সাদা কালো নানা রঙের মানুষ সৃষ্টির হিকমত

বর্ণনা

জনৈক ব্যক্তির প্রশ্ন: মানুষকে কেন সাদা কালো নানা রঙের সৃষ্টি করা হয়েছে, এ রহস্যের কুরআনিক কোনো উত্তর আছে কি? এ ফতোয়ায় তার উত্তর প্রদান করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

সাদা কালো নানা রঙের মানুষ সৃষ্টির হিকমত

الحكمة من خلق البشر على ألوان مختلفة أبيض وأسود ونحوه

 সাদা কালো নানা রঙের মানুষ সৃষ্টির হিকমত

প্রশ্ন: মানুষকে কেন সাদা কালো নানা রঙের সৃষ্টি করা হয়েছে, এ রহস্যের কুরআনিক কোনো উত্তর আছে কি? দীর্ঘদিন যাবত আমি তার উত্তর খুজছি, কিন্তু শান্তনাদায়ক উত্তর পাইনি।

উত্তর: আল-হামদুলিল্লাহ।

 আবু মুসা ‘আশআরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَلَقَ آدَمَ مِنْ قَبْضَةٍ قَبَضَهَا مِنْ جَمِيعِ الْأَرْضِ ، فَجَاءَ بَنُو آدَمَ عَلَى قَدْرِ الْأَرْضِ، مِنْهُمُ الْأَحْمَرُ وَالْأَسْوَدُ وَالْأَبْيَضُ وَالْأَصْفَرُ، وَبَيْنَ ذَلِكَ ، وَالسَّهْلُ وَالْحَزْنُ ، وَالْخَبِيثُ وَالطِّيبُ».

“নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আদমকে এক মুষ্ঠি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, যা তিনি জমিনের সব জায়গা থেকে নিয়েছেন, ফলে আদম সন্তান হয়েছে জমিনের প্রকৃতি মোতাবেক, কেউ লাল, কেউ কালো, কেউ সাদা ও কেউ হলুদ ইত্যাদি। কেউ নরম স্বভাবের, কেউ কঠিন স্বভাবের, কেউ ভালো ও কেউ খারাপ”[1]

এ হাদিস প্রমাণ করে যে, মানুষের নানা রঙ ও তাদের স্বভাব আল্লাহর সৃষ্টি ও তার তাকদির, যা তাদের উপাদানের প্রকৃতি মোতাবেক, যেখান থেকে তারা জন্ম লাভ করেছে এবং ঐ মাটির মত, যেখান থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জমিনের মাটি ও তার বিভিন্ন অঞ্চল এক রঙের নয়, বরং লাল, সাদা ও কালো ইত্যাদি, এ হিসেবে মানুষের রঙ ও তাদের বিভিন্ন আকৃতি সৃষ্টি হয়েছে, কেউ লাল, কেউ কালো ও কেউ সাদা ইত্যাদি।

মাটির স্বভাবও বিভিন্ন প্রকার, তার কোনো অংশ কঠিন ও অমসৃণ, যেখানে চলা খুব কষ্টকর, কোনো অংশ নরম ও মসৃণ, যেখানে বিচরণ করা খুব সহজ, আবার কোনো অংশ আছে মাঝামাঝি প্রকারের। মানুষের স্বভাবও তথৈবচ, কেউ নরম ও ভদ্র প্রকৃতির, কেউ কঠিন ও রক্ষ্ম প্রকৃতির, কেউ মাঝামাঝি। আবার কতক মানুষ আছে ভালো ও মুমিন, কেউ আছে খারাপ ও কাফির, জমিনের অবস্থাও সেরূপ, যেখান থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

এসব কিছুই হচ্ছে আল্লাহর কুদরত ও মহান রাজত্বের নির্দশন, সকল মানুষ তার মুষ্টি, ক্ষমতা ও রাজত্বের অধীন, হোক সে মুমিন, কিংবা কাফির; কঠিন কিংবা নরম মেজাজের, সবাই তার কুদরত ও কর্তৃত্বের অধীন, তার আদেশ ও তাকদিরের নিকট অবনত। তার হিকমতের দাবি মোতাবেক যেভাবে ইচ্ছা তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের সৃষ্টি ও নানা রঙের গঠনকে তার কুদরত ও মহত্বের নির্দশন বানিয়েছেন। তিনি ক্ষমতাধর, যা ইচ্ছা করেন এবং যেভাবে চান সৃষ্টি করতে পারেন। তার সৃষ্টি, নির্দেশ ও রাজত্বে কোনো মখলুকের সামান্যতম অধিকার নেই। এককভাবে তিনিই মখলুকের উপর রাজত্বকারী। তিনি ঘোষণা করেন:

