অন্তর-বিধ্বংসী বিষয়সমূহ: ঝগড়া-বিবাদ

[ بنغالي – Bengali – বাংলা ]

শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

—™

অনুবাদ: জাকের উল্লাহ্ আবুল খায়ের

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 ভূমিকা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف المرسلين، نبينا محمد، وعلى آله وأصحابه أجمعين.

ঝগড়া-বিবাদ এমন একটি কঠিন ব্যাধি ও মহা মুসিবত, যা মানুষের অন্তরকে করে কঠিন আর জীবনকে করে ক্ষতি ও হুমকির সম্মুখীন।

উলামায়ে কিরামগণ এর ক্ষতির দিক বিবেচনার বিষয়টি সম্পর্কে উম্মতদের খুব সতর্ক করেন এবং এ নিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি করেন। এটি এমন একটি দুশ্চরিত্র যাকে সলফে সালেহীনরা খুব ঘৃণা করত এবং এ থেকে অনেক দূরে থাকত। আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, একজন কুরআন ওয়ালা বা জ্ঞানীর জন্য যে ঝগড়া করে তার সাথে ঝগড়া করা অনুরূপভাবে কোনো মূর্খের সাথে তর্ক করা কোনো ক্রমেই উচিৎ নয়। তার জন্য উচিৎ হলো, ঝগড়া- বিবাদ পরিহার করা। ইবরাহীমে নখয়ী রহ. বলেন, সালফে সালেহীন ঝগড়া-বিবাদকে অধিক ঘৃণা করত।

তবে এ বিষয়ে প্রথমে আমাদের কয়েকটি বিষয় জানা অপরিহার্য।

এক. ঝগড়া-বিবাদ বলতে আমরা কী বুঝি?

দুই. আলিম উলামারা কেন ঝগড়া-বিবাদকে অধিক ঘৃণা করেন?

তিন. প্রসংশনীয় বিবাদ আর নিন্দনীয় বিবাদ কোনটি? উভয়টির উদাহরণ কী?

চার. ঝগড়া বিবাদ করা কি মানুষের স্বভাবের সাথে জড়িত নাকি তা তার উপার্জন।

এছাড়াও বিষয়টির সাথে আরো বিভিন্ন প্রশ্ন জড়িত। আশা করি এ কিতাবের মাধ্যমে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাব। আমরা চেষ্টা করব সম্মানিত পাঠকদের এ সব প্রশ্নের উত্তর দিতে।

আমরা আল্লাহ তা‘আলার দরবারে তাওফীক কামনা করি তিনি যেন আমাদের ভালো ও কল্যাণকর কাজগুলো করার তাওফীক দেন আর আমাদের ভুলগুলো শুধরিয়ে সঠিক ও কামিয়াবীর পথে পরিচালনা করেন। নিশ্চয় তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশীল ও সক্ষম।

মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জেদ

 ঝগড়া বিবাদ বলতে আমরা কী বুঝি?

এ বিষয়ে আরবীতে দু’টি শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এক হলো, জিদাল আর দ্বিতীয় হলো, মিরা।

জিদাল: এর অর্থ হলো, ঝগড়া করা ও কথা কাটাকাটি করা। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করা নিজের কথা সত্য প্রমাণ করা জন্য। এটি হলো, প্রতিপক্ষের সাথে ঝগড়া করা।

মুজাদালাহ: এর অর্থ হলো, বিতর্ক করা তবে সত্য বা সঠিককে প্রকাশ করার জন্য নয়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য।

আল্লামা যাজ্জাজ রহ. বলেন, জিদাল “উচ্চ পর্যায়ের ঝগড়া ও বিতর্ক।

আল্লামা কুরতবী বলেন, কোনো কথাকে শক্তিশালী দলীল দ্বারা প্রতিহত করা।

আর মিরা’ শব্দের অর্থ: কেউ কেউ বলেন, জিদাল। যেমন, আল্লামা তাবারী দু’টির অর্থ এক বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, মিরা’ অর্থ হলো, অপরের কথার মধ্যে অপব্যাখ্যা করা। প্রতিপক্ষকে হেয় করা ছাড়া কোনো সৎ উদ্দেশ্য থাকে না।

কেউ কেউ বলেন, মিরা’ হলো, বাতিলকে সাব্যস্ত করার জন্য আর জিদাল কখনো বাতিলকে সাব্যস্ত করা ও না করা উভয়ের জন্য হয়ে থাকেন।

জিদাল ও মিরা’ উভয়ের মধ্যে প্রার্থক্য:

অনেকে বলেন, উভয় শব্দের অর্থ এক। তবে মিরা’ হলো নিন্দনীয় বিতর্ক। কারণ, এটি হলো, হক প্রকাশ পাওয়ার পরও তা নিয়ে অনর্থক বিতর্ক করা। তবে জিদাল এ রকম নয়।

 কুরআন নিয়ে জিদাল করার অর্থ

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«المِرَاءُ فِي القُرْآنِ كُفْرٌ»

“কুরআন নিয়ে ঝগড়া কুফুরী।[1]

কুরআন নিয়ে বিবাদ করাকে কুফুরী বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু কুরআন বিষয়ে বিবাদ করার অর্থ কি?

কুরআন বিষয়ে বিবাদের অর্থ: কুরআন বিষয়ে বিবাদের অর্থ হলো, কুরআনের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা। আর কুরআনের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা নিঃসন্দেহে কুফর। যদি কোনো ব্যক্তি সন্দেহ করে যে কুরআন কি আল্লাহর বাণী অথবা কেউ বলে যে, ইহা আল্লাহর মাখলুক সে অবশ্যই কাফির। অনুরূপভাবে যদি যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে যা নাযিল করেছেন, তার কোনো বিধান বা কিছু অংশকে অস্বীকার করার অনুসন্ধানে থাকে, সেও নিঃসন্দেহে কাফির। সুতরাং বলা বাহুল্য যে, এখানে মুজাদালা বা মুমারাত অর্থ সন্দেহ সংশয়।

কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বা তাফসীর বিষয়ে বিতর্ক করাকে জিদাল বলা হয় না। যেমন কোনো ব্যক্তি বলল, কুরআনের এ আয়াতের অর্থ এটি? নাকি এটি? তারপর একাধিক অর্থ হতে কোনো একটিকে প্রাধান্য দিল। এ ধরনের বিতর্ককে জিদাল বলা হবে না, বরং এ হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণীর মর্মার্থ জানার জন্য পর্যালোচনা করা।

মোটকথা, কুরআন বিষয়ে বিবাদ করাকে কুফুর বলে আখ্যায়িত করা তখন হবে, যখন কুরআনকে সন্দেহ, সংশয় ও অস্বীকার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

জুনদুব ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 «اقْرَؤُواالقُرْآنَ مَا ائْتَلَفَتْ قُلُوبُكُمْ، فَإذَِا اخْتَلَفْتُمْ فَقُومُوا عَنْهُ»

“যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের মনোযোগ থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর। আর যখন তোমাদের অন্তর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তোমরা কুরআন পড়া ছেড়ে দাও।[2]

এ কথাটির কয়েকটি অর্থ হতে পারে:

Ø যখন তোমরা কুরআনের অর্থ বোঝার মধ্যে মতবিরোধ কর, তখন তোমরা কুরআন নিয়ে আলোচনা ছেড়ে দাও। কারণ, হতে পারে তোমাদের ইখতেলাফ তোমাদেরকে কোনো খারাপ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।

Ø অথবা হতে পারে এখানে যে নিষেধ করা হয়েছে, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের সাথে খাস।

Ø অথবা এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলার বাণী যে অর্থ বোঝায় বা তোমাদের যে অর্থের দিক নিয়ে যায়, তার ওপর তুমি মনোযোগী হও এবং তাই তুমি গ্রহণ করতে থাক। আর যখন তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিবে বা সন্দেহের অবকাশ সৃষ্টি হবে, যা তোমাকে বিবাদের দিকে ঠেলে দেয়, তখন তুমি তা থেকে বিরত থাক। আয়াতের প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অর্থই গ্রহণ কর এবং অস্পষ্টতা যা বিবাদের কারণ হয় তা ছেড়ে দাও। বাতিল পন্থীরা কুরআনের অস্পষ্ট বিষয়গুলো নিয়েই টানাটানি করে এবং ফিতনা সৃষ্টি করার জন্য তাতেই তারা বিবাদ করে।

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এমন কতক লোকের আগমন ঘটবে যারা কুরআনের সংশয়যুক্ত আয়াত নিয়ে তোমাদের সাথে বিবাদ করবে। তোমরা সুন্নাতের মাধ্যমে তাদের প্রতিহত কর। কারণ, যারা সুন্নাত বিষয়ে অভিজ্ঞ তারা আল্লাহর কিতাব বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখে।[3] এ ছাড়া সুন্নাত আল্লাহর বাণীর মর্মার্থকে তুলে ধরে এবং কুরআনের ব্যাখ্যা করে।

 ঝগড়া-বিবাদ মানুষের স্বভাবের সাথে আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত

ঝগড়া-বিবাদ করা মানুষের স্বভাবের সাথে জড়িত। প্রাকৃতিক ভাবে একজন মানুষ অধিক ঝগড়াটে স্বভাবের হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ صَرَّفۡنَا فِي هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لِلنَّاسِ مِن كُلِّ مَثَلٖۚ وَكَانَ ٱلۡإِنسَٰنُ أَكۡثَرَ شَيۡءٖ جَدَلٗا﴾ [الكهف:54]

“আর আমরা এই কুরআনে মানুষের জন্য সকল প্রকার উপমা বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি তর্ককারী।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫৪]

অর্থাৎ সবচেয়ে অধিক ঝগড়াকারী ও প্রতিবাদী, সে সত্যের পতি নমনীয় হয় না এবং কোনো উপদেশ-কারীর উপদেশে সে কর্ণপাত করে না।[4]

আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ও তার মেয়ে ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে তাদের উভয়ের দরজায় পাড়ি দিয়ে উভয়কে জিজ্ঞাসা করে বলেন, তোমরা উভয়ে কি সালাত আদায় করনি? আমরা তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জীবনতো আল্লাহর হাতে, তিনি ইচ্ছা করলে আমাদের জাগাতে পারতেন। আমরা এ কথা বলার সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে ফিরে যান। আমাকে কোনো প্রতি উত্তর করেন নি। তারপর আমি শুনতে পারলাম তিনি যাওয়ার সময় তার রানে আঘাত করে বলছে [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৪৫] অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দ্রুত উত্তর দেওয়া ও ব্যাপারটি নিয়ে কোনো প্রকার নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করাতে অবাক হন। এ কারণেই তিনি স্বীয় উরুর উপর আঘাত করেন।

তবে এখানে একটি কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, তা হলো মানুষ হিসেবে সবার মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করার গুণ প্রাকৃতিক হলেও কোনো কোনো মানুষ এমন আছে, যার মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করার গুণ অন্যদের তুলনায় অধিক বেশি এবং সে ঝগড়া করতে অন্যদের তুলনায় অধিক পারদর্শী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফিরদের নিকট রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার পর কাফিরদের বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِنَّمَا يَسَّرۡنَٰهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ ٱلۡمُتَّقِينَ وَتُنذِرَ بِهِۦ قَوۡمٗا لُّدّٗا﴾ [مريم:97]

“আর আমরা তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দিতে পার এবং কলহপ্রিয় কওমকে তদ্বারা সতর্ক করতে পার।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৭]

এখানে লুদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, অনর্থক ও অন্যায়ভাবে ঝগড়া-কারী যে সত্যকে গ্রহণ করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা আহলে বাতিল সম্পর্কে আরো বলেন,

 ﴿وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُون﴾ [الزخرف:58]

“আর তারা বলে, ‘আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ নাকি ঈসা’? তারা কেবল কূটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।” [সূরা আয-যুখরফ, আয়াত: ৫৮] অর্থাৎ ঝগড়ায় তারা পারদর্শী।

কোন কোনো মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা ঝগড়া-বিবাদ করার জন্য অধিক যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করে থাকেন, তার প্রমাণ হলো, কা‘আব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এর হাদীস। কা‘আব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যখন তাবুকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা হতে বিরত থাকেন, তখন তিনি তার নিজের বিষয়ে বর্ণনা দিয়ে বলেন,

«لم أتخلف عن رسول الله في غزوة غزاها إلا في غزوة تبوك، ... قال كعب بن مالك: فلما بلغني أنه توجه قافلا حضرني همي، وطفقت أتذكر الكذب وأقول: بماذا أخرج من سخطه غدا، واستعنت على ذلك بكل ذي رأي من أهلي فلما قيل: إن رسول الله قد أظل قادما زاح عني الباطل، وعرفت أني لن أخرج منه أبدا بشيء فيه كذب، فأجمعت صدقه ... فجئته، فلما سلمت عليه تبسم تبسُّم المغضب، ثم قال تَعالَ فجئت أمشي حتى جلست بين يديه فقال لي « مَا خَلَّفَكَ؟» فقلت: إني والله يا رسول الله لو جلست عند غيرك من أهل الدنيا لرأيت أن سأخرج من سخطه بعذر، ولقد أعطيت جدلا ... الحديث

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত যুদ্ধ করেছে, একমাত্র তাবুকের যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা হতে আমি বিরত থাকিনি। তারপর যখন আমার নিকট খবর পৌঁছল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাফেলা নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করেছেন, তখন সব চিন্তা এসে আমাকে গ্রাস করে ফেলল, তখন আমি মিথ্যার অনুসন্ধান করতে লাগলাম। আগামী দিন আমি কি অপারগতা দেখিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আক্রোশ থেকে রেহাই পাব! আমি আমার পরিবারের বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোকদের কাছ থেকে মতামত নিতে থাকি।... তারপর যখন আমাকে জানানো হলো, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেরৎ আসছে তখন আমার থেকে যাবতীয় সব ধরনের অনৈতিক ও বাতিল চিন্তা দূর হয়ে গেল। আর আমি প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বাচার জন্য এমন কোনো কথা বলবো না যার মধ্যে মিথ্যার অবকাশ থাকে। আমি সব সত্য কথাগুলো আমার অন্তরে গেঁথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে উপস্থিত হই। আমি যখন তাকে সালাম দিলাম, তখন সে একটি মুচকি হাসি দিল; একজন ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত ব্যক্তির মুচকি হাসির মত। তারপর সে আমাকে বলে আস! আমি পায়ে হেটে তার দিকে অগ্রসর হয়ে তার সামনে বসে পড়লাম। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করে বলেন, কোনো জিনিস তোমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ হতে বিরত রাখল? তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ রাসূল! আল্লাহর শপথ করে বলছি! যদি আমি আপনি ছাড়া দুনিয়াদার কোনো লোকের সামনে বসতাম, তাহলে আমি কোনো একটি অপারগতা বা কারণ দেখিয়ে তার আক্রোশ ও ক্ষোভ হতে মুক্তি পেতাম। আমাকে এ ধরনের ঝগড়া ও বিবাদ করার যোগ্যতা দেওয়া হয়েছে...।[5]

