ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কি কোনো ইসলামী দলে যোগ দেয়া যাবে?

বর্ণনা

এটি সম সাময়িক বিষয়ের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া। এখানে বর্তমান সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামী দলে যোগদানের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কি কোনো ইসলামী দলে যোগ দেওয়া যাবে?

    هل ينضم لحزب إسلامي في بلد علماني؟

    < بنغالي- Bengal - বাঙালি>

    ইসলাম কিউ এ

    موقع الإسلام سؤال وجواب

    —™

    অনুবাদক: জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: ذاكر الله أبو الخير

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কি কোনো ইসলামী দলে যোগ দেওয়া যাবে?

    প্রশ্ন: আমাদের দেশে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল আছে। তাদের শ্লোগান হচ্ছে যে, যদি তারা ক্ষমতায় যেতে পারে তাহলে তারা দেশে ইসলামী শাসন কায়েম করবে এবং আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে। আমি এ দেশের একজন নাগরিক। এখানে খুব কম লোকই আছে যারা ইসলামের অনুশাসন মেনে চলে বা হারাম হালাল বেচে জীবন যাবন করে। ঈমানের দুর্বলতার কারণে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত। রাজনৈতিক দলগুলোও আল্লাহর নাফরমানি, দলাদলি, প্রতিহিংসা ইত্যাদিতে লিপ্ত। এ অবস্থায় ইসলামী রাজনৈতিক দল, যারা এ আশা দিচ্ছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে ইসলামী শাসন কায়েম করবে এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে, তাদের দলে যোগ দেওয়া ফরয কিনা? তারা বলেন, আমরা যদি তাদের সাথে যোগ দেই এবং তাদের সহযোগিতা করি তাহলে, জমিনে আল্লাহর দীন কায়েম করা সম্ভব। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে এ ধরনের রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু দলের দর্শন আমাকে তাদের সাথে যোগ দিতে উৎসুক করে। আশা করি, এ বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দেবেন।

    উত্তর: আলহামদু লিল্লাহ

    প্রথমত: ইসলামের অনুসারীদের জন্য হকের উপর অটুট থাকাকে ইসলাম ফরয করেছে। তারা যাতে হক থেকে বিচ্যুত ও বিচ্ছিন্ন না হয় সে ব্যাপারে তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হককে জানার পরও পরস্পর বিভেদ করা ও বিচ্ছিন্ন হওয়া কোনো মুসলিমদের পথ নয়; এটি অমুসলিমদের পথ ও গোমরাহী। কারণ, এতে মুসলিমরা দুর্বল হয়ে পড়বে, তাদের শক্তি ক্ষয় হবে। ফলে ইসলামের শত্রুদের জন্য মুসলিমদের শিকার করা ও ঈমান হতে দূরে সরানো সহজ হবে।

    আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ ... ١٠٣﴾ [ال عمران: ١٠٣]

    “আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]

    আয়াতটির তাফসীরে আল্লামা ইবন কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে মুমিনদের একতাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন। এ ছাড়াও পারস্পরিক বিবাদ করা, বিচ্ছিন্ন হওয়া যে নিষিদ্ধ এবং উম্মতের ঐক্য অটুট রাখা ও একতাবদ্ধ হয়ে থাকার বিষয়ে আরও অনেক হাদীস রয়েছে। সহীহ মুসলিমে সুহাইল ইবন আবি সালেহ তার পিতা হতে এবং তিনি আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় পছন্দ করেন এবং তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন। যে তিনটি বিষয় পছন্দ করেন, তা হল, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে ধরবে এবং বিচ্ছিন্ন হবে না। [মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আরও অতিরিক্ত এসেছে,] (তোমরা তোমাদের প্রশাসকদের কল্যাণকামী হবে।) আর যে তিনটি বিষয় তোমাদের জন্য অপছন্দ করেন, তা হলো, অনর্থক কথা-বার্তা বলা, অধিক প্রশ্ন করা এবং সম্পদের অপচয় করা।”

    এছাড়াও আরও বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, যখন উম্মতের মধ্যে ঐক্য থাকে, তখন তাদেরকে ভুল ভ্রান্তি থেকে হিফাযত করা হয়। আর যখন তাদের মধ্যে ঐক্য না থাকে, তখন তাদের বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বর্তমানে উম্মতের বিভেদ বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট। তারা তিয়াত্তর দলে বিভক্ত। তাদের থেকে কেবল একটি দল জান্নাতে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। আর তারা হলো, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের সূন্নাতের অনুসারী। (তাফসীরে ইবন কাসীর, ২/৮৯, ৯০)

    আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

    ﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤ وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ تَفَرَّقُواْ وَٱخۡتَلَفُواْ مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ ٱلۡبَيِّنَٰتُۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٥﴾ [ال عمران: ١٠٤، ١٠٥]

    “আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪, ১০৫]

    দ্বিতীয়ত: আল্লাহর দীনের পরিপন্থী ও বিরুদ্ধবাদী এমন কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করা একজন মুসলিমের জন্য কোনোক্রমেই বৈধ নয়। যেমন, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতান্ত্রিক দল ইত্যাদি। কারণ, এ সব দলে যোগদান করার অর্থই হল, তাদের কুফুরী ও গোমরাহীকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের দলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

    আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسۡتَقِيمٗا فَٱتَّبِعُوهُۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمۡ عَن سَبِيلِهِۦۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٥٣﴾ [الانعام: ١٥٣]

    “আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তো তোমাদেরকে তার পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৩]

    আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

    ﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗا لَّسۡتَ مِنۡهُمۡ فِي شَيۡءٍۚ إِنَّمَآ أَمۡرُهُمۡ إِلَى ٱللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُواْ يَفۡعَلُونَ ١٥٩﴾ [الانعام: ١٥٩]

    “নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৯]

    শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রহ. বলেন, “যারা আল্লাহ তা‘আলার দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, তাদের সতর্ক করেছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের জন্য কতক নাম নির্ধারণ করেছেন, যা তাদের দীনের ব্যাপারে কোনো উপকারে আসবে না। যেমন, ইয়াহূদীবাদ, খৃষ্টবাদ ও মাজুসবাদ তথা পারসিক। অথবা এতে একজন মানুষের ঈমানও পূর্ণ হবে না যে শরী‘আত থেকে কিছু অংশ নিয়ে দীন বানিয়ে নিলো এবং অনুরূপ কিছু অংশকে বা তা হতে উত্তম বিষয়টিকে অস্বীকার করল। যেমন, দেখা যায় বর্তমান বেদ‘আতী, গোমরাহ ও উম্মতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অবস্থা লক্ষ্য করলে”(তারা তাদের শরী‘আতের যে বিধানটি তাদের মনঃপুত হলো, তা গ্রহণ করল আর যা মনঃপুত হলো না তা গ্রহণ করল না)

    এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হলো যে, দীন মানুষদেরকে ঐক্যবদ্ধ ও মিলে-মিশে থাকার নির্দেশ দেয় এবং দীনদার মুসলিমদের সারিতে বিভেদ ও বিচ্ছন্নতা সৃষ্টি করা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। অনুরূপভাবে যাবতীয় মুখ্য ও গৌণ সব বিষয়ে মতভেদ করতে নিষেধ করে।

    আর আল্লাহ তাঁর নবীকে সেসব লোক সাথে সম্পর্কচ্যুতি ঘটাতে নির্দেশ প্রদান করে বলেন,

    ﴿لَّسۡتَ مِنۡهُمۡ فِي شَيۡءٍۚ إِنَّمَآ أَمۡرُهُمۡ إِلَى ٱللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُواْ يَفۡعَلُونَ ١٥٩﴾ [الانعام: ١٥٩]

    “তুমি তাদের নও এবং তারাও তোমার নয়। কারণ, তারা তোমার বিরোধিতা করে, তোমার সাথে শত্রুতা রাখে। তাদের যাবতীয় বিষয় আল্লাহর হাতে, তারা আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাদের আমলের বিনিময় প্রদান করবেন”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৭] (তাফসীরে সা‘দী, পৃ: ২৮২)

    তৃতীয়ত: আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা, ইসলাম ও মুসলিমের খেদমত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংঘটন, সংস্থা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করাতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে শর্ত হলো, কোনো নাম বা মতামতের জন্য এমন গোড়ামী করা যাবে না যা মুসলিমদের কাতারে বিভেদ সৃষ্টি করবে কিংবা তাদের ঐক্যে ফাটল ধরাবে।

    চতুর্থত: কোনো মতকে গোড়ামী করে প্রতিষ্ঠাকরণ কিংবা কোনো নেতৃত্বের পেছনে দলাদলি করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দল ও জামাত প্রতিষ্ঠা করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। কারণ, এতে উম্মতের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়, যা থেকে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।

    শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, কোনো নেতার জন্য উচিৎ নয় যে, সে মানুষকে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত করবে এবং এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটাবে যা মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব ছড়ায়। বরং মানুষ থাকবে একে অপরের ভাই ভাই। তারা একে অপরের ভালো ও সৎ কর্মে সহযোগী হবে। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ٢﴾ [المائ‍دة: ٢]

