অন্তর-বিধ্বংসী বিষয়সমূহ: নিফাক

[ بنغالي – Bengali – বাংলা ]

শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

—™

অনুবাদ: জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের

সম্পাদনা: ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী

 ভূমিকা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.

সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদের ওপর এবং তার পরিবার পরিজন ও সকল সাহাবীগণের ওপর।

মুনাফিকী বা কপটতা হলো এমন একটি কঠিন ব্যাধি, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারাত্মক ক্ষতিকর। মুনাফিকী বা কপটতা মানুষের অন্তরের জন্য এত ক্ষতিকর যে, তা মানুষের অন্তরকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়, যার ফলে একজন মানুষ দুনিয়াতে ঈমান হারা হয় এবং দুনিয়া থেকে তাকে বেঈমান হয়ে চির বিদায় নিতে হয়। মানুষের অন্তর নষ্ট করার জন্য মুনাফেকি বা কপটতার চেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর আর কোনো কিছুই হতে পারে না। একজন মানুষ কখনই মুনাফেকি বা কপটতাকে পছন্দ করে না। কিন্তু তারপরও তাকে তার অজান্তে মুনাফেকি বা কপটতাতে আক্রান্ত হতে হয়। বিশেষ করে নিফাকে আমলী বা ছোট নিফাক এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ মুনাফেকি বা কপটতাকে প্রতিহত করতে অক্ষম বা মুনাফিকী বা কপটতা হতে বেঁচে থাকা মানুষের জন্য অসম্ভব। যারা মুনাফেকিকে হালকা করে দেখে বা নিফাক হতে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা কম করে তারাই মুনাফিকীতে আক্রান্ত হয়। নিফাক মানুষের যাবতীয় ভাল ও প্রশংসনীয় গুণকে ছিনিয়ে নেয় ও ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে। কুরআনে করীমে আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের অবস্থা তাদের গুণ ও তাদের তৎপরতা তুলে ধরে একটি সূরা নাযিল করেন। আমরা এ কিতাবে নিফাকের সংজ্ঞা, প্রকার, মুনাফিকদের চরিত্র ও নিফাক থেকে বাঁচার উপায়গুলো সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করব। যারা এ কিতাব লিখতে আমাদের সহযোগিতা করবে এবং মানুষের মধ্যে তা প্রকাশে অংশ গ্রহণ করবে আমরা তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

وصلى الله وسلم على نبينا محمد.

 নিফাকের সংজ্ঞা

নিফাকের আভিধানিক অর্থ:

(نفق) নূন, ফা ও কাফ বর্ণগুলোর সমন্বয়ে গঠিত শব্দটি অভিধানে দু’টি মৌলিক ও বিশুদ্ধে অর্থে ব্যবহার হয়। প্রথম অর্থ দ্বারা কোনো কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া ও দূরীভূত হওয়াকে বুঝায় আর দ্বিতীয় অর্থ দ্বারা কোনো কিছুকে গোপন করা ও আড়াল করাকে বুঝায়।

নিফাক শব্দটি ‘নাফাক’ শব্দ হতে নির্গত। ‘নাফাক’ “জমির অভ্যন্তরে বা ভূ-গর্ভের গর্ত যে গর্তে লুকানো যায়, গোপন থাকা যায়। আর নিফাককে নিফাক বলে নাম রাখা হয়েছে, কারণ মুনাফিকরা তাদের অন্তরে কুফুরীকে লুকিয়ে রাখে বা গোপন করে।[1]

ইসলামী শরী‘আতে নিফাকের অর্থ: নিজেকে ভালো বলে প্রকাশ করা আর অন্তরে খারাবী ও অন্যায়কে গোপন করা।

ইবনে জুরাইজ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুনাফিক বলা হয়, যার কথা তার কাজের বিপরীত, সে যা প্রকাশ করে অন্তর তার বিপরীত, তার অভ্যন্তর বাহির হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তার প্রকাশ ভঙ্গি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক।[2]

নিফাকের প্রকার:

নিফাক দুই প্রকার: এক. বড় নিফাক দুই. ছোট নিফাক।

ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, নিফাক কুফুরীর মতোই। বড় নিফাক ও ছোট নিফাক। এ কারণেই অধিকাংশ সময়ে বলা হয়ে থাকে, কোনো কুফুর আছে যা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয় আবার কোনো কুফুর আছে যা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না। অনুরূপভাবে নিফাকও দু ধরনের: কিছু আছে যা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়, তাকে বলা হয়, নিফাকে আকবর বা বড় নিফাক। আর কিছু আছে তা মানুষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না, তাকে বলা হয় নিফাকে আসগর বা ছোট নিফাক।[3]

এক. বড় নিফাক এর সংজ্ঞা:

বড় নিফাক বা নিফাকে আকবর হলো, মুখে ঈমান ও ইসলামকে প্রকাশ করা আর অন্তরে কুফরকে গোপন রাখা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এ প্রকারের নিফাকই ছিল। কুরআনে করীম এ প্রকারের মুনাফিকদের কাফির বলে আখ্যায়িত করে এবং তাদের নিন্দা করেন। আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দেন যে, এ ধরনের মুনাফিক জাহান্নামের একেবারেই নীচের স্তরে অবস্থান করবে এবং তারা চির জাহান্নামী হবে। তারা কখনোই জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।

আল্লামা ইবন রজব রহ. বলেন, নিফাকে আকবর হলো, একজন মানুষ আল্লাহ, তার ফিরিশতা ও রাসূলগণ, আখিরাত দিবস এবং আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান প্রকাশ করা আর অন্তরে উল্লিখিত বিষয় সমূহের প্রতিটির প্রতি ঈমানের পরিপন্থী অথবা যে একটির প্রতি ঈমানের পরিপন্থী বিষয়কে গোপন করা।[4]

ফিকহবিদগণ মুনাফিকদের ক্ষেত্রে যিন্দীক শব্দটিও ব্যবহার করে থাকেন। তারা মুনাফিকদের যিন্দীক বলে আখ্যায়িত করেন।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, “যিন্দীকের দল, তারা হলো, যারা ইসলাম ও রাসূলদের আনুগত্য প্রকাশ করে এবং কুফুর, শির্ক, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিদ্বেষকে গোপন করে। তারা অবশ্যই মুনাফিক এবং তারা জাহান্নামের সর্ব নিম্নে অবস্থান করবে। আর তাতেই তারা চিরকাল অবস্থান করবে”[5]

দুই. নিফাকে আমলী বা ছোট নিফাক:

নিফাকে আমলী বা ছোট নিফাকে লিপ্ত হলো তারা, যাদের অন্তরে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আছে এবং তাদের আক্বীদা সঠিক, তবে গোপনে দীনি আমলসমূহের ওপর আমল করাকে ছেড়ে দেয়, আর প্রকাশ করে যে, সে আমল করে যাচ্ছে। এ ধরনের নিফাককে নিফাকে আমলী বা ছোট নিফাক বলে।

আল্লামা ইবন রজব রহ. বলেন, “নিফাকে আসগর বা ছোট নিফাক হলো, আমলের নিফাক। অর্থাৎ কোনো মানুষ নিজেকে নেক-কার বলে প্রকাশ করা আর অন্তরে এর পরিপন্থী বিষয়কে গোপন করা”[6]

একজন মুসলিমের অন্তরে সে ঈমানদার হওয়া সত্ত্বেও নিফাকে আসগর বা ছোট নিফাক একত্র হতে পারে। তাতে তার ঈমান নষ্ট হবে না। যদিও এটি কবিরা গুনাহসমূহের অন্যতম কবিরা গুনাহ। কিন্তু নিফাকে আকবর বা বড় নিফাক ঈমানের সাথে একত্র হতে পারে না। কারণ, এটি ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই কোনো বান্দা যখন আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, তার মধ্যে নিফাকে আকবর থাকতে পারে না।

কিন্তু যখন কোনো মানুষের অন্তরে নিফাকে আসগর প্রগাঢ় ও মজবুত হয়ে গেঁথে বসে, তখন তা কখনো বান্দাকে বড় নিফাকের দিকে নিয়ে যায় এবং তাকে দীন থেকে পরিপূর্ণ রূপে বের দেয়। ফলে সে ঈমান হারা হয়ে মারা যাওয়ার আশংকা থাকে। এ জন্য নিফাকে আমলীকে কখনোই খাট করে দেখার অবকাশ নাই।

হে পাঠক বন্ধুরা! তুমি যদি তোমার মধ্যে নিফাকের কোনো গুণ বা চরিত্র দেখতে পাও বা অনুভব কর, তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা তুমি বর্জন কর। অন্যথায় দিন দিন তা তোমার মধ্যে আরো বেড়ে যাবে। আর যখন তুমি তোমার মধ্যে নিফাকের গুণকে বাড়তে দিবে, সে তোমাকে ধীরে ধীরে কুফরের দিকে পৌঁছাবে। তখন তোমার পরিণতি যে কত ভয়াবহ হবে তা তুমি নিজেই বুঝতে পার। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাযত করুন। আমীন।

আর নিফাকে আমলী বান্দাকে চির জাহান্নামী করে না, বরং তার বিধান অন্যান্য কবিরা গুনাহ কারীর মতোই। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, আর যদি তিনি চান তাকে তার গুনাহের কারণে শাস্তি দিবেন। তারপর তার ঠিকানা হবে জান্নাত। এ গুনাহের থেকে মাপ পাওয়ার জন্য তাকে অবশ্যই খালেস তওবা করতে হবে।

দীনের মধ্যে নিফাকের ধরণ:

দীনের বিষয়ে মুনাফেকি দুই ধরনের হতে পারে: এক- মৌলিক, দুই- আকস্মিক সংঘটিত।

মৌলিক নিফাক দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে নিফাকের পূর্বে সত্যিকার ইসলাম ছিল না বা ইসলাম অতিবাহিত হয়নি। অনেক মানুষ আছে যারা দুনিয়ার ফায়দা লাভ ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজেকে মুসলিম বলে আখ্যায়িত করে, মূলতঃ সে তার জীবনের শুরুতেই অন্তর থেকে ইসলামকে গ্রহণ করে নি ও আল্লাহর ওপর ঈমান আনয়ন করে নি। সুতরাং এ লোকটি তার জীবনের শুরু থেকেই একজন খাঁটি মুনাফিক, যদিও সে মুখে ইসলাম প্রকাশ করে বা মুসলিম সমাজে বসবাস করে। আবার অনেক লোক এমন আছে যারা সত্যিকার অর্থে মুসলিম, ঈমানে তারা সত্যবাদী। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের বিপদ-আপদ ও মুসীবত যদ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তাদের ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে থাকে, তাতে তারা সফলকাম হতে পারে নি এবং ঈমানের ওপর অটল থাকতে পারে নি। ফলে তাদের অন্তরে ইসলামের সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয় এবং তারা ইসলাম হতে মুরতাদ হয়ে যায়। তাদের ওপর মুরতাদের বিধান প্রয়োগ করা হবে। আবার অনেক মানুষ আছে তারা দুনিয়ার কোনো সুবিধা যা মুসলিম থাকলে লাভ করত, তা হতে বঞ্চিত হবে, এ আশংকায় সে তার মুরতাদ হওয়াকে গোপন রাখে। আর মুসলিম সমাজেই মুসলমানের নামে বসবাস করে। সে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় না যে আমি মুরতাদ। বরং যখন কোনো সুযোগ পায়, তখন ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষোদাগার করে এবং বিদ্বেষ ছড়ায়। এ ধরনের মুনাফিক আমাদের সমাজে অনেক রয়েছে। তারা ইঁদুরের মতো মুসলিমদের সমাজে আত্ম গোপন করে আছে। যখনই সুযোগ পায় ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করতে কার্পণ্য করে না। আর সব সময় তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

একজন মুসলিম যখন কোনো মুসলিম সমাজে বসবাস করে তারপর যখন সে মুরতাদ হয়ে যায়, তাকে অবশ্যই দুর্নামের ভাগি হতে হবে এবং সামাজিক মর্যাদা হারাতে হবে। এ কথা আমাদের কারোই অজানা নয়। আমাদের সমাজে এ ধরনের মুনাফিক অসংখ্য। যারা বাস্তবে ইসলামের অনুশাসনে বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনে না; কিন্তু তারা সমাজে নিজেদের মুসলিম বলে প্রকাশ করে এবং মুসলিম হওয়ার সুবিধাও ভোগ করে, অপর দিকে বিজাতিদের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের থেকেও সুবিধা নেয়। তারা ইসলামের শত্রুদের দালালি করে। মুসলিম সমাজে বসবাস করে মুসলিমদের কীভাবে ক্ষতি করবে এ চিন্তায় তারা বিভোর থাকে।

নিফাক থেকে ভয় করা:

হে মুসলিম ভাইয়েরা! নিফাককে কঠিন ভয় করতে হবে। আমরা যাতে আমাদের মনের অজান্তে নেফাকের মধ্যে নিপতিত না হই সেদিকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে নিফাক অত্যন্ত খারাপ গুণ যা একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা থেকে নিয়ে সব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়। মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানকে ধ্বংস করে দেয়। সমাজে সে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।

সাহাবীগণ এবং তাদের পর সালফে সালেহীনরা নিফাককে কঠিন ভয় করতেন। এমনকি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি যখন সালাতে তাশাহহুদ পড়ে শেষ করতেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট নিফাক হতে পরিত্রাণ কামনা করতেন এবং তিনি বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করত। তার অবস্থা দেখে একজন সাহাবী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,

«ومالك يا أبا الدرداء أنت والنفاق؟، فقال دعنا عنك، فو الله إن الرجل ليقلب عن دينه في الساعة الواحدة فيُخلع منه»

“কি ব্যাপার হে আবু দারদা! তুমি নিফাককে এত ভয় কর কেন? তখন সে বলল, আমাকে আপন অবস্থায় থাকতে দাও। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, একজন লোক মুহূর্তের মধ্যেই তার দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। ফলে সে দীন হতে বের হয়ে যায়”[7]

বড় বড় সাহাবীরাও নিফাককে ভয় করত। হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নিফাককে ভয় করার ঘটনা আমাদের নিকট সুপ্রসিদ্ধ। তিনি নিজেই তার ঘটনার বর্ণনা দেন।

«لقيَني أبو بكر فقال كيف: أنت يا حنظلة؟ قال قلت يذكّرنا بالنار والجنة حتى كأنّا رأي عين، فإذا خرجنا من عند رسول الله عافسنا الأزواج والأولاد والضيعات، فنسينا كثيرا. قال أبو بكر: فو الله، إنا لنلقى مثل هذا. فانطلقت أنا وأبو بكر حتى دخلنا على رسول الله قلت: نافق حنظلة يا رسول الله، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «وَمَا ذَاكَ ؟» قلت: يا رسول الله، نكون عندك تذكّرنا بالنار والجنة حتى كأنّا رأي عين، فإذا خرجنا من عندك عافسنا الأزواج والأولاد والضيعات نسينا كثيرا، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم «وَالَّذِي نَفْسي بيِدِهِ، لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونونَ عِنْدِي، وَفي الذِّكْر، لَصافَحتْكُمُ الملائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُم وَفي طُرُقِكُم، لَكنِْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وسَاعَةً»

“একদিন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথে আমার সাক্ষাত হলে, সে আমাকে বলে, হে হানযালা তুমি কেমন আছ? আমি উত্তরে তাকে বললাম, হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে! আমার কথা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলল, সুবহানাল্লাহ! তুমি কি বল? তখন আমি বললাম, আমরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে থাকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জান্নাত ও জাহান্নামের কথা আলোচনা করে তখন আমরা যেন জান্নাত ও জাহান্নামকে দেখতে পাই। আর যখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে বের হয়ে আসি এবং স্ত্রী, সন্তান ও দুনিয়াবি কাজে লিপ্ত হই, তখন আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলল, আল্লাহর শপথ করে বলছি! আমাদের অবস্থাও তোমার মতোই। তারপর আমি ও আবু বকর উভয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে তার নিকট প্রবেশ করি এবং বলি হে আল্লাহর রাসূল! হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলল, তা কীভাবে? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যখন আপনার দরবারে উপস্থিত থাকি তখন আপনি আমাদের জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা করেন, তখন আমাদের অবস্থা এমন হয়, যেন আমরা জান্নাত ও জাহান্নামকে দেখছি! আর যখন আমরা আপনার দরবার হতে বের হই এবং স্ত্রী, সন্তান ও দুনিয়াবি কাজে লিপ্ত হই, তখন আমরা অধিকাংশই ভুলে যাই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, আমি ঐ সত্ত্বার শপথ করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন, যদি আমার নিকট থাকা অবস্থায় তোমাদের যে অবস্থা হয়, সে অবস্থা যদি তোমাদের সব সময় থাকতো, তাহলে ফিরিশতারা তোমাদের সাথে তোমাদের বিছানায় ও চলার পথে সরাসরি মুসাফা করত। তবে হে হানাযালা! কিছু সময় এ অবস্থা হবে, আবার কিছু সময় অন্য অবস্থা হবে।[8] (এ নিয়ে তোমাদের ঘাবড়ানোর কিছু নাই। এতে একজন মানুষ মুনাফিক হয়ে যায় না।)

