ইখলাছ মুক্তির পাথেয় ()

|

 ইখলাছ মুক্তির পাথেয়

ফয়সাল বিন আলী আল বাদানী

﴿قاعدة الانطلاق وقارب النجاة﴾

فيصل بن علي البعداني

 ইখলাছ মুক্তির পাথেয়

সূচীপত্র

১- অনুবাদকের কথা

২- ইখলাছ কি?

৩- ইখলাছের মর্যাদা

৪- ইখলাছ একটি কঠিন কাজ

৫- ইখলাছের ফলাফল

৬- মুখলিছদের আলামত

৭- কিভাবে ইখলাছ অর্জন করবেন

৮- ইখলাছের পথে যা বাধা হয়ে দাড়ায়

৯- ইখলাছের পথে যা বাধা নয়

 অনুবাদকের কথা

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين.

أخلص دينك يكفيك العمل القليل

তোমার দ্বীনকে খাঁটি কর তাহলে অল্প আমল নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে।

এটি হাদীস হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত। সনদ-সূত্রের দিক দিয়ে দুর্বল। যদি হাদীসটির অর্থ এমন হয় যে, অল্প আমল ইখলাছের সাথে করা হলে তা কবুল হবে আর বেশী আমল করা হল অথচ তাতে ইখলাছ থাকল না তাহলে কোন লাভ নেই-তবে হাদীসটির ভাবার্থ গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই। মোটকথা, অল্প আমল করতে উৎসাহ দেয়া হয়নি বরং আমল যতই করা হোক, ইখলাছের তা সাথে করতে বলা হয়েছে।

ইখলাছ অবলম্বন বড় কঠিন কাজ। আমার কাছে সালাত, সিয়াম, হজ ও জিহাদের চেয়ে ইখলাছ অবলম্বন খুব কঠিন মনে হয়। কোন কাজের শুরুতে ইখলাছের উপর থাকব-এমন দৃঢ় সংকল্প করেও ইখলাছের উপর অটল থাকা যায় না।

এমনও দেখা গেছে যে, কোন ব্যক্তি ইখলাছ অবলম্বনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করলেন। পরে নিজেকে প্রশ্ন করলেন তুমি যে এত সুন্দর করে এতক্ষণ ইখলাছ সম্পর্কে বক্তব্য রাখলে তা কি ইখলাছের সাথে করেছ? না অন্য কোন নিয়্যত ছিল? আমানতদারীর সাথে এ প্রশ্নের উত্তর দিলে দেখা যাবে আসলে ইখলাছের এ আলোচনা ইখলাছের সাথে হয়নি। অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল; লোকেরা কমপক্ষে আমাকে মুখলিছ ভাববে অথবা অন্য কাউকে জব্দ করা যাবে কিংবা উপস্থিত সুধীজন জানবে আমি এ বিষয়ে বেশ পন্ডিত-ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনা তার ভিতর ক্রিয়াশীল ছিল।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত মসজিদে এসে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করেন। আর ইমাম ও মুয়াজ্জিন কোন ভুল করলে বা কাজে অলসতা করলে তিনি শুধরে দেয়ার চেষ্টা করেন। এ কাজ তিনি শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে ইখলাছের সাথে করেন। তিনি মনে করেন, এটা তো আমার চাকুরী নয় বা আমাকে কেউ দায়িত্ব দেয়নি। আমি কষ্টটুকু করছি আল্লাহরই জন্য। তাই এখানে ইখলাছ ছাড়া অন্য কিছুর অসি-ত্ব নেই। একদিন তিনি সবার আগে মসজিদে আসলেন। দেখলেন এক স্থানে ময়লা রয়ে গেছে, ভালমত পরিস্কার করা হয়নি। তিনি নিয়্যত করলেন মুয়াজ্জিনকে ধমকে দেবেন। পরোক্ষণে চিন্তা করলেন, আমি যদি এখন মুয়াজ্জিনকে বকা দেই তাহলে কেউ শুনবে না। আরো দু চার জন লোক মসজিদে আসুক তাদের উপস্থিতিতে আমি মুয়াজ্জিনকে বকা দেব যাতে তারাও শুনবে ও জানবে, আমি এ বিষয়ে কত তৎপর ও মুয়াজ্জিন লোকটার শিক্ষাটা ভাল হবে। সামনের ইলেকশনে আমাকে মসজিদ কমিটির কোন এক ভাল পদে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে।

তিনি তা-ই করলেন। যখন আরো মুসল্লীরা আসলেন তিনি মুয়াজ্জিন সাহেবকে ডেকে বললেন, মুয়াজ্জিন সাব আপনি সারা দিন কি করেন? কিসের ধান্ধায় থাকেন? এখানে কতখানি ময়লা! আপনার চোখে পড়েনি? আজ কি আপনি মসজিদ ঝাড়ু দিয়েছেন? সারা দিন খান ও ঘুমান, কোন কাজ করেন না।

সম্মানিত পাঠক! তিনি প্রথমে নিয়্যত ভালই করেছিলেন। পরে তার নিয়্যতের বিচ্যুতি ঘটেছে। তিনি যদি তার এ কাজটি ইখলাছের সাথে করতেন তবে তার ভাষা মার্জিত হত। তিনি সম্মানের সাথে কথা বলতেন। মুয়াজ্জিন বেচারা এত মানুষের সামনে অপমানিত হতেন না। তিনিও সমাজে বদ-মেজাজি লোক বলে পরিচিত হতেন না। আর আল্লাহর কাছে এ কাজের পুরস্কার! সে তো অনেক দূরে। বরং, এ কাজের প্রতিদানে শাস্তি লাভের সম্ভাবনা সৃষ্টি হল। সওয়াব লাভের দিক দিয়ে আমলটি বৃথা গেল।

তাই তো দেখা যায় কোন কাজের শুরুতে ইখলাছ অবলম্বন একটা কঠিন কাজ। আবার ইখলাছের মাধ্যমে নিয়্যতটা ঠিক করে নিলে এর উপর অটল থাকা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বার এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন : আমি ভয় করি ! আমি সতর্ক করি...।

যেমন একবার তিনি বললেন :-

আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো না যাকে আমি দাজ্জালের চেয়ে বেশী ভয় করি? আমরা বললাম, অবশ্যই আপনি আমাদের বলে দেবেন। তিনি বললেন : তা হল সুক্ষ্ম শিরক, যা এমন যে, কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়ে যায় আর খুব সুন্দর করে সালাত আদায় করে কিন্তু মনে মনে অন্যকে দেখানোর ভাবনা লালন করে।

দাজ্জালের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকা কত কঠিন! রিয়া বা লোক দেখানো ভাবনা থেকে মুক্ত থেকে ইখলাছের উপর অটল থাকা এর চেয়েও কঠিন।

তাই ইখলাছ সম্পর্কে এ বইটির অনুবাদ করা জরুরী মনে করছি।

আরবী ভাষায় বইটি সংকলন করেছেন আমাদের উস্তাদ সৌদী আরবের প্রাজ্ঞ আলেম, বিদগ্ধ গবেষক ফয়সাল বিন আলী আল-বাদানী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এটি এ বিষয়ে একটি জামে ও মানে উপস্থাপনা। যদি কেউ আমাদের এ বইটি পড়ে ইখলাছ অবলম্বনে উৎসাহী হন তাহলে আমাদের বইটির উদ্দেশ্য স্বার্থক বলে ধরে নেব।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা তিনি আমাদের সকলকে ইখলাছ ও বিশুদ্ধ নিয়্যতে সকল ভাল কাজ তাঁরই উদ্দেশ্যে নিবেদন করার তাওফীক দান করুন। এমনিভাবে সকল অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত থাকতে পারি যেন তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আমীন!

আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান

 ইখলাছ

ইখলাছ কি?

আভিধানিক অর্থে ইখলাছ হল কোন বস্তুকে খালি করা বা পরিস্কার করা।

শরিয়তের পরিভাষায় ইখলাছ দ্বারা উদ্দেশ্য কি-তা নির্ণয়ে বিজ্ঞ আলেমদের মত ও মন্তব্য ভিন্ন ভিন্ন।

কেউ বলেছেন, ইখলাছ হল : ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক বলে গ্রহণ করা। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-

وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا . الكهف : 100

সে যেন তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।  সূরা আল-কাহফ : ১১০

কারো মত হল, অন্তরকে পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করে, এমন যাবতীয় নোংরামী ও অসুস্থতা হতে অন্তরকে পবিত্র করা। ভিন্ন কারো মত-স্বত:প্রণোদিত হয়ে আল্লাহর আনুগত্যে আত্মনিবেদন।

আবার কারো মত এই যে, ইখলাছ হল, আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন, তা পালন করা তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা তার সন'ষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে।

ভাষার পার্থক্য থাকলেও সংজ্ঞাগুলোর মূল বক্তব্য এটাই। যে মৌলিক নীতিমালাকে কেন্দ্র করে আলেমগণ ইখলাছের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, তা হলো- ইবাদত-বন্দেগী-সৎকর্ম বলতে যা কিছু আছে, সবই একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সম্পাদন করার নাম ইখলাছ। আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ইবাদত পালন করলে তাকে ইখলাছ বলে গণ্য করা হবে না। এমনিভাবে, সকল পাপাচার থেকে মুক্ত থাকার উদ্দেশ্য হবে কেবল তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জন।

ইবাদত ও কর্মসম্পাদন একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন ও ইখলাছ আনয়নের বিভিন্ন রূপ হতে পারে- কেউ কেউ আল্লাহর ইবাদত করেন তার প্রতি সম্মান ও মর্যাদা জ্ঞাপনার্থে। অপর কেউ ইখলাছকে ভাবেন আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের প্রবেশিকা হিসাবে। কারো উদ্দেশ্য থাকে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন'ষ্টি লাভ। অপর কেউ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সুনিবীড় সম্পর্ক ও পরম আস্বাদ লাভে প্রয়াসী, কিংবা পরকাল দিবসে মহান আল্লাহর সাক্ষাত লাভে প্রত্যাশী-যেদিন আল্লাহর সাক্ষাতে সারিবদ্ধ হবে বান্দাগণ। নির্দিষ্ট কোন প্রাপ্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়-কারো কারো ইবাদতের লক্ষ্য থাকে যে কোন প্রকারে পুরস্কার প্রাপ্তি, আবার কারো ইবাদতের লক্ষ্য নির্দিষ্ট কোন সওয়াব লাভ। কেউ কেউ আল্লাহর ভয়ে ভীত হন নির্দিষ্ট কোন আযাবের কথা স্মরণ করে, অপর কেউ নির্দিষ্ট কোন আযাবের কথা স্মরণ করে নয়, আল্লাহকে ভয় করেন তার যে কোন আযাবের ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে।

সন্দেহ নেই, ইবাদতে মানুষের ইচ্ছাবৃত্তির বৈচিত্র্য এক বিশাল অধ্যায়, একেক সময় তার মাঝে ক্রিয়াশীল থাকে একেক ধরণের ইচ্ছা, কখনো সে প্রণোদনা লাভ করে একাধিক ইচ্ছার দ্বারা। কিন্তু ইচ্ছার এ বৈচিত্র্যও একক এক লক্ষ্যের প্রতি সতত ধাবিত-বান্দা তার কাজ-কর্ম ও যাবতীয় মনোবৃত্তির দ্বারা একমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার আকাঙ্খাকে তীব্র করে তোলে, অন্য কাউকে নয়। এ সবই ইখলাছেরই সত্যায়ন। এ সব ইচ্ছা যার মাঝে ক্রিয়াশীল, সে-ই সিরাতে মুস্তাকীমের অধিকারী, হেদায়েত ও বিশুদ্ধ লক্ষ্যপানে ধাবিত। তবে বান্দার উচিৎ তার ইবাদতকে আল্লাহপ্রেম, ভীতি ও আশা থেকে কখনো বিযুক্ত করবে না। কারণ, ইবাদতের প্রতিষ্ঠাই এই ত্রিমাত্রিক লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

 ইখলাছের মর্যাদা

প্রকৃতপক্ষে, ইখলাছই হল ইসলাম ধর্মের মূল বিষয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ. (البينة : 5)

তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে (ইখলাছের সাথে) একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।  (সূরা আল-বাইয়েনাহ : ৫)

আল্লাহ আরো বলেন :-

قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ .    (الزمر  : 11)

বলুন, আমি ইখলাছের সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি।  (সূরা যুমার : ১১)

فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ ﴿﴾ أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ. (الزمر  : 2-3)

আপনি ইখলাছের সাথে আল্লাহর ইবাদত করুন। জেনে রাখুন, ইখলাছপূর্ণ ইবাদতই আল্লাহর জন্য। (সূরা যুমার, আয়াত ২-৩)

উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা ইখলাছপূর্ণ ইবাদতকেই তার জন্য স্বীকৃতি প্রদান করেছেন-অল্প হোক কিংবা বেশী, বৃহৎ কিংবা ক্ষুদ্র, যে কোন ধরনের শিরক হতে যা বিমুক্ত ও পরিশ্রুত। আয়াতগুলো স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, ইসলাম ধর্মে ইখলাছ এক গুরুত্বপূর্ণ শর্তের নাম, তাবৎ আম্বিয়া এ প্রক্রিয়ারই স্বীকৃতি বহন করেন ; দ্বীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, শরীয়তের প্রতিটি অনুঘটনায় ইখলাছের অনুসন্ধান প্রমাণ করে ইখলাছের মর্যাদা ও গুরুত্ব।

ইখলাছ নবী-রাসূলদের দাওয়াতের কুঞ্জিকা, যে নীতিমালা নিয়ে তারা আগত, তার মহোত্তম স্থানের অধিকারী।

যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ  (النحل: 36)

আল্লাহর ইবাদত করবার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি। সূরা আন-নাহল :

ইবনু কাসীর রহ. বলেন, এ আদেশ নিয়ে রাসূলগণ পৃথিবীতে আগমন করেন ; নূহ আ. যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, সে জাতির মাঝেই সর্বপ্রথম যখন শিরকের উৎপত্তি হয়, তখন তাকে মানবজাতির জন্য প্রথম রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়, যে ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে, যার দাওয়াত বিস্তৃত ছিল জিন-ইনসান ও পৃথিবীর সকল জাতিবর্গের জন্য। পৃথিবীতে রাসূলরূপে আগত সকলের দায়িত্ব ছিল আল-কুরআনের ভাষায়-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ . (الأنبياء : 25)

আমি তোমার পূর্বে এ আদেশ ব্যতীত কোন রাসূল প্রেরণ করিনি যে আমি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই ; সুতরাং আমারই ইবাদত কর। (সূরা আল-আম্বিয়া : ২৫)

এ তাওহীদ ও ইখলাছ হল কলব বা হৃদয়ের কর্মের মাঝে সর্বোচ্চস-রের, এটাই বান্দার কর্মের উদ্দেশ্য, ও পরিমাণে-মর্যাদায় সর্ববৃহৎ।

ইবনুল কায়্যিম রহ. বক্তব্যটির ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর দাসত্বের প্রাণ হল অন-রের কাজ। যদি অঙ্গ-প্রতঙ্গের দ্বারা দাসত্ব করা হয় কিন্তু অন্তর ইখলাছ ও তাওহীদ থেকে শূন্য থাকে তবে সে যেন একটি মৃতদেহ, যার কোন রূহ নেই। নিয়্যত হল অন্তরের আমল। (বাদায়ে আল-ফাওয়ায়েদ : ইবনুল কায়্যিম)

ইখলাছ হল ইবাদত কবুলের দু শর্তের একটি। ইখলাছ ব্যতীত কোন ইবাদত কবুল হবে না।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :-

إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كان خالصا وابتغى به وجهه.

