প্রশংসনীয় গবেষণা

বর্ণনা

বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি প্রশংসনীয় ইজতেহাদ তথা গবেষণা সংক্রান্ত। শরিয়তে ইজতেহাদের অবস্থান, ইজতেহাদের ক্ষেত্র, সাহাবা ও সালাফদের যুগে ইজতেহাদের ধরন-ধারণ, ইজতেহাদকর্মে সালাফদের সতর্কতা ইত্যাদি বিষয় প্রবন্ধটির মূল প্রতিপাদ্য। হাদিসের প্রকারভেদ ও শরয়ি বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তার অবস্থান সম্পর্কেও উক্ত প্রবন্ধে আলোচনা এসেছে।

Download

সম্পূর্ণ বিবরণ

 প্রশংসনীয় গবেষণা

কামাল উদ্দিন মোল্লা

 الاجتهاد المحمود

كمال الدين ملا

প্রশংসনীয় গবেষণা

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ ﴿78﴾ فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا آَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ ﴿79﴾

আর স্মরণ কর দাউদ ও সুলায়মানের কথা, যখন তারা শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল। যাতে রাতের বেলায় কোন কাওমের মেষ ঢুকে পড়েছিল। আর আমি তাদের বিচার কাজ দেখছিলাম।  ৭৯. অত:পর আমি এ বিষয়ের ফয়সালা সুলায়মানকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আর আমি তাদের প্রত্যেককেই দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমি পর্বতমালা ও পাখীদেরকে দাউদের অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাউদের সাথে আমার তাসবীহ পাঠ করত। আর এসবকিছু আমিই করছিলাম। আম্বিয়া:৭৮-৭৯

এখানে আল্লাহ তাআলা সুলায়মান আলাইহিস সালামকে বোধশক্তি দ্বারা বিশেষিত করেছেন এবং তাদের উভয়ের বিদ্যা  ও জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন।

গবেষক তার গবেষণার ফলে পূন্য লাভ করবেন

বুখারী ও মুসলিম শরীফে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত

أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إذا اجتهد الحاكم فأصاب فله أجران، وإذا اجتهد فأخطأ فله أجرٌ

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন হাকিম সঠিক ইজতেহাদ করে, তখন তার জন্য দু’টি প্রতিদান থাকে। আর ইজতেহাদে ভুল করলে একটি প্রতিদান পাবে। এ হাদিসে মুজতাহেদ ভুল করলেও প্রতিদানের কথা পরিস্কার বর্ণনা করা হয়েছে। এটা তার যথাসাধ্য চেষ্টার ফল। সুতরাং তার ভুল মার্জনীয়। কেননা, প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ  হুকুমে নির্ভুল তত্ত্ব পাওয়া অসম্ভব অথবা কঠিন।

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ

দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি। হজ: ৭৮

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

আল্লাহ তোমাদের সরল ও সহজ কামনা করেন, বক্র ও কঠিন কিছু কামনা করেন না বাকারা. ১৮৫

বনু কুরাইজার গ্রামে আছরের সালাত

বুখারী ও মুসলিম শরীফে রাসূল  সাল্লাম হতে বর্ণিত আছে, তিনি খন্দকের যুদ্ধের দিন সাহাবাদের বলেন, বনি কোরায়জার গোত্রে না পৌছানো অবধি কেউ আছরের সালাত আদায় করবেন না। কিন্তু পথে যখন আছরের সালাতের সময় হয়ে গেল, তখন কিছু সংখ্যক সাহাবা বললেন, আমরা বনি কোরায়জা ছাড়া সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন তার ইচ্ছা এটা নয়, বরং পথে সালাত আদায় করে নাও। তাই মতভেদের জন্য দুই দলের কাউকেও দোষ দেয়া যায় না। কেননা, প্রথম দলের সাহাবাগণ রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্যকে সাধারণভাবে গ্রহণ করেছেন। অন্য দলীয় সাহাবাগণ এ অবস্থা সাধারণ হুকুমের আয়ত্বাধীন মনে না করায়, অবশ্যম্ভাবীকরণের দলিল পেশ করেছেন। হাদিসের উদ্দেশ্য হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদেরকে ঘেরাও করেছেন, তাদের কাছে দ্রত পৌঁছানো।

ফকীহগণের মধ্যে এটা একটি বিরোধপূর্ণ প্রসিদ্ধ মাসআলা যে, কিয়াস দ্বারা অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্ট করা যাবে কিনা? এতদসত্বেও যারা পথে সালাত আদায় করছেন তারা ঠিক কাজই করেছেন।

বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা

এরূপভাবে বেলাল রা. যখন দুই ছা’ (صاع ) প্রায় পৌনে দুই সের ওজন বিশেষ খেজুর এক ছা- এর পরিবর্তে বিক্রি করলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওটা ফেরত দেয়ার আদেশ দিলেন। বুখারী ও মুসলিম

এজন্য বেলাল রা. ফেসক, লানত কিংবা কঠোরতার সম্মুখীন হননি। কেননা, এটা হারাম হওয়া সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

আদী_বিন হাতিম তাই রা. ঘটনা

এরূপভাবে আদি বিন হাতেম রা. এবং সাহাবাগণের এক জামায়াত কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন

حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود

যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো দাগ হতে সাদা দাগ পরিদৃষ্ট হয়।

خيط ابيض و اسود  এর অর্থ সাদা ও কালো রশি মনে করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বালিশের নিচে সাদা কালো দুইটি সুতা রাখতেন। দুইটি সুতার মধ্যে একটি অপরটি হতে স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত তারা সাহরী খেতেন।

তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামআদি বিন হাতিম রা. কে বললেন:

إنَّ وِسَادَكَ إذنْ لَعَرِيضُ، إنَّما هُو بَيَاض النَّهارِ وَسَوَدُ الليلِ

যদি সাদা ও কালোর অর্থ সুতা হয়ে থাকে, তা হলে তোমার বালিশ বেশ প্রসস্ত!  বরং তার অর্থ দিনের আলো এবং রাতের অন্ধকার: বুখারী ও মুসলিম।

ওতে  একথার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, তারা আয়াতের ভাবার্থ বুঝতে সক্ষম হননি। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দ্বিতীয়বার সিয়াম পালন করার নির্দেশ দেননি এবং রমজানের দিবসে তাকে সিয়াম পরিত্যাগ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেননি, যদিও সিয়াম ত্যাগ করা মারত্মক কবীরা গুনাহ।

আহত সাহাবীর গোসলের ঘটনা

উল্লেখিত মাসআলার বিপরীত হলো আহত ব্যক্তির শীতের মধ্যে গোসলের ফতোয়া: জাবের রা. হতে বর্ণিত আছে, প্রচণ্ড শীতের সফরে কোন একজন সাহাবী আহত হলেন, তারপর তার স্বপ্নদোষ হলে তিনি উপস্থিত সাহাবাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,  আমি কি গোসল করবো, না তায়াম্মুম করবো? তদুত্তরে সাহাবারা প্রচণ্ড শীতে তাকে গোসলের ফতোয়া দিলেন। গোসলের দরুন ঐ সাহাবা মৃত্যুমুখে পতিত হন। এ সংবাদ মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকাছে পৌছালে তিনি বললেন, তারা তাকে হত্যা করেছে, আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করুন।  যখন তারা মাসআলা  সম্পর্কে অবহিত ছিলনা, তখন তারা কেন জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলো না? বস্তুত: জিজ্ঞেস করাই অজ্ঞতার মুক্তি। আবু দাউদ। ঐ সকল লোক ইজতেহাদ ব্যতিরেকেই ভুল করেছিলেন। কেননা, তারা আহলে ইলম ছিল না।

উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর  ঘটনা

এরূভাবে ওসামা বিন জায়েদ রা.  জুহাইনা গোত্রের হুরাকাত যুদ্ধে যখন কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠকারীকে হত্যা করেন, তখন তার উপর দিয়ত বা কাফ্ফারা কিছুই ওয়াজিব হয়নি। কেননা, ওসামার রা. ধারণা ছিল যে, এরূপ সংকটময় মুহুর্তের ইসলাম গ্রহণ যোগ্য নয়, তাকে হত্যা করা জায়েয, যদিও মুসলিমকে কতল করা হারাম কাজ। বুখারী

সালফে সালেহীন ও অধিকাংশ ফকীহদের ব্যাপক তাবিলের মাধ্যমে বিদ্রোহীগণ ন্যায়পরায়নগণকে হত্যা জায়েয মনে  করলে কেছাছ, কাফ্ফারা বা দিয়ত দিতে হবে না। যদিও মুসলিমদেরকে হত্যা করা ও তাদের সাথে যুদ্ধ করা হারাম।

শাস্তি প্রযোজ্য হবার যে সব শর্ত আমরা উপরে বর্ণণা করেছি, প্রত্যেক কথায় এর উল্লেখ জরুরী নয়। কেননা,  এই সম্পর্কীয় জ্ঞান হৃদয়ে বিরাজমান। যেমন আমলের প্রতিদানের ওয়াদার জন্য শর্ত হলো খালেছভাবে আল্লাহর জন্য আমল করা এবং মুরতাদ হওয়ার কারণে আমল বরবাদ না হওয়া। অবশ্য এই শর্তটি প্রত্যেক নেক কাজের প্রতিদানের ওয়াদাপূর্ণ হাদিসেই উল্লেখ করা প্রয়োজন নয়।

অত: পর  বলতে হয় যেখানে শাস্তি প্রতিষ্ঠার অনিবার্য বিষয়সমূহ নির্ধারণ করা হয়েছে, কখনও ঐ শাস্তির হুকুম প্রতিবন্ধকতার কারণে রহিত হয়ে থাকে।

নিম্ন লিখিত কারণে নির্ধারিত শাস্তিও প্রযোজ্য হয় না

1.     যদি কেউ তওবা করে

2.     আল্লাহর দরবারে গুনাহ ক্ষমা করে দেয়ার প্রার্থনা করে

3.     এমন সৎকাজ করে যা দ্বারা গুনাহ মুছে যায়

4.     দুনিয়ায় বালা মুছিবত

5.     গৃহীত সুপারিশকারীর সুপারিশ বা শাফায়াত

6.     পরম করুণাময় আল্লাহর রহমত

যখন উল্লেখিত সমস্ত উপরণগুলির অনুপস্থিতি ঘটে, তখন আজাব বা শাস্তি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। অবশ্য, উল্লেখিত উপকরণগুলির অনুপস্থিতি শুধু ঐ সমস্ত লোকের পক্ষে হয়ে থাকে, যারা সীমালঙ্ঘনকারী, নাফরমান অথবা প্রভুর সীমা হতে  পলায়নরত জন্তুর ন্যায়।

আল্লাহর সীমা হতে পলায়নকারী কোন অশোভনীয় কাজের পরিণামে যে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে তার অর্থ এই যে, ঐ কাজটি হারাম এবং গর্হিত।

অতএব, যে ব্যক্তি এমন কাজে লিপ্ত হবে সে ব্যক্তি শাস্তির সম্মুখীন হবে।

 যেমন কারণ (سبب)  পাওয়া গেলে কারণকৃত বস্তুর (مُسَبَّبٌ)  উপস্থিতি অপরিহার্য এ কথা বলা একেবারে বাতিল বা অমূলক। কেননা, কারণকৃত বস্তুর (مُسَبَّبٌ) প্রাপকের জন্য ওর শর্ত পাওয়া অপরিহার্য। শর্ত বিদ্যমান না থাকলে কারণকৃত বস্তু পাওয়া যাবে না। শাস্তি প্রযোজ্যের জন্য আরও শর্ত হলো সকল প্রকারের প্রতিবন্ধকতা না থাকা।

 আলোচনার বিষয়ে  আরো পরিস্কার করে বললে বলতে হয় কোন ব্যক্তি হাদিসে আমল না করলে তা তিন প্রকারের বহির্ভূত নয়

১ম প্রকার

হয়তবা এই পরিত্যাগ মুসলিমের সম্মিলিত রায় অনুযায়ী জায়েয। যেমন: যার কাছে হাদিস পৌঁছেনি এবং ফতোয়া বা হুকুমের প্রতি প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও হাদিস সন্ধানে ত্রুটি করেনি, তার জন্য হাদিস ত্যাগ করা। এ অবস্থায় হাদিস পরিত্যাগকারী গুনাহগার হবে না। এ বিষয়ে কোন মুসলিম সন্দেহ করতে পারে না।

২য় প্রকার

না জায়েযভাবে হাদিসটি ত্যাগ করা। এরূপ পরিত্যাগ ইমামগনের পক্ষ হতে কখনও হতে পারে না।  ইনশা আল্লাহ।

৩য় প্রকার

আলেমের পক্ষ হতে এরূপ আশংকা করা হয়ে থাকে, যেমন: কোন আলেম উক্ত মাসআলার হুকুম বুঝতে অক্ষম।  এমতাবস্থায়, চিন্তার শেষ প্রান্তে পৌছার পূর্বই দলিল দ্বারা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও নিজ রায় প্রদান করেন, কিংবা অভ্যাসজনিত বস্তু বা কোন উদ্দেশ্য তার উপর জয়লাভ করে, যার ফলে সে ঐ বিষয়ে পূর্ণ চিন্তা ভাবনা হতে অপারগ থাকেন। ফলে তিনি যে ফতোয়া প্রদান করেন, তার বিপরীত দলিলও পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, ঐ ব্যক্তি যে রায় প্রদান করেছে, তা শুধু তার ইজতেহাদের দলিলের উপর ভিত্তি করেই। কিন্তু ইজতেহাদের যে প্রান্তসীমা প্রয়োজন, মুজতাহিদ কখনও কখনও সেই পর্যায়ে পৌছাতে অক্ষম থাকেন।

ফতোয়া প্রদানে সলফে সালেহীনদের সাবধনতা

এ কারণেই সলফে সালেহীন ফতোয়া প্রদান করতে ভয় করতেন। এজন্যে যে, বিশেষ মাসআলার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় শ্রম ও ইজতেহাদ নাও হতে পারে। উল্লেখিত বিষয়গুলি নি:সন্দেহে গুনাহের কাজ। কিন্তু গুনাহের শাস্তি কাউকে ঐ সময় দেয়া হয়, যখন সে তওবা করে না। তবে ইসতেগফার, ইহসান, বালা-মুসিবত, শাফায়াত ও রহমতের দ্বারা গুনাহ মুছে যায়।

এখন ঐ ব্যক্তির কথা বাকী থাকে যে, প্রবৃত্তির দাস ও রিপুর আজ্ঞাবহ এবং বাতিলকে সাহায্য করে।  এমতাবস্থায় সে জানে যে, উহা বাতিল অথবা যে ব্যক্তি দৃঢ়তার সাথে কোন বিষয়ের পক্ষপাতিত্ব করে অথবা রদ করে, অথচ তার কাছে হ্যা বোধক বা না বোধক কোন দলিল মওজুদ নেই। এই ব্যক্তিদ্বয় অবশ্যই জাহান্নামী হবে।