এখানে হাদীসে কা‘আব ইবন মালেকের أعطيت جدلا কথাটিই হলো আমাদের প্রামাণ্য উক্তি। এখানে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, আমাকে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে কথা বলার এমন এক যোগ্যতা, শক্তি ও পাণ্ডিত্য দেওয়া হয়েছে, যার দ্বারা আমি আমার প্রতি যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে, তা হতে অতি সহজেই বের হয়ে আসতে পারতাম। আমি আমাকে আঠা থেকে চুল যেভাবে বের করে আনে, সেভাবে বের করে আনতে পারতাম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তার স্বীয় ঘরের দরজায় ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ঘর থেকে বের হলেন। তারপর তিনি তাদের বললেন,

«إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنَّهُ يَأْتِينِي الخَصْمُ، فَلَعَلَّ بَعْضَكُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ؛ فَأَحْسَبُ أَنَّهُ صَدَقَ، فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنَّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنَ الناَّرِ، فَلْيأَخُذْهَا أَوْ فَلْيتْرُكْهَا»

“অবশ্যই আমি একজন মানুষ। আর আমার নিকট অনেক বিচার ফায়সালা এসে থাকে। আমি দেখতে পাই অনেক এমন আছে যারা বিতর্কে তার প্রতিপক্ষের চেয়ে অধিক পারদর্শী। তখন তার কথার পেক্ষাপটে আমার কাছে মনে হয় সে সত্যবাদী। ফলে আমি তার পক্ষে ফায়সালা করে থাকি। তবে আমি যদি কোনো মুসলিম ভাইয়ের হককে কারো জন্য ফায়সালা করে দিই, মনে রাখবে, তা হলো আগুনের একটি খণ্ড! চাই সে তা গ্রহণ করুক অথবা ছেড়ে যাক”[6]

মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করার এ গুণটি কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হবে এমনকি কিয়ামত কায়েম হওয়ার পরেও মানুষের মধ্যে ঝগড়া করার গুণটি অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَوۡمَ تَأۡتِي كُلُّ نَفۡسٖ تُجَٰدِلُ عَن نَّفۡسِهَا وَتُوَفَّىٰ كُلُّ نَفۡسٖ مَّا عَمِلَتۡ وَهُمۡ لَا يُظۡلَمُونَ﴾[النحل:111]

(স্মরণ কর সে দিনের কথা) যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পক্ষে যুক্তি-তর্ক নিয়ে উপস্থিত হবে এবং প্রত্যেককে ব্যক্তি সে যা আমল করেছে তা পরি পূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি জুলম করা হবে না”[সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ১১১]

অর্থাৎ দুনিয়াতে সে যা করেছে, সে বিষয়ে সে ঝগড়া-বিবাদ করবে এবং প্রমাণ পেশ করবে। আর আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চেষ্টা করবে।

আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

 «كنا عند رسول الله فضحك فقال: هَلْ تَدْرُونَ مِمَّ أضَحَكُ ؟ قال: قلنا: الله ورسوله أعلم. قال: مِنْ مخُاَطَبةَِ العَبدِْ رَبَّهُ، يَقُولُ: يَا رَبِّ، ألَمَ تجُرْنِي مِنَ الظلمِ؟ قَالَ: يَقُولُ: بَلَى. قَالَ: فَيقُولُ: فَإنِّي لَا أُجِيزُ عَلَى نَفْسِي إلِّا شَاهِداً مِنيِّ قَالَ: فَيَقُولُ:كَفَى بنفسِكَ اليَوْمَ عَلَيْكَ شَهِيداً، وَبالكرامِ الكَاتبِيِنَ شُهُوداً.قَالَ: فَيُخْتَمُ عَلَى فيِهِ، فَيُقَالُ لِأرْكَانهِ: انْطقِي قَالَ: فَتَنْطقُ بأَعْمَالهِ. قَالَ: ثُمَّ يُخَلَّى بَيْنَهُ وَبَيْنَ الكَلَامِ، قَالَ: فَيَقُولُ: بُعْداً لَكُنَّ وَسُحْقاً، فَعَنْكُنَّ كُنْتُ أُنَاضِل»

“একদিন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি হাসি দিলেন। তারপর তিনি আমাদের বললেন, তোমরা কি জান আমি কি কারণে হাসলাম? আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা বললাম আল্লাহ ও তার রাসূ্লই ভালো জানেন। বান্দা তার রবকে সম্বোধন করে যে কথা বলবে, তার কথা স্মরণ করে আমি হাসছি! সে বলবে, হে আমার রব তুমি আমাকে জুলুম থেকে মুক্তি দেবে না। তখন আল্লাহ বলবে অবশ্যই! তখন বান্দা বলবে আমি আমার পক্ষে মাত্র একজন সাক্ষী উপস্থিত করবো আল্লাহ বলবে আজকের দিন তোমার জন্য কিরামান কাতেবীনের অসংখ্য সাক্ষীর বিপরীতে একজন সাক্ষীই যথেষ্ট। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তার মুখের মধ্যে তালা দিয়ে দিবে এবং তার অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, তোমরা কথা বল! তখন প্রতিটি অঙ্গ তার কর্ম সম্পর্কে বলবে। তারপর তাকে তার কথা মাঝে ছেড়ে দেওয়া হবে। তখন সে তাদের বলবে তোমাদের জন্য ধ্বংস! আমি তোমাদের জন্যই বিতর্ক ও বিবাদ করছি![7] আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন কাফিরদের ঝগড়ার বিবরণ দিয়ে বলেন,

﴿وَيَوۡمَ نَحۡشُرُهُمۡ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشۡرَكُوٓاْ أَيۡنَ شُرَكَآؤُكُمُ ٱلَّذِينَ كُنتُمۡ تَزۡعُمُونَ ٢٢ ثُمَّ لَمۡ تَكُن فِتۡنَتُهُمۡ إِلَّآ أَن قَالُواْ وَٱللَّهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشۡرِكِينَ ٢٣ ٱنظُرۡ كَيۡفَ كَذَبُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡۚ وَضَلَّ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَفۡتَرُونَ ٢٤ ﴾[الأنعام:22-23]

“আর যেদিন আমরা তাদের সকলকে সমবেত করব তারপর যারা শিরক করেছে তাদেরকে বলব, ‘তোমাদের শরীকরা কোথায়, যাদেরকে তোমরা (শরীক) মনে করতে?’ অতঃপর তাদের পরীক্ষার জবাব শুধু এ হবে যে, তারপর তারা বলবে, ‘আমাদের রব আল্লাহর কসম! আমরা মুশরিক ছিলাম না’। দেখ, তারা কীভাবে মিথ্যা বলেছে নিজদের ওপর, তারা যে মিথ্যা রটনা করত, তা তাদের থেকে হারিয়ে গেল।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ২২-২৪]

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يجَيِءُ نُوحٌ وَأُمَّتهُ، فَيقولُ الله تَعَالَى: هَلْ بَلَّغْتَ؟ فَيقولُ: نَعمْ، أَيْ رَبِّ . فَيقُولُ لِأمتهِ: هَلْ بَلَّغَكُمْ؟ فَيقُولوُنَ: لَا، مَا جَاءَنَا مِنْ نَبيِ. فَيقَولُ لنوح: منْ يَشْهَدُ لكَ؟ فَيقولُ: مُحَمَّدٌ وَأُمَّتُهُ. فَنَشْهَدُ أَنَّهُ قَدْ بَلَّغَ، وَهُوَ قَوْلُهُ جَلَّ ذِكْرُهُ ﴿وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيۡكُمۡ شَهِيدٗاۗ﴾ »

“নূহ ‘আলাইহিস সালাম ও তার উম্মতরা আল্লাহর দরবারে আসবে তখন আল্লাহ তা‘আলা নুহকে জিজ্ঞাসা করবে তুমি তাদের দাওয়াত দিয়েছ? বলবে হা, হে আমার রব! তারপর উম্মতদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমাদের নিকট কি দাওয়াত দিয়েছে? তার বলবে না হে আমাদের প্রভু! আমাদের নিকট কোনো নবী আসেনি। তখন আল্লাহ তা‘আলা নূহ ‘আলাইহিস সালামকে বলবে হে নূহ, তোমার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে? তখন সে বলবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উম্মতেরা। তারপর আমরা সাক্ষী দেব যে, সে তার উম্মতদের পৌঁছিয়েছে। আর তা হলো, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَٰكُمۡ أُمَّةٗ وَسَطٗا لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيۡكُمۡ شَهِيدٗاۗ﴾[البقرة:143]

“ আর এভাবেই আমরা তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের ওপর”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩]

 ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টির কারণসমূহ

আমরা যদি একটু নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, কি কারণে মানুষের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধ তৈরি হয়? তাহলে আমরা এর অনেকগুলো কারণ খুঁজে পাবো। সব কারণ উল্লেখ করা সম্ভব নয়। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আলোচনা করা হলো:

1. প্রকাশ্যে উপদেশ দেওয়া।

2. অসময়ে উপদেশ দেওয়া।

3. অনুপযোগী স্থানে উপদেশ দেওয়া। যার ফলে অন্যরা তাকে ঘৃণা করে ও লজ্জা দেয়।

4. আবার কখনো ঝগড়া বিবাদের কারণ হয়, অন্যের নিকট যা আছে তা লাভের জন্য পদক্ষেপ নেয়া বা তার প্রতি লোভ করা।

5. অন্যের ওপর যে কোনো উপায়ে প্রাধান্য বিস্তার বা বিজয়ী হওয়ার জন্য অধিক চেষ্টা করা। আর তা চাই অনৈতিক পদ্ধতিতে হোক বা সঠিক পদ্ধতিতে। মোট কথা যে কোনোভাবে তাকে প্রাধান্য বিস্তার করতেই হবে।

6. আর কখনো সময় পরিবেশ ও পরিপার্শ্বিকতা মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদকে উসকিয়ে দেয়। বিশেষ করে যুব সমাজকে পরিবেশ ও সমাজ ব্যবস্থা ঝগড়া-বিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই উচিৎ হলো, তাদের এ ব্যাপারে অধিক সতর্ক করা। আবার কখনো কখনো দেখা যায়, দীনদার ও দা‘ঈদের মধ্যেও ঝগড়া-বিবাদ পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের মধ্যে ফিরকা-বন্দি ও দলাদলিকে উসকিয়ে দেয়। আবার কখনো দেখা যায় স্কুল মাদ্রাসার শিক্ষকদের মধ্যেও ঝগড়া-বিবাদ দেখা দেয়। অনেক সময় তারা ছাত্রদের সাথে বিবাদ ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাবে ছাত্রদের মধ্যেও এ ঘৃণিত গুণটি সয়লাব করে এবং তারা ঝগড়াটে স্বভাবের হয়ে যায়। আবার কখনো এমন হয় যে, মাতা-পিতা ঝগড়াটে হলে, তার প্রভাবে ছেলে সন্তানও ঝগড়াটে হয়। এ জন্য অভিভাবকদের উচিৎ তারা যেন এ ঘৃণিত অভ্যাসটি পরিহার করে এবং তা থেকে বেচে থাকে।

7. অহংকার, ধোঁকাবাজি ও অহমিকা ইত্যাদি ঝগড়ার কারণ হয়।

8. আল্লাহর ভয় না থাকাও ঝগড়া-বিবাদের অন্যতম কারণ।

9. অবসর থাকা। কোনো কাজকর্ম না থাকলে মানুষ ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। একজন অবসর সৈনিক তাকে দাঙ্গা হাঙ্গামায় লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। তুমি যদি চিন্তা কর, তাহলে দেখতে পাবে কেবল অবসর লোক, যাদের কোনো কাজ নাই তারাই বেশিরভাগ ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত থাকে। আর এটাই ঝগড়া বিবাদের অন্যতম কারণ।

 প্রশংসনীয় বিতর্কের শর্তাবলী

আমরা যখন কোনো বিষয়ে বিতর্ক করতে যাব, তখন আমাদের বিতর্কে যাওয়ার পূর্বে কি কি শর্তাবলী মেনে চলা উচিৎ, তা অবশ্যই জানা থাকতে হবে।

প্রশংসনীয় বিতর্কের শর্তাবলী নিম্নরূপ:

এক. বিতর্ক হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। বিতর্ক দ্বারা বরকত লাভ ও ফায়েদা হাসিলের জন্য এখলাস হলো পূর্বশর্ত। কারণ, তর্কের উদ্দেশ্য হলো, সত্য উদঘাটন করা এবং হককে জানা। এ কারণে এ বিষয়ে বিতর্কে যাওয়ার পূর্বে আল্লাহর ভয় অন্তরে বিদ্যমান থাকতে হবে এবং সদিচ্ছা ও সুন্দর নিয়ত থাকতে হবে। তাহলেই বিতর্ক দ্বারা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছা যাবে।

দুই. বিতর্ক হতে হবে উত্তম পদ্ধতিতে।

তিন. বিতর্ক করতে হবে ইলমের দ্বারা। অর্থাৎ যে বিষয়ে বিতর্ক করবে, সে বিষয়ে অবশ্যই তার জ্ঞান থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هَٰٓأَنتُمۡ هَٰٓؤُلَآءِ حَٰجَجۡتُمۡ فِيمَا لَكُم بِهِۦ عِلۡمٞ فَلِمَ تُحَآجُّونَ فِيمَا لَيۡسَ لَكُم بِهِۦ عِلۡمٞۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾[آل عمران:66]

