সবচেয়ে বড় গুনাহ ()

মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-আম্মারী

 

এ নিবন্ধে লেখক আল্লাহর সঙ্গে শির্ক এর প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। এতে শির্কের ভয়াবহতা, শির্কের কিছু ধরন ও মুশরিকের শাস্তি প্রভৃতি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় গুনাহ

|

 সবচেয়ে বড় গুনাহ

الذنب الأعظم

 সংক্ষিপ্ত বর্ণনা.............

এ নিবন্ধে লেখক আল্লাহর সঙ্গে শির্ক এর প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন। এতে শির্কের ভয়াবহতা, শির্কের কিছু ধরন ও মুশরিকের শাস্তি প্রভৃতি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

 সবচেয়ে বড় গুনাহ

পৃথিবীতে যত পাপ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা। পৃথিবীতে শির্কের চেয়ে জঘণ্য আর গুনাহ নেই। যে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া আমাদের একটি মুহূর্তও কাটে না, কাউকে তাঁর সমকক্ষ, সমতুল্য বা সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে? তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفۡتَرَىٰٓ إِثۡمًا عَظِيمًا ٤٨﴾ [النساء: ٤٨] 

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ؟ قَالَ: «أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ»

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন, তুমি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করবে; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন”[1]

আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করার অর্থ আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি অন্য কারও ইবাদত করা। তাঁর দাসত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি অন্য কারও দাসত্বও মেনে নেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ [النساء: ٣٦] 

“তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন,

﴿قُلۡ إِنَّمَآ أُمِرۡتُ أَنۡ أَعۡبُدَ ٱللَّهَ وَلَآ أُشۡرِكَ بِهِۦ﴾ [الرعد: ٣٦] 

“বলুন, আমাকে কেবল আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আমি আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তাঁর সাথে শরীক না করি”[সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ৩৬]

আরেক আয়াতে তিনি বলেন,

﴿فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا ١١٠﴾ [الكهف: ١١٠] 

“সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে”[সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০]

শির্ক যে সবচেয়ে বড় যুলুম ও নিকৃষ্টতম পাপ তা কতভাবেই না আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذۡ قَالَ لُقۡمَٰنُ لِٱبۡنِهِۦ وَهُوَ يَعِظُهُۥ يَٰبُنَيَّ لَا تُشۡرِكۡ بِٱللَّهِۖ إِنَّ ٱلشِّرۡكَ لَظُلۡمٌ عَظِيمٞ ١٣﴾ [لقمان: ١٣] 

“আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শির্ক করো না; নিশ্চয় শির্ক হলো বড় যুলুম”[সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩]

যে শির্ক করে সে যালিম। কারণ, আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন আর সে ইবাদত করছে অন্য কারও। সে তো নিমকহারাম; অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ বলেন,

﴿أَيُشۡرِكُونَ مَا لَا يَخۡلُقُ شَيۡ‍ٔٗا وَهُمۡ يُخۡلَقُونَ ١٩١ وَلَا يَسۡتَطِيعُونَ لَهُمۡ نَصۡرٗا وَلَآ أَنفُسَهُمۡ يَنصُرُونَ ١٩٢ ﴾ [الاعراف: ١٩١،  ١٩٢] 

“তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে, যারা কোনো কিছু সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়? আর তারা তাদেরকে কোনো সাহায্য করতে পারে না এবং তারা নিজদেরকেও সাহায্য করতে পারে না’। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৯১-১৯২]

তিনি তাকে রিযিক দেন আর সে অন্য কারও শুকরিয়া আদায় করে। সে নুন খায় একজনের আর গুণ গায় আরেকজনের। আল্লাহ বলেন,

﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَمۡلِكُ لَهُمۡ رِزۡقٗا مِّنَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ شَيۡ‍ٔٗا وَلَا يَسۡتَطِيعُونَ ٧٣﴾ [النحل: ٧٣] 

“আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপসনা করে, যারা আসমানসমূহ ও যমীনে তাদের কোনো রিযিকের মালিক নয় এবং হতেও পারবে না”[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৩]

 মুশরিকের শাস্তি: 

শির্ক যেহেতু বড় গুনাহ, তাই আল্লাহ শির্ককারী তথা মুশরিককে শাস্তিও দিবেন বড় মর্মন্তুদ।

 প্রথম শাস্তি:

আল্লাহ মুশরিকের সিয়াম, সালাত, হজ বা যাকাত- কোনো কিছুই কবুল করেন না, যাবৎ সে তাওবা করে ফিরে আসে। আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٨٨ ﴾ [الانعام: ٨٨] 