القضاة ثلاثة: قاضيان في النار، وقاض في الجنة فأما الذي في الجنة فرجل علم الحق فقضي به، وأما اللذان في النار: فرجل قضى للناس على جهل، ورجل علم الحق وقضى بخلافه. رواه ابو داودو ابن ماجة

তিন ধরণের বিচারক আছে। দুই প্রকারের বিচারক জাহান্নামে এবং এক প্রকারের বিচারক জান্নাতে যাবেন।যিনি জেনে শুনে বিচার করেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। আর দুই প্রকার বিচারক যারা জাহান্নামে যাবে: তাদের মধ্যে একজন হলো যে না জেনে বিচার করে, অন্যজন হক ও ন্যায় জানা সত্ত্বেও তদনুযায়ী বিচার করে না।

কাজীদের ন্যায় মুফতিগণও হয়ে থাকেন। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য শাস্তির প্রযোজ্য না হওয়ার কতিপয় কারণ আছে, যা আমরা উল্লেখ করেছি।

যদি ধরে নেয়া যায় যে, উম্মতের কাছে প্রশংসিত ও প্রসিদ্ধ কোন আলেমের কোন যায়  এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়, যদিও এটা অসম্ভব বা অবান্তর, তবে মনে করতে হবে উল্লেখিত কারণগুলির কোন একটি তাদের মধ্যে অবশ্যই ছিল। যদিওবা এরূপ হয়ে থাকে, তবুও সাধারণভাবে তাদের ইমামতির মধ্যে কিছুতেই দোষ দেয়া যায় না।

ইমামগণের পদ  মর্যদা

ইমামগণের নির্ভুলায় আমরা বিশ্বাস করি না, বরং তাদের ভুল কিংবা গুনাহে পতিত হওয়া সম্ভব। তা সত্ত্বেও আল্লাহ

তাদেরকে আমল করার এবং হাদিসের অবস্থা সম্পর্কে জানার  জন্য বিশেষিত করেছেন। অধিকন্তু তারা বারবার গুনাহে পতিত হন না। তবে তারা সাহাবা অপেক্ষা উচ্চাসানে সমাসীন নন।

তদ্রুপ যারা ফতোয়া বিচার এবং সাহাবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ইত্যাদির ব্যাপারে ইজতেহাদ করেছেন, তাদের সম্পর্কেও একই কথা।

এতটুকু আমরা জানার পরও বলবো তাদের মধ্যে হাদিস পরিত্যাগকারী মাযুর বা  অপারগ, বরং প্রতিদান প্রাপক। এর পরও আমাদেরকে নিষেধ করতে পারবে না  সহীহ হাদিসের অনুসরণে। আমাদের বিশ্বাস যে, সহীহ হাদিসের উপর আমল এমন বিষয় যাতে কোন মতানৈক্য নেই এবং এর উপর উম্মতের আমল করা এবং তা প্রচার করাও ওয়াজিব। এ কথার মধ্যে আলিমগণের  কোন মতবিরোধ নেই।  

হাদিসের প্রকারভেদ

1.           প্রথম প্রকার হাদিস যা ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে অকাট্যতার ইংগিত বহন করে। এই হাদিসের সনদ ও মতন নির্ভুলভাবে বর্নিত হয়েছে, যে সম্পর্কে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলেছেন এবং হাদিসের এই অবস্থার দ্বারা এই ইচ্ছা করেছেন।

2.           অন্য প্রকার হাদিসের ইসারাগুলি স্পষ্ট কিন্তু তা অকাট্য নয়।

প্রথম প্রকারের হাসিদ সম্পর্কে জানা এবং তদুনাযায়ী আমল করা ওয়াজিব। এতে আদৌ মতবিরোধ নেই। অবশ্য কোন কোন হাদিসের সনদের সরলতা ও দুর্বলতার ভিত্তিতে আলেমদের মধ্যে মত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে , যে, হাদিসটি অকাট্য ইংগিতবহ কি না? যেমন, খবরে ওয়াহেদের ব্যাপারে। এক জামায়াতের মতে খবরে  ওয়াহিদ গ্রহণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য। অন্য জামাআতের মতে আমল করা আবশ্যক নয়। অধিকাংশ ফকীহদের মতে এবং অধিকাংশ মুসলিম দার্শনিকের মতে খবরে ওয়হিদ সুনিশ্চিত ইলমের উপকারিতা দেয়। অন্য একদল দার্শনিকের মতে খবরে ওয়াহিদ ইলমের উপকারিতা দেয় না।

এরূপভাবে, যে সমস্ত খবর বিশেষ বিশেষ লোক কর্তৃক বিভিন্ন পন্থায় বর্ণিত হয়েছে, এবং একটি অপরটিকে সত্যায়িত করে, এমতাবস্থায় এই খবরে ওয়াহিদ ঐ ব্যক্তির জন্য দৃঢ় ইলমের ফায়দা দিবে, যিনি বণির্ত পন্থা, খবর দাতাগণের অবস্থা এবং খবরের পূর্বাপর ও পরিশিষ্ট সম্পর্কে জ্ঞাত। আর যারা উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে অবগত নয়, তাদের জন্য এই খবর দ্বারা ইলমের ফায়দা হবে না। এ কারণেই হাদিস শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন লোকগণ খবরে ওয়াহেদ দ্বারা পূর্ণ ইলমে ইয়াকিন লাভ করে থাকেন, যদিও অন্যান্য আলেমগণ সত্য তথ্যের অভাবের কারণে কখনো এটাকে সত্য বলে মনে করে না।

হাসিদ কখন ইলমের ফায়দা দেয়

নিম্ন লিখিত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে কোন কোন হাদিসে ইলমের ফায়দা হয়ে থাকে।

1.                             কখনও খবর দাতার আধিক্যে

2.                             কখনও খবর দাতাগণ বিশেষ গুণে গুণান্নিত হওয়ায়।

3.                             কখনও হাদিসের ঘটনা এরূপভাবে বর্ণনা করা হয় যাতে শ্রোতাদের বিশ্বাস জন্মে।

4.                             আবার কখনও খবরদাতা নিজেই এর সাক্ষী হয়।

5.                             কখনও খবরদাতার নির্দেশের ভিত্তিতে তা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

যাদের খবর দ্বারা জ্ঞানের উপকার হয় তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম। কেননা, তাদের আমানত, ধর্মে আস্থা ও আল্লাহভীরুতার ফলে তাদের পক্ষে হতে মিথ্যা বলার অবকাশ থাকে না।  আর যাদের খবর দ্বারা জ্ঞানের উপকার হয় না তাদের সংখ্যা অনেক বেশী। এটা অধিকাংশ ফকীহ, মোহাদ্দেস এবং একদল কালাম শাস্ত্রবিদদের স্বত:সিদ্ধ রায়।

কোন কোন শাস্ত্রবিদ ও ফকীহগণের অভিমত এই যে, কোন বিশেষ সংখ্যক লোকদের দ্বারা কোন ব্যাপারে ইলমুল ইয়াকীন বা দৃঢ় ইলম প্রমাণিত হলে অন্যান্য ঘটনা সমূহে তাদের কথা দৃঢ় ইলমের ফায়দা দেবে।  ইহা একান্তই বাতিল ও অমূলক ধারণা। ইহার বিস্তারিত বর্ণনা এখানে সম্ভব নয়।

  ঐ সমস্তু আছার ও কারণ যা বর্ণনাকারীর স্বত্তার বর্হিভূত, তাও উপকারী তবে তা এখানে উল্লেখ করব না। এই জাতীয় আছার ও কারণগুলি হাদিস শাস্ত্র ছাড়াও উপকারী বিদ্যা। এজন্য উহাকে খবরের অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। তা কখনও অকাট্য হয় আবার কখনও সন্দেহযুক্ত হয়। আবার কখনও ঐ দুটি آثار وقرائن মিলে ইলমুল ইয়াকীন বা দৃঢ় ইলমের উপকারিতা দেয়। আবার কখনও একটি অকাট্য ইলম দ্বারা অন্য একটি সন্দেহযুক্ত ইলমের উপকারিতা হাসিল হয়।