)أخرجه النسائي (3140) وصححه الألباني في سنن النسائي (2/659

আল্লাহ তাআলা শুধু সে আমলই গ্রহণ করেন, যা ইখলাছের সাথে এবং আল্লাহকে সন'ষ্টি করার উদ্দেশ্যে করা হয়। (বর্ণনায় : নাসায়ী)

যারা আল্লাহর ব্যাপারে ইখলাছ অবলম্বন করেছে আল্লাহ তাঁর কালামে প্রশংসার সাথে তাদের কথা আলোচনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা তার কালীম মূসা আ. -এর প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেন-

وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ مُوسَى إِنَّهُ كَانَ مُخْلَصًا وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا. (مريم : 51)

স্মরণ কর, এ কিতাবে মূসার কথা, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে ছিল রাসূল। (সুরা মারইয়াম, আয়াত ৫১)

এমনিভাবে তিনি ইউসূফ আ. সম্পর্কে বলেছেন :-

كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ. (يوسف : 24)

আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখার জন্য এভাবেই নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত (ইখলাছ অবলম্বনকারী) বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। (সূরা ইউসূফ : ২৪)

এমনিভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন :-

قُلْ أَتُحَاجُّونَنَا فِي اللَّهِ وَهُوَ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ وَلَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُخْلِصُونَ   (البقرة: 139)

বল, আল্লাহ সম্পর্কে তোমরা কি আমাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও? যখন তিনি আমাদের প্রতিপালক ও তোমাদেরও প্রতিপালক। আমাদের কর্ম আমাদের ও তোমাদের কর্ম তোমাদের ; এবং আমরা তার প্রতি একনিষ্ঠ (ইখলাছ অবলম্বনকারী)(সূরা আল-বাকারা : ১৩৯)

এ সকল আয়াত থেকে বুঝে আসে আম্বিয়া আলাইহিমুচ্ছালামের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ইখলাছ বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। (আখলাকুন্নবী ফি আল-কিতাবে ওয়াস সুন্নাহ: হাদ্দাদ)

অপরদিকে ইখলাছশূন্য ব্যক্তির জন্য এসেছে কঠোর হুশিয়ারী ও শাস্তির সংবাদ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ  . (النساء: 48)

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না। এ শিরক ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সূরা নিসা : ৪৮)

যারা শিরক করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা :-

وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا. (الفرقان : 23)

আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ করব অত:পর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব। (সূরা আল-ফুরকান : ২৩)

আয়াতটি উল্লেখের পর ইবনুল কায়্যিম রহ. এর মন-ব্য এই যে, এ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যর্থ কাজ বলতে ঐ সকল কাজকে বুঝিয়েছেন, যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতিতে করা হয়নি অথবা তার পদ্ধতিতে করা হয়েছিল তবে একনিষ্ঠভাবে (ইখলাছের সাথে) আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হয়নি। (মাদারিজুস সালেকীন)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু কাসীর রহ. বলেন, মুশরিকরা রক্ষা লাভ ও শুভপরিণতির আশায় পার্থিবে যে কর্মসম্পাদন করেছে, তা যারপরনাই মূল্যহীন, কিছুই নয়, কারণ, ইখলাছ অথবা আল্লাহ প্রণীত বিধানের প্রতি আনুগত্য-শরীয়তের এ দুটি আবশ্যকীয় শর্তের কোনটিই তাতে উপস্থিত নেই। যে সকল কাজ খালেছ আল্লাহর জন্য করা হয় না কিংবা শরীয়তের অনুমোদিত পন্থায় পালন করা হয় না তা বাতিল বলে গণ্য -সন্দেহ নেই। (তাফসীর ইবনে কাসীর)

হাদীসে এসেছে-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قال الله تعالى : أنا أغنى الشركاء عن الشرك، من عمل عملا أشرك معي فيه غيري تركته وشركه) .  أخرجه مسلم2985 : (

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন : আমি শরীকদের শিরক থেকে একেবারেই বে-পরওয়া। যদি কোন ব্যক্তি কোন আমল করে এবং এতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে তাহলে আমি তাকে ও তার শিরকী কাজকে প্রত্যাখ্যান করি। (বর্ণনায় : মুসলিম)

হাদীসে এসেছে

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من تعلم علما مما يبتغى به وجه الله عز وجل لا يتعلمه إلا ليصيب به عرضا من الدنيا لم يجد عرف الجنة يعني ريحها يوم القيامة .أخرجه أبو داود (3664) وصححه الألباني

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে জ্ঞান অর্জন করা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তা যদি কেউ পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে করে তাহলে সে কিয়মাত দিবসে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। (বর্ণনায় : আবু দাউদ)

হাদীসে আরো এসেছে -

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من طلب العلم ليجاري به العلماء أو ليماري به السفهاء أو ليصرف به وجوه الناس إليه أدخله الله النار) . أخرجه الترمذي 2654: وحسنه الألباني(

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করবে আলেমদের উপর প্রাধান্য বিস্তারের উদ্দেশে অথবা মূর্খদের সাথে অহমিকা প্রদর্শনের জন্যে কিংবা মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করাবেন। (বর্ণনায় : তিরমিজী)

সুতরাং, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য-যাবতীয় ইবাদতের ক্ষেত্রেই ইখলাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বান্দার কিছু আমল হবে ইখলাসে পূর্ণ, কিছু হবে শূন্য, কিছু মুআমালায় ইখলাছ হবে তার আদর্শ, অপরকিছু মুআমালা হবে ইখলাছ হতে বিচ্যুত-এ খুবই গর্হিত বিষয়, এ কখনো স্বীকৃত নয় শরীয়া মোতাবেক। ইবনে কায়্যিম রহ. ইখলাছের গুরুত্ব ও অবস্থান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, ইখলাছ ও আনুগত্য শূন্য আমল তুলনীয় এমন মুসাফিরের সাথে, যে অকাজের ধুলোয় পূর্ণ করেছে তার থলে এবং প্রচুর ক্লান্তি ও ঘর্মাক্ত দেহে আতিক্রম করছে মরুভূমির পর মরুভূমি, তার জন্য এ সফর নিশ্চয় নিস্ফল ও শুভপরিণতি শূন্য। (আল-ফাওয়ায়িদ : ইবনুল কায়্যিম)

 ইখলাছ একটি কঠিন কাজ :

ইখলাছের গুরুত্ব ও মর্যাদা সত্বেও, আমরা বলব, নি:সন্দেহে ইখলাছ নফসের জন্য কঠিন একটি বিষয়। কারণ, নফস এবং প্রবৃত্তি ও নফসের আকাঙ্খার মাঝে ইখলাছ এক কঠোর দেয়াল ও বাধা হয়ে নিজেকে উপস্থিত করে। নিজ প্রবৃত্তি, সামাজিক অবস্থা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা মুকাবিলা করে ইখলাছ ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর উপর অটল থাকতে সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। এ সংগ্রাম শুধু সাধারণ মানুষ করবে তা কিন্তু নয় বরং আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ, ইসলামী আন্দোলনের কর্মী, ইসলাম প্রচারক ও নেককার-মুত্তাকী-সকলের প্রয়োজন। সূফিয়ান আস-সাওরী বলেন : আমার কাছে নিজের নিয়্যত ঠিক করার কাজটা যত কঠিন মনে হয়েছে অন্য কোন কাজ আমার জন্য এত কঠিন ছিল না। কতবার নিয়্যত ঠিক করেছি কিন্তু কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবার পাল্টে গেছে। (আল-জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবুছ ছামে : খতীব বাগদাদী)

ইউসূফ ইবনে হুসাইন রাযী বলেন: দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ হল ইখলাছের উপর অটল থাকা। আমি আমার অন্তর থেকে রিয়া (লোক দেখানো ভাবনা) দূর করার জন্য কত প্রচেষ্টা চালিয়েছি, সে দূর হয়েছে বটে তবে আবার ভিন্ন আকৃতিতে, ভিন্ন রূপে উপস্থিত হয়েছে। (জামে আল উলূম ওয়া আল-হিকাম : ইবনু রজব)

সাহাল ইবনু আব্দুল্লাহকে প্রশ্ন করা হল, আপন প্রবৃত্তির নিকট কঠিনতম কর্ম কি? তিনি বললেন, ইখলাছ। কেননা, প্রবৃত্তি কখনো ইখলাছ গ্রহণ করতে চায় না। (সফওয়াতু আসসাফওয়াহ : ইবনুল জাওযী)

তাই, মন্দকর্মে প্রণোদনাদাতা নফস বান্দার কাছে ইখলাছকে মন্দরূপে উপস্থাপন করে, দৃশ্যমান করে তোলে এমন রূপে, যা সে ঘৃণা করে মনেপ্রাণে। সে দেখায়, ইখলাছ অবলম্বনের ফলে তাকে ত্যাগ করতে হবে বিলাসী মনোবৃত্তির দাসত্ব, যে তোষামোদী স্বভাব ও মেনে নেয়ার দুর্বলতা মানুষকে সমাজের সকল শ্রেণীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ব্যাপক অবদান রাখে, তাও তাকে ছিন্ন করতে হবে আমূলে। সুতরাং, বান্দা যখন তার আমলকে একনিষ্ঠতায় নিবিষ্ট করে, আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কেউ তার কর্মের উদ্দেশ্য হয় না, তখন বাধ্য হয়েই বিশাল একটি শ্রেণীর সাথে তাকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়, তারাও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, একে অপরের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।

এ জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সময় এ দুআ পাঠ করতেন-

يا مقلب القلوب ثبت قلبي على دينك  . أخرجه الترمذي

হে অন্তর পরিবর্তনকারী ! আমার অন্তর আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন !

 ইখলাছের ফলাফল :

ইখলাছের ফলাফল রয়েছে অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল :-

 ১- জান্নাত লাভ :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

إلا عباد الله المخلصين. أولئك لهم رزق معلوم. فواكه وهم مكرمون. في جنات النعيم. (الصافات : 40-43)

কিন্তু তারা নয় যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ (ইখলাছ অবলম্বনকারী) বান্দা। তাদের জন্য রয়েছে নির্ধারিত রিযিক, ফলমূল, তারা হবে সম্মানিত, সূখদ কাননে।  (সূরা আস-সাফফাত : ৪০ -৪৩)

একটি প্রসিদ্ধ বচন এই যে, সকল মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে, তবে জ্ঞানীরা বেঁচে যাবে। সকল জ্ঞানী ধংস হয়ে যাবে, তবে যারা কাজ করেছে, তারা বেঁচে যাবে। যারা কাজ করেছে, তারাও ধ্বংস হয়ে যাবে, তবে যারা ইখলাছের সাথে (একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য) কাজ করেছে, তারা মুক্তি পাবে। (মিনহাজ আল-কাসেদীন : আল-মাকদিসী)

 ২-আমল কবুল হওয়া :

ইখলাছ হল আমল কবুলের শর্ত। ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন : দুটো শর্তের সন্বিবেশ ব্যতীত আল্লাহ তাআলা আমল গ্রহণ করবেন না। প্রথম শর্ত হল আমলটি শরীয়ত অনুমোদিত হতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত আমলটি ইখলাছ (একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত) সহকারে শিরকমুক্ত ভাবে আদায় করতে হবে। (তাফসীরে ইবনু কাসীর)

আল্লামা সাজী বলেছেন : পাঁচটি গুণের মাধ্যমে জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ হয়। গুণ পাঁচটি হল : আল্লাহর পরিচয় লাভ। হক বা যা সত্য তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপণীত হওয়া। ইখলাছ বা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ মোতাবেক কাজ করা এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করা। যদি এর একটি অনুপস্থিত থাকে তাহলে তার আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। (আল-জামে লিআহকামিল কুরআন : কুরতুবী)

আল্লামা সিদ্দীক খান বলেন : ইখলাছ আমলের শুদ্ধতা ও কবুলের একটি অন্যতম শর্ত, এ বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। (আদ-দীনুল খালেছ : সিদ্দীক খান)

প্রমাণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস-

إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كان خالصا وابتغى به وجهه .(أخرجه النسائي 3140( وصححه الألباني في سنن النسائي2/659 (

আল্লাহ তাআলা শুধু সে আমলই গ্রহণ করেন যা ইখলাছের সাথে এবং আল্ল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়। (বর্ণনায় : নাসায়ী)

হাদীসে আরো এসেছে-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إذا جمع الله الأولين والآخرين يوم القيامة ليوم لا ريب فيه نادي مناد من كان أشرك في عمل عمله لله فليطلب ثوابه من عند غير الله فإن الله أغنى الشركاء عن الشرك.أخرجه ابن ماجة 4203 وحسنه الألباني

রাসূলুল্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কিয়ামতের দিনে আল্ল্লাহ তাআলা যখন সকল মানুষকে একত্র করবেন তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত কাজে অন্য কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করেছে সে যেন আল্লাহকে বাদ দিয়ে সেই শরীকের কাছ থেকে প্রতিদান বুঝে নেয়। কেননা, আল্ল্লাহ তাআলা সকল প্রকার অংশীদার ও অংশীদারিত্ব থেকে মুক্ত। (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ)

 ৩- আখিরাতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফাআত লাভ :

বান্দা ইখলাছ অবলম্বনের ক্ষেত্রে যতবেশী অগ্রগামী হবে সে কিয়ামতের দিন ততবেশী শাফাআত লাভের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে।

আল্লাহর রাসূলের হাদীস এর প্রমাণ-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: أسعد الناس بشفاعتي يوم القيامة من قال لا إله إلا الله خالصا من قلبه .   (أخرجه البخاري:99)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : কিয়ামাতের দিন আমার শাফাআত দ্বারা সবচেয়ে ভাগ্যবান হবে ঐ ব্যক্তি যে ইখলাছের সাথে (একনিষ্ঠভাবে) বলেছে আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। (বর্ণনায় : বুখারী)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন : এ হাদীসে তাওহীদের একটি সুক্ষ্ম রহস্য লুকায়িত আছে, তা এই যে, শাফাআত লাভের অন্যতম শর্ত হচ্ছে তাওহীদ অবলম্বন ও তাওহীদের পরিপন্থী বিষয় হতে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি তার তাওহীদকে যত বেশী উন্নত ও পূর্ণ করতে পারবে সে তত বেশী শাফাআত লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যে শিরক করবে তার জন্য কোন শাফাআত নেই। (আদ-দীন আল-খালেছ : সিদ্দীক খান)

 ৪-হিংসা-বিদ্বেষ থেকে অন্তর পবিত্র থাকে :

যখন কোন ব্যক্তির অন্তরে ইখলাছ স্থান পেয়ে যায় তখন সে অনেক বিপদ-আপদ, দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকে। যেমন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন :-

ثلاثة لا يغل عليهن قلب امرئ مؤمن: إخلاص العمل لله، والمناصحة لأئمة المسلمين ولزوم جماعتهم. (أخرجه أحمد وابن ماجة)

তিনটি বিষয়ে মুমিনের অন্তর খিয়ানত করে না। ইখলাছের সাথে আমলসমূহ আল্লাহর জন্য নিবেদন করা, মুসলিম নেতাদের কল্যাণ কামনা ও মুসলিম জামাআতের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা।    (বর্ণনায় : আহমদ, ইবনে মাজাহ)

ইবনু আব্দুল বার রহ. বলেন: এ তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে তার অন-র কখনো দুর্বল হবে না। কপটতা বা নিফাকী থেকে সে পবিত্র থাকবে। (আত-তামহীদ : ইবনে আব্দুল বার)

 ৫- গুনাহ মাফ ও অগণিত পুরস্কার লাভ :

যখন মুমিন ব্যক্তি ইখলাছসহ সকল আমল করবে তখন সে গুনাহ থেকে ক্ষমা পেয়ে যাবে এবং অনেক গুণে প্রতিদান লাভ করবে। যদিও কাজটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে ছোট অথবা পরিমাণে খুবই স্বল্প।

এ ব্যাপারে ইবনুল মুবারক রহ. বলেন : অনেক ক্ষুদ্র আমল আছে নিয়্যত যাকে অনেক বড় করে দেয়। আবার অনেক বড় আমল আছে নিয়্যত যাকে অনেক ছোট করে দেয়। (সিয়ার আলামুন নুবালা : আজ-যাহাবী)

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন : অনেক আমল এমন আছে যা মানুষ পরিপূর্ণ ইখলাছের সাথে সম্পাদন করে। ফলে এ আমলটি ইখলাছের পূর্ণতার কারণে তার কবীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। যেমন তিরমিজী ও ইবনে মাজার হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কিয়ামাতের দিন আমার উম্মতের এক ব্যক্তির ব্যাপারে চিৎকার দেয়া হবে। তার কাছে উপস্থিত করা হবে পাপকর্মের নিরানব্বইটি বিশাল নথি। প্রতিটি নথির ব্যপ্তি হবে দৃষ্টির দুরত্ব পরিমাণ। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি যে এ পাপকর্মগুলো করেছো তা কি তুমি অস্বীকার করবে? সে বলবে হে প্রতিপালক! আমি এগুলো অস্বীকার করতে পারি না। আল্লাহ বলবেন, তোমার উপর জুলুম করা হবে না। এরপর হাতের তালু পরিমাণ একটা টিকেট বের করা হবে যাতে লেখা থাকবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। সে বলবে এত বিশাল পাপের সম্মুখে এ ছোট টিকেটের কি মূল্য আছে? অত:পর এ টিকেটটি একটি পাল্লায় রাখা হবে এবং তার পাপের বিশাল নথিগুলোকে রাখা হবে অপর পাল্লায়। টিকেটের পাল্লাই ভারী হবে।

কারণ এ ব্যক্তি ইখলাছের (একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য) সাথে লা-ইলাহা ইল্লাহর স্বাক্ষ্য দিয়েছে বলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়েছে। নয়ত যে সকল কবীরাগুণাহে লিপ্ত ব্যক্তিরা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর স্বাক্ষ্য দিয়েছে, তারাও জাহান্নামে যাবে। হয়ত তারা ইখলাছের সাথে কালেমা পড়েনি।

এমনিভাবে যে পতিতা একটি পিপাসার্ত কুকুরকে কষ্ট করে পানি পান করিয়েছিল সে তা ইখলাছের সাথে করেছে বলেই তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। নয়তো যে কোন পতিতা এ কাজ করত, তারই ক্ষমা পাওয়ার কথা ছিল।

