি তাদের এক আলেম নামধারী ব্যক্তিকে বলতে শোনে হতবাক হয়ে গেছি। সে বলে: তোমরা বাস্তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভ করতে পার? তার উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে জীবিত এসে তার ওলীদের সাথে সাক্ষাত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন তারা শুধু এটা অবিশ্বাসই করে না বরং তারা বলে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্তমানেও তার ওলীদের সাথে জীবিত সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন। আমরা তাদেরকে কিভাবে প্রতিবাদ করব? ইসলামী শরী'আতে এর হুকুম কী?

    উত্তর: আল-হামদুলিল্লাহ।

    বিদ‘আত প্রতিরোধ করা অথবা কারো ভুল সংশোধন করার উত্তম পন্থা হচ্ছে তার কাছে দলীল সম্পর্কে জানতে চাওয়া। যার কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে দলীল চাওয়া হয়, সে অবশ্যই নিজের বিষয়টি গভীর মনোযোগ ও বিবেক দিয়ে যাচাই করে, সঠিক দলীল ও নির্ভুল নিয়ম অনুসরণ করে, ধারণা বা শ্রুত কোনো ঘটনার ভিত্তিতে নয়। এ প্রসঙ্গে সকলে একমত যে, এ বিষয়গুলো দীনি বিষয়। অতএব, এসব বিষয়ে সকলের কর্তব্য দলীল উপস্থাপন করা এবং দলীলের ভিত্তিতে এসব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা।

    এরা জাগ্রত অবস্থায় সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার দাবি করে।

    তারা হয়তো বলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূহসহ সশরীরে জীবিত, যেখানে ইচ্ছা যাওয়া-আসা এবং যেরূপ ইচ্ছা নড়াচড়া করেন। যেমন, ছিলেন তিনি জীবিত অবস্থায়, অনুরূপ এখনো।

    অথবা তারা বলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন, অর্থাৎ তিনি তার বারযাখী জগত তথা কবরের বিশেষ হায়াতে চলে গেছেন, যে হায়াত একমাত্র তার সাথেই খাস। যদি কেউ তাকে দেখে, মূলত তার সামনে তার আকৃতি ভেসে উঠে সেখান থেকেই।

    উভয় অবস্থায় তারা দলীল পেশ করতে বাধ্য, কুরআন অথবা সুন্নত অথবা উম্মতের ইজমা থেকে। তারা যেসব দলীল বর্ণনা করে, তা আমরা খতিয়ে দেখেছি, যার সারাংশ কতক ওলী ও নেককার লোকের ঘটনা এবং তাদের উল্লেখ করা প্রত্যক্ষদর্শী কতক লোকের নাম। সন্দেহ নেই, এসব ঘটনা দলীল হিসেবে পেশ করার উপযুক্ত নয়। দলীল হয়তো কুরআনের আয়াত অথবা হাদীস অথবা উম্মতের ইজমা অথবা ন্যূনতম পক্ষে কোনো সাহাবীর বাণী হবে, কিসসা বা ঘটনা নয়। বিশেষ করে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও ইলমে গায়েবের সাথে তার সম্পৃক্ততার বিষয় হয়।

    তাদের বর্ণিত এসব কিসসা-কাহিনীর ব্যাপারে আমি বলতে চাই, এতে নানা সম্ভাবনা বিদ্যমান। হয়তো এসব ঘটনা কখনোই সংঘটিত হয় নি। তারা শুধু নিজেদের কল্পনা প্রকাশ করেছে অথবা এসব ঘটেছে তাদের স্বপ্নে দিবালোকে নয়, এমনও হতে পারে শয়তান নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতির ধান্ধা দিয়েছে অথবা এগুলো ছিল তাদের চিন্তার ভেলকিবাজি, যা তারা বাস্তব ধরে নিয়েছে।

    আর আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাস্তবে দেখার বিপক্ষে দলীল পেশ করতে সক্ষম হই, তাহলে এসব সম্ভাবনাই জোরদার হয়, বলার অপেক্ষা রাখে না।

    আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “জেন রেখ! যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাত করত, নিশ্চয় মুহাম্মাদ মারা গেছেন, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত করত, আল্লাহ চিরঞ্জীব তিনি কখনো মারা যাবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿إِنَّكَ مَيِّتٞ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ ٣٠﴾ [الزمر: ٣٠]

    “নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩০]

    সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

    ﴿وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٞ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَٰبِكُمۡۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡ‍ٔٗاۗ وَسَيَجۡزِي ٱللَّهُ ٱلشَّٰكِرِينَ ١٤٤﴾ [ال عمران: ١٤٤]

    “আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৪][1]

    সাহাবায়ে কেরাম, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি নিকটবর্তী ছিলেন, তাকে অধিক মহব্বত করতেন এবং তার আনুগত্যে নিজেদের উৎসর্গ করে দিতেন, তারা যদি মৃত্যুর অর্থ অনুধাবন করতে পারেন, অর্থাৎ তার সাথে দুনিয়াতে আর কখনো সাক্ষাৎ সম্ভব নয় জানেন, তাহলে এরা কীভাবে ধারণা করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, তাদের সাথে উঠাবসা করেন?!

    শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন: “এসব ক্ষেত্রে তাদের কিছু শয়তানী ধান্ধা ও আসর হাসিল হয়, যা তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কারামত মনে করে। তাদের কেউ দেখে যে, কবরস্থ ব্যক্তি তার কাছে এসেছে, (অথচ বহু বছর পূর্বে সে মারা গছে) এবং বলছে, আমি অমুক। অনেক সময় তাকে বলে, আমরা এমন লোক, আমাদেরকে যখন কবরে রাখা হয় আমরা উঠে আসি। এমনি ঘটনা ঘটেছে তুনসী ও নুমান সালামির সাথে। আর শয়তান তো অহরহ মানুষের আকৃতি ধারণ করে, তাদেরকে ঘুমন্ত ও ও সজাগ উভয় অবস্থায় ধোঁকা দেয় ও প্রতারিত করে।

    অনেক সময় অপরিচিত লোকের নিকট এসে বলে, আমি অমুক বুযুর্গ অথবা আমি অমুক আলেম। অনেক সময় তাদেরকে বলে, আমি আবু বকর, আমি উমার। আবার অনেক সময় জাগ্রত অবস্থায় এসে বলে, আমি মাসীহ, আমি মূসা, আমি মুহাম্মাদ।

    এ জাতীয় আরও অনেক ঘটনা আমি জানি, আর এ থেকে অনেকে বিশ্বাস করে নেয় যে, নবীগণ নিজ আকৃতিতে জাগ্রত অবস্থায় তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন।

    এদের কতক শাইখ আছেন, যাদের মুজাহাদা, ইলম, তাকওয়া ও দীনদারী প্রসিদ্ধ, তারা সরল মনে এসব ঘটনা বিশ্বাস করে নেয়।

    এদের মধ্যে কতক রয়েছে, যে ধারণা করে, যখন সে নবীর কবর যিয়ারত করতে আসে, তখন তিনি সশরীরে কবর থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেন। এদের কেউ কাবার সীমানায় জনৈক শাইখের চেহারা দেখে বলে, তিনি ইবরাহীম খলিল।

    এদের কেউ ধারণা করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হুজরা থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেছেন। এটা সে নিজের কারামাত মনে করে। এদের কারো বিশ্বাস, কবরস্থ ব্যক্তিকে আহ্বান করলে সে ডাকে সাড়া দেয়।

    এদের কেউ বর্ণনা করত, ইবন মানদাহ কোনো হাদীস সম্পর্কে সমস্যায় পড়লে, হুজরায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করত, আর তিনি তার উত্তর দিতেন। সর্বশেষ এমন ঘটনা মরক্কোর এক ব্যক্তির ঘটে, অতঃপর সে এ ঘটনাকে নিজের কারামাত গণ্য করে।

    এসব ধারণা পোষণকারী সম্পর্কে ইবন আব্দুল বার বলেছেন, তুমি নিপাত যাও! এসব ঘটনা তুমি মুহাজির ও আনসার সম্পর্কে জান? তাদের মধ্যে এমন কেউ কি ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর যে তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, আর তিনি তার উত্তর দিয়েছেন?