“সাবধান! তোমরা তো সেসব লোক, বিতর্ক করলে এমন বিষয়ে, যার জ্ঞান তোমাদের রয়েছে। তবে কেন তোমরা বিতর্ক করছ সে বিষয়ে যার জ্ঞান তোমাদের নেই? আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৬]

চার. আল্লাহ তা‘আলার নামের মাধ্যমে বিতর্ক শুরু করবে। সুতরাং, উভয় পক্ষ আল্লাহর নাম ও বিছমিল্লাহ দ্বারা বিতর্ক শুরু করবে। যদি মুখে উচ্চারণ করতে না পারে, তবে তাকে অবশ্যেই অন্তরে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে হবে।

পাঁচ. মজলিশের আদব ও প্রতিপক্ষের সম্মান রক্ষা করতে হবে এবং তার সামনে সুন্দর ও বিনম্র-ভাবে বসবে।

ছয়. প্রবৃত্তির পূজা করা হতে বের হতে হবে। তর্কের মাঝে যদি কোনো মানুষ বুঝতে পারে, সে ভুলের ওপর আছে এবং তার প্রতিপক্ষ হকের ওপর, তখন তার উচিৎ হলো, সে তার ভুল থেকে ফিরে আসবে এবং প্রতি পক্ষের কথা মেনে তার নিকট আত্মসমর্পণ করবে। যে ব্যক্তি সালফে সালেহীনদের জীবনী পাঠ করবে, তার জন্য ভুল থেকে ফিরে আসা অনেকটা সহজ হবে।

মুহাম্মদ ইবন কা‘ব থেকে বর্ণিত, এক লোক আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি তার মতামত দেন। কিন্তু লোকটি তাকে বলল, বিষয়টি এমন নয় বরং বিষয়টি এ রকম। তখন আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলল, তুমি সঠিক বলছ আর আমি ভুল করছি। আল্লাহ বলেন,

﴿وَفَوۡقَ كُلِّ ذِي عِلۡمٍ عَلِيمٞ﴾[يوسف:76]

“এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর রয়েছে একজন জ্ঞানী। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৭৬]

তাউস রহ. বর্ণনা করেন, যায়েদ ইবন সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উভয় তাওয়াফে বিদা করার আগে কোনো মহিলার মাসিক আরম্ভ হলে তার বিধান কি হবে, এ নিয়ে মতবিরোধ করেন। মহিলাটি কি তাওয়াফে বিদা না করে বিদায় নিবে, নাকি সে তাওয়াফ করবে? ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, সে বিদায় নিবে, আর যায়েদ ইবন সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন সে বিদায় নিবে না। তারপর যায়েদ ইবন সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সে বিদায় নিবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার উত্তর শুনে যায়েদ ইবন সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মুচকি হেসে বের হন এবং আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলেন, কথা সেটাই যা তুমি বলছ।

ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, এটাই হলো ইনসাফ! যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হলেন ইবন আব্বাসের শিক্ষক। তারপরও তিনি তার ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি। আমরা কেন তাদের অনুকরণ করব না। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন।

আমরা জানি ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন বিতর্কে অত্যন্ত পারদর্শী ও বুদ্ধিমান বিতর্ককারীদের একজন। যারা সত্য ও হককে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিতর্ক করত তিনি ছিলেম তাদের অন্যতম ও বিখ্যাত। কিন্তু তিনি তার ছেলেকে বিতর্ক করতে নিষেধ করেন। তখন তার ছেলে তাকে বলে আপনাকে আমি বিতর্ক করতে দেখছি, অথচ আপনি আমাদের না করছেন!

উত্তরে তিনি বলেন, আমরা যখন কথা বলতাম, তখন আমাদের প্রতিপক্ষের সম্মানহানি হওয়ার ভয়তে এমন করে বসতাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। আর বর্তমানে তোমরা বিতর্ক কর, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও সম্মানহানি করার জন্যই।

ইমাম শাফে‘ঈ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কল্যাণ কামনা করা ছাড়া কখনোই কারো সাথে বিতর্ক করি নি। আর কারো সাথে এ জন্য বিতর্ক করিনি যে সে ভুল করুক।[8] অর্থাৎ আমরা এ কামনা করে কখনোই বিতর্ক করিনি যে, আমার প্রতিপক্ষ হেরে যাক। কারণ, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে উদঘাটন করা সেটা চাই আমার পক্ষ থেকে হোক বা তার পক্ষ থেকে হোক।

বর্ণিত আছে একবার ইমাম শাফে‘ঈ রহ. একটি বিষয় যার মধ্যে দুইটি মতামত বিদ্যমান, তা নিয়ে কোনো এক আহলে ইলমের সাথে বিতর্ক করেন। তারপর ইমাম শাফে‘ঈ রহ. তার প্রতিপক্ষের মতকে গ্রহণ করেন আর প্রতিপক্ষ ইমাম শাফে‘ঈর মতকে গ্রহণ করে। এভাবেই তাদের বিতর্কের সমাপ্তি হয়।

সাত. ধৈর্য ও সহনশীলতা থাকতে হবে। কারণ, ধৈর্য ও সহনশীলতা ছাড়া বিতর্ক তিক্ততা ও খারাপ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।

আট. বিতর্কের সময় ধীরস্থিরিতা থাকতে হবে। শুধু তাড়াহুড়া করলে চলবে না। কারণ, শুধু আমি আমার কথা বলতে থাকলাম আমার প্রতিপক্ষকে কথা বলার সুযোগ দিলাম না তাহলে শুধু কথা বলাই হবে। প্রতিপক্ষের নিকট কি আছে তা শোনা বা জানা হবে না।

নয়. সত্য কথা বলার ওপর অটল অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تَقۡفُ مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٌۚ إِنَّ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡبَصَرَ وَٱلۡفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٦﴾ [الإسراء: ٣٦]

“আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।” [সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬]

দশ. প্রতিপক্ষের সাথে বিনম্র আচরণ করতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, আমরা যখন কোনো বিষয়ে তর্ক করি আমাদের উদ্দেশ্য হলো, ফলাফল বের ও সত্য উদঘাটন করা। আমাদের উদ্দেশ্য সময় নষ্ট করা বা প্রতিপক্ষের ওপর বিজয় লাভ করা নয়।

সুতরাং প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করা, মানুষের সামনে তাকে নির্বাক ও হেয় প্রতিপন্ন করা, তাকে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া বা তার সাথে এমন কথা বলা, যা তার অন্তরে আঘাত আনে ও ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার শামিল হয় এবং মানুষের সামনে তাকে ঠাট্টা বিদ্রূপ ও হাসির পাত্র বানিয়ে ফেলে, তা কোনো ক্রমেই উচিৎ নয়।

এগার. প্রতিপক্ষ ফিরে আসার জন্য পথকে উম্মূক্ত রাখবে। সে যদি হেরে যায় তাহলে তাকে হেয় করবে না। তার সাথে কোনো প্রকার দুর্ব্যবহার করবে না। তার কথা ভালোভাবে শুনবে। কারণ, তার কথা ভালোভাবে শুনা দ্বারা তুমি অর্ধেক ফলাফলে পৌঁছে যাবে।

বার. ইনসাফ করা। যদি তোমার প্রতিপক্ষ কোনো সত্য কথা বলে, তা স্বীকার করে নেয়া এবং তার মান-মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।

আবু মুহাম্মদ ইবন হাযাম বলেন, একবার আমি আমার এক সাথীর সাথে মুনাযারা করি। তার মুখের মধ্যে তোতলামি থাকাতে আমি তার ওপর বিজয় লাভ করি। আমাকে মজলিশে বিজয়ী ঘোষণা করে মজলিশ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমি যখন মজলিশ শেষ করে ঘরে ফিরি, তখন আমার অন্তরে সন্দেহ হলে আমি কিতাবের শরণাপন্ন হই এবং কিতাবে একটি বিশুদ্ধ প্রমাণ দেখতে পাই যা আমার প্রতিপক্ষের কথাকে বিশুদ্ধ আর আমার কথাকে বাতিল বলে প্রমাণ করে। আমার সাথে একজন সাথী ছিল যে আমাদের তর্কের মজলিসে উপস্থিত ছিল। আমি তাকে কিতাবের বিষয়টি অবহিত করলে সে বলে তুমি এখন কি করতে চাও? আমি বললাম কিতাবটি নিয়ে তার কাছে গিয়ে পেশ করবো এবং তাকে বলব তুমি হক আর আমি বাতিল। আর তার কথা কবুল করে নেব। সে বলল, তুমি তোমাকে হেয় করবে? আমি বললাম হা! আমি যদি এ মুহূর্তে তা করতে পারতাম তাহলে আগামীর জন্য অপেক্ষা করতাম না। তবে আমি এখনই আমার মতকে প্রত্যাখ্যান করে তার মতের দিকে ফিরে আসলাম।

তের. মার্জিত ও সম্মান সূচক বাক্য ব্যবহার করে কথা বলবে। চিৎকার করবে না ও অমার্জিত কথা বলবে না। কোনো এক ব্যক্তি মজলিশে চিৎকার করলে পরিচালনাকারী বলেন, হে আব্দুস সামাদ সত্য তো সঠিক কথার মধ্যে কঠিন আওয়াজে নয়। সুতরাং চিৎকার দ্বারা কোনো ফায়সালা হয় না।

চৌদ্দ. ঝগড়া পরিহার করা। অনেক লোক আলিমদের ইলম থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাদের সাথে বিবাদ করার কারণে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কোনো এক ছাত্র বলছিল, আমি যদি ইবন আব্বাসের সাথে বন্ধুত্ব করতাম, তাহলে তার থেকে আরো অনেক ইলম শিখতে পারতাম।[9] ইবন জুরাইয রহ. বলেন, আমি যত কিছু আতা থেকে শিখেছি তা তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দ্বারাই শিখছি।[10]

পনের. বিতর্কের জন্য শর্ত হলো, তা আলিমদের সম্মুখে হবে যাহেলদের সম্মুখে নয়।

ষোল. মতামতের পার্থক্য বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারবে না। ইমাম আহমদ রহ. একবার আলী ইবনুল মাদিনীর সাথে বিতর্ক করতে গিয়ে মজলিশে তারা একে অপরের সাথে উচ্চ বাচ্য করেন। কিন্তু আলী ইবনুল মাদীনি যখন মজলিশ থেকে উঠে চলে যেতে লাগল, তখন ইমাম আহমদ উঠে তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তাকে বিদায় দেন।

সতের. যে সব কথা মানুষের চিন্তা চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী ঐ ধরনের কথা হতে বিরত থাকা উচিৎ।

আঠার. সব ধরনের হিলা ও ষড়যন্ত্র পরিহার করবে। আর একজন বিচারক নির্ধারণ করবে যে উভয় পক্ষের কথা নোট করবে, যাতে কেউ কোনো কথা বলে অস্বীকার করতে না পারে।

উনিশ. কতক লোক আছে তাদের সাথে বিতর্ক সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। যেমন, মূর্খ যে তার মূর্খতাকে স্বীকার করে না, সীমালঙ্ঘন কারী, আহাম্মক এবং যে মিথ্যা সাক্ষী দেয়।

 বিতর্কের প্রকারভেদ

বিতর্ক দুই প্রকার:

এক- প্রশংসনীয় বিতর্ক।

দুই- নিন্দনীয় বা মন্দ বিতর্ক।

বিতর্ক দ্বারা কখনো কথোপকথন, প্রমাণ উত্থাপন ও মতামত প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এ ধরণের বিতর্ক প্রশংসনীয়। আর বিতর্ক মানে যখন তিক্ততা, বাক বিতণ্ডা ও ঝগড়া-বিবাদ হয়, তা হলো, নিন্দনীয় বা মন্দ বিতর্ক। আল্লাহ তা‘আলা উত্তম ও প্রশংসনীয় বিতর্কের জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

﴿ٱدۡعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلۡحِكۡمَةِ وَٱلۡمَوۡعِظَةِ ٱلۡحَسَنَةِۖ وَجَٰدِلۡهُم بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِۦ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ﴾ [النحل:125]

“তুমি তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াত প্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন। [সূরা নাহাল: ১২৫]

সুতরাং তোমাদের বিতর্ক যেন হয় উত্তম পদ্ধতিতে, নম্র, ভদ্র ও সুন্দর বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে। আর আমাদের বিতর্ক যেন খারাপ ভাষায় না হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تُجَٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡۖ وَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱلَّذِيٓ أُنزِلَ إِلَيۡنَا وَأُنزِلَ إِلَيۡكُمۡ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمۡ وَٰحِدٞ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَ﴾ [العنكبوت:46]

“আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া, যারা জুলুম করেছে। আর তোমরা বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই। আর আমরা তাঁরই সমীপে আত্মসমর্পণকারী”[সূরা আল-‘আনকাবুত, আয়াত: ৪৬] আর উত্তম দ্বারা বিতর্ক করার অর্থ:

১. কুরআন দ্বারা বিতর্ক করা।

২. কেউ কেউ বলে, লা ইলাহা... দ্বারা বিতর্ক করা।

৩. আবার কেউ কেউ বলে, তাদের সাথে বিতর্ক করা কোনো প্রকার কঠোরতা ও তিক্ততা ছাড়া আর তাদের জন্য তুমি তোমার পার্শ্বকে বিছিয়ে দাও।

আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী-

﴿وَلَا تُجَٰدِلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡهُمۡۖ ﴾

এর অর্থ হলো, কিন্তু যারা তোমাদের জন্য সত্যকে স্বীকার করতে অস্বীকার করে এ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না। তবে যারা কর দিতে অস্বীকার করে এবং তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকে, তাদের সাথে মৌখিক বিতর্ক নয়। কারণ, তাদের সাথে বিতর্ক হলো, তলোয়ার বা যুদ্ধ। তাদের সাথে এ অবস্থায় মৌখিক বিতর্ক করা সম্ভব নয়।

নিন্দনীয় বা মন্দ বিতর্ক:

যে বিতর্ক দ্বারা বাতিলকে বিজয়ী করা হয় এবং সঠিক ও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা হয়, তাকে নিন্দনীয় বা মন্দ বিতর্ক বলা হয় ।

