উপদেশতত্ত্ব

[ بنغالي – Bengali – বাংলা ]

আকীল ইবন মুহাম্মাদ আল-মাকতিরী

—™

অনুবাদ: ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 ভূমিকা

بسم الله الرحمن الرحيم

সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য, আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি, যিনি নবীদের ইমাম, উপদেশদাতাদের নেতা, যিনি বলেন,

«الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ»

“দীন হচ্ছে কল্যাণ কামনা করা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের জন্য।”[1]

অতঃপর......

উপদেশ হচ্ছে দীনের অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ। কারণ, নসীহতের অবর্তমানে হক বাতিলের সাথে মিশে যাবে এবং দেখা যাবে যে, সত্য মিথ্যায়, মিথ্যা সত্যে পরিণত হয়েছে। এ জন্যই এক মুসলিম ভাইয়ের ওপর অন্য মুসলিমের অন্যতম অধিকার হচ্ছে: “যখন সে তোমার নিকট উপদেশ চাইবে, তখন তাকে উপদেশ দিবে।”

প্রাথমিকভাবে এক মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইকে উপদেশ দিবে, আবার কখনও কখনও সে উপদেশ চাইলে তাকে উপদেশ দিবে। তবে অনেক সময় উপদেশদাতা তার কথার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না। ফলে সে উপদেশের ক্ষেত্রে কঠোর (রূঢ়) শব্দ প্রয়োগ করে এবং আঘাত দিয়ে কথা বলে। আবার কোনো কোনো সময় উপদেশের সময়-কাল ও স্থান নির্ণয়ে ভুল করে।

এসব বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নসীহত বা উপদেশের ক্ষেত্রে উৎসাহব্যঞ্জক ও সুন্নাহ সমর্থিত উপদেশ দেওয়া। যাদের মধ্যে এ যোগ্যতা নেই, তাদেরকে আমরা শিশু ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রের মত মনে করি!! যারা আলিম-ওলামা, দা‘ঈ (আল্লাহর পথে আহ্বানকারী), ইসলামি সংগঠন ও বিভিন্ন কল্যাণ সংস্থার সমালোচনা করে, কথা-বার্তায় নির্লজ্জতা প্রকাশ করে এবং শিষ্টাচার বহির্ভূতভাবে গালমন্দ করে।

সেখানে যে নিজেকে জনগণের মানদণ্ড মনে করে, কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন তার কথা ও কাজের বিরোধিতা করলে, সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। আর এসব করে নসীহতের দোহাই দিয়ে।

ময়দানে অনেক বই-পুস্তক ও ক্যাসেটের সরবরাহ দেখা যায়, যেগুলো গালমন্দ দ্বারা পরিপূর্ণ, যা তার স্বত্বাধিকারীগণ নসীহত নামে চালিয়ে দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, এগুলো শুনতে অন্যদের কানে অপমানজনক ও আপত্তিকর শুনায়। এসব বই-পুস্তক ও ক্যাসেটের মধ্যে আলিমদেরকে সমালোচনার বাণে বিদ্ধ করা হয়েছে। এর একমাত্র কারণ গবেষণালব্ধ মাসআলার ক্ষেত্রে মতানৈক্য অথবা তারা ঐসব পুস্তক ও ক্যাসেটের লেখক ও সম্পাদকদের সাথে বিভিন্ন মতভেদ সৃষ্টি করেছেন। তাছাড়া ঐসবের মধ্যে হিংসুক ও নিন্দুকদের কথার ওপর ভিত্তি করে দা‘ঈ তথা আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের সমালোচনা ও কুৎসা রটনা করা হয়েছে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই বলা হয়েছে, সে এ কথা বলেছে বা সে এই কাজ করেছে ইত্যাতি ইত্যাদি। আর এ কারণেই আমি এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এই ক্ষুদ্র পুস্তকটি লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি এবং তার নাম দিয়েছি فقه النصيحة (উপদেশতত্ত্ব)। আল্লাহ তা‘লার নিকট আবেদন করছি, তিনি যাতে এর দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করেন। তিনি শুনেন এবং আবেদন কবুল করেন।

আকীল আল-মাকতিরী

 নসীহত-এর পরিচয়

‘লিসানুল আরব’ (২/৬১৫)-এর গ্রন্থকার বলেন, نصح শব্দের অর্থ- نصح الشيءُ: خلص (বস্তুটি বিশুদ্ধ বা নির্ভেজাল হয়েছে), والناصح: الخالص من العسل (নির্ভেজাল মধু) ইত্যাদি। কোনো বস্তু যখন বিশুদ্ধ বা নির্ভেজাল হয়, তখন বলা হয়: قد نصح (বিশুদ্ধ বা খাঁটি হয়েছে)

النصح শব্দটি الغشّ (ভেজাল বা প্রতারণা) শব্দের বিপরীত। যা نصحه (তার উপদেশ) থেকে নির্গত। এ শব্দের আরও কয়েকটি রূপ হচ্ছে:

"نصحاً و نصيحة و نَصَاحة و نِصاحة و نِصاحية و نصوحاً"

এ শব্দটি ل (লাম) صلة-এর সাথে ব্যবহার সবচেয়ে বিশুদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا يَنفَعُكُمۡ نُصۡحِيٓ إِنۡ أَرَدتُّ أَنۡ أَنصَحَ لَكُمۡ﴾ [هود: ٣٤]

“আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের উপকারে আসবে না।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৩৪]

আরও বলা হয়:

نصحتُ له نصيحتي نصوحاً أي أخلصت و صدقت.

“আমি তাকে খাঁটি উপদেশ দিয়েছি।”

ইমাম মুহাম্মাদ ইবন নসর আল-মারওয়াযী তার “তা‘যীমু কাদরিস্ সালাত” নামক কিতাবে (১/৬৯১) বলেন, কোনো কোনো আলিম বলেন, ‘নসীহত’ শব্দের ব্যাখ্যায় সারকথা হলো, যাকে উপদেশ দেওয়া হয়, তাকে আন্তরিকভাবে দেখাশুনা ও তত্ত্বাবধান করা। আর আল্লাহর জন্য এ নসীহত দু’ভাবে হয়ে থাকে: একটি ফরয হিসেবে, আর অপরটি নফল হিসেবে।

ফরয নসীহত হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে। আর তা হলো, বিশেষ যত্নসহকারে উপদেশদাতার পক্ষ থেকে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ভালোবাসায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি যা ফরয করেছেন, তা আদায় করা এবং যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকা।

আর নফল নসীহত মানে হলো, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাকে নিজের নফসের প্রতি ভালোবাসার ওপর প্রাধান্য দেওয়া। যেমন, কোনো ব্যক্তি দু’টি বস্তুর প্রস্তাব করল: একটি তার নিজের জন্য, আর অপরটি তার রবের জন্য। এ ক্ষেত্রে সে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তার রবের জন্য নির্ধারিত অংশ দিয়ে শুরু করবে এবং পরে নিজের জন্য বরাদ্ধকৃত অংশ গ্রহণ করবে।

এই হলো আল্লাহর জন্য ফরয ও নফল নসীহতের মোটামুটি ব্যাখ্যা। অনুরূপভাবে নসীহতের আরও ব্যাখ্যা রয়েছে, যার কিছু দিক আমরা আলোচনা করব ঐ ব্যক্তির বুঝার সুবিধার্থে, যে ব্যক্তি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দ্বারা বিষয়টি বুঝতে পারে না।

আল্লাহর জন্য নসীহতের উদ্দেশ্য হলো, তিনি যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকা, আর তিনি যা ফরয করেছেন এবং যা করলে তাঁর আনুগত্য করা হয়, সর্বশক্তি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা। তবে রোগ-ব্যাধি, বন্দীদশা ইত্যাদি নানাবিধ আপদ-বিপদের কারণে তাঁর ফরয দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যে, উল্লিখিত প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেলে সে তার ওপর অর্পিত ফরয দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَّيۡسَ عَلَى ٱلضُّعَفَآءِ وَلَا عَلَى ٱلۡمَرۡضَىٰ وَلَا عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُواْ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦۚ مَا عَلَى ٱلۡمُحۡسِنِينَ مِن سَبِيلٖ﴾ [التوبة: ٩١]

“যারা দুর্বল, যারা অসুস্থ এবং যারা অর্থ সাহায্যে অসমর্থ, তাদের কোনো অপরাধ নেই, যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের অবিমিশ্র অনুরাগ থাকে। যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো হেতু নেই।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৯১]

সুতরাং আয়াতে প্রতিবন্ধী মুমিনগণ নিজেদেরকে জিহাদ থেকে বিরত রাখার পরেও আল্লাহ তা‘আলার প্রতি তাদের আন্তরিক অনুরাগের কারণে তিনি তাদেরকে মুহসিনীন তথা সৎকর্মশীল বলে নামকরণ করেছেন।

কোনো কোনো অবস্থায় বান্দার সকল শর‘ঈ কর্ম-কাণ্ডের দায়বদ্ধতা রহিত হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর প্রতি তার অনুরাগ বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ অসুস্থতার কারণে বান্দা এমন পরিস্থিতির শিকার হয় যে, তার পক্ষে জিহ্বা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কোনো কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠে না, কিন্তু তার বিবেক ও আল্লাহর প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা ও অনুরাগ বিদ্যমান থাকে, সে তার অপরাধের জন্য লজ্জিত হয় এবং নিয়ত করে যে, সে সুস্থ হলে আল্লাহ তার ওপর যা ফরয করেছেন তা বাস্তবায়ন করবে, আর যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকবে। অনুরূপভাবে তার রবের নির্দেশক্রমে তিনি জনগণের জন্য যা বাধ্যতামূলক করেছেন, সে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নসীহত করবে।

আল্লাহর ওয়াজিব নসীহতের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, অপরাধীর অপরাধকে অপছন্দ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকারীর আনুগত্যকে পছন্দ করা।

আর নফল নসীহত হচ্ছে, মনে-প্রাণে প্রত্যেক প্রিয় ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর আল্লাহকে প্রাধান্য দেওয়ার মত প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে নসীহতকারী অন্যের ওপর প্রাধান্য না পায়। কারণ, যাকে উপদেশ দেওয়া হয় উপদেশদাতা যখন তার কল্যাণ কামনায় ব্যস্ত থাকে, তখন সে নিজেকে তার ওপর প্রাধান্য দেয় না। আর হাসি-আনন্দ ও ভালোবাসা যা দরকার তার জন্য সে তাই করে। সুতরাং অনুরূপ নিয়ম স্বীয় রবের প্রতি অনুরাগী ব্যক্তির বেলায়ও প্রযোজ্য। চিন্তা-গবেষণা না করেই যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নফল কাজ করল, সে তার আমল পরিমাণই আল্লাহর হিতাকাঙ্ক্ষী বলে বিবেচিত হবে, পরিপূর্ণ হিতাকাঙ্ক্ষী বলে বিবেচিত হবে না।

আল্লাহর কিতাবের জন্য নসীহত:

