কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’

[ بنغالي – Bengali – বাংলা ]

শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায

—™

অনুবাদ: মুহাম্মাদ রকীবুদ্দীন আহমদ হুসাইন

সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মর্মার্থ

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এই বাক্যটি ধর্মের মূলবাণী এবং ইসলামী মিল্লাতের ভিত্তি। এই কালেমার দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেন। এরই বাস্তবায়নে সমস্ত নবী-রাসূলের আহ্বান ছিল কেন্দ্রীভূত। এরই বাস্তবায়নে নাযিল হয় পবিত্র গ্রন্থাবলী, সৃষ্টি হয় সমগ্র জিন্ন ও মানবকুল।

আমাদের পিতা আদম ‘আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম এই কালেমার প্রতি আহ্বান জানান তার সন্তান-সন্ততিদের। তিনি ও তার বংশধর নূহ ‘আলাইহিস সালাম পর্যন্ত এই কালেমার ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। অতঃপর নূহ ‘আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ে ইবাদতের ক্ষেত্রে শির্ক দেখা দিলে আল্লাহ তা‘আলা নূহ ‘আলাইহিস সালামকে তাদের প্রতি প্রেরণ করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদের (তাওহীদ) প্রতি আহ্বান জানান এবং বলেন,

﴿يَٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَٰهٍ غَيۡرُهُ﴾ [المؤمنون: ٢٣]

“হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৩]

নূহ ‘আলাইহিস সালামের পর এভাবে হূদ, সালেহ, ইবরাহীম, লূত, শু‘আইব ও অন্যন্যা সকল রাসূলগণও তাদের স্ব স্ব জাতিকে এই কালেমা অর্থাৎ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর প্রতি, আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি এবং তিনি ভিন্ন অন্যের ইবাদত বাদ দিয়ে কেবল তাঁরই জন্য তা “খালেস” করার আহ্বান জানান।

সর্বশেষ এই কালেমার বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি এসে প্রথমে তাঁর সম্প্রদায়কে তাওহীদের প্রতি আহ্বান করে বলেন,

«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قُولُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا»

“হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা বল- আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য মা‘বূদ বা উপাস্য নেই, তোমরা সফলকাম হবে”

তিনি তাদেরকে কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত খালেস করার আহ্বান জানান এবং তাদের বাপ-দাদা পূর্বপুরুষগণ পরম্পরায় আল্লাহর সাথে যে শির্ক, প্রতিমাপূজা, পাথর, বৃক্ষ ও অন্যান্য বস্তুর ইবাদত চলে আসছে, তা বর্জন করতে বলেন। মুশরিকরা তাঁর এই আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলে উঠলো:

﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ ٥﴾ [ص: ٥]

“তিনি তো অনেক মা‘বূদের বদলে এক মা‘বূদ স্থির করে নিলেন। এটাতো অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়”[সূরা সদ, আয়াত: ৪]

কারণ, মুশরিকরা মূর্তি-প্রতিমা, অলী-দরবেশ, গাছ বৃক্ষ ইত্যাদির ইবাদতে অভ্যস্থ ছিল। তারা এই সবের নামে জবাই করত, মান্নত করতো এবং তাদের প্রতি আপন আপন প্রয়োজন পূরণ ও দুঃখ-কষ্ট দূর করার আবেদন জানাতো। ফলে, তারা এই তাওহীদী কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, এই কালেমা আল্লাহ ব্যতীত তাদের অন্য সব মা‘বুদ বা উপাস্যকে বাতিল প্রতিপন্ন করে। আল্লাহ তা‘আলা সূরা সাফ্‌ফাতের ৩৫ ও ৩৬ নং আয়াতে বলেন,

﴿إِنَّهُمۡ كَانُوٓاْ إِذَا قِيلَ لَهُمۡ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ يَسۡتَكۡبِرُونَ ٣٥ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوٓاْ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرٖ مَّجۡنُونِۢ ٣٦﴾ [الصافات: ٣٥، ٣٦]

“তাদের নিকট ‘আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্য মা‘বূদ নেই’ বললে তারা অহংকার করতো এবং বলত আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের মা‘বূদগণকে বর্জন করব”[সূরা আস-সাফ্‌ফাত, আয়াত: ৩৫-৩৬]

