সঠিক আকীদা-বিশ্বাস যা এর পরিপন্থী


শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায

অনুবাদক : মুহাম্মাদ রকীবুদ্দীন আহমদ হুসাইন

সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া


 সংক্ষিপ্ত বর্ণনা.............

বইটি আল্লামা শাইখ আবদুল আযীয ইবন বায রহ. এর একটি ভাষণ, যাতে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস তুলে ধরেছেন। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এটাই জানা যায় যে, কোনো কথা ও কাজ তখনই শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে যখন তা সহীহ আকীদার ওপর ভিত্তি করে সংঘটিত হবে, যদি আকীদা অশুদ্ধ হয়, তখন এর ওপর ভিত্তি করে যা কিছু সংঘটিত হবে সবই বাতিল বলে গণ্য হবে।

 ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, দুরূদ ও সালাম সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের ওপর। কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত শরী‘আতি প্রমাণাদির দ্বারা একথা সুস্পষ্টরূপে পরিজ্ঞাত রয়েছে যে, যাবতীয় কথা-বার্তা ও কার্যাবলি কেবল তখনই আল্লাহ তা‘আলার নিকট স্বীকৃত ও গৃহীত হয়, যখন তা ‘বিশুদ্ধ আকীদা’ অর্থাৎ সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়ে থাকে। আর যদি আকীদা বিশুদ্ধ না হয় তাহলে তার ভিত্তিতে সম্পাদিত যাবতীয় কথা ও কাজ আল্লাহর নিকট বাতিল বলে গণ্য হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلۡإِيمَٰنِ فَقَدۡ حَبِطَ عَمَلُهُۥ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [المائدة:5]

“যে কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে তার সমস্ত কাজ অবশ্যই বিফলে যাবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”[সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [الزمر:65]

“অবশ্যই তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্বে অতীত সমস্ত নবী রাসূলগণের প্রতি এ বার্তা পাঠানো হয়েছে যে, তুমি যদি আল্লাহর সাথে শির্ক কর, তাহলে তোমার সমস্ত কাজ অবশ্যই বৃথা হয়ে যাবে, আর তুমি নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

এই অর্থের সপক্ষে কুরআনে কারীমে বর্ণিত আয়াতের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ তা‘আলার অবতীর্ণ সুস্পষ্ট কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, বিশুদ্ধ আকীদার সারকথা হলো: আল্লাহর ওপর, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণের ওপর, আখেরাতের দিন এবং ভাগ্যের মঙ্গল-অমঙ্গলের ওপর বিশ্বাস স্থপন করা। এ ছয়টি বিষয়ই হলো সেই সঠিক ধর্মবিশ্বাসের মৌলিক বিষয়বস্তু বা নীতিমালা, যা নিয়ে নাযিল হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এবং প্রেরিত হলেন আল্লাহর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই মৌলিক নীতিমালারই শাখা-প্রশাখা হলো গায়েবী বিষয়াদি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কৃর্তক প্রদত্ত যাবতীয় খবরাখবর, যেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য। উক্ত ছয় নীতিমালার সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ’তে অসংখ্য প্রমাণাদি রয়েছে। তন্মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণীগুলো সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ليۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ﴾ [البقرة:177]

“তোমরা পূর্বদিকে মুখ করলে কি পশ্চিম দিকে, তা প্রকৃত কোনো পূণ্যের ব্যাপার নয়; বরং প্রকৃত পূণ্যের কাজ হলো যে, আল্লাহ তা‘আলা, শেষ দিন ও ফিরিশতাকুল, অবতীর্ণ কিতাবসমূহ এবং প্রেরিত নবীগণের ওপর নিষ্ঠার সাথে ঈমান আনয়ন করা”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৭৭]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ﴾ [البقرة:285]

“রাসূল সেই হিদায়াতে (পথ নির্দেশেই) ঈমান এনেছেন যা স্বীয় রবের নিকট থেকে তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে, আর মুমিনগণও (সেটার ওপর ঈমান এনেছে)। তারা সকলেই আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং রাসূলগণের ওপর ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বলে: আমরা আল্লাহর রাসূলগণের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করি না”[সূরা আল-আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا﴾ [النساء:136]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর এবং সে কিতাবের ওপর ঈমান আনয়ন কর, যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর নাযিল করেছেন। আর সেসব কিতাবের ওপরও ঈমান আনয়ন কর, যা তিনি এর পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ ও রাসূলগণ এবং শেষ দিবসের সাথে কুফরী (অস্বীকার) করবে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ﴾ [الحج:70]

“তোমার কি জানা নেই যে, আসমান-জমীনের সবকিছুই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত, সবকিছুই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এতো আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ”[সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭০]

উপরোক্ত নীতিমালার প্রমাণে সহীহ হাদীসের সংখ্যাও অনেক। তন্মধ্যে সেই সুপ্রসিদ্ধ হাদীসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা ইমাম মুসলিম স্বীয় সহীহ হাদীস গ্র্রন্থে আমীরুল মুমিনীন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদীসে এসেছে যে, জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি উত্তরে বলেন, “ঈমান হচ্ছে তুমি আল্লাহ তা‘আলার ওপর, তাঁর ফিরিশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনয়ন করবে, আর তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপরও ঈমান রাখবে”(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

এ ছয়টি মূলনীতি থেকেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও পুনরুত্থান সংক্রান্ত যাবতীয় গায়েবী বিষয়ে মুসলিমের আকীদা-বিশ্বাসের সবকিছু নির্ধারিত হয়েছে।  

 [প্রথম নীতি] আল্লাহর ওপর ঈমান

আল্লাহর ওপর ঈমানের প্রথম কথা হলো, এ ঈমান রাখতে হবে যে, তিনিই ইবাদত পাওয়ার একমাত্র যোগ্য, সত্যিকার মা‘বুদ, অন্য কেউ নয়। কেননা একমাত্র তিনিই বান্দাহদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি অনুগ্রহকারী এবং তাদের জীবিকার ব্যবস্থাপক। তিনি তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত এবং তিনি তাঁর অনুগত বান্দাকে প্রতিফলদানে ও অবাধ্যজনকে শাস্তি প্রদানে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর এ ইবাদতের জন্যেই আল্লাহ তা‘আলা জিন্ন ও ইন্‌সানকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রতি তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন, আল্লাহ বলেন,

 ﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ ٥٧ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ﴾ [الذاريات:56-57]

“আমি জিন্ন ও ইনসানকে কেবল আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের নিকট কোনো রিযিক চাই না, এটাও চাই না যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ নিজেইতো রিযিকদাতা, মহান শক্তিধর ও প্রবল পরাক্রান্ত”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬-৫৭)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ٢١ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ٢٢﴾ [البقرة: 21-22]

“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত কর যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকলকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে বিছানাস্বরূপ, আকাশকে ছাদস্বরূপ তৈরি করেছেন এবং আকাশ হতে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করে এর সাহায্যে নানা প্রকার ফল-শষ্য উৎপাদন করে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অতএব, তোমরা এসব কথা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করাবে না”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ২১-২২]