আল্লাহর কিতাবের জন্য নসীহত মানে হলো, স্রষ্টার বাণী হওয়ার কারণে তার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা এবং তার মর্ম অনুধাবনে যথার্থ আগ্রহ প্রকাশ করা। অতঃপর তার গবেষণায় বিশেষ যত্নবান হওয়া, তিলাওয়াতের সময় ওয়াকফসহ তিলাওয়াত করা, যাতে তার মাওলার পছন্দসই অর্থ অনুসন্ধান ও অনুধাবন করা যায় এবং সে অনুযায়ী আমল করা যায়। অনুরূপভাবে উপদেশদাতা আন্তরিকভাবে ঐ ব্যক্তির অসিয়তকে অনুধাবন করবে, যার কল্যাণ কামনা সে করে থাকে এবং তার পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বক্তব্য থাকলে মনোযোগসহ তা অনুধাবন করবে, যাতে সে লিখিত বক্তব্যের মর্মানুযায়ী কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে। অনুরূপভাবে আল্লাহর কিতাবের হিতাকাঙ্ক্ষী মানে হলো, সে কিতাবের মর্ম উপলব্দি করবে, যাতে আল্লাহর নির্দেশসমূহ তাঁর পছন্দমত ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, অতঃপর সে যা অনুধাবন করেছে, তা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে প্রচার করবে, আন্তরিকতাসহকারে আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন অব্যহত রাখবে, তার চরিত্রকে নিজের চরিত্র হিসেবে এবং তার শিষ্টাচারকে নিজের শিষ্টাচাররূপে গ্রহণ করবে।[2]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নসীহত:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নসীহত মানে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর আনুগত্য ও সাহায্য-সহযোগিতায় সর্বাত্মক চেষ্টা করা, তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সম্পদ ব্যয় করা এবং তাঁর ভালোবাসায় প্রতিযোগিতা করা। আর তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আদর্শের অনুসন্ধানে যত্নবান হওয়া, তাঁর চরিত্র ও শিষ্টাচার নিয়ে গবেষণা করা, তাঁর আদেশ-নির্দেশের সম্মান করা ও তার যথাযথ বাস্তবায়নকে কর্তব্য বলে মনে করা, তাঁর সুন্নাতের বিপরীত মতাদর্শের অনুসারীকে ঘৃণা করা ও এড়িয়ে চলা, যে ব্যক্তি দুনিয়াবী স্বার্থে সুন্নাতকে ধ্বংস করে, তাকে অভিশাপ দেওয়া, যদিও সে নিজেকে ধার্মিক মনে করে, আর যে ব্যক্তি আত্মীয়তা, বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা, হিজরত, সাহায্য-সহযোগিতা, ইসলাম গ্রহণসহ দিবা-রাত্রির কিয়দংশের সহবত ও পোষাক-পরিচ্ছদে তাঁর অনুকরণের দ্বারা তাঁর নৈকট্য অর্জন করেছে, তাকে মহব্বত করা।

মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য নসীহত:

মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য নসীহত মানে হচ্ছে: তাদের আনুগত্য, পথনির্দেশ, ন্যায়পরায়নতা ও তাদের ব্যাপারে উম্মতের ঐক্যবদ্ধতাকে মহব্বত করা। আর অপছন্দ করা তাদের ব্যাপারে উম্মতের অনৈক্যকে। আর আল্লাহর আনুগত্যের শর্তসাপেক্ষে তাদের আনুগত্যকে দীন হিসেবে গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বের হওয়ার জন্য উসকানি দেয়, তাকে ঘৃণা করা এবং আল্লাহর আনুগত্য করার কারণে তাদেরকে সম্মান প্রদর্শন করা।

মুসলিম ব্যক্তিবর্গের জন্য নসীহত:

মুসলিম ব্যক্তিবর্গের জন্য নসীহত বা কল্যাণ কামনা মানে, নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তাই পছন্দ করা, নিজের জন্য যা অপছন্দ করা হয়, তাদের জন্যও তা অপছন্দ করা, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের ছোটদেরকে স্নেহ করা ও বড়দেরকে সম্মান করা, তাদের দুঃখে দুঃখিত হওয়া এবং তাদের আনন্দে আনন্দিত হওয়া, যদিও এসব কারণে নসীহতকারী ব্যক্তি দুনিয়াবী ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যেমন, ব্যবসায়ীক বেচা-কেনায় মুনাফা লাভের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের দ্রব্যমূল্য হ্রাস করে দেওয়া। আর অনুরূপভাবে যে সকল বস্তু তাদেরকে কষ্ট দেয়, সামগ্রিকভাবে সেসব অসুবিধা দূর করে দেওয়া। আর মনে-প্রাণে তাদের সততা, আন্তরিকতা, অনন্ত নি‘আমত ও শত্রুর ওপর বিজয় লাভের তাওফীক কামনা করা এবং তাদের থেকে যাবতীয় কষ্টদায়ক ও অপছন্দনীয় বস্তু দূর করে দেয়।[3]

ইবন ‘আল্লান ‘দলীলুল ফালিহিন’ (২/২৫৭) গ্রন্থে বলেন, ইমাম নববী রহ.-এর সংকলিত হাদীস গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ “শরহুল আরবা‘য়ীনা আন্ নববীয়া”-এর মধ্যে আল-ফাকিহাতি বলেন, নসীহত: এ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ যা উপদেশ দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির জন্য সকল কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। বলা হয়, এই শব্দটি সংক্ষিপ্ত ইসম ও সংক্ষিপ্ত বাক্যের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, আরবি ভাষায় এমন কোনো একক শব্দ নেই, যা নসীহত শব্দের অর্থের চেয়ে পরিপূর্ণ অর্থবোধক, যেমনিভাবে আরবগণ الفلاح (কল্যাণ) শব্দের ব্যাপারে বলেন, আরবদের ভাষায় الفلاح (কল্যাণ) শব্দের বিকল্প এমন কোনো শব্দ নেই, যা উভয় জগতের সমুদয় কল্যাণকে শামিল করে।

আর এই নসীহত শব্দটি আরবি نصح الرجل ثوبه إذا خاطه (লোকটি তার কাপড় সেলাই করল) থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। উপদেশদাতা উপদিষ্ট ব্যক্তির জন্য যে কল্যাণকর চিন্তা-ভাবনা করেন, সে কাজটিকে সেলাই কর্মের মাধ্যমে ছেঁড়া কাপড় মেরামতের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন, নসীহত শব্দটি আরবি نصحت العسل إذا صفيته من الشمع (আমি মোম থেকে মধু শোধন করেছি) থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে প্রতারণামূলক কথা থেকে নির্ভেজাল তথা সত্য কথা বের করার কাজটিকে মধুকে শোধন করে ভেজালমুক্ত করণের সাথে তুলনা করা হয়েছে।[4]

الدين النصيحة- (দীন হচ্ছে কল্যাণকামনা করা) এর মর্মার্থ:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী الدين النصيحة (দীন হচ্ছে কল্যাণ কামনা করা)-এর মানে হলো, “নসীহত হচ্ছে দীনের অন্যতম ভিত্তি ও অবকাঠামো।” যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: الحج عرفة (হজ হচ্ছে আরাফার ময়দানে অবস্থান)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা لله (আল্লাহর জন্য)-এর ব্যাখ্যায় আল-খাত্তাবী রহ. বলেন, النصيحة لله (আল্লাহর জন্য নসীহত) মানে- আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা, তার সাথে কাউকে শরিক না করা, তাঁর গুণাবলী ও নামের ক্ষেত্রে নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারা পরিহার করা, তাঁকে পরিপূর্ণ গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত করা, যাবতীয় অপূর্ণতা থেকে তাঁকে পবিত্র রাখা, তাঁর আনুগত্য কায়েম করা, তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা, তাঁর জন্যই কাউকে ভালোবাসা, তাঁর জন্যই কাউকে ঘৃণা করা, যে তাঁর আনুগত্য করে, তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা, যে তাঁর অবাধ্য হয়, তার সাথে শত্রুতা করা, যে তাঁকে অবিশ্বাস তথা অস্বীকর করে, তার সাথে জিহাদ করা, তাঁর নি‘আমতের স্বীকৃতি দেওয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, সকল কাজে ইখলাস তথা নিষ্ঠার পরিচয় দেওয়া, উল্লিখিত গুণাবলীর দিকে জনগণকে দাওয়াত দেওয়া এবং এগুলোর প্রতি উৎসাহিত করা, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের মধ্যে যাকে সম্ভব এসব বিষয় শিক্ষা দেওয়া।

আল-খাত্তাবী রহ. বলেন, প্রকৃতপক্ষে এসব গুণাবলী বান্দার নিজের কল্যাণের দিকেই প্রত্যাবর্তিত। কারণ, আল্লাহর জন্য উপদেষ্টা বা হিতাকাঙ্ক্ষীর হিতোপদেশের দরকার হয় না, তিনি মুখাপেক্ষীহীন সত্তা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ولكتابه (তাঁর কিতাবের জন্য)-এর ব্যাখ্যায় আলিমগণ বলেন, ‘কিতাবের জন্য নসীহত মানে- এই প্রত্যয় থাকা যে, এটা আল্লাহর কিতাব, অবতীর্ণ এই কিতাবের বাণী কোনো সৃষ্টির কথার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয় এবং কারো পক্ষে এরূপ কথা তৈরি করাও সম্ভব নয়। অতঃপর আল্লাহর কিতাবকে সম্মান করা, হক আদায় করে তাকে সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করা, তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিটি হরফ মাখরাজসহ আদায় করা, বিকৃতিকারীদের অপব্যাখ্যা থেকে তাকে হেফাযত করা, এর মধ্যে যা কিছু আছে, তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা, তার বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করা, তার বিজ্ঞান ও উপমা সংক্রান্ত আয়াতসমূহ অনুধাবন করা, তার উপদেশসমূহের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, তার বিস্ময়কর বিষয়সমূহ নিয়ে চিন্ত-গবেষণা করা, তার মুহকাম (সুস্পষ্ট) আয়াতসমূহের ওপর আমল করা ও মুতাশাবেহ (দ্ব্যর্থবোধক) আয়াতসমূহ মেনে নেয়া, তার ‘আম (ব্যাপক অর্থবোধক), খাস (নির্দিষ্ট অর্থবোধক), নাসিখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) আয়াতসমূহ নিয়ে গবেষণা করা, তার জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচার করা এবং তার দিকে ও তার উপদেশমালার দিকে দাওয়াত দেওয়া।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ولرسوله (তাঁর রাসূলের জন্য)-এর ব্যাখ্যা: ‘রাসূলের জন্য নসীহত’ মানে- রিসালাতের ব্যাপারে তাঁকে সত্যায়িত করা ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর আদেশ ও নিষেধসমূহ মেনে চলা, তাঁকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় সাহায্য-সহযোগিতা করা, তাঁর সাথে যে ব্যক্তি শত্রুতা করে, তার সাথে শত্রুতা করা, তাঁকে যে ব্যক্তি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা, তাঁর হকসমূহকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করা, তাঁর সুন্নাত ও জীবনাদর্শকে প্রাণবন্ত করা, তাঁর দাওয়াত ও সুন্নাতকে প্রচার ও প্রসার করা, তাঁর সুন্নাতের জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা উপকার হাসিল করা, তাঁর অর্থসমূহ উপলব্দি করা ও তার দিকে মানুষকে আহ্বান করা, তার (সুন্নাতের) শিক্ষা প্রদান ও সম্মান দানে বিনম্র হওয়া, আদবের সাথে তা পাঠ করা, না জেনে তার ব্যাপারে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকা এবং এর সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তার অনুসারীদেরকে সম্মান করা। তাছাড়া তাঁর (রাসূলের) চরিত্রের অনুকরণে নিজের চরিত্র গঠন করা, তাঁর আদব তথা শিষ্টাচারকে নিজের জন্য আদব হিসেবে গ্রহণ করা, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীদেরকে মহব্বত করা এবং বিদ‘আতপন্থী ও যে কোনো সাহাবীর সমালোচকদেরকে ঘৃণা করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ولأئمة المسلمين (মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য)-এর ব্যাখ্যা: ‘মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য নসীহত’ মানে (হকের ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য) সহযোগিতা করা, তাদের ও তাদের নির্দেশের আনুগত্য করা, বিনয় ও নম্রতার ব্যাপারে সাবধান ও স্মরণ করিয়ে দেওয়া, তারা কোনো বিষয় ভুলে গেলে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাদের নিকট না পৌঁছলে, তা তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া। আর তাদের সাথে বিদ্রোহ করার চিন্তা পরিহার করা, তাদের অনুসরণের জন্য সকল মুসলিমের হৃদয়কে ঐক্যবদ্ধ করা, তাদের মিথ্যা প্রশংসা না করা এবং তাদের জন্য কল্যাণের দো‘আ করা। মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলতে যাদেরকে বুঝানো হয়, তারা হলেন মুসলিম জনগোষ্ঠীর খলিফা ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ। আর এটাই প্রসিদ্ধ কথা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা وعامتهم (সর্বসাধারণের জন্য)-এর ব্যাখ্যা: ‘সর্বসাধারণের জন্য নসীহত’ মানে- তাদের কল্যাণ কামনা করা, তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর পথ দেখানো এবং এ জন্য তাদেরকে কথা ও কাজ দ্বারা সহযোগিতা করা, তাদের গোপনীয় বিষয় গোপন রাখা, তাদেরকে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ রাখা, তাদের জন্য ক্ষতিকারক বস্তু দূর করা ও উপকারী বস্তু আমদানি করা, তাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজ থেকে আন্তরিকতার সাথে নিষেধ করা, নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, তাদের জন্য তাই পছন্দ করা, কথা ও কাজ দ্বারা তার জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা এবং আমরা যত প্রকারের নসীহত বা উপদেশের উল্লেখ করেছি, সেগুলোর দ্বারা তাদেরকে চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করা। (‘দলীলুল ফালিহিন’-থেকে)