হাদীসে হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মুনাফিক হয়ে গেছে, এ কথার অর্থ হলো, তিনি আশংকা করেন যে, তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন। কারণ, তিনি দেখলেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিশে তার অবস্থার যে ধরন হয়ে থাকে, সেখান থেকে উঠে চলে গিয়ে যখন স্ত্রী, সন্তান, পারিবারিক কাজ ও দুনিয়াদারিতে লেগে যান, তখন তার অবস্থা আর ঐ রকম থাকে না। হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার এ দ্বৈত অবস্থাকেই মুনাফেকী বলে আখ্যায়িত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জানিয়ে দেন যে, এ তো কোনো নিফাক নয়, আর মানুষ সর্বদা একই অবস্থার ওপর থাকার বিষয়ে দায়িত্বশীল নয়। কিছু সময় এক রকম থাকবে আবার কিছু সময় অন্য রকম থাকবে এটাই স্বাভাবিক।[9] (একজন মানুষের ঈমানও সব সময় এক রকম থাকে না। কখনো ঈমান বাড়ে আবার কখনো ঈমান কমে। আল্লাহ তা‘আলা কথা, আল্লাহর দীনের কথা জান্নাত জাহান্নামের কথা আলোচনা হলে, তখন মানুষের ঈমান বাড়ে আর যখন মানুষ দুনিয়ার কাজ কর্মে লিপ্ত হয় তখন মানুষের ঈমান কমে। আমাদের উচিত হলো, আমরা বিজ্ঞ আলিম উলামা ও সালফে সালেহীনদের মজলিশে গিয়ে তাদের থেকে কুরআনের আলোচনা ও হাদীসের আলোচনা শোনা। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, যারা বাণিজ্যিক বক্তা, মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কিচ্ছা কাহিনী, দুর্বল হাদীস, বানোয়াট হাদীস ও মিথ্যা কল্প কাহিনী দিয়ে ওয়াজ করে তাদের মজলিশে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকবে)

খলিফাতুল মুসলিমিন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যাকে দুনিয়াতে জান্নাতের সু-সংবাদ দেওয়া হয়েছে, তিনিও নিফাককে ভয় করতেন। যেমন, হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন,

دُعي عمر لجنازة فخرج فيها أو يريدها، فتعلّقتُ به فقلتُ: اجلس يا أمير المؤمنين، فإنّه من أولئك أي: من المنافقين، فقال: نشدتك الله، أنا منهم؟ قال: لا، ولا أبرئ أحداً بعدك

“একবার উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে একটি জানাযায় হাজির হতে দাওয়াত দেওয়া হলে, তিনি তাতে অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অথবা বের হওয়ার ইচ্ছা করেন। আমি তার পিছু নিয়ে তাকে বললাম! হে আমিরুল মুমিনীন আপনি বসুন! কারণ, আপনি যে লোকের জানাযায় যেতে চান সে ঐসব মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি! তুমি বলতো আমি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেন, না। তোমার পর আমি আর কাউকে এভাবে দায়মুক্ত ঘোষণা করব না”[10]

ইবন আবি মুলাইকা রহ. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ত্রিশজন সাহাবীকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছি, তারা প্রত্যেকেই নিজের নফসের ওপর নিফাকের আশংকা করেন। তাদের কেউ এ কথা বলেনি: তার ঈমান জিবরীল বা মিকাইলের ঈমানের মতো মজবুত।[11]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, কাওমের লোকদের অন্তরসমূহ ঈমান ও বিশ্বাস এবং নিফাকের কঠিন ভয়ে ভরে গেছে। তাদের ছাড়া অনেক এমন আছে যাদের ঈমান তাদের গলদেশ অতিক্রম করে নি। অথচ তারা দাবি করে তাদের ঈমান জিবরীল ও মিকাইলের ঈমানের মতো।[12]

তাদের উল্লিখিত উক্তির অর্থ এ নয় যে, তারা ঈমানের পরিপন্থী আসল নিফাক বা বড় নিফাককে ভয় করছে। বরং তারা ভয় করছে ঈমানের সাথে যে নিফাক একত্র হতে পারে তাকে। অর্থাৎ ছোট নিফাক। সুতরাং এ নেফাকের কারণে সে মুনাফিক মুসলিম হবে মুনাফিক কাফির হবে না।[13]

 কুরআন ও হাদীসে মুনাফিকদের চরিত্র

কুরআনে করীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের অসংখ্য জায়গায় মুনাফিকদের আলোচনা এসেছে। তাতে তাদের চরিত্র ও কর্মতৎপরতা আলোচনা করা হয়েছে। আর মুমিনদেরকে তাদের থেকে সতর্ক করা হয়েছে যাতে তাদের চরিত্র মুমিনরা অবলম্বন না করে। এমনকি আল্লাহ তা‘আলা তাদের নামে একটি সুরাও নাযিল করেন। মুনাফিকদের চরিত্র:

১. মুনাফিকদের অন্তর রুগ্ন ও ব্যাধিগ্রস্ত:

মুনাফিকদের অন্তর রুগ্ন ও ব্যাধিগ্রস্ত থাকে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে এরশাদ করেন,

﴿فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ فَزَادَهُمُ ٱللَّهُ مَرَضٗاۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمُۢ بِمَا كَانُواْ يَكۡذِبُونَ﴾ [البقرة: 10]

“তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১০]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, সন্দেহ, সংশয় ও প্রবৃত্তির ব্যাধি তাদের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলছে, ফলে তাদের অন্তর বা আত্মা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও নিয়তের ওপর খারাপ ও নগ্ন মানসিকতা প্রাধান্য বিস্তার করছে। ফলে তাদের অন্তর একদম হালাক বা ধ্বংসের উপক্রম। বিজ্ঞ ডাক্তাররাও এখন তার চিকিৎসা দিতে অক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ فَزَادَهُمُ ٱللَّهُ مَرَضٗاۖ “তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।”

২. মুনাফিকদের অন্তরে অধিক লোভ-লালসা:

মুনাফিকরা অধিক লোভী হয়ে থাকে। যার কারণে তারা পার্থিব জগতকে বেশি ভালোবাসে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا﴾ [الأحزاب: 32]

“হে নবীÑপতিœগণ, তোমরা অন্য কোনো নারীর মতো নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে”[সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩২]

অর্থাৎ যে ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দুর্বল থাকে, সে তার দুর্বলতার কারণে লোভী হয়ে থাকে। আর সে তার ঈমানের দুর্বলতার কারণে ইসলাম বিষয়ে সন্দেহ পোষণকারী একজন মুনাফিক। যার ফলে সে আল্লাহ তা‘আলার দেওয়া বিধানকে গুরুত্বহীন মনে করে এবং হালকা করে দেখে। আর অন্যায় অশ্লীল কাজ করাকে কোনো অন্যায় মনে করে না।[14]

৩. মুনাফিকরা অহংকারী ও দাম্ভিক:

মুনাফিকরা কখনই তাদের নিজেদের দোষত্রুটি নিজেরা দেখতে পায় না। তাই তারা নিজেদের অনেক বড় মনে করে। কারো কোনো উপদেশ তারা গ্রহণ করে না, তারা মনে করে তাদের চাইতে বড় আর কে হতে পারে? আল্লাহ তা‘আলা তাদের অহংকারী স্বভাবের বর্ণনা দিয়ে বলেন,

﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ يَسۡتَغۡفِرۡ لَكُمۡ رَسُولُ ٱللَّهِ لَوَّوۡاْ رُءُوسَهُمۡ وَرَأَيۡتَهُمۡ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسۡتَكۡبِرُونَ﴾ [المنافقون: 5]

“আর তাদেরকে যখন বলা হয় এস, আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা তাদের মাথা নাড়ে। আর তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে, অহঙ্কারবশত বিমুখ হয়ে চলে যেতে।” [সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ৫]

এ আয়াতে অভিশপ্ত মুনাফিকদের বিষয়ে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ يَسۡتَغۡفِرۡ لَكُمۡ رَسُولُ ٱللَّهِ لَوَّوۡاْ رُءُوسَهُمۡ وَرَأَيۡتَهُمۡ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسۡتَكۡبِرُونَ “আর তাদেরকে যখন বলা হয় এস, আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা তাদের মাথা নাড়ে। আর তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে, অহঙ্কারবশত বিমুখ হয়ে চলে যেতে”

অর্থাৎ তাদের যা পালন করতে বলা হলো, অহংকার ও অহমিকা বশত বা নিকৃষ্ট মনে করে তারা তা পালন করা হতে বিরত থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তি দিয়ে বলেন,

﴿سَوَآءٌ عَلَيۡهِمۡ أَسۡتَغۡفَرۡتَ لَهُمۡ أَمۡ لَمۡ تَسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ لَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ٦﴾ [المنافقون: ٦]

“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা কর অথবা না কর, উভয়টি তাদের ক্ষেত্রে সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। অবশ্যই আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।” [সূরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ৬]

৪. মুনাফিকদের চরিত্র হলো, আল্লাহ তা‘আলার আয়াতসমূহের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَحۡذَرُ ٱلۡمُنَٰفِقُونَ أَن تُنَزَّلَ عَلَيۡهِمۡ سُورَةٞ تُنَبِّئُهُم بِمَا فِي قُلُوبِهِمۡۚ قُلِ ٱسۡتَهۡزِءُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ مُخۡرِجٞ مَّا تَحۡذَرُونَ﴾ [التوبة: 64]

“মুনাফিকরা ভয় করে যে, তাদের বিষয়ে এমন একটি সূরা অবতীর্ণ হবে, যা তাদের অন্তরের বিষয়গুলি জানিয়ে দেবে। বল, ‘তোমরা উপহাস করতে থাক। নিশ্চয় আল্লাহ বের করবেন, তোমরা যা ভয় করছ”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬৪]

আয়াতের ব্যাখ্যা: মুনাফিকরা সব সময় এ আশংকা করত যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে যা আছে, তা মুমিনদের নিকট একটি সূরা নাযিল করে জানিয়ে দিবেন। তাদের এ আশংকার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন। কারো মতে, আল্লাহ তা‘আলা তার রাসূলের ওপর এ আয়াত নাযিল করেন, কারণ, মুনাফিকরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো দোষ বর্ণনা, তার বা মুসলিমদের কোনো কর্মের সমালোচনা করত, তখন তারা নিজেরা বলাবলি করত, আল্লাহ আমাদের গোপন বিষয় প্রকাশ করে না দেয়। তাদের কথার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা‘আলা তার নবীকে বলেন, আপনি তাদের ধমক ও হুমকি দিয়ে বলুন, ﴿ٱسۡتَهۡزِءُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ مُخۡرِجٞ مَّا تَحۡذَرُونَ “তোমরা উপহাস করতে থাক। নিশ্চয় আল্লাহ বের করবেন, তোমরা যা ভয় করছ”

৫. মুমিনদের সাথে বিদ্রূপ:

মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে বিদ্রূপ করত। তারা যখন মুমিনদের সাথে মিলিত হত, তখন তারা মুমিনদের সাথে প্রকাশ করত যে, তারা ঈমানদার আবার যখন তারা তাদের কাফির বন্ধুদের সাথে মিলিত হত, তখন তারা তাদের সাথে ছির অন্তরঙ্গ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذَا لَقُواْ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قَالُوٓاْ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوۡاْ إِلَىٰ شَيَٰطِينِهِمۡ قَالُوٓاْ إِنَّا مَعَكُمۡ إِنَّمَا نَحۡنُ مُسۡتَهۡزِءُونَ ١٤ ٱللَّهُ يَسۡتَهۡزِئُ بِهِمۡ وَيَمُدُّهُمۡ فِي طُغۡيَٰنِهِمۡ يَعۡمَهُونَ﴾ [البقرة: 14-15]

“আর যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এবং যখন গোপনে তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে আছি। আমরা তো কেবল উপহাসকারী’। আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘোরার অবকাশ দেন।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪, ১৫]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, মুনাফিকদের দু’টি চেহারা: একটি চেহারা দ্বারা তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাত করত, আর আরেকটি চেহারা দ্বারা তারা তাদের মুনাফিক (কাফের) ভাইদের সাথে সাক্ষাত করত। তাদের দু’টি মুখ থাকত, একটি দ্বারা তারা মুসলিমদের সাতে মিলিত হত, আর অপর চেহারা তাদের অন্তরে লুকায়িত গোপন তথ্য সম্পর্কে সংবাদ দিত।

তারা কিতাব ও সুন্নাহ এবং উভয়ের অনুসারীদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে ফিরে যায় এবং তারা তাদের নিকট যা আছে তার ওপর সন্তুষ্ট থাকে। আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল কৃত ওহীর বিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকে অস্বীকার করত। তারা মনে করত, তারাই বড় জ্ঞানী। হে রাসূল আপনি তাদের বলে দিন, তাদের জ্ঞান যতই থাকুক না কেন, তা তাদের কোনো উপকারে আসে না, বরং তা তাদের অন্যায় অনাচারকে আরো বৃদ্ধি করে। আর আপনি কখনোই তাদের ওহীর প্রতি আনুগত্য করতে দেখবেন না। তাদের আপনি দেখবেন ওহীর প্রতি বিদ্রূপ কারী। আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তাদের বিদ্রূপের বদলা দেবেন। ﴿ٱللَّهُ يَسۡتَهۡزِئُ بِهِمۡ وَيَمُدُّهُمۡ فِي طُغۡيَٰنِهِمۡ يَعۡمَهُونَ “আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘোরার অবকাশ দেন।” তারা তাদের কু-কর্মে আনন্দ ভোগ করতে থাকবে।

৬. মানুষকে আল্লাহর রাহে খরচ করা হতে বিরত রাখা:

মুনাফিকরা মানুষকে আল্লাহর রাখে খরচ করাকে অনর্থক মনে করে। তাই তারা মানুষকে আল্লাহর রাহে খরচ করতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هُمُ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُواْ عَلَىٰ مَنۡ عِندَ رَسُولِ ٱللَّهِ حَتَّىٰ يَنفَضُّواْۗ وَلِلَّهِ خَزَآئِنُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ لَا يَفۡقَهُونَ﴾ [المنافقون: 7]

“তারাই বলে, যারা আল্লাহর রাসূলের কাছে আছে তোমরা তাদের জন্য খরচ করো না, যতক্ষণ না তারা সরে যায়। আর আসমানসমূহ ও যমিনের ধনÑভাণ্ডার তো আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না। [সূরা আল মুনাফিকূন, আয়াত: ৭]

যায়েদ ইবন আরকাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«كنت في غزاة، فسمعت عبدالله بن أُبيّ يقول: لا تنفقوا على من عند رسول الله حتى ينفضّوا من حوله، ولئن رجعنا من عنده ليخرجنّ الأعزّ منها الأذلّ، فذكرت ذلك لعمّي أو لعمر، فذكره للنبي فدعاني فحدّثته، فأرسل رسول الله إلى عبد الله بن أُبيّ وأصحابه فحلفوا ما قالوا، فكذّبني رسول الله وصدّقه،فأصابني همّ لم يصبني مثلُه قطّ، فجلست في البيت فقال لي عمّي: ما أردت إلى أن كذبك رسول الله ومقتك، فأنزل الله تعالى فبعث إليّ النبي فقرأ إِنَّ الله قَدْ صَدقَك يَا زْيُد»

“আমি একদা একটি যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই কে বলতে শুনি সে বলে, তোমরা মুহাম্মদের আশ পাশে যে সব মুমিনরা রয়েছে, তাদের জন্য খরচ করো না, যাতে তারা তাকে ছেড়ে চলে যায়। আর যদি তারা মদিনায় ফিরে আসে তাহলে মদিনার সম্মানী লোকেরা এ সব নিকৃষ্ট লোকদের বহিষ্কার করবে। আমি বিষয়টি আমার চাচা অথবা উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বললে, তারা বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আলোচনা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাকে বিস্তারিত বিষয়টি জানালাম। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ও তার সাথীদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলে, তারা শপথ করে বলল, আমরা এ ধরনের কোনো কথা বলি নাই। তাদের কথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কথা বিশ্বাস করল, আর আমাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করল। এরপর আমি এত চিন্তিত হলাম ইতোপূর্বে আর কোনো দিন আমি এত চিন্তিত হই নাই। আমি লজ্জিত হয়ে ঘরে বসে থাকতাম। লজ্জায় ঘর থেকে বের হতাম না। তখন আমার চাচা আমাকে বলল, আমরা কখনো চাইছিলাম না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করুক বা তোমাকে অস্বীকার করুক। তারপর আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত-

﴿إِذَا جَآءَكَ ٱلۡمُنَٰفِقُونَ قَالُواْ نَشۡهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُۥ وَٱللَّهُ يَشۡهَدُ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ لَكَٰذِبُونَ﴾ [المنافقون: 1]

“যখন তোমার কাছে মুনফিকরা আসে, তখন বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, অবশ্যই তুমি তার রাসূল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, অবশ্যই মুনাফিকরা মিথ্যবাদী” নাযিল করেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে পাঠান এবং আমাকে এ আয়াত পাঠ করে শোনান এবং বলেন, হে যায়েদ! আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে সত্যবাদী বলে আখ্যায়িত করেন।”

৭. মুনাফিকদের মূর্খতা ও মুমিনদের মূর্খ বলে আখ্যায়িত করা:

মুনাফিকরা নিজেরা মূর্খ এ জিনিষটি তাদের চোখে ধরা পড়তো না। কিন্তু তারা মুমিনদের মূর্খ বলে আখ্যায়িত করত। এ কারণেই তাদের যখন মুমিনদের ন্যায় ঈমান আনার জন্য বলা হত, তখন তারা বলত, মুমিনরা-তো বুঝে না, তারা মূর্খ, তাই তারা ঈমান এনেছে। আমরাতো মূর্খ নই, আমরা শিক্ষিত আমরা কেন ঈমান আনব? আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিষয়ে বলেন,

﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُۗ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَٰكِن لَّا يَعۡلَمُونَ﴾ [البقرة: 13]

“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা ঈমান আন যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে’, তারা বলে, ‘আমরা কি ঈমান আনব যেমন নির্বোধরা ঈমান এনেছে’? জেনে রাখ, নিশ্চয় তারাই নির্বোধ; কিন্তু তারা জানে না”[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, যারা কুরআন ও হাদীসের আনুগত্য করে তারা তাদের নিকট নির্বোধ, বোকা। তাদের জ্ঞান বুদ্ধি বলতে কিছুই নাই। আর যারা ইসলামী শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চায় তারা তাদের নিকট সেই গাধার মত যে বোঝা বহন করে। তার কিতাব বা ব্যবসায়ীর মালামাল দ্বারা তার কোনো লাভ হয় না। সে নিজে কোনো প্রকার উপকার লাভ করতে পারে না। আর যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং তার আদেশের আনুগত্য করে তারা হলো, তাদের নিকট নির্বোধ, মূর্খ। তাই তারা তাদের মজলিশে তার উপস্থিতিকে অপছন্দ করত ও তার দ্বারা তারা তাদের অযাত্রা হতো বলে বিশ্বাস করত।[15]