এ সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এবং এর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে এর পরিপন্থী বিষয় থেকে সতর্ক করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন,

 ﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমরা রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত কর এবং তাগুত (শয়তানী শক্তি) এর ইবাদত থেকে দূরে থাক”[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ﴾ [الأنبياء:25]

“আর আপনার পূর্বে যখনই আমরা কোনো রাসূল পাঠিয়েছি তখনই তাকে তো এটাই ওহী করেছি যে, নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) ব্যতীত কোনো সত্যিকারের মা‘বুদ নেই, সুতরাং তোমরা কেবল আমারই ইবাদত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿كِتَٰبٌ أُحۡكِمَتۡ ءَايَٰتُهُۥ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِن لَّدُنۡ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ١ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّا ٱللَّهَۚ إِنَّنِي لَكُم مِّنۡهُ نَذِيرٞ وَبَشِيرٞ﴾ [هود:1-2]

“এটি এমন এক কিতাব যার আয়াতসমূহ এক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ সত্ত্বার নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে, যেন তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না কর। অনন্তর, আমি তাঁরই পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি একজন ভয় প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা”[সূরা হূদ, আয়াত: ১-২]

উল্লিখিত ইবাদতের প্রকৃত অর্থ হলো: যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই নিবেদিত করা। প্রার্থনা, ভয়, আশা, সালাত, সাওম, যবেহ, মান্নত ইত্যাদি সর্বপ্রকার ইবাদত তাঁরই প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় ও পূর্ণ বশ্যতাসহ সম্পাদন করা। কুরআনে কারীমের অধিকাংশ আয়াত এই মহান মৌলিক নীতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

﴿فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ ٢ أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ﴾ [الزمر:2-3]

“অতএব, তুমি এক আল্লাহরই ইবাদত কর, দীনকে একমাত্র তাঁরই জন্যে খালেস কর। সাবধান, খালেস দীনতো একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২-৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ﴾ [الإسراء:23]

“তোমার রব এই বিধান করে দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কারো নয়”[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩]

মহান আল্লাহ আরো বলেন,

 ﴿فَٱدۡعُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ﴾ [غافر:14]

“অতএব, তোমরা আল্লাহকেই ডাক, নিজেদের দীনকে কেবল তাঁরই জন্যে খালেসভাবে নির্দিষ্ট করে, কাফিরদের কাছে তা যতই দুঃসহ হোক না কেন”[সূরা আল-গাফির, আয়াত: ১৪]

মু‘আয রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, ‘বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার হলো তারা যেন কেবল তাঁরই ইবাদত করে এবং এতে অন্য কাউকে তাঁর সাথে অংশীদার না করে’।

আল্লাহর ওপর ঈমানের আরেকটি দিক হলো-ঐ সমস্ত বিষয়ের ওপর ঈমান রাখা, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাগণের ওপর ওয়াজিব ও ফরয করেছেন। সেগুলো হচ্ছে, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ: (১) এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো হক্ব মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, (২) সালাত প্রতিষ্ঠা করা, (৩) যাকাত দেওয়া, (৪) রমযানের সাওম পালন, (৫) বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছার সামর্থ্য থাকলে হজ পালন করা ইত্যাদিসহ অন্যান্য ফরযগুলো, যা নিয়ে পবিত্র শরী‘আতের আগমন ঘটেছে।

উপরোক্ত স্তম্ভ বা রুকনগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান করুন হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। এটিই হলো কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’-এর প্রকৃত মর্মার্থ। কেননা এর যথার্থ অর্থ হলো-আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো সত্যিকার মা‘বুদ নেই। সুতরাং তাঁকে ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয়, সে মানব সন্তান হোক আর ফিরিশতা, জিন্ন বা অন্য যাই হোক সবই বাতিল। সত্যিকার মা‘বুদ হলেন কেবল সেই মহান আল্লাহ তা‘আলাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ﴾ [الحج:62]

“তা এই জন্যে যে, আল্লাহই প্রকৃত সত্য এবং তাঁকে বাদ দিয়ে ওরা যাদের আহ্বান (ইবাদত) করছে তা নিঃসন্দেহে বাতিল”[সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৬২]

ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এই যথার্থ মৌলিক বিষয়ের উদ্দেশ্যেই জিন্ন ও ইন্‌সান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে তা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং হে পাঠক, বিষয়টি ভালো করে ভেবে দেখুন এবং এ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করুন। আপনার কাছে নিশ্চয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে, অধিকাংশ মুসলিম উক্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতি সম্পর্কে বিরাট অজ্ঞতার মধ্যে নিপতিত রয়েছে। ফলে তারা আল্লাহর সাথে অন্যেরও ইবাদত করছে এবং তাঁর প্রাপ্য ও খালেস অধিকার অন্যের জন্যে নিবেদিত করে চলেছে।

এটাও আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনিই সকল সৃ্ষ্টির সৃষ্টিকর্তা, তাদের যাবতীয় বিষয়ের ব্যবস্থাপক এবং আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে স্বীয় জ্ঞান ও কুদরতের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি দুনিয়া-আখেরাতের মালিক ও সমগ্র জগৎবাসীর প্রতিপালক। তিনিই আপন বান্দাহগণের যাবতীয় সংশোধন, তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যাণের প্রতি আহ্বান জানানোর উদ্দেশ্যে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। এ সব যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার কোনো শরীক নেই। আল্লাহ বলেন,

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر:62]

“আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সর্ববিষয়ের যিম্মাদার”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬২]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۢ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [الأعراف:54]

“নিশ্চয় তোমাদের রব হলেন আল্লাহ, যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি ‘আরশের উপর উঠলেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখো, সৃষ্টি আর হুকুম প্রদানের মালিক তিনিই। চির মঙ্গলময় মহান আল্লাহ তিনিই সৃষ্টিকুলের রব”[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪]

আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমানের আরেকটি দিক হলো, কুরআনে কারীমে উদ্ধৃত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আল্লাহর সর্ব সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর সর্বোন্নত গুণরাজির ওপর কোনো প্রকার বিকৃতি, অস্বীকৃতি, ধরণ নির্ধারণ, গঠন বা সাদৃশ্য আরোপ না করে ঈমান আনয়ন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [الشورى:11]

“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”[সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿فَلَا تَضۡرِبُواْ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡثَالَۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ﴾ [النحل:74]

“সুতরাং তোমরা আল্লাহর কোনো সাদৃশ্য স্থির করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না”[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৪]

এ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারী আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদা বা বিশ্বাস। ইমাম আবুল হাসান আল-আশ‘আরী রহ. তার ‘আল-মাকালাত আন আসহাবিল হাদীস ওয়া আহলিস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই আকীদার কথাই উদ্ধৃত করেছেন। এভাবে ইলম ও ঈমানের বিজ্ঞজনেরাও বর্ণনা করে গেছেন।

* ইমাম আওযা‘য়ী রহ. বলেন, ইমাম যুহরী ও মাকহুলকে আল্লাহর গুণরাজি সম্পর্কিত আয়াতগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলেন, এগুলো যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবেই মেনে নাও।