ফায়দা: ইবন বাত্তাল বলেন, এই হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, নসীহত হলো দীন ও ইসলামের আরেক নাম। দীন শব্দটি যেমন কথার বেলায় প্রজোয্য, তেমনি কাজের বেলায়ও প্রজোয্য। নসীহত ফরয, কোনো ব্যক্তি এ কর্তব্য কাজ পালন করলে বাকিরা দায়মুক্ত হয়ে যাবে। প্রয়োজনের আলোকে যখন উপদেষ্টা জানতে পারবে যে, তার উপদেশ গ্রহণ করা হবে, তার আদেশের আনুগত্য করা হবে এবং সে নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করবে, তখন তার জন্য অসিয়ত করা আবশ্যক হবে। আর যখন সে দুঃখ-কষ্টের আশঙ্কা করবে, সে নসীহত করার দায়িত্ব থেকে অবকাশ পাবে।

 নসীহত প্রসঙ্গে বর্ণিত আয়াতসমূহ

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী নূহ ‘আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে বলেন,

﴿أُبَلِّغُكُمۡ رِسَٰلَٰتِ رَبِّي وَأَنصَحُ لَكُمۡ وَأَعۡلَمُ مِنَ ٱللَّهِ مَا لَا تَعۡلَمُونَ ٦٢﴾ [الاعراف: ٦٢]

“আমার রবের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাচ্ছি ও তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি। আর তোমরা যা জান না, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তা জানি।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৬২]

আর হুদ ‘আলাইহিস সালাম জাতির উদ্দেশ্যে বলেন,

﴿أُبَلِّغُكُمۡ رِسَٰلَٰتِ رَبِّي وَأَنَا۠ لَكُمۡ نَاصِحٌ أَمِينٌ ٦٨﴾ [الاعراف: ٦٨]

“আমার রবের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্ক্ষী।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৬৮]

সালেহ ‘আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী বর্ণনায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَتَوَلَّىٰ عَنۡهُمۡ وَقَالَ يَٰقَوۡمِ لَقَدۡ أَبۡلَغۡتُكُمۡ رِسَالَةَ رَبِّي وَنَصَحۡتُ لَكُمۡ وَلَٰكِن لَّا تُحِبُّونَ ٱلنَّٰصِحِينَ ٧٩﴾ [الاعراف: ٧٩]

“অতঃপর সে তাদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো আমার রবের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছায়েছিলাম এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমারা তো হিতোপদেশ দানকারীদেরকে পছন্দ কর না।”[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৭৯]

শু‘আইব ‘আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী বর্ণনায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَتَوَلَّىٰ عَنۡهُمۡ وَقَالَ يَٰقَوۡمِ لَقَدۡ أَبۡلَغۡتُكُمۡ رِسَٰلَٰتِ رَبِّي وَنَصَحۡتُ لَكُمۡۖ فَكَيۡفَ ءَاسَىٰ عَلَىٰ قَوۡمٖ كَٰفِرِينَ ٩٣﴾ [الاعراف: ٩٣]

“অতঃপর সে তাদের নিকট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো আমার রবের বাণী তোমাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিয়েছি। সুতরাং আমি কাফির সম্প্রদায়ের জন্য কি করে আক্ষেপ করি।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৯৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿لَّيۡسَ عَلَى ٱلضُّعَفَآءِ وَلَا عَلَى ٱلۡمَرۡضَىٰ وَلَا عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ مَا يُنفِقُونَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُواْ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ﴾ [التوبة: ٩١]

“যারা দুর্বল, যারা অসুস্থ এবং যারা অর্থ সাহায্যে অসমর্থ, তাদের কোনো অপরাধ নেই, যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের অবিমিশ্র অনুরাগ থাকে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৯১]

হাফেয ইবন রজব (জামি‘উল ‘উলুম ওয়াল হিকাম গ্রন্থে/পৃ. ৭৪) বলেন, যে ব্যক্তি ওযরের কারণে জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে থাকে এবং এ পিছিয়ে থাকাটা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অনুরাগ ও আন্তরিকতাসহ হয়ে থাকে, তবে তা তার জন্য দোষণীয় হবে না। কারণ, মুনাফিকরা মিথ্যা ওজর-আপত্তি প্রকাশ করত এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ছাড়াই জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে পিছিয়ে থাকত। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “দীন হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ কামনা করা।” এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, নসীহত এমন বিষয়, যা হাদীসে জিবরীল ‘আলাইহিস সালাম-এর মধ্যে আলোচিত ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর এগুলোকেই দীন হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। কারণ, আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতা থাকলেই তাঁর অর্পিত ওয়াজিব দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে আদায় করার দাবি রাখে। আর এটাই হচ্ছে ইহসানের স্তর। সুতরাং ইহসান ব্যতীত আল্লাহ প্রেমের পরিপূর্ণতা হবে না। আর পরিপূর্ণ মহব্বত ব্যতীত এটাও (ইহসানও) সহজ হবে না। তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য ইহসানের ভিত্তিতে যাবতীয় নফল আনুগত্য তথা ইবাদত করা এবং হারাম ও মাকরূহ কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করার জন্য চেষ্টা-সাধনা করা একান্ত জরুরি।

 নসীহত প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসসমূহ

১. তামীম ইবন আওস আদ-দারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ »

“দীন হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ কামনা করা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের জন্য।”[5]

২. আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস:

«إنَّمَا الدِّينُ النَّصِيحَةُ»

“দীন হচ্ছে কল্যাণ কামনা করা।”[6]

৩. অন্য হাদীসে আছে:

«دعوا الناس يصيب بعضهم من بعض فإذا استنصح أحدكم أخاه فلينصحه»

“মানুষকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দাও, দেখবে তাদের কেউ কেউ বিপদগ্রস্ত হবে। সুতরাং যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের নিকট উপদেশ কামনা করে, তখন সে যেন তাকে উপদেশ প্রদান করে।”[7]

৪. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস:

«المستشار مؤتمن»

“যার নিকট পরামর্শ চাওয়া হয়, সে আমানতদার।”[8]

৫. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস:

«إِنَّ اللَّهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلاَثًا: يَرْضَى لَكُمْ أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلاَ تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا , وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُوا , وَ أنْ تَنَاصَحُوْا مَنْ وَلاَّه الله أمْرَكُمْ».

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য তিনটি জিনিস পছন্দ করেছেন: তিনি তোমাদের জন্য পছন্দ করেছেন যে, তোমরা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না, তোমরা আল্লাহর রশিকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরবে, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না এবং আল্লাহ যাকে তোমাদের প্রশাসক নিযুক্ত করেছেন, তোমরা তার কল্যাণ কামনা করবে।”[9]

৬. জারীর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস:

« بَايَعْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فَلَقَّنَنِى فِيمَا اسْتَطَعْت وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ »

“আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শ্রবণ করা, আনুগত্য করা ও প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করার ওপর বায়‘আত (শপথ) গ্রহণ করেছি। অতঃপর তিনি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে তালকিন (প্রশিক্ষণ) দিয়েছেন।”[10]

৭. আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস:

«لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ».

“তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে।”[11]

৮. . আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ».

“এক মুসলিমের ওপর অন্য আরেক মুসলিমের ছয়টি হক রয়েছে: জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সে হকগুলো কী কী? জবাবে তিনি বলেন, যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তাকে সালাম দিবে, সে আহ্বান করলে সাড়া দিবে, সে তোমার নিকট উপদেশ চাইলে তাকে উপদেশ দিবে, সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে তুমি (ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে) তার হাঁচির জবাব দিবে, সে অসুস্থ হলে তার সেবা করবে এবং সে মারা গেলে তার জানাযায় উপস্থিত হবে।”[12]

৯. জুবাইর ইবন মুত‘য়িম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ثلاث لا يغل عليهن قلب امرئ مسلم: إخلاص العمل لله عز و جل ومناصحة أولي الأمر ولزوم جماعة المسلمين»

“তিনটি বিষয়ে কোনো মুসলিম ব্যক্তির অন্তর খেয়ানত (অস্বীকার) করে না: আন্তরিকতাসহ আল্লাহ তা‘আলার জন্য কাজ করা, শাসকশ্রেণীর কল্যাণ কামনা করা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সংঘবদ্ধ জীবনযাপনের আবশ্যকতা।”[13]

১০. মা‘কাল ইবন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من عبد يسترعيه الله رعية فلم يحطها بنصحه إلا لم يجد رائحة الجنة».