মূল কথা এই যে, হাদিস সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞাত ব্যক্তি কোন কোন হাদিসের শুদ্ধতা ও সত্যতা সম্পর্কে অকাট্য ফায়সালা দিতে পারে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ঐ বিষয় বেশী অভিজ্ঞ নয়, সে কোন হাদিসের শুদ্ধতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত ও অকাট্য রায় দিতে পারে না।

কখনও কখনও আলেমগণের মধ্যে এজন্য মতেবিরোধ দেখা যায় যে এ হাদিসটি قطعي الدلالة অনিবার্য ইংগিত বহন করে কিনা? এই মতবিরোধের ভিত্তি হল ঐ হাদিসটি نص বা দলিলের পর্যায়ভুক্ত নয় বরং ظاهر বা স্পষ্টতার পর্যায়ভুক্ত। যখন হাদিসটি ظاهر স্পষ্ট হয়, তখন গৌণ দিকগুলি  احتمال المرجوح না অর্থবোধক হবে কি হবে না এ সম্পর্কেও মতানৈক্য রয়েছে। এটি একটি বিশাল অধ্যায়।

একদল আলেম কোন কোন হাদিসকে قطعي الدلالة সুনিশ্চিত ইংগিতবহ হিসেবে গ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ এর বিপরীত মনোভাব পোষণ করেন। যারা সুনিশ্চিত ইংগিতবহ মনে করেন, তাদের মতে এ হাদিসটি শুধু একটি নির্দিষ্ট অর্থই বহন করে এবং অন্য অর্থের অবকাশ রাখে না। অথবা অন্যান্য দলিলসমূহ যদ্বারা হাদিসটি সুনিশ্চিত ইংগিতবহ মনে হয়।

কারও মতে শাস্তির হাদিস قطعي বা অকাট্য না হলে ওতে আমল প্রযোজ্য নয়

দ্বিতীয় প্রকার অর্থাৎ হাদিসটি স্পষ্ট ظاهر  হলে নির্ভরযোগ্য আলেমগণের মতে শরিয়তী আহকামের ব্যাপারে আমল করা ওয়াজিব। যদি এই হাদিসটি হুকমে ইলমী সম্পর্কিত  হয়। যেমন শাস্তির ব্যাপারে হয়, তবে তাতে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ পরিদৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় কতিপয় ফকীহর মত হল খবরে ওয়াহেদ خبرواحد এর বর্ণনাকরী যখন ন্যায়বান ও নির্ভরযোগ্য হবে এবং উহা কোন কাজের শাস্তি সম্পর্কিত হবে , তখন ঐ হাদিসে আমল করা ওয়াজিব। অর্থাৎ কাজটি হারাম জ্ঞান করতে হবে। তবে শাস্তির উপর আমল শুধু ঐ সময়ই হবে, যখন হাদিসটি অনিবার্য ইংগিত বহন করে। যদি হাদিসের متن বা মূল হাদিস قطعي  অকাট্য হয় এবং উহার دلالة ইংগিত স্পষ্ট হয় তখনও তাতে আমল করা ওয়াজিব।

এর ভিত্তিতেই আবু ইসহাক আল সুবাইর স্ত্রী সম্পর্কিত আয়িশার রা. কথাকে গন্য করা হয়েছে। কথাটি হল

أبْلِغِيْ زَيْدَ بْنِ أرْقَمَ، أنَّهُ قَدْبَطَلَ جِهَادَهُ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إلا أن يَتُوبَ.رواه دارقطني

অর্থাৎ জায়েদ বিন আরকামকে জানিয়ে দাও যে, রাসূলের সা. সাথে তার জিহাদের সওয়াব বাতিল করা হয়েছে, তবে হ্যাঁ তওবা করলে বাতিল হবে না।

বিস্তারিত ঘটনা এই যে, আবু ইসহাকের স্ত্রী জায়েদ বিন আরকাম আনসারীর রা. নিকট বাকীতে আটশত দিরহামের বিনিময়ে একটি গোলাম বিক্রয় করে। তৎপর জায়েদ বিন আরকাম ঐ গোলামটি বিক্রয় করতে চাইলে আবু ইসহাকের স্ত্রী তাকে ছয়শত দিরহামে ক্রয় করে । এ সংবাদ আয়িশার র. নিকট পৌছলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, জায়েদ বিন আরকামের রাসূলের সাথে জিহাদের সাওয়াব বাতিল হয়েছে। অবশ্য তওবা করলে সাওয়াব বাতিল হবে না।

আলেম সম্প্রদায়ের কথা এই যে, আয়িশা রা. জায়েদ বিন আরকামের রা. জিহাদ বাতিল হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। কেননা, তিনি সে সম্পর্কে সম্পুর্ণ অবহিত ছিলেন। সুতরাং, সেই জাতীয় ক্রয়-বিক্রয়  হারাম হওয়া সম্পর্কে আয়িশার রা. হাদিসে আমল করা হবে। যদি ও আমরা ঐ শাস্তির কথা বলি না যে, জায়েদ বিন আরকামের জিহাদ বাতিল হয়ে গেছে। কেননা সেই হাদিসটি খবরে ওয়াহেদ এর সমপর্যায়।

তাদরে দলিল এই যে, শাস্তি নির্ধারণ অকাট্যতা সম্পর্কিত ব্যাপার।  সুতরাং এটা অকাট্য দলিল দ্বারাই প্রমাণিত হবে, যার দ্বারা দৃঢ় ইলম হাসিল হয়। এতদসত্ত্বেও কাজটি যখন হুকুমের মধ্যে ইজতেহাদমূলক হয়, তখন তার সাথে কর্তার সাথে শাস্তি সম্পৃক্ত হবে না। তাদের কথানুযায়ী শাস্তি সম্পর্কীয় হাদিস দ্বারা কাজের হারাম হওয়ার দলিল হয় । কিন্তু অকাট্য প্রমাণ ছাড়া শাস্তি প্রযোজ্য হয় না।

মুসহাফে ওসমানীতে অসম্পূর্ণ কিরাতের দ্বারা দলিল পেশ করা

উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, আলেমগণ এমন কতকগুলি অপ্রসিদ্ধ কিরায়াত দ্বারা দলির পেশ করেছেন যা কোন কোন সাহাবা হতে সহীহ বলে বর্ণিত আছে। অবশ্য ঐ কিরায়াত  مصحفُ عثماني  বা ওসমান রা. কর্তৃক লিপিবদ্ধ কুরআন নেই। কেননা, এসব কিরায়াতগুলি ইলম ও আমলের ইংগিত বহন করে এবং সেটা সঠিক খবরে ওয়াহেদ। আলেমগণ তার দ্বারা আমলের দলিল প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু সেটাকে কুরআনের অংশ হিসেবে গণ্য করেননি। কেননা, কুরআনের অংশ প্রমাণ করতে হলে অকাট্য দলিলের প্রয়োজন।

হাদিস দ্বারা শাস্তি প্রতিষ্ঠা

সলফে সালেহীন এবং অধিকাংশ ফকীহগণের মতে এসব হাদিসগুলোতে যে শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, তা যথার্থ দলিল হিসেবে গৃহিত হবে। কেননা, সাহাবাগণ এবং পরবর্তী সময় তাবেয়ীনগণ সর্বদাই শাস্তি নির্ধারণের হাদিস দ্বারা দলিল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তা কাজে পরিণত করেছেন এবং আমলকারীর উপর শাস্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এর সার্বিক ও বিশদ বিবরণ ও দিয়েছেন। তাদের হাদিস ও ফতোয়ার এই জাতীয় মতামতগুলো ছড়িয়ে আছে।