* ওয়ালীদ ইবন মুসলিম রহ. বলেন ইমাম মালেক, আওযায়ী, লাইস ইবন সা‘দ ও সুফইয়ান সাওরীকে আল্লাহর গুণরাজি সম্বন্ধে বর্ণিত হাদীসসমূহ জিজ্ঞাসা করা হলে তারা সকলেই উত্তরে বলেন, ‘কোনোরূপ ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই এগুলো যেভাবে এসেছে ঠিক সেভাবে মেনে নাও’।

* ইমাম আওযা‘য়ী বলেন, বহুল সংখ্যায় তাবেঈগণের জীবদ্দশায় আমরা বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ‘আরশের উপর রয়েছেন এবং হাদীস শরীফে বর্ণিত তাঁর সব গুণাবলীর ওপর আমরা ঈমান আনয়ন করি।

* ইমাম মালেকের উস্তাদ রাবী‘আহ ইবন আবু আব্দুর রহমান রহ.-কে (আল্লাহ তাঁরই ‘আরশের উপর উঠা) সম্পর্কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তাঁর ‘আরশের উপর উঠা অজানা ব্যাপার নয়, তবে এর বাস্তব ধরণ আমাদের বিবেকগ্রাহ্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে রিসালাত, রাসূলের দায়িত্ব হলো স্পষ্টভাবে এর ঘোষণা করা আর আমাদের কর্তব্য হলো এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।

* ইমাম মালেক রহ.-কে ‘ইস্তিওয়া’ বা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক ‘আরশের উপর উঠা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, উপরে উঠা আমাদের জ্ঞাত আছে, তবে এর বাস্তব ধরন অজ্ঞাত, এর ওপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা বিদ‘আত।’ তারপর তিনি প্রশ্নকর্তাকে বললেন, আমার তো মনে হচ্ছে তুমি খারাপ লোক ছাড়া আর কিছু নও, তারপর তাকে তার মজলিস থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বের করে দেওয়া হয়। 

* উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ঐ একই অর্থে হাদীস বর্ণিত আছে।

* আর ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রারহ. বলেন, “আমরা আমাদের মহান রব সম্পর্কে জানি যে, তিনি সকল আসমানের ওপর ‘আরশের ওপর রয়েছেন তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা হয়ে।”

উপরোক্ত বিষয়ে ইমামগণের অনেক বক্তব্য রয়েছে। এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এর বিস্তারিত উল্লেখ সম্ভব নয়। কারো এর অধিক জানার আগ্রহ হলে আহলে সুন্নাতের আলেমগণ কর্তৃক উক্ত বিষয়ের উপর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থাবলী পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি।

১) আবদুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ রচিত কিতাবুস সুন্নাহ।

২) প্রখ্যাত ইমাম মুহাম্মাদ ইবন খুযাইমা কর্তৃক রচিত কিতাবুত তাওহীদ।

৩) আবুল কাসেম আল-লালেকায়ী আত-ত্বাবারী রচিত, আস-সুন্নাহ।

৪) আবু বকর ইবন আবী ‘আসিম রচিত কিতাবুস সুন্নাহ।

৫) শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কর্তৃক প্রদত্ত জবাব, যা তিনি হামাবাসীদের জন্য দিয়েছিলেন। বস্তুত এ শেষোক্ত জবাবটি অতি উপকারী এক মহৎ জবাবনামা। এতে শাইখুল ইসলাম অতি চমৎকারভাবে আহলে সুন্নাতের আকীদাসমূহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এবং তাদের বহুবিধ উক্তিসহ শরী‘আত ও বুদ্ধিভিত্তিক প্রমাণসমূহ উদ্ধৃত করেছেন, যা আহলে সুন্নাতের বক্তব্যের বিশুদ্ধতা ও তাদের বিপক্ষীয় বক্তব্যের অসারতা সঠিকভাবে প্রমাণ করে।

৬) অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলামের আরেকটি গ্রন্থ, যা ‘রিসালায়ে তাদমুরিয়া’ নামে পরিচিত; সেটাতেও তিনি উক্ত বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেন। কুরআন-সুন্নাহ ও বিবেকগ্রাহ্য বিভিন্ন দলীল দিয়ে আহলে সুন্নাতের আকীদা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন এবং এমনভাবে বিরুদ্ধবাদীদের প্রত্যুত্তর প্রদান করেছেন যে, সত্যান্বেষী ও সরল-সাধু যে কোনো জ্ঞানভাজন ব্যক্তি একটু চিন্তা করলেই তাঁর কাছে সত্য উদ্ভাসিত ও বাতিল বিলুপ্ত হতে দেরী হবে না।

আর যে কেউ আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র নামসমূহ ও গুণরাজি সংক্রান্ত বিশ্বাসে আহলে সুন্নাতের বিরোধিতা করবে, সে যা সাব্যস্ত করবে বা নিষেধ করবে তাতে নিশ্চিতভাবে কুরআন-সুন্নাহ ও বিবেকগ্রাহ্য দলীলের বিরোধিতা করার সাথে সাথে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাসে নিপতিত হবে। 

* আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ‘ত আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ঐসব গুণাবলী সাদৃশ্যহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তিনি স্বীয় কুরআনে কারীমে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহীহ হাদীসসমূহে আল্লাহর জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সদৃশ হওয়া থেকে এমনভাবে পবিত্র রাখেন যার মধ্যে তা‘ত্বীল বা গুণমুক্ত করার কোনো লেশ থাকে না। ফলে তারা পরস্পর বিরোধী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর গুণাবলীর ওপর ঈমান আনয়ন করে থাকেন।

বস্তুত আল্লাহ তা‘আলার চিরন্তন নীতিই হলো, যে কোনো মানুষ রাসূলগণের মাধ্যমে প্রেরিত সত্যকে আঁকড়ে তাঁর সমুদয় সামর্থ্য সে পথে ব্যয় করে এবং নিষ্ঠার সাথে এর অন্বেষায় থাকে, তাকে আল্লাহ তা‘আলা সত্যের পথে চলার তাওফীক দান করেন এবং তার বক্তব্যকে বিজয়ী করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿بَلۡ نَقۡذِفُ بِٱلۡحَقِّ عَلَى ٱلۡبَٰطِلِ فَيَدۡمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٞۚ وَلَكُمُ ٱلۡوَيۡلُ مِمَّا تَصِفُونَ﴾ [الأنبياء:18]

“বরং আমরা তো বাতিলের ওপর সত্যের আঘাত হেনে থাকি, ফলে তা অসত্যকে চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষনাৎই বাতিল বিলুপ্ত হয়ে যায়।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা‘আলা আরেকটি আয়াতে বলেন,

﴿وَلَا يَأۡتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ وَأَحۡسَنَ تَفۡسِيرًا﴾ [الفرقان: 33]