“আল্লাহ তা‘আলা কোনো বান্দাকে আমানত হিসেবে সংরক্ষণের জন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়ার পর তার উপদেশের মাধ্যমে সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”[14]

 মুসলিম ও নসীহত

ইবন হিব্বান রহ. “রওদাতুল ‘উকালা” গ্রন্থের ১৯৪ পৃষ্ঠায় বলেন, সমগ্র মুসলিম জাতির কল্যাণ কামনা করা এবং আন্তরিকতায়, কথায় ও কাজে তাদের খেয়ানত করার চিন্তা পরিহার করা প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব। কারণ, মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মধ্যে যিনি তাঁর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করতেন, তার জন্য তিনি সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদানের পাশাপাশি ‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করার’ শর্ত করতেন।

আবুল বারাকাত আল-গাযী ‘আদাবুল ‘ইশরত’ গ্রন্থের ১৯ পৃষ্ঠায় বলেন, “শিষ্টাচারের অন্যতম দিক হচ্ছে, তার ভাইদের সহবতে থেকে তাদের খেয়াল-খুশির পরিবর্তে তাদের সততার হিফাযত করা এবং তারা যা পছন্দ করে, তার পরিবর্তে তাদেরকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দেওয়া।”

আবু সালেহ আল-মারী বলেন, “মুমিন সেই, যে তোমার সাথে ভালো আচরণ করে এবং তোমাকে তোমার দীন ও দুনিয়ার সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান করে। আর সেই মুনাফিক, যে তোমার সাথে চাটুকারিতা ও মিথ্যার অভিনয় করে এবং তোমাকে তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী পরিচালিত করে। আর সেই নিষ্পাপ, যে এ উভয় অবস্থার মধ্যে তমিজ করতে পারে।”

আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমরা প্রতারণামূলক কাজ করো না। কারণ, এটা অভদ্রদের আচরণ। তোমার ভাইকে ভালো-মন্দের ব্যাপারে নির্ভেজাল উপদেশ দাও। আর সে মিশে থাকতে চাইলে তার সাথে মিশে থাক।”

আল-কুরাইযী আমাকে আবৃত্তির সুরে বলেন,

উপদেশদাতাকে বল, যে তার উপদেশ হাদিয়া দেয় আমাদেরকে গোপনে,

আর যে উপদেশ (নসীহত) তাকে বাধ্য করল কষ্টকর দায়িত্ব পালনে।

নসীহতের কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই যে তুমি তাকে পরিচিত করবে, নসীহত হলো নির্দিষ্ট পরিচয়ের চেয়েও সুপরিচিত ও পছন্দনীয়।

এমনকি যখন আমাদের কাছে তার ফলাফল পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন তা হয়ে যায় আমাদের কাছে বড় উপদেশ।

নসীহতের জন্য যদি এমন সংজ্ঞা থাকত, যা দ্বারা বিষয়টি হত সুস্পষ্ট, তাহলে আমাদের নাগাল পেত না কোনো আফসোস, আর দুঃখ-কষ্ট। কিন্তু তার রয়েছে বহু শাখা-প্রশাখা যা বিরোধপূর্ণ, একে অপরের সাথে, কিছু অপরিচিত, আরও কিছু পরিচিত।

মানুষের মধ্যে কিছু পথভ্রষ্ট, কিছু হেদায়াত প্রাপ্ত, আরও কিছু মিশ্রিত, আর নসীহতও কিছু চলমান, কিছু বাতিল, আরও আছে কিছু স্থগিত।

আবু হাতেম ইবন হিব্বান রহ. বলেন, ভাইদের মধ্যে সেই সকলের চেয়ে উত্তম, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী, যেমনিভাবে সর্বোত্তম হলো ঐ আমল, যে আমলের ফলাফল বা পরিণাম সবচেয়ে প্রশংসনীয় এবং একনিষ্ঠতায় সবচেয়ে সুন্দর। আর হিতাকাঙ্ক্ষীর আঘাত হিংসুকের অভিনন্দনের চেয়ে অনেক উত্তম। প্রত্যেক বিবেকবানের জন্য সাধ্যানুসারে সর্বসাধারণের কল্যাণ কামনা করা ওয়াজিব। আর উপদিষ্টের চেয়ে উপদেষ্টা নসীহতের বেশি উপযুক্ত নয়।

হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “মুমিন মুমিনের অংশ। সে তার ভাইয়ের জন্য আয়না স্বরূপ, সে তার ভাইয়ের মধ্যে অপছন্দনীয় কিছু দেখলে তাকে সংশোধন ও ঠিক-ঠাক করে দিবে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে তার কল্যাণ কামনা করবে।”

ইবন হিব্বান রহ. বলেন, আমাকে আলী ইবন মুহাম্মদ আল-বাস্‌সামী আবৃত্তি করে বলেন, “আমি এমন লোককে গোপনীয় বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করি, যে দৃঢ়সংকল্প নয়, কিন্তু সে কল্যাণ কামনায় সন্দেহপ্রবণ নয়।

অতঃপর সে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল মনে হয় যেন সে উঁচু চূড়ার আগুন, যা ছিদ্র বা গর্তসমূহকে প্রজ্বলিত করে।

সুতরাং সব জ্ঞানীই তোমাকে তার উপদেশ প্রদানকারী নয়,আর সব উপদেশ প্রদানকারীও জ্ঞানী নয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তির মধ্যে উভয় গুণের সমাবেশ ঘটবে, তখন আনুগত্য লাভের অধিকার তারই জন্য নির্দিষ্ট হবে।

আবুল বারাকাত আল-গাযী ‘আদাবুল ‘ইশরত’ গ্রন্থের ১৮ পৃষ্ঠায় বলেন, “শিষ্টাচারের আরও একটি অন্যতম দিক হচ্ছে, তার অন্তরকে ভাইদের জন্য বিশুদ্ধ রাখা, তাদের কল্যান কামনা করা এবং তাদের উপদেশ গ্রহণ করা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِلَّا مَنۡ أَتَى ٱللَّهَ بِقَلۡبٖ سَلِيمٖ ٨٩﴾ [الشعراء: ٨٩]

“সেদিন উপকৃত হবে কেবল সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।” [সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ৮৯]

আল-সাকতী রহ. বলেন, “সৎ ব্যক্তিদের চরিত্রের কারণেই ভাইদের জন্য তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ থাকে এবং তাদের কল্যাণ কামনা করে।”

কোনো কোনো দার্শনিক বলেন, “দুই ব্যক্তি জালিম: এক ব্যক্তি হচ্ছে, তাকে উপদেশ দেওয়া হয়, অথচ সে ঐ উপদেশকে অপরাধ বলে বিবেচনা করে। আর অপর ব্যক্তি হচ্ছে, তাকে সংকীর্ণ জায়গায় স্থান করে দেওয়া হলো, অথচ সে আসন পেতে বসল।”

আবু হাতেম ইবন হিব্বান রহ. “রওদাতুল ‘উকালা” গ্রন্থের ১৯৬ পৃষ্ঠায় বলেন, “নসীহত নিয়ামতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ। নসীহত শুধু তার জন্যই, যে তা গ্রহণ করে। যেমনিভাবে দুনিয়া শুধু তার জন্য, যে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে, আখেরাত শুধু তার জন্যই, যে তাকে তলব করে এবং নসীহতকারী তথা কল্যাণকামীর দায়িত্ব হলো শুধু চেষ্টা-সাধনা করা। তার নসীহত কেউ গ্রহণ না করলে, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। উপদেশদাতার উপদেশ প্রত্যাখ্যানকারীর সাথে পরামর্শ করার চেয়ে বধিরের সাথে পরামর্শ করা অধিক প্রশংসনীয়। আবরাশ আমার নিকট কবিতা আবৃত্তি করেন: “যখন তুমি কোনো অহঙ্কারীকে সঠিক পথের করবে নসীহত, তখন সে তোমার অনুসরণ না করলে দিবে না তাকে কখনও নসীহত। কারণ, অহঙ্কারী তোমায় দিবে না তার আনুগত্য কখনও সত্যের দিকে আহ্বান করলে দিবে না সে সাড়া কখনও। তোমার কিছুই হবে না পথভ্রষ্ট যদি গোমরাহীতে থাকে যুগ যুগ, যদি না সে হয় তোমার আত্মীয় বা সন্তানদের কেউ।

 নসীহতের আদব বা বৈশিষ্ট্য

১. আল্লাহ তা‘আলার প্রতি আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতা: যেহেতু নসীহত তথা কল্যাণ কামনা হচ্ছে সামগ্রিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ইবাদত করে থাকি। সুতরাং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত না হলে তিনি তা গ্রহণ করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ﴾ [البينة: ٥]

“তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে তাঁর ইবাদত করতে।” [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ﴾ [الزمر: ٢]

“সুতরাং আল্লাহর ইবাদত কর তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে।” [সুরা আয-যুমার, আয়াত: ২]

বরং এই নসীহত প্রদানের পদ্ধতি হতে হবে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সালফে সালেহীনদের পদ্ধতি অনুসারে। আর এ জন্যই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ ».

“কোনো ব্যক্তি এমন কাজ করল যার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, সে কাজটি প্রত্যাখ্যাত।”[15]

২. সত্য প্রকাশের ইচ্ছা পোষণ করা: নসীহতের অন্যতম আদব হলো উপদেশদাতার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকবে সত্য প্রকাশ করা। চাই সে সত্যের প্রকাশ তার ভাষায় হউক অথবা অন্যের ভাষায়। কারণ, অনেক সময় উপদেশদাতা নিজের কথার দ্বারাই পরাজিত হয়। কেননা, সে যখন তার বিরোধীদেরকে নসীহত করে এবং তার জন্য তাদের দলীলসমূহ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়, তথন সে বুঝতে পারে যে, তাদের কথাটিই সত্য ও যুক্তিসম্মত। কিন্তু যখন সে অহেতুক ছুটাছুটি করবে এবং তার অযৌক্তিক ও মন্দ দিকটি প্রকাশ পাবে, সে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে। এ জন্যই ইমাম শাফেঈ রহ. তার সঙ্গী-সাথীদেরকে তার কথার বিপরীতে সত্যের অনুসরণ ও সুন্নাহকে গ্রহণ করার নির্দেশ দিতেন এবং তাঁর কথাকে দেওয়ালের অপর দিকে ফেলে দিতে বলতেন। আর তিনি তাঁর কিতাবসমূহের ব্যাপরে বলতেন: “এগুলোর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত কিছু বিদ্যমান থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ كَانَ مِنۡ عِندِ غَيۡرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُواْ فِيهِ ٱخۡتِلَٰفٗا كَثِيرٗا﴾ [النساء: ٨٢]

“এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নিকট থেকে আসত, তবে তারা তাতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২]

তিনি (ইমাম শাফে‘ঈ রহ.) আরও চমৎকারভাবে বলেন, “আমার সাথে কেউ বিতর্কে লিপ্ত হলে আমি কামনা করতাম যে, তার ভাষায় হউক অথবা আমার ভাষায় হউক যাতে সত্য ও যৌক্তিক বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়।”[16]

৩. বিতর্কের সময় মন্দ কথা থেকে জিহ্বাকে হিফাযত করা: যেহেতু নসীহতকারীর নসীহতের মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধী ব্যক্তিকে কথায় ও কাজে তার বিরোধিতা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা, সেহেতু তার সাথে মন্দ কথা বলা মানেই শয়তানকে সহযোগিতা করা। আর এ জন্যই যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের কাউকে অপর সাহবীদের মধ্যে কাউকে বলতে শুনতেন: “ঐ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর লা‘নত, যে ব্যক্তিকে বার বার রাসূলের দরবারে হাযির করা হয়।” অর্থাৎ সে বার বার মদ খেত, অতঃপর তাকে রাসূলের দরবারে হাজির করা হত এবং বেত্রাঘাত করা হত, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا تُعِينُوا الشَّيْطَانَ عَلَي أخيكم».