মূলতঃ মুশরিকরা তাদের অজ্ঞতা, ভ্রান্তি ও একগুয়েমীবশতঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাগল কবি বলে আখ্যায়িত করতো। যদিও তারা সম্যকভাবে জানত যে, তিনি তাদের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি কোনো কবি ছিলেন না। বস্তুতঃ অজ্ঞতা, অত্যাচারী স্বভাব, আগ্রাসী চরিত্র এবং সমাজে ভ্রান্তি, মিথ্যা ও অবাস্তব তথ্য প্রচারের ঐকান্তিক আগ্রহই ছিল তাদের সত্য গ্রহণের পথে প্রধান অন্তরায়। সুতরাং যে ব্যক্তি এই কালেমার অর্থ অনুধাবন করবে না এবং কাজের মাধ্যমে নিজের জীবনে এর বাস্তবায়ন করবে না, সে মুসলিম হতে পারে না। মুসলিম সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদে বিশ্বাস রাখে এবং যাবতীয় ইবাদত অন্য কারো পরিবর্তে একমাত্র আল্লাহর জন্যই খাস করে, তাঁরই জন্য সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করে, সিয়াম (রোযা) পালন করে, তাঁকেই ডাকে, তাঁরই সাহায্য কামনা করে, তাঁরই উদ্দেশ্যে সে মান্নত করে, জবাই করে। এভাবে সকল প্রকার ইবাদত সে কেবল আল্লাহ তা‘আলার প্রতিই নিবেদন করে। একজন মুসলিম ব্যক্তির স্থির বিশ্বাস এই যে, আল্লাহ তা‘আলাই কেবল ইবাদতের যোগ্য। তিনি ব্যতিরেকে আর কেউ এর হকদার নয়। চাই সে হোক নবী, ফিরিশতা, অলী, প্রতিমা, বৃক্ষ, জিন্ন বা অন্য কিছু; এরা কেউ ইবাদতের যোগ্য হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ﴾ [الاسراء: ٢٣]

“তোমাদের রব নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত তোমরা করবে না”[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩]

এটাই হলো কালেমায়ে لا إله إلا الله এর মর্মার্থ। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার উপাস্য আর কেউ নেই। কালেমা এর মধ্যে অস্বীকারসূচক ও স্বীকৃতিসূচক উভয় দিক রয়েছে। এই কালেমায়, একদিকে যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাস্য হওয়ার ব্যাপারটি অস্বীকার করা হচ্ছে, তেমনি অপর দিকে কেবল আল্লাহ তা‘আলারই উপাস্য হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। তাই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্যগুণে বিশেষিত করলে তা হবে বাতিল। কারণ, এই গুণ আল্লাহ তা‘আলারই প্রতিষ্ঠিত অধিকার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ﴾ [الحج: ٦٢]

“তা এই জন্য যে, আল্লাহ তিনিই সত্য এবং ওরা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা বাতিল”[সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৬২] সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য, অন্য কারো নয়। কাফিররা যে এই ইবাদত অন্যের প্রতি নিবেদন করে, তা সম্পূর্ণ বাতিল কাজ এবং এটা অপাত্রে রাখার শামিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١﴾ [البقرة: ٢١]

“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন। যাতে, তোমরা মুত্তাকী হতে পার”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১] কুরআন শরীফের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা ফাতিহার একটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِيَّاكَ نَعۡبُدُ وَإِيَّاكَ نَسۡتَعِينُ ٥﴾ [الفاتحة: ٥]

“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য কামনা করি”[সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৫] আল্লাহ তা‘আলা মুমিনগণকে এভাবে বলতে নির্দেশ করেছেন: “হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই নিকট সাহায্য কামনা করি। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗا﴾ [النساء: ٣٦]

“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং এতে তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করো না”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ﴾ [البينة: ٥]

“তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে”[সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُ﴾ [الزمر: ٢، ٣]

“আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে। জেনে রাখ, খালেস আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২-৩]