এমনিভাবে যে ব্যক্তি পথের কাঁটা দূর করে দেয়ার কারণে ক্ষমা পেয়েছিল সে তা ইখলাছের সাথে করার কারণে ক্ষমা পেয়েছে। নয়তো সকল কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিরা এ কাজটি করে ক্ষমা আদায় করে নিতে পারত।

পক্ষান্তরে : অনেক বড় বড় ব্যক্তি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে কিন্তু তাতে ইখলাছ (আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা) না থাকার কারণে তা ব্যর্থ হয়ে গেছে ও আমলকারী পুরস্কার ও প্রতিদানের পরিবর্তে শাসি-র পাত্রে পরিণত হয়েছে।

যেমন হাদীসে এসেছে-

إن أول الناس يقضى يوم القيامة عليه رجل استشهد فأتي به فعرفه نعمها فعرفها، قال فما عملت فيها، قال : قاتلت فيك حتى استشهدت، قال: كذبت، ولكنك قاتلت لأن يقال جريء فقد قيل، ثم أمر به فسحب على وجهه حتى ألقى في النار. ورجل تعلم العلم وعلمه وقرأ القرآن فأتي به فعرفه نعمه فعرفها، قال: فما عملت فيها، قال: تعلمت العلم وعلمته وقرأت فيك القرآن، قال: كذبت، ولكنك تعلمت العلم ليقال: عالم وقرأت القرآن ليقال هو قارئ فقد قيل، ثم أمر به فسحب على وجهه حتى ألقى في النار. ورجل وسع الله عليه وأعطاه من أصناف المال كله فأتي به فعرفه نعمه فعرفها، قال: فما عملت فيها، قال: ما تركت من سبيل تحب أن ينفق فيها إلا أنفقت فيها لك، قال : كذبت ولكنك فعلت ليقال هو جواد، فقد قيل، ، ثم أمر به فسحب على وجهه حتى ألقى في النار .أخرجه مسلم: 1905

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন ব্যক্তি যে শহীদ হয়েছিল। তাকে হাজির করা হবে এবং আল্লাহ তার নিয়ামতের কথা তাকে বলবেন। এবং সে তার প্রতি সকল নিয়ামত চিনতে পারবে। তখন আল্লাহ তাকে বলবেন তুমি কি কাজ করে এসেছ? সে বলবে, আমি তোমার পথে যুদ্ধ করেছি, শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন : তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তো যুদ্ধ করেছ লোকে তোমাকে বীর বলবে এ উদ্দেশ্যে। আর তা বলা হয়েছে। অত:পর নির্দেশ দেয়া হবে, এবং তাকে টেনে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর এমন ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে ও অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন তেলাওয়াত করেছে। তাকে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞেস করবেন কি কাজ করে এসেছ? সে বলবে আমি জ্ঞান অর্জন করেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং আপনার জন্য কুরআন তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি জ্ঞান অর্জন করেছ এ জন্য যে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলবে। কুরআন তেলাওয়াত করেছ এ উদ্দেশ্যে যে, লোকে তোমাকে কারী বলবে। আর তা বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেয়া হবে তাকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার জন্য।

তারপর বিচার করা হবে এমন ব্যক্তির, যাকে আল্লাহ দুনিয়াতে সকল ধরণের সম্পদ দান করেছিলেন। তাকে হাজির করে আল্লাহ নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সকল নেয়ামত স্মরণ করবে। আল্লাহ বলবেন, কি করে এসেছ? সে বলবে, আপনি যে সকল খাতে খরচ করা পছন্দ করেন আমি তার সকল খাতে সম্পদ ব্যয় করেছি, কেবল আপনারই জন্য। আল্লাহ বলবেন তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি সম্পদ এ উদ্দেশ্যে খরচ করেছ যে, লোকে তোমাকে দানশীল বলবে। আর তা বলা হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেয়া হবে, এবং তাকে উপুর করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। বর্ণনায় : মুসলিম।

হাদীসে আরো এসেছে :-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إني أخوف ما أخوف عليكم الشرك الأصغر، قالوا يا رسول الله وما الشرك الأصغر؟ قال : الرياء، يقول الله لهم يوم يجازي العباد بأعمالهم: اذهبوا إلى الذين كنتم تراؤون في الدنيا فانظروا هل تجدون عندهم جزاء. أخرجه البغوي في شرح السنة

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি তোমাদের ব্যাপারে যে বিষয়ে ভয় করি, সে বিষয়ে সাবধান করতে চাই; তা হল শিরক আছগর বা ছোট শিরক। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন হে রাসূল! ছোট শিরক কি? তিনি বললেন : রিয়া (লোক দেখানো উদ্দেশ্যে কাজ করা)। যেদিন আল্লাহ তার বান্দাদের কর্মের প্রতিদান দেবেন, সে দিন তিনি বলবেন : দুনিয়াতে তোমরা যাদের দেখানোর জন্য কাজ করেছ আজ তাদের কাছে যাও! দেখ, তাদের কাছে প্রতিদান পাও কি-না। (বগভী)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

إن الله تبارك وتعالى يقول: أنا أغنى الشركاء عن الشرك، من عمل عملا أشرك فيه غيري فأنا منه بريء، هو للذي عمله. أخرجه مسلم : 2985

আল্লাহ তাআলা বলবেন : আমি শিরক ও অংশীদার থেকে বে-পরোয়া। যে কোন কাজে আমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে শরীক করল আমি তার থেকে সম্পর্কমুক্ত। যার জন্য সে করেছে সেটা তারই জন্য। বর্ণনায়: মুসলিম

 ৬- আল্লাহর সাহায্য ও প্রতিষ্ঠা লাভ :

ঈমানদারদের আল্লাহর সাহায্য লাভ ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূল উপাদান হল ইখলাছ বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

إنما ينصر الله هذه الأمة بضعيفها : بدعوتهم وصلاتهم وإخلاصهم. أخرجه النسائي : 3178 وصححه الألباني

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ উম্মাতকে সাহায্য করেন তাদের দূর্বলদের কারণে ; তাদের দুআ, সালাত ও ইখলাছের কারণে। (বর্ণনায় : নাসায়ী)

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

بشر هذه الأمة بالنصر والسناء والتمكين، فمن عمل منهم عمل الآخرة للدنيا لم يكن له في الآخرة نصيب). صحيح ابن حبان)

আমার উম্মতকে সাহায্য, প্রাচুর্য ও তাদের প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দাও। আর তাদের কেউ যদি আখিরাতের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে, আখিরাতে তার কোন অংশ নেই। (বর্ণনায় : ইবনে হিব্বান)

আমাদের পূর্বসূরী সালাফে সালেহীনদের জীবনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তারা আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছেন নিজেদের ঈমানী শক্তি, ইখলাছ বা অন্তরের একনিষ্ঠতা ও ঈমান ও ইখলাছের আলোকে গঠিত পরিশুদ্ধ আকীদা-বিশ্বাসের মাধ্যমে।

ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছেন :-

فمن خلصت نيته في الحق ولو على نفسه كفاه الله ما بينه وبين الناس) .السنن الكبرى للبيهقي(

যে সত্যের ব্যাপারে নিজ নিয়্যতকে খালেছ করে নিয়েছে, যদিও তা তার নিজের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে মানুষের অপকারিতা অসহযোগের ক্ষেত্রে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হবেন। (সুনানুল কুবরা : বায়হাকী)

উক্ত মন্তব্য উল্লেখের পর ইবনুল কায়্যিম রহ. মন্তব্য করেন : বান্দা যখন আল্লাহর জন্য তার নিজের নিয়্যত স্থির করে নেয় এবং তার ইচ্ছা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, জ্ঞান-সবকিছু আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, তখন আল্লাহর সাহায্য সর্বদা তার সাথে থাকে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও ইহসান করে আল্লাহ তাদের সাথে আছেন। তাকওয়া ও ইহসানের মূল হল সত্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়া বা ইখলাছ অবলম্বন করা। আল্লাহর উপর জয়ী হতে পারে এমন কেউ নেই। যার সাথে আল্লাহ আছেন তার উপর কেউ জয় লাভ করতে পারে না, পারে না তাকে কেউ পরাজিত করতে। যার সাথে আল্লাহ আছেন তার ভয় কিসের? (ইলামুল-মুআক্কিয়ীন : ইবনুল কায়্যিম)

 ৭- মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও ভালবাসা লাভ :

আল্লাহ তাআলা ইখলাছ অবলম্বনকারী বান্দাদের জন্য মানুষের ভালবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভের ফয়সালা করেন। পক্ষান্তরে যে মানুষের মন পাওয়ার জন্য মানুষের কাছে আস্থাভাজন হওয়ার নিয়্যতে কাজ করে, সে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা লাভ করতে পারে না। সে যা চায় তার উল্টোটাই পায়।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

من سمع سمع الله به، ومن يرائي يرائي الله به.أخرجه البخاري : 6499

যে মানুষকে শুনাতে চায় আল্লাহ তার কথা শুনিয়ে দেন। যে মানুষকে দেখাতে চায় আল্লাহ মানুষের কাছে তাকে দেখিয়ে দেন। (বর্ণনায় : বুখারী)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন :-

من كانت الدنيا همه فرق الله عليه أمره وجعل فقره بين عينيه ولم يأته من الدنيا إلا كتب له، ومن كانت الآخرة نيته جمع الله له أمره، وجعل غناه في قلبه وأتته الدنيا وهي راغمة . أخرجه ابن ماجة : 4105

যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য হবে পার্থিব স্বার্থ, আল্লাহ তার কাজগুলোকে এলোমেলো করে দেবেন। তার দু চোখে দরিদ্রতা দিয়ে দেবেন। তার জন্য যা কিছু নির্ধারিত আছে এর বাইরে দুনিয়ার কিছুই সে লাভ করতে পারবে না। আর যার উদ্দেশ্য হবে আখেরাত, আল্লাহ তার কাজ-কর্ম গুছিয়ে দেবেন। তার অন্তরে সচ্ছলতা দান করবেন। দুনিয়ার সম্পদ অপমানিত হয়ে তার কাছে ফিরে আসবে। (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ)

আমাদের পূর্বসূরী সালাফে সালেহীন এ বিষয়ে কতটা সচেতন ছিলেন তা অনুমান করা যায় মুজাহিদ রহ. এর কথায়। তিনি বলেন : বান্দা যখন তার অন-র নিয়ে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হয় আল্লাহ তখন সকল সৃষ্ট জীবের অন্তর তার দিকে ঝুকিয়ে দেন।

ফুজাইল রহ. বলেন : যে কামনা করে আলোচিত হওয়ার জন্য, যার একান্ত আকাঙ্খা এই যে, মানুষ তাকে স্মরণ করুক, তাকে কিন্তু স্মরণ করা হয় না। আর যে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং মানুষ তাকে স্মরণ করুক এটা কামনা করে না, আসলে তাকেই স্মরণ করা হয়। (ইলামুল-মুআক্কিয়ীন : ইবনুল কায়্যিম)

 ৮- বৈধ কাজগুলো ইবাদতে রূপান্তরিত হওয়া :

ইবাদত ও কাজে-কর্মে বান্দার একনিষ্ঠতা এবং বিশুদ্ধ নিয়ত তার পার্থিব কর্মগুলোকে উঁচু স্তরে উন্নীত করে এবং পরিণত করে গ্রহণযোগ্য ইবাদতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-

وفي بضع أحدكم صدقة، قالوا يارسول الله أيأتي أحدنا شهوته ويكون له فيها أجر؟ قال: أرأيت لو وضعها في حرام أكان عليه وزر ؟ فكذلك إذا وضعها في الحلال كان له أجر أخرجه مسلم : 1006

আর তোমাদের স্ত্রীদের সাথে যৌনকর্মেও রয়েছে সদকার ছাওয়াব। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের কেউ যদি তার যৌন চাহিদা পূর্ণ করে তাহলে কি পুরস্কার? তিনি বললেন, আচ্ছা তোমরা কী মনে কর? ; যদি কেউ অবৈধ পন্থায় যৌন চাহিদা মেটায় তাহলে তার কি পাপ হবে? এমনিভাবে যদি কেউ বৈধ পন্থায় তার যৌন চাহিদা পূর্ণ করে তাহলে পুরস্কার পাবে। (বর্ণনায় : মুসলিম)

কেন সে বৈধ পন্থায় যৌন চাহিদা মেটালেও সওয়াব পাবে? কারণ সে কাজটি করার সময় এ ধারণা করেছে যে, আমি বৈধ পন্থায় কাজটি করে সেই অবৈধ পন্থা থেকে বেঁচে থাকব, যেখানে আল্লাহ আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এ অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আমি তার প্রতি একনিষ্ঠ (মুখলিছ) হতে পারব। আর এ ইখলাছ প্রসূত ধারণার কারণেই তার সামান্য মানবিক চাহিদা মেটানোর কাজটাও সওয়াবের কাজ হিসাবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে।

হাদীস থেকে আরেকটি দৃষ্টান- :-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إنك لن تنفق نفقة تبتغي بها وجه الله إلا أجرت عليها حتى ما تجعل في فم امرأتك) .أخرجه البخاري)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তুমি যা কিছু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যতে খরচ করবে অবশ্যই তার পুরস্কার পাবে। এমনকি, তুমি যা কিছু তোমার স্ত্রীর মুখে দিয়েছ তারও সওয়াব পাবে। (বর্ণনায় : বুখারী)

স্ত্রী সন্তানদের জন্য খরচ করা পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এখানে পাপ-পুণ্যের কী আছে? তবু দেখুন, যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রী সন্তানদের জন্য খরচ করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যত করে তাহলে সে সওয়াব ও পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছে।

এমনিভাবে যদি কেউ নিজের খাওয়া-দাওয়ার জন্য ব্যয় করে এবং এর সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যত করে, তাহলে সে সওয়াব লাভ করছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, যে ব্যক্তি কোন বৈধ মানবিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে সামর্থ হাসিলের নিয়্যত করবে তার এ চাহিদা পূরণের কাজটা আল্লাহর কাছে ইবাদত হিসেবে কবুল হবে ও সে এতে সওয়াব পাবে। (মজমু আল-ফাতাওয়া: ইবনে তাইমিয়া)

যেমন আপনি নিয়্যত করলেন যে, আমি এখন বাজারে কেনা-কাটার জন্য যাব। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য হল, এ কেনা-কাটার মাধ্যমে আমি খেয়ে-দেয়ে যে শক্তি অর্জন করব তা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে ব্যয় করব। ব্যস! আপনার এ নিয়্যতের কারণে বাজারে কেনা-কাটা করাটা আপনার ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। এটাইতো ইখলাছ বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া।

ইখলাছ যেমন সাধারণ বৈধ কাজকে ইবাদতে রূপান-রিত করে, তেমনি রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য ইবাদতকে বরবাদ করে প্রতিফল শূন্য করে দেয়।

যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ . (البقرة : 264)

হে মুমিনগণ! দানের কথা বলে বেড়িয়ে এবং ক্লেশ দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় নিস্ফল করো না, যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকাল দিবসে ঈমান রাখে না। (সূরা বাকারা : ২৬৪)

অর্থাৎ, দানের কথা বলে বা খোঁটা দিয়ে যেভাবে দানের প্রতিফলকে ধ্বংস করা হয়, তেমনি মানুষকে দেখানোর বা শুনানোর জন্য দান করলে আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দিক দিয়ে যদিও মনে হবে সে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করেছে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য হল মানুষের প্রশংসা অর্জন। মানুষ তাকে দানশীল বলবে, তার দানের কথা প্রচার হলে মানুষ তাকে সমর্থন দেবে-ইত্যাদি।

সাহাবী উবাদাহ ইবনু সামেত রা. কে এক ব্যক্তি বলল, আমি আমার এ তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করব। এর মাধ্যমে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করব ও মানুষের প্রশংসা পাব। উবাদাহ তাকে বললেন, তুমি কিছুই পাবে না। তুমি কিছুই পাবে না। তৃতীয়বার উবাদাহ রা. বললেন, আল্লাহ বলেছেন : আমি শিরক ও অংশীদার থেকে বে-পরোয়া। যে ব্যক্তি আমার জন্য করা হয় এমন কোন কাজে আমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে শরীক করল আমি তার থেকে সম্পর্কমুক্ত। আমাকে ছাড়া যার জন্য সে করেছে সেটা তারই জন্য বিবেচিত। (এহইয়া উলূমুদ্দীন: লিল-গাযালী )

 ৯- ইখলাছপূর্ণ নিয়্যতের মাধ্যমে পরিপূর্ণ আমলের সওয়াব অর্জন :

কোন কোন সময় মানুষ ইখলাছ ও বিশুদ্ধ নিয়্যতে কাজ করতে উদ্যোগী হয়, কিন্তু তার সম্পদের সীমাবদ্ধতা, শারীরিক দুর্বলতা-ইত্যাদি কারণে কাজটি সমাধা করতে পারে না। কখনো দেখা যায়, উক্ত ভাল কাজটি করার জন্য সে প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু কোন কারণে কাজটি আঞ্জাম দিতে পারেনি। এমতাবস্থায় সে কাজটি সম্পন্ন করার সওয়াব পেয়ে যাবে। এবং তার ইখলাছের কারণে কাজটি যারা করতে পেরেছে তাদের সমমর্যাদা লাভ করবে।