“আর যখনই তারা তোমার সম্মুখে কোনো নতুন উদাহরণ পেশ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা এর হক্ব জবাব তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি এবং অতি উত্তমভাবে মূল কথা ব্যক্ত করে দিয়েছি”[সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৩৩]

হাফেয ইবন কাসীর রহ. তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ﴾ [الأعراف:54]

“বস্তুত তোমাদের প্রভু সেই আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন”[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪] এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অতি সুন্দর কথা বলেছেন যা অত্যন্ত উপকারী বিধায় এখানে প্রণিধানযোগ্য মনে করছি। তিনি বলেন, এ প্র্রসঙ্গে লোকদের বক্তব্য অনেক, এর বিস্তারিত বর্ণনার স্থান এখানে নয়। আমরা এ ব্যাপারে ঐ পথই গ্রহণ করবো, যে পথে চলেছেন পূর্বেকার সুযোগ্য মনীষী ইমাম মালেক, আওযা‘য়ী, সাওরী, লাইস ইবন সা‘দ, শাফে‘ঈ, আহমদ ইবন রাহওয়িয়াহসহ তৎকালীন ও পরবর্তী মুসলিমদের ইমামগণ। আর তা হলো, আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ঠিক সেভাবেই তা মেনে নেওয়া, এর কোনো ধরণ, সাদৃশ্য বা গুণ বিমুক্তি নির্ণয় ব্যতিরেকেই। সাদৃশ্যপন্থিদের মস্তিষ্কে প্রথম লগ্নেই আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে যে কল্পনার উদয় ঘটে তা আল্লাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত। কেননা কোনো ব্যাপারেই কোনো সৃষ্টি আল্লাহর সদৃশ হতে পারে না। তাঁর সমতুল্য কোনো বস্তু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তদ্রূপই, যেরূপ শ্রদ্ধেয় ইমামগণ বলে গেছেন। তাদের মধ্যে ইমাম বুখারীর উস্তাদ নু‘আইম ইবন হাম্মাদ আল খুযা‘য়ী অন্যতম। তিনি বলেছেন: যে লোক আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে কোনো ব্যাপারে সদৃশ মনে করে সে কাফির এবং যে আল্লাহর সে সব গুণরাজি অস্বীকার করে যা দ্বারা তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন, সেও কাফির। কেননা আল্লাহকে স্বয়ং তিনি বা তাঁর রাসূল যেসব গুণরাজির দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সৃষ্টির সাথে সেগুলোর কোনো সাদৃশ্য নেই।

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে আল-কুরআনের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহে বর্ণিত গুণরাজি এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে যা আল্লাহর মহত্বের সাথে মানানসই হয় এবং তাঁকে যাবতীয় অপূর্ণতা, খুঁত বা ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পাক-পবিত্র রাখে, সে ব্যক্তিই হিদায়াতের পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করে চলে।

 [দ্বিতীয় নীতি] ফিরিশতাদের ওপর ঈমান

ফিরিশতাগণের প্রতি ব্যাপক ও বিশদভাবে ঈমান স্থাপন করতে হবে। একজন মুসলিম ব্যাপকভাবে এ ঈমান পোষণ করবে যে, আল্লাহ তা‘আলার বিপুল সংখ্যক ফিরিশতা রয়েছে। তাদেরকে তিনি নিজ আনুগত্যের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাদের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন যে, তারা আল্লাহর আগেভাগে কোনো কথা বলে না, বরং তারা সর্বদা তাঁর আদেশানুসারে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে থাকে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿عِبَادٞ مُّكۡرَمُونَ ٢٦ لَا يَسۡبِقُونَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ ٢٧ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ﴾ [الأنبياء: 26-28]

“তারা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তাঁর (আল্লাহর) আগেভাগে তারা কথা বলে না বরং তারা সর্বদা তাঁকেই আদেশানুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। তাদের সম্মুখে এবং পশ্চাতে যা কিছু আছে সবকিছুই তাঁর জানা রয়েছে। যাদের পক্ষে সুপারিশ শুনতে আল্লাহ রাযী হবেন কেবল তাদের জন্যই তারা সুপারিশ করবে। আর ফিরিশতারা আল্লাহর ভয়ে সদা সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত থাকে”[সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৬-২৮]

আল্লাহর ফিরিশতাগণ অনেক প্রকার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তন্মধ্যে একদল তাঁর ‘আরশ উত্তোলন কাজে, অপর একদল জান্নাত-জাহান্নামের তত্ত্বাবধানে এবং আরেক দল মানুষের আমলনামা সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।

আর আমরা বিশদভাবে ঐসব ফিরিশতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, যাদের নাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল উল্লেখ করেছেন। যেমন, জিবরীল, মিকাঈল, মালিক- তিনি জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক এবং ইসরাফীল- তিনি শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। একাধিক সহীহ হাদীসে তার কথা উল্লেখ আছে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত এক সহীহ হাদীসে আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফিরিশতাগণ নূরের সৃষ্টি, জিন্নকুল খাঁটি আগুন থেকে সৃষ্টি এবং আদমকে যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা আল্লাহ তা‘আলা (কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে) তোমাদেরকে বলে দিয়েছেন”। ইমাম মুসলিম উক্ত হাদীসটি সহীহ সনদে স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

 [তৃতীয় নীতি] আসমানী কিতাবসমূহের ওপর ঈমান

এভাবে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এ ঈমান স্থাপন করতে হবে যে, আল্লাহ তা‘আলা আপন সত্যের ঘোষণা এবং এর প্রতি আহ্বান জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর নবী ও রাসূলগণের ওপর অসংখ্য কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন,

﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِۖ﴾ [الحديد: 25]

“আমরা আমাদের রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও মীযান নাযিল করেছি, যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে”[সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِۚ﴾ [البقرة:213]

“প্রথমদিকে মানুষ একই পথের অনুসারী ছিল। অনন্তর আল্লাহ নবীদের প্রেরণ করেন সঠিক পথের অুসারীদের জন্য সুসংবাদদাতা এবং বিভ্রান্তদের জন্য ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে। আর তাদের সাথে নাযিল করেন সত্যের প্রতীকসমূহ এ উদ্দেশ্যে যে, লোকদের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তিনি তার চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেন”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১৩]

আর বিশদভাবে আমরা ঐসব কিতাবের ওপর ঈমান স্থাপন করবো যেগুলোর নাম আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন, তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর ও কুরআন।

* এগুলোর মধ্যে কুরআনই সর্বোত্তম ও সর্বশেষ কিতাব যা পূর্ববর্তী অপর কিতাবসমূহের সংরক্ষক ও সত্যয়নকারী। সমগ্র উম্মতকে এরই অনুসরণ করতে হবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত সহীহ সুন্নাতসহ এরই ফায়সালা মেনে নিতে হবে। কেননা আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র জিন্ন ও ইনসানের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর প্রতি এই মহান কিতাব ‘কুরআন শরীফ’ নাযিল করেছেন, যাতে তিনি ইহা দ্বারা লোকদের মধ্যে ফায়সালা করেন। উপরন্তু, আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনকে তাদের অন্তরস্থ যাবতীয় ব্যাধির প্রতিকার, তাদের প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট প্রতিপাদক এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমতস্বরূপ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ مُبَارَكٞ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُواْ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ﴾ [الأنعام:155]