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের ব্যাপারে শয়তানকে সহযোগিতা করো না” এছাড়া আরও অনেক হাদীস রয়েছে।

ইমাম ইবন হাযম ‘মুদাওয়াতুন্ নুফুস’ নামক গ্রন্থের ৫৫ পৃষ্ঠায় বলেন, “অজ্ঞ, অপরাধী ও চরত্রিহীন ব্যক্তিবর্গকে উপদেশদাতার উপদেশ প্রদানের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। সুতরাং যে ব্যক্তি রুক্ষ মেযাজে ও বিবর্ণ চেহারায় উপদেশ প্রদান করে, সে ভুল করে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত বিরুদ্ধ কাজ করে। সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপদেশ দ্বারা উপদিষ্টের জন্য প্রীতিকর ও উদার মনের হবে। কারণ, রুক্ষ স্বভাবের উপদেশদাতার উপদেশ মন্দ ছাড়া ভালো হয় না।”

ইমাম হাফেয ইবন রজব ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩২ পৃষ্ঠায় বলেন, ইমাম আহমদ রহ. হাতেম আল-আসম থেকে একটি সুন্দর ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তাকে বলা হলো: “আপনি তো অনারবি লোক ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না, আপনার সাথে কোনো লোক বিতর্কে লিপ্ত হলে আপনি কিভাবে তার মোকাবেলা করবেন এবং কিসের বলে আপনি বিতর্কে জয় লাভ করবেন? প্রতিত্তুরে তিনি বলেন, তিনটি বস্তুর দ্বারা আমি বিজয় লাভ করব, আমার তর্ক সঠিক হলে আমি আনন্দিত হব, ভুল হলে অনুতপ্ত হব এবং প্রতিপক্ষকে মন্দ বলা থেকে আমি আমার জিহ্বাকে হিফাযত করব।”

ইবন রজব আরও বলেন, “কোনো আলিম আদব-লিহাজের সাথে বক্তব্য দান ও মত বিনিময়ের সময় যদি ভুল করে ভুল স্বীকার করে, তাতে দোষের কিছু নেই এবং সে নিন্দিত হবে না।”

৪. উপদিষ্টের জন্য দো‘আ করা: উপদেশদাতার বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উপদিষ্টের জন্য বেশি বেশি দো‘আ করা, যাতে আল্লাহ তাকে উপদেশ বুঝার তাওফীক দান করেন, মনোযোগসহ উপদেশ শোনার এবং সে অনুযায়ী আমল করার জন্য তার বক্ষকে উম্মোচন করে দেন। এ প্রসঙ্গেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أللهم اهد قومي فإنهم لا يعلمون»

“হে আল্লাহ! তুমি আমার জাতিকে হিদায়াত দান কর, কারণ, তারা বুঝে না।”

৫. উপদেশের জন্য উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্ধারণ করা: সুতরাং উপদেশদাতা উপদিষ্টকে তার ক্রোধ ও উত্তেজনা অবস্থায় এবং জনসাধারণের উপস্থিতিতে উপদেশ প্রদান করবে না। কারণ, এসব পরিস্থিতিতে উপদেশ দিলে তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রাখে। সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, ক্রোধের করণে জনৈক ব্যক্তির চেহরা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুলে উঠেছিল, তার এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “আমি এমন একটা কথা জানি, যা সে পাঠ করলে তার ক্রোধ দূর হয়ে যাবে। আর তা হলো: أعوذ بالله من الشيطان الرجيم (আমি বিতাড়িত শয়তানের আক্রমন থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই)। জনৈক ব্যক্তি ঐ ক্রোধে আক্রান্ত ব্যক্তিকে এই কথা বা দো‘আ পাঠ করার উপদেশ দিলে, তখন সে বলল: আমি কি পাগল? অতঃপর সে নসীহত প্রত্যাখ্যান করল। আরও প্রত্যাখ্যান করল أعوذ بالله من الشيطان الرجيم (আমি বিতাড়িত শয়তানের আক্রমন থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই) বলা। এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দয়া পরবশ হয়ে কাউকে সরাসরি তার উপদেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকতেন।

৬. উপদিষ্টের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা: উপদেশদাতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: যাকে সে উপদেশ দিবে, তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ না করে গোপন রাখা। বিশেষ করে যখন তা তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কোনো অবস্থাতেই তা সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকাশ করবে না।

 উপদিষ্টের আদব বা বৈশিষ্ট্য

১. উপদেশ গ্রহণ করা: উপদিষ্ট ব্যক্তির উচিৎ সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা পোষণ করা। কেননা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ব্যাপারে কথিত আছে যে, তিনি যখন খেলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন, তখন তিনি বলেছিলেন: “তোমাদের পরিচালনায় যতক্ষণ আমি আল্লাহর আনুগত্য করি, ততক্ষণ তোমরা আমার অনুসরণ করবে, আর যখন এর ব্যতিক্রম করব, তখন তোমরা আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।”

আর উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন দেনমোহর নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, তখন জনৈক মহিলা এসে তাঁকে বলল: আপন কি আল্লাহর বাণী শুনেন নি? আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَءَاتَيۡتُمۡ إِحۡدَىٰهُنَّ قِنطَارٗا فَلَا تَأۡخُذُواْ مِنۡهُ شَيۡ‍ًٔاۚ أَتَأۡخُذُونَهُۥ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا﴾ [النساء: ٢٠]

“এবং তাদের একজনকে অগাধ অর্থও দিয়ে থাকে, তবুও তা থেকে কিছুই গ্রহণ করো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচরণ দ্বারা তা গ্রহণ করবে? [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২০], তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করুন, প্রতিটি মানুষই ওমরের চেয়ে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান। অতঃপর তিনি ফিরে এসে মিম্বরে উঠে বলেন, “হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকে নারীদের জন্য চারশত দিরহামের বেশি দেনমোহর নির্ধারণ করতে নিষেধ করেছিলাম, সুতরাং এখন থেকে যার যত খুশি তার সম্পদ থেকে তার স্ত্রীকে মোহর হিসেবে দান করতে পারবে।”[17]

তিনি (উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু) আরও একবার জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: তোমরা শোন এবং আনুগত্য কর। অতঃপর জনগণ তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমরা আপনার কথা শুনবও না, মানবও না যতক্ষণ না আমরা জানতে পারব যে, আপনার এই কাপড় কোথা থেকে এসেছে? তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, তুমি তাদেরকে প্রকৃত বিষয়টি জানিয়ে দাও, তখন আবদুল্লাহ বলেন, আমার পিতা লম্বা মানুষ, পোশাক হিসেবে তার প্রাপ্ত অংশটুকু যথেষ্ট ছিল না বিধায়, আমার অংশটুকুও তাঁকে প্রদান করেছি। আর সেটাই তোমরা দেখতে পাচ্ছ। তখন তারা খলিফা উমারকে বলল, এখন আমরা তোমার কথা শুনব এবং মানব।

সুতরাং ভেবে দেখুন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পদমর্যদার কথা, তিনি কিভাবে সাহাবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমদের সমালোচনাকে অকপটে গ্রহণ করে নিতেন। এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের সময় হাব্বান ইবন মুনযির রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সৈন্য বাহিনীর অবস্থান পবির্তন বিষয়ক উপদেশ গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া তিনি খন্দকের যুদ্ধসহ অন্যান্য যুদ্ধেও সাহাবীদের পরামর্শ ও উপদেশ গ্রহণ করেছেন।সুতরাং নসীহত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।

পদমর্যাদা বিবেচ্য বিষয় নয়:

হাফেয ইবন রজব ‘আল-ফারকু বাইনান নসিহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৪ পৃষ্ঠায় বলেন, কোনো ব্যক্তির নসীহতের অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে শুধু সত্য প্রকাশ করা এবং কোনো ভুল বক্তব্যের মাধ্যমে যাতে জনগণ প্রতারিত না হয়, তবে সে তার সৎ উদ্দেশ্যের কারণে নিঃসন্দেহে সওয়াবের অধিকারী হবে এবং সে তার এই কাজ ও নিয়তের দ্বারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের কল্যাণকামী বলে বিবেচিত হবে। চাই সে ছোট অথবা বড় যে কোনো ধরণের ভুল করুক না কেন। তার জন্য আলিমদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আদর্শ হতে পারে, যিনি মুত‘আ বিবাহ, দুই ওমরার বিধান ইত্যাদি বিষয়ে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার একক মতামত বা বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং কোনো কোনো আলিম তার প্রতিবাদও করেছেন।

তার জন্য ঐ ব্যক্তিও আদর্শ হতে পারে, যিনি সা‘ঈদ ইবন মুসাইয়েবের শুধু আকদের দ্বারা তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী হালাল হওয়া সংক্রান্ত স্পষ্ট সুন্নাত পরিপন্থী মতামতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যিনি হাসান বসরীর ‘স্বামী মারা যাওয়া স্ত্রীর ক্ষৌরকর্ম না করা’র মতামতকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যিনি যৌনাঙ্গ ধার দেওয়ার বৈধতা সংক্রান্ত আতা’র মতামতের সমালোচনা করেছেন। আরও সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন মাসআলার ক্ষেত্রে তাউস রহ. সহ অন্যান্যদের, যাদের হেদায়েত, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও প্রশংসায় মুসলিম সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ। এসব মাসাআলার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে এমন একজনও পাওয়া যাবে না, যিনি ঐসব ইমামদেরকে অপবাদ দিয়েছেন বা কোনোরূপ দোষারোপ করেছেন। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুসলিম ইমামগণের কিতাবসমূহ এসব মতামতের আলোচনা-সমালোচনায় ভরপুর হয়ে আছে। যেমন ইমাম শাফেঈ, ইসহাক, আবু উবাইদ, আবু সওরসহ তৎপরবর্তী হাদীস, ফিকহ ও অন্যান্য শাস্ত্রের ইমামদের কিতাবসমূহ। তাদের কেউ কেউ এসব বক্তব্য ও মতামতের ব্যাপক আলোচনা করেছেন, এখানে তার হুবহু আলোচনা করলে বিষয়টি অনেক বিস্তারিত হয়ে যাবে।

দোষ-ত্রুটি প্রকাশের উদ্দেশ্যে সমালোচনা হারাম:

হাফেয ইবন রজব ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৫ পৃষ্ঠায় বলেন, যদি সমালোচনার উদ্দেশ্য হয় সমালোচিত ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা, তার অজ্ঞতা ও জ্ঞানের কমতি ইত্যাদি বিষয় বর্ণনা করা, তবে তা হারম কাজ বলে গণ্য হবে। চাই সমালোচনার জবাবে সমালোচনা হউক, অথবা গিবতের কায়দায় সমালোচনা হউক, তার জীবদ্দশায় হউক অথবা তার মৃত্যুর পরে । সে ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে যার নিন্দা করেছেন এবং যার ব্যাপারে সামনে ও পিছনে নিন্দকারীর পরিণামের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছেন। আবার সে ঐ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে, যার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “হে যারা মুখে মুখে ঈমান এনেছ, অন্তরে ঈমান গ্রহণ কর নি, তেমারা মুসলিম সম্প্রদায়কে কষ্ট দিবে না এবং তাদের গোপনীয় বিষয়ের অনুসন্ধান করবে না। কারণ, যে ব্যক্তি তাদের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করবে, আল্লাহও তার গোপন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন। আর আল্লাহ যার অভ্যন্তরীণ বিষয়ের পেছনে লাগবেন, ঘরের ভিতরে অবস্থান করলেও তিনি তাকে লাঞ্ছিত করবেন।”

এ বিধানটি দীনের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় প্রত্যেক আলিমের ব্যাপারে প্রজোয্য। তবে বিদ‘আতপন্থী, পথভ্রষ্ট ও লেবাসধারী ওলামারা এ বিধানের আওতাধীন নয়। সুতরাং তাদের অনুসরণ করা থেকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তাদের অজ্ঞতা ও দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা বৈধ। আর আমাদের এখনকার আলোচনা এ সম্প্রদায়কে নিয়ে নয়। আল্লাহই মহাজ্ঞানী।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. ‘আর-রূহ’ নামক গ্রন্থের ৫১১ পৃষ্ঠায় বলেন, “...যখন নসীহতের উদ্দেশ্য হবে তোমার ভাইয়ের নিন্দা করা, তার মান-সম্মান বিনষ্ট করা, তার মাংস ভক্ষণ করা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা যাতে জনগণের মন থেকে তার অবস্থান নষ্ট হয়ে যায়, তখন তা হবে দূরারোগ্য ব্যধি ও পুণ্য বিধ্বংসী আগুন যা ভালো আমলগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমনিভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।”

নসীহতের ধরণ কেমন হবে:

আমরা অনেক নামধারী আলিমের কথা শুনতে পাই যাদের কেউ কেউ প্রকৃত ওলামা ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের প্রকাশ্য নিন্দা ও সমালোচনা করে, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ও ধর্মদ্রোহী ব্যক্তি সবাই তার কথা শুনতে পায়। আর এসব নিন্দা ও সমালোচনা সম্পাদিত হয়েছে অডিও-ভিডিও ও প্রকাশিত বই-পত্রে, মনে হয় যেন নসীহত করার উপায়-উপকরণের বড় অভাব। এটাই কি তাদের গোপন নসীহত?!