৮. কাফিরদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব:

মুনাফিকরা কাফিরদেরকে তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত। মুমিনদের তারা কখনোই তাদের বন্ধু বানাত না। তারা মনে করত কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করলে তারা ইজ্জত সম্মানের অধিকারী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿بَشِّرِ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ بِأَنَّ لَهُمۡ عَذَابًا أَلِيمًا ١٣٨ ٱلَّذِينَ يَتَّخِذُونَ ٱلۡكَٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۚ أَيَبۡتَغُونَ عِندَهُمُ ٱلۡعِزَّةَ فَإِنَّ ٱلۡعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعٗا﴾ [النساء: 138، 139]

“মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, নিশ্চয় তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। যারা মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি তাদের কাছে সম্মান চায়? অথচ যাবতীয় সম্মান আল্লাহর”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৮, ১৩৯]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা তার নবীকে বলেন, হে মুহাম্মদ! بَشِّرِ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ তুমি ঐ সব মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও, যে সব মুনাফিকরা আমার দীন অস্বীকারকারী ও বেঈমানদের সাথে বন্ধুত্ব করে অর্থাৎ মুমিনদের বাদ দিয়ে তারা কাফিরদের তাদের সহযোগী ও বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি আমার ওপর অবিশ্বাসী বেঈমানদের সাথে বন্ধুত্ব করার মাধ্যমে তাদের নিকট থেকে শক্তি, সামর্থ্য, সম্মান ও সাহায্য তালাশ করে?। তারা কি জানে না? ইজ্জত, সম্মান, শক্তি সামর্থ্য-তো সবই আল্লাহর জন্য। أَيَبۡتَغُونَ عِندَهُمُ ٱلۡعِزَّةَ “তারা কি তাদের কাছে সম্মান চায়?” অর্থাৎ তারা কি তাদের নিকট ইজ্জত তালাশ করে? আর যারা নিকৃষ্ট ও সংখ্যালঘু কাফিরদের থেকে সম্মান পাওয়ার আশায় তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কেন মুমিনদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে না? তারা যদি মুমিনদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত, তাহলে তারা ইজ্জত, সম্মান ও সহযোগিতা আল্লাহর নিকটই তালাশ করত। কারণ, ইজ্জত সম্মানের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ। যাবতীয় ইজ্জত সম্মান কেবলই আল্লাহর। আল্লাহ বলেন, فَإِنَّ ٱلۡعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعٗا “যাবতীয় সম্মান আল্লাহর” তিনি যাকে চান ইজ্জত দেন, আর যাকে চান বে-ইজ্জত করেন।[16]

৯. তারা মুমিনদের পরিণতি দেখার অপেক্ষায় থাকে:

মুনাফিকরা সব সময় পিছনে থাকত, কারণ, তারা অপেক্ষা করত, যদি বিজয় মুমিনদের হয়, তাহলে তারা মুমিনদের সাথে মিলে যায় আর যদি বিজয় কাফিরদের হয়, তখন কাফিরদের পক্ষে চলে যায়। তাদের এ ধরনের অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمۡ فَإِن كَانَ لَكُمۡ فَتۡحٞ مِّنَ ٱللَّهِ قَالُوٓاْ أَلَمۡ نَكُن مَّعَكُمۡ وَإِن كَانَ لِلۡكَٰفِرِينَ نَصِيبٞ قَالُوٓاْ أَلَمۡ نَسۡتَحۡوِذۡ عَلَيۡكُمۡ وَنَمۡنَعۡكُم مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۚ فَٱللَّهُ يَحۡكُمُ بَيۡنَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ وَلَن يَجۡعَلَ ٱللَّهُ لِلۡكَٰفِرِينَ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ سَبِيلًا﴾ [النساء: 41]

“যারা তোমাদের ব্যাপারে (অকল্যাণের) অপেক্ষায় থাকে, অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি তোমাদের বিজয় হয়, তবে তারা বলে, ‘আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না’? আর যদি কাফিরদের আংশিক বিজয় হয়, তবে তারা বলে, ‘আমরা কি তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করি নি এবং মুমিনদের কবল থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করি নি’? সুতরাং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে বিচার করবেন। আর আল্লাহ কখনো মুমিনদের বিপক্ষে কাফিরদের জন্য পথ রাখবেন না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪১]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে মুমিনগণ! ٱلَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمۡ যারা তোমাদের পরিণতি জানার জন্য অপেক্ষা করে। فَإِن كَانَ لَكُمۡ فَتۡحٞ مِّنَ ٱللَّهِ “যদি আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের বিজয় হয়।” অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যদি তোমাদের দুশমনদের ওপর তোমাদের বিজয় দান করে এবং তোমরা গণিমতের মাল লাভ কর, তখন তারা তোমাদের বলবে, أَلَمۡ نَكُن مَّعَكُمۡ আমরা কি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করি নি এবং তোমাদের সাথে লড়াই করি নি? তোমরা আমাদেরকে গণিমতের মাল হতে আমাদের ভাগ দিয়ে দাও! কারণ, আমরা তোমাদের সাথে যুদ্ধে শরিক ছিলাম। অথচ তারা তাদের সাথে যুদ্ধে শরিক ছিল না তারা জান প্রাণ চেষ্টা করত পরাজয় যাতে মুমিনদের ললাটে থাকে। وَإِن كَانَ لِلۡكَٰفِرِينَ نَصِيبٞ আর যদি বিজয় তোমাদের কাফির দুশমনদের হয়ে থাকে এবং তারা তোমাদের থেকে ধন-সম্পদ লাভ করে, তখন এসব মুনাফিকরা কাফিরদের গিয়ে বলবে, أَلَمۡ نَسۡتَحۡوِذۡ عَلَيۡكُمۡ আমরা কি তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করি নি? যার ফলে তোমরা মুমিনদের ওপর বিজয় লাভ করছ! তাদেরকে আমরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করা হতে বাধা দিতাম। আর তাদের আমরা বিভিন্নভাবে অপমান, অপদস্থ করতাম। যার ফলে তারা তোমাদের আক্রমণ করা হতে বিরত থাকে এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করে। আর এ সুযোগে তোমরা তোমাদের দুশমনদের ওপর বিজয় লাভ কর। فَٱللَّهُ يَحۡكُمُ بَيۡنَكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ আল্লাহ তা‘আলাই তোমাদের মাঝে ও মুনাফিকদের মাঝে কিয়ামতের দিন ফায়সালা করবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে কিয়ামতের দিন ফায়সালা করবেন। যারা ঈমানদার তাদের আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত দান করবেন, আর যারা মুনাফিক তাদের তিনি কাফির বন্ধুদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।[17]

১০. মুনাফিকদের চরিত্র হলো, আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়া ও ইবাদতে অলসতা করা:

মুনাফিকরা তাদের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহকে ধোঁকা দেয় এবং সালাতে তারা অলসতা করে। তাদের সালাত হলো, লোক দেখানো। তারা আল্লাহর ভয়ে ইবাদত করে না। তারা ইবাদত করে মানুষের ভয়ে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلٗا﴾ [النساء: 142]

“নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। অথচ তিনি তাদের ধোঁকা (-এর জবাব) দান কারী। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলস-ভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪২]

আয়াতের ব্যাখ্যা: মুনাফিকরা তাদের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহ তা‘আলাকে ধোঁকা দেয়। কারণ, তাদের নিফাকই তাদের জান-মাল ও ধন-সম্পদকে মুমিনদের হাত থেকে রক্ষা করে থাকে। মুখে ইসলাম ও ঈমান প্রকাশ করার কারণে, আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নিষেধ করা হয়। অথচ, আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে তারা যে কুফুরকে লুকিয়ে রাখছেন তা জানেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে না করেন। এর দ্বারা তিনি দুনিয়াতে তাদের সুযোগ দেন। আর যখন কিয়ামতের দিন আসবে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে এর বদলা নিবেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তারা অন্তরে যে কুফরকে গোপন করত তার বিনিময়ে তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।

আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ “আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলস-ভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায়” মুনাফিকরা আল্লাহ তা‘আলা যে সব নেক আমল ও ইবাদত বন্দেগী মুমিনদের ওপর ফরয করেছেন, তার কোনো একটি নেক আমল মুনাফিকরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করে না। কারণ, কীভাবে করবে তারা তো আখিরাত, পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম কোনো কিছুই বিশ্বাস করে না। তারা প্রকাশ্যে যে সব আমল করে থাকে তা কেবলই নিজেদের রক্ষা করার জন্যই করে থাকে অথবা মুমিনদের থেকে বাঁচার জন্য করে থাকে। যাতে তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে না পারে এবং তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নিতে না পারে। তাই তারা যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসতা করে দাঁড়ায়। সালাতে দাঁড়িয়ে তারা এদিক সেদিক তাকায় এবং নড়াচড়া করে। সালাতে উপস্থিত হয়ে তারা মুমিনদের দেখায় যে, আমরা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত অথচ তারা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, তারা সালাত আদায় করা যে ফরয বা ওয়াজিব তাতে বিশ্বাস করে না। তাই তাদের সালাত হলো, লোক দেখানো সালাত, আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার সালাত নয়।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী﴿وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلٗا “এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে।” এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কি তারা আল্লাহর যিকির কম করে বেশি করে না? উত্তরে বলা হবে, এখানে তুমি আয়াতের অর্থ যা বুঝেছ, তা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। আয়াতের অর্থ হলো, তারা একমাত্র লোক দেখানোর জন্যই আল্লাহর যিকির করে, যাতে তারা তাদের নিজেদের থেকে হত্যা, জেল ও মালামাল ক্রোক করাকে প্রতিহত করতে পারে। তাদের যিকির আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করা বা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য নয়। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাকে কম বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ, তারা তাদের যিকির দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও সাওয়াব লাভ করাকে উদ্দেশ্য বানায়নি। সুতরাং তাদের আমল যতই বেশি হোক না কেন তা বাস্তবে মরীচিকার মতোই। যা বাহ্যিক দিক দিয়ে দেখতে পানি বলে মনে হয় কিন্তু বাস্তবে তা পানি নয়।[18]

১১. দ্বিমুখী নীতি ও সিদ্ধান্ত হীনতা:

মুনাফিকরা দ্বৈতনীতির হয়ে থাকে। তাদের বাহ্যিক এক রকম আবার ভিতর আরেক রকম। তারা যখন মুমিনদের সাথে মিলে তখন তারা যেন পাক্কা ঈমানদার, আবার যখন কাফিরদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা কাট্টা কাফির। তাদের এ দ্বি-মুখী নীতির কারণে তাদের কেউ বিশ্বাস করে না। সবার কাছেই তারা ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়। আল্লাহ তা‘আলা তাদের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে বলেন,

﴿مُّذَبۡذَبِينَ بَيۡنَ ذَٰلِكَ لَآ إِلَىٰ هَٰٓؤُلَآءِ وَلَآ إِلَىٰ هَٰٓؤُلَآءِۚ وَمَن يُضۡلِلِ ٱللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُۥ سَبِيلٗا﴾

“তারা এর মধ্যে দোদুল্যমান, না এদের দিকে আর না ওদের দিকে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোনো পথ পাবে না”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৩]

অর্থাৎ মুনাফিকরা তাদের দীনের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে। তারা সঠিকভাবে কোনো কিছুকেই বিশ্বাস করতে পারে না। তারা বুঝে শুনে মুমিনদের সাথেও নয় আবার না বুঝে কাফিরদের সাথেও নয়; বরং তারা উভয়ের মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে।[19]

আব্দুল্লাহ উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَثَلُ المُنَافِقِ كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائرَِة بَيَن الْغَنَمَيْن تَعِير فِي هَذِهِ مَرَّةً وَفِي هَذِهِ مَرَّةً»

“মুনাফিকদের উপমা ছাগলের পালের মাঝে দড়ি ছাড়া বকরীর মত। একবার এটিকে গুঁতা দেয় আবার এটিকে গুঁতা দেয়।[20]

ইমাম নববী রহ. বলেন, العائرة শব্দের “সিদ্ধান্তহীন লোক, সে জানেনা দু’টির কোনোটির পিছু নিবে। আর تعير “ঘুরাঘুরি করা, ছুটাছুটি করা।[21] মুনাফিকরাও অনুরূপ। তারা সর্বদা সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগতে থাকে। তাদের চিন্তা ও পেরেশানির কোনো অন্ত নাই। দুনিয়াতে এটি তাদের জন্য বড় ধরনের আযাব। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এ ধরনের ‘আযাব থেকে হেফাযত করুন।

১২. মুমিনদের ধোঁকা দেওয়া:

মুনাফিকরা মনে করে তারা আল্লাহ তা‘আলা ও মুমিনদের ধোঁকা দিয়ে থাকে, প্রকৃত পক্ষে তারা কাউকেই ধোঁকা দেয় না। তারা নিজেরাই তাদের নিজেদের ধোঁকা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَمَا يَخۡدَعُونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمۡ وَمَا يَشۡعُرُونَ﴾ [البقرة: 9]

“তারা আল্লাহকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে (বলে মনে করে)। অথচ তারা নিজদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে এবং তারা তা অনুধাবন করে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৯]

আয়াতের ব্যাখ্যা: মুনাফিকরা তাদের রব ও মুমিনদের ধোঁকা দিত। তারা তাদের মুখে প্রকাশ করত যে, আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, কিন্তু তাদের অন্তরে তারা অবিশ্বাস, অস্বীকার ও সন্দেহ-সংশয়কে গোপন করত, যাতে তারা তাদের জন্য অবধারিত শাস্তি- হত্যা, বন্দি করা ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযান ইত্যাদি হতে মুক্তি পায়। তারা মুখের ঈমান ও স্বীকার করাকে নিজেদের বাঁচার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। অন্যথায় তাদের ওপর ঐ শাস্তি বর্তাবে যা অস্বীকারকারী কাফিরদের ওপর বর্তায়। আর এটাই হলো, মুমিনদের ও তাদের রবকে ধোঁকা দেওয়া।[22]

১৩. গাইরুল্লাহর নিকট বিচার ফায়সালা নিয়ে যাওয়া:

মুনাফিকদের অন্যতম স্বভাব হলো, তারা বিচার ফায়সালার জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যেত না। তারা তাদের কাফির বন্ধুদের নিকট বিচার ফায়সালার জন্য যেত। যাতে তারা তাদের প্রতিপক্ষকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করতে সক্ষম হয়। কারণ, তারা জানতো যদি ন্যায় বিচার করা হয়, তখন ফায়সালা তাদের বিপক্ষে যাবে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই ন্যায় বিচার ও ইনসাফের বাহিরে যেতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦۖ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَٰلَۢا بَعِيدٗا ٦٠ وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَإِلَى ٱلرَّسُولِ رَأَيۡتَ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودٗا﴾ [النساء: 60ـ61]

“তুমি কি তাদেরকে দেখ নি, যারা দাবী করে যে, নিশ্চয় তারা ঈমান এনেছে তার ওপর, যা নাযিল করা হয়েছে তোমার প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে তোমার পূর্বে। তারা তাগূতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা আস যা আল্লাহ নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে’, তখন মুনাফিকদেরকে দেখবে তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাচ্ছে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬০, ৬১]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, যখন মুনাফিকদের আল্লাহ তা‘আলার সুস্পষ্ট ওহীর বিধান, আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের দিকে বিচার ফায়সালার জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তারা পলায়ন করে এবং তুমি তাদের দেখতে পাবে, তারা এ থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ। আর যখন তুমি তাদের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারবে, তখন তুমি দেখতে পাবে তাদের মধ্যে ও বাস্তবতার মধ্যে বিশাল তফাৎ। তারা কোনো ভাবেই আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ ওহীর আনুগত্য করে না।[23]

১৪. মুমিনদের মাঝে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা:

মুনাফিকরা চেষ্টা করে কীভাবে মুমিনদের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করা যায়। তারা সব সময় মুমিনদের মাঝে অনৈক্য, মতবিরোধ ও ইখতেলাফ লাগিয়ে রাখে। তারা একজনের কথা আরেক জনের নিকট গিয়ে বলে। চোগলখোরি করে বেড়ায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَوۡ خَرَجُواْ فِيكُم مَّا زَادُوكُمۡ إِلَّا خَبَالٗا وَلَأَوۡضَعُواْ خِلَٰلَكُمۡ يَبۡغُونَكُمُ ٱلۡفِتۡنَةَ وَفِيكُمۡ سَمَّٰعُونَ لَهُمۡۗ وَٱللَّهُ عَلِيمُۢ بِٱلظَّٰلِمِينَ﴾ [التوبة: 47]

“যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত, তবে তোমাদের মধ্যে ফ্যাসাদই বৃদ্ধি করত এবং তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত, তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির অনুসন্ধানে। আর তোমাদের মধ্যে রয়েছে তাদের কথা অধিক শ্রবণকারী, আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৪৭]