    “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ২]

    অনুরূপভাবে কারও কাছ থেকে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি নেওয়া কখনোই বৈধ নয় যে, আমি যা করব, তুমি তাই করবে, আমার ইচ্ছার বাইরে কিছুই করবে না, আমি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখব, তুমিও তার সাথে বন্ধুত্ব রাখবে এবং আমি যার সাথে শত্রুতা রাখব, তুমিও তার সাথে শত্রুতা রাখবে। যদি কোনো ব্যক্তি এ ধরনের কিছু করে তবে তার দৃষ্টান্ত হবে চেঙ্গিস-খান ও তার সঙ্গীদের মতো। যারা তাদের মতের অনুসারী হত, তাদের তারা বন্ধু বানাত আর যারা তাদের মতের বিরোধিতা করত, তাদের তারা রাষ্ট্রদ্রোহ ও শত্রু মনে করত। বস্তুত তাদের ও তাদের অনুসারীদের ওপর ফরয ছিল, আল্লাহর হুকুমের বাস্তবায়ন করা, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করা, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং আল্লাহ ও তার রাসূল যা হারাম করেছেন, তাকে হারাম জানা। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যেভাবে নির্দেশ করেছেন, সেভাবে নেতাদের হকের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/১৫,১৬)

    তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো মানুষ থেকে এ বলে শপথ নেয় যে, সে যার সাথে বন্ধুত্ব রাখে তাকেও তার সাথে বন্ধুত্ব রাখতে হবে এবং যার সাথে দুশমনি রাখে তাকেও তার সাথে দুশমনি রাখতে হবে, তাহলে সে তাতারিদের অন্তর্ভুক্ত হবে যারা শয়তানের রাহে যুদ্ধ করে। এ ধরনের লোক কখনোই আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ হতে পারে না এবং মুসলিম সৈন্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। এ ধরনের লোক মুসলিম বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হওয়াও বৈধ নয়, বরং সে শয়তানের বাহিনী। তবে একজন ব্যক্তি (নেতা/শিক্ষক) তার ছাত্র/অনুসারীকে এ কথা বলাই উত্তম যে, তুমি আল্লাহর সাথে দেওয়া প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির কাছে দায়বদ্ধ। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব করবে, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের শত্রুদের সাথে শত্রুতা করবে। ভালো ও তাকওয়ার কর্মে সাহায্য করবে, মন্দ ও গুনাহের কর্মে সাহায্য করবে না। যদি সত্য আমার সাথে থাকে তাহলে তুমি হকের সাহায্য কর, আর আমি যদি বাতিলের উপর থাকি, তাহলে বাতিলকে সাহায্য করা যাবে না। যে ব্যক্তি এ মূলনীতি অনুসরণ করবে, সে অবশ্যই আল্লাহর রাহের মুজাহিদ; যারা আল্লাহর দীনকে আল্লাহর জন্য পালন করে এবং আল্লাহর বাক্যকে সমুন্নত রাখতে চেষ্টা করে, তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [মাজমুউল ফাতাওয়া, পৃ: ২০, ২১/২৮]

    শাইখ আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ ইবন বায রহ. বলেন, বর্তমান সময়ে আবিষ্কৃত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দান করা হতে বিরত থাকা ওয়াজিব। সবার জন্য ওয়াজিব হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত থাকা এবং ইখলাস ও সততার সাথে এ বিষয়ে সহযোগিতা করা। আমরা যদি এভাবে সহযোগিতা করতে পারি তবে আমরা সূরা মুজাদালার শেষে যে আল্লাহর দলের কথা বলা হয়েছে, “নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলতা লাভ করবে” তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারব। আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতে শুরুতে “যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে শত্রুতা রাখে তাদের সাথে সে লোকদের বন্ধুত্ব আপনি দেখতে পাবেন না যারা আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে”; -এসব গুণাগুণ আলোচনা করার পরই আল্লাহ তা‘আলা উক্ত কথাটি বলেছেন।

    সূরা আয-যারিয়াতে তাদের গুণাগুণ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

    ﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٍ ١٥ ءَاخِذِينَ مَآ ءَاتَىٰهُمۡ رَبُّهُمۡۚ إِنَّهُمۡ كَانُواْ قَبۡلَ ذَٰلِكَ مُحۡسِنِينَ ١٦ كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ وَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ ١٩ وَفِي ٱلۡأَرۡضِ ءَايَٰتٞ لِّلۡمُوقِنِينَ ٢٠﴾ [الذاريات: ١٥، ٢٠]