তারা কি উপদিষ্ট ব্যক্তির নিকট কিছু লিখেছে? তারা কি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? তাদের কি এমন কোনো উপায় জানা আছে যা তাকে এই মত ও পথের দিকে আকৃষ্ট করবে? কি.. কি..? সম্ভবত তারা ‘সমালোচক’ যখন তারা তাদের ধারণা অনুযায়ী সুন্নাহ বিরোধী (প্রকৃতপক্ষে সুন্নাহ বিরোধী নয়) কোনো ব্যক্তির সাথে বসে এবং মনোযোগ সহকারে তার যুক্তি-তর্ক শ্রবণ করে, তখন তারা তার কাছে ক্ষমা চায় ও নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে অথবা তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল কষ্ট দেওয়া ও মান-সম্মান নষ্ট করা।

হাফেয ইবন রজব ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৪ পৃষ্ঠায় বলেন, এ অধ্যায়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তিকে তার সামনাসামনি এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। সুতরাং তা যদি তার কল্যাণ কামনায় হয়ে থাকে, তবে তা উত্তম কাজ। সালফে সালেহীনদের কেউ কেউ তার কোনো কোনো ভাইকে বলতেন: “ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমার কল্যাণকামী হতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি আমার উপস্থিতিতে আমার মন্দ দিকগুলো তুলে ধরবে।” সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি সংশোধনের উদ্দেশ্যে তার ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি বলে দেয়, তখন তা উত্তম কাজ বলে বিবেচিত হবে। যার দোষ-ত্রুটি বলে দেওয়া হবে, তার কোনো ওজর থাকলে সে তা পেশ করবে। আর যদি সমালোচনার উদ্দেশ্য হয় অপরাধের জন্য তিরস্কার করা, তবে তা হবে খুবই নিন্দনীয় কাজ।

সালফে সালেহীনদের কাউকে এই বলে জিজ্ঞাসা করা হত: “কেউ তোমার দোষ-ত্রুটিগুলো বলে দিক তুমি কি তা পছন্দ করবে, তখন সে বলত: তার বলার উদ্দেশ্য যদি হয় আমাকে তিরস্কার করা, তবে সে বলবে না।” সুতারাং অপরাধের জন্য তিরস্কার করা নিন্দনীয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যভিচারিণী দাসীকে চাবুক মারার পাশাপাশি তিরস্কার করতে নিষেধ করেছেন, তিনি হদের (শাস্তির) চাবুক মারতেন, কিন্তু অপরাধের তিরস্কার করতেন না।

তিরমিযী ও অন্যান্য গ্রন্থে মারফু‘ সনদে বর্ণিত আছে: “যে ব্যক্তি তার ভাইকে অপরাধের জন্য তিরস্কার করে, সে একই অপরাধ না করা পর্যন্ত ঐ ব্যক্তির মৃত্যু হবে না।”[18]

ফুদাঈল ইবন ‘আইয়ায বলেন, “মুমিন দোষ-ত্রুটি গোপন করে এবং কল্যাণ কামনা করে উপদেশ দেয়, আর ফাসিক সম্মান নষ্ট করে এবং তিরস্কার করে।”

এ বিষয়টি ফুদাঈল ‘নসীহত ও তিরস্কারের আলামত’ বিষয়ক পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কল্যাণ কামনা তথা নসীহতের সাথে দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার বিষয় সম্পৃক্ত, আর তিরস্কারের সাথে দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করার বিষয় সম্পৃক্ত। আর তাকে বলা হত: “যে ব্যক্তি তার ভাইকে জনসমক্ষে কোনো বিষয়ে আদেশ করল, সে যেন তার ভাইকে তিরস্কার করল।”

সালফে সালেহীনগণ সামনাসামনি সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করাকে অপছন্দ করতেন এবং তারা এ কাজটি গোপনীয়ভাবে আদেশদাতা ও আদিষ্ট ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ রেখে করাটাকে পছন্দ করতেন। আর এটাই হচ্ছে পরস্পর কল্যাণ কামনার লক্ষণ। কারণ, উপদিষ্ট ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি প্রচার করা উপদেশদাতার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে উপদিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান দোষ-ত্রুটি দূর করা।

দোষ-ত্রুটি প্রকাশ ও প্রচার করাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ١٩﴾ [النور: ١٩]

“যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ১৯]

দোষ-ত্রুটি গোপন করার ফযীলত প্রসঙ্গে বহু হাদীস রয়েছে। ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«المسلم أخو المسلم لا يظلمه ولا يسلمه... ومن ستر مسلما ستره الله يوم القيامة».

“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে না তার ওপর যুলুম করতে পারে, আর না তাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করতে পারে।... যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।”

ইমাম মুসলিম আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لاَ يَسْتُرُ عَبْدٌ عَبْدًا فِى الدُّنْيَا إِلاَّ سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ».

“যে বান্দাই অন্য বান্দার দোষ-ত্রুটি পার্থিব জীবনে গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।”

আলিমদের কেউ কেউ সৎ কাজের আদেশদাতার উদ্দেশ্যে বলেন, “অপরাধীদের দোষ-ত্রুটি যথাসম্ভব গোপন রাখার চেষ্টা করবেন। কারণ, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ করা এক ধরণের দুর্বলতা। ইসলামের মধ্যে গোপনীয়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ বিষয় গোপন রাখা।”

মুসান্নাফে আবদুর রায্‌যাকে বর্ণিত আছে যে, আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু নেশা গ্রহণ করেছেন, অতঃপর তা পরিত্যাগ করেন এবং বলেন, “আমি তা গোপন রাখছি, আশা করি আল্লাহও আমার বিষয়টি গোপন রাখবেন।”[19]

সুতরাং মুসলিম সম্প্রদায়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখতে পারা একটি মহৎ গুণ। তবে এ ক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিত্বের সংখ্যা খুবই কম। কারণ, আমরা দেখতে পাই অধিকাংশ মুখপাত্র এমন সব কথা বলে, যার দ্বারা তাদের ভাইদের সম্মান নষ্ট হয় এবং তা হারাম বলে পরিগণিত হয়। আর এ ক্ষেত্রে যিনি এ ধরণের কথা-বার্তা শুনেন, আনন্দ লাভ করেন, এ ধরণের আলোচনা অংশগ্রহণ করেন বা একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং ধারণা করেন যে, কোনো কথা না বলে বিরামহীনভাবে শুনতে থাকলে তার জন্য তা বৈধ হয়ে যাবে। আর এ ধরণের চিন্তাধারা নিরেট শয়তানী চিন্তা ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, এ ধরণের বক্তা এবং শ্রোতা উভয়ই অপরাধী। আর এ ধরণের সকল কর্ম-কাণ্ড নিষিদ্ধ গিবতের অন্তর্ভুক্ত। তবে এ ধরণের কথা-বার্তার শ্রোতার উচিৎ বক্তাকে নসীহত করা এবং তার আরও কর্তব্য হলো, তার মুসলিম ভাইয়ের মান-সম্মান রক্ষা করা। কারণ, এর দ্বারা সে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَن ذَبَّ عن عِرْضِ أخيه المسلم باعد اللهَ وجهه عن النار»

“যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের মান-সম্মান রক্ষা করল, আল্লাহ তার চেহারকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখবেন।”

সুতরাং শ্রোতার নসীহতের পরও সমালোচনা বন্ধ না করলে শ্রোতার কর্তব্য হলো ঐ মজলিস ত্যাগ করা।

আল্লাহ দোষ-ত্রুটি গোপন রাখাকে পছন্দ করেন। কেননা, হাদীসে বর্ণিত আছে: “আল্লাহ দোষ-ত্রুটি গোপনকারীকে অভিনন্দন জানান।”[20]

বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كل أمتي معافى إلا المجاهرين وإن من المجاهرة أن يعمل الرجل بالليل عملا ثم يصبح وقد ستره الله فيقول يا فلان عملت البارحة كذا وكذا وقد بات يستره ربه ويصبح يكشف ستر الله عنه».

“দোষ-ত্রুটি প্রকাশকারীরা ব্যতীত আমার সকল উম্মতই ক্ষমারযোগ্য। দোষ-ত্রুটি প্রকাশকারীদের মধ্যে এমন ব্যক্তি রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি রাতের বেলায় কোনো (দোষের) কাজ করল, আর তাকে গোপন করলেন। অতঃপর ঐ ব্যক্তি (দোষ-ত্রুটি প্রকাশকারী) সকাল বেলায় উঠে বলতে লাগল: হে অমুক! তুমি না গত রাত্রে এই এই কাজ করেছ, অথচ রাতের বেলায় তার রব তাকে গোপন রাখল, আর সকাল বেলায় উঠেই সে আল্লাহর গোপন করা দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করতে লাগল।”

বুখারী ও মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরও বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«يدنو أحدكم من ربه حتى يضع كنفه عليه فيقول عملت كذا وكذا ؟ فيقول نعم ويقول عملت كذا وكذا ؟ فيقول نعم فيقرره ثم يقول إني سترت عليك في الدنيا فأنا أغفرها لك اليوم».

“তোমাদের কেউ তার রবের এত নিকটতম হবে যে তিনি তার ডানা তার উপর রাখবেন, অতঃপর বলবেন: তুমি কি এই এই কাজ করেছ? জওয়াবে সে বলবে: হ্যাঁ, তিনি আবার বলবেন: তুমি কি এই এই কাজ করেছ? জওয়াবে সে বলবে: হ্যাঁ। এভাবে তিনি তার স্বীকৃতি আদায় করবেন, অতঃপর বলবেন: আমি দুনিয়ায় তোমার দোষ-ত্রুটি গোপন করেছি। আর আজ তোমাকে তা ক্ষমা করে দেব।”

সুতরাং মুসলিম দোষ-ত্রুটি গোপন করে এবং কল্যাণ কামনা করে উপদেশ দেয়, আর ফাসিক সম্মান নষ্ট করে এবং তিরস্কার করে। আর একমাত্র আল্লাহই সাহায্যস্থল।

হাফেয ইবন রজব বলেন, এজন্যই অশ্লীলতার প্রসার নিন্দা ও তিরস্কারের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। আর উভয়টি ফাসিকদের বৈশিষ্ট্য। কারণ, বিশৃঙ্খলা দূর করা ও মুমিনদেরকে দোষ-ত্রুটি থেকে দূরে রাখা ফাসিক বা দুষ্কৃতকারীর উদ্দেশ্য নয়। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মুমিন ভাইয়ের মধ্যে দোষ-ত্রুটি প্রচার ও প্রসার করা এবং তার মান-সম্মান নষ্ট করা।

আর এর দ্বারা উপদেশদাতা তথা হিতাকাঙ্খীর উদ্দেশ্য হলো, তার মুমিন ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি দূর করা ও তার থেকে দূরে রাখা। আর এ গুণেই আল্লাহ তা‘আলা তার রাসূলকে গুণান্বিত করেছেন। তিনি বলেন,

﴿لَقَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ عَزِيزٌ عَلَيۡهِ مَا عَنِتُّمۡ حَرِيصٌ عَلَيۡكُم بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ ١٢٨﴾ [التوبة: ١٢٨]

“অবশ্যই তোমাদের মধ্যেই তোমাদের নিকট এক রাসূল এসেছে। তেমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়াদ্র ও পরম দয়ালু।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৮]