অর্থাৎ ﴿لَوۡ خَرَجُواْ فِيكُم مَّا زَادُوكُمۡ إِلَّا خَبَالٗ যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে বের হত, তবে তারা তোমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকারে আসত না। কারণ, তোমাদের মধ্যে ফ্যাসাদই বৃদ্ধি করত। কারণ, তারা হলো, কাপুরুষ ও অপদস্থ সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে যুদ্ধ করা ও কাফিরদের মোকাবেলা করার মত কোনো সাহস তাদের নাই। ﴿وَلَأَوۡضَعُواْ خِلَٰلَكُمۡ يَبۡغُونَكُمُ ٱلۡفِتۡنَةَ আর তারা তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত, একবার এদিক যেত, আবার ওদিক যেত, একজনের কথা আরেক জনের নিকট গিয়ে বলত, চোগলখোরি করত, বিদ্বেষ চড়াত এবং তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির অনুসন্ধানে থাকত যা তোমাদের জন্য অকল্যাণ ও অশান্তি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনত না। وَفِيكُمۡ سَمَّٰعُونَ لَهُمۡۗ আর তোমাদের মধ্যে রয়েছে এমন লোক, যারা তাদের কথা অধিক শ্রবণকারী, অর্থাৎ তাদের আনুগত্যকারী, তাদের কথাকে পছন্দকারী ও তাদের হিতাকাংখি। যদিও তারা তাদের প্রকৃত অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে তারা অবগত নয়। ফলে এ সব অপকর্মের কারণে মুমিনদের মাঝে বড় ধরনের ফ্যাসাদ ও বিবাদ তৈরি হতে পারে। যা তোমাদের পরাজয়ের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালান করবে।[24]

১৫. মিথ্যা শপথ করা, কাপুরুষতা ও ভীরুতা:

মুনাফিকরা অধিক হারে মিথ্যা শপথ করে। তাদের যখন কোনো অপকর্মের জন্য জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তারা তা সাথে সাথে অস্বীকার করে এবং তারা তাদের নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা শপথ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَيَحۡلِفُونَ بِٱللَّهِ إِنَّهُمۡ لَمِنكُمۡ وَمَا هُم مِّنكُمۡ وَلَٰكِنَّهُمۡ قَوۡمٞ يَفۡرَقُونَ ٥٦ لَوۡ يَجِدُونَ مَلۡجَ‍ًٔا أَوۡ مَغَٰرَٰتٍ أَوۡ مُدَّخَلٗا لَّوَلَّوۡاْ إِلَيۡهِ وَهُمۡ يَجۡمَحُونَ ٥٧﴾ [التوبة: ٥٦، ٥٧]

“আর তারা আল্লাহর কসম করে যে, নিশ্চয় তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তারা এমন কওম যারা ভীত হয়। যদি তারা কোনো আশ্রয়স্থল, বা কোনো গুহা অথবা লুকিয়ে থাকার কোনো প্রবেশস্থল পেত, তবে তারা সেদিকেই দৌড়ে পালাত। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৫৬, ৫৭]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে মুনাফিকদের আকুতি, তাদের হৈ-চৈ ও তৎপরতা সম্পর্কে জানিয়ে দিয়ে বলেন, وَيَحۡلِفُونَ بِٱللَّهِ إِنَّهُمۡ لَمِنكُمۡ আর তারা আল্লাহর নামে কঠিন কসম করে বলে যে, নিশ্চয় তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত, অথচ বাস্তবতা হলো, وَمَا هُم مِّنكُمۡ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং وَلَٰكِنَّهُمۡ قَوۡمٞ يَفۡرَقُونَ তারা হলো এমন এক সম্প্রদায় যারা ভীরু। আর মুমীনরা হলো সাহসী বীর, তারা কখনোই ভয় পায় না। তাদের ভয়ই তাদেরকে শপথ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।

لَوۡ يَجِدُونَ مَلۡجَا যদি তারা কোনো আশ্রয়স্থল, বা مَغَٰرَٰتٍ কিল্লা পেত যেখানে গিয়ে তারা আত্মরক্ষা করতে পারত, বা مُدَّخَلٗا কোনো পাহাড়ের গুহা অথবা যমিনে লুকিয়ে থাকার কোনো প্রবেশস্থল বা গর্ত পেত, তবে তারা সেদিকেই দৌড়ে পালাত। তারা কখনোই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করত না। আল্লাহ বলেন, لَّوَلَّوۡاْ إِلَيۡهِ وَهُمۡ يَجۡمَحُونَ অর্থাৎ তারা তোমাদের রেখে সে আশ্রয়স্থলের দিকে দৌড়ে পালাত। কারণ, তারা যে তোমাদের সাথে মিলিত হয়, তা তোমাদের ভালোবাসায় নয় বরং বাধ্য হয়ে। বাস্তবে তারা চায় যে, যদি তোমাদের সাথে না মিলে থাকতে পারত! কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রয়োজনের জন্য আলাদা বিধান থাকে। অর্থাৎ তাদের বিষয়ে সব কিছু জানার পরও তোমরা যে তাদের সাথে যুদ্ধ কর না বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নাও না, তা একটি বৃহত্তর স্বার্থের দিক বিবেচনা ও একটি বিশেষ প্রয়োজনকে সামনে রেখে। অন্যথায় তাদের অপরাধ কাফির ও মুশরিকদের চেয়েও মারাত্মক। এ কারণে তারা সব সময় দুশ্চিন্তা, সিদ্ধান্তহীনতা ও পেরেশানিতে থাকে। আর ইসলাম ও মুসলিমরা সব সময় ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করে থাকেন। আর যখনই মুসলিমরা খুশি হয়, তা তাদের বিরক্তির কারণ হয়। তারা সব সময় পছন্দ করে, যাতে তোমাদের সাথে মিলতে না হয়। তাই আল্লাহ বলেন, ﴿لَوۡ يَجِدُونَ مَلۡجَا أَوۡ مَغَٰرَٰتٍ أَوۡ مُدَّخَلٗا لَّوَلَّوۡاْ إِلَيۡهِ وَهُمۡ يَجۡمَحُونَ অর্থাৎ যদি তারা কোনো আশ্রয়স্থল, বা কোনো গুহা অথবা লুকিয়ে থাকার কোনো প্রবেশস্থল পেত, তবে তারা সেদিকেই দৌড়ে পালাত।[25]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَإِذَا رَأَيۡتَهُمۡ تُعۡجِبُكَ أَجۡسَامُهُمۡۖ وَإِن يَقُولُواْ تَسۡمَعۡ لِقَوۡلِهِمۡۖ كَأَنَّهُمۡ خُشُبٞ مُّسَنَّدَةٞۖ يَحۡسَبُونَ كُلَّ صَيۡحَةٍ عَلَيۡهِمۡۚ هُمُ ٱلۡعَدُوُّ فَٱحۡذَرۡهُمۡۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُۖ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ﴾ [المنافقون: 4]

“আর যখন তুমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবে, তখন তাদের শরীর তোমাকে মুগ্ধ করবে। আর যদি তারা কথা বলে, তুমি তাদের কথা (আগ্রহ নিয়ে) শুনবে। তারা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া কাঠের মতোই। তারা মনে করে প্রতিটি আওয়াজই তাদের বিরুদ্ধে। এরাই শত্রু, অতএব এদের সম্পর্কে সতর্ক হও। আল্লাহ এদেরকে ধ্বংস করুন। তারা কীভাবে সত্য থেকে ফিরে যাচ্ছে। [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৪]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, দেহের দিক দিয়ে তারা খুব সুন্দর, মুখের দিক দিয়ে তারা খুব সাহিত্যিক, কথার দিক দিয়ে তার খুব ভদ্র, অন্তরের দিক দিয়ে তারা সর্বাধিক খবিস নাপাক ও মনের দিক দিয়ে খুবই দুর্বল। তারা খাড়া কাঠের মত খাড়া করা, যাতে কোনো ফল নাই। গাছগুলোকে জড়ের থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, ফলে সে গুলো একটি দালানের সাথে খাড়া করে রাখা হয়েছে, যাতে পথচারীরা পা পৃষ্ট না করে।[26]

১৬. তারা যা করে নি তার ওপর তাদের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করত:

মুনাফিকরা যে কাজ করে না তার ওপর তাদের কোনো ভৎসনা মানতে রাজি না। এমনটি তারা কাজ না করে সে কাজের প্রশংসা শুনতে চায়। আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবান্তর চাহিদার নিন্দা করে বলেন,

 ﴿لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ فَلَا تَحۡسَبَنَّهُم بِمَفَازَةٖ مِّنَ ٱلۡعَذَابِۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ﴾ [آل عمران: 188]

“যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করে নি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে আযাব থেকে মুক্ত মনে করো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৮]

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«إن رجالا من المنافقين على عهد رسول الله كان إذا خرج رسول الله إلى الغزو تخلّفوا عنه، وفرحوا بمقعدهم خلاف رسول الله فإذا قدم رسول الله اعتذروا إليه، وحلفوا وأحبّوا أن يحمدوا بما لم يفعلوا، فنزلت: » ﴿لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ...﴾

“মুনাফিকদের একটি জামা‘আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধে বের হত, তখন তারা যুদ্ধে যাওয়া হতে বিরত থাকতো। আর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না গিয়ে আত্ম-তৃপ্তিতে ভুগত। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যুদ্ধ হতে ফিরে আসতো, তখন তারা তার নিকট গিয়ে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করিয়ে অপারগতা প্রকাশ করত এবং তারা মিথ্যা শপথ করত। আর তারা পছন্দ করত, যাতে তারা যে যুদ্ধে যায়নি তার জন্য যেন তাদের প্রশংসা করা হয়। তারপর আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ﴿لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَفۡرَحُونَ بِمَآ أَتَواْ وَّيُحِبُّونَ أَن يُحۡمَدُواْ بِمَا لَمۡ يَفۡعَلُواْ... “যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশী হয় এবং যা তারা করে নি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে...।[27]

১৭. মুনাফিকরা নেক আমলসমূহের দুর্নাম করত:

মুনাফিকরা মুসলিমদের ভালো কাজগুলোকে মানুষের সামনে খারাপ করে তুলে ধরত। যতই ভালো কাজই হোক না কেন তাতে মুনাফিকরা তাদের স্বার্থ খুঁজত। যদি তাদের স্বার্থ হাসিল হত তখন তারা চুপ থাকতো আর যখন তাদের হীন স্বার্থ হাসিল না হত তখন তারা বদনাম করা আরম্ভ করত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُم مَّن يَلۡمِزُكَ فِي ٱلصَّدَقَٰتِ فَإِنۡ أُعۡطُواْ مِنۡهَا رَضُواْ وَإِن لَّمۡ يُعۡطَوۡاْ مِنۡهَآ إِذَا هُمۡ يَسۡخَطُونَ﴾ [التوبة: 58]

“আর তাদের মধ্যে কেউ আছে, যে সদকা বিষয়ে তোমাকে দোষারোপ করে। তবে যদি তাদেরকে তা থেকে দেওয়া হয়, তারা সন্তুষ্ট থাকে, আর যদি তা থেকে দেওয়া না হয়, তখন তারা অসন্তুষ্ট হয়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৫৮][28]

আয়াতের ব্যাখ্যা:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿وَمِنۡهُم مَّن يَلۡمِزُكَ فِي ٱلصَّدَقَٰتِ মুনাফিকদের একটি জামা‘আত আছে, যখন তুমি সদকা বণ্টন কর, তখন তারা সদকা বিষয়ে তোমাকে দোষারোপ করে অর্থাৎ তোমার ওপর দোষ চাপায় ও তোমার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এবং তুমি যে বণ্টন করেছ, সে বিষয়ে তারা তোমাকে মিথ্যা অপবাদ দেয়। মূলত: তারাই দোষী ও মিথ্যুক। তারা দীনের কারণে কোনো কিছুকে অপছন্দ করে না, তারা অপছন্দ করে নিজেদের স্বার্থের জন্য। এ কারণে যদি তাদেরকে যাকাত দেওয়া হয়, তারা সন্তুষ্ট থাকে, ﴿وَإِن لَّمۡ يُعۡطَوۡاْ مِنۡهَآ إِذَا هُمۡ يَسۡخَطُونَ আর যদি তা থেকে তাদের দেওয়া না হয়, তখন তারা অসন্তুষ্ট হয়।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿ٱلَّذِينَ يَلۡمِزُونَ ٱلۡمُطَّوِّعِينَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ فِي ٱلصَّدَقَٰتِ وَٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهۡدَهُمۡ فَيَسۡخَرُونَ مِنۡهُمۡ سَخِرَ ٱللَّهُ مِنۡهُمۡ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾ [التوبة: 79]

“যারা দোষারোপ করে সদকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছা দানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭৯]

আব্দুল্লাহ ইবন মাসুদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

«لما أُمرنا بالصدقة كنّا نتحامل، فجاء أبو عقيل بنصف صاع، وجاء إنسان بأكثر منه، فقال المنافقون: إن الله لغني عن صدقة هذا، وما فعل هذا الآخر إلا رئاء، فنزلت» :﴿ٱلَّذِينَ يَلۡمِزُونَ ٱلۡمُطَّوِّعِينَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ فِي ٱلصَّدَقَٰتِ وَٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهۡدَهُمۡ...﴾

“আমাদেরকে যখন সদকা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো, তখন আমরা বাড়ী থেকে বহন করে সদকার মালামাল নিয়ে আসতাম। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ বেশি নিয়ে আসত, আবার কেউ কম নিয়ে আসত। আবু আকীল অর্ধ সা নিয়ে আসল আর অপর এক ব্যক্তি তার চেয়ে কিছু বেশি নিয়ে আসল। তখন মুনাফিকরা বলল, আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ সদকার প্রতি মুখাপেক্ষী নন, আর দ্বিতীয় লোকটি যে একটু বেশি নিয়ে আসছে, তার সম্পর্কে বলল, সে তা কেবলই লোক দেখানোর জন্যই করছে। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথার প্রেক্ষাপটে এ আয়াত নাযিল করেন-﴿ٱلَّذِينَ يَلۡمِزُونَ ٱلۡمُطَّوِّعِينَ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ فِي ٱلصَّدَقَٰتِ وَٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهۡدَهُمۡ... “যারা দোষারোপ করে সদকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছা দানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না।”...[29]

সব সময় তাদের বাড়াবাড়ি এবং তাদের অনাচার থেকে কেউ নিরাপদে থাকে না। এমনকি যারা সদকা করে তারাও তাদের অনাচার থেকে নিরাপদ নয়। যদি তাদের কেউ অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে আসে, তখন তারা বলে, এ তো লোক দেখানোর জন্য নিয়ে আসছে। আর যদি সামান্য নিয়ে আসে, তখন তারা বলে, আল্লাহ তা‘আলা তার সদকার প্রতি মুখাপেক্ষী নয়।[30]

১৮. তারা নিম্নমান ও অপারগ লোকদের প্রতি সন্তুষ্টি:

মুনাফিকরা অপারগ মা’জুর লোকদের সাথে থাকতে পছন্দ করে। যারা ওযরের কারণে ঘর থেকে বের হতে পারে না, তারা তাদের সাথে থাকাকে তাদের জন্য নিরাপদ মনে করে। তাই তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বিভিন্ন ধরনের ওজর পেশ করে। যাতে তাদের যুদ্ধে যেতে না হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذَآ أُنزِلَتۡ سُورَةٌ أَنۡ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَجَٰهِدُواْ مَعَ رَسُولِهِ ٱسۡتئذَنَكَ أُوْلُواْ ٱلطَّوۡلِ مِنۡهُمۡ وَقَالُواْ ذَرۡنَا نَكُن مَّعَ ٱلۡقَٰعِدِينَ﴾ [التوبة: 86]

“আর যখন কোনো সূরা এ মর্মে নাযিল করা হয় যে, ‘তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন এবং তাঁর রাসূলের সাথে জিহাদ কর’, তখন তাদের সামর্থ্য বান লোকেরা তোমার কাছে অনুমতি চায় এবং বলে, ‘আমাদেরকে ছেড়ে দাও, আমরা বসে থাকা লোকদের সাথে থাকব”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮৬]

আল্লাহ তা‘আলা যারা শক্তি সামর্থ্য ও সব ধরনের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও জিহাদে শরীক হয় না এবং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিন্দা ও দোষারোপ করেন। তারা বলে, ﴿ذَرۡنَا نَكُن مَّعَ ٱلۡقَٰعِدِينَ “ ‘আমাদেরকে ছেড়ে দাও, আমরা বসে থাকা লোকদের সাথে থাকব’ তারা তাদের নিজেদের দোষী সাব্যস্ত করতে কার্পণ্য করে না। সৈন্য দলেরা যুদ্ধে বের হলেও, তারা নারীদের সাথে ঘরে বসে থাকতেও লজ্জা করে না। যখন যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তখন তারা খুবই দুর্বল। আর যখন তারা বেঁচে যায় তখন অতি কথন করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্য এক আয়াতে বলেন,

﴿أَشِحَّةً عَلَيۡكُمۡۖ فَإِذَا جَآءَ ٱلۡخَوۡفُ رَأَيۡتَهُمۡ يَنظُرُونَ إِلَيۡكَ تَدُورُ أَعۡيُنُهُمۡ كَٱلَّذِي يُغۡشَىٰ عَلَيۡهِ مِنَ ٱلۡمَوۡتِۖ فَإِذَا ذَهَبَ ٱلۡخَوۡفُ سَلَقُوكُم بِأَلۡسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى ٱلۡخَيۡرِۚ أُوْلَٰٓئِكَ لَمۡ يُؤۡمِنُواْ فَأَحۡبَطَ ٱللَّهُ أَعۡمَٰلَهُمۡۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٗا﴾ [الأحزاب: 19]

“তোমাদের ব্যাপারে (সাহায্য প্রদান ও বিজয় কামনায়) কৃপণতার কারণে। অতঃপর যখন ভীতি আসে তখন তুমি তাদের দেখবে মৃত্যুভয়ে তারা মূর্ছিত ব্যক্তির ন্যায় চক্ষু উল্টিয়ে তোমার দিকে তাকায়। অতঃপর যখন ভীতি চলে যায় তখন তারা সম্পদের লোভে কৃপণ হয়ে শাণিত ভাষায় তোমাদের বিদ্ধ করে। এরা ঈমান আনেনি। ফলে আল্লাহ তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করে দিয়েছেন। আর এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ১৯] যুদ্ধের বাইরে তারা অতি কথন করে এবং তাদের গলাবাজির আর অন্ত থাকে না; কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে তার সর্বাধিক দুর্বল ও কাপুরুষ।[31]