যেমন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

إن أقواما خلفنا بالمدينة ما سلكنا شعبا ولا واديا إلا وهم معنا، حسبهم العذر . أخرجه البخاري  : 2839

আমরা কয়েকটি দলকে মদীনায় রেখে এসেছি। তারা আমাদের সাথে কোন পাহাড় অতিক্রম করেনি, কোন উপত্যকাও মাড়ায়নি। অথচ তারা আমাদের সাথে অংশগ্রহণকারীর মর্যাদা লাভ করবে । অক্ষমতা তাদেরকে আটকে রেখেছে।  (বর্ণনায় : বুখারী)

হাদীসে বর্ণিত সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে অভিযানে অংশ নিতে পারেননি কোন অসুবিধার কারণে। কিন্তু তাদের বিশুদ্ধ নিয়্যত ও ইখলাছ ছিল অভিযানে অংশ নেয়ার জন্য। তাই তারা অংশ গ্রহণ না করেও অংশগ্রহণকারীদের সম-মর্যাদার অধিকারী হবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন :-

من أتى إلى فراشه وهو ينوي أن يقوم يصلى من الليل، فغلبته عيناه حتى أصبح كتب له ما نوى وكان نومه صدقة عليه من ربه عز وجل .أخرجه النسائي 258 وصححه الألباني

যে ব্যক্তি শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করবে-এ নিয়্যতে শুয়ে পড়ল। অবশেষে নিদ্রা তাকে কাবু করে ফেলল এবং সকাল হওয়ার আগে জাগতে পারল না। এমতাবস্থায় সে যা নিয়্যত করেছিল তা তার জন্য লেখা হয়ে যাবে। এবং এ নিদ্রা তার প্রভুর পক্ষ থেকে দান হিসেবে ধরা হবে। (বর্ণনায় : নাসায়ী)

তাহাজ্জুদের নিয়্যত করেও এ ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়তে পাড়ল না বটে কিন্তু ইখলাছ ও বিশুদ্ধ নিয়্যতের কারণে সে তাহাজ্জুদের পূর্ণ সওয়াব পাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন :-

من سأل الشهادة بصدق بلغه الله منازل الشهداء وإن مات على فراشه .أخرجه مسلم 1909

যে বিশুদ্ধ মনে জিহাদে শরীক হয়ে আল্লাহর কাছে শহীদ হওয়া কামনা করবে, আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন যদিও সে বিছানায় মৃত্যুবরণ করে। (বর্ণনায় : মুসলিম)

ইখলাছ বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে যে শহীদ হওয়ার আকাঙ্খা করবে, সে শহীদ না হতে পারলেও আল্লাহ তাকে তার ইখলাছের কারণে শহীদের মর্যাদা দান করবেন।

আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

قال رجل لأتصدقن الليلة بصدقة، فخرج بصدقته فوضعها في يد زانية، فأصبحوا يتحدثون : تصدق الليلة على زانية، قال أللهم لك الحمد على زانية، لأتصدقن بصدقة فخرج بصدقته فوضعها في يد غني فأصبحوا يتحدثون : تصدق على غني، قال : أللهم لك الحمد على غني، لأتصدقن بصدقة، فخرج بصدقته فوضعها في يد سارق، فأصبحوا يتحدثون : تصدق على سارق، فقال أللهم لك الحمد على زانية وعلى غني وعلى سارق فأتي، فقيل له : أما صدقتك فقد قبلت، أما الزانية فلعلها تستعف بها عن زناها، ولعل الغني يعتبر فينفق مما أعطاه الله ولعل السارق يستعف بها عن سرقته .أخرجه البخاري 1421: ومسلم: 1022

এক ব্যক্তি নিয়্যত করল, আমি রাতে কিছু ছদকা (দান) করব। যখন রাত এল সে ছদকা করল। কিন্তু ছদকা পড়ল এক ব্যভিচারী মহিলার হাতে। সকাল হলে লোকজন বলতে শুরু করল, গত রাতে জনৈক ব্যক্তি এক ব্যভিচারীকে ছদকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ ! ব্যভিচারীকে ছদাক দেয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। আমি রাতে আবার একটি ছদকা করব। পরের রাতে যখন সে ছদকা করল, তা পড়ল একজন ধনীর হাতে। যখন সকাল হল তখন লোকজন বলাবলি শুরু করল গত রাতে জনৈক ব্যক্তি এক ধনীকে ছদকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ! ধনীকে ছদকা দেয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। আমি রাতে আবার একটি ছদকা করব। যখন পরের রাতে সে ছদকা করল, তা পড়ল একজন চোরের হাতে। যখন সকাল হল তখন লোকজন বলতে শুরু করল, গত রাতে এক ব্যক্তি এক চোরকে ছদকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ! ব্যভিচারী, ধনী ও চোরকে ছদকা দেয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বলা হল তোমার সকল ছদকা (দান)-ই কবুল করা হয়েছে। সম্ভবত তোমার ছদকার কারণে ব্যভিচারী মহিলা তার পতিতাবৃত্তি থেকে ফিরে আসবে। ধনী ব্যক্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উৎসাহী হবে। চোর তার চুরি কর্ম থেকে ফিরে আসবে। (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)

দেখুন, এ ব্যক্তি তার ছদকা বা দান করার ব্যাপারে এতটাই ইখলাছ (আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়্যত) গ্রহণ করেছিল যে, ছদকা প্রদানে তার অতি গোপনীয়তা কাউকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে দেয়নি। এ গোপনীয়তা রক্ষার কারণে বার বার এ ছদাক অনাকাংখিত হাতে পরলেও সে তার ইখলাছ থেকে সরে আসেনি। ইখলাছ অবলম্বনে ছিল অটল। ফলে তার কোন দান ব্যর্থ হয়নি।

ইবনে হাজার রহ. বলেন, এ হাদীস দ্বারা বুঝে আসে দানকারী নিয়্যত বিশুদ্ধ থাকলে তার দান অনাকাংখিত স্থানে পড়লেও তার দান বা ছদকা আল্লাহর কাছে কবুল হবে। (ফাতহুল বারী : ইবনে হাজার)

 ১০- ইখলাছ বিপদ মুসীবত থেকে মুক্তির কারণ :

নিয়্যতের ব্যাপারে ইখলাছ অবলম্বন ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে আশ্রয় গ্রহণে সততা ও সত্যবাদিতা হল দুনিয়া ও আখিরাতের বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির মাধ্যম।

বিষয়টি স্পষ্ট করে যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :-

وَلَقَدْ ضَلَّ قَبْلَهُمْ أَكْثَرُ الْأَوَّلِينَ﴾ وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا فِيهِمْ مُنْذِرِينَ﴾ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُنْذَرِينَ﴾ إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ﴾ الصافات : 71-74

তাদের পূর্বেও পূর্ববর্তীদের অধিকাংশ বিপথগামী হয়েছিল। এবং আমি তাদের মধ্যে সতর্ককারী প্রেরণ করেছিলাম। সুতরাং লক্ষ্য কর যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল, তাদের পরিণাম কি হয়েছিল! তবে আল্লাহর একনিষ্ঠ (ইখলাছ অবলম্বনকারী) বান্দাদের কথা স্বতন্ত্র। (সূরা সাফফাত : ৭১-৭৪)

আল্লাহ আরো বলেন :-

هُوَ الَّذِي يُسَيِّرُكُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ حَتَّى إِذَا كُنْتُمْ فِي الْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِمْ بِرِيحٍ طَيِّبَةٍ وَفَرِحُوا بِهَا جَاءَتْهَا رِيحٌ عَاصِفٌ وَجَاءَهُمُ الْمَوْجُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ أُحِيطَ بِهِمْ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ لَئِنْ أَنْجَيْتَنَا مِنْ هَذِهِ لَنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ ﴿২২﴾ فَلَمَّا أَنْجَاهُمْ إِذَا هُمْ يَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ. )يونس: 22-23)

তিনিই তোমাদিগকে জলে স্থলে ভ্রমন করান এবং তোমরা যখন নৌকারোহী হও এবং এগুলো আরোহী নিয়ে অনুকূল বাতাসে বয়ে যায় এবং তারা এতে আনন্দিত হয়, অত:পর এগুলো বাত্যাহত এবং সর্বদিক থেকে তরংগাহত হয় এবং তারা তা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গেছে মনে করে, তখন তারা আনুগত্য ও ইখলাছের সাথে (বিশুদ্ধ চিত্তে) আল্লাহকে ডেকে বলে : তুমি আমাদেরকে এ থেকে উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন-র্ভূক্ত হব। অত:পর তিনি যখনই তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন তখনই তারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে জুলুম করতে থাকে। (সূরা ইউনূস : ২২-২৩)

এ রকম আরেকটি দৃষ্টান-, আল্লাহ তাআলা বলেন :-

وَإِذَا غَشِيَهُمْ مَوْجٌ كَالظُّلَلِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَّاهُمْ إِلَى الْبَرِّ فَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمَا يَجْحَدُ بِآَيَاتِنَا إِلَّا كُلُّ خَتَّارٍ كَفُورٍ.(لقمان: 32)

যখন তরঙ্গ তাদের আচ্ছন্ন করে মেঘচ্ছায়ার মত, তখন তারা আল্লাহকে ডাকে তার আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্তে (ইখলাছের সাথে)। কিন্তু যখন তিনি তাদের উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছান তখন তাদের কেউ কেউ সরল পথে থাকে; কেবল বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে। (সূরা লুকমান : ৩২)

এ সকল আয়াতে স্পষ্টভাবেই ব্যক্ত করা হয়েছে যে আলোচিত বিপদগ্রস্থরা ইখলাছের সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার কারণেই বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছে।

এমনিভাবে বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে তিন বিপদগ্রস্থ ব্যক্তির কথা আলোচিত হয়েছে যারা এক বিপদসংকুল ঝড়-বৃষ্টির রাতে পাহাড়ের এক গুহায় আটকে পড়েছিল। তখন প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ নেক আমলের অসীলায় দুআ করে বলেছিল, হে আল্লাহ ! আমি যদি এ কাজটি আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য (ইখলাছের সাথে) করে থাকি, তবে এর অসীলায় আমাদের এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর! ফলে তারা বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)

এ হাদীস দ্বারা আমরা বুঝতে পারি আলোচিত তিন ব্যক্তির কাজ তিনটি ইখলাছ ভিত্তিক হওয়ার কারণে বিপদ থেকে আল্লাহ তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন।

 ১১- শয়তানের ধোঁকা থেকে মুক্ত থাকা :

শয়তান সর্বদা আল্লাহর বান্দাদের ধোঁকা দিয়ে খারাপ পথে নিয়ে যায়। খারাপ কথা ও কাজ, পথ এবং মতকে মানুষের কাছে শোভনীয় ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে তাদের বিভ্রান্তু করে। কিন্তু মানুষ যদি সকল কাজে ইখলাছ বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়ার ভাবনা ধারণ করে, তবে শয়তান তাকে ধোঁকা দিতে পারে না, আবদ্ধ করতে পারে না বিভ্রান্তির বেড়াজালে।

যেমন আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :-

قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴿39﴾ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ﴿40﴾( الحجر  : 39-40)

শয়তান বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে আমাকে বিপথগামী করলেন সে জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে দেব এবং আমি তাদের সকলকে বিপথগামী করব, তবে তাদের ব্যতীত, যারা আপনার ইখলাছ অবলম্বনকারী (একনিষ্ঠ) বান্দা। (সূরা আল-হিজর : ৩৯-৪০)

এ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা নিজেদের ঈমান-বিশ্বাস, ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ করে নেবে, সবকিছু যখন শুধু আল্লাহর জন্যই নিবেদন করবে, তখন তাদের বিভ্রান্ত করতে শয়তান কোন পথ খুঁজে পাবে না। (জামে আল-বয়ান : তাবারী)

ইখলাছ হল শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকার একটা মাধ্যম।

আবু সুফিয়ান আদ-দারানী বলেন : বান্দা যখন আল্লাহর জন্য ইখলাছ ধারন করে তখন সকল প্রকার কুমন্ত্রণা ও রিয়া বা লোক দেখানো ভাবনা থেকে মুক্ত থাকে। তিনি নিজেকে সম্বোধন করে বলতেন, তুমি আর কত কাঁদবে! তুমি ইখলাছ ধারণ কর, মুক্তি পাবে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন : মানুষ যখন আল্লাহর জন্য ইখলাছ অবলম্বন করবে বা তার জন্য একনিষ্ঠ হবে, আল্লাহ তখন তাকে নির্বাচন করে নেন, তার অন্তরকে জাগ্রত করে দেন। তখন যত পাপ-পংকিল, অশ্লীলতা, অপকর্ম আছে সব কিছু তার কাছে ঘৃণিত মনে হয়। এবং এগুলোর লালনকে সে খুব ভয় করে চলে।

পক্ষান্তরে, যে অন্তর আল্লাহর জন্য নিবেদিত নয়, ইখলাছ ধারণ করতে পারেনি, সে যখন কোন ভাল কাজ করতে যায়, তখন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশা করে, মানব সমাজে নিজের সুনাম ও খ্যাতির প্রত্যাশা করে, কখনো কখনো মানুষের কাছ থেকে কিছু পাওয়া বা সুবিধা আদায়ের নিয়্যত করে। বা কখনো মানুষের সমালোচনা, গাল-মন্দ থেকে বেঁচে থাকার বিষয়টি প্রাধান্য দেয়। ফলে আল্লাহর কাছে তার সৎ কর্মটি অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এমনিভাবে সে শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়। তাই শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে নিজের কাজ-কর্মগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে ইখলাছ তথা সকল কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টার কোন বিকল্প নেই। (মাজমু আল-ফাতাওয়া : ইবনে তাইমিয়া)

 ১২- সৎকাজের সামর্থ, ভালবাসা ও বরকত লাভ :

বান্দা যখন তার সকল কাজ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য করবে এবং সঠিক পদ্ধতিতে করবে তখন সে ভাল কাজের তাওফীক, মানুষের ভালবাসা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভ করবে।

মাকহূল রহ. মন্তব্য করেন, কোন যদি বান্দা একাধারে চল্লিশটি দিবস ইখলাছের সাথে যাপন করে, তবে সন্দেহ নেই, তার অন্তর থেকে বিচ্ছুরিত হবে হিকমত ও প্রজ্ঞার প্রস্রবন, জ্যোতি প্রকাশ পাবে তার কথা ও ভাষায়। (মাদারিজুস সালিকীন : ইবনুল জাওযী)

হামদূন কিসারকে যখন বলা হল, মহান পূর্বসুরীদের কথা ও বক্তব্য কি করে আমাদের কথা ও বক্তব্যের তুলনায় অধিক উপকারী ও কল্যাণকর রূপে দেখা দেয়?  উত্তরে তিনি বললেন, কারণ, তারা কথা বলেন ইসলামের সম্মান, নফসের মুক্তি ও আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। আর আমাদের বক্তব্য হয় নফসের সম্মান, পার্থিবের অনুসন্ধান ও মানুষের সন'ষ্টি লাভের জন্য।  (সফওয়াতুস সাফওয়াহ : ইবনুল জাওযী)

ইবনুল কায়্যিম রহ. মন্তব্য করেন, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কু-প্রবৃত্তির লালসা ত্যাগ করলে, আল্লাহর জন্য সকল কাজ নিবেদন করলে যে প্রশান্তি, মনোবল, বরকত অর্জিত হয় তা ঐ সকল লোক কখনো অর্জন করতে পারে না, যারা আল্লাহর জন্য না করে অন্য উদ্দেশ্যে করে। সে যত বড় আলেম, পীর, দরবেশ হোক, কখনো মুখলিছ ব্যক্তির ন্যায় সাহস, মনোবল, আধ্যাত্মিক শান্তি অর্জন করতে পারবে না। (আল-ফাওয়ায়েদ : ইবনুল কায়্যিম)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. সুন্দর একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন যে, প্রচলিত আছে, এক ব্যক্তি শুনল, যদি কেউ চল্লিশ দিন ভোরে আল্লাহর জন্য ইখলাছ অবলম্বন করে তাহলে তার অন্তর ও মুখের কথা হিকমত (প্রজ্ঞা) পূর্ণ হবে। শোনার পর সে চল্লিশ দিন পর্যন্ত ইখলাছের চর্চা (তার ধারণা অনুসারে) করল কিন্তু সে প্রজ্ঞা বা হিকমাত অর্জন করতে পারলো না। এরপর সে একজন বড় আলেমের কাছে গিয়ে অনুযোগ করলো যে, আমি যে হিকমত অর্জনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর জন্য ইখলাছের চর্চা করেছি তার কিছুই পেলাম না। ইখলাছ অবলম্বন করেও কেন আমি তার ফল লাভ করতে পারলাম না। আলেম উত্তরে বললেন, তুমি তো ইখলাছ চর্চা করেছো হিকমাত (প্রজ্ঞা) অর্জনের জন্য, আল্লাহর জন্য তো নয়! তোমার ইখলাছই তো হয়নি। কাজেই, তার মাধ্যমে হিকমাত অর্জন করবে কিভাবে? তুমি যদি ইখলাছ চর্চা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য করতে তাহলে হিকমাত এমনিতেই অর্জিত হত। কিন্তু তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য না করে করেছো হিকমাত অর্জনের উদ্দেশ্যে। তাই ইখলাছও আদায় হয়নি আর তার প্রতিফল হিকমাতও অর্জন করতে পারনি। (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা : ইবনে তাইমিয়া)