আল্লামা যাহবী রহ. বলেন, বিতর্ক যদি সত্য উদঘাটন ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে তা হবে প্রশংসনীয়। আর যদি তা সত্যকে প্রতিহত করা অথবা না জেনে করা হয়, তা হবে নিন্দনীয়।[11]

প্রশংসনীয় বিতর্ক:

যে বিতর্ক খালেস নিয়ত ও কোনো কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তা হলো, প্রশংসনীয়। আর এ ধরনের বিতর্ক আল্লাহর দ্বীনের জন্য করা একজন মুসলিমের ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লামা ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, যে ব্যক্তি নাস্তিক মুরতাদ ও বেদাতিদের সাথে এমন বিতর্ক না করে, যে বিতর্ক তাদের মুলোৎপাটন ও জড় কেটে দেয়, তাহলে সে ইসলামের হক আদায় করেনি এবং সে ঈমান ও ইলমের চাহিদা পূরণ করেনি। তার কথা দ্বারা তার অন্তরের তৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করেনি। আর তার কথা তার ঈমান ও ইলমের কোনো উপকারে আসেনি।[12]

একটি কথা মনে রাখতে হবে, হকের পক্ষে বিতর্ক করা মহান ইবাদত। যখন নূহ আ. এর কওমের লোকেরা নূহ আ. কে বলল,

﴿قَالُواْ يَٰنُوحُ قَدۡ جَٰدَلۡتَنَا فَأَكۡثَرۡتَ جِدَٰلَنَا فَأۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَآ إِن كُنتَ مِنَ ٱلصَّٰدِقِينَ ﴾[هود:32]

“তারা বলল, ‘হে নূহ, তুমি আমাদের সাথে বাদানুবাদ করছ এবং আমাদের সাথে অতিমাত্রায় বিবাদ করেছ। অতএব যার প্রতিশ্রুতি তুমি আমাদেরকে দিচ্ছ, তা আমাদের কাছে নিয়ে আস, যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও”[সূরা হূদ, আয়াত: ৩২]

এখানে একটি কথা প্রমাণিত হয়, নূহ ‘আলাইহিস সালাম তার কাওমের লোকদের সাথে হককে জানানো ও মানানোর জন্য বিতর্ক করেন। এ কারণেই তিনি তাদের কথার জবাব দেন এবং বলেন,

﴿قَالَ إِنَّمَا يَأۡتِيكُم بِهِ ٱللَّهُ إِن شَآءَ وَمَآ أَنتُم بِمُعۡجِزِينَ ٣٣ وَلَا يَنفَعُكُمۡ نُصۡحِيٓ إِنۡ أَرَدتُّ أَنۡ أَنصَحَ لَكُمۡ إِن كَانَ ٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يُغۡوِيَكُمۡۚ هُوَ رَبُّكُمۡ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ﴾ [هود:33-34]

“সে বলল, ‘আল্লাহই তো তোমাদের কাছে তা হাজির করবেন, যদি তিনি চান। আর তোমরা তাকে অক্ষম করতে পারবে না’। ‘আর আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের কোনো উপকারে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান। তিনি তোমাদের রব এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে”[সূরা হুদ, আয়াত: ৩৩-৩৪]

কুরআন কারীম নবীদের বিতর্কের কাহিনীর আয়াত দ্বারা ভরপুর। যেমন, মূসা ‘আলাইহিস সালামের ফিরআউনের সাথে বিতর্ক, নূহ ‘আলাইহিস সালামের তার কাওমের লোকদের সাথে, ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম নমরূদের সাথে ও তার পিতার সাথে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুরাইশদের সাথে এবং সাহাবীদের মুশরিকদের সাথে বিতর্ক করেন। এ সব বিতর্ক হলো, হক পন্থীদের সাথে বাতিল পন্থীদের বিতর্ক, যাতে তারা হককে কবুল করে এবং বাতিল থেকে ফিরে আসে। আর এগুলো হলো, প্রশংসনীয় বিতর্ক।

অনুরূপভাবে কুরআনে যে মহিলাটির ঘটনা উল্লেখ করা হয়, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে ফাতওয়া চান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قَدۡ سَمِعَ ٱللَّهُ قَوۡلَ ٱلَّتِي تُجَٰدِلُكَ فِي زَوۡجِهَا وَتَشۡتَكِيٓ إِلَى ٱللَّهِ وَٱللَّهُ يَسۡمَعُ تَحَاوُرَكُمَآۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعُۢ بَصِيرٌ ﴾ [المجادلة:01]

আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তেমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০১]

মহিলাটি তার স্বামীর সাথে তার পরিণতি ও তার সাথে তার করণীয় সম্পর্কে জানতে চান। তার স্বামী তার জন্য হালাল নাকি হারাম? এ হলো, প্রশংসনীয় বিতর্ক।

মন্দ বা খারাপ বিতর্ক:

এমন বিতর্ক যা পরিষ্কার বাতিল অথবা বাতিলের দিকে নিয়ে যায়। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَا نُرۡسِلُ ٱلۡمُرۡسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَۚ وَيُجَٰدِلُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِٱلۡبَٰطِلِ لِيُدۡحِضُواْ بِهِ ٱلۡحَقَّۖ وَٱتَّخَذُوٓاْ ءَايَٰتِي وَمَآ أُنذِرُواْ هُزُوٗا ﴾[الكهف:56]

“আর আমরা তো রাসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপেই পাঠিয়েছি এবং যারা কুফুরী করেছে তারা বাতিল দ্বারা তর্ক করে, যাতে তার মাধ্যমে সত্যকে মিটিয়ে দিতে পারে। আর তারা আমার আয়াতসমূহকে এবং যা দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তাকে উপহাস হিসেবে গ্রহণ করে।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫৬]

অর্থাৎ যাতে তারা হককে প্রতিহত করতে পারে এবং মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পারে। আর নিন্দনীয় বিতর্ক হলো, কাফিরদের স্বভাব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

﴿وَمَا نُرۡسِلُ ٱلۡمُرۡسَلِينَ إِلَّا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَۚ وَيُجَٰدِلُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِٱلۡبَٰطِلِ لِيُدۡحِضُواْ بِهِ ٱلۡحَقَّۖ وَٱتَّخَذُوٓاْ ءَايَٰتِي وَمَآ أُنذِرُواْ هُزُوٗا ﴾[الكهف:56]

“আর আমরা তো রাসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপেই পাঠিয়েছি এবং যারা কুফুরী করেছে তারা বাতিল দ্বারা তর্ক করে, যাতে তার মাধ্যমে সত্যকে মিটিয়ে দিতে পারে। আর তারা আমার আয়াতসমূহকে এবং যা দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তাকে উপহাস হিসেবে গ্রহণ করে”[সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৫৬]

এ মহান আয়াত দ্বারা এ কথা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কাফিররা সর্বদা হককে প্রতিহত ও দূরীভূত করতে ঈমানাদরদের সাথে বিতর্ক করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿كَذَّبَتۡ قَبۡلَهُمۡ قَوۡمُ نُوحٖ وَٱلۡأَحۡزَابُ مِنۢ بَعۡدِهِمۡۖ وَهَمَّتۡ كُلُّ أُمَّةِۢ بِرَسُولِهِمۡ لِيَأۡخُذُوهُۖ وَجَٰدَلُواْ بِٱلۡبَٰطِلِ لِيُدۡحِضُواْ بِهِ ٱلۡحَقَّ فَأَخَذۡتُهُمۡۖ فَكَيۡفَ كَانَ عِقَابِ﴾[غافر:05]

“এদের পূর্বে নূহের কাওম এবং তাদের পরে অনেক দলও অস্বীকার করেছিল। প্রত্যেক উম্মতই স্ব স্ব রাসূলকে পাকড়াও করার সংকল্প করেছিল এবং সত্যকে বিদূরিত করার উদ্দেশ্যে তারা অসার বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। ফলে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। সুতরাং কেমন ছিল আমার আযাব!” [সূরা গাফির, আয়াত: ০৫]

অর্থাৎ তারা ঝগড়া বিবাদ ও বিতর্ক করে যাতে হককে মিটিয়ে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ يُحَآجُّونَ فِي ٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ مَا ٱسۡتُجِيبَ لَهُۥ حُجَّتُهُمۡ دَاحِضَةٌ عِندَ رَبِّهِمۡ وَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ وَلَهُمۡ عَذَابٞ شَدِيدٌ﴾ [الشورى:16]

“আর আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার পর আল্লাহ সম্পর্কে যারা বিতর্ক করে, তাদের দলীল-প্রমাণ তাদের রবের নিকট অসার। তাদের ওপর (আল্লাহর) গযব এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি”[সূরা সুরা: ১৬]

যারা আল্লাহ তা‘আলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে, তাদের সাথে আল্লাহর ব্যাপারে যারা বিতর্ক করে ও ঝগড়া-বিবাদ করে এ আয়াত তাদের জন্য হুমকি ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা যারা মুমিনদের আল্লাহর রাস্তা হতে বিরত রাখতে চায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَا يُجَٰدِلُ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَلَا يَغۡرُرۡكَ تَقَلُّبُهُمۡ فِي ٱلۡبِلَٰدِ﴾[غافر:04]

“কাফিররাই কেবল আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ০৪]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُم مَّن يَسۡتَمِعُ إِلَيۡكَۖ وَجَعَلۡنَا عَلَىٰ قُلُوبِهِمۡ أَكِنَّةً أَن يَفۡقَهُوهُ وَفِيٓ ءَاذَانِهِمۡ وَقۡرٗاۚ وَإِن يَرَوۡاْ كُلَّ ءَايَةٖ لَّا يُؤۡمِنُواْ بِهَاۖ حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءُوكَ يُجَٰدِلُونَكَ يَقُولُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ إِنۡ هَٰذَآ إِلَّآ أَسَٰطِيرُ ٱلۡأَوَّلِينَ ﴾[الأنعام:25]

“আর তাদের কেউ তোমার প্রতি কান পেতে শোনে, কিন্তু আমি তাদের অন্তরের ওপর রেখে দিয়েছি আবরণ যেন তারা অনুধাবন না করে, আর তাদের কানে রেখেছি ছিপি। আর যদি তারা প্রতিটি আয়াতও দেখে, তারা তার প্রতি ঈমান আনবে না; এমনকি যখন তারা তোমার কাছে এসে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়, যারা কুফুরী করেছে তারা বলে, ‘এটা পূর্ববর্তীদের কল্পকাহিনী ছাড়া কিছুই নয়।’ [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ২৫]

অর্থাৎ তুমি পূর্বেকার লোকদের থেকে গ্রহণ করছ এবং তাদের কিতাবসমূহ ও তাদের মুখ থেকে শুনে শুনে শিখছ। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ﴾[الزخرف:57]

“আর তারা বলে, আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ নাকি ঈসা? তারা কেবল কুটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়”[সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৫৭]

বাতিলের ওপর তারা ঝগড়া করে এবং তারা ছিল অধিক ঝগড়াটে।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«جاء عبد الله بن الزبعرى إلى النبي فقال: تزعم أن الله أنزل عليك هذه الآية ﴿إِنَّكُمۡ وَمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمۡ لَهَا وَٰرِدُونَ ٩٨ لَوۡ كَانَ هَٰٓؤُلَآءِ ءَالِهَةٗ مَّا وَرَدُوهَاۖ وَكُلّٞ فِيهَا خَٰلِدُونَ﴾ ]الأنبياء: ٩٨ [فقال ابن الزبعرى: قد عبدت الشمس والقمر والملائكة وعزير وعيسى بن مريم، كل هؤلاء في النار مع آلهتنا؟ فنزلت ﴿وَلَمَّا ضُرِبَ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ مَثَلًا إِذَا قَوۡمُكَ مِنۡهُ يَصِدُّونَ ٥٧ وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ ٥٨﴾ [الزخرف: ٥٧] ثم نزلت ﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ سَبَقَتۡ لَهُم مِّنَّا ٱلۡحُسۡنَىٰٓ أُوْلَٰٓئِكَ عَنۡهَا مُبۡعَدُونَ﴾ [الأنبياء: ١٠١]»

“ইবন যুবারী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করে তুমি কি ধারণা কর যে, আল্লাহ তা‘আলা তোমার ওপর এ আয়াত-

﴿إِنَّكُمۡ وَمَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمۡ لَهَا وَٰرِدُونَ ٩٨ لَوۡ كَانَ هَٰٓؤُلَآءِ ءَالِهَةٗ مَّا وَرَدُوهَاۖ وَكُلّٞ فِيهَا خَٰلِدُونَ﴾[الأنبياء: ٩٨ [

“নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা কর, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানী। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে”[সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮]

নাযিল করেন, ইবন যুবারী বলেন, আমরা সূর্য, চন্দ্র, ফিরিশতা উযাইর ও ঈসা ইবন মারইয়ামের ইবাদত করি। তাহলে তাদের সবাই কি আমাদের ইলাহগুলোর সাথে জাহান্নামে যাবে? তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন-

﴿وَلَمَّا ضُرِبَ ٱبۡنُ مَرۡيَمَ مَثَلًا إِذَا قَوۡمُكَ مِنۡهُ يَصِدُّونَ ٥٧ وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ ٥٨﴾ [الزخرف: ٥٧]

“আর তারা বলে, আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ নাকি ঈসা? তারা কেবল কুটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়”[সূরা যুখরুফ: ৫৭]

তারপর আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ سَبَقَتۡ لَهُم مِّنَّا ٱلۡحُسۡنَىٰٓ أُوْلَٰٓئِكَ عَنۡهَا مُبۡعَدُونَ﴾[ الأنبياء: ١٠١]

“নিশ্চয় আমার পক্ষ থেকে যাদের জন্য পূর্বেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০১]

উযাইর ‘আলাইহিস সালাম ও ঈসা ইবন মারইয়াম জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত থাকবে আর অন্যান্য বাতিল ইলাহগুলো জাহান্নামে যাবে। এমনকি চন্দ্র, সূর্য ও মূর্তিগুলোকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যাতে তাদের যারা পূজা করত তাদের কষ্ট দেওয়া হয় ও তাদের শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়। তাদের বলা হবে, এ সব ইলাহগুলোর তোমরা ইবাদত করতে। এখন তারা তোমাদের জাহান্নামের কারণ হলো। তাদের কারণে তোমরা জাহান্নামের খড়ি। সুতরাং তোমরা জাহান্নামের আযাবের স্বাদ গ্রহণ করতে থাক।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুশরিকদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের একাধিক বিতর্ক হয়েছে। কাফিররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের সাথে অন্যায়ভাবে ঝগড়া-বিবাদ করত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تَأۡكُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُۥ لَفِسۡقٞۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآئِهِمۡ لِيُجَٰدِلُوكُمۡۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ﴾ [الأنعام:121]