১৯. মুনাফিকরা খারাপ কাজের আদেশ দেয় আর ভালো কাজ থেকে নিষেধ করে:

মুনাফিকরা মানুষকে খারাপ ও মন্দ কাজের দিকে আহ্বান করে। ভালো কাজের দিকে ডাকে না। পক্ষান্তরে মুমিনরা তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত, তারা মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করে এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ٱلۡمُنَٰفِقُونَ وَٱلۡمُنَٰفِقَٰتُ بَعۡضُهُم مِّنۢ بَعۡضٖۚ يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمُنكَرِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَقۡبِضُونَ أَيۡدِيَهُمۡۚ نَسُواْ ٱللَّهَ فَنَسِيَهُمۡۚ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ﴾ [التوبة: 67]

“মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা একে অপরের অংশ, তারা মন্দ কাজের আদেশ দেয়, আর ভাল কাজ থেকে নিষেধ করে, তারা নিজদের হাতগুলোকে সঙ্কুচিত করে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে তিনিও তাদেরকে ভুলে গিয়েছেন, নিশ্চয় মুনাফিকরা হচ্ছে ফাসিক।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬৭]

আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের অবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তারা মুমিনদের বিপরীত গুণের অধিকারী। কারণ, মুমিনরা মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দেয়, আর খারাপ কাজ হতে বারণ করে। পক্ষান্তরে মুনাফিকরা﴿يَأۡمُرُونَ بِٱلۡمُنكَرِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَقۡبِضُونَ أَيۡدِيَهُمۡۚ খারাপ কাজের আদেশ দেয় এবং ভালো কাজ হতে নিষেধ করে। আর আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করা হতে তারা তাদের হাত-দ্বয় গুটিয়ে রাখে। তারা আল্লাহর স্মরণকে ভুলে যায়, আল্লাহ তা‘আলাও তাদের সাথে সে ব্যক্তির আচরণ করেন, যে তাদের ভুলে যান। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে বলেন, তাদের বলা হবে আজকের দিন আমরা তোমাদেরকে ভুলে যাব, যেমনটি তোমরা আজকের দিনের সাক্ষাতের দিনটি ভুলে গিয়েছিলে, ﴿إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ নিশ্চয় মুনাফিকরা হলো, সত্যের পথ হতে বিচ্যুত, আর গোমরাহীর পথে পরিবেষ্টিত।[32]

২০. জিহাদকে অপছন্দ করা ও জিহাদ হতে বিরত থাকা:

মুনাফিকরা জিহাদকে অপছন্দ করে। তারা কখনোই আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে চায় না। এ কারণে তারা বিভিন্ন অজুহাতে জিহাদ হতে বিরত থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَرِحَ ٱلۡمُخَلَّفُونَ بِمَقۡعَدِهِمۡ خِلَٰفَ رَسُولِ ٱللَّهِ وَكَرِهُوٓاْ أَن يُجَٰهِدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَقَالُواْ لَا تَنفِرُواْ فِي ٱلۡحَرِّۗ قُلۡ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرّٗاۚ لَّوۡ كَانُواْ يَفۡقَهُونَ﴾ [التوبة: 81]

“পিছনে থাকা লোকগুলো আল্লাহর রাসূলের বিপক্ষে বসে থাকতে পেরে খুশি হলো, আর তারা অপছন্দ করল তাদের মাল ও জান নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং তারা বলল, ‘তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না। বল, ‘জাহান্নামের আগুন অধিকতর গরম, যদি তারা বুঝত”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮১]

তাবুকের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের সাথে যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নি সে সব মুনাফিকদের সমালোচনা করে বলেন, তারা তাদের গৃহাভ্যন্তরে বসে থাকাকে পছন্দ করে এবং ﴿وَكَرِهُوٓاْ أَن يُجَٰهِدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ আর আল্লাহর রাস্তায় জান মাল দিয়ে জিহাদ করতে অপছন্দ করে। আর তারা একে অপরকে বলে, ﴿لَا تَنفِرُواْ فِي ٱلۡحَرِّۗ তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না। অর্থাৎ তাবুকের যুদ্ধের অভিযান ছিল উত্তপ্ত গরমের মৌসুমে এবং ফসল কাটার উপযুক্ত সময়। এ কারণেই মুনাফিকরা বলে তোমরা গরমের মধ্যে ঘর থেকে বের হয়ো না। আল্লাহ তা‘আলা তার স্বীয় রাসূল কে বলেন, আপনি তাদের বলুন, ﴿نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرّٗاۚ لَّوۡ كَانُواْ يَفۡقَهُونَ “তোমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের বিরোধিতা করার মাধ্যমে জাহান্নামের যে পরিণতির দিকে যাচ্ছ, তা দুনিয়ার এ গরমের চেয়ে আরো বেশি উত্তপ্ত। যদি তোমরা বুঝতে পারতে”[33] সুতরাং তোমাদের জন্য জাহান্নামের আগুনের চেয়ে দুনিয়ার গরম অনেক সহনীয়। কিন্তু তোমরা এখন তা বুঝতে পারছ না।

২১. অপমান ও অপদস্থের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া:

 মুনাফিকরা যুদ্ধ হতে বিরত থাকার জন্য অপমানিত হবে তবুও তারা যুদ্ধে যাবে না। তাদের নিকট মান-সম্মান ও ইজ্জতের কোনো দাম নাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذۡ يَقُولُ ٱلۡمُنَٰفِقُونَ وَٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ مَّا وَعَدَنَا ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ إِلَّا غُرُورٗا ١٢ وَإِذۡ قَالَت طَّآئِفَةٞ مِّنۡهُمۡ يَٰٓأَهۡلَ يَثۡرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمۡ فَٱرۡجِعُواْۚ وَيَسۡتَ‍ٔۡذِنُ فَرِيقٞ مِّنۡهُمُ ٱلنَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوۡرَةٞ وَمَا هِيَ بِعَوۡرَةٍۖ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارٗا﴾ [الأحزاب: 12، 13]

“আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, ‘আল্লাহ ও তার রাসূল আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যখন তাদের একদল বলেছিল, “হে ইয়াসরিববাসী, এখানে তোমাদের কোনো স্থান নেই, তাই তোমরা ফিরে যাও। আর তাদের একদল নবীর কাছে অনুমতি চেয়ে বলছিল, আমাদের বাড়িÑঘর অরক্ষিত, অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ১২, ১৩]

২২. মুমিনদের থেকে পিছে হটা:

মুনাফিকদের চরিত্র হলো, তারা সব সময় পিছু হটে থাকে। তারা কোনো ভালো কাজের পিছনে থাকে। সালাতে তারা সবার পিছনে আসে এবং পিছনের কাতারে দাঁড়ায়। রাসূল সা. এর তালীমের মজলিশে তারা পিছনে থাকে। জিহাদে বের হলে তারা মুমিনদের পিছনে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِنَّ مِنكُمۡ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ فَإِنۡ أَصَٰبَتۡكُم مُّصِيبَةٞ قَالَ قَدۡ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيَّ إِذۡ لَمۡ أَكُن مَّعَهُمۡ شَهِيدٗا﴾ [النساء: 72]

“আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যে অবশ্যই বিলম্ব করবে। সুতরাং তোমাদের কোনো বিপদ আপতিত হলে সে বলবে, ‘আল্লাহ আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলাম না”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭২]

আয়াতের ব্যাখ্যা: এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের গুণাগুণ ও তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা‘আলা তাদের মুমিন বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন, হে মুমিনগণ! কিছু লোক আছে যারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত ও তোমাদের সম্প্রদায়ের। আর তারা তোমাদেরই সাদৃশ্য। তারা মানুষের মধ্যে প্রকাশ করে যে, আমরা তোমাদের দাওয়াত ও ধর্মের অনুসারী অথচ তারা এ দাওয়াত ও ইসলাম ধর্মের অনুসারী নয়, সত্যিকার অর্থে তারা হলো মুনাফিক। যার ফলে তোমাদের শত্রুদের সাথে জিহাদ ও তাদের সাথে লড়াই করতে তারা বিলম্ব করে। তোমরা মুমিনগণ ঘর থেকে বের হলেও তারা ঘর থেকে বের হয় না। فَإِنۡ أَصَٰبَتۡكُم مُّصِيبَة যদি তোমাদের কোনো মুসীবত তথা পরাজয় নেমে আসে অথবা তোমাদের কেউ আহত বা শহীদ হয়, তখন তারা বলে, ﴿قَدۡ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيَّ إِذۡ لَمۡ أَكُن مَّعَهُمۡ شَهِيدٗا আল্লাহ আমার ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলাম না। কারণ, যদি আমি তাদের সাথে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমিও আক্রান্ত হতাম; আহত বা নিহত হতাম। তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ হতে বিরত থাকাতে খুশি ও আনন্দ যোগায়। কারণ, সে তো মুনাফিক। আল্লাহর রাস্তায় আক্রান্ত হলে বা শহীদ হলে যে সব সাওয়াব ও বিনিময়ের ঘোষণা আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন সে বিষয়ে সে বিশ্বাস করে না, বরং সন্দেহ পোষণকারী। সে কখনোই সাওয়াবের আশা করে না এবং আল্লাহর আযাবকে ভয় করে না।[34]

২৩. জিহাদ থেকে বিরত থাকতে অনুমতি চাওয়া:

মুনাফিকরা জিহাদে অংশ গ্রহণ করাকে অপছন্দ করে। তার জন্য তারা রাসূল সা. এর দরবারে এসে বিভিন্ন ধরনের অহেতুক অজুহাত দাড় করায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُم مَّن يَقُولُ ٱئۡذَن لِّي وَلَا تَفۡتِنِّيٓۚ أَلَا فِي ٱلۡفِتۡنَةِ سَقَطُواْۗ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةُۢ بِٱلۡكَٰفِرِينَ﴾ التوبة: 49]

“আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, ‘আমাকে অনুমতি দিন এবং আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না’। শুনে রাখ, তারা ফিতনাতেই পড়ে আছে। আর নিশ্চয় জাহান্নাম কাফিরদের বেষ্টনকারী।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৪৯]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আর মুনাফিকদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ তোমাকে বলবে হে মুহাম্মদ!ٱئۡذَن لِّي ‘আমাকে ঘরে বসে থাকতে অনুমতি দিন আমি যুদ্ধে তোমাদের সাথে শরিক হবো না। তুমি যদি আমাকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য কর, আমি আমার বিষয়ে আশংকা করছি যে, রুমের সুন্দর সুন্দর রমণীদের কারণে আমি ফিতনায় আক্রান্ত হতে পারি। সুতরাং وَلَا تَفۡتِنِّيٓۚ তুমি আমাকে ফিতনায় ফেলবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَلَا فِي ٱلۡفِتۡنَةِ سَقَطُواْ শুনে রাখ, তারা তাদের এ কথার কারণেই ফিতনাতেই পড়ে আছে।[35]

২৪. জিহাদে না গিয়ে বিভিন্ন ওজুহাত দাঁড় করানো:

রাসূল সা. যখন জিহাদ থেকে ফিরে আসতো, তখন মুনাফিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দাঁড় করান এবং নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَعۡتَذِرُونَ إِلَيۡكُمۡ إِذَا رَجَعۡتُمۡ إِلَيۡهِمۡۚ قُل لَّا تَعۡتَذِرُواْ لَن نُّؤۡمِنَ لَكُمۡ قَدۡ نَبَّأَنَا ٱللَّهُ مِنۡ أَخۡبَارِكُمۡۚ وَسَيَرَى ٱللَّهُ عَمَلَكُمۡ وَرَسُولُهُۥ ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَىٰ عَٰلِمِ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَٰدَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ﴾ [التوبة: 94]

“তারা তোমাদের নিকট ওযর পেশ করবে যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে। বল, ‘তোমরা ওযর পেশ করো না, আমরা তোমাদেরকে কখনো বিশ্বাস করব না। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের খবর আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তোমাদের আমল দেখবেন এবং তাঁর রাসূলও। তারপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে গায়েব ও প্রকাশ্যের পরিজ্ঞাতার নিকট। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তোমরা আমল করতে সে সম্পর্কে”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৯৪]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের বিষয়ে সংবাদ দেন যে, তারা যখন মদিনা ফিরে আসবে তখন তারা তোমাদের নিকট ওজর পেশ করবে। আল্লাহ বলেন, قُل لَّا تَعۡتَذِرُواْ لَن نُّؤۡمِنَ لَكُمۡ বল, ‘তোমরা ওজর পেশ করো না, আমরা তোমাদেরকে কখনো বিশ্বাস করব না। قَدۡ نَبَّأَنَا ٱللَّهُ مِنۡ أَخۡبَارِكُمۡۚ অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের খবর ও অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। وَسَيَرَى ٱللَّهُ عَمَلَكُمۡ وَرَسُولُهُۥ অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের আমলসমূহ দেখবেন এবং তাঁর রাসূলও। অর্থাৎ তোমাদের আমলসমূহ আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে মানুষের সম্মুখে প্রকাশ করে দেবেন। ثُمَّ تُرَدُّونَ إِلَىٰ عَٰلِمِ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَٰدَةِ তারপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে গায়েব ও প্রকাশ্যের পরিজ্ঞাতার নিকট।فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন যা তোমরা আমল করতে সে সম্পর্কে’। অর্থাৎ তোমাদের খারাপ আমল ও ভালো আমল সম্পর্কে অবগত করবে আর তোমাদের তার ওপর বিনিময় দিবেন।[36]

২৫. মানুষের থেকে আত্ম-গোপন করা:

মুনাফিকরা মাথা লুকাত এবং নিজেদের সব সময় আড়াল করে রাখতো। কারণ, তাদের মনে সব সময় আতংক থাকতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَسۡتَخۡفُونَ مِنَ ٱلنَّاسِ وَلَا يَسۡتَخۡفُونَ مِنَ ٱللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمۡ إِذۡ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرۡضَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡلِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِمَا يَعۡمَلُونَ مُحِيطًا﴾ [النساء: 108]

“তারা মানুষের কাছ থেকে লুকাতে চায়, আর আল্লাহর কাছ থেকে লুকাতে চায় না। অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তারা যা করে তা পরিবেষ্টন করে আছেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৮]

আয়াতের ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের আমলের নিন্দা করে বলেন, তারা তাদের খারাপীগুলো মানুষের থেকে গোপন করে, যাতে তারা তাদের খারাপ না বলে, অথচ, আল্লাহ তা‘আলা তাদের চরিত্রগুলো প্রকাশ করে দেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তাদের গোপন বিষয় ও তাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে কি আছে, সে সম্পর্কে জানেন। এ কারণেই তিনি বলেন, ﴿وَهُوَ مَعَهُمۡ إِذۡ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرۡضَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡلِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِمَا يَعۡمَلُونَ مُحِيطًا অথচ তিনি তাদের সাথেই থাকেন যখন তারা রাতে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তারা যা করে তা পরিবেষ্টন করে আছেন। এটি তাদের হুমকি ও ধমক আল্লাহর পক্ষ হতে।[37]

২৬. মুমিনদের মুসিবতে খুশি হওয়া:

মুমিনরা যখন কোনো মুসীবতে পতিত হয়, তখন মুনাফিকরা খুব খুশি হয়। তারা সব সময় মুমিনদের ক্ষতি কামনা করে এবং তাদের মুসিবতের অপেক্ষায় থাকে। কারণ, তারা তাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةٗ مِّن دُونِكُمۡ لَا يَأۡلُونَكُمۡ خَبَالٗا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمۡ قَدۡ بَدَتِ ٱلۡبَغۡضَآءُ مِنۡ أَفۡوَٰهِهِمۡ وَمَا تُخۡفِي صُدُورُهُمۡ أَكۡبَرُۚ قَدۡ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ ١١٨ هَٰٓأَنتُمۡ أُوْلَآءِ تُحِبُّونَهُمۡ وَلَا يُحِبُّونَكُمۡ وَتُؤۡمِنُونَ بِٱلۡكِتَٰبِ كُلِّهِۦ وَإِذَا لَقُوكُمۡ قَالُوٓاْ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوۡاْ عَضُّواْ عَلَيۡكُمُ ٱلۡأَنَامِلَ مِنَ ٱلۡغَيۡظِۚ قُلۡ مُوتُواْ بِغَيۡظِكُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمُۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ ١١٩ إِن تَمۡسَسۡكُمۡ حَسَنَةٞ تَسُؤۡهُمۡ وَإِن تُصِبۡكُمۡ سَيِّئَةٞ يَفۡرَحُواْ بِهَاۖ وَإِن تَصۡبِرُواْ وَتَتَّقُواْ لَا يَضُرُّكُمۡ كَيۡدُهُمۡ شَيۡ‍ًٔاۗ إِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعۡمَلُونَ مُحِيطٞ﴾ [118-120]

“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না। তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে। তাদের মুখ থেকে তো শত্রুতা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আর তাদের অন্তরসমূহ যা গোপন করে তা মারাত্মক। অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে। শোন, তোমরাই তো তাদেরকে ভালবাস এবং তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। অথচ তোমরা সব কিতাবের প্রতি ঈমান রাখ। আর যখন তারা তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’। আর যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তোমাদের ওপর রাগে আঙ্গুল কামড়ায়। বল, ‘তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মর’! নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। যদি তোমাদেরকে কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন তাদের কষ্ট হয়। আর যদি তোমাদেরকে মন্দ স্পর্শ করে, তখন তারা তাতে খুশি হয়। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৮-১২০]

আয়াতের সারমর্ম: আল্লাহ তা‘আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে মুনাফিকদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করেন। অর্থাৎ আল্লাহ মুনাফিকদের অন্তরে কি আছে এবং তারা তাদের শত্রুদের জন্য কি গোপন করেন, তা জানিয়ে দেন। মুনাফিকরা তাদের সাধ্য অনুযায়ী কখনোই মুমিনদের বন্ধু বানাবে না। তারা সব সময় তাদের বিরোধিতা ও ক্ষতি করতে চেষ্টা করবে। মুমিনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকবে। আর তারা মুমিনদের কষ্টের কারণ হয় বা তাদের কোন মুসিবত হয় এমন কাজই করতে থাকবে।[38]