 ১৩- ফিতনা ফাসাদ থেকে মুক্তি পাওয়া :

ইখলাছ অবলম্বন করার কারণে বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইউসূফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন :-

كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ  . يوسف : 24

আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখার জন্য এভাবেই নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত (ইখলাছ অবলম্বনকারী) বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। (সূরা ইউসূফ : ২৪)

ইখলাছের কারণে আল্লাহ তাকে অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও অবৈধ প্রেমের ফিতনা থেকে রক্ষা করেছেন। মানুষের অন্তর এ জাতীয় অনাচারে তখনি লিপ্ত হয়ে পড়ে, যখন তার অন্তর শূন্য থাকে আল্লাহপ্রেম ও তার প্রতি সমর্পিত ইখলাছ থেকে। কারণ, মানুষের অন্তর মাত্রই প্রেমের আকাঙ্খী, সমর্পণের উদগ্র বাসনা তাকে উম্মত্ত করে রাখে সতত। আল্লাহ যার মাহবুব, ইলাহ ও একক উপাস্য নন, তার অন্তর স্বভাবতই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে খুঁজে নেবে।

ইবনুল কায়্যিম রহ. ইউসুফ আআইহিস সালাম প্রসঙ্গে বলেন : ইউসুফ আ. যখন আল্লাহর জন্য ইখলাছ বা নিষ্ঠা অবলম্বন করলেন, আল্লাহ তার কাছে এ সকল অশ্লীল বিষয়কে ঘৃণিত হিসেবে তুলে ধরলেন, ফলত: উক্ত অনাচার ও ফিতনা তাকে কোনভাবে ত্যাক্ত করতে পারল না। ...সুতরাং, ইখলাছ অবলম্বন, সন্দেহ নেই, অনাচার ও অকল্যাণ হতে মুক্তির সরল পথ। ইখলাছের ব্যাপারে যে যত দূর্বল থাকবে, সে ততবেশী অন্যায়-অপকর্ম ও পাপাচারে জড়িয়ে পড়বে। (আল-ফাওয়ায়েদ : ইবনুল কায়্যিম)

অন্যত্র তিনি বলেন, ...এ কারণেই ইউসুফের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে উদ্ধৃত হয়েছে যে,-

كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ   

এমনই ঘটেছিল, যাতে তার থেকে দূরিভূত করি অকল্যাণ ও অনাচার। নিশ্চয় তিনি আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত।

আয়াতটি প্রমাণ করে অনৈতিক প্রেম ও তার ফলে উদ্ভূত অন্যায়-অকল্যাণ-অনাচার রোধের অন্যতম উপায় হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে, সর্বকাজে ইখলাছ অবলম্বন। এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে সালাফে সালিহীনের কারো কারো মন্তব্য এই যে, প্রেম হল অলস, কর্মশূন্য ও অথর্ব, অথবা বলা যায়, প্রেমিকশূন্য অন্তরের এক ধরনের কর্মব্যস্ততা ও মনোবৃত্তি। তিনি আরো বলেন, ছোট হোক কিংবা বড়, যাবতীয় পাপাচার তিনটি কান্ড হতে পত্র-পল্লবে বিস্তৃত হয়ে প্রকাশ পায়। কান্ড তিনটি হচ্ছে : আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপন, অশুভ ও প্রবৃত্তির শক্তির পুজা অর্থাৎ শিরক, এবং জুলুল ও অনাচার...এ তিনটি একে অপরের সাথে শৃঙ্খলাবদ্ধ, গলায় গলায় জড়িত। শিরক তার অবশ্য পরিণতিতে ডেকে আনে জুলুম ও অনাচার। যেমনিভাবে ইখলাছ ও তাওহীদের প্রতি বান্দার সমর্পণ বান্দাকে মুক্ত করে এইসব অনাচার থেকে।

 মুখলিছদের আলামত

যারা ইখলাছ অবলম্বন করেন, তাদের বলা হয় মুখলিছ। তাদের কিছু গুণাবলি রয়েছে যা দেখে বুঝা যাবে যে তারা ইখলাছের গুণে সমৃদ্ধ। এ সকল গুণাবলির মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি আলোচনা করা হল :-

 ১-আল্লাহর সন্তুষ্টিই তাদের একান্ত কাম্য :

ইখলাছের উঁচু স্থানে অবস্থান করেন যারা, তাদের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে যাবতীয় কাজে-কর্মে তারা একমাত্র আল্লাহকেই উদ্দেশ্য করেন; খ্যাতি, প্রশংসা, কিংবা নশ্বর পার্থিব সম্পদের কিছুই তাদের উদ্দেশ্য নয়। তাদের এ অবস্থার কথা বহু আয়াত ও হাদীসে এসেছে :-

আল্লাহ তার প্রতি সমর্পিত বান্দাদের কথা উল্লেখ করে বলেন :-

وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ .  الكهف :28

তুমি নিজেকে ধৈর্য সহকারে রাখবে তাদের সংসর্গে যারা সকাল ও সন্ধায় ডাকে তাদের প্রতিপালকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। (সূরা আল-কাহাফ : ২৮)

অর্থাৎ তারা তাদের দুআ ইবাদতের মাধমে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, পার্থিব কোন স্বার্থ চায় না।

হাদীসে এসেছে-

عن أبي موسى رضى الله عنه قال : جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: الرجل يقاتل للمغنم والرجل يقاتل للذكر، والرجل يقاتل ليرى مكانه، فمن في سبيل الله ؟ قال : من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا فهو في سبيل الله . أخرجه البخاري : 2810

সাহাবী আবু মুছা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, জনৈক ব্যক্তি জিহাদ করছে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পাওয়ার জন্য, আরেক ব্যক্তি জিহাদ করছে লোকেরা তাকে স্মরণ করবে এ জন্য, অন্য এক ব্যক্তি জিহাদ করছে তার মর্যাদা বেড়ে যাবে সে জন্য। এর মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে সর্বশীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে লড়াই করছে সে-ই আল্লাহর পথ জিহাদ করছে। (বর্ণনায় : বুখারী)

মুখলিছ ব্যক্তি তার সকল কাজের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে আল্লাহর দীনকে সর্বশীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

 ২-তারা গোপনে কাজ করা পছন্দ করেন :

মুখলিছ বান্দারা নিজেদের সৎকর্মগুলো গোপনে সম্পাদন করতে ভালবাসেন। এমনিভাবে তারা অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন করতে পছন্দ করেন। আল্লাহ তাআলাও এ ধরনের লোকদের পছন্দ করেন।

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

إن الله يحب العبد التقي الغني الخفي .أخرجه مسلم

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালবাসেন এমন বান্দাকে যে মুত্তাকী ও ধনী এবং দানশীলতায় গোপনীয়তা রক্ষাকারী। (বর্ণনায় : মুসলিম)

পূর্বসূরী সালাফে সালেহীনগণ এ গুণ অর্জনে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম মাকদাসী বলেন : যারা ভাল ও নেক কাজ করেন তারা কখনো নিজেদের প্রচার ও সুখ্যাতি চান না। যে সকল কাজে সুখ্যাতি অর্জন করা যায় কখনো তার পিছনে ছুটেন না। কখনো যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে তা তাদের সামনে এসে লুটিয়ে পড়ে, তবে তারা ছুটে পালান। এক ধরনের বৈরাগ্য ও নিস্কৃয়তা তারা পছন্দ করেন। যেমন বর্ণিত আছে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে, একদিন তিনি তার বাসস্থান হতে বেরুলেন, অপেক্ষমান একটি দল তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাদের দিকে মুখ করে বললেন, কী কারণে তোমরা আমার অনুসরণে লিপ্ত? আল্লাহর শপথ! যদি জানতে আমি গৃহে কি রেখে এসেছি, তবে তোমরা আমার অনুসরণ হতে বিরত থাকতে। (মুখতাছার মিনহাজ আল-কাসেদীন : মাকদাসী)

বিষয়টির শুদ্ধতা নিরসনে খরীবীর মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, তারা পছন্দ করতেন বিশুদ্ধ-ইখলাছপূর্ণ আমলসমূহ লুকিয়ে রাখতে, এমনকি, একান্ত আপন সহধর্মিনী পর্যন্ত সে বিষয় সম্পর্কে যেন টের না পায়। সালমান ইবনে দীনার রহ. বলেন : তুমি তোমার মন্দ বিষয় গোপন করার তুলনায় ভাল কাজগুলো বেশী গোপন করো। বিশির আল-হাফী রহ. মন্তব্য করেন, খ্যাতি ও উত্তম খাদ্য বর্জন কর। এমন ব্যক্তি আখেরাতের আস্বাদ হতে বঞ্চিত হবে, পার্থিব জগতে যার একান্ত অভিলাষ ছিল মানুষের মাঝে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন : আমার ভাল লাগে মানুষ আমার কাছ থেকে শিখবে, কিন্তু আমার নাম বলবে না। (হুলিয়াতুল আউলিয়া : আল-ইসফাহানী)

আমাদের পূর্ববর্তী সাহাবা ও ইমামগণ শুধু কথা বলে যাননি। তারা নিজেদের ভাল কাজগুলো গোপন রাখার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

যেমন ওমর রা. মদীনার পল্লীর এক অন্ধ অসহায় বৃদ্ধা মহিলার সেবা করতেন প্রতি রাতে এসে। তার জন্য পানি বহন করতেন, খাদ্য তৈরী করে দিতেন, কাপড়-চোপড় পরিস্কার করতেন। একদিন তিনি দেখলেন তার আসার পূর্বে কেউ এসে তার কাজগুলো করে দিয়ে গেছে। পরের দিন তিনি আরো আগে আসলেন যাতে অন্য কেউ তার কাজ করার সুযোগ না নেয়। তিনি এসে দেখলেন, আবু বকর রা. বৃদ্ধার কাজগুলো গুছিয়ে দিচ্ছেন। আবু বকর রা.) তখন ছিলেন খলীফার দায়িত্বে। ওমর রা. তাকে দেখে বললেন, হে তুমি! আমার জীবন তোমার জন্য কুরবান হোক। (তারীখ আল-খুলাফা : আস-সুয়ূতী)

আরকেটি ঘটনা বর্ণিত আছে যে, একরাতে ওমর রা. ঘর থেকে বের হলেন। তালহা রা. তাকে অনুসরণ করে দেখতে পেলেন, ওমর রা. একটি গৃহে প্রবেশ করলেন। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে বের হয়ে আরেকটি গৃহে ঢুকলেন। তালহা রা. ঘর দুটো চিনে রাখলেন। যখন ভোর হল তখন তিনি ঐ ঘরে প্রবেশ করলেন, দেখলেন এক অন্ধ বৃদ্ধা বসে আছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ঐ লোকটি যে গত রাতে তোমার কাছে এসেছিল সে কি কাজে এসেছিল? বৃদ্ধা বলল, লোকটি আমার সাথে ওয়াদা করেছে যে, সে প্রতি রাতে এসে আমার কাজ করে দেবে; খাবার তৈরী করবে, কাপড়-চোপড় ধুয়ে দেবে। (হুলিয়াতুল আউলিয়া : আল-ইসফাহানী)

যাইনুল আবেদীন বিন আলী ইবনুল হুসাইন সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি মদীনার একশটি ঘরে খাদ্য দান করতেন। রাতে তিনি খাদ্য নিয়ে আসতেন এবং খাদ্যগুলো বিতরণ করে চলে যেতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল, কেউ জানতো না যে কে খাদ্য দিয়ে গেছে। তিনি যখন ইন্তেকাল করলেন, তখন খাদ্য আসা বন্ধ হলে লোকজন বুঝতে পারল যে যইনুল আবেদীনই এ কাজ করে যাচ্ছিলেন। তার গোছলের সময় দেখা গেল তার পিঠে খাদ্যের বস্তা বহনের দাগ পড়ে গেছে। (সিয়ার আলাম আন-নুবালা : আজ-জাহাবী)

অবশ্য গোপনে আমল করার বিষয়টি নফল আমলের বেলায় প্রযোজ্য; ফরজ বা ওয়াজিবের বেলায় নয়। ফরজ ও ওয়াজিব প্রকাশ্যে আদায় করতে হয়।

 ৩- তাদের ভিতরের দিকটা বাহ্যিক দিকের চেয়ে ভাল থাকে :

মুখলিছ এমন হতে পারেন না যে, মানুষ যা দেখে, এমন কাজগুলো খুব ভাল করে আদায় করেন আর যা মানুষ দেখে না- শুধু আল্লাহ দেখেন সে সকল বিষয় যেনতেন করে আদায় করেন। তিনি যে কোন কাজ মুরাকাবার সাথে সম্পন্ন করবেন। মুরাকাবার সাথে সম্পন্ন করার অর্থ হল- সকল কাজে সর্বদা এ ভাবনা থাকা যে, আমি যা করছি আল্লাহ তা অবশ্যই দেখছেন।

ইবনে আতা রহ. বলেন: সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হল সকল সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মুরাকাবা করা। (ইহইয়া আল-উলূম আদ-দীন : আল-গাযালী)

যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا . الفرقان: 64

এবং তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে। সূরা আল-ফুরকান : ৬৪

যারা প্রকাশ্যে ভাল কাজ করে আর গোপনে পাপে জড়িয়ে পরে তারা কখনো মুখলিছ হতে পারে না।

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

لأعلمن أقواما من أمتي يأتون يوم القيامة بحسنات أمثال جبال تهمامة بيضا فيجعلها الله هباءا منثورا، قال ثوبان : يا رسول الله صفهم لنا جلهم لنا أن لا نكون منهم ونحن لا نعلم، قال : أما إنهم إخوانكم ومن جلدتكم يأخذون من الليل كما تأخذون، ولكنهم إذا خلوا بمحارم الله اتهكوها .أخرجه ابن ماجة 4245 وصححه الألباني

আমার উম্মতের মধ্যে অনেকের কথা আমি জানি যারা কিয়ামতের দিন তিহামা অঞ্চলের সাদা পর্বতমালা পরিমাণ সৎকর্ম নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু আল্লাহ তাদের সৎ কর্মগুলো বিক্ষিপ্ত ধুলিকণায় পরিণত করে দিবেন। এ কথা শুনে সাওবান (রা.) বললেন, হে রাসূলুল্লাহ! তাদের পরিচয় দিন, আমরা যেন নিজেদের অজান্তে তাদের অন্তর্ভূক্ত না হয়ে যাই। তিনি বললেন: তারা তোমাদেরই ভাই, তোমাদের সাথেই থাকে। তোমরা যেমন রাত জেগে ইবাদত কর, তারাও করে। কিন্তু যখন একাকী হয় তখন আল্লাহর সীমা লংঘন করে (পাপে লিপ্ত হয়) (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ)

এ জাতীয় মানুষ কখনো মুখলিছ হতে পারে না; সমাজে ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু ব্যক্তিজীবন তাদের পাপে কলুষিত। কিভাবে তারা মুখলিছ হবে? যদি তারা সর্বাবস্থায় ও সকল কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা চিন্তা করত তাহলে কি করে লোকচক্ষুর অন্তরালে পাপে লিপ্ত হয়?