“আর, এটি এক মহাকল্যাণময় গ্রন্থ, যা আমরা অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরন কর এবং তাকওয়াপূর্ণ আচরণ-বিধি গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের প্রতি রহমত নাযিল হবে”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ﴾ [النحل:89]

“আমরা মুসলিমদের জন্য প্রত্যেকটি বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথ নির্দেশ, রহমত ও সুসংবাদস্বরূপ এই কিতাব তোমার কাছে অবতীর্ণ করলাম”[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮৯]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

 ﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ فَ‍َٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ﴾ [الأعراف: 158]

(হে রাসূল) আপনি বলুন, হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের প্রতি প্রেরিত সেই আল্লাহর রাসূল যিনি যমীন ও আকাশসমূহের একচ্ছত্র মালিক। তিনি ব্যতীত আর কোনো হক্ব মা‘বুদ নেই, তিনিই জীবন-মৃত্যু দান করেন। অতএব, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আন, যে আল্লাহ ও তাঁর সকল বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর; যাতে তোমরা সরল সঠিক পথের সন্ধান লাভ করতে পার”[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৮]

 [চতুর্থ নীতি] রাসূলগণের ওপর ঈমান

আল্লাহর প্রেরিত রাসূলগণের ওপরও ব্যাপক ও বিশদভাবে ঈমান স্থাপন করতে হবে। সুতরাং আমরা ঈমান রাখি যে, আল্লাহ তা‘আলা আপন বান্দাদের প্রতি তাদের মধ্যে বহু সংখ্যক রাসূল- শুভসংবাদবাহী, ভীতি প্রদর্শনকারী ও সত্যের পানে আহ্বায়করূপে প্রেরণ করেছেন। যে ব্যক্তি তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে সে সৌভাগ্যের পরশ লাভ করেছে, আর যে তাদের বিরোধিতা করেছে সে হত্যাশা ও অনুশোচনার শিকারে নিপতিত হয়েছে।

রাসূলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ হলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ বলেন,

  ﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [النحل:36]

“প্রত্যেক জাতির প্রতি আমরা রাসূল পাঠিয়েছি এই আদেশ সহকারে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতের (শয়তান বা শয়তানী শক্তির) ইবাদত থেকে দূরে থাক”[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ﴾ [النساء: 165]

“আমি তাদর সবাইকে শুভসংবাদবাহী ও সতর্ককারী রাসূল হিসেবে প্রেবণ করেছি যাতে এ রাসূলগণের আগমণের পর মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৫]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

 ﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَۗ﴾ [الأحزاب:40]

“মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নন বরং তিনি তো আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী”[সূরা আল-আহ্‌যাব, আয়াত: ৪০]

ঐ সমস্ত নবী–রাসূলগণেরে মধ্যে আল্লাহ যাদের নাম উল্লেখ করেছেন বা যাদের নাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে তাদের প্রতি আমরা বিশদভাবে ও নির্দিষ্ট করে ঈমান স্থাপন করি। যেমন, নূহ, হূদ, সালেহ, ইবরাহীম ও অন্যান্য রাসূলগণ। আল্লাহ তাদের সকলের ওপর, তাদের পরিবারবর্গ ও অনুসারীদের ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

 [পঞ্চম নীতি] আখেরাত দিবসের ওপর ঈমান

আখেরাত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদের প্রতি ঈমান স্থাপন আখেরাত দিবসের ওপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে যেমন: কবরের পরীক্ষা, সেখানকার আযাব ও নি‘আমত, রোজ কিয়ামতের ভয়াবহতা ও প্রচণ্ডতা, পুলসিরাত, দাড়িপাল্লা, হিসাব-নিকাশ, প্রতিফল প্রদান, মানুষের মধ্যে তাদের আমলনামা বিতরণ: তখন কেউবা তা ডান হাতে গ্রহণ করবে আবার কেউবা তা বাম হাতে বা পিছনের দিক হতে গ্রহন করবে ইত্যাদি সবকিছুর ওপর ঈমান স্থাপন উক্ত ঈমানের আওতাভুক্ত। এতদ্ব্যতীত আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবতরণের জন্য নির্ধারিত হাউজে কাউসার, জান্নাত-জাহান্নাম, মুমিন বান্দাগণ কর্তৃক তাদের রবের দর্শন লাভে এবং তাদের সাথে আল্লাহর কথোপকথনসহ অন্যান্য যা কিছু কুরআনে কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও আখেরাতের দিনের ওপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং উপরোক্ত সব কয়টি বিষয়ের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় ঈমান আনয়ন করা আমাদের ওপর ফরয।

 [যষ্ঠ নীতি] তাকদীরের ওপর ঈমান

তাকদীরের ওপর ঈমান বলতে নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের ওপর ঈমান স্থাপনকে বুঝায়:

প্রথমত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, অতীতে যা কিছু ছিল এবং বর্তমান বা ভবিষ্যতে যা কিছু হবে তার সবকিছুই আল্লাহ তা‘আলার জানা আছে। তিনি আপন বান্দাদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে অবহিত। তাদের রিযিক, তাদের মৃত্যুক্ষণ, তাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীসহ অন্যান্য সব বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত, কোনো কিছুই তাঁর অগোচরে নেই। তিনি পাক-পবিত্র মহান। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ﴾ [العنكبوت:62]

“নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেকটি বস্তু সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত”[সূরা আল-‘আনকাবুত, আয়াত: ৬২]

মহা মহীম আল্লাহ আরো বলেন,

 ﴿لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ وَأَنَّ ٱللَّهَ قَدۡ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عِلۡمَۢا﴾ [الطلاق: 12]

“যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর ওপর শক্তিমান এবং একথাও জানতে পার যে, আল্লাহর জ্ঞান সবকিছুতেই পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে”[সূরা আল-তালাক, আয়াত: ১২]

দ্বিতীয়ত: এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তা‘আলা যা কিছু নির্ধারণ ও সম্পাদন করেছেন সবকিছুই তাঁর লিখা রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

 ﴿قَدۡ عَلِمۡنَا مَا تَنقُصُ ٱلۡأَرۡضُ مِنۡهُمۡۖ وَعِندَنَا كِتَٰبٌ حَفِيظُۢ﴾ [ق: 4]

“পৃথিবী তাদের দেহ থেকে যা কিছু ক্ষয় করে তা আমার জানা আছে এবং আমার নিকট একটি সংরক্ষক কিতাব রয়েছে”[সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৪]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿وَكُلَّ شَيۡءٍ أَحۡصَيۡنَٰهُ فِيٓ إِمَامٖ مُّبِينٖ﴾ [يس: 12]

“এবং আমরা প্রতিটি বস্তু একটি স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি”[সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ১২]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ﴾ [الحج:70]