২৭. যখন আমানত রাখা হয় খিয়ানত করে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, আর যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, তা ভঙ্গ করে আর যখন ঝগড়া করে অকাট্য ভাষায় গাল-মন্দ করে।

মুনাফিকদের কিছু মৌলিক গুণ আছে, যেগুলো একটি সমাজ, দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। এ সব গুণগুলো থেকে বেঁচে থাকা আমাদের সকলের জন্য একান্ত অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُم مَّنۡ عَٰهَدَ ٱللَّهَ لَئِنۡ ءَاتَىٰنَا مِن فَضۡلِهِۦ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ٧٥ فَلَمَّآ ءَاتَىٰهُم مِّن فَضۡلِهِۦ بَخِلُواْ بِهِۦ وَتَوَلَّواْ وَّهُم مُّعۡرِضُونَ ٧٦ فَأَعۡقَبَهُمۡ نِفَاقٗا فِي قُلُوبِهِمۡ إِلَىٰ يَوۡمِ يَلۡقَوۡنَهُۥ بِمَآ أَخۡلَفُواْ ٱللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُواْ يَكۡذِبُونَ﴾ [التوبة: 75-77]

“আর তাদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করে যে, যদি আল্লাহ তার স্বীয় অনুগ্রহে আমাদের দান করেন, আমরা অবশ্যই দান-খয়রাত করব এবং অবশ্যই আমরা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দান করলেন, তারা তাতে কার্পণ্য করল এবং বিমুখ হয়ে ফিরে গেল। সুতরাং, পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে নিফাক রেখে দিলেন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, তারা আল্লাহকে যে ওয়াদা দিয়েছে তা ভঙ্গ করার কারণে এবং তারা যে মিথ্যা বলেছিল তার কারণে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭৫-৭৭]

আয়াতের সারমর্ম: আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, মুনাফিকরা আল্লাহ তা‘আলাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, যদি আল্লাহ তা‘আলা তার করুণা দ্বারা তাদের ধন-সম্পদ ও অর্থ বিত্ত দান করেন, তবে সে আল্লাহর রাহে খরচ করবে। আর সে নেককার লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের যখন ধন-সম্পদ দেওয়া হলো, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি। তারা যে সদকা করার দাবি করছিল তা পূরণ করে নি। আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ অপকর্মের শাস্তি স্বরূপ তাদের অন্তরে নিফাক ঢেলে দেন। যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে অর্থাৎ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তা তাদের অন্তরে স্থায়ী হবে। আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এ ধরনের নিফাক হতে।[39]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَمَا هُم بِمُؤۡمِنِينَ ٨ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَمَا يَخۡدَعُونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمۡ وَمَا يَشۡعُرُونَ﴾ [البقرة: 8]

“আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি’, অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে (বলে মনে করে) অথচ তারা নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে এবং তারা তা অনুধাবন করে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৮]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, মুনাফিকদের বড় পুঁজি হলো, ধোঁকা দেওয়া ও প্রতারণা করা। তাদের সম্পদ হলো, মিথ্যা ও খিয়ানত। তাদের মধ্যে দুনিয়ার জীবনের ওপর যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। উভয় দল, তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা নিরাপদ। ﴿يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَمَا يَخۡدَعُونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمۡ وَمَا يَشۡعُرُونَ “তারা আল্লাহ তা‘আলাকে ধোঁকা দেয় এবং যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনছে তাদের ধোঁকা দেয়, মূলতঃ তারা তাদের নিজেদেরকেই ধোঁকা দেয় কিন্তু তারা তা অনুধাবন করে না।”[40]

আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أَربعٌ من كُن فِيهِ كَانَ مُناَفقِا خَالصِا، وََمْن كَاَنتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنهُنَّ كَاَنتْ فِيهِ خَصلَةٌ مِنَ النفِّاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إذَِا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَاعَاَهَد غَدرَ، وَإذَِا وَعَد أَْخلَفَ، وَإذَِا خَاصَم فَجَر»

“চারটি গুণ যার মধ্যে একত্র হবে, সে সত্যিকার মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ তিনটি গুনের যে কোনো একটি থাকবে সে যতদিন পর্যন্ত তা পরিহার না করবে তার মধ্যে নেফাকের একটি গুণ অবশিষ্ট থাকল। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। আর যখন কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা লঙ্ঘন করে, আর যখন ওয়াদা করে তা খিলাফ করে, যখন ঝগড়া-বিবাদ করে, সে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে।[41]

ইমাম নববী রহ. বলেন, এক দল আলেম এ হাদীসটিকে জটিল বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ, এখানে যে কটি গুণের কথা বলা হয়েছে, তা একজন সত্যিকার মুসলিম যার মধ্যে কোনো সন্দেহ বা সংশয় নাই তার মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে। যেমন, ইউসুফ ‘আলাইহিস সালামের ভাইদের মধ্যেও এ ধরনের গুণ পাওয়া গিয়েছিল। অনুরূপভাবে আমাদের আলেম, ওলামা, পূর্বসূরি ও মনীষীদের মধ্য হতে অনেকের মধ্যে এসব গুণ বা এর কোনো একটি পাওয়া যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। তাই বলে তারাতো মুনাফিক নয়। এর সমাধানে ইমাম নববী বলেন, আলহামদু লিল্লাহ এ হাদীসে তেমন কোনো অসুবিধা নাই। তবে আলেমগণ হাদীসের বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ আলেমগণ যা বলেছেন, তা হলো, মূলতঃ এ চরিত্রগুলো হলো, নেফাকের চরিত্র। যাদের মধ্যে এ সব চরিত্র থাকবে সে মুনাফিকদের সাদৃশ্য হবে, তাদের চরিত্রে চরিত্রবান হবে। কারণ, নিফাক হলো, তার ভিতরে যা আছে, তার বিপরীতটিকে প্রকাশ করা। যার মধ্যে উল্লেখিত চরিত্র গুলো পাওয়া যাবে, তার ক্ষেত্রে নেফাকের অর্থটিও প্রযোজ্য। সে যাকে ওয়াদা দিয়েছে, যার সাথে মিথ্যা কথা বলছে, যার আমানতের খিয়ানত করছে এবং যার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে, তার ব্যাপারে সে অবশ্যই মুনাফেকি করছে। তার সাথে সে অবশ্যই বাস্তবতাকে গোপন করছে। এ অর্থে লোকটি অবশ্যই মুনাফিক। কিন্তু সে ইসলামের ক্ষেত্রে মুনাফিক নয় যে, মুখে ইসলাম প্রকাশ করল আর অন্তরে কুফরকে লালন করল। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাণী দ্বারা এ কথা বলেননি যে, সে খাঁটি মুনাফিক ও চির জাহান্নামী হবে এবং জাহান্নামের নিম্নস্তরে তার অবস্থান হবে। এ অর্থটিই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফীক দান করুন। আমীন!

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

«كان منافقا خالصا»

“সে খালেস মুনাফিক” এ কথার অর্থ হলো, এ চরিত্রগুলোর কারণে লোকটি মুনাফিকদের সাথে অধিক সাদৃশ্য রাখে। আবার আরো কতক আলেম বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী ঐ লোকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যার মধ্যে এ চরিত্রগুলো প্রাধান্য বিস্তার করছে। আর যার মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে নি তবে মাঝে মধ্যে পাওয়া যায়, সে এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়। মুহাদ্দিসগণ হাদীসের এ অর্থটিকেই গ্রহণ করেছেন।[42]

২৮. সময় মত সালাত আদায় না করা:

মুনাফিকরা সময় মত সালাত আদায় করে না। জামা‘আতে ঠিক মত হাজির হয় না। তারা সালাতের জামা‘আত কায়েম হওয়ার শেষ সময় আসে আবার সর্বাগ্রে চলে যায়।

আলা ইবন আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,

«أنه دخل على أنس بن مالك في داره بالبصرة حين انصرف من الظهر، وداره بجنب المسجد، فلما دخلنا عليه قال: «أصليتم العصر؟ فقلنا له: إنما انصرفنا الساعة من الظهر، قال: فصلوا العصر، فقمنا فصلينا، فلمّا انصرفنا قال سمعت رسول الله يقول تلِْكَ صَلاَةُ المنُاَفقِِ يَْجلسُِ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حتَّى إذَِا كَانَتْ بَيْن قَرْنَىِ الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَر أَْرَبعًا الله لَا يَذُكُر فِيهَا إلّا قَلِيلاً»

“একদিন তিনি বছরায় আনাস ইবন মালেকের বাড়ীতে প্রবেশ করেন। আর আনাস ইবন মালেক তখন যোহরের সালাত আদায় করে বাড়ীতে ফিরেন। তার ঘর ছিল মসজিদের একেবারে পাশেই। আলা ইবন আব্দুর রহমান বলেন, আমরা তার নিকট প্রবেশ করলে, তিনি আমাদের বলেন, তোমরা কি আসরের সালাত আদায় করছ? আমরা তাকে বললাম, আমরাতো কেবল যোহরের সালাত আদায় করে ফিরলাম। তখন তিনি বললেন, তাহলে তোমরা আসরের সালাত আদায় কর। তারপর আমরা দাঁড়ালাম এবং আসরের সালাত আদায় করলাম। আমরা সালাতের সালাম ফিরাইলে তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি মুনাফিকদের সালাত হলো, তারা বসে বসে সূর্যের অপেক্ষা করতে থাকে। তারপর সূর্য যখন শয়তানের দু’টি শিংয়ের মাঝে অবস্থান করে, তখন তারা তাড়াহুড়া করে সালাতে দাঁড়ায়, কাকের ঠোকরের মতো চার রাকাত সালাত আদায় করে, তাতে আল্লাহর যিকির বা স্মরণ খুব কমই করা হয়ে থাকে।[43]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, তারা সালাতকে প্রথম ওয়াক্তে আদায় করে না। সালাতকে একদম শেষ ওয়াক্তে নিয়ে যায়, যখন সালাতের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তারা ফজর আদায় করে সূর্য উদয়ের সময়, আসর আদায় করে সূর্যাস্তের সময়। আর তারা সালাত আদায় করে কাকের ঠোকরের মত করে। তাদের সালাত হলো, দেহের সালাত, তাদের সালাত অন্তরের সালাত নয়। তারা সালাতের মধ্যে শিয়ালের মত এদিক সেদিক তাকায়।[44]

২৯. জামা‘আতে সালাত আদায় করা হতে বিরত থাকা:

মুনাফিকরা জামা‘আতে সালাত আদায় হতে বিরত থাকে। তাদের নিকট জামা‘আতে সালাত আদায় করা অতীব কঠিন কাজ। তাই মুমীনদের উচিত, তারা যেন জামা‘আতে সালাত আদায় করবে।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসুদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«من سرّه أن يلقى الله غدًا مسلمًا فليحافظ على هؤلاء الصلوات حيث ينادى بهن، فإن الله شرع لنبيكم سننَ الهدى، وإنهن من سنن الهدى، ولو أنكم صليتم في بيوتكم كما يصلي هذا المتخلف في بيته لتركتم سنة نبيكم، ولو تركتم سنة نبيكم لضللتم، وما من رجل يتطهر فيحسن الطهور ثم يعمد إلى مسجد من هذه المساجد إلا كتب الله له بكل خطوة يخطوها حسنة، ويرفعه بها درجة، ويحطّ عنه بها سيئة، ولقد رأيتُنا وما يتخلّف عنها إلا منافق معلوم النفاق، ولقد كان الرجل يؤتى به يهادى بين الرجلين حتى يقام في الصف»

“যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, কিয়ামতের দিন সে একজন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সে যেন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতসমূহের জন্য আহ্বান করা হলে, তা যথাযথ সংরক্ষণ করে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নবীর জন্য হেদায়েতের বিধান চালু করেন। আর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো, হিদায়েতেরই বিধান। তোমরা যদি তোমাদের সালাতসমূহকে ঘরে আদায় কর, যেমনটি এ পশ্চাৎপদ লোকটি করে থাকে, তবে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নতকে ছেড়ে দিলে। আর যখন তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাতকে ছেড়ে দেবে তখন তোমরা গোমরাহ ও ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। যে কোনো ব্যক্তিই হোক না কেন, সে যখন ভালোভাবে অযু করবে, তারপর মসজিদসমূহ থেকে কোনো একটি মসজিদের দিকে যাওয়ার জন্য রওয়ানা করে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতিটি কদমে কদমে নেকি লিপিবদ্ধ করেন, তার মর্যাদাকে এক ধাপ করে বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে গুনাহ ক্ষমা করেন। আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে দেখেছি একমাত্র প্রসিদ্ধ মুনাফিক ছাড়া আর কেউ সালাত হতে বিরত থাকতো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমরা আরো দেখেছি, এক লোককে দুইজন মানুষের কাঁধে ভর করে সালাতের কাতারে উপস্থিত করা হত।[45]

আল্লামা সুমনি রহ. বলেন, এখানে মুনাফিক দ্বারা উদ্দেশ্য ঐ মুনাফিক নয় যারা কুফুরকে গোপন করে এবং ইসলাম প্রকাশ করে। যদি তাই হয়, তাহলে জামা‘আতে সালাত আদায় করা ফরয হয়ে যাবে। কারণ, যে কুফুরকে গোপন করে সে অবশ্যই কাফির।”[46]

৩০. অশ্লীল কথা বলা ও বেশি কথা বলা:

মুনাফিকদের স্বভাব হলো, তারা কথায় কথায় মানুষকে গালি দেয়, লজ্জা দেয়। যে কথা লোক সমাজে বলা উচিত নয়, ঐ ধরনের অশ্লীল ফাহেশা কথা বলাবলি করত এবং তারা তাদের মজলিশে হাসাহাসি করত।

আবু উমামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الحَيَاءُ وَالْعِىُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الِإيمَانِ، والْبذَاءُ وَالَبَياُن شعْبَتَانِ منَ النفَّاقِ»

“লজ্জা ও কথা কম বলা, ঈমানের দু’টি শাখা আর অশ্লীলতা ও অতিকথন নেফাকের দু’টি শাখা।[47]

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, হাদীসে الْعِىُّ শব্দটির অর্থ হলো, কম কথা বলা আর الَبذَاءُ শব্দের অর্থ হলো, অশ্লীল কথা বলা আর البيان অর্থ হলো অধিক কথা বলা। যেমন, বক্তা বা ওয়ায়েজরা মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য ও তাদের প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে এমন এমন কথা বলে যা আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করে না।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, মুনাফিকদের অবস্থা মুসলিমদের মধ্যে অচল মুদ্রার মত। যা অনেক মানুষই তাদের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে গ্রহণ করে থাকে। আর যারা অভিজ্ঞ ও যোগ্যতা সম্পন্ন তারা অবশ্যই বুঝতে পারে এটি কি আসল মুদ্রা না নকল মুদ্রা। আর এ ধরনের অভিজ্ঞ লোকের সংখ্যা সমাজে কমই হয়ে থাকে। দীনের জন্য এ ধরনের লোকের চাইতে ক্ষতি আর কিছুই হতে পারে না। এ সব লোকেরা দীন ও ধর্মকে স্ব-মুলে উৎখাত করে ফেলে। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে তাদের অবস্থাকে পরিষ্কার করেন ও চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেন। একাধিক বার তাদের অবস্থান, বৈশিষ্ট্য ও আলোচনা তুলে ধরেন এবং তাদের ক্ষতি উম্মতকে থেকে সতর্ক করেন। এ উম্মতকে বার বার তাদের কারণে মাশুল দেওয়া এবং তাদের কারণেই এ উম্মতের ওপর বড় বড় মুসিবত নেমে আসায়, তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানার প্রয়োজন তীব্রভাবে দেখা দেয়। তাদের কথা শোনা হতে বেঁচে থাকা, তাদের এবং সাথে সম্পর্ক রাখা হতে দুরে থাকা উম্মতের ওপর ফরয হয়ে গেছে। তারা কত পথিককেই না তাদের গন্তব্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে! তাদেরকে সঠিক পথ থেকে সরিয়ে গোমরাহি ও ভ্রষ্ট পথে নিয়ে গেছে। তারা কত মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করছে! আর কত মানুষকে তারা আশাহত করছে। তারা মানুষকে ওয়াদা দিয়ে প্রতারণা করছে এবং মানুষকে ধ্বংস ও হালাকের দিকে ঠেলে দিয়েছে।[48]

৩১. গান শ্রবণ করা:

গান-বাজনা হলো মুনাফিকদের একটি অন্যতম কু অভ্যাস, যা একজন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ গাফেল করে দেয়। আর এ গান বাজনাই ছিল মুনাফিকদের নিত্য দিনের সাথী। তারা সব সময় গান বাজনা শ্রবণ করে সময় নষ্ট করত। বর্তমান সময়ে এ ব্যধিটি মুসলিম যুবকদের মধ্যেও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুনাফিকদের এ ঘৃণিত স্বভাব থেকে আমাদের সবাইকে বেঁচে থাকতে হবে।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসুদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

« الغناء ينبت النفاق في القلب»

“গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।[49]