 ৪- তারা তাদের সৎকর্ম প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় করে :

মুখলিছ ব্যক্তি যত বেশী ইবাদত-বন্দেগী ও নেক আমল করে না কেন তারা সর্বদা এ ভয় রাখে যে, আমার কর্মগুলো আল্লাহ কবুল করবেন, না কি প্রত্যাখ্যান করবেন, তা আমি অবগত নই। তাদের এ গুণের কথা আল-কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে :-

وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آَتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ  . المؤمنون :৬০

যারা তাদের যা দান করার তা দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে যে তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে। (সূরা মুমিনুন : ৬০)

হাদীসে এসেছে, আয়েশা রা. এ আয়াতের অর্থ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন-

أهم الذين يشربون الخمر ويسرقون؟ قال : لا يا بنت الصديق، ولكنهم الذين يصومون ويصلون ويتصدقون وهم يخافون أن لا تقبل منهم. أولئك يسارعون في الخيرات وهم لها سابقون.رواه الترمذي

আল্লাহ এ কথা কাদের জন্য বলেছেন, যারা মদ্যপান করে, চুরি করে তাদের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন: না, হে সত্যবাদীর কন্যা (আয়েশা)! তারা হল, যারা সিয়াম পালন করে, সালাত আদায় করে, দান-ছাদাকা করে; সাথে সাথে এ ভয় রাখে যে, হয়ত আমার এ আমলগুলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী। (বর্ণনায় : তিরমিজী)

মুখলিছ বান্দারা ইখলাছের সাথে সকল কাজ সম্পন্ন করে ও সাথে সাথে অন-রে এ ভয় পোষণ করে যে, আমি কাজটি যেভাবে করলে আল্লাহ কবুল করবেন সেভাবে করতে পেরেছি কি-না। আল্লাহ আমার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে আমার কাজটি কবুল করবেন, না প্রত্যাখ্যান করবেন, এমন একটা ভয় অন্তরে সর্বদা বিরাজ করে।

এ ব্যাপারে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত দেখা যায় ইমাম মাওয়ারেদী রহ.-এর জীবনে। তাফসীর, ফিকাহ, ইতিহাস ও রাজনীতিসহ বহু বিষয়ে তিনি শত শত গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত মানুষ জানত না তিনি যে কত গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইন্তেকালের সময় তিনি তার কাছের বিশ্বস্ত লোকটিকে বললেন, অমুক ব্যক্তির কাছে যে সকল কিতাব আছে সবগুলো আমার নিজের লেখা। আমি এগুলো প্রকাশ করিনি এ জন্য যে, আমি জানি না এগুলো ইখলাছের নিয়্যতে করেছি কি-না। যখন মৃত্যু নিকটে এসে যাবে আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকব তখন তুমি তোমার হাতটা আমার হাতের মধ্যে রাখবে। যদি দেখ আমি তোমার হাত ধরেছি ও চাপাচাপি করছি তাহলে তুমি বুঝে নেবে ওগুলোর কিছুই আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি। তুমি তখন ঐ কিতাবগুলো দজলা নদীতে ফেলে দেবে। আর যদি দেখ আমি তোমার হাত না ধরে হাত খোলা রেখেছি তাহলে বুঝে নেবে ওগুলো আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে।

ইন্তেকালের সময় দেখা গেলে তিনি হাত খোলা রেখেছেন। পরে কিতাবগুলো প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্বের হাজার মানুষ পাঠ করে এখনো উপকৃত হচ্ছে। (সিয়ার আলাম আন নুবালা : আয-যাহাবী)

 ৫- তারা মানুষের প্রশংসার অপেক্ষা করে না :

যখন তারা কোন সৃষ্টিজীবের কল্যাণের জন্য কাজ করে বা কোন মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য নিয়োজিত হয়, তাদের দু:খ কষ্ট দূর করতে নেমে পরে, তখন তারা কারো কাছ থেকে নিজের পারিশ্রমিক আশা করে না। কারো প্রশংসা কামনা করে না। শুধু আশা করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি। রাসূলগণ এ বক্তব্যের সমর্থন করেছেন। যেমন-

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ . الشعراء :109

আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না ; আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে। (সূরা আশ-শুআরা : ১০৯)

এ জন্য যারা তাদের সাথে দূর্ব্যবহার করেছে, তাদের কিছু বলতেন না। যারা তাদের বাধা দিত তাদের সাথে বৈরিতা পোষণ করতেন না। এমনকি, মানুষ তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক-তাও কামনা করতেন না।

যেমন আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন-

إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا .  الإنسان : 9

এবং তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদের আহার্য দান করি, তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও কামনা করি না। (সূরা আল-ইনছান : ৯)

অর্থাৎ, আমরা যে দান করলাম তার বিনিময়ে তোমাদের থেকে কোন প্রতিদান বা প্রশংসা অথবা কৃতজ্ঞতা পাওয়ার উদ্দেশ্য নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হল আল্লাহর সন'ষ্টি।

আসলে যাদের সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে তারা কিন্তু মুখে এ কথা বলেনি। এটা ছিল তাদের অন-রের লুকায়িত কথা। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জানেন ও জানিয়েছেন। এটা তাদের ইখলাছের বরকত। আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন অন্যদেরকে এ আদর্শে অনুপ্রাণিত করার জন্য। (তাফসীর ইবনে কাসীর)

 ৬- তারা নিজেদের জন্য পদ-মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা কামনা করে না :

অনেক মানুষ আছেন, যারা ভাল কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ইখলাছ অবলম্বন ও দায়িত্ব কর্তব্য সঠিকভাবে আদায় করেই কাজ করেন। কিন্তু যদি তার পদমর্যাদা কমিয়ে দেয়া হয় বা সুযোগ সুবিধায় ঘাটতি হয়, তবে তিনি অস্থির হয়ে যান। আসলে যিনি সত্যিকার মুখলিছ তার এমন হওয়ার কথা নয়। সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই যে আবু বকর রা. ও উমার রা. মত শীর্ষস্থানীয় সাহাবাদের যখন উসামা ইবনে যায়েদের অধীনস্থ করা হল তখন তাদের মধ্যে সামান্য প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এমনিভাবে যখন খালিদ বিন ওয়ালীদ রা. কে সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হল তখন তিনি পূর্বের মতই কাজ করতে থাকলেন। মুখলিছ যখন আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান আশা করেন তখন এ সকল বিষয় নিয়ে মন খারাপ করেন না।

যদি এমন হয় যে সুযোগ-সুবিধা ভাল পেলে সব কিছু ঠিকঠাক থাকে আর একটু অন্যরকম হলে সব গড়বড় হয়ে যায় তাহলে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে এটা কিভাবে দাবী করা যায়? বরং সে নিজের প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য কাজ করে।

এ বিষয়টি একটি হাদীসে দু ব্যক্তির চরিত্রের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে এভাবে :-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : تعس عبد الدينار، تعس عبد الدرهم، تعس عبد الخميلة، تعس عبد الخميصة، إن أعطى رضي وإن لم يعطى سخط، تعس وانتكس وإذا شيك فلا انتقش . طوبى لعبد آخذ بعنان فرسه في سبيل الله أشعس رأسه مغبرة قدماه، إن كان في الحراسة كان في الحراسة وإن كان في الساقة كان في الساقة، إن استأذن لم يؤذن له وإن شفع لم يشفع.أخرجه البخاري

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : টাকা-পয়সার দাস ধ্বংস হোক, রেশম কাপড়ের দাস ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক পোশাকের দাস। এদের অবস্থা এমন প্রদান করা হলে খুশী হয় আর না দিলে অসন্তুষ্ট হয়। ধ্বংস হোক! অবনত হোক! কাঁটা বিঁধলে তা যেন উঠাতে না পারে।

তবে সৌভাগ্যবান আল্লাহর ঐ বান্দা যে আল্লাহর পথে ঘোড়ার লাগাম ধরেছে, মাথার চুল এলোমেলো করেছে ও পদদ্বয় ধুলায় ধূসরিত করেছে। যদি তাকে পাহারার দায়িত্ব দেয়া তবে সে পাহারার দায়িত্ব পালন করে। যদি তাকে বাহিনীর পিছনে দায়িত্ব দেয়া হয় তবে তা পালন করে। যদি সে নেতার সাথে সাক্ষাত করার অনুমতি চায় তবে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। যদি সে কারো জন্য শুপারিশ করে তবে তার শুপারিশ গ্রহণ করা হয় না। (বর্ণনায় : বুখারী)

 কিভাবে ইখলাছ অর্জন করবেন

ইখলাছ অর্জনের কিছু পদ্ধতি আছে যার প্রধান কয়েকটি পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল :-

 ১-যথাযথভাবে আল্লাহর পরিচয় :

আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি মহান, তিনি ধনী, কারো মুখাপেক্ষী নন, সর্ববিষয় তার ক্ষমতাধীন, তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। মানুষ চোখ দিয়ে যা কিছু খিয়ানত করে, অন্তর দিয়ে যা কল্পনা করে, সবই তার জানা। তার হাতেই সকল ধরনের লাভ ও ক্ষতি; কল্যাণ ও অকল্যাণ। তার কোন কাজেই কোন অংশীদার নেই। তিনি যা ইচ্ছে করেন তা-ই হয়, তা ইচ্ছা করেন না, তা কোনভাবেই হবার নয়-এ ভাবনাগুলো সর্বদা তাজা ও সজীব রাখা।

সাথে সাথে নিজের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত, অনুগ্রহ ও ইহসানের প্রতি খেয়াল রাখা। তার এ সকল নেয়ামতের পরিবর্তে আমি তার জন্য কিছু করতে পেরেছি কি? যদি কিছু করি তা কি বিশুদ্ধভাবে করছি যা আল্লাহর কাছে কবুলের শতভাগ সম্ভাবনা আছে? আল্লাহর অধিকার অনেক বড় ও ব্যাপক। তার হক বা অধিকার আমরা কতটুকু আদায় করতে পারি?

এ ধরনের ভাবনা মানুষকে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ বা মুখলিছ হতে সাহায্য করে।

 ২- ইখলাছ শিক্ষা ও অনুশীলন :

ইখলাছ কি, কেন ও কিভাবে অর্জন সম্ভব-এ বিষয়টি ভালভাবে রপ্ত করতে হবে। ভালভাবে কোন বিষয় না জানলে তা অবলম্বন করা যায় না।

ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর রহ. বলেন : তোমরা নিয়্যত শিক্ষা করে নাও, কারণ এটা আমলের চেয়ে বেশী গুরূত্বপূর্ণ। (হুলইয়াতুল আওলিয়া : আল-ইসফাহানী)

আল-মাকাদাসী রহ. বলেন : যে নিয়্যতের স্বরূপ জানে না সে কি করে নিয়্যতকে বিশুদ্ধ করবে। যে নিয়্যত বিশুদ্ধ করল, কিন্তু ইখলাছ সম্পর্কে জানলো না সে কি করে ইখলাছ অবলম্বন করবে। কাজেই প্রথম কাজ হল নিয়্যতকে শুদ্ধ করা তারপর ইখলাছ অবলম্বন করা। (মিনহাজ আল-কাসেদীন : আল-মাকদাসী)

 ৩- ইখলাছের সওয়াব ও পুরস্কার স্মরণ করা :

ইখলাছের তাৎপর্য ও তার প্রতিদানের কথা স্মরণ করা। মনে রাখা, ইখলাছ হল আমল কবুলের শর্ত। জান্নাতে প্রবেশের একমাত্র রাস্তা। আর শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ধোঁকা থেকে বাঁচার একটা মজবুত কেল্লা।

যেমন বলেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন :-

قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ. إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ .الحجر : 39-40

শয়তান বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে আমাকে বিপথগামী করলেন সে জন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে দেব এবং আমি তাদের সকলকে বিপথগামী করব, তবে তাদের নয়, যারা আপনার ইখলাছ অবলম্বনকারী (একনিষ্ঠ ) বান্দা। (সূরা আল-হিজর : ৩৯-৪০)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :-

إِنَّكُمْ لَذَائِقُو الْعَذَابِ الْأَلِيمِ ﴿38﴾ وَمَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ ﴿39﴾ إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ ﴿40﴾ أُولَئِكَ لَهُمْ رِزْقٌ مَعْلُومٌ ﴿41﴾ فَوَاكِهُ وَهُمْ مُكْرَمُونَ ﴿42﴾ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ﴿43﴾ عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ ﴿44﴾ (الصافات : 38-44)

তোমরা অবশ্যই মর্মন্তদ শাস্তির আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল পাবে। তবে তারা নয় যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ (মুখলিছ) বান্দা। তাদের জন্য আছে নির্ধারিত রিযক-ফলমূল ; আর তারা হবে সম্মানিত, সুখদ-কাননে তারা মুখোমুখি হয়ে আসীন হবে। (সূরা আস-সাফফাত : ৩৮-৪৪)

যে ব্যক্তি কোন নেক আমলের দ্বারা শুধু পার্থিব স্বার্থ অর্জন করার নিয়্যত করবে তাকে পার্থিব সে স্বার্থ দেয়া হবে পূর্ণভাবে। কিন্তু আখেরাতে থাকবে তার জন্য শাস্তি। কারণ তার নিয়্যত ও পুরো চিন্তাভাবনা ছিল দুনিয়াকে ঘিরে। আল্লাহ তো তার বান্দাদের অন্তরের নিয়্যত অনুযায়ী প্রতিদান দিবেন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ ﴿15﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآَخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿16﴾.(هود : 15-16)

যে পার্থিব জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাদেরকে কম দেয়া হবে না। তাদের জন্য আখেরাতে আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই। আর তারা যা করে আখেরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা নিরর্থক। (সূরা হুদ : ১৫-১৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেই দিয়েছেন :-

من سمع سمع الله به ومن يرائي يرائي الله به أخرجه البخاري : 6499

যে মানুষকে শোনানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। আর যে মানুষকে দেখানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে দেখিয়ে দেবেন। (বর্ণনায় : বুখারী)

 ৪-আত্ম-জিজ্ঞাসা ও অধ্যবসায় :

যে কোন কাজ শুরু করার পূর্বে নিজেকে জিজ্ঞাসা করবে এ কাজ দ্বারা তোমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি? উত্তর যদি আপনার কাছে সঠিক ও শুদ্ধ মনে হয়, তবে কাজ শুরু করে দিন। আর যদি লক্ষ্য করেন, উত্তর সঠিক হচ্ছে না তাহলে নিয়্যত ঠিক করে নিন আপনার কাজটি শুরু করার পূর্বে।

আমাদের পূর্ববর্তী ইমামগণ এমনিভাবে কাজের পূর্বে মুরাকাবা বা আত্ম-জিজ্ঞাসা করে নিতেন। হাসান রহ. বলেন : কোন ব্যক্তি যদি একটি ছদকা করার নিয়্যত করত তখন নিজেকে প্রশ্ন করে নিত। যদি দেখত যে তার ছদকাটা আল্লাহর জন্যই করা হচ্ছে তখন সে অগ্রসর হত। আর যদি দেখত তার নিয়্যতে কোন সন্দেহ আছে তা হলে সে বিরত থাকত। (জামে আল-বয়ান : আত-তাবারী)

সালমান রা. বলতেন : প্রত্যেক কাজের শুরুতে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করবে যখন তুমি সংকল্প কর ও প্রত্যেক বিচারে তাকে স্মরণ করবে তখন তুমি রায় দেবে।

এর অর্থ এ নয় যে নিয়্যত খারাপ দেখলে কাজটি পরিত্যাগ করবে বরং নিয়্যতকে বিশুদ্ধ করে কাজটি শুরু করবে। এটা হল সঠিক নিয়্যতের অনুশীলন।

 ৫-আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা :

মানুষ আল্লাহর কাছে বেশী করে ধর্ণা দিয়ে তাঁর কাছে বেশী করে দুআ-প্রার্থনা করে ইখলাছ অবলম্বনের তাওফীক কামনা করবে। এ জন্য তো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দৈনিক পাঁচ বার সালাতের মাধ্যমে আমাদের বলতে শিখিয়েছেন-

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

আমরা তোমারই ইবাদত করি আর তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।

অর্থাৎ একমাত্র তোমারই উপাসনা করি অন্য কারো নয়; আর তোমার উপাসনার জন্য তোমারই কাছে সামর্থ চাই, অন্য কারো কাছে নয়। তোমার সাহায্য ছাড়া কেউ ভাল কাজ করতে পারে না এবং তোমার সাহায্য ছাড়া কেউ খারাপ কাজ থেকে ফিরে থাকতে পারে না।

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম শিরক থেকে ফিরে থাকা ও আল্লাহর তাওহীদে অটল থাকার জন্য প্রার্থনা করেছেন :-

وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَنْ نَعْبُدَ الْأَصْنَامَ .  إبراهيم :35

আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে প্রতিমা পুজা থেকে দূরে রেখ। (সূরা ইবরাহীম : ৩৫)

অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমার আমার সন্তানদের ও শিরকের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও এবং আমাদের তাওহীদ ও ইখলাছ অবলম্বনকারী বানাও। (ফাতহুল বয়ান : সিদ্দীক খান)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার শিক্ষা দিয়েছেন বহু হাদীসে। যেমন :-

عن أبي موسى الأشعري رضي الله عنه قال : خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات يوم فقال : أيها الناس اتقوا هذا الشرك فإنه أخفى من دبيب النمل، فقال له من شاء الله أن يقول : وكيف نتقيه وهو أخفى من دبيب النمل يا رسول الله ، قال : قولوا : أللهم إنا نعوذبك من أن نشرك بك شيئا نعلمه ونستغفرك لما لا نعلم .أخرجه أحمد في المسند وحسنه الألباني

সাহাবী আবু মূছা আল-আশআরী বলেন : একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন: হে মানব সকল! তোমরা শিরক থেকে নিজেদের রক্ষা কর। কেননা তা অনুভবে পিঁপড়ার চলার শব্দের চেয়েও সুক্ষ্ম। একজন ব্যক্তি প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রাসূল! যা পিঁপড়ার চলার শব্দের চেয়েও হাল্কা-আমরা অনুভব করতে পারি না-তা থেকে কিভাবে বেঁচে থাকব? তিনি বললেন: তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, হে আল্লাহ! আমরা এমন শিরক থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি যা আমরা জানি। এবং এমন শিরক থেকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, যা আমরা জানি না।  (মুসনাদ আহমদ)