“তোমার কি জানা নেই, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে আল্লাহ তা অবগত আছেন? নিশ্চয় তা একটি কিতাবে সংরক্ষিত আছে। তা আল্লাহর নিকট অতি সহজ”[সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭০]

তৃতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলার কার্যকরী ইচ্ছার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয় এবং যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ﴾ [الحج:18]

“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ১৮]

মহা মহীম আল্লাহ আরো বলেন,

﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡ‍ًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ﴾ [يس: 82]

“বস্তুত তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তার কাজ শুধু এই হয় যে, তিনি তাকে বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়”[সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৮২]

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

 ﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ﴾ [التكوير:29]

“আর আসলে তোমদের চাওয়ায় কিছু হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চান”[সূরা আত-তাকভীর, আয়াত: ২৯]

চতুর্থত: এই বিশ্বাস রাখা যে, সমগ্র বস্তুজগত আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি। তিনি ব্যতীত না আছে কোনো স্রষ্টা, না আছে কোনো প্রভু-প্রতিপালক।

মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ﴾ [الزمر: 62]

আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর কর্মবিধায়ক”। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬২]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡۚ هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ﴾ [فاطر:3]

“হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের প্রতি আল্লাহর নি‘আমতসমূহ স্মরণ কর। আল্লাহ ব্যতীত কি তোমাদের কোনো স্রষ্টা আছে! যে তোমাদিগকে আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত অন্য কোনো হক্ব মা‘বুদ নেই। সুতরাং তোমরা কোনো পথে পরিচালিত হচ্ছো”? [সূরা ফাতির, আয়াত: ৩]

অতএব, তাকদীরের ওপর ঈমান বলতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মতে উপরোক্ত চারটি বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকেই বুঝায়। পক্ষান্তরে বিদ‘আত পন্থীরা এর কোনো কোনোটি অস্বীকার করে থাকে।

[আল্লাহর ওপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত আরও কয়েকটি বিষয়]

উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহর ওপর ঈমানের মধ্যে এ বিশ্বাসও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে যে,

·   ঈমান মানে কথা ও কাজ যা পূণ্যে বৃদ্ধি এবং পাপে হ্রাস পায়।

·   একথাও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত যে, কুফুরী ও শির্ক ব্যতীত কোনো কবীরা গুনাহ- যেমন, ব্যভিচার, চুরি, সুদ গ্রহণ, মদ্যপান, পিতা-মাতার অবাধ্যতা ইত্যাদির জন্য কোনো মুসলিমকে কাফির বলা যাবে না, যতক্ষণ না সে তা হালাল বলে গণ্য করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ﴾ [النساء:116]

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সবকিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৬]

তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একাধিক মুতাওয়াতির হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা পরকালে এমন লোককেও মুক্ত করবেন যার অন্তরে (এ জগতে) শষ্যদানা পরিমাণ ঈমান বিদ্যমান ছিল।

·   আল্লাহর পথে প্রীতি-ভালোবাসা, বিদ্বেষ, বন্ধুত্ব এবং শক্রতা পোষণ করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সূতরাং মুমিন ব্যক্তি অপর মুমিনদের ভালোবাসবে এবং তাদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবে। পক্ষান্তরে সে কাফিরদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে এবং তাদের সাথে বৈরীতা বজায় রাখবে।

·   মুসলিম উম্মাহর মুমিনদের শীর্ষস্থানে রয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ। তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তাদের প্রতি সম্প্রীতি ও গভীর ভালোবাসা পোষণ করে।

·   আহলে সুন্নাত একথাও বিশ্বাস করে যে, সাহাবায়ে কিরামই নবীকুলের পর সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«خَيْرُ النّاس قَرْنِي ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الْذِينَ يَلُوْنَهُمْ»

“সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী আমরা যুগের লোকেরা, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তারপর এদের পরবর্তীগণ’। (অত্র হাদীসের বিশুদ্ধতার ওপর বুখারী ও মুসলিম একমত)

·   তারা আরো বিশ্বাস করেন যে, এই সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আবু বকর সিদ্দীক হলেন সর্বোত্তম, তারপর উমার ফারুক, তারপর উসমান জুন-নূরাইন, তারপর আলী মুরতাযা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদের পর হলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত অপর সাহাবীগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) তারপর আরো বাকী সব সাহাবীগণের স্থান (আল্লহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হোন)

·    আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত সাহাবীগণের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ-বিসংবাদ সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন। তারা মনে করেন যে, সাহাবীগণ ঐসব ব্যাপারে মুজতাহিদ ছিলেন। যাদের ইজতিহাদ সঠিক ছিল তারা দ্বিগুণ, আর ভুল হলে একগুণ সাওয়াবের অধিকারী।

·   আহলে সুন্নাত রাসূলুল্লাহ্‌র বংশধরদের ভালোবাসেন এবং তাদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রদর্শন করেন। আর তারা মুমিনগণের মাতৃকুল রাসূলুল্লাহর সহধর্মিনীদের প্রতিও যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাদের সকলের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন।

·   এভাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের লোকেরা নিজেদেরকে রাফেযীদের নীতি থেকে মুক্ত রাখেন। রাফেযীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে এবং আহলে বাইতের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শণ করে এবং তাদেরকে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত স্থানের আরো উপরে মর্যাদা প্রদান করে।

·   আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত ঐসব ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের নীতি থেকেও নিজেদেরকে মুক্ত রাখেন, যারা কোনো কোনো কথা ও কাজের দ্বারা আহলে বাইতকে যন্ত্রণা প্রদান করে।

আমি এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা উল্লেখ করেছি, সেসব সেই বিশুদ্ধ আকীদা বা ধর্মবিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত যা দিয়ে আল্লাহ ত‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। এটিই নাজাতপ্রাপ্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ধর্মবিশ্বাস, যাদের সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন:

«لاَ تَزَالْ طَائِفَةُ مِنْ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ مَنْصُوْرةَ لاَ يَضُرُّهُمْ مِنْ خَذَلَّهُمْ حَتَّى يَأتِيْ أَمْرُ اللهِ سُبْحَانَهُ»

“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের ওপর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে টিকে থাকবে। কারো অপমান, অত্যাচার তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ (কিয়ামত) উপস্থিত হবে”

তিনি আরো বলেন,

«إفْتَرَقتِ الْيَهُوْدَُ عَلَى إحْدِى وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً وَ افْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى إِثْنَتَيْنَ فِرْقَةً, وَسَتَفْرِقُ هَذِهِ لأُمَّةُ عَلَى ثَلاَثَ وَ سَبْعِيْنَ فِرْقَةً , كُلُّهَا فِيْ النَّارِ إلاَّ وَاحِدَةً»

“ইয়াহুদী সম্প্রদায় একাত্তর দলে বিভক্ত হলো এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বাহাত্তর দলে বিভক্ত হলো, আর আমার এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে একটি বাদে সবক’টি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন সাহাবীগন বলে উঠলেন: হে আল্লাহর রাসূল, সে দলটি কেমন হবে? উত্তরে তিনি বললেন:

«منْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَ أَصْحَابِيْ»

“যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের অনুসৃত নীতির ওপর চলবে”। এই নীতিই সেই আকীদা বা ধর্ম বিশ্বাসের নামন্তর; যার ওপর দৃঢ়ভাবে অটল থাকা এবং তার পরিপন্থী বিষয় হতে সতর্ক থাকা সকলের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য।

 [যারা আকীদার ক্ষত্রে বিভ্রান্ত]

আর যারা এই আকীদা থেকে পথভ্রষ্ট এবং এর বিপরীত পথে পরিচালিত, তারা কয়েক প্রকারে বিভক্ত। যথা- মূর্তিপুজক, প্রতিমাপুজক, ফিরিশতা, আউলিয়া, জিন্ন, বৃক্ষ, প্রস্তর ইত্যাদির ইবাদতকারীগণ। এসব লোক আল্লাহর রাসূলদের আহ্‌বানে সাড়া না দিয়ে তাদের বিরোধিতা ও শত্রুতা করেছে। যেমনটা করেছে কুরাইশ ও বিভিন্ন আরব গোত্র আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে। তারা তাদের মা‘বুদদের কাছে স্বীয় অভাব পূরণের, রোগমুক্তি ও শত্রুর ওপর বিজয় লাভের জন্য প্রার্থনা জানাতো এবং এই মা‘বুদদেরই উদ্দেশ্যে জবাই ও মান্নত নিবেদন করতো। ফলে, যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এবং তাদেরকে একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে খালেসভাবে ইবাদত করার আহ্বান জানালেন, তখনই তারা এই আহ্বানকে অস্বাভাবিক মনে করে এর বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগলো এবং বলতে লাগলো:

﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ﴾ [ص: 5]

“সে কি বহু মা‘বুদদের পরিবর্তে মাত্র এক মা‘বুদ বানিয়ে নিল? এতো এক নিশ্চিত অদ্ভূত ব্যাপার”[সূরা সদ, আয়াত: ৫]

অনন্তর, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ডাকতে থাকেন এবং শির্ক থেকে ভীতিপ্রদর্শন ও তাদের কাছে স্বীয় আহ্বানের হাকীকত বিশ্লেষণে আত্মনিয়োগ করেন। যার ফলে আল্লাহ তা‘আলা প্রথম দিকে তাদের কিছুসংখ্যক লোককে হিদায়াত দান করেন এবং পরে তারা দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করে। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবীগণ ও তাদের নিষ্ঠাবান অনুসারী তাবে‘ঈদের ধারাবাহিক প্রচার ও দীর্ঘ সংগ্রামের পর আল্লাহর দীন অন্যান্য সমুদয় ভ্রান্ত দীনের ওপর বিজয়ী বেশে আত্মপ্রকাশ করলো।

 পরবর্তী কালের মুশরিক সম্প্রদায়

সময়ের ব্যবধানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং অধিকাংশ লোক অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হলো। সংখ্যাগুরু জনগণ নবী-ওয়ালীগণের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং বিপদ-আপদে তাদের নিকট প্রার্থনাসহ অন্যান্য শির্কের মাধ্যমে ইসলাম পূর্ব অন্ধকার যুগে ফিরে গেল। তারা কালেমা ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু’র প্রকৃত অর্থ এতটুকু অনুধাবনে ব্যর্থতার পরিচয় দিল, যতটুকু আরবের কাফিররা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। (আল্লাহ সকলকে সত্য উপলব্ধি করার তাওফীক দিন।)

অজ্ঞতার সয়লাবে তথা নবুওয়াতের যুগ হতে দুরত্বের ফলে বর্তমান কাল পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে উক্ত শির্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান কালে মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা হুবহু পূর্ববর্তী মুশরিকদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। তারা বলতো:

 ﴿هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ﴾ [يونس: 18]

“তারা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্যে সুপারিশকারী”[সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

তাদের একথাও ছিল;

﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ﴾ [الزمر:3]

“আমরাতো এগুলোর ইবাদত এ জন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]

আল্লাহ তা‘আলা এ ভ্রান্তির অপনোদন করে স্পষ্ট বলে দিলেন যে, আল্লাহ ভিন্ন কারো ইবাদত করা সে যে কেউ হোক না কেন আল্লাহর সাথে শির্ক ও কুফুরী করার নামান্তর। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ ...﴾ [يونس: 18]

“তারা আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুর ইবাদত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপরকারও করতে পারে না। তদুপরি তারা বলে যে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী”[সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা‘আলা তাদের বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন,

  ﴿... قُلۡ أَتُنَبِّ‍ُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾ [يونس: 18]

(হে রাসূল) তাদেরকে বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি জানেন না? তিনি পাক-পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি বহু উর্ধ্বে”[সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি ভিন্ন কোনো ওলী, পয়গাম্বর বা অন্য কারো ইবাদত করা মহাশির্ক, যদিওবা শির্ককারীরা এর অন্য নাম দিয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ...﴾ [الزمر:3]

“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে: “আমরাতো এগুলোর ইবাদত এজন্য করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]

আল্লাহ তা‘আলা তাদের উত্তরে বলেন,

﴿... إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾ [الزمر: 3]

“তারা যে বিষয়ে পরস্পর মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় তাদের মধ্যে এর ফায়সালা করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন না যে জঘন্য মিথ্যুক, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]

উপরোক্ত বাণীর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা একথাটি পরিস্কার করে বলে দিয়েছেন যে, দো‘আ, ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো ইবাদত করার অর্থ আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফুরী করা এবং তাদের মা‘বুদগণ তাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে আসবে, এ কথাটি তাদের একটি জঘন্যতম মিথ্যা বৈ কিছুই নয়।

 সঠিক ধর্ম বিশ্বাসের পরিপন্থী কতিপয় মতবাদ

বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী ও আল্লাহর রাসূলগণ (তাদের ওপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক) কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী একটি মতবাদ হলো,

·   বর্তমান কালে নাস্তিকতা ও কুফুরীর ধ্বজ্জাবাহী মার্কস-লেলিন প্রমুখ পন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ। তারা একে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম বা অন্য যে, নাস্তিকদের মূলমন্ত্র হলো, ‘মা‘বুদ বা উপাস্য বলতে কেউ নেই এবং এই পার্থিব জীবন এবটি বস্তুগত ব্যাপার মাত্র’। পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম এবং সমস্ত ধর্মের প্রতি অস্বীকৃতি তাদের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত। তাদের বই-পুস্তক পর্যালোচনা করলে একথা নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করা যায়। নিঃসন্দেহে এটা সমস্ত ঐশী ধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এক মতবাদ, যা দুনিয়া ও আখেরাতে এর অনুসারীদের এক চরম অশুভ পরিণতির দিকে পরিচালিত করছে।

·   সত্যের পরিপন্থী আরেকটি মতবাদ হলো:

কোনো কোনো বাতেনী ও সূফী সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, তথাকথিত ওলীগণ এ সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় আল্লাহর সাথে শরীক থাকে। তারা তাদেরকে কুতুব (পীর-দরবেশ), আওতাদ (নির্ভরযোগ্য খুঁটিস্বরূপ), গাওস (ফরিয়াদ শ্রবণকারী) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। তারাই স্বীয় মা‘বুদদের জন্যে এসব নাম উদ্ভাবন করেছে। আল্লাহর প্রভূত্বে এটি একটি জঘণ্যতম শির্ক। এটি ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগের শির্ক থেকেও জঘণ্য। কেননা আরবের কাফিরগণ আল্লাহর প্রভূত্বে শির্ক করে নি, তাদের শির্ক ছিল ইবাদতে এবং তাও ছিল সুখ-স্বাচ্ছন্দের অবস্থায়। দুর্যোগ অবস্থায় তারা ইবাদত আল্লাহর জন্যেই খালেস করে নিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ﴾ [العنكبوت:65]

“যখন তারা জলযানে আরোহণ করে তখন বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ কে ডাকে। তারপর যখন আল্লাহ তাদেরকে স্থলে ভিড়ায়ে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়ে যায়”[সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৬৫]

প্রভূত্বের প্রশ্নে তারা স্বীকার করতো যে, তা একমাত্র আল্লাহরই অধিকার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ﴾ [الزخرف:87]

“আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? উত্তরে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ”[সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ [يونس:31]

“বল, আকাশ ও পৃথিবী থেকে কে তোমাদের রিযিক সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কার কর্তৃত্বাধীন এবং কে জীবিতকে মৃত থেকে নির্গত করে এবং কে মৃতকে জীবিত থেকে নির্গত করে? আর কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। বল, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না”? [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩১]

পরবতীকালের মুশরিকরা পূর্ববর্তীকালের মুশরিকদের চেয়ে আরো দু’টি বিষয়ে অগ্রগামী রয়েছে:

[এক] তাদের কেউ কেউ আল্লাহর প্রভূত্বেও শির্ক করে।

[দুই] সুদিন দুর্দিন উভয় অবস্থাতেই তারা শির্ক করে। একথা কেবল ঐসব লোকেরাই ভালো করে জানতে পারবে যারা তাদের সাথে মিশে স্বচক্ষে তাদের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ লাভ করবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঐসব ক্রিয়াকলাপ অবলোকন করবে যা মিশরস্থ হুসাইন, বাদাভী গংদের কবরে, ইডেনস্থ ‘আইদারূসের কবরে, ইয়েমেনে আল-হাদীর কবরে, সিরিয়ায় ইবন আরাবীর কবরে, ইরাকে শাইখ আব্দুল কাদের জীলানীর কবরসহ বিভিন্ন প্রসিদ্ধ সমাধি ক্ষেত্রের আশেপাশে দৈনন্দিন ঘটে চলছে।

সাধারণ লোকেরা মৃতের প্রতি সীমাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করছে এবং সেখানে আল্লাহ তা‘আলার বহু অধিকার খর্ব করছে। কিন্তু অতি অল্প লোকই তাদের এসব অপকীর্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রকৃত তাওহীদের বাণী তাদের কাছে উপস্থাপিত করার সাহস করছে। অথচ এই তাওহীদের বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে (তাদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক) প্রেরণ করেছেন। আর আমাদেরকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে যে,

 ﴿إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ﴾ [البقرة:156]

“আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবে তাঁরই পানে আমরা প্রত্যাবর্তনকারী”[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৫৬]

আল্লাহ তা‘আলার দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন ঐসব লোককে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদের মধ্যে সৎপথে আহ্বানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। আর মুসলিম শাসকবৃন্দ ও উলাময়ে কিরামকে শির্কের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এর যাবতীয় উপকরণ নির্মুল সাধনের তাওফীক দান করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, অতি সন্নিকটে।

·   আল্লাহ তা‘আলার নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী আরও কয়েকটি আকীদা হলো জাহ্‌মিয়্যাহ, মু‘তাযিলা ও তাদের অনুসারী বিদ‘আতপন্থীদের মতবাদসমূহ। এরা মহামহীম আল্লাহ তা‘আলার প্রকৃত গুণাবলী অস্বীকার করে এবং তাঁকে সম্পূর্ণ ও নিখুত গুণাবলী থেকে বিমুক্ত বলে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে তারা আল্লাহকে অস্তিত্বহীনতা, জড়তা ও অসম্ভাব্য গুণে বিশেষিত করার প্রয়াস পায়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলা তাদের এসব অপবাদ থেকে বহু উর্ধ্বে।

এতদ্ব্যতীত, যারা আল্লাহ তা‘আলার কোনো কোনো গুণ প্রতিষ্ঠিত করে এবং অপর কোনো কোনো গুণ অস্বীকার করে তারাও উপরোক্ত ভ্রান্ত মতবাদিদের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ আশ‘আরী পন্থীদের নাম উল্লেখ করা যায়। কেননা কিছু সংখ্যক গুণের স্বীকৃতির মধ্যেই তাদের পক্ষে ঐসব গুণাবলীর অনুরূপ অর্থ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যেগুলো তারা সরাসরি উপেক্ষা করতঃ তারা প্রমাণাদির অপব্যাখ্যা প্রদানের প্রচেষ্টা চালায়। এভাবে তারা শ্রুত ও প্রমাণ্য উভয় প্রকার দলীলগুলোর বিরোধিতা এবং পরস্পর বিরোধী বিশ্বাসের ঘুর্ণিপাকে নিপতিত হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আল্লাহর ঐসব পবিত্র নাম ও নিখুঁত গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত করে যেগুলো নিজের জন্য তিনি স্বয়ং বা তাঁর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে এমনভাবে পাক-পবিত্র রাখেন যাতে তা‘তীল বা গুণ বিমুক্তির কোনো লেশ থাকে না। এভাবে তারা এ সম্পর্কে সমুদয় প্রমাণাদির ওপর আমল করতে সক্ষম হয় এবং কোনোরূপ বিকৃতি বা তা‘লীল না করে পরস্পর বিরোধী বিশ্বাস থেকে নিরাপদ থাকে। এই বিশ্বাসই দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের একমাত্র উপায়। আর এটিই হলো সে ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ যার পথিক ছিলেন পূর্ববর্তী মুসলিম উম্মত ও তাদের ইমামবর্গ।

একথা অতীব সত্য যে, পরবর্তী লোকগণ কেবল সে পথেই পরিশুদ্ধ হতে পারে, যে পথে তাদের পূর্ববর্তীরা পরিশুদ্ধ হয়ে গেছেন। আর সে পথটি হলো: ‘কুরআন ও সুন্নাতের সঠিক অনুসরণ এবং এতদুভয়ের পরিপন্থী বিষয়সমূহ বর্জন করে চলা।’

আল্লাহই আমাদের তাওফীকদাতা, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং পরমোত্তম প্রভূ। তিনি ব্যতীত কারো কোনো শক্তি সামর্থ্য নেই।

আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর সালাত ও সালাম প্রেরণ করুন। আমীন।

সমাপ্ত