“আর যদি তারা শির্ক করত, তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮৮]

আল্লাহ আরও বলেন,

﴿وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٦٥ ﴾ [الزمر: ٦٥] 

“আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে”[সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

 দ্বিতীয় শাস্তি:

তাওবা না করে মারা গেলে আল্লাহ কোনো শির্ককারীকে ক্ষমা করবেন না, যদিও সে সিয়াম, সালাত, হজ ও যাকাত আদায় করে এবং নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে। আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفۡتَرَىٰٓ إِثۡمًا عَظِيمًا ٤٨﴾ [النساء: ٤٨] 

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

অতএব, সব গুনাহই আল্লাহ মাফ করতে পারেন যা পরিত্যাগ না করেই সে মারা গেছে, কেবল শির্ক ছাড়া। শির্ক থেকে তাওবা না করে মারা গেলে তার নিস্তার নেই। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

﴿وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ ﴾ [النساء: ٤٨] 

“তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]

হাদীসেও দেখুন সেই একই কথার পুনঃর্ধ্বনি। শির্ক না করে শত পাপ করেও নিস্তারের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শির্কের ক্ষমা নেই। আবূ যর (গিফারী) রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«عَرَضَ لِي جِبْرِيلُ، قَالَ: بَشِّرْ أُمَّتَكَ أَنَّهُ مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الجَنَّةَ، قُلْتُ: يَا جِبْرِيلُ، وَإِنْ سَرَقَ، وَإِنْ زَنَى؟ قَالَ: نَعَمْ " قَالَ: قُلْتُ: وَإِنْ سَرَقَ، وَإِنْ زَنَى؟ قَالَ: نَعَمْ، وَإِنْ شَرِبَ الخَمْرَ»

“আমার সামনে জিবরীল আবির্ভূত হলেন। তিনি বললেন, আপনি আপনার উম্মতদের সুসংবাদ দিন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে। আমি বললাম, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে থাকে? তিনি বললেন, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে থাকে। আমি বললাম, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে থাকে? তিনি বললেন, যদিও সে মদ পান করে”[2]

 তৃতীয় শাস্তি:

আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। তার সঙ্গে কাফেরের অনুরূপ আচরণ করবেন। যদিও সে সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, হজ সম্পাদন করে এবং যাকাত প্রদান আর নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে। আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢﴾ [المائ‍دة: ٧٢] 

“নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার ওপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই”[সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৭২]

পক্ষান্তরে অন্তত শির্ক না করে কেউ যদি মারা যায় তাহলে তার জন্য পরিত্রাণের বার্তা রয়েছে। জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

«مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ»

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার না করে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে কোনো অংশীদার সাব্যস্ত করে সাক্ষাৎ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”[3]

 চতুর্থ শাস্তি:

মুশরিকের ক্ষেত্রে ফিরিশতা, নবী বা মুমিন তথা কোনো সুপারিশকারীই কাজে আসবে না। পীরের কথা তো বলাই বাহুল্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

﴿فَمَا تَنفَعُهُمۡ شَفَٰعَةُ ٱلشَّٰفِعِينَ ٤٨﴾ [المدثر: ٤٨] 

“অতএব সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না”[সূরা আল-মুদ্দাস্সির, আয়াত: ৪৮]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِذَا فَرَغَ اللَّهُ مِنَ القَضَاءِ بَيْنَ العِبَادِ، وَأَرَادَ أَنْ يُخْرِجَ بِرَحْمَتِهِ مَنْ أَرَادَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، أَمَرَ المَلاَئِكَةَ أَنْ يُخْرِجُوا مِنَ النَّارِ، مَنْ كَانَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا، مِمَّنْ أَرَادَ اللَّهُ أَنْ يَرْحَمَهُ، مِمَّنْ يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَيَعْرِفُونَهُمْ فِي النَّارِ بِأَثَرِ السُّجُودِ، تَأْكُلُ النَّارُ ابْنَ آدَمَ إِلَّا أَثَرَ السُّجُودِ، حَرَّمَ اللَّهُ عَلَى النَّارِ أَنْ تَأْكُلَ أَثَرَ السُّجُودِ، فَيَخْرُجُونَ مِنَ النَّارِ»