তিনি (ইবন রজব) বলেন: উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সূচিত হলো যে, কার উদ্দেশ্য নসীহত তথা কল্যাণ কামনা করা। সুস্থ বুদ্ধির কোনো লোক এদের একজনকে অপর জনের সাথে মিশাবে না।

ইমাম ইবন হাযম রহ. ‘মুদাওয়াতুন্ নুফুস’ নামক গ্রন্থের ৫৫ পৃষ্ঠায় বলেন, যে ব্যক্তি আনন্দের সাথে মুচকি হাসি ও বিনয়ের সাথে নরম ভাষায় উপদেশ দেয়, মনে হয় যেন সে মতামত প্রদানকারী উপদেষ্টা ও উপদিষ্টের মন্দ দিকের সংবাদদাতা, এটাই ওয়ায-নসীহতের সর্বোত্তম পন্থা। এর পরও সে সঠিক পথে ফিরে না আসলে উপদেষ্টা যেন তাকে নিরিবিলি জায়গায় ডেকে এনে লজ্জা দিয়ে উপদেশ দেয়, এতেও যদি সে উপদেশ গ্রহণ না করে, তবে তাকে এমন ব্যক্তির সামনে উপদেশ দিতে হবে, যাকে দেখে সে লজ্জিত হবে। আর আল্লাহও নরম ভাষায় তার বিধান পালন করার কথা বলেন।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উপদেশ নিয়ে কারো সামনাসামনি ও মুখোমুখি হতেন না, বরং তিনি বলতেন: “গোত্রসমূহের কী হলো যে, তারা এমন এমন কাজ করছে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নসীহতের ব্যাপারে কোমলতার প্রশংসা করেন, সহজকরণের আদেশ দেন এবং তাড়িয়ে দিতে নিষেধ করেন। তিনি উপদিষ্ট ব্যক্তির বিরক্তির আশঙ্কায় উপদেশ প্রদানের জন্য নিরিবিলি জায়গা নির্বাচন করতেন। তাকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ ٱلۡقَلۡبِ لَٱنفَضُّواْ مِنۡ حَوۡلِكَ﴾ [ال عمران: ١٥٩]

“যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯]

ইবন হিব্বান রহ. বলেন, নসীহত সকল মানুষের ওপর ওয়াজিব যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। কিন্তু শুরুতে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে অসিয়ত করা আবশ্যক। কারণ, যে ব্যক্তি তার ভাইকে জনসমক্ষে উপদেশ দিল, সে তার অসম্মান করল, আর যে ব্যক্তি অন্তরালে উপদেশ দিল, সে তার তার সাথে সুন্দর ব্যবহার করল। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সাথে অসম্মানজনক আচরণের চিন্তা বাদ দিয়ে তার সাথে সুন্দর ব্যবহারের যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করা উচিত।

সুফিয়ান রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুস‘আরকে বললাম: “কোনো ব্যক্তি তোমাকে তোমার দোষ-ত্রুটিসমূহ জানিয়ে দিক, তুমি কি তা পছন্দ কর? তখন সে বলল: কোনো সাধারণ মানুষ উপদেশের নামে আমাকে তিরস্কার করলে তার উপদেশ পছন্দ করব না, আর কোনো হিতাকাঙ্খী উপদেশ নিয়ে আসলে, তা বিবেচনা করব।”

ইবনুল মুবারক রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের মধ্যে অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখত, তখন তাকে তা গোপন করতে আদেশ করতেন এবং তাকে গোপনে এ কাজ থেকে নিষেধ করতেন। আর আজ-কালকার দিনে কেউ তার ভাইয়ের মধ্যে অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখলে সে তার ওপর রাগ করে এবং তার গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়।”

সুফিয়ান রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল জাব্বার ইবন ওয়াইলের নিকট তালহা এসে উপস্থিত হলো, তার নিকট আরও একদল লোক উপস্থিত ছিল। অতঃপর সে চুপে চুপে কিছু একটা বলে চলে গেল। অতঃপর সে বলল: “তোমরা কি জান সে আমাকে কী বলে গেল? সে বলল: আমি তোমাকে গত কালকে নামাজরত অবস্থায় এদিক সেদিক তাকাতে দেখিছি।”

ইবন হিব্বান রহ. বলেন, “নসীহত যখন আমাদের বর্ণনাকৃত গুণাবলীর ওপর হবে, তখন তা পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করবে এবং ভ্রাতৃত্ববোধের হক আদায় করবে।

উপদেষ্টা বা হিতাকাঙ্খীর লক্ষণ:

ইবন হিব্বান রহ. বলেন, “প্রকৃত উপদেষ্টার লক্ষণ হলো, যখন সে উপদিষ্ট ব্যক্তির শ্রী কামনা করবে, তখন সে তাকে গোপনে উপদেশ প্রদান করবে। আর যে ব্যক্তি উপদিষ্ট ব্যক্তিকে অসম্মান করার ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন সে তাকে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে উপদেশ প্রদান করবে। আর বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত সে যেন শত্রুর উপদেশ গ্রহণের সময় প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সতর্কতা অবলম্বন করে। ইবন রাতজী আল-বাগদাদী আমাকে আবৃত্তি করে বলেন,

“অনেক শত্রু আছে যে তোমকে তার উপদেশ প্রদান করে প্রকাশ্যে,

এমতাবস্থায় যে প্রতারণা রয়েছে তার (অন্তরে) পাঁজরের নিচে ।

আর অনেক পথ প্রদর্শক বন্ধু আছে যাকে অমান্য করছে তুমি ছিলে না তুমি তার দেখানো পথের অনুগামী।

প্রতিটি কাজেরই শেষ পরিণাম রয়েছে, এ কাজটি

তারা অচিরেই শুরু করেবে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে।”

 পরিচ্ছেদ: উপদেষ্টার উদ্দেশ্য কিভাবে বুঝা যাবে

ইমাম হাফেয ইবন রজব রহ. ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৬ পৃষ্ঠায় বলেন, উপদেশদাতার উদ্দেশ্য বুঝা যাবে কখনও উপদেশ প্রত্যাখ্যানকারীর স্বীকারোক্তির দ্বারা, আবার কখনও তার ব্যক্তিগত কথা-কাজকে ঘিরে উদ্বুত ইঙ্গিতের দ্বারা। যার থেকে জ্ঞান-বুদ্ধি, দীন, মুসলিম নেতৃবৃন্দকে সম্মান করার ব্যাপারে জানা যাবে, যিনি বিনা কারণে ভুল-ত্রুটির কথা উথ্থাপন করেন না।

সাহিত্যকর্ম ও উৎসাহ-উদ্দীপনার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে তার কথা গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে এবং উল্লেখিত পরিস্থিতিতে যার কথা গ্রহণ করা হয়, তিনি যদি এমন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হন, যিনি নির্দোষ ব্যক্তির ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করেন, তবে তিনি আল্লাহর বাণীর আওতাধীন হয়ে যান। আর কুধারণা এমন এক ধারণার নাম যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ সুহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يَكۡسِبۡ خَطِيٓ‍َٔةً أَوۡ إِثۡمٗا ثُمَّ يَرۡمِ بِهِۦ بَرِيٓ‍ٔٗا فَقَدِ ٱحۡتَمَلَ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا ١١٢﴾ [النساء: ١١٢]

“কেউ কোনো দোষ বা পাপ করে পরে তা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” [আন-নিসা, আয়াত: ১১২]

অতএব, যার মধ্য থেকে কোনো মন্দ কর্মের নিদর্শন প্রকাশিত হয় নি, তার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হারাম করে দিয়েছেন।

সুতরাং এই ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি দোষ ও পাপ কাজ করা এবং তা নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করার মত অন্যায়ের সমাবেশ ঘটায়। এই ধারণা পোষণকারী ব্যক্তি থেকে এ ধরণের অন্যায় কাজ প্রকাশিত হলে সে (আয়াতে উল্লিখিত) এই হুমকির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি জোরদার হবে। খারাপ কাজের নিদর্শন হলো যেমন, বেশি বেশি অন্যায়-অপরাধ ও বাড়াবাড়ি করা, ভয়-ভীতি কম করা, বেশি কথা বলা, বেশি বেশি গিবত করা ও অপবাদ দেওয়া, যেসব মানুষকে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দান করেছেন, তাদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা এবং নেতৃত্ব লাভের জন্য চরম আগ্রহ প্রকাশ করা।

আর যে ব্যক্তির মাঝ থেকে এসব মন্দ গুণাবলী প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যাবে যা ঈমানদার ও আলিম সম্প্রদায় পছন্দ করেন না, তার কথাকে আলিমদের নিকট অভিযোগে আকারে পেশ করা হবে এবং সে তাদের নিকট তা প্রত্যাখ্যান করলে তখন উচিৎ হবে অপমান করে তাকে মোকাবিলা করা। আর যে ব্যক্তির মাঝ থেকে এসব মন্দ গুণাবলী পুরাপুরি প্রকাশিত হয় নি, তবে তার কথাকে ভালো অবস্থায় গ্রহণ করা আবশ্যক এবং মন্দ অবস্থায় গ্রহণ করা অবৈধ।

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমার মুসলিম ভাইয়ের মুখ থেকে বের হওয়া কথাকে খারাপ বলে ধারণা করো না। কারণ, তাতে তুমি ভালো কিছুও পেতে পার।”

হামদুন বলেন, যা আবুল বারাকাত আল-গাযী’র ‘আদাবুল ‘ইশরত’ গ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত: “যখন তোমার ভাইদের মধ্যে কোনো ভাই ভুল করে, তবে তাকে ক্ষমা চাইতে বল। অতঃপর সে যদি তা গ্রহণ না করে, তবে তুমি ত্রুটিপূর্ণ।”

আবুল বারাকাত আল-গাযী ‘আদাবুল ‘ইশরত’ গ্রন্থের ১৪ পৃষ্ঠায় বলেন, “উপদেষ্টার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভাইদের পদস্খলনকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। যেমনিভাবে গোলামের ওপর আবশ্যক তার মনিবের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, তেমনিভাবে মনিবেরও উচিৎ তার সহযোগীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করা।”

জ্ঞানী ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেন, “মুমিন স্বভাবগত ও প্রকৃতিগতভাবেই মুমিন।”

ইবনুল আরাবী বলেন, “ভাইদের দুঃখ-কষ্টে সমবেদনা জ্ঞাপন কর, তবে তোমার প্রতি তাদের ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হবে।”

ইবন রজব বলেন, তিরস্কারকারী থেকে নসীহতকারী তথা হিতাকাঙ্খীকে পৃথক করে চিনার উপায় হলো, নসীহতকারী দোষ-ত্রুটি গোপন করে এবং গোপনে উপদেশ দেয়, বিশেষ করে ঐসব আমলের ক্ষেত্রে, যেসব কর্ম-কাণ্ডে অন্যের কোনো ক্ষতি হয় না। অর্থাৎ বিরোধিতাকারী যে কাজটির ব্যাপারে বিরোধ করে, তা তার সাথেই সীমাবদ্ধ। আর বিষয়টি দ্বারা অন্যের ক্ষতি হলে তখনও তাকে গোপনেই উপদেশ দিবে। আর সঠিক পথে ফিরে না এলে এবং বিষয়টি যদি এমন হয় যে বিষয়ে ইখতিলাফের বৈধতা নেই, তবে এই অবস্থায় উপদেষ্টার জন্য তার ব্যাপারে জনসমক্ষে কথা বলা বৈধ হবে এবং তিনি তাদেরকে সতর্ক করবেন যাতে তারা হকের বিরোধিতাকারীর কথা ও কাজে তারা প্রতারিত না হয়।

ফুদাঈল ইবন ‘আইয়াদ রহ. বলেন, যা ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৯ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত: “মুমিন দোষ-ত্রুটি গোপন করে এবং কল্যাণ কামনা করে উপদেশ দেয়, আর ফাসিক সম্মান নষ্ট করে এবং তিরস্কার করে।”