﴿ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٥٤ [الاعراف: ٥٣] 

 “জেনে রেখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তারই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব”[2] অপর আয়াতে তিনি ঘোষণা করেন:

﴿ وَرَبُّكَ يَخۡلُقُ مَا يَشَآءُ وَيَخۡتَارُۗ مَا كَانَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُۚ سُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٦٨ [القصص: ٦٨] 

 “আর তোমার রব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং মনোনীত করেন, তাদের কোনো ইখতিয়ার নেই। আল্লাহ পবিত্র মহান এবং তারা যা শরীক করে, তিনি তা থেকে উর্দ্ধে”[3] অপর আয়াতে তিনি বলেন:

﴿ وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦ خَلۡقُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱخۡتِلَٰفُ أَلۡسِنَتِكُمۡ وَأَلۡوَٰنِكُمۡۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّلۡعَٰلِمِينَ ٢٢ [الروم: ٢٢] 

“আর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য”[4]

আল্লামা শানকিতি রহ. বলেন: “এ ছাড়া একাধিক জায়গায় আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের রঙের ভিন্নতা, পাহাড়সমূহ, ফল-ফলাদি, কীট-পতঙ্গ ও জীব-জন্তুর রঙের বিভিন্নতা আল্লাহর পরিপূর্ণ কুদরত এবং তিনিই ইবাদতের হকদার প্রমাণ বহন করে। এসব বস্তুর বিচিত্র রঙ আল্লাহর মহান সৃষ্টি ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফল। তিনিই এগুলোতে ক্ষমতার প্রয়োগ ও কর্তৃত্বকারী, এসব কর্মকাণ্ডকে প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত করা সবচেয়ে বড় কুফরি ও গোমরাহী”[5]

 মুদ্দাকথা: মুসলিমের কর্তব্য হল আল্লাহর সৃষ্টি ও বিধানে বিদ্যমান পরিপূর্ণ হিকমতকে মেনে নেওয়া, যে হিকমত আমাদের জন্য স্পষ্ট হয়, আমরা তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করব, যার ফলে মুমিনের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পায়। আর যা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়নি, আমরা তার জ্ঞানকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করব এবং তার প্রতি ঈমান আনব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ هُوَ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ مِنۡهُ ءَايَٰتٞ مُّحۡكَمَٰتٌ هُنَّ أُمُّ ٱلۡكِتَٰبِ وَأُخَرُ مُتَشَٰبِهَٰتٞۖ فَأَمَّا ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمۡ زَيۡغٞ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَٰبَهَ مِنۡهُ ٱبۡتِغَآءَ ٱلۡفِتۡنَةِ وَٱبۡتِغَآءَ تَأۡوِيلِهِۦۖ وَمَا يَعۡلَمُ تَأۡوِيلَهُۥٓ إِلَّا ٱللَّهُۗ وَٱلرَّٰسِخُونَ فِي ٱلۡعِلۡمِ يَقُولُونَ ءَامَنَّا بِهِۦ كُلّٞ مِّنۡ عِندِ رَبِّنَاۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٧ [ال عمران: ٧] 

“তিনিই তোমার উপর কিতব নাযিল করেছেন, তার মধ্যে আছে মুহকাম আয়াতসমূহ, সেগুলো কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো মুতাশাবিহ, ফলে যাদের অন্তরে রয়েছে সত্য বিমুখ প্রবণতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে মুতাশাবিহ আয়াতসমূহের পেছনে লেগে থাকে, অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেক সম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে”[6] আল্লাহ ভালো জানেন।

 সূত্র:



[1] তিরমিযি: (২৯৫৫), ইব্‌ন হিব্বান: (৬১৬০), আলবানি রহ. হাদিসটি সহি বলেছেন, দেখুন: ‘সাহিহাহ’: (১৬৩০)

[2] সূরা আরাফ: (৫৪)

[3] সূরা কাসাস: (৬৮)

[4] সূরা রূম: (২২)

[5] আদওয়াউল বায়ান: (৬/১৭৩)

[6] সূরা আলে-ইমরান: (৭)

আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