তাই শিরক থেকে বেঁচে থাকতে এবং ইখলাছের উপর কায়েম থাকতে সর্বদা আল্লাহর কাছে সাহায্য ও সামর্থ প্রার্থনা করা উচিত।

 ৬-ইবাদত-বন্দেগী বেশী করা :

মানুষের কাছে শয়তানের প্রত্যাশা এই যে, সর্বতোভাবে সে আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যাগ করুক, কিংবা নিয়্যত ও ধরণের দিক দিয়ে ইবাদত পালন করুক অযথার্থ প্রক্রিয়ায়। কিন্তু শয়তান যখন জানতে পারে যে, বান্দা তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে, বর্জন করছে তার আনুগত্য; এবং যখনি সে বান্দাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে ইবাদত-বন্দেগী ও ইখলাছ, তখন সে ক্ষান্ত হয়, কারণ বান্দার এ অটলতাই তার জন্য প্রভূত কল্যাণের কারণ হবে সন্দেহ নেই। হাসান বসরী রা. বলেন: শয়তান তোমার দিকে দৃষ্টি দিয়ে যখন দেখে যে তুমি সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যে অটল, তখন সে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে যায়। আর যখন দেখে তুমি কখনো আনুগত্য করছো, আবার কখনো ছেড়ে দিচ্ছ তখন সে তোমার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠে। (আয-যুহুদ : ইবনে মুবারক)

 ৭-আত্মতৃপ্তি পরিহার করা :

আমি খুব ভাল মানুষ, বা আমি অনেক লোকের চেয়ে সৎকর্ম বেশী করি- এ ধরণের অনুভূতি লালন করার নাম হল আত্মতৃপ্তি। এটা এক খারাপ আচরণ। শয়তান এ পথ দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে থাকে, ঢুকে পড়ে তার অন্তকরণে সন্তর্পণে।

যে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে, সে যেন আল্লাহর প্রতি অনুগ্রহ করেছে বলে ধারনা পোষণ করে। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আত্মতৃপ্তিতে পতিত হওয়া কতিপয় মানুষের কথা বলেছেন এভাবে :-

يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ  . الحجرات  : 17

তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমাকে ধন্য করেছে বলে মনে করে। বল, তোমাদের ইসলাম গ্রহণ আমাকে ধন্য করেছে বলে মনে করো না, বরং আল্লাহ ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।  (সূরা হুজুরাত : ১৭)

ইমাম নববী রহ. বলেন : ইখলাছ অবলম্বনে যতগুলো বাধা আছে তার মধ্যে আত্মতৃপ্তি হল অন্যতম। আত্মতৃপ্তি যাকে পেয়ে বসবে তার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে। এমনিভাবে যে অহংকার করবে তার আমল নিষ্ফলতায় পর্যবসিত হবে। (আল-আরবাঈন আন-নববীয়্যাহ)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন : মানুষ যখন কোন কাজ শুরু করবে তখন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়্যত করবে, আল্লাহ তাকে অনুগ্রহ করে এ কাজ করার সামর্থ দিয়েছেন এটা মনে রাখবে, তাঁরই দেয়া শক্তি ও সামর্থ দ্বারা এ কাজ করা হচ্ছে, তিনিই মুখ, অন্তর, চোখ, কানকে এ কাজে ব্যবহারের উপযোগী করেছেন এ অনুভূতি পোষণ করবে। এ রকম নিয়্যত ও অনুভূতি যদি কাজ করার শুরুতে না থাকে তাহলে আত্মতৃপ্তিতে পতিত হওয়ার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাবে। ফলে তার আমলট বৃথা যাবে। (আল-ফাওয়ায়েদ : ইবনুল কায়্যিম)

সৃষ্টিজীব আমার কাজ সম্পর্কে জানুক, তারা আমার প্রশংসা করুক ও আমাকে তিরস্কার না করুক-এমন নিয়্যতে কাজ করলে তা এক ধরণের শিরক বলে আল্লাহর কাছে গণ্য হবে। (মজমু আল-ফাতাওয়া : ইবনে তাইমিয়া)

মানুষের সমালোচনা ও প্রশংসার প্রতি লক্ষ্য রেখে মুখলিছ বান্দা ইবাদত-বন্দেগী করতে পারে না। কেন সে মানুষের ভাল-মন্দ কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবে। সে তো জানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

واعلم أن الأمة لوجتمعت على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك بشيء إلا قد كتبه الله لك، ولو اجتمعوا على أن يضروك بشيء لم يضروك بشيء إلا قد كتبه الله عليك، رفعت الأقلام وجفت الصحف .أخرجه الترمذي 2516 وصححه الألباني

জেনে রাখ! পুরো জাতি যদি তোমাকে উপকার করতে একত্র হয় তবুও তোমার কোন উপকার করতে পারবে না, তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন (তা অবশ্যই ঘটবে)। এমনিভাবে, পুরো জাতি যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্র হয় তবুও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তবে আল্লাহ যা তোমার বিপক্ষে লিখে রেখেছেন (তা নিশ্চয় ঘটবে)। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর খাতা শুকিয়ে গেছে। (বর্ণনায় : তিরমিজী)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন : আগুন ও পানি যেমন একত্র হতে পারে না। সাপ এবং গুই সাপ যেমন এক গর্তে থাকতে পারে না তেমনি একই হৃদয়ে ইখলাছ ও মানুষকে সন্তুষ্ট করার ভাবনা একত্র হতে পারে না। (আল-ফাওয়ায়েদ : ইবনুল কায়্যিম)

মানুষের নজর কাড়ার প্রতি গুরুত্ব দিলে, তাদের সন'ষ্টি অর্জনের ভাবনা অন্তরে স্থান দিলে তা কাউকে উপকার করবে না ও ক্ষতি থেকেও ফিরাবে না। বরং এ ধরণের ভাবনা শুধু মানুষের ক্রোধ ও সমালোচনার যোগান দেয়।

 ৮-সৎ ও মুখলিছ লোকদের সঙ্গ অবলম্বন :

মানুষ যার সাথে উঠা-বসা ও চলাফেরা করে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি কেউ মুখলিছ লোকদের সঙ্গ অবলম্বন করে তবে তার মধ্যে ইখলাছের ধারনা প্রবল হবে। আর যদি কোন ব্যক্তি লোক দেখানো ভাবনাধারী বা লোকশুনানো ধারণার বাহকের সাথে চলাফেরা করে তবে তার দৃষ্টিভংগি তার সঙ্গীর মতই হবে। এটা সকলের কাছে বোধগম্য। যেমন হাদীসে এসেছে-

المرء على دين خليله، فلينظر أحدكم من يخالل .أخرجه أحمد :  8212

মানুষ তার সঙ্গী-সাথীর দৃষ্টিভংগি গ্রহণ করে। তাই তোমরা খেয়াল করে দেখবে কে কার সাথে চলাফেরা করে। (বর্ণনায় : আহমদ)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন :-

مثل الجليس الصالح والسوء كحامل المسك ونافخ الكير، فحامل المسك إما أن يحذيك، وإما أن تبتاع منه وإما أن تجد منه ريحا طيبا، ونافخ الكير إما أن يحرق ثيابك وإما أن تجد منه ريحا خبيثا.  أخرجه البخاري: 2234

সৎসঙ্গ অবলম্বনকারী ও অসৎসঙ্গ গ্রহণকারীদের দৃষ্টান্ত হল যথাক্রমে সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের মত। সুগন্ধি বিক্রেতা হয়ত তোমাকে কিছু সুগন্ধি দেবে অথবা তুমি তার থেকে সুগন্ধি কিনবে। যদি কোনটিই না হয়, তবে কমপক্ষে তার থেকে সুঘ্রাণ এমনিতেই পাবে। আর কামারের ব্যাপারটা হল, হয়ত তার আগুনের ফুলকিতে তোমার কাপড় পুরে যাবে অথবা তার হাপরের দুর্গন্ধ তোমাকে পেয়ে বসবে। (বর্ণনায় : বুখারী)

তাই যিনি ইখলাছ অবলম্বন করতে চান তাকে অবশ্যই সৎ-সঙ্গ নির্বাচন করতে হবে।

 ৯- মুখলিছ ও সৎ-কর্মপরায়ণদের আদর্শ রূপে গ্রহণ করা :

ইসলামের প্রথম যুগে নবী ও রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও ইমামগণ-যারা নিজেদের জীবনে ইখলাছের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন- তাদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলে ইখলাছ অবলম্বনে সহায়ক হবে। প্রতিটি কাজে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآَخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

الأحزاب: 21

তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্বরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব : ২১)

আল্লাহ আরো বলেন :-

أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهِ  . الأنعام: 90

তাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন। সুতরাং তুমি তাদের পথের অনুসরণ কর।  (সূরা আল-আনআম : ৯০)

আল্লাহ আরো বলেন :-

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ.  الممتحنة: 8

তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আল-মুমতাহিনা : ৯)

এমনিভাবে সৎকর্মপরায়ণদের অনুসরণ করার ব্যাপারে হাদীসেও নির্দেশ এসেছে :-

فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين عضوا عليها بالنواجذ. أخرجه ابن ماجة وصححه الألباني

তোমরা আমার সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শ দৃঢ়ভাবে আকরে ধরবে। (বর্ণনায় : ইবনু মাজাহ)

এ জন্য রাসুল ও তার সাহাবাদের সীরাত বা জীবনী অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। তাদের সীরাত অধ্যয়ন ব্যতীত তাদের আদর্শ কিভাবে জানা যাবে?

ইমাম আবু হানীফা রহ. বলেন : ফিকাহর কোন মাছআলা গবেষণার চেয়ে পূর্বসুরী আলেম-উলামাদের জীবনী অধ্যয়ন আমার কাছে প্রিয়। কারণ তাদের জীবনীতে পাওয়া যায় উম্মাহর সত্যিকার আদব-আখলাক ও আচার আচারণ। (জামে আল-বয়ান ওয়া ফাযলিহি : ইবনু আবদিল বির)

তাদের সীরাত বা জীবনী পাঠ করে মানুষ ইখলাছ অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ হবে অবশ্যই।

১০- ইখলাছকে জীবনের একটি লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করা :

ইখলাছ অবলম্বন করতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু সত্যিকার মুখলিছদের সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ ইখলাছ অবলম্বনে প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও তারা ইখলাছকে জীবনের একটি লক্ষ্য হিসেবে নিতে পারেনি। একে একটি লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে এর অনুশীলনের প্রশ্ন আসে, মুহাসাবা বা আত্মসমালোচনার বিষয় আসে। এ ভাবনাগুলো ইখলাছ অবলম্বন করতে সহায়তা করে। যদি কেউ এটাকে অতিরিক্তি সওয়াবের বিষয় বা নফল কাজ হিসেবে মুল্যায়ন করে, তাবে সে হয়ত কখনো ইখলাছ অবলম্বনে সফল হতে পারবে না।

 ইখলাছের পথে যা বাধা হয়ে দাড়ায়

এমন কিছু বিষয় আছে যা ইখলাছের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। নিম্নে আমরা তার উল্লেখযোগ্য কিছু উপস্থাপন করছি।

 প্রথমত : রিয়া ও ছুমআ :

রিয়া অর্থ লোক দেখানো ভাবনা আর ছুমআ অর্থ মানুষকে শোনানো বা প্রচারের ভাবনা।

পারিভাষিক অর্থে রিয়া হল মানুষকে দেখিয়ে তাদের প্রশংসা অর্জনের জন্য ইবাদত-বন্দেগী তথা সৎকর্মগুলো প্রকাশ করা। (ফাতহুল বারী : ইবনু হাজর)

ইমাম গাযালী রহ. বলেন : রিয়া হল ভাল কাজ-কর্ম মানুষকে দেখিয়ে তাদের অন-রে নিজের স্থান করে নেয়া, যাতে লোকের কাছে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

আর ছুমআ হল নিজের ইবাদত-বন্দেগীর কথা মানুষকে শোনানো। (আল-ইখলাছ : আল-আশকর)

রিয়া ও ছুমআর ব্যাপারে হাদীসে সতর্কবাণী এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

ألا أخبركم بما هو أخوف عليكم عندي من المسيح الدجال، قال : قلنا بلى ، فقال: الشرك الخفي أن يقوم الرجل يصلي فيزين صلاته لما يرى من نظر رجل .رواه ابن ماجة: 4204

আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করবো না যাকে আমি দাজ্জালের চেয়ে বেশী ভয় করি? আমরা বললাম, অবশ্যই আপনি আমাদের বলে দেবেন। তিনি বললেন : তা হল সুক্ষ্ম শিরক, তা এমন যে, কোন ব্যক্তি সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়ে খুব সুন্দর করে আদায় করল, কিন্তু তার অন-রে ক্রিয়াশীল ছিল অন্যকে দেখানোর ভাবনা। (বর্ণনায় : ইবনে মাজাহ)

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন : মানুষের কর্তব্য এই যে, সে আল্লাহর হুকুমসমূহ পালন করবে, তাঁর নিষেধ থেকে ফিরে থাকবে শুধু তাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে। এছাড়া যদি সে এর মাধ্যমে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব লাভের নিয়্যত করে, অন্যকে অবমাননা করার সংকল্প করে, তাহলে এটা হবে জাহিলিয়্যাত। যা আল্লাহর কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সে যদি এ কাজগুলো মানুষকে দেখানো বা প্রচারের উদ্দেশ্যে করে, তবে তার কোন সওয়াব থাকবে না। (মিনহাজ আস-সুন্নাহ : ইবনু তাইমিয়া)

 দ্বিতীয়ত : আত্মতৃপ্তি

আত্মতৃপ্তি মানে এক ধরণের আত্মম্ভরিতা বা অহংকার। এটা কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্মে অহংকার প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মতৃপ্তি রোগে আক্রান- ব্যক্তি নিজেকে অত্যন- সৎ মনে করে, পাক-সাফ ও অন্যের চেয়ে এগিয়ে আছি-এমন একটি ধারণা তার মাঝে সর্বদা কাজ করে। আত্মতৃপ্তি মানুষের আত্মার জন্য একটি ভয়াবহ ব্যধি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :-

ثلاث مهلكات : شح مطاع، وهو متبع، وإعجاب المرء بنفسه. رواه الطبراني في الأوسط : 5452 وحسنه الألباني

তিনটি বিষয় মানুষকে ধ্বংস করে দেয় : অব্যাহত কৃপণতা, নিজ প্রবৃত্তির আনুগত্য, নিজের ব্যাপারে সু-ধারণা পোষণ বা আত্মতৃপ্তি। (বর্ণনায় : তাবারানী)

আত্মতৃপ্তি মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। কারণ এ রোগে আক্রান- ব্যক্তি নিজের ইবাদত-বন্দেগীকে বড় করে দেখে, তার ধারণা, সে স্বয়ং আল্লাহর উপকার করছে, আল্লাহ তাআলা যে নিজ অনুগ্রহে তাকে ভাল পথে চলার সামর্থ দিয়েছেন এ কথা সে ভুলতে বসে। ফলে, সে ইখলাছের সকল বিপদ থেকে অন্ধ হয়ে যায়। তার ইখলাছ অবলম্বনে কি কি বাধা রয়েছে এ সম্পর্কে সে সম্পূর্ন বে-খবরে পরিণত হয়।

আয়েশা রা. কে প্রশ্ন করা হয়েছিল মানুষ কখন খারাপ হয়? তিনি বললেন : যখন মনে করে, সে খুব ভাল, তখন খারাপ হয়ে যায়। (ইহইয়াউ ঊলুম আদ-দীন : আল-গাযালী)

মাছরূক রহ. বলেন : মানুষের আলেম হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে সে আল্লাহকে ভয় করবে। আর জাহেল (মূর্খ) হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে সে আত্মতৃপ্তিতে ভুগবে। (আদ-দুরুল মানসূর : আস-সুয়ূতী)

আত্মতৃপ্তি নামের এ ধ্বংসাত্মক রোগ থেকে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়? কিভাবে এর চিকিৎসা সম্ভব?

নিজের আত্মাকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে হবে, লালন করতে হবে তাকে এবং নিজের প্রতিপালককে চিনতে-জানতে হবে। প্রতিপালকের সাথে নিজেকে চিনতে হবে এভাবে যে, আমার প্রতিপালক কত মহান! তিনি আমার উপর কত অনুগ্রহ করেছেন। আমার মত লক্ষ-কোটি মানুষ রয়েছে, তাদেরকে তাঁর অনুগত হওয়ার সুযোগ দেননি, আমাকে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমার কি কৃতিত্ব আছে? আমি কি ছিলাম? তিনি তাঁর একান্ত অনুগ্রহে আমাকে এ পর্যন্ত আসতে দিয়েছেন। আমি এখন যে সকল সৎ-কর্ম করছি তার সবগুলো কি তাঁর পছন্দ মত করছি? কি নিশ্চয়তা আছে এর?