এটা এজন্য যে, শাস্তিও শরিয়তের হুকুমের অন্তর্ভূক্ত এবং শরিয়তের হুকুম অকাট্য দলিল দ্বারা আবার কখনও স্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কেননা, শাস্তির বিধান দ্বারা পূর্ণ বিশ্বাস উদ্দেশ্য নয়, বরং এমন বদ্ধমূল ধরণা যা বিশ্বাসের অন্তর্ভূক্ত কিংবা প্রধান্যপূর্ণ ধারণা। যেমন, আমল সম্পর্কিত হুকুমে হয়ে থাকে। যেমন, মানুষের এই ধারণা করা যে, আল্লাহ সেগুলি হারাম করেছেন এবং ঐ হারাম কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে সংক্ষিপ্ত ভীতি প্রদর্শন করেছেন। আর এমন ধারণা করা যে, আল্লাহ এটা হারাম করেছেন কিংবা তার জন্য নির্দিষ্ট শাস্তির ওয়াদা করেছেন। এই উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা, উভয় প্রকার শাস্তিই নির্ধারিত ও অনির্ধারিত আল্লাহর পক্ষ হতে।  এবং এর খবরদাতা আল্লাহর পক্ষ হতে খবর দিয়েছেন। সুতরাং প্রমাণ হিসেবে প্রথম ব্যাপারে খবর দেয়া জায়েয। বরং যদি কেউ বলে: শান্তির ব্যাপারে এর উপর আমল করাই অধিক যুক্তিপূর্ণ, তবে সে কথা সঠিকভাবে জানতে হবে। এই জন্যই শরিয়তের আহকামপূর্ণ হাদিসে সনদের ব্যাপারে ততটা সতর্কতা অবলম্বন করতেন না। কেননা, শাস্তির ধারণা প্রবৃত্তিকে শাস্তিমূলক কাজ হতে বিরত থাকতে শিক্ষা দেয়। যদি হাদিসে বর্ণিত শাস্তিটি সত্য হয় তবে লোকটি মুক্তি পেল। আর যদি শাস্তি সত্য না হয় বরং কাজের পরিণতি প্রযোজ্য শাস্তির চেয়ে হালকা হয়, তবে লোকটির কোন ক্ষতি হল না। কিন্তু শর্ত হলো সে ঐ কাজটিকে ক্ষতিকর মনে করে পরিত্যাগ করবে।

মূল কথা এই যে, যদি কোন ব্যক্তি ভুলবশত: কোন কাজের শাস্তির পরিমাণ কম ধারণা করে তবে ক্ষতির কারণ হবে। কেননা, কাজের পরিণামে আসল শাস্তি কম ধারণা করলে  সে ঐ কাজে লিপ্ত হতে পারে। এভাবে অতিরিক্ত শাস্তি সম্পর্কে হ্যাঁ বোধক বা না বোধক ধারণা না রাখে, তা হলেও ভুল করল। শাস্তি সম্পর্কিত এই ভুল ধারণার পরিণতি এই যে, কখনও ঐ ব্যক্তি ঐ কাজকে সাধারণ মনে করে তাতে লিপ্ত হতে পারে। ফলে সে অধিকতর শাস্তির সম্মুখীন হবে । যদি ঐ কাজের জন্য এই শাস্তি প্রযোজ্য হয়ে থাকে, তবে বলা যেতে পারে যে, শাস্তি সম্পর্কিত ভুল ধারণা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর। কিন্তু শাস্তির উপর বদ্ধমূল ধারণা রাখা আজাব হতে পরিত্রাণের উপায় এবং এটা জ্ঞানসংগত কথা। সুতরাং এ ক্ষেত্রটিই অধিকতর শ্রেয়।

হারামের দলিলের প্রাধান্য

উল্লেখিত বর্ণনা অনুযায়ী, অধিকাংশ আলেম হারামের দলিলটিকে হালালের দলিলের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই বহু ফিকাহ শাস্ত্রবিদ শরিয়তের আহকামের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতেন।

কোন কাজ সম্পাদনে সাবধানতার ব্যাপারে এবং তার ভাল মন্দ হওয়ার ব্যাপারে জ্ঞানীরা একমত। হ্যাঁ, যদি কোন ব্যক্তির মনে এই সন্দেহ জাগে যে, এই শাস্তি সত্য কি অসত্য, তা হলো হ্যাঁ বোধকের দিকটি না বোধকের উপর প্রাধান্য পাবে।

 কোন লোকের এরূপ বলা ঠিক হবে না যে, শাস্তির জন্য অকাট্য  দলিল না থাকা শাস্তি প্রযোজ্য না হওয়ার প্রমাণ। যেমন, কুরআনের অতিরিক্ত কিরায়াতের জন্য خبرُمتواترُ খবরে মুতাওয়াতের না থাকা ঐ কিরাআতগুলো শুদ্ধ না হওয়ার দলিল । কথকের এই কথা ঠিক নয়। কেননা, দলিল না থাকা দলিলকৃত বস্তু না থাকা বুঝায় না।

যে ব্যক্তি ইলম বিষয়ক কাজে তার অস্তিত্বের অকাট্য দলিল না থাকার কারণে ঐ বস্তুকে ছিন্ন করে, সে প্রকাশ্য ভুলে লিপ্ত। অবশ্য কালাম শাস্ত্রবিদদের একদল এরূপ করে থাকেন।

কিন্তু যখন আমরা জানতে পারি, কোন বস্তুর অস্তিত্ব এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে, অনিবার্যভাবে তার দলিল পাওয়া যাবে। সুতরাং যখন জানলাম দলিল নেই, অতএব বুঝা গেল বস্তুটিও একেবারেই অস্তিত্বহীন। কেননা, অনিবার্য না হওয়াই অনিবার্য বস্তু না হওয়ার প্রমাণ। আর আমরা এও জানতে পেরেছি যে, আল্লাহর কিতাব ও তার দ্বীন প্রচারের যথেষ্ট উপকরণ রয়েছে। মুসলিমদের জন্য সেটার কোনটি গোপন বা রহস্যাবৃত রাখা উচিত নয়। কেননা, মানব সমাজের জন্য তা অতীব প্রয়োজনীয়। আর সেগুলো মুসলিম উম্মতের জন্য সাধারণ দলিল স্বরূপ।

উহারণ স্বরূপ বলা যায় যে, ইসলাম ধর্মে যখন ছয় ওয়াক্তসালাত সম্পর্কে কোন বর্ণনাই নেই, এভাবে কুরআনে বর্ণিত সূরাগুলি ছাড়া নতুন কোন সূরা বর্ণনা নেই। এতে প্রতীয়ামন হয় যে, ইসলামে ছয় ওয়াক্ত ফরজ সালাতও নেই এবং কুরআনে বর্ণিত  সূরা ছাড়া অন্য কোন সূরাও নেই।

কিন্তু শাস্তি প্রযোজ্য অধ্যায়টি এই অধ্যায়ের অন্তর্ভূক্ত নয়। কেননা, প্রত্যেক কাজের শাস্তির বর্ণনা আমাদের কাছে ধারাবাহিক ও  মোতাওয়াতের হওয়া শর্ত নয়।   কেননা প্রত্যেক কাজের শাস্তির বর্ণনা  আমাদের কাছে ধারাবাহিকভাবে ও نقلُ متواترُ  মোতাওয়াতের বিশুদ্ধভাবে পৌছবে। এরূপভাবে শাস্তির হুকুমটিও ধারাবাহিক ও মোতাওয়াতের হওয়া শর্ত নয়।