এভাবে আরও অনেক আয়াত রয়েছে, যা এ কথাই প্রমাণ করে যে, ইবাদতের যোগ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই। এতে সৃষ্টির কোনো অংশ নেই। এ-ই হচ্ছে কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মর্মার্থ। এর হাকীকত ও দাবী হলো, আপনি আল্লাহ তা‘আলার জন্যই সমূহ ইবাদত খাস ও খালেস করবেন এবং তিনি ব্যতীত অন্য সবার ক্ষেত্রে এর অস্বীকৃতি জানাবেন। জানা কথা, এই বিশ্বজগতে আল্লাহ ব্যতীত তাঁর অনেক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত চলছে। অতীতেও আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তি-প্রতিমা, ফির‘আউন ও ফিরিশতাদের ইবাদত হয়েছে, আল্লাহকে ছেড়ে কোনো কোনো নবী-রাসূল ও নেক লোকদের ইবাদত করা হয়েছে। এসবই ঘটেছে। তবে তা হয়েছে বাতিল ও সত্যের পরিপন্থি। সত্যিকার মা‘বূদ তো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা। তিনিই তো হলেন ইবাদতের একমাত্র যোগ্য ও অধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ ٣٠﴾ [لقمان: ٣٠]

“তা এজন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং ওরা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা মিথ্যা। আল্লাহ, তিনি তো সুউচ্চ-মহান”[সূরা লুকমান, আয়াত: ৩০]

[এই হলো ইসলামের প্রথম ভিত্তি কালেমা তাইয়্যেবার প্রথম অংশ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর সারকথা।]

 আল্লাহর সাথে শির্ক-এর বিশ্লেষণ

ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করার নাম শির্ক। যেমন, প্রতিমা-মূর্তি বা অন্য কাউকে ডেকে তার নিকট সাহায্য কামনা, তার জন্য মান্নত বা তার উদ্দেশ্যে সালাত পড়া বা সাওম পালন করা বা যবেহ করা এভাবে বাদাভী-র উদ্দেশ্যে বা ‘আইদারুস’র উদ্দেশ্যে যবেহ করা বা কোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্যে সালাত পড়া বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বা ইরাকস্থ শাইখ আবদুল কাদির জিলানী, ইয়ামনস্থ ‘আইদারুস, মিশরস্থ বাদাভী বা অন্যান্য মৃত বা যারা অনুপস্থিত তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা, এইসব কাজের নাম শির্ক।

এভাবে কেউ যদি নক্ষত্ররাজি বা জিন্নদের ডেকে তাদের কাছে ফরিয়াদ করে বা সাহায্য কামনা করে বা এ জাতীয় ইবাদত কর্মের কোনো একটি যখন কোনো জড় সৃষ্টি, মৃত বা অনুপস্থিত কারো জন্য নিবেদন করে তখন তা আল্লাহর সাথে শির্ক নামে আখ্যায়িত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ﴾ [الانعام: ٨٨]

“তারা যদি শির্ক করত তাহলে তাদের সব কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে যেত”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٦٥﴾ [الزمر: ٦٥]

“তোমাদের প্রতি এবং তোমার পূর্বে অতীত সমস্ত রাসূলগণের প্রতি অবশ্যই এ বার্তা পাঠানো হয়েছে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শির্ক কর তাহলে তোমার সমস্ত নেক আমল অবশ্যই বৃথা যাবে। আর তুমি নিঃসন্দেহে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

শির্কের মধ্যে একটি হলো, পূর্ণভাবে গাইরুল্লাহ’র ইবাদত করা। এটাকে শির্কও বলা হয়, কুফুরীও বলা হয়। যে আল্লাহ তা‘আলা থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে অন্যের উদ্দেশ্যে ইবাদত নির্দিষ্ট করে যেমন বৃক্ষ, প্রস্তর, মূর্তি, জিন্ন বা কোনো মৃত ব্যক্তি যাদেরকে তারা আওলিয়া নাম দিয়ে থাকে, তাদের ইবাদত করে, তাদের উদেশ্যে সালাত আদায় করে, সাওম পালন করে এবং আল্লাহকে পুরোপুরি ভুলে যায়, এটা হবে সবচেয়ে বড় কুফুরী ও জঘন্যতম শির্ক। (আল্লাহর কাছে তা থেকে নিরাপত্তা কামনা করি।) এভাবে যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং বলে: মা‘বূদ বা উপাস্য বলতে কেউ নেই এবং এই পার্থিব জীবন একটি বস্তুগত ব্যাপার মাত্র। যেমনটি সমাজতন্ত্রী ও নাস্তিকরা বলে থাকে, এরা হলো চরম পর্যায়ের কাফির, মুশরিক ও পথভ্রষ্ট। (আল্লাহ তা‘আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।)