“আর তোমরা তা থেকে আহার করো না, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি এবং নিশ্চয় তা সীমালঙ্ঘন এবং শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তবে নিশ্চয় তোমরা মুশরিক”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২১]

শরী‘আতের বিধান যা হক ও সত্য তা প্রতিহত করার জন্য শয়তান কাফিরদের যুক্তি দেয়, ফলে তারা মুসলিমদের বলে, তোমরা তোমাদের নিজ হাতে যা জবেহ কর, তা তোমরা বক্ষণ কর, অথচ যে গুলোকে আল্লাহ তা‘আলা নিজে হত্যা করে তা তোমরা খাও না?! দেখুন! জাহিলদের যুক্তি কতইনা অবান্তর! আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুসলিমদের সম্বোধন করে বলেন,

﴿وَلَا تَأۡكُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُۥ لَفِسۡقٞۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآئِهِمۡ لِيُجَٰدِلُوكُمۡۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ﴾[الأنعام:121]

“আর তোমরা তা থেকে আহার করো না, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি এবং নিশ্চয় তা সীমালঙ্ঘন এবং শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তবে নিশ্চয় তোমরা মুশরিক”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২১]

সবই আল্লাহ তা‘আলার ফায়সালা হয়ে থাকে। আল্লাহর ফায়সালা ছাড়া কোনো কিছুই হয়নি। যাকে মানুষ জবেহ করে তা যেমন আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী হয়ে থাকে অনুরূপভাবে যে জন্তুটি নিজে নিজে মারা যায় তাও আল্লাহর ফায়সালায় হয়ে থাকে। তবে যে জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে মানুষ জবেহ করে তার বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা হালালের ফায়সালা দেন, আর যে জন্তুটি নিজে নিজে মারা যায় তাকে আল্লাহ তা‘আলা হারামের ফায়সালা দেন।

তাদের এ বিতর্ক সম্পর্কে আরো দেখুন হাদীসের মাধ্যমে।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«أتى أناس النبي صلى الله عليه وسلم فقالوا: يا رسول الله، أنأكل ما نقتل، ولا نأكل ما يقتل الله؟

“কিছু লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরাবারে এসে জিজ্ঞাসা করে বলে হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যা হত্যা করি তা আমরা খাব আল্লাহ তা‘আলা যা হত্যা করে আমরা তা খাব না? তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত ﴿فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِ‍َٔايَٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ থেকে নিয়ে وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ পর্যন্ত নাযিল করেন।”[13]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজে গিয়ে যা দেখেন, তা নিয়ে মুশরিকরা বিতর্ক করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিতর্কের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

﴿مَا كَذَبَ ٱلۡفُؤَادُ مَا رَأَىٰٓ ١١ أَفَتُمَٰرُونَهُۥ عَلَىٰ مَا يَرَىٰ﴾ [النجم : 11-12]

“সে যা দেখেছে, অন্তঃকরণ সে সম্পর্কে মিথ্যা বলে নি। সে যা দেখেছে, সে সম্পর্কে তোমরা কি তার সাথে বিতর্ক করবে?” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১১-১২]

অর্থাৎ হে মুশরিকগণ আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব নিদর্শন দেখিয়েছেন তা তোমরা অস্বীকার করছ! এবং সন্দেহ পোষণ করছ! আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِن جَٰدَلُوكَ فَقُلِ ٱللَّهُ أَعۡلَمُ بِمَا تَعۡمَلُونَ ٦٨ ٱللَّهُ يَحۡكُمُ بَيۡنَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ فِيمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ﴾ [النجم:68-69]

“আর তারা যদি তোমার সাথে বাকবিতণ্ডা করে, তাহলে বল, ‘তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।’ তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন ফয়সালা করে দেবেন।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৬৮-৬৯] কাফিররা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে অনর্থক বিতর্ক তখন আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর এ আয়াত নাযিল করে তাদের প্রতিহত করেন। তিনি বলেন, তোমারা যা কর আল্লাহ তা‘আলা সে সম্পর্কে জানেন। অর্থাৎ তোমরা যে কুফুরী ও হৎকারিতা করছ, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা অবগত আছেন। তাই তিনি তাদের তোমাদের থেকে বিরত থাকতে ও তোমাদের সাথে বিতর্ক করতে না করেন। কারণ হঠকারী লোকদের সাথে বিতর্ক করে কোনো ফায়দা নেই।

মুশরিকরা কুরআন বিষয়ে অনর্থক বিতর্ক করে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَا يُجَٰدِلُ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَلَا يَغۡرُرۡكَ تَقَلُّبُهُمۡ فِي ٱلۡبِلَٰدِ ﴾[غافر:04]

“কাফিররাই কেবল আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে তাদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে”[সূরা গাফির, আয়াত: ০৪]

আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا تُجَادلِوُا فِي القُرْآنِ؛ فَإنّ جِدَالا فيِهِ كُفْرٌ»

“তোমরা কুরআন বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করো না। কারণ, কুরআন বিষয়ে বিবাদ করা কুফুরী”

দুর্বল-ঈমান সম্পন্ন লোকদের বিতর্ক:

অনুরূপভাবে দুর্বল ঈমানদারদের পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর্কের সম্মুখীন হন।

 আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كَمَآ أَخۡرَجَكَ رَبُّكَ مِنۢ بَيۡتِكَ بِٱلۡحَقِّ وَإِنَّ فَرِيقٗا مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ لَكَٰرِهُونَ ٥ يُجَٰدِلُونَكَ فِي ٱلۡحَقِّ بَعۡدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُونَ إِلَى ٱلۡمَوۡتِ وَهُمۡ يَنظُرُونَ﴾ [الأنفال:5-6]

(এটা এমন) যেভাবে তোমার রব তোমাকে নিজ ঘর থেকে বের করেছেন যথাযথভাবে এবং নিশ্চয় মুমিনদের একটি দল তা অপছন্দ করছিল। তারা তোমার সাথে সত্য সম্পর্কে বিতর্ক করছে তা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৫-৬] অর্থাৎ তারা যখন বুঝতে পারল যুদ্ধ ও লড়াই নিশ্চিত। তখন তারা তা অপছন্দ করল এবং বলল, আপনি যুদ্ধের কথা কেন আমাদের আগে জানায় নি? যাতে আমরা যুদ্ধের জন্য তৈরি ও প্রস্তুত হতাম? আমরা তো বের হয়েছি বাণিজ্যিক কাফেলার জন্য আমরা সৈন্য দলের উদ্দেশ্যে বের হই নাই। এ ছিল তাদের বিবাদ।

কাফিররা নবীদের সাথে তাদের উপস্থিতিতেও বিবাদ ও বিতর্ক করত। যেমন, হূদ ‘আলাইহিস সালাম তার কাওমের লোকেরা তার সাথে বিতর্ক করে এবং মূর্তি বিষয়ে তার সাথে ঝগড়া করে। আল্লাহ তা‘আলা হুদ আ. এর জবানে বলেন,

﴿قَالَ قَدۡ وَقَعَ عَلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ رِجۡسٞ وَغَضَبٌۖ أَتُجَٰدِلُونَنِي فِيٓ أَسۡمَآءٖ سَمَّيۡتُمُوهَآ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُكُم مَّا نَزَّلَ ٱللَّهُ بِهَا مِن سُلۡطَٰنٖۚ فَٱنتَظِرُوٓاْ إِنِّي مَعَكُم مِّنَ ٱلۡمُنتَظِرِينَ﴾[الأعراف:71]

“সে বলল, নিশ্চয় তোমাদের ওপর তোমাদের রবের পক্ষ থেকে আযাব এ ক্রোধ পতিত হয়েছে। তোমরা কি এমন নামসমূহ সম্পর্কে আমাদের সাথে বিবাদ করছ, যার নাম করণ করছ তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা যার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি? সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর। আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৭১] অর্থাৎ কতক মূর্তি নিয়ে তোমরা বিতর্ক করছ, যেগুলোর নাম করন তোমরা ও তোমাদের পূর্ব পুরুষরাই করছে। তারা কোনো ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না।?!

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يُجَٰدِلُونَ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ سُلۡطَٰنٍ أَتَىٰهُمۡۖ كَبُرَ مَقۡتًا عِندَ ٱللَّهِ وَعِندَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْۚ كَذَٰلِكَ يَطۡبَعُ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ قَلۡبِ مُتَكَبِّرٖ جَبَّارٖ ﴾[غافر:35]

“যারা নিজদের কাছে আগত কোনো দলীল-প্রমাণ ছাড়া আল্লাহর নিদর্শনা-বলী সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয়। তাদের এ কাজ আল্লাহ ও মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণার্হ। এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী স্বৈরাচারীর অন্তরে সীল মেরে দেন।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৩৫] কে এ কথাটি বলছিল? আল্লাহ তা‘আলা কার কথার বর্ণনা দেন? এ কথাটি বলছিল, ফেরআউনের গোত্রের একজন ঈমানদার যখন সে মুসা ‘আলাইহিস সালামকে ছড়াতে উদ্ধত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

﴿ّإِنَ ٱلَّذِينَ يُجَٰدِلُونَ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ بِغَيۡرِ سُلۡطَٰنٍ أَتَىٰهُمۡ إِن فِي صُدُورِهِمۡ إِلَّا كِبۡرٞ مَّا هُم بِبَٰلِغِيهِۚ فَٱسۡتَعِذۡ بِٱللَّهِۖ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [غافر:56]

“নিশ্চয় যারা তাদের নিকট আসা কোনো দলীলÑ প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতর্ক করে, তাদের অন্তরসমূহে আছে কেবল অহংকার, তারা কিছুতেই সেখানে (সাফল্যের মনজিলে) পৌঁছবে না। কাজেই তুমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা গাফির, আয়াত: ৫৬]

অহংকার, দম্ভ ও ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান। দেখুন কীভাবে অহংকার মানুষকে অন্যায়ভাবে ঝগড়া-বিবাদের দিকে ধাবিত করে এবং সত্যকে প্রতিহত ও বাতিলকে প্রতিষ্ঠিত করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

﴿أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يُجَٰدِلُونَ فِيٓ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ أَنَّىٰ يُصۡرَفُونَ﴾[غافر:69]

“তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বাকবিতণ্ডা করে? তাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে? [সূরা গাফির, আয়াত: ৬৯]

নিন্দনীয় বিতর্কের প্রকার:

নিন্দনীয় বিতর্ক ও দুই প্রকার:

এক. জ্ঞানহীন ঝগড়া বিবাদ। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيۡطَٰنٖ مَّرِيدٖ﴾[الحج:3]

“মানুষের মধ্যে কতক আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করে না জেনে এবং সে অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩]

আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাবদের সম্বোধন করে বলেন,

﴿هَٰٓأَنتُمۡ هَٰٓؤُلَآءِ حَٰجَجۡتُمۡ فِيمَا لَكُم بِهِۦ عِلۡمٞ فَلِمَ تُحَآجُّونَ فِيمَا لَيۡسَ لَكُم بِهِۦ عِلۡمٞۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾[آل عمران:66]

“সাবধান! তোমরা তো সেসব লোক, বিতর্ক করলে এমন বিষয়ে, যার জ্ঞান তোমাদের রয়েছে। তবে কেন তোমরা বিতর্ক করছ সে বিষয়ে যার জ্ঞান তোমাদের নেই? আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৬]

আল্লাহ তা‘আয়ালার বিষয়ে বিতর্ক করা জ্ঞানহীন বিতর্কের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَيُسَبِّحُ ٱلرَّعۡدُ بِحَمۡدِهِۦ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ مِنۡ خِيفَتِهِۦ وَيُرۡسِلُ ٱلصَّوَٰعِقَ فَيُصِيبُ بِهَا مَن يَشَآءُ وَهُمۡ يُجَٰدِلُونَ فِي ٱللَّهِ وَهُوَ شَدِيدُ ٱلۡمِحَالِ﴾ [الرعد:13]

“আর বজ্র তার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করে এবং ফেরেশতারাও তার ভয়ে। আর তিনি গর্জনকারী বজ্র পাঠান। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তা দ্বারা আঘাত করেন এবং তারা আল্লাহর সম্বন্ধে ঝগড়া করতে থাকে। আর তিনি শক্তিতে প্রবল, শাস্তিতে কঠোর।” [সূরা আর-রা‘আদ, আয়াত: ১৩]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيۡطَٰنٖ مَّرِيدٖ ٣ كُتِبَ عَلَيۡهِ أَنَّهُۥ مَن تَوَلَّاهُ فَأَنَّهُۥ يُضِلُّهُۥ وَيَهۡدِيهِ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلسَّعِيرِ﴾[الحج:3-4]

“মানুষের মধ্যে কতক আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করে না জেনে এবং সে অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। তার সম্পর্কে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, যে তার সাথে বন্ধুত্ব করবে সে অবশ্যই তাকে পথভ্রষ্ট করবে এবং তাকে প্রজ্বলিত আগুনের শাস্তির দিকে পরিচালিত করবে”[সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩-৪] তাদের বিতর্ক; তারা আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা করে যে, আল্লাহ তা‘আলা মৃতকে জীবিত করতে পারে না। তাই একজন কাফির রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পুরনো একটি হাড় নিয়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বলত, তুমি কি মনে কর যে, তোমার রব এ চূর্ণ -বিচূর্ণ হাড় কে জীবিত করতে পারবে? এভাবেই তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তর্ক করত এবং আখিরাতের জীবনকে অস্বীকার করত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَلَا هُدٗى وَلَا كِتَٰبٖ مُّنِيرٖ ٨ ثَانِيَ عِطۡفِهِۦ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِۖ لَهُۥ فِي ٱلدُّنۡيَا خِزۡيٞۖ وَنُذِيقُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ عَذَابَ ٱلۡحَرِيقِ ﴾[الحج:8-9]