উল্লেখিত বর্ণনায় বুঝা গেল, সে সমস্ত হাদিস ইংগিতবহ তাতে আমল করা ওয়াজিব। কেননা, ঐ কাজের আমলকারীকে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তি প্রযোজ্য হবার  জন্য কতকগুলি শর্ত রয়েছে, পক্ষান্তরে এর জন্য কতকগুলি প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এই রীতিটি কতকগুলি উদাহরণের মাধ্যমে ব্যক্ত করা যায়।

1.                 মহানবী সা. হতে শুদ্ধ বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে:

لعن الله آكل الربا و مَوْكله، و شاهدية و كاتبه. رواه مسلم

অর্থাৎ সুদখোর, সুদদাতা, স্বাক্ষীদ্বয় ও এর লেখকের উপর আল্লাহর তাআলার লানত। মুসলিম

2.                মহানবী সা. হতে আরো বর্ণিত হয়েছে, তিনি ঐ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলেছেন যে, এক ছা’ এর পরিবর্তে দুই ছা’ খাদ্য নগদ বিক্রি করলে তা প্রকৃতই সুদ। তিনি এও বলেছেন:

البر بالبر رباً إلا هاء هاء . رواه البخاري ومسلم

অর্থাৎ: গমের পরিবর্তে গম নগদ মূল্য ছাড়া সুদের পর্যায়ভূক্ত। অর্থাৎ বাকীতে অথবা অতিরিক্ত বিনিময়ের মাধ্যমে বিক্রি হলে সুদ হবে এবং নগদ হলে সুদ হবে না। বুখারী ও মুসলিম।

উল্লেখিত হাদিসে দুই প্রকার সুদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। একটি অতিরিক্ত লাভ করা সম্পর্কীয়, অন্যটি বাকী বিক্রয় সম্বন্ধীয়। অত:পর যাদের কাছে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদিস পৌছেছে:

إنما الربا في النسيئة.

অর্থাৎ সুদ হলো বাকী বিক্রয়ের মধ্যে

তারা এক ছা’ এর পরিবর্তে দুই ছা’এর নগদ বিক্রয়কে হালাল মনে করতেন। এই রায় হলো ইবনে আব্বাস রা. ও তার সংগীগণের, আবুস সোয়াছা, আতা তাউস, ছাঈদ বিন জোবায়ের, ইকরামা রা. ও অন্যান্যগণ, যারা ইলম ও আমলে মুসলিম জাতির গৌরব ছিলেন।

এখন কেউ একথা বলতে পারবেনা যে, উল্লেখিত সাহাবা ও তাদের অনুসারীগণ, সুদ সম্পর্কিত হাদিসে সুদখোরদের পর্যায়ভূক্ত ও অভিশপ্ত। কেননা, তারা উল্লেখিত ফতোয়া দিয়েছিলেন একটি বৈধ ও সুনির্দিষ্ট তাবিলের উপর ভিত্তি করে।

3.      অন্য একটি উদাহরণ এই যে, মদীনার কতিপয় আলেম হতে স্ত্রীর পিছনের রাস্তা দিয়ে সহবাসের বৈধতার উল্লেখ আছে। কিন্তু সুনানই আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন

من أتى إمرأة في دبرها فهو كافر بما أنزل على محمد . رواه أحمد ، مسلم و النسائي.

অর্থাৎ যে ব্যক্তিতার স্ত্রীল পিছনের রাস্তা দিয়ে যৌন সহবাস করে, সে মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামপ্রতি অবর্তীণ বস্তুকে অস্বীকার করল। ইমাম আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী।

কিন্তু কারও পক্ষে এটা বলা সমীচীন নয় যে, ঐ আলেমগণ মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপর অবর্তীর্ণ বস্তুর সাথে কুফরী করেছে।

4.      এভাবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামহতে বর্ণিত আছে, তিনি শরাবের ব্যাপারে দশ ব্যক্তিকে লানত করেছেন। তাতে মদ প্রস্তুতকারী, প্রস্তুতে সাহায্যকারী ও পানকারী ইত্যাদি সকল প্রকার লোকই শামিল। মসনাদে ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী। এরূভাবে বিভিন্ন পন্থায় বর্ণিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেছেন:

كل شراب أسكرَ فهو خمرٌ وقال كل مُسكر خمرٌ.

অর্থাৎ: এমন পানীয় যাতে নেশা আসে, সেটাই শরাব এবং প্রত্যেক নেশাযুক্ত বস্তুই শরাব। বুখারী, মুসলিম, আহমদ

উমর রা. মিম্বরে, মোহাজিরীন ও আনসারদের মধ্যে খুতবা দিতে গিয়ে বলেন:

الخمر ما خامر العقلُ

অর্থাৎ যে বস্তু জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাই শরাব।

এর পর শরাব হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই আয়াতের শানে নুজুল এইযে, তৎকালে মদীনায় শরাব পানের সাধারণ অভ্যাস বিদ্যমান ছিল। তারা শুধু খেজুরের রস দ্বারা শরাব তৈরী করতো। আঙ্গুরের রসের শরাব তৈরীর ব্যবস্থা ছিলনা।

অবশ্য মুসলিম জাতির মধ্যে ইলম আমলের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ কতিপয় কুফাবাসী ধারণা পোষণ করতেন যে, আঙ্গুর ব্যতীত শরাব হয়না। আর খেজুর আঙ্গুর ব্যতীত অন্যান্য ফলের রস নেশা পরিমাণ না হলে হারাম হবে না।  তারা হালাল ধারণা করে সেটা পানও করতেন।  এতদসত্ত্বে সব লোকদেরকে হাদিসে বর্ণিত শাস্তির অন্তর্ভূক্ত করা যাবে না। কেননা, তাদের ওজর ছিল এবং তারা হাদিসকে তাবীল করেছে। এছাড়া অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও ছিল।

এও বলা উচিৎ নয় যে,  তারা যে শরাব পান করত তা অভিশপ্ত শরাব নয়।  কেননা, তশরাবের জন্য যে সাধারণ শরবত ব্যবহৃত হয়েছে তা সকল প্রকার মদকে শামিল করে। আর এটাও জানা যে,  তখনকার দিনে মদীনায় আঙ্গুরের শরাব তৈরী হতো না। অত:পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরাব বিক্রেতাকে অভিশাপ দেন। এতসত্ত্বেও কতিপয় সাহাবা শরাবের ব্যবসা করতেন। এমন কি এই সংবাদ উমর র: এর কাছে পৌছলে তিনি রাগান্নিত হয়ে বললেন, অমুককে আল্লাহ ধ্বংস করুন। সে কি জানেনা যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেছেন:

لعن الله اليهود، حرمت عليهم الشحومُ فجملوها فباعوها وأكلوا أثمانها. رواه البخاري ومسلم

 অর্থাৎ ইয়াহুদীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তাদের জন্য চর্বি হারাম করা হয়েছিল, কিন্তু তারা তা গলিয়ে বিক্রি করতো ও তার  মূল্য ভোগ করতো। বুখারী, মুসলিম। শরাব বিক্রেতা সাহাবী জ্ঞাত ছিলেন না যে, সেটা বিক্রি করা হারাম। এতদসত্বেও উমর রা. ঐ সাহাবীকে ঐ কাজের শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করেননি। অবশ্য তিনি শাস্তির বর্ণনা দিলে ঐ সাহাবী ও অন্যান্যগণ এরূপ খারাপ কাজ থেকে বেচে যেতেন।