হাফেয ইবন রজব রহ. বলেন, “এ বিষয়টি ফুদাঈল ‘নসীহত ও তিরস্কারের আলামত’ বিষয়ক পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কল্যাণ কামনা তথা নসীহতের সাথে দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার বিষয় সম্পৃক্ত, আর তিরস্কারের সাথে দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করার বিষয় সম্পৃক্ত। আর তাকে বলা হত: “যে ব্যক্তি তার ভাইকে জনসমক্ষে কোনো বিষয়ে আদেশ করল, সে যেন তার ভাইকে তিরস্কার করল।”

আবুল বারাকাত বদরুদ্দীন মুহাম্মাদ আল-গাযী ‘আদাবুল ‘ইশরত’ গ্রন্থের ১৩ পৃষ্ঠায় বলেন, ইবন মাযেন বলেন, “মুমিন ব্যক্তি তার ভাইদের জন্য ক্ষমা চায়, আর মুনাফিক তাদের পদস্খলন বা অধপতন চায়।”

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তার ‘আর-রূহ’ নামক গ্রন্থের ৫১০ পৃষ্ঠায় বলেন, “গিবত এবং নসীহতের মধ্যে পার্থক্য হলো, নসীহতের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম ব্যক্তিকে বিদ‘আতপন্থী, ফিতনাবাজ, প্রতারক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী থেকে সতর্ক করা। সুতরাং যখন কেউ তোমার নিকট তার (উপরোক্ত ব্যক্তির) সাথে বন্ধুত্ব, লেন-দেন ও অন্য কোনো সম্পর্ক গড়তে পরামর্শ চায়, তখন তুমি তার মধ্যে বিদ্যমান দোষ-গুণ স্পষ্ট করে বলে দিবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফাতেমা বিনতে কায়েস মুয়াবিয়া ও আবু জাহামকে বিয়ে করার ব্যাপারে পরামর্শ চাইলে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মুয়াবিয়া দরিদ্র মানুষ, আর আবু জাহামের ব্যাপারে কথা হলো তার ঘাড়ে সব সময় লাঠি থাকে অর্থাৎ সে স্ত্রীকে মারধর করে।” তিনি তাঁর সাথে যেসব সাহাবী সফর করেন তাদের কাউকে কাউকে বলেন, “যখন তুমি কোনো জাতির আঙ্গিনায় অবতরণ করবে, তখন তাকে সতর্ক করবে।”

 উপদেষ্টার সাথে আচার-ব্যবহার পদ্ধতি

১. মহৎ উদ্দেশ্যের ধারক ও বাহক: ইমাম হাফেয ইবন রজব রহ. ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৬ পৃষ্ঠায় বলেন, “যার ব্যাপারে জানা যাবে যে, আলিমদের সাথে তার যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নসীহত করা, তবে তার সাথে সকল মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও তাদের উত্তম অনুসারীবৃন্দের মতো সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা আবশ্যক, যাদের আলোচনা ও দৃষ্টান্ত পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।”

ইমাম হাফেয ইবন রজব রহ. ‘আল-ফারকু বাইনান নসীহাতে ওয়াত তা‘য়ীর’ নামক গ্রন্থের ৩৬ পৃষ্ঠায় আরও বলেন, দুর্বল বক্তব্যসমূহ প্রত্যাখ্যান করা এবং তার বিপরীতে শর‘ঈ দলীল দ্বারা সত্যকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা ঐসব আলিমদের নিকট অপছন্দনীয় নয়, বরং তারা তা পছন্দ করেন এবং এ ধরণের কাজ যিনি করেন, তার প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করেন। তাছাড়া এ ধরণের কাজ গিবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। সুতরাং যদি অনুমান হয় যে, কোনো ব্যক্তি সত্যের বিপরীতে তার ভুল-ত্রুটি প্রকাশ করাকে সে অপছন্দ করে, তবে তার এই অপছন্দ করাটা বিবেচ্য বিষয় হবে না। কারণ, সত্য প্রকাশ করাটা যখন কোনো ব্যক্তির কথার বিপরীতে অপছন্দনীয় হয়, তখন তা প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, বরং মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য হলো, সত্যকে প্রকাশ করা এবং তা মুসলিম সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেওয়াটাকেই পছন্দ করা। চাই তা তার মতের সাথে মিল থাকুক, অথবা তার মতের সাথে অমিল হউক। আর এটাই হলো আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, তাঁর দীন, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সমস্ত মুসলিমের জন্য নসীহতের অন্তর্ভুক্ত। আর এটাই হচ্ছে দীন, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য থেকে জানা যায়।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. তার ‘আর-রূহ’ নামক গ্রন্থের ৫১১ পৃষ্ঠায় বলেন, “যখন আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর মুসলিম বান্দাদের জন্য নসীহত তথা পরস্পর কল্যাণ কামনার উদ্দেশ্যে গিবত সংঘটিত হয়, তবে তা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলকারী পুণ্যকর্মসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে।”

২. অসৎ উদ্দেশ্যের ধারক ও বাহক: হাফেয ইবন রজব হাম্বলী রহ. বলেন, যার ব্যাপারে জানা যাবে যে, তার সমালোচনার উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে (মুসলিম ব্যক্তিবর্গকে) হেয় প্রতিপন্ন করা, নিন্দা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা, তবে সে শাস্তির মুখোমুখি হবে যাতে সে ও তার অনুসারীরা এ ধরণের নিষিদ্ধ অপকর্ম থেকে বিরত থাকে।

মুমিনদের ওপর দোষারোপকারীর শাস্তি:

হাফেজ ইবন রজব রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি তার মুমিন ভাইয়ের ওপর দোষারোপ করে, তার দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং তার অভ্যন্তরীণ বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ করে, তার শাস্তি হচ্ছে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি খুঁজবেন এবং তাকে অপমানিত করবেন, যদিও সে ঘরের ভিতর অবস্থান করুক না কেন। যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে একাধিকভাবে বর্ণিত আছে। ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযী বিভিন্নভাবে তা বর্ণনা করেছেন।

ইমাম তিরমিযী রহ. ওয়াসেলা ইবনুল আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “তুমি তোমার ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করো না। এমন করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাকে পরীক্ষায় ফেলে দিবেন।”[21]

তিনি (ইবন রজব) আরও বলেন, যখন ইবন সীরীন নামক এক ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হলো এবং এ কারণে সে বন্দী হলো, তখন সে বলল: “আমি জানি, যে অপরাধের কারণে আমার এই পরিণতি, তার কারণ হলো চল্লিশ বছর যাবৎ আমি এক ব্যক্তিকে তিরস্কার করেছি, আমি তাকে বলেছি, হে রিক্তহস্ত!”

 উপসংহার

পূর্বের আলোচনা থেকে আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নসীহত দীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন এবং অবশ্য পালনীয় কর্তব্য কাজ। অসিয়ত ব্যতীত ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন প্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী হতে পারে না।

সুতরাং নসীহত করাটা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য, আর নসীহত গোপন করাটা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। তবে প্রত্যেকেই সুন্দরভাবে নসীহত করতে পারে না। মুমিন দোষ-ত্রুটি গোপন করে এবং উপদেশ দেয়, আর মুনাফিক দোষ-ত্রুটি ফাঁস করে দেয় এবং অসম্মান করে।

উপদেষ্টার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য অর্জন করা আবশ্যক, তন্মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ইখলাস বা ঐকান্তিকতা। আর উপদিষ্টেরও কতিপয় বৈশিষ্ট্য আর্জন করা কর্তব্য, তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উপদেশ গ্রহণ করা।

একজন সূক্ষ্ম সমালোচক উপদেষ্টার মধ্যে প্রকাশিত লক্ষণ দ্বারাই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে সক্ষম- কল্যাণ কামনা করাই কি তার উদ্দেশ্য, না কি অসম্মান করা উদ্দেশ্য? এর ভিতর দিয়ে জানা যাবে, কিভাবে কার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়।

পরিশেষে আমি প্রাথমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উপদেশ দিচ্ছি, যাতে তারা আলিম-উলামা ও আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী দা‘ঈদের মান-সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে। কারণ, ওলামাদের শরীর বিষাক্ত এবং যে ব্যক্তি তাদের মান-সম্মান নষ্ট করবে, তার ব্যাপারে আল্লাহর সুন্নাত (নিয়ম) সর্বজনবিদিত। আর যে ব্যক্তি তাদের ব্যাপারে তিরস্কারমূলক কথা বলে, আল্লাহ তাকে আত্মার মৃত্যু দিয়ে পরীক্ষা করেন।

আল্লাহর নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন আমাদের সকলকে তাঁর পছন্দসই কাজ করার তাওফীক দেন এবং তিনি যাতে আমাদেরকে ঐসব ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শুনেন ও উত্তম কথাগুলোর অনুসরণ করেন। তিনি শ্রবণকারী, আহ্বানে সাড়া দানকারী। পরিশেষে আমাদের সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত।

আকিল আল-মাকতিরী

ফিকহুন নসীহত বা উপদেশতত্ত্ব: নসীহত দীনের গুরুত্বপূর্ণ রুকন। অথচ মানুষ এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভুলে যেতে বসেছে। যাদের নসীহত করার যোগ্যতা নেই, তারাও নসীহত করতে শুরু করে। আলোচ্য গ্রন্থে নসীহতের মর্মার্থ, বিভিন্ন অভিধান এবং কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে তুলে ধরা হয়েছে। তাছাড়া নসীহতের আদব, বৈশিষ্ট্য, পদ্ধতি, বিবেচ্য বিষয় ও বর্জনীয় বিষয়ও এখানে আলোকপাত করা হয়েছে।



[1] সহীহ মুসলিম, ঈমান, বাব-২৫, হাদীস নং ২০৫।

[2] দ্র. লিসানুল আরব, ২/৬১৬।

[3] দ্র তা‘যীমু কাদরিস্ সালাত।

[4] দ্র. জামি‘উল উসুল, ১১/৫৫৮।

[5] হাদীসটি ইমাম মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী রহ. বর্ণনা করেন, তাছাড়া ইমাম তিরমিযী ও নাসায়ী রহ. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এবং ইমাম আহমদ আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন।

[6] দ্র. সহীহুল জামে‘-৩২৪।

[7] দ্র. সহীহুল জামে‘-৩৩৭৯।

[8] দ্র. সহীহুল জামে‘-৬৫৭৬।

[9] সহীহ মুসলিম।

[10] সহীহ বুখারী, কিতাবুল আহকাম, ১৩/১৯৩; সহীহ মুসলিম, ১/৭৫; আহমদ, ৪/৩৫৭, ৩৬০, ৩৬৪ ইত্যাদি।

[11] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[12] সহীহ বুখারী ও মুসলিম।

[13] আহমদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ।

[14] সহীহ বুখারী, কিতাবুল আহকাম, বাব-৮, হাদীস নং ৬৭৩১।

[15] সহীহ মুসলিম।

[16] আল-ফারকু বাইনান নসিহাতে ওয়াত তা‘য়ীর, পৃ. ৩১

[17] আবু ইয়া‘লা আল-মাওসুলী তার মুসনাদে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেন।

[18] হাদীসটি বানোয়াট। দ্র. দ‘ঈফুল জামে, হাদীস নং ৫৭২২।

[19] দ্র. আল-মুসান্নাফ, ১০/২২৬।

[20] দ্র. সহীহ আল-জামে।

[21] শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানী হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন।দ্র. জঈফ আল-জামে‘, ৬২৫৮, হাদীসটি হাসান, গরীব।