    সাহাবায়ে কেরাম কত বিষয়ে মত বিরোধ করেছে, তারা কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেনি?! এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে ফাতেমা মিরাসের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন, তিনি কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন নি?”[2]

    ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. আরও বলেন, “এর দ্বারা বলা উদ্দেশ্য যে, সাহাবায়ে কেরামকে গোমরাহ করার জন্য শয়তান এসব স্পষ্ট কুফুরী পেশ করার সাহস করে নি, যেরূপ সাহস এসব গোমরাহ ও বিদ‘আতীদের ক্ষেত্রে করেছে। এরা কুরআনের অপব্যাখ্যা করেছে অথবা এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল অথবা এরা অস্বাভাবিক আশ্চর্য কিছু শ্রবণ করেছে ও দেখেছে, আর তাকেই মনে করেছে যে, এগুলো নবী ও নেককার লোকের আলামত, অথচ এগুলো ছিল শয়তানের কারসাজি। খ্রিষ্টান ও বিদ‘আতী সম্প্রদায় এভাবেই পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মুতাশাবাহ আয়াতের ( অস্পষ্ট আয়াত, যার অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না) অনুসরণ করে, আর দাবি করে এগুলো মুহকাম (স্পষ্ট অর্থবিশিষ্ট), অনুরূপ তারা যুক্তি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দলীল আঁকড়ে থাকে, অতঃপর কিছু শোনে ও দেখে বলে: এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, অথচ তা শয়তানের পক্ষ থেকে। আর তারা দাবি করে এগুলো স্পষ্ট সত্য -এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। (অথচ তা বিভ্রান্তি)

    অনুরূপ সাহাবীগণের ক্ষেত্রে শয়তান এমন সাহস করে নি, তাদের সামনে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতি ধারণ করবে অথবা তার নিকট ফরিয়াদ করবে অথবা তাদের নিকট এমন আওয়াজ পেশ করারও সাহস দেখায় নি, যে আওয়াজ তার আওয়াজের ন্যায়। কারণ, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে, তারা নিশ্চয় জানে এসব শির্ক ও হারাম।

    এ জন্য শয়তান তাদের কাউকে এও বলতে সাহস করে নি, তোমাদের কারো প্রয়োজন হলে আমার কবরের নিকট আস, আমার উসীলা দিয়ে ফরিয়াদ কর, না তার জীবদ্দশায় না তার মৃত্যুর পর। পরবর্তী যুগের লোকদের ক্ষেত্রে যেরূপ ঘটেছে।

    শয়তান তাদের কারো নিকট এসে এও বলার সাহস করে নি, আমি অদৃশ্য ব্যক্তি অথবা আমি চতুর্থ ‘আওতাদ’ এর অন্তর্ভুক্ত অথবা সপ্তম ‘আওতাদ’ এর অন্তর্ভুক্ত অথবা চল্লিশ ‘আওতাদ’ এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ তাদের কাউকে বলার সাহস করে নি, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এগুলো ছিল তাদের নিকট অসার ও নিরর্থক। শয়তান তাদের কারো কাছে এসে বলার সাহস করে নি, আমি আল্লাহর রাসূল অথবা কবর থেকে তাদের কাউকে সম্বোধন করারও সাহস করে নি। যেমন, পরবর্তী যুগে অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তার কবরের নিকট, অন্যদের কবরের নিকট; বরং যেখানে কবর নেই সেখানেও।

    অনুরূপ ঘটনা মুশরিক ও কিতাবিদের ক্ষেত্রেও অনেক ঘটে, তারা দেখে মৃত্যুর পর তাদের কোনো সম্মানিত ব্যক্তি এসে তাকে সম্মান করছে। যেমন, হিন্দুরা তাদের শ্রদ্ধার পাত্র পুরোহিত বা অন্য কোনো কাফির ব্যক্তিকে দেখে। যেমন, নাসারাগণ তাদের শ্রদ্ধার পাত্র নবী, হাওয়ারী ও অন্যদের দেখে। অনুরূপ আহলে কিবলার পথভ্রষ্টরাও জাগ্রত অবস্থায় তাদের সম্মানিত ব্যক্তিদের দেখে: হয়তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অথবা অন্য কাউকে, তারা তাকে সম্বোধন করে, সেও তাদেরকে সম্বোধন করে। কখনো তার থেকে উপকৃত হয়, তাকে কোনো হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আর সে তাদেরকে উত্তর দেয়। তাদের কাউকে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে, হুজরা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসেছেন, তার সাথে মু‘আনাকা করছেন তিনি এবং তার দুই সাথী। আবার তাদের কাউকে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে, তার সালাম কয়েক দিনের দূরত্বে ও অনেক দূর স্থানে পৌঁছে গেছে। এরূপ আরও অনেক ঘটনা জানি এবং যাদের সাথে ঘটেছে তাদের অনেককেই জানি। আমার নিকট এদের অনেকে এর সত্য সত্য বর্ণনা দিয়েছে, তাদের উল্লেখ করলে স্থান দীর্ঘায়িত হবে।