“যখন আল্লাহ বান্দাদের বিচারকার্য সম্পাদন সম্পন্ন করবেন এবং জাহান্নামীদের থেকে যাদের প্রতি আল্লাহ রহমত করতে ইচ্ছা করবেন, তাদের ব্যাপারে ফিরিশতাগণকে নির্দেশ দিবেন যে যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে নি, তাদের যেন জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হয়। যাদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন, যারা সাক্ষ্য দিয়েছে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। জাহান্নামে ফিরিশতারা সাজদার চিহ্ন দেখে তাদের চিনতে পারবেন। আগুন বনী আদমের সবই ভষ্ম করতে পারবে কিন্তু সাজদার চিহ্ন ভক্ষণ করতে পারবে না। কেননা আল্লাহ জাহান্নামের জন্য সাজদার চিহ্নগুলো মিটিয়ে দেওয়া হারাম করে দিয়েছেন। ফলে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে”[4]

 পঞ্চম শাস্তি:

শির্ককারীদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করবেন না। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا»

“প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে কবুল দো‘আ রয়েছে। প্রত্যেক নবীই আগেভাগে দো‘আ করে ফেলেছেন। আর আমি আমার দো‘আকে গোপন রেখেছে কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফা‘আতের জন্য। অতএব, সেটি আমার প্রত্যেক উম্মতই ইনশাআল্লাহ পাবে যে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক না করে মারা যাবে”[5]

কখনো মুশরিকদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অজ্ঞতা হেতু কোনো কোনো মুসলিম শির্কে লিপ্ত হন। যেমন, মূসা আলাইহিস সালামের সগোত্রীয় সুনির্বাচিত লোকেরা সমুদ্রডুবি ও ফির‘আউনের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভের পর শির্কে বিভ্রান্ত হয়। আল্লাহ তাদের ঘটনা তুলে ধরে বলেন,

﴿وَجَٰوَزۡنَا بِبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ ٱلۡبَحۡرَ فَأَتَوۡاْ عَلَىٰ قَوۡمٖ يَعۡكُفُونَ عَلَىٰٓ أَصۡنَامٖ لَّهُمۡۚ قَالُواْ يَٰمُوسَى ٱجۡعَل لَّنَآ إِلَٰهٗا كَمَا لَهُمۡ ءَالِهَةٞۚ قَالَ إِنَّكُمۡ قَوۡمٞ تَجۡهَلُونَ ١٣٨ إِنَّ هَٰٓؤُلَآءِ مُتَبَّرٞ مَّا هُمۡ فِيهِ وَبَٰطِلٞ مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٣٩ قَالَ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِيكُمۡ إِلَٰهٗا وَهُوَ فَضَّلَكُمۡ عَلَى ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٤٠﴾ [الاعراف: ١٣٨،  ١٤٠] 

“আর বনী ইসরাঈলকে আমি সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম। অতঃপর তারা আসল এমন এক কাওমের কাছে যারা নিজদের মূর্তিগুলোর পূজায় রত ছিল। তারা বলল, ‘হে মূসা, তাদের যেমন উপাস্য আছে আমাদের জন্য তেমনি উপাস্য নির্ধারণ করে দাও। সে বলল, ‘নিশ্চয় তোমরা এমন এক কাওম যারা মূর্খ। নিশ্চয় এরা যাতে আছে, তা ধ্বংসশীল এবং তারা যা করত তা বাতিল। সে বলল, ‘আল্লাহ ছাড়া আমি কি তোমাদের জন্য অন্য ইলাহ সন্ধান করব অথচ তিনি তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন?” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৩৮-১৪০]

একইভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় দেখা যায়, মুসলিমরা হুনায়নের যুদ্ধে বের হলে অজ্ঞানতবশত তারাও নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একই ধরনের আবেদন করে বসেন। যেমন, আবূ ওয়াকেদ লাইছী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

«خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى حُنَيْنٍ وَنَحْنُ حُدَثَاءُ عَهْدٍ بِكُفْرٍ، ولِلْمُشْرِكِينَ سِدْرَةٌ يَعْكُفُونَ عِنْدَهَا، ويَنُوطُونَ بِهَا أَسْلِحَتَهُمْ يُقَالُ لَهَا ذَاتُ أَنْوَاطٍ. قَالَ: فَمَرَرْنَا بِالسِّدْرَةِ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ اجْعَلْ لَنَا ذَاتَ أَنْوَاطٍ كَمَا لَهُمْ ذَاتُ أَنْوَاطٍ. فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللهُ أَكْبَرُ، إِنَّهَا السُّنَنُ، قُلْتُمْ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ كَمَا قَالَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ: ﴿ٱجۡعَل لَّنَآ إِلَٰهٗا كَمَا لَهُمۡ ءَالِهَةٞۚ قَالَ إِنَّكُمۡ قَوۡمٞ تَجۡهَلُونَ﴾ [الاعراف: ١٣٨]، لَتَرْكَبُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ»