“আর মানুষের মধ্যে কতক আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে কোনো জ্ঞান ছাড়া, কোনো হিদায়েত ছাড়া এবং দীপ্তিমান কিতাব ছাড়া। সে বিতর্ক করে ঘাড় বাঁকিয়ে, মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে ভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে তার জন্য রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে দহন যন্ত্রণা আস্বাদন করাব।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৮-৯] অর্থাৎ অহংকারী এবং চায় মানুষকে আল্লাহর রাস্তা হতে বিরত রাখতে।

এ ছাড়াও তারা কিয়ামত বিষয়ে বিতর্ক করত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَسۡتَعۡجِلُ بِهَا ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِهَاۖ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مُشۡفِقُونَ مِنۡهَا وَيَعۡلَمُونَ أَنَّهَا ٱلۡحَقُّۗ أَلَآ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُمَارُونَ فِي ٱلسَّاعَةِ لَفِي ضَلَٰلِۢ بَعِيدٍ﴾ [الشورى: 18]

“যারা এতে ঈমান আনে না, তারাই তা ত্বরান্বিত করতে চায়। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা একে ভয় করে এবং তারা জানে যে, এটা অবশ্যই সত্য। জেনে রেখ, নিশ্চয় যারা কিয়ামত সম্পর্কে বাক-বিতণ্ডা করে তারা সুদূর পথভ্রষ্টটায় নিপতিত”[সূরা শূরা, আয়াত: ১৮] অথচ কিয়ামতের বিষয়টি ইলমে গাইবের অন্তর্ভুক্ত, যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।

 জ্ঞানহীন তর্কে অন্তর্ভুক্ত হলো, কদর সম্পর্কে বিতর্ক করা

আমর ইবন শুয়াইব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত, তিনি বলেন,

«خرج رسول الله على أصحابه وهم يختصمون في القدر،فكأنما يُفقأُ في وجهه حب الرمان من الغضب. فقال: بِهَذَا أُمِرْتُمْ؟ أَوْ لَهِذَا خُلِقْتُمْ؟ تَضرِبُونَ القُرْآنَ بَعْضَهُ بِبَعْضٍ؟! بِهَذَاهَلَكَتِ الأُمَمُ قَبْلَكُمْ قال: فقال عبد الله بن عمروما غبطت نفسي بمجلس تخلفت فيه عن رسول الله ما غبطت نفسي بذلك المجلس وتخلفي عنه»

“একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন তার সাহাবীরা কদর সম্পর্কে বিতর্ক করছে। এ দেখে রাগে এ ক্ষোভে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মলিন হয়ে গেল। তখন তিনি তাদের বললেন, তোমাদের এর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? অথবা তোমাদের এ জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? তোমরা কুরআনের এক অংশ দ্বারা অপর অংশকে আঘাত করছ! এ কারণেই তোমাদের পূর্বের উম্মতরা ধ্বংস হয়েছে। তারপর আব্দুল্লাহ ইবন আমর বলেন, আমি আর কোনো মজলিশে অনুপস্থিত থাকতে এত পছন্দ করিনি সেদিন ঐ মজলিশে অনুপস্থিত থাকাকে যতটুকু পছন্দ করি।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক ক্ষুব্ধ হন, কারণ ক্বদর হলো আল্লাহ তা‘আলার গোপনীয় বিষয় সমূহের একটি। যে ব্যক্তি না জেনে তাতে মশগুল হয়, তার পরিণতি হবে গোমরাহী। হয় সে ক্বদরী হবে অথবা জবরী হবে। এ কারণে তিনি তাতে লিপ্ত হতে নিষেধ করেন।

ক্বদর সম্পর্কে বিতর্ক ঈমানের নড়বড়টা ও সন্দেহ, সংশয়ের দিকে নিয়ে যায়। ক্বদর বিষয়ে ঈমানের মধ্যে ঘটায় ও সন্দেহ সংশয়কে উসকিয়ে দেয়, তাই এ বিষয়ে বিতর্ক করা নিন্দনীয় বিতর্ক। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا يَزَالُ أَمْرُ هَذِهِ الأمةِ مُوَائِماً أَوْ مُقَارِباً مَا لَمْ يَتَكَلَّمُوا فِي الوِلْدَانِ وِالقَدَرِ»

“এ উম্মতের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ততদিন পর্যন্ত ঠিক বা সত্যের কাছাকাছি থাকবে যতদিন পর্যন্ত তারা কদর ও মুশরিকদের সন্তানদের নিয়ে কোনো বিতর্ক করবে না।

নিন্দনীয় বিতর্কের দ্বিতীয় প্রকার:

নিন্দনীয় বিতর্কের দ্বিতীয় প্রকার হলো, বাতিলকে বিজয়ী করা ও হক স্পষ্ট হওয়ার পরও তা অস্বীকার করার বিতর্ক। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿كَذَّبَتۡ قَبۡلَهُمۡ قَوۡمُ نُوحٖ وَٱلۡأَحۡزَابُ مِنۢ بَعۡدِهِمۡۖ وَهَمَّتۡ كُلُّ أُمَّةِۢ بِرَسُولِهِمۡ لِيَأۡخُذُوهُۖ وَجَٰدَلُواْ بِٱلۡبَٰطِلِ لِيُدۡحِضُواْ بِهِ ٱلۡحَقَّ فَأَخَذۡتُهُمۡۖ فَكَيۡفَ كَانَ عِقَابِ﴾ [غافر: 5]

“এদের পূর্বে নূহের কাওম এবং তাদের পরে অনেক দলও অস্বীকার করেছিল। প্রত্যেক উম্মতই স্ব স্ব রাসূলকে পাকড়াও করার সংকল্প করেছিল এবং সত্যকে বিদূরিত করার উদ্দেশ্যে তারা অসার বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল। ফলে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। সুতরাং কেমন ছিল আমার আযাব!” [সূরা গাফির, আয়াত: ৫]

এ বিতর্কের পরিণতি খুবই খারাপ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এ থেকে রক্ষা করুন। আমীন!

প্রশংসনীয় বিতর্ক: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এর প্রতি আহ্বান করেন, বরং এটি একটি জিহাদ।

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«جَاهِدُوا المُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسُكمْ وَأَلْسِنتَكْم»

মৌখিক জিহাদ কীভাবে করবো?

উত্তম কথা দ্বারা বিতর্ক করার মাধ্যমে। আল্লামা ইবন হাযম বলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা যেমন ওয়াজিব অনুরূপভাবে মুনাযারা করাও ওয়াজিব। আল্লামা সুনআনি বলেন, জীবন দিয়ে জিহাদ হলো, কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সশরীরে অংশগ্রহণ করা। মাল দ্বারা জিহাদ হলো, জিহাদের খরচ ও অস্র ক্রয়ের জন্য ব্যয় করা। আর মৌখিক জিহাদ হলো, তাদের বিরুদ্ধে দলীল পেশ করা ও তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করা।

এ ধরনের মুনাযারা কখনো ওয়াজিব হয়, আবার কখনো মোস্তাহাব হয়।

আর নিন্দনীয় বিতর্ক সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। কারণ, তা হলো, হককে প্রত্যাখ্যান করা অথবা বাতিলকে বিজয়ী করা।

কখনো কখনো বিতর্ক প্রশংসনীয় হয়, ঠিক একই স্থানে তা আবার নিন্দনীয়ও হয়ে থাকে। যেমন হজ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡحَجُّ أَشۡهُرٞ مَّعۡلُومَٰتٞۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلۡحَجِّۗ وَمَا تَفۡعَلُواْ مِنۡ خَيۡرٖ يَعۡلَمۡهُ ٱللَّهُۗ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيۡرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُونِ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ﴾ [البقرة:197]

“হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের ওপর হজ আরোপ করে নিলো, তার জন্য হজে অশি¬ল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা ভাল কাজের যা কর, আল্লাহ তা জানেন এবং পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় উত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭]

হজে যে বিতর্ক করতে নিষেধ করা হয়েছে তা কি?

যে বিতর্ক পরস্পরের মধ্যে বিরোধ, বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করে, না জেনে বিতর্ক করা, যে বিতর্ক লক্ষ্য, প্রতিপক্ষের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করা, বিতর্কে কে ভালো করতে পারে থাকে, কে তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ও চুপ করে দিতে পারে, তা দেখা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য না থাকে।

কখনো হজের বিধান নিয়ে না জেনে বিতর্ক করে থাকে, তাও নিন্দনীয়।

কিন্তু হক্ব, সঠিক ও সুন্নাতকে জানার জন্য বিতর্ক করা, উত্তম বিতর্ক। যেমন, হজ্জে তামাত্তু উত্তম না ইফরাদ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারেন ছিলেন নাকি তামাত্তু পালন করেন এ ধরনের বিতর্ক যদ্ধারা সত্য উদঘাটন হয়, তা উত্তম। অনুরুপভাবে সাওমের বিধান বিষয়ে বিতর্ক করা তার বিধান নিয়ে আলোচনা করা।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، فَلَا يَرْفُثُ وَلَا يَجْهَلُ، وَإِنِ امْرُؤٌ قَاتَلَهُ أَوْ شَاتَمَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي صَائِمٌ مَرَّتَيْنِ وفي رواية سهيل بن أبي صالح عن أبيه فَلَا يَرْفُثُ وَلَا يُجَادِلُ»

“সাওম হলো, ডাল স্বরূপ রোজা অবস্থা কেউ যেন অশ্লিল কোনো কাজ না করে এবং অজ্ঞতার পরিচয় না দেয়। যদি কোনো লোক তোমার সাথে ঝগড়া করে বা তোমাকে গালি দেয়, তখন তাকে বলে, দিবে যে আমি রোজাদার। এ কথা দুইবার বলবে।[14] আর সুহাইল ইবন আবি সালেহের বর্ণনায় বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে যেন অশ্লিল কোনো কাজ না করে এবং ঝগড়া না করে।”[15]

এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে মুসলিমদের জন্য উচিৎ হলো, তারা হক্বের পক্ষে হলেও বর্তমানে বিতর্ক পরিহার করবে। কারণ, বিতর্ক ঝগড়া ও বিবাদ মানুষের অন্তকে কঠিন করে দুই মুসলিম ভাইয়ের মাঝে হিংসা বিদ্বেষ ও রেষারেষি বৃদ্ধি করে। বিতর্কে হককে প্রত্যাখ্যান করা ও বাতিলকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الجَنةَِّ لِمَنْ تَرَكَ المِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقّاً»

“যে ব্যক্তি বিতর্ককে পরিহার করে যদিও সে হকের পক্ষে হয়, আমি তার জন্য জান্নাতের পার্শ্বের একটি প্রাসাদের দায়িত্বশীল।”[16] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ أَبْغَضَ الرِّجَالِ إلِى الله الأَلَدُّ الخَصِمُ»

“আল্লাহ তায়ালার নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট সে ব্যক্তি যে অধিক ঝগড়া বিবাদ করে।”[17]

এখানে যে ঝগড়া বিবাদ ও বিতর্ক পরিহার করার কথা বলা হয়েছে, তা হলো, হক পন্থীদের সাথে বিবাদ করা কিন্তু যারা আহলে বাতিল ও বিদআতি তাদের সাথে তর্ক বিতর্ক করাই হলো, জরুরি যাতে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় অথবা তাদের বাতিলের মূলোৎপাটন হয়।

 প্রশংসনীয় বিতর্কের উদাহরণ

বাতিল পন্থীদের সাথে নবী -রাসূল ও সালফে সালেহীনদের বিতর্কের পদ্ধতির ওপর কয়েটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো:

১. ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম নমরূদের সাথে তার বাতিলকে প্রতিহত করতে বিতর্ক করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِي حَآجَّ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ فِي رَبِّهِۦٓ أَنۡ ءَاتَىٰهُ ٱللَّهُ ٱلۡمُلۡكَ إِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِ‍ۧمُ رَبِّيَ ٱلَّذِي يُحۡيِۦ وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا۠ أُحۡيِۦ وَأُمِيتُۖ قَالَ إِبۡرَٰهِ‍ۧمُ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ فَبُهِتَ ٱلَّذِي كَفَرَۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ﴾ [البقرة:258]

“তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখ নি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন? যখন ইবরাহীম বলল, ‘আমার রব তিনিই’ যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমিই জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই। ইবরাহীম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়েত দেন না”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৮]

এ বিতর্ক ছিল তাওহীদের রুবুবিয়্যাহ বিষয়ে তাই কাফিরটি বলে (আমি জীবিত করি ও মৃত্যু দিই) অর্থাৎ এক লোক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমি তাকে ক্ষমা করে দিই আবার অপরজন নির্দোষ আমি তাকে হত্যা করি। এ বিতর্ক ছিল অবান্তর। কারণ, তাওহীদের রুবুবিয়্যাতে হায়াত দ্বারা উদ্দেশ্য অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে আনা। যদি তুমি তোমার দাবীতে সত্য হও তবে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আস! কিন্তু ইব্রাহিম আ. যখন দেখতে পেলেন, বিষয়টিতে নমরূদের বিতর্ক করার অবকাশ রয়েছে, তাই তিনি বিষয়টি এমন একদিক ঘুরিয়ে দিলেন, যেখানে নমরুদ বিতর্ক করতে পারবে না। তারপর তিনি বলেন,

﴿فَإِنَّ ٱللَّهَ يَأۡتِي بِٱلشَّمۡسِ مِنَ ٱلۡمَشۡرِقِ فَأۡتِ بِهَا مِنَ ٱلۡمَغۡرِبِ فَبُهِتَ ٱلَّذِي كَفَرَۗ﴾

“নিশ্চয় আল্লাহ পূর্বদিক থেকে সূর্য আনেন। অতএব তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে আন। ফলে কাফির ব্যক্তি হতভম্ব হয়ে গেল।

২. অনুরূপভাবে দুই বাগানের মালিক ও একজন নেককার লোকের বিতর্ক। লোকটি তাকে কিভাবে উত্তর দেন? তার নিকট যে নেয়ামত রয়েছে তা দ্ধারা ধোঁকায় না পড়ে তার পরিবর্তে তার কর্তব্য বিষয়ে কিভাবে তাকে পথ দেখান। তারপর সে আল্লাহর থেকে তার প্রত্যাশা কি তা উল্লেখ করেন,