    এরূপ ঘটনা অনেকেরই ঘটতে পারে, যেরূপ ঘটে নাসারা ও মুশরিকদের ক্ষেত্রে। তবে এদের অনেকে এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। আবার এদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও তারা এটা আল্লাহর নিদর্শন মনে করে, আরও ধারণা করে যে, এটা তার অন্তরের শুদ্ধতা ও দীনদারীর কারণেই ঘটেছে; কিন্তু সে জানে না এটা শয়তানের পক্ষ থেকে, সে জানে না মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার সুযোগে শয়তান তাদেরকে গোমরাহ করে। যার একেবারেই সামান্য জ্ঞান, শয়তান তাকে শরী‘আতের স্পষ্ট খেলাফ করার নির্দেশ করে। আর যার মোটামুটি জ্ঞান রয়েছে, শয়তান তাকে তার জানা বিষয়ের মাধ্যমেই গোমরাহ করে, এটাই শয়তানের কাজ, সে যদিও মনে করে কিছু সে অর্জন করেছে; কিন্তু সে যে দীন হারিয়েছে তার ক্ষতি এর চেয়ে ঢের বেশি।

    এ জন্যই কোনো সাহাবী বলেন নি, তার কাছে খিজির এসেছে, না মূসা, না ঈসা, আর না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনেছেন।

    ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সফর থেকে এসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিতেন; কিন্তু কখনো তিনি বলেন নি আমি উত্তর শুনেছি। অনুরূপ তাবে‘ঈ বা তাদেরও অনুসারী কারো ক্ষেত্রে এরূপ ঘটে নি, বরং এসব ঘটেছে তাদেরও অনেক পরে।

    অনুরূপ কোনো সাহাবী তাদের ইখতিলাফী বিষয় বা ইলমী কোনো সমাধানের জন্য তার কবরে যান নি, না চার খলিফা, না তাদের ব্যতীত অন্য কেউ, অথচ তাদের সাথেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক গভীর ছিল।

    এমনকি ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে পর্যন্ত শয়তান বলার সাহস করে নি, তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, আপনার মিরাসের হুকুম কী?

    অনুরূপ অনাবৃষ্টির সময় শয়তান তাদেরকে এভাবে ধোঁকা দেওয়ার সাহস করে নি, তার নিকট দো‘আ প্রার্থনা কর, যেন তিনি বৃষ্টির জন্য দো‘আ করেন। তাদেরকে এও বলে নি, তোমাদের বিজয়ের জন্য তার নিকট সাহায্যের দো‘আ প্রার্থনা কর, আর না বলেছে তার নিকট ইস্তেগফার প্রার্থনা কর। তার জীবিতাবস্থায় যেরূপ তারা তার নিকট গিয়ে রোগ মুক্তির দো‘আ চাইত, বিজয়ের জন্য দো‘আ চাইত। তার মৃত্যুর পর শয়তান তাদেরকে এরূপ গোমরাহ করার সাহস করে নি, আর না এভাবে সাহস করেছি পরবর্তী তিন যুগে। এসব গোমরাহী তখনই সৃষ্টি হয়েছে, যখন তাওহীদ ও সুন্নতের ইলম হ্রাস পেয়েছে, তখনি তাদের গোমরাহ করার সুযোগ শয়তানের হাতে এসেছে, যেরূপ গোমরাহ করেছে নাসারাদের, যখন তাদের নিকট ঈসা ও তার পূর্ববর্তী নবীগণের ইলম হ্রাস পেয়েছিল”।[3]

    আল্লামা আলুসী রহ. বলেন, “কামেল লোকদের সম্পর্কে যা বলা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তারা তাকে দেখেছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তার থেকে শিখেছেন -ইসলামের প্রথম যুগে কারো ব্যাপারে এরূপ ঘটেছে আমাদের জানা নেই।

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর দীনি ও দুনিয়াবী বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবীগণের মাঝে ইখতিলাফ হয়েছে, তাদের মধ্যে আবু বকর ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছিলেন। যেসব সূফীদের সম্পর্কে এসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তাদের সিলসিলা এদের দু’জন পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়, অথচ কোনো প্রমাণ নেই যে, তাদের কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছেন অথবা তার থেকে শিখেছেন।

    অনুরূপ আমাদের কাছে এমন প্রমাণও নেই যে, কোনো সমস্যার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে সাহাবীগণকে সমাধান দিয়েছেন।

    উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে প্রমাণিত, তিনি কোনো বিষয়ে বলেছেন: আফসোস! এ বিষয়ে যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করতাম!