“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হুনায়নের (যুদ্ধের) উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছি (নওমুসলিম)। একস্থানে পৌত্তলিকদের একটি কুলগাছ ছিল যার চারপাশে তারা একান্তভাবে বসত এবং তাদের সমরাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। গাছটিকে তারা ‘যাত আনওয়াত’ বলত। আমরা একদিন একটি কুলগাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের যেমন ‘যাতু আনওয়াত’ আছে আমাদের জন্যও অনুরূপ ‘যাতু আনওয়াত’ (একটি গাছ) নির্ধারণ করে দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহু আকবার’, তোমাদের এ দাবিটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতিনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছ যা বনী ইসরাঈল মূসা ‘আলাইহিস সালামকে বলেছিল। তারা বলেছিল, “হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা‘বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা‘বুদ বানিয়ে দাও। মূসা ‘আলাইহিস সালাম  বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথাবার্তা বলছ”[সূরা আল-আরাফ: ১৩৮] তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতিনীতিই অবলম্বন করছ”।[6]

শির্কের রয়েছে নানা ধরন ও প্রকরণ। আল্লাহ তা‘আলা সবগুলোই স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

﴿وَقَدۡ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيۡكُمۡ ﴾ [الانعام: ١١٩] 

“...অথচ তিনি তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১১৯]

আল্লাহ যা দ্ব্যর্থহীনভাবে হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, শির্ক করা তার অন্যতম। আল্লাহ বলেন,  

﴿قُلۡ تَعَالَوۡاْ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَيۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗاۖ وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُواْ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ ١٥١ ﴾ [الانعام: ١٥١] 

“বলুন, ‘এসো, তোমাদের ওপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তা তিলাওয়াত করি যে, তোমরা তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান করবে আর দারিদ্র্যের কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমরাই তোমাদেরকে রিযিক দিই এবং তাদেরকেও। আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না- তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫১]

 শির্কের প্রথম প্রকার:

আল্লাহর সঙ্গে বা তাঁকে ছাড়াই ফিরিশতা বা নবীদের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। যে তাদের ইবাদত করবে সে আল্লাহর সঙ্গে কুফুরী করবে এবং নিজ মুনিবের সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্তকারী হিসেবে গন্য হবে। আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَا يَأۡمُرَكُمۡ أَن تَتَّخِذُواْ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةَ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ أَرۡبَابًاۗ أَيَأۡمُرُكُم بِٱلۡكُفۡرِ بَعۡدَ إِذۡ أَنتُم مُّسۡلِمُونَ ٨٠ ﴾ [ال عمران: ٨٠] 

“‘আর তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ করেন না যে, তোমরা ফিরিশতা ও নবীদেরকে রব রূপে গ্রহণ কর। তোমরা মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ দিবেন”? [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮০]

 দ্বিতীয় প্রকার:

আল্লাহর সঙ্গে বা তাঁকে ছাড়াই ওলী-বুযুর্গানের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। যে তাদের ইবাদত করবে সে নিজ মুনিবের সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করবে। আল্লাহ বলেন,

﴿ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلۡمَسِيحَ ٱبۡنَ مَرۡيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُوٓاْ إِلَٰهٗا وَٰحِدٗاۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ سُبۡحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٣١﴾ [التوبة: ٣١] 

“তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগী বুযুর্গদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র”[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩১]

﴿وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا ٢٣ ﴾ [نوح: ٢٣] 

“আর তারা বলে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক ও নাসরকে”[সূরা নূহ, আয়াত: ২৩]

ওয়াদ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়া‘ঊক ও নাসর- এদের প্রত্যেকেই ছিলেন একেকজন পুণ্যবান মানব ও বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব। আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে তারা এসব ব্যক্তির সন্তুষ্টিও খুঁজত ইবাদতে। তাই বুযুর্গকে খুশী করতে কোনো ইবাদতের অবকাশ নেই।

 তৃতীয় প্রকার:

আল্লাহর সঙ্গে বা তাঁকে ছাড়াই বৃক্ষরাজি বা ইট-পাথরের উদ্দেশ্যে ইবাদত তথা ভক্তি নিবেদন করা। যে এসবের উদ্দেশ্যে ভক্তি নিবেদন করবে সে নিজ মুনিবের সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করবে। আল্লাহ বলেন,