মোটকথা, এ জাতীয় সব আকীদা-বিশ্বাসকে আল্লাহর সাথে শির্ক ও কুফুরী বলা হয়ে থাকে।

কোনো কোনো লোক স্বীয় অজ্ঞতাবশতঃ মৃত ব্যক্তিকে ডাকা এবং তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করাকে উসীলা (মাধ্যম) নামে আখ্যায়িত করে এবং তা জায়েয মনে করে। এটা মারাত্মক ভুল, কেননা একাজ আল্লাহর সাথে শির্ক হিসেবে পরিগণিত; যদিও অজ্ঞ লোকেরা বা মুশরিকরা এটাকে “উসীলা” নাম দিয়ে থাকে। এটাই হলো মুশরিকদের ধর্ম, আল্লাহ তা‘আলা যার নিন্দা ও দোষারূপ করেছেন। এটাকে অস্বীকার এবং এ থেকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ﴾ [المائ‍دة: ٣٥]

“হে মুমিনগণ, আল্লাহকে তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তাঁর নৈকট্য তালাশ কর”[সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৩৫]

এই আয়াতে যে উসীলার কথা বলা হয়েছে তা হলো আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের দ্বারা তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। সমস্ত ওলামায়ে কেরামের নিকট এটাই উসীলার অর্থ। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা একটি উসীলা, আল্লাহর জন্য যবেহ করা একটি উসীলা। যেমন, কুরবানী দেওয়া, হজের হাদী দেওয়া, এভাবে সিয়াম পালন করাও একটি উসীলা। সাদকা প্রদান একটি উসীলা, আল্লাহ তা‘আলার যিকির, কুরআন তিলাওয়াতও উসীলা। এটাই হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ﴾ [المائ‍دة: ٣٥]

এর মর্মার্থ আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের দ্বারা তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর। ইবন কাসির, ইবন জরীর ও বাগাভী প্রমুখ মুফাস্‌সীরগণ এক বাক্যে বলেছেন এর প্রকৃত অর্থ হলো: আল্লাহর আনুগত্য দ্বারা তাঁর নৈকট্য তালাশ কর এবং তোমরা যেখানেই থাক তাঁর প্রবর্তিত বিষয়াদি যথা- সালাত, সিয়াম, সদকা ইত্যাদি দ্বারা তা কামনা কর।

এভাবে আল্লাহ তা‘আলার অন্য একটি আয়াতে এই অর্থ ব্যক্ত করেছেন, আর তা হলো:

﴿أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّهُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ﴾ [الاسراء: ٥٧]

“তারা যাদেরকে আহ্বান করে তারা নিজেরাই তো নিজেদের রবের নৈকট্য লাভের জন্য উসীলা তালাশ করে যে, তাদের মধ্যে কে অধিক নিকটবর্তী। তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর আযাবকে ভয় করে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৭]

এভাবে রাসূলবর্গ ও তাদের অনুসারীগণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঐসব বিষয়কেও উসীলা হিসেবে গ্রহণ করেছেন যা তিনি প্রবর্তিত রেখেছেন। যেমন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, সাওম, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি।

আর কোনো কোনো লোকের ধারণা যে, উসীলা মানে মৃত ব্যক্তির ডাকা ও আওলিয়াদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা তা একটি বাতিল ধারণা, এটা মুশরিকদেরই আকীদাহ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ﴾ [يونس: ١٨]

“তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। তদুপরি তারা বলে যে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।” [সূরা ইউনূস, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তাদের এই বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন,

﴿قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾ [يونس: ١٨]

(হে রাসূল) আপনি তাদেরকে বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? তিনি পাক-পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি বহু উর্ধ্বে।” [সূরা ইউনূস, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা‘আলা আমাকে ও সকল মুসলিমকে সঠিকভাবে তাঁর দীন অনুধাবনের এবং এর উপর অচিল থাকার তাওফীক দান করুন। আর আমাদের সকল কু-প্রবৃত্তি ও পাপাচারের অমঙ্গল থেকে তিনি আশ্রয় প্রদান করুন। তিনি সর্বশ্রোতা, অতি সন্নিকটে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর সঠিক অনুসারীদের ওপর দুরূদ ও সালাম বর্ষণ করুন।

 প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন-১ : ইবাদতের অর্থ কী?