5.                রাসূল সা. আঙ্গুরের রস নিংরানো ব্যক্তি এবং যার জন্য নিংরানো হয়, উভয়কেই লানত করেছেন। অবশ্য বহু সংখ্যক ফকীহ অন্যের জন্য আঙ্গুরের রস নিংরানো জায়েয মনে করেন, যদিও ঐ ব্যক্তি জানে যে, রস দিয়ে শরাব তৈরী করা হবে।

এটা সহজেই বোঝা যায় যে, উল্লেখিত হাদিস রস নিংরানো ব্যক্তির অভিশপ্ত হওয়ার ব্যাপারে نصٌّ বা দলিল স্বরূপ, তবুও ঐ কর্মে লিপ্ত ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধকতার ফলে অভিশপ্ত বলা হবে না।

6.                বিভিন্ন সহীহ হাদিসে মহনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরচুলাধারীনি স্ত্রীলোক এবং যে অন্যের জন্য পরচুলা তৈরী করে, উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন। অবশ্য কতিপয় ফকীহর মতে এ কাজ শুধু মাকরূহ।

7.                রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেছেন:

إن الذين يشرب في آنية الفضة إنما يُجَرجِرُ في بطنه نار جهنم. رواه البخاري ومسلم

অর্থাৎ: যারা রৌপ্যের পাত্রে পানি পান করে, তারা নিজেদের পেটের মধ্যে জাহান্নামের আগুন প্রবেশ করায় এবং তাদের পেটে জাহান্নামের আগুনের শব্দ হবে। বুখারী ও মুসলিম। এতসত্ত্বেও কোন কোন ফকীহ এটাকে মাকরূহ তানজিহ মনে করেন।

8.                নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:

إذاالتقى المسلمان بسيفَيهما فالقاتل والمقتول في النار. رواه البخاري و مسلم

অর্থাৎ যখন দুই মুসলিম তরবারী নিয়ে একে অন্যের সামনাসামনি হয়, তখন ঘাতক ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে। বুখারী ও মুসলিম

উল্লেখিত হাদিস আমল করা ওয়াজিব। এটা এই ইংগিত বহন করে যে, সত্য প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া মুসলিমদের হত্যা করা হারাম। এতদস্ত্বেও  আমরা জানি যে, জামাল যুদ্ধে এবং সিফফিন যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীগণ জাহান্নামবাসী নন। কেননা, যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ব্যাপারে তাদের ওজর এবং ইচ্ছা ছিল। এছাড়া  তারা এমন সব সৎ কাজ করেছিলেন, যা তাদের জাহান্নামে প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাড়িয়েছিল।

9.                রাসূল সাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

ثلاثة لا يكلمهم الله، ولا ينظر إليهم يوم القيامة، ولا يزكيهم ولهم عذاب أليم، رجل على فضل ماءٍ يمنعه ابن السبيل فيقول الله له: اليومَ أمنعك فضلي كما منعتَ فضلَ مالم تعمل يداكَ. ورجل بايع إما ماً لايبايعه إلا لدنيا إن أعطاه رضي وإن لم يعطه سخط، ورجل حلف على سلعةٍ بعد العصر كاذباً.

অর্থাৎ আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তিন শ্রেনীর লোকের সাথে কথা বলবেন না তাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না এবং তাদেরকে গুনাহ হতে পবিত্রও করবেন না। তাদের জন্য ভীষণ শাস্তি অবধারিত রয়েছে।  যে ব্যক্তি পথিককে অতিরিক্ত পানি দিতে অসম্মতি জানায় কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন- আজ আমি তোমাকে আমার করুনা ও রহমত হতে বঞ্চিত রাখব, যেমন তুমি মানুষকে অতিরিক্ত পানি হতে বঞ্চিত করতে , যা তোমার শ্রমলব্ধ নয়। দ্বিতীয় ব্যক্তি শুধু পার্থিব স্বার্থের জন্য ইমামের হাতে বায়আত হয় , তাকে কিছু দেয়া হলে খুশী হয়, আর না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। তৃতীয় ব্যক্তি তার মাল অতিরিক্ত দামে বিক্রয় করার জন্য আছরের পর মিথ্যা শপথ করে, ইতিপূর্বে তার মালের বেশী দাম, বলা হয়েছিল। মসনানে আহমদ, বুখারী, মুসলিম।  

উক্ত হাদিসে প্রতীয়মান হয় যে, অতিরিক্ত পানি দান করতে অসম্মতি জানালে ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এতদসত্বেও একদল আলেম আলেম অতিরিক্ত পানি দিতে নিষেধ করাকে জায়েয মনে করেন।

কিন্তু হাদিসের দলিল অনুসারে, ঐ কাজে আমাদেরকে হারামই বলতে হবে। এতদসত্ত্বেও যে ঐ কাজ জায়েয মনে করে, সে শাস্তির উপযু্ক্ত নয়। কেননা, তাবিলের কারণে তার ওজর কবুল করত হবে।

10.           নবী করিম স. বলেন:

لعن الله المحللُ والمحلل له.

আল্লাহ মহাল্লাল এবং মুহাল্লাল লাহু উভয়ের উপর লানত দেন।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্য কারো জন্য হালাল করার নিয়তে কোন স্ত্রীলোককে বিয়ে করে, আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর অভিশাপ দেন। আর যে ব্যক্তির জন্য ঐ স্ত্রী লোকটি হালাল করা হয়, তার উপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ। মুসনাদে আহমদ, নাসায়ী, তিরমীযি, রাসূল সা. এবং সাহাবাগণ হতে ও এরূপ বর্ণিত আছে। এতদসত্ত্বেও কতিপয় আলেম হালাল কার জন্য এ বিয়ে জায়েয মনে করেন।

আবার কেউ ঐ প্রকার বিয়ে এই শর্তে জায়েয রাখেন, যদি বিয়ের আকদ এর সময় কোন প্রকার শর্ত না করা হয়। তাদের এই কথার পেছনে বহু ওজব আপত্তি আছে। যারা হীলা বিয়ে জায়েয বলেন, তাদের দলিল এই যে, যে সকল আকদ বিয়ে বন্ধন এর সাথে শর্তের উল্লেখ থাকে না, সেটাতে আকদ এর হুকুম অবশিষ্ট থাকবে এবং এতে কোন প্রকার পরিবর্তন দেখা দিবে না।

আর যারা এই কাজ অন্যের স্ত্রীকে হালাল করা জায়েয মনে করেন, তাদের কাছে হারাম সম্পর্কিত হাদিস পৌছেনি। কেননা, তাদের পুরাতন কিতাব সমূহে ঐ হাদিস নেই। হ্যা যদি তাদের কাছে এ হাদিস পৌছত, তা হলে অবশ্যই  তারা ঐ হাদিস তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ করতেন এবং এ হাদিসকে দলিল  হিসাবে গ্রহণ করতেন অথবা ঐ হাদিসের জবাব দিতেন। এটাও সম্ভব হতে পারে যে, তাদের কাছে হাদিসটি পৌছেছে, কিন্তু তারা তার তাবিল করেছেন। অথবা উক্ত হাদিসকে মনসূখ বা রহিত ঘোষণা করেছেন। আবার এও সম্ভব হতে পারে এয, এই হাদিসের বিপক্ষে অন্য একটি হাদিস রয়েছে। উল্লেখিত বর্ণনায় এটি প্রতীয়মান হয় যে, উল্লেখিত লোকগণ হাদিসে বর্ণিত শাস্তির সম্মুখীন হবে না, যদিওতারা উল্লেখিত শর্তানুসারে হালাল করার কাজ করেও থাকে।

অবশ্য আমাদের এটা বলতেই হবে যে, উক্ত تحليل বা হালাল করাই শাস্তির কারণ, যদিও শর্তের অভাবে অথবা প্রতিবন্ধকতার ফলে কোন কোন লোকের উপর এই শাস্তি প্রযোজ্য হয় না।

এরূপভাবে মুয়াবিয়া রা. বিয়াদ বিন আবিহিকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেন। প্রকৃত পক্ষে জিয়াদ হারিস বিন কালদাহ এর বিছানায় জন্মগ্রহণ করেন। কেননা, আবু সুফিয়ান বলতেন: জিয়াদ আমার বীর্যে জন্মলাভ করেছে, কিন্তু রাসূলে করীম স. বলেছেন।

من ادعى إلى غير أبيه، وهو يعلم أنه غيرَ أبيه: فالجنة عليه حرام. البخاري ومسلم

অর্থাৎ যে ব্যক্তি জানা সত্ত্বেও অন্যকে পিতা স্বীকার করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।

মহানবী স. আরো বলেন:

من ادعى إلى غير أبيه، أو تولى غيرَ مواليه، فعليه لعنة الله والملائكةِ والناس أجمعين، لا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا. رواه مسلم .