    “নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, তাদের রব তাদের যা দিবেন তা তারা খুশীতে গ্রহণকারী হবে। ইতোপূর্বে এরাই ছিল অনুগ্রহশীল। রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো, আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। আর তাদের ধন সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক”[সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৫-২০] এ সবই হলো, আল্লাহর পছন্দনীয় দলের লোকদের গুনাগুণ। আল্লাহর কিতাব ও সূন্নাত ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি তারা ঝুঁকে না, অন্য কিছুর দিকে মানুষদেরকে ডাকে না। তারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাতের প্রতি মানুষকে আহ্বান করে এবং উম্মতের সাহাবী ও তাদের অনুসারীদের মতে চলার প্রতি দাওয়াত দেন।

    সুতরাং তারা প্রতিটি জামাত ও সংগঠনকে সাহায্য করে এবং তাদেরকে কুরআন ও সুন্নতকে আঁকড়ে ধরার প্রতি আহ্বান করে। তারা কোনো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে তা কুরআন ও সূন্নাহের সামনে তুলে ধরে। তারা মনে করে, যদি তাদের কথা কুরআন ও সুন্নাহ উভয়টির বা যে কোনো একটির মোতাবেক হয়, তবে তা গৃহীত এবং তা হক। আর যদি কুরআন ও হাদিসে পরিপন্থী হয় তা প্রত্যাখ্যাত এবং তা ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব।

    এ ব্যাপারে (জামায়েতে ইসলাম) জামা‘আতে ইখওয়ানুল মুসলিমীন, আনসারুসসুন্নাহ, জমঈয়া শর-ইয়াহ, জামা‘আতে তাবলীগ ইত্যাদি সকল জামা‘আত যারা নিজেদের ইসলামী জামা‘আত বা দল বলে দাবি করেন, তাদের কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সকলকেই কুরআন ও সুন্নাহের অনুসারী হতে হবে। যদি তাদের মধ্যে এ জিনিসটি থাকে তাহলে তাদের সবার কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না, তাদের লক্ষ্য অভিন্ন, তারা সবাই একই জামা‘আতে পরিণত হবে। তাদের সবাইকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বলে আখ্যায়িত করা হবে এবং তারাই হবেন হিযবুল্লাহ, আল্লাহর দীনের সহযোগী ও আল্লাহর দীনের প্রতি দা‘ঈ।

    কোনো জামা‘আত বা কোনো দলে যদি ইসলামী শরী‘আত পরিপন্থী কাজ সংঘটিত হয়, তাহলে তার জন্য গোড়ামী করে তার পক্ষ নেওয়া কোনো ক্রমেই বৈধ নয়। (মাজমুউ ফাতাওয়ায়ে শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন বায রহ. ১৭৭, ১৭৮/৭)

    পঞ্চমত: যদি কোনো মুসলিম কোনো ধর্মনিরপেক্ষবাদী শহরে বসবাস করেন এবং সেখানে এমন কোনো জামাত পাওয়া যায় যারা মানুষদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে বা মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে অংশ গ্রহণ করে এবং মুসলিমদের আকীদা, বিশ্বাস ও তাদের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করেন, তাহলে কারো জন্যই তাদের অপমান করা ও তাদের বিপক্ষে অপপ্রচার করা জায়েয নেই, বরং তাদের সাহায্য করতে হবে এবং যথা সম্ভব তাদের সহযোগিতা করতে হবে। যদি কোনো মুসলিম কেবল তাদের সাথে নাম লেখানো ছাড়া আর কোনো সহযোগিতা করতে না পারে তবে কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি ও দলাদলি ছাড়া সতর্কতার সাথে তাদের দলে নাম লেখানোতে কোনো অসুবিধা নেই।

    শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রহ. সূরা হুদের তাফসীরে শোয়াইব আলাইহিস সালামের ঘটনার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

    আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের থেকে বিপদ বিভিন্নভাবে প্রতিহত করেন, কোনো কোনো কারণ আছে তা তারা জানে, আবার কোনো কোনো কারণ আছে তা তারা জানে না। কোনো কোনো সময় তাদের থেকে জুলুম নির্যাতন গোত্রীয় কারণে প্রতিহত করেন অথবা স্বজাতি হওয়ার কারণেও (তারা কাফের হলেও) মুসলিমদের ওপর যুলুম নির্যাতন করে না। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা শোয়াইব আলাইহিস সালামকে তার কাওমের পাথর মারা থেকে রক্ষা করেন, স্বগোত্রীয় হওয়ার কারণে। এ ধরনের বন্ধন যার দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদের থেকে যুলুম নির্যাতন প্রতিহত করা যায়, তা গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করাতে কোনো ক্ষতি নেই, বরং ক্ষেত্র বিশেষে এর কোনো বিকল্প থাকে না। কারণ, শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী উম্মতের সংশোধন করাই হলো মূল লক্ষ্য।