উত্তর : ইবাদতের অর্থ অত্যন্ত বিনীত ও নম্র হয়ে একমাত্র আল্লাহরই দাসত্ব করা এবং সকল বিধি-নিষেধ পালনের মাধ্যমে তাঁরই সম্পূর্ণ অনুগত হয়ে চলা। আলিমগণের ভাষায় ব্যাপক অর্থে: প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যেসব কথা ও কাজে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হন এবং যা তিনি পছন্দ করেন তারই নাম ইবাদত। যেমন, ঈমান, ইসলাম, দো‘আ, আশা, ভয়, আশ্রয় প্রার্থনা, সাহায্য কামনা, যবেহ করা, মান্নত করা ইত্যাদি।

প্রশ্ন-২ : তাওহীদের অর্থ কী?

উত্তর : তাওহীদ অর্থ আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর বৈশিষ্ট্যে একক ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করা। অর্থাৎ এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রভূত্বে, তাঁর সর্বসুন্দর নাম ও গুণাবলিতে এবং তার ইবাদতে একক, এতে তাঁর কোনো শরীক নেই। একেই আল্লাহর একত্ববাদ বলা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন-৩ : তাওহীদ কত প্রকার ও কী কী?

উত্তর : তাওহীদ তিন প্রকার।

(১) আল্লাহর প্রভূত্বে তাওহীদ;

(২) তাঁর নাম ও গুণাবলিতে তাওহীদ; এবং

(৩) তাঁর ইবাদতে তাওহীদ।

১। প্রভূত্বে তাওহীদ : এই প্রকার তাওহীদকে তাওহীদে রুবুবিয়্যাত বলা হয়ে থাকে। এর অর্থ হলো, এই কথা স্বীকার করা যে, আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিকর্ম, রিযিক প্রদান, জীবন-মৃত্যু দান এবং আকাশ-জমিন তথা নিখিল বিশ্বজগতের সর্বপ্রকার নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় একক ও অদ্বিতীয়। আরো স্বীকার করা যে, কিতাবসমূহ নাযিল ও নবী-রাসূলগণ প্রেরণের মাধ্যমে শাসন ও বিধি-বিধান প্রবর্তনে আল্লাহ তা‘আলা একক; এইসব ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরীক নেই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [الاعراف: ٥٤]

“জেনে রাখ, সৃজন ও নির্দেশ তাঁরই, বরকতময় আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রভূ-প্রতিপালক”[সূরা আল-‘আরাফ, আয়াত: ৫৪]

২। নাম ও গুণাবলিতে তাওহীদ : এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলাকে ঐসব নাম ও গুণাবলির দ্বারা বিশেষিত করা, যদ্বারা কুরআন কারীমে তিনি নিজেকে এবং বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে তাঁর রাসূল তাঁকে বিশেষিত করেছেন। আর এগুলোকে আল্লাহ তা‘আলার শানের উপযোগী পর্যায়ে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে সাদৃশ্য, উপমা, অপব্যাখ্যা বা নিষ্ক্রিয় করণের কোনো লেশ না থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ[الشورا: ١١]

“তার মতো কিছুই নেই এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”[সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

৩। ইবাদতে তাওহীদ : এই প্রকার তাওহীদকে তাওহীদে উলূহিয়্যাহ বলা হয়ে থাকে। এর অর্থ হলো, এককভাবে আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করা। তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করা, অন্য কারো কাছে দো‘আ বা আশ্রয় প্রার্থনা না করা, একমাত্র তাঁরই সাহায্য কামনা করা। তাঁরই উদ্দেশ্যে

মান্নত, জবাই ও কুরবানী ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবাদত নিবেদন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٦٢ لَا شَرِيكَ لَهُۥۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ١٦٣﴾ [الانعام: ١٦٢، ١٦٣]

(হে রাসূল) আপনি বলুন, আমার সালাত (নামায), আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এতে তাঁর কোনো শরীক নেই, আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং মুসলিমদের মধ্যে আমিই প্রথম।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬২-১৬৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢﴾ [الكوثر: ٢]

“সুতরাং তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত (নামায) আদায় এবং কুরবানী কর”[সূরা আল-কাউসার, আয়াত: ২]

আল্লাহই আমাদের তাওফীকদাতা।

কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’: একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা। কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ব্যাখ্যা, শির্কের অর্থ ও হাকীকত, ইবাদত ও তাওহীদের অর্থ এসব বিষয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান পুস্তিকায়।