অর্থাৎ যে ব্যক্তি অপরকে পিতা বলে দাবী করে অথবা নিজের মুনিব থাকা সত্বেও অন্য মুনিবের বশ্যতা স্বীকার করে তার উপর আল্লাহ,মালাইকাও সকল মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তার কোন ফরজ ও নফল ইবাদত ইত্যাদি কবুল করবেন না। মুসলিম।

রাসূল সা. অন্যত্র বিধান দিয়েছেন: الولد للفراش অর্থাৎ সন্তান ঐ ব্যক্তির প্রাপ্য , যার দাসী অথবা স্ত্রীর পেটে ঐ সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে।

এতে করে আমরা বুঝি যে, যে ব্যক্তি তার পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে স্বীকার করে, সে ঐ হাদিসে উল্লেখিত শাস্তির যোগ্য বলে বিবেচি হবে। এতদসত্ত্বেও, আমরা নির্দিষ্ট কোন সাধারণ ব্যক্তিকে এজন্য দায়ী করতে পারি না। সাহাবীদেরকে অভিযুক্ত করাতো দূরের কথা। অর্থাৎ সাহাবীদের কাউকেও বলা যাবে না যে, তিনি এই শাস্তির যোগ্য। কেননা, রাসূল সা. এর হাদিস الولد للفراش আর মুয়াবিয়ার রা. ধারণা ছিল যে, সন্তান ঐ  ব্যক্তিরই হবে যার বীর্যে সে জন্মলাভ করেছে। একথার উপর ভিত্তি করেই জিয়াদকে আবু সুফিয়ানের ছেলে হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। কেনান, জিয়াদের মাতা সূমাইয়া আবু সুফিয়ান কর্তৃক গর্ভবতী হয়েছিল।

এই বিধান অনেক লোকেরই অজানা ছিল । বিশেষ করে, হাদিস সংকলনের প্রসার লাভের পূর্বে বেশীর ভাগ লোক এই বিধান সম্মন্ধে অজ্ঞ ছিলেন। তাছাড়া এও হতে পারে যে, ইসলামের পূর্ব যুগে সন্তান ঐ ব্যক্তিরই প্রাপ্য ছিল, যার বীর্যে সে জন্মলাভ করেছে। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার ফলে ঐ কাজে শাস্তি প্রয়োগ হত না। কেননা, সে এমন কেন কাজ করত, যার ফলে ঐ গুনাহ মুছে যেত । এছাড়া আরো অনকে প্রতিন্ধকতা রয়েছে।

হালাল ও হারামের দলিলের পরস্পর দ্বন্দ্ব

বহু মাসআলা এরকম আছে, যার হারাম হওয়ার দলিল কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রতিষ্ঠত হয়েছে। এতদসত্বেও, কতিপয় আলেক তাকে হালাল মনে করেন। কেননা, তাদের কাছে হারামের দলিল পৌছেনি। অথবা তাদের কাছে হারামের দলিল  পৌছেছে, কিন্তু হালালের দলিল হারামের দলিলের উপর প্রাধান্য লাভ করেছে। অবশ্য তারা এটা তাদের জ্ঞানও ইজতেহাদের দ্বারাই করেছেন।

হারামের হুকুম ও ফলাফল

কোন বস্তুকে হারাম করতে হলে তার কতকগুলি হুকুম ও ফলাফল আছে যেমন:

1.                হারামে লিপ্ত ব্যক্তি গুনাহগার হবে।

2.                ঐ ব্যক্তি র্ভৎসনার পাত্র।

3.                সে শাস্তির উপযু্ক্ত।

4.                সে ফাসেকের পর্যায়ভূক্ত

এগুলি ছাড়া অন্যান্য ফলাফলও আছে। কিন্তু হারাম প্রতিষ্ঠার জন্য কতকগুলি শর্ত ও বাধা নিষেধও রয়েছে। যেমন, কখনও কোন বস্তুর হারাম প্রমাণিত হয়, কিন্তু হারাম হবার কোন শর্তের অনুপস্থিতিতে বা কোন প্রতিবন্ধকতার ফলে হারামের হুকুম রহিত হয়। অথবা ঐ হারাম কোন নির্দিষ্ট লোকের বেলায় প্রযোজ্য হয় না, অথচ অন্যের বেলায় তা প্রযোজ্য হয়ে থাকে। এই বিষয়ে আমরা কথা লম্ব করলাম না। কেননা, উক্ত মাসআলার মানুষ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত।

সালফে সালেহীনের মতে আল্লাহর হুকুম এক, তবে যিনি ইজতেহাদে ভুল করলেন তিনি অপারগ ও সওয়াব প্রাপ্ত হবেন।

1.                সালফে সালেহীন ও ফকীগণের মত এই যে, আল্লাহর বিধান সকলের জন্য একই রকম। যে ব্যক্তি ইজতেহাদের ফলে তার বিরোধিতা করে সে ভ্রান্ত ও অক্ষম। সে আল্লাহর দরবারে প্রতিদান পাবে। যদিও সে তাবিল করতে গিয়ে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে বসে, তবু তার উপর হারামের প্রতিক্রিয়া হবে না। কেননা, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছেন। আর আল্লাহ কাউকে তার শক্তির অতিরিক্ত কষ্ট দেন না।

2.                আলেমগণের দ্বিতীয় দলের ধারণা বিশ্বাস এই যে, ঐ কাজটি মুজতাহিদের জন্য হারাম নয়। কেননা, হারামের দলিল তার কাছে পৌছেনি। কিন্তু অন্যের জন্য হারাম।

উল্লেখিত মাসআলা দুটির মতবিরোধ পরস্পরের কাছাকাছি, এটা বাক্যের মধ্যে বিভিন্নতার নামান্তর মাত্র।

মূলকথা এইযে, শাস্তি সম্পর্কিত হাদিস পরস্পর বিরোধী হলে তা উল্লেখিত বর্ণনার বহির্ভূত নয়। আলেমগনের সম্মিলিত রায় এই যে, যে কাজের জন্য শাস্তি প্রযোজ্য হয়েছে তা অবশ্যই হারাম। তা দ্বারা দলিল গ্রহণ করা জায়েয, সেটা অনুকূলে হোক বা প্রতিকূলে হোক। অবশ্য প্রতিকূল অবস্থায়ই হাদিস দ্বারা বেশীর ভাগ দলিল গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আবার হাদিস قطعي الدلالة অনিবার্য ইংগিবহ না হলে তা দ্বারা দ্বন্দযুক্ত স্থানে দলিল গ্রহণ সম্পর্কে আলেমগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

সমাপ্ত

আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