﴿فَعَسَىٰ رَبِّيٓ أَن يُؤۡتِيَنِ خَيۡرٗا مِّن جَنَّتِكَ وَيُرۡسِلَ عَلَيۡهَا حُسۡبَانٗا مِّنَ ٱلسَّمَآءِ فَتُصۡبِحَ صَعِيدٗا زَلَقًا ﴾[الكهف:40]

“তবে আশা করা যায় যে, ‘আমার রব আমাকে তোমার বাগানের চেয়ে উত্তম (কিছু) দান করবেন এবং তার ওপর আসমান থেকে বজ্র পাঠাবেন। ফলে তা অনুর্বর উদ্ভিদশূন্য জমিনে পরিণত হবে”[সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ৪০] এবং তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এটি সবই ধ্বংস হবে।

৩. এ ছাড়াও অনেক আহলে ইলম আছেন, যারা নাস্তিক মুরতাদ ও কাফিরদের সাথে বিতর্ক করেন। যেমন, ইমাম আবু হানিফা রহ. দাহরীয়াদের একটি সম্প্রদায়ে সাথে মুনাজারা করেন। তারা বলেন, এ জগতের সৃষ্টি প্রাকৃতিক, জগতের আলাদা কোনো স্রষ্টা নাই, সে নিজেই তার স্রষ্টা। প্রতি ছত্রিশ হাজার বছর পর পৃথিবী আপন কক্ষ পথে ফিরে আসে। আদম আ. আবার জন্ম লাভ করে এবং প্রতি জীবন যেগুলো চলে যায় সে গুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে। এভাবে তারা মারা যায় আবার ফিরে আসে।

ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, আচ্ছা বলত, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের মতামত কি? যে বলে নদীতে মাঝি ছাড়াই নৌকা চলে, কোনো লোক ছাড়াই নৌকা নিজে নিজে তার মধ্যে মালামাল উঠায়, আবার নামায়।

তারা বলল, যে এ কথা বলে সে পাগল ছাড়া আর কি হতে পারে?

তিনি বললেন, ছোট্ট একটি নৌকা তার জন্য যদি মাঝি লাগে, পরিচালক লাগে, তাহলে এত বড় জগত তার জন্য কি পরিচালক লাগবে না? তা কীভাবে পরিচালক ছাড়া চলতে পারে?

তার কথা শোনে তারা কেঁদে ফেলল এবং হককে স্বীকার করে নিলো।

আমর ইবন উবাইদ সে একজন মুতাযেলা যারা বলে কবীরাগুণাহকারী চির জাহান্নামী। সে একদিন বলে, কিয়ামতের দিন আমাকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হলে আল্লাহ বলবে তুমি কেন বললে হত্যাকারী জাহান্নামী? আমি বলব তুমি তা বলছ!

﴿وَمَن يَقۡتُلۡ مُؤۡمِنٗا مُّتَعَمِّدٗا فَجَزَآؤُهُۥ جَهَنَّمُ خَٰلِدٗا فِيهَا وَغَضِبَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ وَلَعَنَهُۥ وَأَعَدَّ لَهُۥ عَذَابًا عَظِيمٗا ﴾[النساء:93]

“আর যে ইচ্ছাকৃত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লা‘নত করবেন এবং তার জন্য বিশাল আযাব প্রস্তুত করে রাখবেন”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৩]

তারপর তাকে কুরাইশ ইবন আনাস বলল, ঘরের মধ্যে তার চেয়ে ছোট আর কেউ নাই, যদি তোমাকে বলে আমি বলছি

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا﴾ [النساء:116]

“নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টটায় পথভ্রষ্ট হলো। [সূরা আন-নিসা আয়াত: ১১৬]

তুমি কীভাবে জানতে পারলে আমি ক্ষমা করতে চাইবো না? এ কথার পর সে আর কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

৩ উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. আওন ইবন আব্দুল্লাহকে খারেজিদের সাথে মুনাযারার জন্য পাঠান। তারা ইমামদের কাফির বলত। সে তাদের বলল, তোমরা উমার ইবনুল খাত্তাবের মতে শাসক চেয়েছিলে, কিন্তু যখন উমার ইবন আব্দুল আযীয আসল তোমরাই সর্বপ্রথম তার থেকে পলায়ন করলে?!

তারা বলল, সে তার পূর্বসূরীদের বলয় থেকে বের হতে পারে নি! আমরা শর্ত দিয়েছিলাম তার পূর্বের সব ইমাম ও খলিফাদের অভিশাপ করতে হবে। কিন্তু সে তা করে নি।

সে বলল, তোমরা সর্বশেষ করে হামানকে অভিশাপ করছ?

তারা বলল, না আমরা কখনোই হামানকে অভিশাপ করি নি!

সে বলল, ফেরআউনের উজির যে তার নির্দেশে প্রাসাদ নির্মাণ করল তাকে তোমরা ছাড়তে পারলে অথচ তোমরা উমার ইবন আব্দুল আজীজকে ছাড়তে পারলে না, যে হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং আহলে ক্বিবলার কাউকে চাই সে কোনো বিষয়ে ভুল করুক?!

উমার ইবন আব্দুল আযীয তার কথায় খুব খুশি হন এবং বলেন তাদের নিকট তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পাঠাবো না।

তারপর সে তাকে বলে, তুমি হামানের কথা বললে ফিরআউনের কথা বললে না?

সে বলে আমি আশংকা করছিলাম ফিরআউনের কথা বললে সে বলবে আমরা তাকে অভিশাপ করি।

* জাহ্হাক আস-সারী নামে একজন খারেজী আবু হানিফা রহ. এর নিকট এসে বলে তুমি তাওবা কর!

তিনি বললেন, কীসের থেকে তাওবা করব?

সে বলল, তুমি যে বলছ, দুই ব্যক্তির মাঝে বিচারক নির্ধারণ করা বৈধ তা হতে। খারেজীরা কোনো হাকীম মানে না তারা বলে, হাকিম একমাত্র আল্লাহ।

আবু হানিফা রহ. বলল, আচ্ছা তুমি কি আমাকে হত্যা করবে নাকি আমার সাথে মুনাযারা করবে?

সে বলল, আমি তোমার সাথে মুনাযারা করব!

বলল, যদি আমরা যে বিষয়ে মুনাযারা করব তাতে যদি আমরা একমত না হতে পারি তাহলে আমার আর তোমার মধ্যে কে ফায়সালা করবে?

সে বলল, যাকে তুমি চাও নির্ধারণ কর।

আবু হানিফা রহ. জাহ্হাক আশ-শারী এক সাথীকে বলল, তুমি বস আমরা যে বিষয়ে বিরোধ করি তাতে তুমি ফায়সালা দিবে।

তারপর সে জাহ্হাককে বলল, তুমি আমার ও তোমার মধ্যে বিচারক হিসেবে তাকে মান?

বলল, হ্যাঁ

আবু হানিফা রহ. বলল, তুমি তো এখন বিচারক নির্ধারণ করাবে বৈধ বললে। তারপর সে নির্বাক হলো এবং চুপ হয়ে গেল। আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ইবনে আসাকের বর্ণনা করেন, একদা রুমের একজন লোককে কাজী আবু বকর আলা-বাকিল্লানীর নিকট পাঠান ইফকের ঘটনা বিষয়ে বিতর্ক করার জন্য। উদ্দেশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে হেয় করা। সে বলল, আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মধ্যে একজন মহিলাকে যিনার অপবাদ থেকে পবিত্র করেন, তার নাম কি?

কাজী উত্তরে বললেন, তার হলো, দুইজন মহিলা। তাদের সম্পর্কে লোকেরা অপবাদ দেয় এবং যা বলার বলে। একজন হলো আমাদের নবীর স্ত্রী আর অপর জন হলো, মারয়াম বিনতে ইমরান। আমাদের নবীর স্ত্রী সন্তান প্রসব করেনি আর মারয়াম আ. একজন সন্তান কাঁধে নিয়ে মানুষের মধ্যে ফিরে আসে। আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা যে অপবাদ দেয়, তা থেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও মারয়াম আ. উভয়কে পবিত্র করেন। তুমি তাদের দু’জনের কার কথা জানতে চাও? এ কথা শোনে লোকটি চুপ হয়ে গেল কোনো উত্তর দিতে পারল ন। এর পর তার আর কি বলার আছে?

মোটকথা, বাতিলকে প্রতিহত ও নিরুত্তর করার জন্য এবং বিধর্মী কাফির মুশরিক ও নাসারাদের প্রতিহত করার জন্য বিতর্ক করা মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব। একজন মুসলিমের সামনে কুফর পেশ করা হবে, আর সে চুপ করে বসে থাকবে, তা কখনোই বৈধ হতে পারে না।

 নিন্দনীয় ঝগড়া ও বিতর্কের ক্ষতি

আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের একমাত্র ঐ সব বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেন, যার মধ্যে নগদে বা ভবিষ্যতে কোনো না কোনো ক্ষতি নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিষেধ করেছেন। কারণ, ঝগড়া-বিবাদ মানুষের অনেক ক্ষতির কারণ হয় এবং অনিষ্টটা সৃষ্টি করে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি উল্লেখ করা হলো:

১. মহা কল্যাণ হতে বঞ্চিত হওয়া

 আল্লামা আওযায়ী বলেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি কামনা করেন, তখন তাদের ওপর ঝগড়া-বিবাদ চাপিয়ে দেন এবং তাদের কাজের থেকে বিরত রাখেন।

মুয়াবিয়া ইবন কুরাহ বলেন, তোমরা ঝগড়া-বিবাদ থেকে বেচে থাক! কারণ, তা তোমাদের আমলসমূহকে ধ্বংস করে দেয়।

২. ইলম থেকে বঞ্চিত

তোমরা জান না যে, আল্লাহ তা‘আলা ক্বদর রজনীর ইলমকে কেবল ঝগড়ার কারণে তুলে নেন।

উবাদাহ ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«رسول الله خرج يخبر بليلة القدر، فتلاحى رجلان من المسلمين فقال: «إنِّي خَرَجْتُ لِأخْبِرَكُمْ بلِيلْةِ القَدْرِ -أي: ليعينها-، وَإِنَّهُ تَلَاحَى فُلَانٌ وَفُلَانٌ فَرُفِعَتْ، وَعَسَى أَنْ يَكُونَ خَيْراً لَكُمْ، الْتَمِسُوهَا فِي السَّبْعِ وَالتِّسْعِ وَالخَمْسِ»

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কদর রজনী সম্পর্কে খবর দিতে আমাদের নিকট বের হন, তারপর দুই মুসলিমকে দেখেন, তারা দুইজন ঝগড়া করছে। আমি তোমাদের নিকট বের হয়েছিলাম তোমাদের কদর রজনী সম্পর্কে সংবাদ দিতে। কিন্তু অমুক অমুক লোক ঝগড়া করতে থাকলে তার ইলম তুলে নেয়া হয়। হতে পারে এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। তোমরা সাতাশ, উনত্রিশ ও পঁচিশ তারিখ রজনীতে কদর রজনীকে তালাশ কর।”[18]

ওবাদাহ ইবন সামেত থেকে বর্ণিত, হাদীস দ্বার প্রমাণিত হয়, ঝগড়া বিবাদ করা একটি নিন্দনীয় কাজ; যার কারণে মানুষ শাস্তি ভোগ করতে হয় এবং কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়। দুই লোকের ঝগড়া, বাক বিতণ্ডা ও বিবাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিতিতে মসজিদে সংঘটিত হয়। ফলে কদর রাত্রির ইলম থেকে আমরা মাহরুম হই।

ইউনুস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার নিকট মাইমুন ইবন মাহরান লিখেন, সাবধান! দীনের বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা থেকে বিরত থাকবে। কোনো আলিম বা জাহেল কারো সাথে কখনো বিবাদ করবে না।

এক লোক বর্ণনা করে যে, এক ব্যক্তি আলিমদের সাথে বিবাদ করার কারণে ইলম হাসিল করা হতে বঞ্চিত হয়। শেষ পর্যন্ত সে লজ্জিত হয় এবং বলে, আফসোস যদি আমি তাদের সাথে বিবাদ না করতাম!