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, মনে রাখতে হবে, নিফাকের মুল ভিত্তি হলো, একজন মানুষের বাহ্যিক দিকটি তার অন্তরের অবস্থার বিপরীত হওয়া। একজন গায়ক তার দুই অবস্থা হতে পারে, সে তার গানে কারো চরিত্রকে হনন করে, ফলে সে ফাজির। অথবা সে মিথ্যা গুণগান করে তাহলে সে মুনাফিক। একজন গায়ক সে দেখায় যে, তার মধ্যে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু তার অন্তর নফসের খায়েশাতে ভরপুর। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যে সব গান বাজনা বাদ্য যন্ত্র ও অনর্থক গলাবাজিকে অপছন্দ করে, তার প্রতি তার ভালোবাসা অটুট। তার অন্তর এসব দ্বারাই সব সময় ভর্তি। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যা পছন্দ করে এবং যা অপছন্দ করে তা থেকে তার অন্তর একে বারেই খালি ও বিরান। তাদের এ চরিত্র নিফাক বৈ আর কিছুই না।... এ ছাড়াও নিফাকের আলামত হলো, আল্লাহর যিকির কম করা, সালাত আদায়ে অলসতা করা এবং সালাতে কাকের ঠোকরের মত ঠোকর দেওয়া। আর অভিজ্ঞতা হলো, যারা গান করে তাদের খুব কম লোকই আছে যাদের মধ্যে এ চরিত্রগুলো পাওয়া যাবে না। গায়করা সাধারণত সালাতে অমনোযোগী ও আল্লাহর যিকির হতে গাফেল হয়ে থাকে। এ ছাড়াও নিফাকের ভিত্তিই হলো, মিথ্যার ওপর আর গান হলো সবচেয়ে অধিক মিথ্যাচার। গানে অসুন্দরকে সুন্দর ও খারাপকে ভালো করে দেখায় আর সুন্দরকে বিশ্রী আর ভালোকে মন্দ করে দেখায়। আর এই হলো আসল নিফাক বা কপটতা। আরো বলা যায়, নিফাক হলো ধোঁকা, ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচার আর গানের ভিত্তিই হলো এ সবের ওপর প্রতিষ্ঠিত।[50]

 নিফাক থেকে বাঁচার উপায়

প্রতিটি মুসলিমের ওপর কর্তব্য হলো, সে নিজেকে নিফাক থেকে হেফাযত করবে। আর নেফাকের থেকে বাঁচার জন্য তাকে অবশ্যই নেক আমল সমূহের পাবন্দী করতে হবে এবং ভালো গুণে গুণান্বিত হতে হবে। নিফাক একটি মারাত্মক সমস্যা। মুমিনের জন্য নিফাক থেকে বাঁচার কোনো বিকল্প নাই। একজন মুমিন নিফাক থেকে নিজেকে না বাঁচাতে পারলে, সে অবশ্যই ধীরে ধীরে অধঃপতনের দিকে যাবে। ফলে সে এক সময় ঈমান হারা হয়ে মারা যাবে। সুতরাং নিফাক থেকে বাঁচার কোনো বিকল্প নাই।

যে সব নেক আমল সমূহের পাবন্দি করতে হবে তা নিম্নরূপ:

এক. প্রথম ওয়াক্তের মধ্যে সালাত আদায় করা এবং ইমামের সাথে তাকবীরে তাহরীমায় শরীক হওয়া।

মুনাফিকদের স্বভাব হলো, তারা সালাতে দেরি করা এবং শেষ ওয়াক্তের মধ্যে গিয়ে কোনো রকম সালাত আদায় করা।

আনাস ইবন মালেক থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من صَلَّى للهِ أَرْبَعِيَن يَوًْما فِي جَماعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبيِرةَ الْأوُلَى، كُتبِت لَهُ بَرَاءَتَانِ، بَرَاءَةٌ مِنْ الناَّرِ وَبَرَاءَةٌ مِنْ النفَّاق»

“যে ব্যক্তি প্রথম তাকবীরের সাথে চল্লিশ দিন জামা‘আতে সালাত আদায় করে, তার জন্য দু’টি পুরস্কার লিপিবদ্ধ হয়, এক- তাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দেওয়া হবে। দুই- নিফাক থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।

অর্থাৎ লোকটি জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নাজাত পাবে। আর নিফাক থেকে মুক্তি পাওয়ার অর্থ হলো, সে লোকটি দুনিয়াতে মুনাফিকরা যে সব আমল করে তা হতে মুক্ত থাকবে। মুখলিস লোকেরা যে সব আমল করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে তা করার তাওফীক দিবেন। আর আখেরাতে লোকটি মুনাফিকদের যে শাস্তি দেওয়া হবে তা থেকে মুক্ত থাকবে। এবং তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হবে যে লোকটি মুনাফিক নয়। মোট কথা মুনাফিকরা সালাতে দাঁড়ালে অলসতা করে আর এ লোকটি তার বিপরীত হবে।[51]

দুই. উত্তম চরিত্র ও দীনের জ্ঞান:

উত্তম চরিত্র অবলম্বন ও দীন সম্পর্কে জান অর্জন করার মাধ্যমে একজন মুসলিমকে অবশ্যই নিফাক থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারণ, কখনোই দ্বীনি শিক্ষাকে ভালো চোখে দেখে না, তারা সব সময় ইসলামী শিক্ষাকে পরিত্যাগ করে এবং বিজাতীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পছন্দ করে।

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«خَصْلَتَانِ لَا تَجتَمِعَانِ فِي مُناَفقٍِ حُسُن سَمْتٍ، وَلَا فقْهٌ فِي الدِّينِ»

“একজন মুনাফিকের মধ্যে দু’টি চরিত্র কখনোই একত্র হয় না, সুন্দর চরিত্র ও দীনের জ্ঞান।[52]

সুন্দর চরিত্র বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে, সালেহীনদের গুণে গুণান্বিত হওয়া এবং কল্যাণকর কাজগুলো অনুসন্ধান করে তার ওপর জীবন যাপন করা। আর খারাপ ও মন্দ কাজ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা।

তিন. সদকা করা:

সদকা হলো, নিফাক থেকে বাঁচার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কারণ, মানুষের অন্তরে টাকা, পয়সা ও ধন সম্পদের লোভ অত্যধিক হয়ে থাকে। তাই সে যখন সদকা করবে তখন তার অন্তর থেকে পার্থিব জগতের মুহাব্বাত কমবে এবং সে আখেরাতমুখী হবে।

আবু মালেক আল-আশয়ারী থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الطُّهُورُ شَطرُ الْإِيمَانِ، وَالَحمْدُ للهِ تَملَأ الْميِزَانَ، وَُسْبحَانَ الله وَاَلحمْدُ للهِ تَملْآنِ أَوْ تَملُأ مَا بَيْن السَّمَاوَاتِ وَالْأرَْضِ، وَالَّصلَاةُ نُورٌ، وَالَّصدَقَةُ بُرَْهانٌ، وَالَّصْبرُ ضِيَاءٌ، وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ، كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبايعٌِ نَفْسَهُ فَمُعتقِهَا أَوْ مُوبقِهَا»

“পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ, আলহামদু লিল্লাহ মীযানকে ভরে দেয়, আর সুবহানাল্লাহ ও আলহামদু লিল্লাহ উভয়টিকে ভরপুর করে দেয় অথবা আসমান ও যমিনে মধ্যবর্তী সব কিছুকে ভরপুর করে দেয়। সালাত হলো নুর, সদকা হলো প্রমাণ, ধৈর্য হলো আলো, আর কুরআন হয় তোমার পক্ষে দলীল অথবা তোমার বিপক্ষে প্রমাণ। প্রতিটি আত্মাই ব্যবসায়ী। কেউ হয়ত, লাভবান হয় আর কেউ হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়”[53]

সদকা করা একজন মানুষের ঈমানদার হওয়ার ওপর বিশেষ প্রমাণ। কারণ, একজন মুনাফিক তার মধ্যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস না থাকাতে সে কখনোই সদকা করবে না। সুতরাং, যে সদকা করল, তা তার ঈমানের সত্যতার ওপর প্রমাণস্বরূপ।[54]

চার. কিয়ামুল্লাইল করা:

কাতাদাহ রহ. বলেন, একজন মুনাফিক কখনোই রাত জেগে ইবাদত করতে পারে না।[55]

কারণ হলো, একজন মুনাফিক তখন নেক আমল করে, যখন লোকেরা তাকে দেখে আর যখন লোকজন ঘুমিয়ে থাকে বা না দেখে, তখন তার নেক আমল করার কোনো কারণ থাকে না। সুতরাং যখন একজন লোক রাতে উঠে সালাত আদায় করে, তাহলে বুঝতে হবে লোকটি মুনাফিক নয় বরং ঈমানদার। আমাদের সকলেরই উচিত রাতে কিয়ামুল্লাইল করা। এতে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ ও নিফাক থেকে বাঁচা সহজ হয়।

পাঁচ. আল্লাহর রাহে জিহাদ করা:

জিহাদ হলো, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ সোপান ও শৌর্যবীর্য। ইসলামকে দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা করা এবং টিকিয়ে রাখার জন্য জিহাদের কোনো বিকল্প নাই। সুতরাং, একজন ঈমানদারের জন্য যখনই সুযোগ আসবে, তাকে অবশ্যই জিহাদে শরীক হতে হবে। অন্যথায় তার অন্তরে শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে। যদি কারো অন্তরে এ ধরনের আকাঙ্ক্ষা না থাকে তাকে বুঝতে হবে, তার অন্তরে নিফাকের ব্যাধি রয়েছে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَن مَاتَ وَلَم يَغْزُ وَلَم يَحدِّثْ نَفْسَهُ بهِِ مَاتَ عَلَى شُعبَةٍ مْن نفِاقٍ»

“যে ব্যক্তি মারা গেল, জীবনে কখনো জিহাদ করে নি এবং অন্তরে জিহাদের আকাঙ্ক্ষাও জাগে নি, সে নিফাকের একটি অধ্যায়ের ওপর মৃত্যু বরণ করল।[56]

ইমাম নববী রহ. বলেন, এখানে অর্থ হলো, যার অবস্থা এমন হবে সে যে সব মুনাফিকরা জিহাদ করা থেকে বিরত থাকে তাদের মতোই হবে। কারণ, জিহাদ ছেড়ে দেওয়া নিফাকের একটি অন্যতম শাখা। হাদীস দ্বারা একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ইবাদত করার নিয়ত করে এবং সে কাজটি করার আগেই মারা যায় তাহলে তাকে নিন্দা করা হবে না। যেমনটি নিন্দা করা হবে ঐ ব্যক্তির যে নিয়তই করল না।[57]

ছয়. আল্লাহর যিকির বেশি করা:

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, আল্লাহর যিকির বেশি করে করা দ্বারা নিফাক থেকে নিরাপদ থাকা যায়। কারণ, মুনাফিকরা আল্লাহর যিকির করেই না। আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,

﴿ إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلٗا ١٤٢﴾ [النساء: ١٤٢]

“নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে। বস্তুতঃ তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়। শুধুমাত্র লোকদেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪২]

আর কা‘ব রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির বেশি করে সে নিফাক হতে মুক্ত থাকবে। এ কারণেই হতে পারে আল্লাহ তা‘আলা সূরা মুনাফিককে শেষ করেছেন-

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تُلۡهِكُمۡ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَلَآ أَوۡلَٰدُكُمۡ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ ٩﴾ [المنافقون: ٩]

“হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ০৯] এ কথা দ্বারা। কারণ, এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের ফিতনা থেকে সতর্ক করেন। যারা আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল হওয়ার কারণে নিফাকে নিপতিত হয়। কোনো কোনো সাহাবীকে খারেজীদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো, তারা কি মুনাফিক? উত্তরে তারা বলল, না। কারণ, মুনাফিকরা আল্লাহর যিকির করে না। আল্লাহর যিকির না করা নিফাকের আলামত। আল্লাহর যিকির করা নিফাক থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়। যে অন্তর আল্লাহর যিকিরে মশগুল ঐ অন্তরকে নিফাকে লিপ্ত করা কোনো ক্রমেই সমীচীন নয়। নিফাক হলো ঐ অন্তরের জন্য যে অন্তর আল্লাহর যিকির হতে গাফেল ও বেখবর।[58]

সাত. দো‘আ করা:

যুবাইর ইবন নুফাইর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

«دخلت على أبي الدرداء منزله بحمص، فإذا هو قائم يصلي في مسجده، فلما جلس يتشهد جعل يتعوذ بالله من النفاق، فلما انصرف قلت: غفر الله لك يا أبا الدرداء، ما أنت والنفاق؟ قال: اللهم غفرًا ثلاثا، من يأمن البلاء؟! من يأمن البلاء؟! والله إن الرجل ليفتتن في ساعة فينقلب عن دينه

“আমি আবু দারদার ঘরে প্রবেশ করে দেখি সে সালাত আদায় করছে, তারপর যখন সে তাশাহুদের জন্য বসল, তখন তাশাহুদ পড়ে আল্লাহর নিকট নিফাক হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছে, যখন সালাম ফিরাল আমি তাকে বললাম আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ক্ষমা করুক হে আবু দারদা! তুমি নিফাককে এত ভয় করছ কেন? তোমার সাথে নিফাকের সাথে সম্পর্ক কী? এ কথার জবাবে সে তিনবার হে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন এ কথা বলল এবং আরো বললেন, এ মহা প্রলয় হতে কে নিরাপদে থাকবে? এ মহা প্রলয় থেকে কে নিরাপদ? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি একজন লোক মুহূর্তের মধ্যে ফিতনার সম্মুখীন হয় তারপর সে তার দীন থেকে ফিরে যায়।[59]

আট. আনসারীদের মহব্বত করা:

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«آيَةُ الِإيمَان حُّب الأنَصَارِ، وَآَيُة النفاقِ بُغْضُ الأنصَارِ»

“ঈমানের আলামত হলো, আনছারদের মহব্বত করা আর নিফাকের আলামত হলো, আনসারদের ঘৃণা করা”[60]

নয়. আলী ইবন আবী তালেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে মহব্বত করা:

যুর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আলী ইবন আবী তালেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,

«وَالَّذِي فَلَقَ الَحبَّةَ، وَبَرَأَ النَّسَمَةَ إِنَّهُ لَعهْدُ النَّبيِِّ الأُِّميِّ إلَي أَنَّهُ لا يُحبِّنيِ إلِا مُؤمِنٌ ولا يُبْغِضُنيِ إلِا مُنَافقِ»

“আমি ঐ সত্তার শপথ করে বলছি যিনি বীজ থেকে অঙ্কুর উৎপন্ন করেন এবং মানবাত্মাকে সৃষ্টি করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই আমাকে জানান যে, আমাকে শুধু মুমিনরাই মহব্বত করবে আর যারা আমাকে ঘৃণা করবে তারা হলো মুনাফিক”[61]

 মুনাফিকদের বিষয়ে একজন ঈমানদারের অবস্থান কি হওয়া উচিত?

মুনাফিকদের সাথে কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাদের ক্ষতিকে কোনো ক্রমেই ছোট মনে করা যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের মুনাফিকদের তুলনায় বর্তমান যুগের মুনাফিকরা আরো অধিক ভয়ঙ্কর।

হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«إن المنافقين اليوم شر منهم على عهد النبي صلى الله عليه وسلم كانوا يومئذ يسرون واليوم يجهرون»

“বর্তমান যুগের মুনাফিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের মুনাফিকদের তুলনায় আরো বেশি ভয়ঙ্কর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে তারা গোপনে কাজ করত, আর বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে মুনাফেকি করে।”[62]

তাদের বিষয়ে একজন মুসলিমের অবস্থান:

১. মুনাফিকদের আনুগত্য করা হতে বিরত থাকা:

কখনোই মুনাফিকদের আনুগত্য করা যাবে না। কারণ, তারা কখনোই মুসলিমদের কল্যাণ চায় না তারা চায় ক্ষতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ وَلَا تُطِعِ ٱلۡكَٰفِرِينَ وَٱلۡمُنَٰفِقِينَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمٗا﴾ [الأحزاب: 1]

“হে নবী, আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সম্যক জ্ঞানী, মহাপ্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ১]

আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা তাবারী রহ. আল্লাহ তা‘আলা তার স্বীয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ “হে নবী, আল্লাহকে ভয় কর” অর্থাৎ হে নবী! তুমি আল্লাহকে তার আনুগত্যের মাধ্যমে ভয় কর। তোমার জন্য যা করা কর্তব্য ও তোমার ওপর যা ফরয করা হয়েছে, তা আদায় কর এবং যে সব নিষিদ্ধ কাজ হতে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তা করা হতে বিরত থাক। ﴿لَا تُطِعِ ٱلۡكَٰفِرِينَ “আর তুমি কাফিরদের আনুগত্য করো না।” যারা তোমাকে বলে, তুমি তোমার আশপাশ থেকে দুর্বল, গরীব, মিসকিন ও অসহায় ঈমানদারদের সরিয়ে দাও। তাদের তুমি আনুগত্য করো না। وَٱلۡمُنَٰفِقِينَۚ আর তুমি মুনাফিকদের আনুগত্য করো না যারা তোমার নিকট এসে প্রকাশ করে যে, তারা ঈমানদার ও তোমার সহযোগী। বাস্তবে তারা ঈমানদার নয়, তারা কখনোই তোমাকে ও তোমার সাথীদেরকে বন্ধু বানাবে না। তুমি তাদের থেকে কোনো মতামত নিয়ো না এবং তাদের কোনো পরামর্শ গ্রহণ করো না। কারণ, তারা তোমার দুশমন ও আল্লাহর দীনের দুশমন।إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمٗا নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সম্যক জ্ঞানী, মহাপ্রজ্ঞাময়। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তারা তাদের অন্তরে যা কিছু গোপন করে তা জানেন। আর তারা প্রকাশ্যে তোমার কল্যাণকামী হওয়ার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ও জানেন। আল্লাহ তা‘আলা তোমার ও তোমার সাহাবীদের এবং দীনের যাবতীয় কর্মের আঞ্জাম দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং সমগ্র মাখলুকের যাবতীয় পরিচালনায় তিনি সম্যক জ্ঞানী।[63]

২. মুনাফিকদের সাথে বিতর্ক করা থেকে বিরত থাকা, তাদের ধমক দেওয়া ও ভালো হওয়ার জন্য উপদেশ দেওয়া:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿بَشِّرِ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ بِأَنَّ لَهُمۡ عَذَابًا أَلِيمًا﴾ [النساء : 137]