    আমাদের নিকট এমন প্রমাণও নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট দো‘আর আবেদন করেছেন। যেমন, কতক সূফীদের ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়।

    তুমি জান যে, সাহাবায়ে কিরাম ‘দাদার সাথে ভাইদের মিরাস’ বণ্টন সম্পর্কে ইখতিলাফ করেছেন; কিন্তু তুমি কি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তার সমাধান দিয়েছেন?!

    তোমার নিকট নিশ্চয় পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা কীরূপ শোকে কাতর হয়েছিল, “ফিদাক”-এর মিরাস সম্পর্কে তার অবস্থা কেমন হয়েছিল, কিন্তু তুমি কি জান, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ও তার সমস্যা দূর করেছিলেন, যেমন সূফীদের ক্ষেত্রে ঘটে?!

    তুমি অবশ্যই জান যে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বসরায় গিয়েছিলেন, যে কারণে সেখানে জামাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়; কিন্তু তুমি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে নিষেধ করেছেন অথবা তাকে বিরত রেখেছেন?! এ ধরণের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা গণনা করা সম্ভব নয়।

    মোদ্দাকথা: আমাদের নিকট পৌঁছে নি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোনো সাহাবী বা তাঁর পরিবারের কোনো প্রয়োজনে কবর থেকে বের হয়েছেন, অথচ তাদের এটা বেশি প্রয়োজন ছিল।

    মসজিদে কুবার দরজার সামনে তার বের হওয়ার যে ঘটনা কতক শি‘আ সম্প্রদায় বর্ণনা করে থাকে, তা শুধুই অপবাদ ও মিথ্যাচার।

    সারকথা: পূর্ববর্তী নেককার লোকদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বের না হওয়া আর পরবর্তী লোকদের জন্য বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে, যার দ্বারা বিবেকবান সন্তুষ্ট হতে পারে”।[4]

    শাইখ ইবন বায রহ. বলেন:

    “দীনের অকাট্য প্রমাণ ও শরী‘আতের দলীল দ্বারা জানা গেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যমান নয়, তার শরীর শুধু তার কবরে মদিনায় বিদ্যমান। আর তার রূহ ‘রফীকে আ‘লা’ তথা জান্নাতে বিদ্যমান। এর প্রমাণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, তিনি মৃত্যুর সময় বলেছেন: “আল্লাহুম্মা ফির-রাফিকিল আ‘লা” তিনবার বলেন, অতঃপর তিনি মারা যান”।

    সাহাবায়ে কেরাম ও তার পরবর্তী সকল উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মসজিদের পাশে আয়েশার ঘরে দাফন করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত তার শরীর সেখানেই বিদ্যমান। আর তার রূহ, অনুরূপ অন্যান্য নবী-রাসূল ও নেককার লোকদের রূহ জান্নাতে; কিন্তু তাদের প্রত্যেকের স্তর ও মর্যাদায় তারতম্য রয়েছে, তাদের ইলম ও ঈমান এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যের তারতম্য অনুরূপ।

    কতক সূফী যেমন ধারণা করে, তিনি গায়েব জানেন এবং তাদের মীলাদ ইত্যাদিতে তিনি উপস্থিত হোন, এসব ভ্রান্ত আকীদা, এর পশ্চাতে কোনো দলীল নেই; বরং কুরআন-হাদীস ও আদর্শ পূর্বসূরীদের সম্পর্কে মূর্খতাই তাদেরকে এ দিকে ধাবিত করেছে।

    আল্লাহ তাদেরকে যে গোমরাহীতে লিপ্ত করেছেন, তা থেকে আমরা নিজেদের জন্য ও সকল মুসলিমের জন্য নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলার নিকট দো‘আ করছি, তিনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকীম ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন। নিশ্চয় তিনি শ্রবণ করেন, নিশ্চয় তিনি কবুল করেন”।[5] (সংক্ষেপিত)

    সমাপ্ত

    [1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৬৬৭

    [2] মাজমুউল ফাতাওয়া: (১০/৪০৬-৪০৭)

    [3] মাজমুউল ফাতাওয়া: (২৭/৩৯০-৩৯৩)

    [4] রুহুল মা‘আনী: (২২/৩৮-৩৯)

    [5] মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায: (৩/৩৮১-৩৮৩)

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