    এরই ভিত্তিতে বলা যায়, যে সব মুসলিম কাফের রাজত্বের অধীনে বসবাস করে, তারা যদি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাহায্য করে, যাতে জনগণ তাদের দীনি ও দুনিয়াবী অধিকারগুলো স্বাধীনভাবে আদায় করতে পারে, তা হলে তা তাদের জন্য উত্তম হবে, ঐ রাষ্ট্রের আনুগত্য করার চেয়ে যারা তাদের দীনি ও দুনিয়াবী স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে, তাদের সমূলে উৎখাত করতে চেষ্টা করে এবং কর্মচারী ও অধীনস্থ বানাতে চায়। হ্যাঁ, তবে যদি সম্ভব হয়, রাষ্ট্র মুসলিমদেরই হবে এবং তারা নেতৃত্ব দেবে, তাহলে তাই নির্ধারিত থাকবে। কিন্তু যদি এ পর্যায়ে আসাটা সম্ভব না হয়, তখন যে পদ্ধতি অবলম্বন করা দ্বারা মুসলিমদের থেকে জুলুম নির্যাতন প্রতিহত করা যায়, দ্বীন ও দুনিয়ার হেফাযত হয়, তা গ্রহণ করা মন্দের ভালো বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহই ভালো জানেন। (তাফসীরে আস-সা‘দী, পৃ: ৩৮৮)

    লাজনা দায়েমা বা ফাতাওয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমদের জিজ্ঞাসা করা হলো, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামী দল বা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে কিনা? যদি সে দল বা সংগঠনটি সে দেশের আইন কানুন এর ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন এবং দাওয়াতি কাজের বিষয়টি তাদের গোপন লক্ষ্য থাকে?

    তারা উত্তর দেন: কোনো অমুসলিম দেশে অবস্থান করতে বাধ্য মুসলিমরা সেখানে সুস্থভাবে জীবন যাপন করার লক্ষ্যে একীভূত হওয়া, একে অপরের সহযোগিতা করা, পরস্পর সু-সম্পর্ক স্থাপন করা এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা সম্পূর্ণ বৈধ। চাই এটি কোনো ইসলামী সংগঠনের ব্যানারে হোক বা কোন ইসলামী দলের নামে হোক। কারণ, এতে রয়েছে তাকওয়া ও কল্যাণমূলক কাজের বিষয়ে সহযোগিতা।“ফাতাওয়া লাজনায়ে দায়েমাহ” বা ফাতাওয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির মতামত: (২৩/৪০৭, ৪০৮)

    ষষ্ঠত: আর আমরা তোমার জন্য বা তোমার মত আরও যারা আছে তাদের জন্য আমাদের পরার্মশ হবে এই যে, তুমি ইসলামী দলে যোগ না দিয়ে তাদের সাহায্য করবে। তাহলে তুমি দলাদলি করলে না, কারণ দলাদলিতে রয়েছে বিবিধ সমস্যা যেমনটি পূর্বে আমরা বর্ণনা করেছি। তুমি বরং তাদের সাথে যোগ না দিয়ে তাদের কাছে যে হক বা সঠিক কর্মকাণ্ড রয়েছে সেটাকে সমর্থন করতে পার। এভাবে তুমি এক সাথে দুটি কাজ করলে, দলাদলি পরিত্যাগ করলে এবং তোমার পরিবারের কথাও রাখলে। আর যদি অবস্থা এমন হয়, তাদের দলে যোগদান ছাড়া তাদের সহযোগিতা করা যায় না, তাহলে তুমি তোমার পরিবারের লোকদের বুঝাবে যে, আমার তাদের দলে যোগ দেওয়া, ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণের জন্যই। তারপরও যদি তোমার পরিবার তোমাকে উক্ত দলের সাথে যোগদানে বাধা দেয় এবং তোমার জন্য ইসলামী দলে যোগদান করাটা তাদের তত্বাবধানে ও একই ঘরে থাকার কারণে তাদের থেকে গোপন রাখাও সম্ভব না হয়, তাহলে আমরা তোমার জন্য যেটি ভালো মনে করি সেটা হলো, তুমি দলটির সাথে যোগ দেবে না। আর যদি তুমি তোমার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাক, তাহলে যদি তুমি তোমার পরিবারের কথা না শোন (অর্থাৎ উক্ত দলে যোগ দাও) তবে তাতে তুমি গুনাহগার হবে না।

    আল্লাহই ভালো জানেন।