৩. উম্মতের ধ্বংস

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«دَعُونِي مَا تَرَكْتكُمْ، إنَمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ سُؤَالهمْ وَاخْتِلَافُهُمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ»

“তোমাদের পূর্বের উম্মতরা অধিক প্রশ্ন করা ও তাদের নবীদের সাথে বিরোধ করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।”

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যিয়াদ ইবন হাদীরকে জিজ্ঞাসা করে বলে, তুমি কি জান কোনো জিনিস ইসলামকে ধ্বংস করে? সে বলল, না। তারপর বলল, ইসলাম ধ্বংস করে আলিমদের পদস্খলন, মুনাফেকদের বিবাদ করা আল্লাহর কিতাব বিষয়ে এবং ভ্রষ্ট ইমামদের ফায়সালা দেয়।

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

إنما هلك من كان قبلكم بالمراء والخصومات في الدين»

“তোমাদের পূর্বের লোকেরা দীনের ব্যাপারে বিবাদ করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।”

৪. অন্তরকে কঠিন করে ও শত্রুতা সৃষ্টি করে

ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেন, ঝগড়া বিবাদ করা মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয় এবং পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করে।

অনেক মানুষ আছে কেবল মজলিশে বিতর্ক করার কারণে তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। যার কারণে তারা একে অপরের সাথে কথা বলে না, একজন অপরজনকে দেখতে যায় না। এ কারণে মনীষীরা বিতর্ক করা থেকে সতর্ক করেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তোমার যুলুমের জন্য তুমি ঝগড়াটে হওয়াই যথেষ্ট। আর তোমার গুণার জন্য তুমি বিবাদ কারী হওয়াই যথেষ্ট।

মুহাম্মাদ ইবন আলী ইবন হুসাইন বলেন, ঝগড়া দীনকে মিটিয়ে দেয়, মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ জন্মায়।

আব্দুল্লাহ ইবন হাসান বলেন, বিবাদ প্রাচীন বন্ধুত্বকেও ধ্বংস করে, সুদৃঢ় বন্ধনকে খুলে দেয়, কমপক্ষে তার চড়াও হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে যা হলো, সম্পর্কচ্ছেদের সবচেয়ে মজবুত উপায়।

ইবরাহীমে নখয়ী আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীর তাফসীরে বলেন,

﴿وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ يَدُ ٱللَّهِ مَغۡلُولَةٌۚ غُلَّتۡ أَيۡدِيهِمۡ وَلُعِنُواْ بِمَا قَالُواْۘ بَلۡ يَدَاهُ مَبۡسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيۡفَ يَشَآءُۚ وَلَيَزِيدَنَّ كَثِيرٗا مِّنۡهُم مَّآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ مِن رَّبِّكَ طُغۡيَٰنٗا وَكُفۡرٗاۚ وَأَلۡقَيۡنَا بَيۡنَهُمُ ٱلۡعَدَٰوَةَ وَٱلۡبَغۡضَآءَ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ كُلَّمَآ أَوۡقَدُواْ نَارٗا لِّلۡحَرۡبِ أَطۡفَأَهَا ٱللَّهُۚ وَيَسۡعَوۡنَ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَسَادٗاۚ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلۡمُفۡسِدِينَ﴾ [المائدة:64]

“আর ইয়াহূদীরা বলে, ‘আল্লাহর হাত বাঁধা’। তাদের হাতই বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং তারা যা বলেছে, তার জন্য তারা লা‘নতগ্রস্ত হয়েছে। বরং তার দু’হাত প্রসারিত। যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন এবং তোমার ওপর তোমার রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তা তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফুরী বাড়িয়েই দিচ্ছে। আর আমরা তাদের মধ্যে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত শত্রতা ও ঘৃণা ঢেলে দিয়েছি। যখনই তারা যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত করে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দেন। আর তারা জমিনে ফ্যাসাদ করে বেড়ায় এবং আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৬৪]

অর্থাৎ দীনের ব্যাপারে ঝগড়া-বিবাদ করা।

৫. ভালো কাজের তাওফীক থেকে বঞ্চিত

আল্লাহ তা‘আলা যে মজলিশে বিতর্ক করা হয় এবং তাতে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য থাকে না, তাদের আল্লাহ তায়ালা ভালো কাজ করার তাওফিক হতে বঞ্চিত করেন।

৬. অন্তর আল্লাহর স্মরণ হতে বিরত থাকে

যে বিতর্কে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য থাকে না তা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এমনকি সালাতেও তার অন্তর আল্লাহর স্মরণ করাকে বাদ দিয়ে বিতর্কের দিকে তার অন্তর সম্পৃক্ত থাকে।

কোনও একজন মনীষী বলেন, দীনকে নষ্ট, মরুয়তকে দুর্বল এবং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখার জন্য ঝগড়া বিবাদ থেকে এত বেশি মারাত্মক আমি আর কিছুই দেখিনি।

৭. পদস্খলনের কারণ

মুসলিম ইবন ইয়াসের বলেন, তোমরা ঝগড়া-বিবাদ পরিহার কর। কারণ, তা হলো আলেমের মূর্খতার মুহূর্ত। শয়তান এ মুহূর্তেই তার পদস্খলন কামনা করে।

৮. সম্মানহানী

কোন এক আরব বলছিল, যারা মানুষের সাথে বিবাদ করে তাদের সম্মান নষ্ট হয়। যে বেশি ঝগড়া করে সে তা অবশ্যই বুঝতে পারে।

ইমাম শাফে‘ঈ রহ. বলেন,

قَالُوا سَكتَّ وَقَدْ خُوصِمْتَ، قُلْتُ لَهُمْ

إنَِّ الجَوَابَ لبابِ الشَّرِّ مِفْتَاحُ

وَالصَّمْتُ عَنْ جَاهِلٍ أَوْ أَحمَقٍ شَرَفٌ

وَفيِهِ أَيْضاً لصِوْنِ العِرْضِ إصِلَاحُ

أَمَا تَرَى الُأسَد تُخَشى وَْهَي صامِتَةٌ

وَالكلْبُ يخْسَى لَعَمْرِي وَهْوَ نَبَّاحُ

“তুমি চুপ থাকলে অথচ তোমার সাথে বিতর্ক করা হচ্ছে! আমি তাদের বললাম উত্তর দেওয়া অন্যায়ের দরজার চাবি স্বরুপ। কোনো জাহেল বা আহমকের কথার উত্তর দেওয়ার চেয়ে চুপ থাকা মর্যদাকর। এছাড়াও তাতে রয়েছে ইজ্জত সংরক্ষনে নিশ্চয়তা। তুমি কি দেখনা বাঘ চুপ থাকে অথচ তাকে সবাই ভয় করে। আর কুকুরকে সবাই ঘৃণা করে অথচ সে সব সময় ঘেউ ঘেউ করতেই থাকে”

 ৮. বিদআতের বিকাশ ও প্রবৃত্তির অনুকরণ

উমার ইবন আব্দুল আযীয রহ. বলেন, যে ব্যক্তি দীনকে বিতর্কের জন্য লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করে তার নকল করার প্রবণতা বেড়ে যায়। অর্থাৎ এক বিদ‘আত থেকে আরেক বিদ‘আতের দিকে যায়।

হাকাম ইবন উতাইবা আল কূফীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মানুষকে বিদ‘আতে প্রবেশে কিসে বাধ্য করছে? তিনি বললেন, ঝগড়া ও বিবাদ।

সাহাল ইবন আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, একজন মানুষ কীভাবে বুঝতে পারবে যে সে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেন, যখন সে দশটি গুণ তার নিকট আছে বলে বুঝতে পারবে! সে জামা‘আত ছাড়বে না, এ উম্মতের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করবে না, ভাগ্যকে অস্বীকার করবে না, ঈমান বিষয়ে সন্দেহ করবে না, দীনের বিষয়ে বিবাদ করবে না, আহলে কিবলার কোনো অপরাধী মারা গেলে তার ওপর সালাত আদায় ছাড়বে না। মোজার উপর মাসেহ করা ছাড়বে না, যালিম বা ইনসাফগার বাদশাহর পিছনে সালাত আদায় করা ছাড়বে না।

 আলিমদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ

এখানে এমন কতক লোক আছে, যারা মাসলা -মাসায়েল বিষয়ে আলিমদের সাথে অনর্থক বিতর্ক করে। তাদের উদ্দেশ্য আলিম ও তালেবে ইলমদের মজলিশে নিজেদের যোগ্যতা ও ইলম জাহের করা এবং তারা কথা বলা ও বিতর্ক করার যোগ্যতা রাখে প্রকাশ করা। এ ধরনের বিতর্ক ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে অবশ্যই অপরাধ। যাবের ইবন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا تَعَلَّمُوا العِلْمَ لِتُبَاهُوا بِهِ العُلَمَاءَ، وَلَا لِتُمَارُوا بِهِ السُّفَهَاءَ، وَلَا تَخَيَّرُوا بِهِ المَجَالِسَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَالنَّارَ النَّارَ»

“তোমরা আলিমদের সাথে বড়াই করা এবং মূর্খদের সাথে বিতর্ক করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করো না এবং ইলম দ্বারা মজলিশসমূহকে বিতর্কিত করো না। যে ব্যক্তি ইহা করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম জাহান্নাম।”[19]

অপর এক হাদীসে কা‘ব ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

«مَنْ طَلَبَ العِلْمَ لِيُجَارِيَ بهِِ العُلَمَاءَ، أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ، أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ؛ أَدْخَلَهُ الله النَّارَ»

“যে ব্যক্তি আলিমদের সাথে বিতর্ক করা এবং জাহেলদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করা অথবা মানুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।”[20]

সুতরাং ঝগড়া করার বা আলিমদের সাথে বিতর্ক করার উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা হতে বিরত থাকতে হবে।

আবার কিছু লোক আছে তাদের উদ্দেশ্যই হলো, আলিম ও তালেবে ইলমদের সাথে বিতর্ক করা। তারা বিভিন্ন মজলিশে গিয়ে বলতে থাকে, আমি অমুক কায়েদা জানি অমুক দলীল জানি ইত্যাদি। এ কারণে তাদের দেখা যায় তাদের মাশায়েখদের প্রশ্ন করলে মাশায়েখরা যখন উত্তর দেয়, তখন বলে, হে শাইখ এ মাসাআলা বিষয়ে অমুক আলিম এ কথা বলছে, অমুক এ কথা বলছে...। সে যখন সব কিছু জানে তাহলে তার প্রশ্ন করার দরকার কি? এতে স্পষ্ট হয় সে তার যোগ্যতা প্রকাশ করার জন্য প্রশ্ন করে থাকে। এ ধরনের লোকেরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে ইলম শিক্ষা করে না। তারা ইলম শিখে তাদের বড়ত্ব, যোগ্যতা ও পাণ্ডিত্য প্রকাশ করার জন্য। এ ছাড়াও তার নাম যাতে আলোচনায় আসে এবং মানুষ বলবে লোকটি হাফেয তার নিকট দলীলের অভাব নাই সে অনেক বড় মুনাযের ইত্যাদি প্রশংসা লাভের জন্যই সে ইলম অর্জন করে।

 পরিশিষ্ট:

আমরা যখন চাইবো যে, আমরা অনর্থক বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদ হতে বিরত থাকবো এবং ঝগড়া-বিবাদের নিজেদের জড়াবো না, তখন আমাদের কর্তব্য হলো, আমরা এ দ্বীনকে মজবুত করে ধরবো দ্বীন থেকে বিচ্যুত হবো না। কারণ, যারা দ্বীনকে ছেড়ে দেয়, তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি হলো, আল্লাহ তা‘আলা তাদের মধ্যে জাহালত ও ঝগড়া-বিবাদ ও ফিতনা ছড়িয়ে দেয়।

আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَا ضلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدىً كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الجَدَلَ ثم تلا النبي هذه الآية ﴿وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ﴾»

“মানুষ সঠিক পথের ওপর থাকার পর কখনো গোমরাহ হয় নাই কিন্তু যখন তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ দেওয়া হলো, তখন তারা ধ্বংস হতে আরম্ভ করল। তার এ আয়াত-

﴿وَقَالُوٓاْ ءَأَٰلِهَتُنَا خَيۡرٌ أَمۡ هُوَۚ مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلَۢاۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُونَ﴾[الزخرف:58]

“আর তারা বলে, ‘আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ নাকি ঈসা’? তারা কেবল কূটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।” [সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৫৮] তিলাওয়াত করেন।

আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে বদলা নিয়েছেন এবং তাদের শাস্তি দিয়েছেন। যেমন, তাদের নিকট যে দীন ও ইলম পেশ করা হয়েছিল তার বিনিময়ে তাদের ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত করা হয়েছে। তাদের অনর্থক বিতর্কে লিপ্ত করে দেওয়া হলো।

আর মনে রাখতে হবে, এ হলো, চিরন্তন নিয়ম, যখন কোনো জাতি উপকারী ইলম ও কুরআন ও সুন্নাহের ইলম ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও ফিতনা ফাসাদ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের থেকে বদলা নিবে।

হে আল্লাহ তুমি আমাদের হককে হক হিসেবে পরিচয় করে দাও আর তার অনুকরণ করার তাওফীক দান কর। আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে চেনার তাওফীক দাও এবং বাতিল থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দাও।

وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين

মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ

 তোমার বুঝকে পরীক্ষা কর!

তোমার সামনে দুই প্রকার প্রশ্ন আছে; কিছু আছে তুমি এখনই উত্তর দিতে পারবে, আর কিছু আছে যে গুলোর উত্তর দিতে তোমাকে গভীর চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।

প্রথম প্রকার প্রশ্ন:

১. ঝগড়া-বিবাদের সংজ্ঞা দাও।

২. ঝগড়া ও বিতর্কের মধ্যে পার্থক্য কী?

৩. ঝগড়া ও বিতর্কের অনেক কারণ আছে, উল্লেখ যোগ্য কয়েকটি উল্লেখ কর।

৪. প্রশংসনীয় বিতর্কের শর্তসমূহ কী?

৫. বিতর্ক কত প্রকার? প্রত্যেক প্রকার উদাহরণ বর্ণনা কর।

৬. ঝগড়ার কারণে কী কী ক্ষতি বা ফ্যাসাদ হতে পারে।

দ্বিতীয় প্রকার প্রশ্ন:

১. কুরআনে কারীম বিষয়ে বিতর্কে অর্থ কী?

২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্ন লিখিত বাণীর অর্থ কী?

 اقرؤوا القرآن ما ائتلفت قلوبكم،فإذا اختلفتم فقوموا عنه

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্ন লিখিত বাণীর অর্থ কী?

ما ضل قوم بعد هدى كانوا عليه إلا أُتوا الجدل

৪. আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে অর্থ কী?

ঝগড়া-বিবাদ করা খুবই খারাব। এর কুফল এতই ক্ষতিকর যে, এটি একজন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয়। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর কুফল খুবই মারত্মক। এর কারণে মানুষের অন্তর কঠিন হয় এবং পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পায়। তাই এ বিষয়ে আমাদের জানা থাকা ও এর থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি



[1] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৩। আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন।

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৬০।

[3] দারমী, হাদীস নং ১১৯।

[4] তাফসীরে কুরতবী ২৪১/৮।

[5] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬৯।

[6] বুখারি: ৪৪১৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৬৯

[7] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৯৬৯।

[8] দেখুন: তারিখে দেমশক ৩৮৪/৫১

[9] দেখুন তারিখে দামেশক [২৯৭/২৯]

[10] দেখুণ: মিফতাহুস সাআদাত [১৬৯/১]

[11] আল-কাবায়ের।

[12] মাজমুয়ুল ফাতওয়াহ ১৬৪/২০।

[13] তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৬৯।

[14] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৯৪।

[15] ওমদাতুল কারী: ২৫৮/১০; ফতহুল বারী: ১০৪/৪।

[16] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৮০০।

[17] সহীহ বুখারী আমর ইবন শুয়াইব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত, তিনি বলেন, ২৪৫৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৬৮।

[18] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৯।

[19] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৫৪।

[20] তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৪৫।