একদিন মালেক ইবনু দীনারের কাছ দিয়ে মুহাল্লাব ইবনু আবি সাফারাহ বীরের মত হেলে দুলে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার এ অবস্থা দেখে মালেক ইবনে দীনার তাকে বললেন, তুমি কি জানো না যুদ্ধের ময়দানে শক্র সারি ব্যতীত এ রকম হাঁটা ঠিক নয়? মুহাল্লাব উত্তরে গর্ব করে বললেন, তুমি কি চেন না আমি কে? মালেক ইবনে দীনার বললেন, হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভাল করে চিনি। মুহাল্লাব বললেন, তুমি আমার সম্পর্কে কি জানো? মালেক ইবনে দীনার বললেন, তোমার শুরুটা ছিল এক দুর্গন্ধময় বীর্য। তোমার শেষটা হবে একটি পঁচা লাশ। এর মধ্যবর্তী সময়ে তুমি বহন করে চলছ কতগুলো ময়লা-আবর্জনা।

আসলে মানুষ যতই গর্ব ও অহংকার করে থাক না কেন, প্রত্যেকের আসল পরিচয় তো এটাই, যা মালেক ইবনে দীনার রহ. বললেন। তাই, এ ধরণের অনুভুতি জাগ্রত রাখলে গর্ব, অহংকার, আত্মতৃপ্তি নামক রোগ-ব্যধি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

 তৃতীয়ত : নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ :

নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ ইখলাছ অবলম্বনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির অনুসরণ বলতে বুঝায় নিজের মনে যা চায় সেটাই করা বা তার দিকে ঝুঁকে পড়া। নিজের প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে পড়া। প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসেবে নেয়া বলতে এটাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا﴾ أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا﴾ .  الفرقان: 43-44

তুমি কি দেখ না তাকে, যে তার কামনা-বাসনাকে ইলাহ (উপাস্য) রূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার কর্মবিধায়ক হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বুঝে? তারা তো পশুর মতই ; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। (সূরা আল-ফুরকান : ৪৩-৪৪)

আল্লাহ আরো বলেন :-

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ . الجاثية : 23

তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনে-শুনে তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় সীল করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর দিয়েছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আল-জাসিয়া : ২৩)

আল্লাহ আরো বলেন :-

فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنَ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ  . القصص: 50

এরপর তারা যদি তোমার আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখবে তারা তো নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। আল্লাহর পথনির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ যালিম সমপ্রদায়কে পথনির্দেশ করেন না। (সূরা আল-কাছাছ : ৫০)

যে প্রবৃত্তির অনুগত হয়ে পড়ে তার সম্পর্কে আল্লাহর বক্তব্য এমনি পরিস্কার। প্রবৃত্তির অনুগত হওয়া বলতে বুঝায়; যখন যা মনে চায়, তাই করা। তাকওয়া ও পরহেযগারী, হারাম-হালাল, জায়েয-না জায়েয, মাকরূহ-মুবাহ ইত্যাদির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন : যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে প্রবৃত্তি তাকে অন্ধ ও বধির বানিয়ে দেয়, ফলে সে স্থির করতে পারে না যে আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য তার করণীয় কি, আল্লাহ ও রাসূল যাতে সন্তুষ্ট হন সে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারে না, আল্লাহ ও রাসূল যাতে ক্রোধান্বিত হন, তাতে তো তার রাগ জন্মায় না। বরং নিজের সন্তুষ্টি ও নিজের অসন্তুষ্টিই হল তার লক্ষ্য। (মিনহাজ আস-সুন্নাহ : ইবনু তাইমিয়া)

যারা জান্নাতের অধিকারী হবে তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন :

وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى .  النازعات : 40

সে নিজেকে প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত রেখেছে। (সূরা আন-নাযেআত :৪০)

অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ ইখলাছে পরিপন্থী ও নেক আমল বিনষ্টকারী।

উমার ইবনু আব্দুল আযীয রহ. বলেছেন : তুমি এমন হয়ো না যে সত্য যদি তোমার মনপুত হয় তাহলে গ্রহণ করবে আর যদি তোমার মনের বিরুদ্ধে যায় তাহলে বিরোধিতা করবে। এমন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে সত্য গ্রহণ করলে তুমি কোন প্রতিদান পাবে না। এবং বাতিল বর্জন করে শাসি- থেকে বাঁচতে পারবে না। কারণ তুমি যে সত্য গ্রহণ করেছো ও মিথ্যাকে বর্জন করেছো তা তোমার মনের মত হওয়ার কারণে। আল্লাহর জন্য নয়। (শরহু আল-আকীদাহ আত-তাহাবীয়্যাহ)

ইমাম শাতেবী রহ. বলেছেন: প্রবৃত্তির চাহিদায় কোন ভাল কাজও প্রশংসনীয় হতে পারে না। (আল-মুআফিকাত : শাতেবী)

আসলেই প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা একটা মস্তবড় কঠিন কাজ। এ কাজ করতে না পারার কারণেই অনেক ইহুদী ও খৃষ্টান এবং বহু অমুসলিম ব্যক্তি ইসলামকে সত্য বলে অনুভব করার পরেও তা কবুল করতে পারেনি। তারা নিজেদের সমপ্রদায়, দেশ, ধন-সম্পদ বিসর্জন দিতে রাজী হয়েছে কিন্তু প্রবৃত্তির বিরোধিতা করতে রাজী হয়নি। তাদের লক্ষ করেই আল্লাহ বলেছেন :-

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ .الجاثية: 23

তুমি কি লক্ষ্য করেছো তাকে, যে তার খেয়াল-খুশীকে নিজ ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? আল্লাহ জেনে-শুনে তাকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কর্ণ ও হৃদয় সীল করে দিয়েছেন এবং তার চক্ষুর উপর দিয়েছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? (সূরা আল-জাসিয়া : ২৩)

ইমাম শাতেবী রহ. চমৎকার বলেছেন : শরীয়তের বিধি-বিধানের উদ্দেশ্য হল মানুষকে তার প্রবৃত্তির গোলামীকে বের করে আল্লাহর গোলামীতে স্বাধীন করে দেয়া। শরীয়তের পূর্বে সে প্রবৃত্তির বাধ্যগত দাস ছিল ইসলামী শরীয়ত গ্রহণের ফলে সে আল্লাহর স্বাধীন দাসে পরিণত হলো। (আল-মুআফিকাত : শাতেবী)

অতএব যিনি ইখলাছ অবলম্বন করতে চান তার কর্তব্য হল, নিজের সংকল্প ও ইচ্ছাকে দৃঢ় করা, আল্লাহর নিকট উপস্থিতিকে ভয় করা, নিজের প্রবৃত্তিকে বাধা দেয়া। তাহলে স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে জান্নাতের অধিকারী হওয়া যাবে। (আল-ইখলাছ : আল- আশকর)

হাসান বসরী রহ. বলেন : সর্বোত্তম জিহাদ হল প্রবৃত্তির বিরাধিতা। (আদাবুদ্দুনিয়া ওয়াদ-দীন : আল-মাওয়ারেদী)

ইবনুল জাওযী রহ. বলেন : মানুষের কর্তব্য হল, সকল সৎকর্ম করবে আল্লাহকে সন'ষ্ট করার জন্য, আল্লাহকে নিজের সম্মুখে উপস্থিত জেনে ও আল্লাহর নির্দেশ বাস-বায়নের জন্য। যদি এ তিনটি শর্ত পূরণ করে সৎকর্ম বা নেক আমল করা যায়, তাহলে সকল সৃষ্টিজীব তার পক্ষে থাকবে, সকল কল্যাণ তার কাছেই ছুটে আসবে। আর যদি মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রবৃত্তির দাসত্ব করা হয় তবে ফলাফল হবে উল্টো। (তাফসীর ইবনু কাসীর)

 চতুর্থ : সৎকাজে মানুষের প্রশংসা :

মুখলিছ ব্যক্তি সর্বদাই নিজের প্রসার ও প্রচারকে এবং নিজ কাজের সুখ্যাতিকে অপছন্দ করে।

আলী রা. বলেছেন : তুমি প্রসিদ্ধি লাভ করবে এ জন্য কোন কাজ শুরু করবে না। মানুষে তোমাকে স্মরণ করবে এ উদ্দেশ্যে নিজের ব্যক্তিত্বকে উন্নত করবে না। শিখবে ও গোপন রাখবে। নীরবতা অবলম্বন করবে, তাহলে নিরাপদ থাকবে। সৎ-কর্মপরায়ণ লোকদের দেখলে খুশী হবে এবং অসৎ লোকদের দেখলে ক্রোধান্বিত হবে। (তাফসীর ইবনু কাসীর)

তবে হ্যাঁ, মুখলিছ ব্যক্তি যে প্রসিদ্ধি বা মানুষের প্রশংসা পায়, তা অনিচ্ছায় লাভ হয়। সে তা লাভ করার নিয়্যত করেনি। নিজের অনিচ্ছায় কোন সুখ্যাতি বা মানুষের প্রশংসা অর্জন হলে ইখলাছের কোন ক্ষতি হয় না।

হাদীসে এসেছে-

عن ابي ذر رضى الله عنه قال: قيل لرسول الله صلى الله عليه وسلم : أرأيت الرجل يعمل العمل من الخير ويحمده الناس عليه، قال: تلك عاجل بشرى المؤمن .رواه مسلم : 2642

আবু জর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হল, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কি যে কল্যাণকর কাজ করল এবং মানুষ এর জন্য তার প্রশংসা করল? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: এটা মুমিন ব্যক্তির জন্য অগ্রিম সুসংবাদ। (বর্ণনায় : মুসলিম)

 পঞ্চম : রিয়ার ভয়ে নেক আমল ত্যাগ করা :

কোন ব্যক্তি একটি ভাল কাজ করতে মনস্থির করল। ইতিমধ্যে সে খেয়াল করে দেখল কাজটি করলে মানুষ দেখবে ও প্রশংসা করবে। তাই সে রিয়া বা লোক দেখানো ভাবনায় পড়ে যাবে এ আশংকায় কাজটি ত্যাগ করল। এটা শয়তানের আরকেটি কুমন্ত্রণা।

ইবনু হাযম রহ. বলেন : রিয়া ত্যাগ করার ব্যাপারেও শয়তানের চক্রান্ত আছে। তাহল, মানুষের মনে এ ধারণা সৃষ্টি করে দেয়া যে এ ভাল কাজটি করলে লোকেরা দেখবে, এতে তুমি রিয়ার দোষে দুষ্ট হবে। এ ধারণার পর মানুষ ভাল কাজ সম্পাদন থেকে বিরত থাকল। (আল-আখলাক ও আস-সিয়ার : ইবনু হাযম)

শয়তান যদি এমনি একটা পথ খুলে নেয় তাহলে সকল ভাল কাজে এমনি করে বাধা দিতে থাকবে। (আল-ইখলাছ : আল-আশকর)

ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন : যদি কারো নির্দিষ্ট কোন নফল আমল থাকে যেমন চাশতের সালাত, তাহাজ্জুদ-ইত্যাদি তাহলে সে এগুলো আদায় করবে, যেখানেই সে থাকুক না কেন। মানুষ দেখবে, সে রিয়ার মধ্যে পড়ে যাবে-এ ভয়ে ত্যাগ করবে না। কাজেই যে সকল নেক আমল শরীয়ত অনুমোদিত তা কখনো রিয়া হবে এ ভয়ে করে ত্যাগ করা যাবে না। (মাজমু আল-ফাতাওয়া : ইবনে তাইমিয়া)

ফুজাইল রহ. বলেন: মানুষে দেখবে এ ভয়ে ভাল কাজ ত্যাগ করা একটি রিয়া, কেননা মানুষের জন্যই সে কাজটা ত্যাগ করল। আর মানুষ দেখবে এ উদ্দেশ্যে ভাল কাজ করা হল শিরক। আর ইখলাছ হল এ দুটো থেকেই বেঁচে থাকা। (সিয়ার আলাম আন-নুবালা : আয-যাহাবী)

 ইখলাছের পথে যা বাধা নয়

সৎ লোকদের সাথে থাকার সুযোগে নেক আমল করা :

মানুষ যখন কিছু সংখ্যক মুত্তাকী পরহেযগার লোকদের সাথে একত্র হয়ে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী করে তখন কারো কারো মনে এ ধরণের ভাবনা জন্ম নেয় যে, এ কাজটা মনে হয় রিয়ার মধ্যে পড়ে গেল। যদি কাজটা একান্তে সম্পাদন করা হত তা হলে কি ভাল হত না? আসলে ব্যাপারটা এ রকম নয়। জামাআতবদ্ধ থাকলে অনেক সময় অন্যের উৎসাহে বা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক নেক আমল করা যায়, যা একা একা করার সুযোগ হয় না, বা করতে গেলে অলসতায় পেয়ে বসে। তাই বলে এটা ইখলাছের বিরোধী হওয়ার কোন কারণ নেই।

 এক কাজে একাধিক নিয়্যত করা :

একটি নেক আমল করার সময় একাধিক সওয়াবের নিয়্যত করা যেতে পারে। এটাকে বলে তাশরীকুন্নিয়্যাত বা নিয়তের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব। একাধিক নিয়্যত দু ধরনের হয়ে থাকে :

এক. একটি নেক আমল করার মাধ্যমে দুটো সওয়াব অর্জনের নিয়্যত করা যেতে পারে। এতে ইখলাছের পরিপন্থী কিছু নেই। যেমন কেউ জুমুআর সালাতের পূর্বে গোসল করল দুটো নিয়্যতে; বড় নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন ও জুমুআর দিনের গোসলের সওয়াব লাভ। এ দুটো নিয়্যত করা সঠিক হয়েছে। এমনিভাবে কেউ মসজিদে প্রবেশ করে দু রাকাআত সালাত আদায় করল কিন্তু সওয়াবের নিয়্যত করল দুটোর; তাহিয়্যাতুল মসজিদের সালাত ও ফজরের সুন্নাতের সালাত। অথচ সালাত মাত্র একটি। এতে সে দু সালাতের সওয়াব অর্জনের নিয়্যত করলে কোন অসুবিধা নেই। এমনিভাবে আত্মীয়-স্বজনকে দান করে আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করা ও ছদকার সওয়াব লাভ করার নিয়্যত করা যায়। সালাতের পূর্বে মসজিদে অবস্থান করে সালাতের অপেক্ষার সওয়াব ও এতেকাফের সওয়াবের নিয়্যত করতে অসুবাধা নেই।

দুই . একটি নেক আমল করে একটি সওয়াব ও অন্য একটি আমলের নিয়্যত করা। এতেও কোন সমস্যা নেই। যেমন কেউ অজু করল সালাত আদায়ের নিয়্যতে। কিন' সাথে সাথে সে অজুর মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা হবে বা অলসতা কেটে যাবে এ নিয়্যত করল। এতে কোন সমস্যা নেই। এমনিভাবে কেউ হজ্ব করতে গেল। তার নিয়্যত সে হজ্বের সওয়াব অর্জন করবে। সাথে নিয়্যত করল হজ্বে যেয়ে সে কিছু ব্যবসা-বানিজ্য করবে। এতে নাজায়েযের কিছু নেই। মোটকথা, একটি নেক আমল করে একাধিক নেক আমলের সওয়াব অর্জন করার নিয়্যত করা ইখলাছের পরিপন্থী নয়।

 রিয়া বা লোক দেখানো আমল দু ধরনের :

যে সকল আমলে রিয়া হয় তা দু ভাগে ভাগ করা যায়।

এক. এমন নেক আমল যা শুধু মানুষকে দেখানোর জন্য বা শোনানোর জন্যই করা হয়েছে। কর্তা কখনো আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার চিন্তা মাথায় স্থান দেয়নি। শুধু পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে করেছে। এমন ধরনের কাজ মুমিন ব্যক্তি করতে পারে না। যে এমন নিয়্যত করে সে মুনাফিক। মুনাফিকরাই ইবাদত-বন্দেগীসহ অন্যান্য নেক আমল পার্থিব স্বার্থ আদায়ের জন্য করত। এভাবে আমল নি:সন্দেহে বাতিল বলে গণ্য।

দুই. নেক আমল করার সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়্যত করার সাথে সাথে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যও থাকল। এটাও বাতিল। এটাকেই হাদীসে আল্লাহর রাসূল শিরকে খফী বা ছোট শিরক বলে অভিহিত করেছেন। এ আমলের কোন সওয়াব পাওয়া যাবে না।

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :-

. أنا أغنى الشركاء عن الشرك، من عمل عملا أشرك معي فيه غيري تركته وشركه. أخرجه مسلم : 2985

আমি শরীকদের শিরক থেকে মোটেই মুখাপেক্ষী নই। যদি কোন ব্যক্তি কোন আমল করে এবং এতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে তাহলে আমি তাকে ও তার শিরকী কাজকে প্রত্যাখ্যান করি। (বর্ণনায় : মুসলিম, ২৯৮৫)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তাঁর জন্যই সকল নেক আমল ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন ও নিবেদন করার তাওফীক দান করুন।

সমাপ্ত