“তুমি মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَعۡلَمُ ٱللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمۡ فَأَعۡرِضۡ عَنۡهُمۡ وَعِظۡهُمۡ وَقُل لَّهُمۡ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ قَوۡلَۢا بَلِيغٗا﴾ [النساء: 63]

“ওরা হলো সেসব লোক, যাদের অন্তরে কি আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও এবং তাদেরকে সদুপদেশ দাও। আর তাদেরকে তাদের নিজদের ব্যাপারে মর্মস্পর্শী কথা বল”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৩]

আয়াতের ব্যাখ্যা: হে মুহাম্মাদ! ঐ সব মুনাফিক যাদের বর্ণনা আমি তোমাকে দিয়েছি, তারা তোমার নিকট বিচার ফায়সালা নিয়ে আসা বাদ দিয়ে তাগুতের নিকট বিচার ফায়সালা নিয়ে যাওয়াতে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা জানেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَعۡلَمُ ٱللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمۡ “তাদের অন্তরে কি আছে আল্লাহ তা জানেন” যদিও তারা শপথ করে বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য ভালোই ছিল। আমরা কখনোই খারাপ চাইনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَأَعۡرِضۡ عَنۡهُمۡ وَعِظۡهُمۡ তুমি তাদের থেকে বিরত থাক। তাদের দৈহিক ও শারীরিক কোনো প্রকার শাস্তি দিও না। তবে তাদের ওপর নাযিল হওয়া আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে তাদের ভয় দেখিয়ে তাদের উপদেশ দাও। আর তাদের শাস্তি হলো, তারা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে যে সন্দেহ পোষণ করে তার কারণে তাদের ঘরে বাড়ীতে আযাব নাযিল হওয়া। আল্লাহ তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَقُل لَّهُمۡ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ قَوۡلَۢا بَلِيغٗا আর তুমি আল্লাহকে ভয় করতে এবং তার রাসূল তাদের আযাবের যে ওয়াদা ও হুমকি দিয়েছো তার প্রতি বিশ্বাস করতে বল।[64]

৩. তাদের সাথে বিতর্ক না করা এবং তাদের থেকে আত্মরক্ষা করা:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تُجَٰدِلۡ عَنِ ٱلَّذِينَ يَخۡتَانُونَ أَنفُسَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَّانًا أَثِيما﴾ [النساء: 107]

“আর যারা নিজেদের খিয়ানত করে তুমি তাদের পক্ষে বিতর্ক করো না। নিশ্চয় আল্লাহ ভালবাসেন না তাকে, যে খিয়ানতকারী, পাপী।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৭]

“হে মুহাম্মাদ! তুমি বিতর্ক করো না তাদের পক্ষে যারা নিজেদের খিয়ানত করে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ঐ সব লোকদের পছন্দ করেন না যাদের গুণ হলো, মানুষের সম্পদে খিয়ানত করা এবং আল্লাহ তা‘আলা যে সব কাজ করতে নিষেধ করছে তা করা।[65]

৪. তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা থেকে বিরত থাকা:

মুনাফিকদের কখনোই অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ بِطَانَةٗ مِّن دُونِكُمۡ لَا يَأۡلُونَكُمۡ خَبَالٗا وَدُّواْ مَا عَنِتُّمۡ قَدۡ بَدَتِ ٱلۡبَغۡضَآءُ مِنۡ أَفۡوَٰهِهِمۡ وَمَا تُخۡفِي صُدُورُهُمۡ أَكۡبَرُۚ قَدۡ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلۡأٓيَٰتِۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ﴾ [آل عمران: 118]

“হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না। তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে। তাদের মুখ থেকে তো শত্রুতা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আর তাদের অন্তরসমূহ যা গোপন করে তা মারাত্মক। অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৮]

মুসলিমদের এক দল সম্পর্কে নাযিল হয়, যাদের সহযোগী ছিল ইয়াহুদী ও মুনাফিক। ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে তাদের সাথে যে সব কারণে বন্ধুত্ব ছিল, সে সব কারণে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিষেধ করেন এবং তাদের কোনো বিষয়ে উপদেশ দিতে নিষেধ করেন।[66]

৫. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং তাদের বিষয়ে কঠোর হওয়া:

মুনাফিকদের বিষয়ে কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ جَٰهِدِ ٱلۡكُفَّارَ وَٱلۡمُنَٰفِقِينَ وَٱغۡلُظۡ عَلَيۡهِمۡۚ وَمَأۡوَىٰهُمۡ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ﴾

“হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের ওপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭৩]

ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা‘আলা তার স্বীয় রাসূলকে নির্দেশ দেন যে, ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ جَٰهِدِ ٱلۡكُفَّارَ হে নবী আপনি কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করেন তলোয়ার ও অস্ত্র নিয়ে।وَٱلۡمُنَٰفِقِينَ আর মুনাফিকদের সাথেও জিহাদ করুন। মুনাফিকদের সাথে জিহাদ করা অর্থ কি এ বিষয়ে, মুফাসসিরদের মধ্যে একাধিক মত আছে, তাদের সাথে জিহাদ হলো হাত ও মুখ দ্বারা। আর যা কিছু দ্বারা তাদের সাথে জিহাদ করা সম্ভব হয়। এটিই হলো, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদের মতামত।[67]

৬. মুনাফিকদের নিকৃষ্ট বলে জানা এবং কখনো তাদের কাউকে নেতা না বানানো:

বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا تَقُولُوا للِمُناَفقِِ سَّيدٌ، فَإنِّهُ إنِْ يَكُ سَّيدًا فَقَدْ أَسْخْطُتمْ ربَّكُمْ عَزَّ وَجَلَّ»

“তোমরা মুনাফিকদের কখনোই নেতা বলে সম্বোধন করো না। কারণ, যদি তোমরা তাদেরকে সরদার বল, তাহলে তোমরা তোমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করলে ও কষ্ট দিলে।

৬. তারা মারা গেলে তাদের জানাজায় অংশ গ্রহণ করা হতে বিরত থাকা:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا وَلَا تَقُمۡ عَلَىٰ قَبۡرِهِۦٓۖ إِنَّهُمۡ كَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَمَاتُواْ وَهُمۡ فَٰسِقُونَ﴾ [التوبة: 84]

“আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার ওপর তুমি জানাজা পড়বে না এবং তার কবরের ওপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮৪]

আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিন বলেন,

«لما توفي عبد الله بن أُبيّ جاء ابنه إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم: فقال يا رسول الله، أعطني قميصَك أكفنه فيه وصلِّ عليه واستغفِر له، فأعطاه قميصه وقال إذَا فَرَغْتَ مِنْهُ فَآذِنَّا فلمّا فرغ آذنه به، فجاء ليصلّي عليه، فجذبه عمر، فقال أليس قد نهاك الله أن تصلّي على المنافقين ؟! فقال... »

“আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল মারা গেলে তার ছেলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল! তুমি তোমার পরিধেয় কাপড়টি আমার নিকট দাও! তাতে আমি আমার পিতাকে কাফন দেবো। আর তুমি তার ওপর সালাতে জানাজা পড় এবং তার জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাও। তার প্রস্তাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মত হয়ে তাকে তার জামাটি দিয়ে দেয় এবং তাকে বলে, তুমি যখন কাফন থেকে ফারেগ হবে, তখন আমাকে খবর দেবে। তারপর যখন তারা কাফন থেকে ফারেগ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খবর দিল। খবর পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর সালাতে জানাজা আদায়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে টেনে ধরে বলেন, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আল্লাহ তা‘আলা কি আপনাকে মুনাফিকদের ওপর সালাতে জানাজা পড়তে নিষেধ করে নি? তখন তিনি বলেন, আমি তাদের জন্য ক্ষমা চাই বা না চাই উভয়টি সমান। আর আমি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা চাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا وَلَا تَقُمۡ عَلَىٰ قَبۡرِهِۦٓۖ إِنَّهُمۡ كَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَمَاتُواْ وَهُمۡ فَٰسِقُونَ আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার ওপর তুমি জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের ওপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ওপর সালাত আদায় করা ছেড়ে দেন।[68]

 পরিশিষ্ট

উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা মুনাফিকদের তৎপরতা ও নিফাকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আমরা কিছুটা হলেও জানতে পারছি। নিফাক এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি ও নিন্দনীয় চরিত্র, যা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতি ও মারাত্মক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা নিফাকের গুণে গুণান্বিত তাদের গাদ্দার, খিয়ানত কারী, মিথ্যুক ও ফাজের বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, একজন মুনাফিক তার ভিতরে যা আছে, সে তার বিপরীত জিনিসটিকে প্রকাশ করে। সে নিজেকে সত্যবাদী দাবী করলেও সে নিজেই জানে নিশ্চয় সে একজন মিথ্যুক। সে নিজেকে আমানতদার দাবী করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে একজন খিয়ানত কারী। অনুরূপভাবে সে দাবি করে যে, সে প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী কিন্তু সত্যি হলো, সে একজন গাদ্দার। একজন মুনাফিক তার প্রতিপক্ষের লোকদের নানান ধরনের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকে, অথচ সে নিজেই ফাজের অশ্লীল ও অন্যায় কাজে লিপ্ত। মুনাফিকদের চরিত্রই হলো, ধোঁকা দেওয়া, প্রতারণা করা ও মিথ্যাচার করা। যদি কোনো মুসলিমের মধ্যে এ ধরনের কোনো চরিত্র পাওয়া যায়, তাহলে আশংকা হয় যে, তাকে বড় নিফাক- ঈমান হারা- আক্রান্ত করতে পারে। কারণ, নিফাকে আমলী যদিও এমন এক অপরাধ বা কবিরা গুনাহ যা বান্দাকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, কিন্তু যখন একজন বান্দার মধ্যে তা প্রগাঢ় হয়ে যায় বা গেঁথে বসে, তখন তার চরিত্র ধীরে ধীরে মিথ্যাচার, প্রতারণা ও ধোঁকা দেওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে থাকে। তারপর যখন তার চরিত্রের আরো অবনতি ঘটে তখন সে আল্লাহর মাখলুকের সাথে যে ধরনের আচরণ করে, তার প্রভুর সাথেও ঠিক একই ধরনের আচরণ করে। অতঃপর তার অন্তর থেকে ঈমান হরণ করা হয়, তার পরিবর্তে তাকে দেওয়া হয়ে নিফাক, আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি ও হুমকি।

আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা হলো, আল্লাহ তা‘আলা যেন আমাদের অন্তরসমূহকে সংশোধন করে দেন। আমাদেরকে প্রকাশ্য ও গোপনীয় যাবতীয় ফিতনা হতে দূরে রাখেন। আমীন!

وصلى الله وسلم على نبينا محمد.

 অনুশীলনী

তোমার সামনে দুই ধরনের প্রশ্ন আছে, এক ধরনের প্রশ্ন যা তুমি সাথে সাথে উত্তর দিতে পারবে। আর এক ধরনের প্রশ্ন আছে যে গুলো গভীর চিন্তা ভাবনা ও ফিকির করার প্রয়োজন আছে।

প্রথম প্রকার প্রশ্ন:

1. নিফাকের শাব্দিক ও আভিধানিক অর্থ কি?

2. নিফাকের প্রকার গুলো কি?

3. নিফাকে ইতিকাদী ও নিফাকে আমলীর মধ্যে পার্থক্য কি?

4. মুনাফিকদের কিছু আলামত ও গুণ রয়েছে, সে গুলোর থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আলোচনা কর।

5. একজন মুসলিম কীভাবে নিজেকে নিফাক থেকে রক্ষা করবে?

3. মুনাফিকদের সাথে একজন মুসলিমের অবস্থান কি হওয়া উচিৎ?

দ্বিতীয় প্রকার প্রশ্ন:

১. নিফাকে আসলি আর নিফাকে আমলীর মধ্যে পার্থক্য কি?

২. মদিনায় কেন নিফাক প্রকাশ পেল কিন্তু মক্কায় নিফাক প্রকাশ পেল না?

৩. আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, «الغناء ينبت النفاق في القلب» এ কথাটির ব্যাখ্যা কর।

৪. ইমাম নববী রহ. উল্লেখ করেন, আলেমগণ নিম্ন বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আসের হাদীসটিকে মুশকিল বলে উল্লেখ করেন হাদীসটির বিশুদ্ধ অর্থ কি?

«أَرْبعٌ مَن كُنَّ فِيهِ كَانَ مُناَفقًا خَالصِا، وَمَن كَانَتْ فيِهِ خَصْلَةٌ مِنهْنَّ كَاَنتْ فِيهِ خَصْلٌة مِنَ النفِّاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إذَِا حَدَّثَ كَذََب، وَإذَِا عَاَهَد غَدرَ، وَإذَِا وَعَدَ أَْخلَفَ، وَإذَِا خَاصَمَ فَجَرَ»

“চারটি গুণ যার মধ্যে একত্র হবে, সে সত্যিকার মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ চারটি গুণের যে কোনো একটি থাকবে সে যতদিন পর্যন্ত তা পরিহার না করবে, তার মধ্যে নিফাকের একটি গুণ অবশিষ্ট থাকল। গুণগুলো হলো, যখন কথা বলে মিথ্যা বলে। আর যখন কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা লঙ্ঘন করে, আর যখন ওয়াদা করে তা খিলাফ করে, যখন ঝগড়া-বিবাদ করে, সে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে।

সমাপ্ত

নিফাক একটি মারাত্মক ব্যাধি যা একজন মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতকে ধ্বংস করে দেয়। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এর পরিণতি খুবই মারাত্মক। এর কারণে মানুষের অন্তর কঠিন হয় এবং পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি পায়। তাই নিফাক থেকে সতর্ক থাকা এবং মুনাফেকদের চরিত্র থেকে নিজেকে হিফাযত করা খুবই জরুরি। এ গ্রন্থে নিফাকের সংজ্ঞা, মুনাফিকদের চরিত্র ও নিফাক থেকে বাঁচার উপায় ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়।



[1] দেখুন লিসানুল আরব ১০/৩৫৭ আরো দেখুন, মুজামু মাকায়েসুললুগাহ ৫/৪৫৫।

[2] তাফসীরুল কুরআনীল আযীম ১/১৭২।

[3] মাজমুউল ফতাওয়া ৭/৫২৪।

[4] জামে’উল উলুম ওয়াল হিকাম ১/৪৩১।

[5] তরীকুল হিজরাতাইন পৃ. ৫৯৫।

[6] জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম ১/৪৩১।

[7] সীয়ারে আ-লামুন নুবালা ৬/৩৮২, আল্লামা যাহাবী বলেন হাদীসের সনদটি বিশুদ্ধ।

[8]  সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৫০।

[9] শরহে নববী লি-মুসলিম ১৭/৬৬-৬৭।

[10] ইবন আবি শাইবা এটি বর্ণনা করেছেন, আল-মুসান্নাফ ৮/৬৩৭।

[11]  সহীহ বুখারী ১/২৬।

[12]  মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৫৮।

[13] এহইয়াউ ‘উলুমুদ্দিন ৪/১৭২।

[14]  জামেউল বয়ান ২০/২৫৮।

[15] মাদারেজুস সালেহীন ১/৩৫০।

[16]  জামেউল বায়ান ৯/৩১৯

[17]  জামেয়ুল বায়ান ৯/৩২৪

[18] জামেউল বায়ান ৫/৩২৯।

[19] জামেউল বায়ান ৯/৩৩৩।

[20] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৮৪।

[21]  শরহে নববী ১৭/১২৮।

[22]  জামেউল বায়ান ১/২৭২।

[23]  মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৫৩।

[24]  তাফসীরুল কুরআন আল-আযীম ৪/১৬০।

[25]  তাফসীরুল কুরআন আল আজীম ৪/১৬৩।

[26] মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৫৪।

[27] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৬৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭৭৭।

[28] তাফসীরুল কুরআন আল-আযীম ১৮২/২।

[29] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৬৬৮) সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১৮)

[30] তাফসীরুল কুরআন আল-আযীম ৪/১৮৪।

[31]  তাফসীরুল কুরআন আল-আযীম ৪/১৯২।

[32] তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/১৭৩।

[33] তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/১৭৯।

[34]  জামেউল বায়ান ৮/৫৩৮।

[35]  তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/১৬১।

[36] তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/২০১।

[37] তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/৪০৭।

[38] তাফসীরুল কুরআনীল আযীম ২/১০৬।

[39] তাফসীরুল কুরআন আল আযীম ৪/৮৩

[40] মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৪৯।

[41]  সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮।

[42] শরহে মুসলিম ২/৪৬-৪৭।

[43] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬২২।

[44]  মাদারেজুস সালেকীন ১/৩৫৪।

[45] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৫৪।

[46] দেখুন ‘আওনুল মাবুদ ২/১৭৯।

[47] তিরমিযী, হাদীস নং ২০২৭। হাকিম হাদীটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন।

[48] তরিকুল হিজরাতাইন ৬০৩।

[49] শুয়াবুল ঈমান ১০/২২৩।

[50]  ইগাসাতুল নাহকান ১/২৫০।

[51] তুহফাতুল আহওয়াযী ২/৪০।

[52] তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৮৪। আল্লামা আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন।

[53]  সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৩।

[54] শরহে নববী ৩/১০১।

[55] হুলয়াতুল আওলিয়া ২/৩৩৮।

[56] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১০।

[57] শরহে নববী ১৩/৫৬।

[58]  আল ওয়াবেলুস সাইয়েব পৃ. ১১০।

[59] সীয়ারু আলামীন নুবালা ৬/৩৮২, আল্লামা যাহাবী বলেন, সনদটি সহীহ।

[60]  সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৪।

[61] সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৭৮।

[62]  সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১১৩।

[63]  জামেউল বায়ান ২০/২০২

[64] জামেউল বায়ান ৮/৫১৫।

[65] জামে’উল বায়ান ৯/১৯০

[66] জামেউল বায়ান ৭/১৪০।

[67] জামেউল বায়ান ১৪/৩৬০

[68] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৯৬।