আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেওয়ার বিধান

বর্ণনা

আয়েশা রাদিয়াল্লাহ ‘আনহাকে আল্লাহ তা‘আলা সাত আসমানের উপর থেকে পবিত্রা ঘোষণা করেছেন। তারপরও শিয়া গোষ্ঠী তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করে। যারা তাঁকে অপবাদ দেয়, ইসলামী শরী‘আতে তাদের বিধান কী এ ফতোয়াতে তা আলোচনা করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেওয়ার বিধান

    حكم من قذف عائشة رضي الله عنها

    < بنغالي >

    শাইখ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ

    الشيخ صالح المنجد

    —™

    অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: ذاكر الله أبو الخير

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেওয়ার বিধান

    প্রশ্ন: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেওয়ার বিধান কী?

    উত্তর:আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা এবং অন্যান্য উম্মুহাতুল মুমিনীন সবাই রাসূলের সাহাবীগণের অন্তর্ভুক্ত। ফলে যেসব হাদীসে সাহাবীদের গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে, তাতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা ও রাসূলের অন্যান্য স্ত্রীরাও অন্তর্ভুক্ত। যেমন, আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «لا تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلا نصيفه».

    “তোমরা আমার সাহাবীদের গালি দিও না, যদি তোমাদের কেউ অহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করে তবে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক পরিমাণ দান করার সাওয়াবের সমান হবে না”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৭৯)

    অতঃপর সমস্ত আলেমগণ এ বিষয়ে একমত, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করবে, সে কাফির।

    কারণ, আল্লাহ তা‌‍‌‍‌‌‍‍‘আলা নিজেই সূরা নূরের মধ্যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন।

    ইমাম ইবন হাযম রহ.হিশাম ইবন আম্মারের সনদে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মালেক ইবন আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহুমাকে গালি দেয়, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। আর যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দেয়, তাকে হত্যা করা হবে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কেন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি দিলে হত্যা করা হবে? তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সম্পর্কে বলেন,

    ﴿يَعِظُكُمُ ٱللَّهُ أَن تَعُودُواْ لِمِثۡلِهِۦٓ أَبَدًا إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ ١٧﴾ [النور : ١٧]

    “আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, যদি তোমরা মুমিন হও, তাহলে আর কখনো এর পুনরাবৃত্তি করবে না”[সূরা আন-নুর, আয়াত নং ১৭]

    ইমাম মালেক রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেয়, সে কুরআনের বিরোধিতা করল। আর যে কুরআনের বিরোধিতা করে তার শাস্তি হত্যা।

    আল্লামা ইবনে হাযম রহ. বলেন, ইমাম মালেক রহ.-এর কথাই এখানে বিশুদ্ধ। কারণ, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেওয়া মানে আল্লাহ তা‘আলাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করা। যা ইসলাম থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। আবু বকর ইবনুল আরাবী রহ. বলেন, কতক লোক নির্দোষ ও নিরপরাধ নারী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেয়। আল্লাহ তা‘আলা তার নির্দোষ ও পবিত্র হওয়ার কথা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাকে পবিত্র বলে ঘোষণা দেওয়ার পরও যারা তাকে অপরাধিনী বলে সে আল্লাহকেই মিথ্যুক বলল। আর যে আল্লাহকে অস্বীকার করল সে অবশ্যই কাফির। জ্ঞানীদের জন্য এটিই হলো মুক্তির উপায় ও আলোর দিশারী।

    কাজী আবু ইয়া‘লা রহ. বলেন, আল্লাহ তা‌‌‌‘আলা যা থেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেছে সে বিষয়ে যে ব্যক্তি তাকে দোষী বলে, সে অবশ্যই কাফির। এতে কোনো মতবিরোধ নাই। এ বিষয়ে একাধিক ইমাম উম্মতের ইজমা নকল করেছেন এবং অসংখ্য ইমামগণ এ বিধানটি সু-স্পষ্ট করেছেন।

    ইমাম ইবন আবু মুসা রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেয়, সে দীন থেকে বহিষ্কার হয়ে গেল। তার বিবাহ ইসলামী বিধান অনুযায়ী সম্ভব নয়।

    আল্লামা ইবন কুদামাহ রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী যারা মুমিনদের মাতা এবং সর্বপ্রকার খারাবী থেকে তারা পবিত্র তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাই হলো ইসলামের বিধান। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা। তারপর আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা, যার পবিত্রতা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন। তিনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে রাসূলের স্ত্রী। যে তাকে অপবাদ দেয় সে নিঃসন্দেহে কাফির।

    ইমাম নববী রহ. বলেন, অপবাদ থেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পবিত্র হওয়া অকাট্য প্রমাণ কুরআনের আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত। যদি কোনো মানুষ এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে, সকল মুসলিমের ঐকমত্যে সে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাবে।

    আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেয়, তার কাফির হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত উম্মত একমত।

    হাফেয ইবন কাসীর রহ. স্বীয় তাফসীরে লিখেন, সকল আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কুরআন আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পরও যে ব্যক্তি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে গালি বা অপবাদ দেয়, সে কাফির। কারণ, সে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণকারী। বদরুদ্দিন আয-যারকশী রহ. বলেন, কুরআন তার পবিত্র হওয়াকে স্পষ্ট করার পর যে তাকে অপবাদ দেয় সে অবশ্যই কাফির।

    যে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে অপবাদ দেয় তার বিধান সম্পর্কে আলেমগণ অনেক দলীল উপস্থাপন করেছেন।

    যেমন-

    ১- সূরা আন-নূরের আয়াত। যাতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার নির্দোষ ও পবিত্র হওয়াকে স্পষ্ট করা হয়। তারপরও যারা তাকে অপবাদ দেয়, মূলত সে আল্লাহকেই অস্বীকার করল। আর আল্লাহকে অস্বীকার করা নিঃসন্দেহে কুফর।

    ২-রাসূলের পরিবার সম্পর্কে অপবাদ দেওয়া রাসূলুল্লাহকেই কষ্ট দেওয়া। আর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সকলের ঐকমত্যে কুফর। তার স্ত্রীকে অপবাদ দেওয়াতে তাকে যে কষ্ট দেওয়া হয়, তার প্রমাণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস।

    আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

    «فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ يَوْمِهِ فَاسْتَعْذَرَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أُبَيٍّ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ مَنْ يَعْذِرُنِي مِنْ رَجُلٍ قَدْ بَلَغَنِي عَنْهُ أَذَاهُ فِي أَهْلِي وَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ عَلَى أَهْلِي إِلا خَيْرًا …»

    “অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই-এর ব্যাপারে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, হে মুসলিমগণ! তোমাদের কে আছ যে আমাকে ঐ লোকটি থেকে রেহাই দিবে যার থেকে আমার পরিবারের বিষয়ে আমার কষ্ট পৌছেছে? আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি আমার পরিবার সম্পর্কে ভালোই জানি”

    হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কে আছে যে আমার সাথে ইনসাফ করবে, আমার ওযরকে কবুল করবে। আমার পরিবার বিষয়ে যে কষ্ট আমার লাগছে। এতে প্রমাণিত হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতো বেশি কষ্ট পেয়েছেন, যার ফলে তিনি মানুষের কাছে ইনসাফ কামনা করেছেন।

    ইমাম কুরতুবী রহ. আল্লাহর এ বাণীর তাফসীরে বলেন, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার ও তার ইজ্জত বিষয়ে তাকে অবশ্যই কষ্ট দেওয়া হয়। আর এটি অবশ্যই কুফর। যে এ ধরনের গর্হিত কর্ম করবে সে অবশ্যই কাফির হবে।

    ৩- আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা সম্পর্কে অপবাদ রাসূল সম্পর্কেই অপবাদ। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, الخبيثات للخبيثين হাফেয ইবন কাসীর রহ. বলেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা পাক-পবিত্র না হলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী হিসেবে নির্ধারণ করতেন না। কারণ, আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত মানবজাতি থেকে অধিক পবিত্র। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা যদি অপবিত্র হতেন তাহলে তিনি শরী‘আতগত ও প্রাকৃতিক কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত হতেন না।

    অবশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো ‘আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা। যেমন, ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত বর্ণিত, তিনি বলেন,

    بَعَثَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى جَيْشِ ذَاتِ السَّلَاسِلِ قَالَ فَأَتَيْتُهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ عَائِشَةُ قَالَ قُلْتُ فَمِنْ الرِّجَالِ قَالَ أَبُوهَا إِذًا قَالَ قُلْتُ ثُمَّ مَنْ قَالَ عُمَرُ قَالَ فَعَدَّ رِجَالًا

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যাতুস সালাসিল সৈন্য দলের ওপর নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। আমি তার নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা)। তারপর আমি বললাম, পুরুষদের থেকে? তিনি বললেন, তার পিতা। তারপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম তারপর কে? বললেন, উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। এভাবে তিনি আরও কতক সাহাবীর নাম নিলেন”

    যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় মানুষটির প্রতি বিদ্বেষ ও দুশমনী প্রদর্শন করবে, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি দুশমনী ও বিদ্বেষ প্রদর্শন করবেন এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহই ভালো জানেন।

    দেখুন, শেখ নাসের-এর ‘সাহাবীদের বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা’। পৃ: ৮৭১/২; আরও দেখুন, মুহাম্মদ আল-উহাইবীর ‘সাহাবীদের বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশ্বাস’ পৃ: ৫৮।

    বিষয়ভিত্তিক ক্যাটাগরি:

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