﴿أَفَرَءَيۡتُمُ ٱللَّٰتَ وَٱلۡعُزَّىٰ ١٩ وَمَنَوٰةَ ٱلثَّالِثَةَ ٱلۡأُخۡرَىٰٓ ٢٠﴾ [النجم: ١٩،  ٢٠] 

“তোমরা লাত ও ‘উয্যা সম্পর্কে আমাকে বল’? আর মানাত সম্পর্কে, যা তৃতীয় আরেকটি?[সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১৯-২০]

 চতুর্থ প্রকার:

শয়তানের উদ্দেশে ইবাদত তথা ভক্তি নিবেদন করা। আল্লাহ বলেন,

﴿أَلَمۡ أَعۡهَدۡ إِلَيۡكُمۡ يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ أَن لَّا تَعۡبُدُواْ ٱلشَّيۡطَٰنَۖ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٞ ٦٠ وَأَنِ ٱعۡبُدُونِيۚ هَٰذَا صِرَٰطٞ مُّسۡتَقِيمٞ ٦١﴾ [يس: ٦٠،  ٦١] 

“হে বনী আদম, আমি কি তোমাদেরকে এ মর্মে নির্দেশ দেইনি যে, ‘তোমরা শয়তানের উপাসনা করো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? আর আমারই ইবাদাত কর। এটিই সরল পথ”[সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৬০-৬১]

এক কথায় রহমান আল্লাহ ছাড়া যার উদ্দেশ্যেই ভক্তি-ইবাদত নিবেদন করা হবে তা শয়তানের জন্য বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 

﴿إِن يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦٓ إِلَّآ إِنَٰثٗا وَإِن يَدۡعُونَ إِلَّا شَيۡطَٰنٗا مَّرِيدٗا ١١٧ لَّعَنَهُ ٱللَّهُۘ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنۡ عِبَادِكَ نَصِيبٗا مَّفۡرُوضٗا ١١٨﴾ [النساء: ١١٧،  ١١٨] 

“আল্লাহ ছাড়া তারা শুধু নারীমূর্তিকে ডাকে এবং কেবল  অবাধ্য শয়তানকে ডাকে। আল্লাহ তাকে লা‘নত করেছেন এবং সে বলেছে, ‘অবশ্যই আমি তোমার বান্দাদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (অনুসারী হিসেবে) গ্রহণ করব”[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৭-১১৮]

আবূ তোফায়েল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

لَمَّا فَتْحَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَّةَ بَعَثَ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ إِلَى نَخْلَةٍ، وَكَانَتْ بِهَا الْعُزَّى، فَأَتَاهَا خَالِدٌ, وَكَانَتْ عَلَى ثَلَاثِ سَمُرَاتٍ، فَقَطَعَ السَّمُرَاتِ، وَهَدَمَ الْبَيْتَ الَّذِي كَانَ عَلَيْهَا، ثُمَّ أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ، فَقَالَ: «ارْجِعْ فَإِنَّكَ لَمْ تَصْنَعْ شَيْئًا», فَرَجَعَ خَالِدٌ، فَلَمَّا بَصُرَتْ بِهِ السَّدَنَةُ وَهُمْ حَجَبَتُهَا، أَمْعَنُوا فِي الْجَبَلِ, وَهُمْ يَقُولُونَ: يَا عُزَّى يَا عُزَّى، فَأَتَاهَا خَالِدٌ, فَإِذَا امْرَأَةٌ عُرْيَانَةٌ, نَاشِرَةٌ شَعْرَهَا, تَحْتَفِنُ التُّرَابَ عَلَى رَأْسِهَا، فَعَمَّمَهَا بِالسَّيْفِ حَتَّى قَتَلَهَا، ثُمَّ رَجَعَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ , فَقَالَ: «تِلْكَ الْعُزَّى»

“মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালেদ ইবন ওলীদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নাখলাহ নামক স্থানে পাঠালেন। সেখানে উজ্জা নামের মূর্তি ছিল। খালেদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সেখানে গেলেন। সেটি ছিল তিনটি গাছের উপর স্থাপিত। তিনি গাছগুলো কেটে ফেললেন এবং তার ওপরের ঘর ভেঙ্গে দিলেন। পরবর্তীতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন এবং এ ব্যাপারটি অবহিত করলেন। তিনি বললেন, তুমি ফিরে গিয়ে দেখ, কোনো কাজই করোনি তুমি। তখন খালেদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সেখানে পুনরায় গেলেন। খালেদ ফিরে গেলেন। তাকে দেখে (ঐ আশ্রমের) প্রহরীরা, হে উজ্জা হে উজ্জা বলে পাহাড়ের আড়ালে পলায়ন করল। খালেদ তার সামনে পৌঁছা মাত্র এক চুল খোলা উলঙ্গ নারীকে দেখলেন সে নিজের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করছে। তিনি তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করলেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে বৃত্তান্ত তুলে ধরলেন। শুনে তিনি বললেন, সে ছিল উজ্জা”[7]

আর যে শয়তানের অনুসরণ-ইবাদত করে, শয়তান তাকে রহমান আল্লাহর সঙ্গে শির্ক, কুফর ও বিদ‘আত শেখায়। আল্লাহ বলেন,

﴿وَلَا تَأۡكُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُۥ لَفِسۡقٞۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآئِهِمۡ لِيُجَٰدِلُوكُمۡۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ ١٢١﴾ [الانعام: ١٢١] 

“আর তোমরা তা থেকে আহার করো না, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় নি এবং নিশ্চয় তা সীমালঙ্ঘন এবং শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয়, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদ করে। আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তবে নিশ্চয় তোমরা মুশরিক”[সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১২১]

শয়তান মানুষের সঙ্গে কথা বলে স্বর ও সূরতে এবং স্বরূপে ও ভিন্নরূপে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱسۡتَفۡزِزۡ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتَ مِنۡهُم بِصَوۡتِكَ وَأَجۡلِبۡ عَلَيۡهِم بِخَيۡلِكَ وَرَجِلِكَ وَشَارِكۡهُمۡ فِي ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَوۡلَٰدِ وَعِدۡهُمۡۚ وَمَا يَعِدُهُمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ إِلَّا غُرُورًا ٦٤﴾ [الاسراء: ٦٤] 

“তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত কর, তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড় তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হও এবং তাদেরকে ওয়াদা দাও’। আর শয়তান প্রতারণা ছাড়া তাদেরকে কোনো ওয়াদাই দেয় না”[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৬৪]

আবূ তোফায়ল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, জাহেলী যুগের দেবী উজ্জার সম্মুখে শয়তান আত্মপ্রকাশ করেছিল। তখন খালেদ ইবন ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে হত্যা করে ফেলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এসে বৃত্তান্ত তুলে ধরলে তিনি বললেন, সে ছিল উজ্জা।[8]

ইমাম বুখারী দীর্ঘ এক হাদীসে ঘটনা তুলে ধরেন যে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কাছে শয়তান এসেছিল এবং তিন রাত অবস্থান করেছিল। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

«تَعْلَمُ مَنْ تُخَاطِبُ مُنْذُ ثَلاَثِ لَيَالٍ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ»، قَالَ: لاَ، قَالَ: «ذَاكَ شَيْطَانٌ»

“তুমি কি জানো তিন রাত তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছ হে আবূ হুরায়রা? তিনি বললেন, জী না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে ছিল শয়তান”[9]

মোটকথা, শয়তান তার কণ্ঠ ও কর্ম দিয়ে মুশরিকদের বিভ্রান্ত করেছে। অথচ তারা ভেবেছে এ বুঝি কেবল একটি চিত্র বা কবরস্থ কেউ। কিয়ামত পর্যন্তই সে এভাবে ছলে-বলে-কৌশলে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে যাবে। আমাদের কর্তব্য হবে, সর্বদা শয়তানের চক্রান্ত ও প্ররোচনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা। আল্লাহর কাছে দিবারাত্র শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কূটচাল থেকে বাঁচার জন্য প্রার্থনা করা। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের শির্ক থেকে দূরে থাকার তাওফীক দান করুন। আমাদেরকে শির্কমুক্ত ঈমান নিয়ে কবরের যাত্রী বানান। আমীন।



[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০০১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৬।

[2] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৪৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৪।

[3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৩।

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪৩৭।

[5] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৯।

[6] তিরমিযী, হাদীস নং ২১৮; তাবরানী, হাদীস নং ৩২৯১; আহমাদ, হাদীস নং ২১৯০০। তিরমিযী এ হাদীসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

[7] নাসাঈ, সুনান আল-কুবরা, হাদীস নং ১১৪৮৩।

[8] নাসাঈ: প্রাগুক্ত।

[9] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৩১১।