জুমু‘আর দিন ৮০ বার দুরূদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীস কি বিশুদ্ধ?

বর্ণনা

এ ফতওয়াটিতে একটি হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হয়েছে। হাদীসটি হচ্ছে, ‘কেউ যদি জুমু‘আর দিনে আশিবার দুরূদ পড়ে, তার আশি বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হবে’ এটা কি বিশুদ্ধ?

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    ‘জুমু‘আর দিন ৮০ বার দুরূদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীস কি বিশুদ্ধ?

    ما صحة حديث (من صلى علي الجمعة ثمانين مرة غفرت له ذنوب ثمانين سنة)؟

    < بنغالي- Bengal - বাঙালি>

    ইসলাম কিউ.এ

    موقع الإسلام سؤال وجواب

    —™

    অনুবাদক: জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: ‌ذاكرالله أبو الخير

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    জুমু‘আর দিন ৮০ বার দুরূদ পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে’ মর্মে বর্ণিত হাদীস কি বিশুদ্ধ?

    প্রশ্ন: একটি হাদীস সম্পর্কে আমার জিজ্ঞাসা, তা হল আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জুমু‘আর দিন আসরের সালাতের পর জায়গা থেকে উঠার পূর্বে যে ব্যক্তি ৮০ বার নিম্ন বর্ণিত দুরূদটি পড়বে, আল্লাহ তা‘আলা তার ৮০ বছরের গুনাহ মাপ করে দেবেন এবং তার জন্য ৮০ বছর ইবাদত করার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। তিনি বলেন, যেমন কোনো ব্যক্তি এ যিকিরটি ৮০ বার বলল, اللهم صل على محمد النبي الأمي وآله وسلم تسليما জানার বিষয় হলো, এ হাদীসটি সহীহ কিনা? এ হাদীসের ওপর আমল করা যাবে কিনা? কারণ অনেক মানুষকে হাদীসটির ওপর আমল করতে দেখি।

    উত্তর: আল-হামদুলিল্লাহ।

    ইবন শাহীন ‘আত-তারগীব ফি ফাযায়েলীল আমাল’ পৃ. ১৪ তে আওন ইবন উমারাহ থেকে এবং তিনি সাকান আল-বুরজুমী থেকে, তিনি হাজ্জাজ ইবন সিনান থেকে, তিনি আলী ইবন যায়েদ থেকে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব এবং তিনি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমার ওপর দুরূদ পড়া, পুলচিরাতের উপর নূর। যে ব্যক্তি জুমু‘আর দিন আমার ওপর ৮০ বার দুরূদ পড়বে, তার ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”

    পরবর্তী আলিমদের কেউ কেউ হাদীসটি সম্পর্কে নমনীয়তা ও উদারতা প্রদর্শন করেন এবং হাদীসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেন, কিন্তু সঠিক কথা হলো, হাদীসটি দুর্বল, শুধু দুর্বল নয়, খুবই দুর্বল। কারণ, এ হাদীসের সনদে তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। তারা হলেন.

    ১- আলী ইবন যায়েদ ইবন জাদ‘আন আল-বাসরী

    হাম্মাদ ইবন যায়েদ রহ. তার সম্পর্কে বলেন, তিনি হাদীসসমূহকে উলট-ফালট করে ফেলেন।

    শু‘বা রহ. বলেন, তিনি হাদীসকে একটির সাথে আরেকটিকে মিলিয়ে ফেলেন।

    ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রহ. বলেন, তিনি কিছুই না।

    আবু যুর‘আ রহ. বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী নন। ধারণাপ্রসূত কথা বলেন এবং ভুল করেন।

    আবু হাতেম রহ. এ বর্ণনাকারী সম্পর্কে বলেন, তার কথা দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে না।

    দেখুন: ইমাম আয যাহাবী রহ.-এর ‘আল মুগনী ফীদ দ্বু‘আফা’ পৃ. ৪৪৭/২।

    ২- হাজ্জাজ ইবন সিনান:

    তার সম্পর্কে আযদী রহ. বলেন, তিনি মাতরুক, অর্থাৎ মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী।

    দেখুন: হাফেয ইবন হাজারের লিসানুল মিযান ৫৬৩/২।

    ৩- আওন ইবন উমারা আল-কাইসী:

    আবু যুর‘আহ রহ. বলেন, সে মুনকারুল হাদীস অর্থাৎ মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী।

    হাকেম রহ. বলেন, আমি তাকে পেয়েছি, তবে তার থেকে কোনো হাদীস লিপিবদ্ধ করি নি, তিনি মুনকারুল হাদীস ছিলেন এবং হাদীসে দুর্বল ছিলেন।

    ইমাম আবু দাউদ তার সম্পর্কে বলেন, তিনি দুর্বল। দেখুন: তাহযীবুত তাহযীব, পৃ. ১৭৩/৮

    হাদীসের ইমামদের মধ্যে আরও যারা হাদীসটিকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেন, তারা হলেন, ইমাম দারা ক্বুতনী। হাফেয ইবন হাজার রহ. স্বীয় কিতাব ‘নাতায়েজুল আফকার’ (৫৬/৫); আল্লামা সাখাবী রহ. স্বীয় কিতাব ‘আল কাওলুল বাদী’ পৃ. ২৮৪; আল্লামা মুনাবী, ‘ফাইযুল কাদীর’ পৃ. ২৪৯/৪; কামাল ইউসুফ আল-হুত আল- বাইরূতি তার কিতাব ‘আসনাল মাতালেব’ পৃ. ১৭৫ এবং শাইখ আল-আলবানী স্বীয় কিতাব ‘সিলসিলাতুদ দ্বা‘য়ীফা’ পৃ. ২৭৪/৮।

    এ হাদীসটির সমর্থনে আনাস ইবন মালেক থেকে অপর একটি হাদীস বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্মুখে দাঁড়ানো ছিলাম, তখন তিনি বলেন, জুমু‘আর দিন যে ব্যক্তি আমার ওপর ৮০ বার দুরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তা‘আলা তার ৮০ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল আপনার ওপর দুরূদ কীভাবে পড়বো? তখন তিনি বললেন, বলবে-

    اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ ونبيك ورسولك النبي الأمي

    বর্ণনায় খতীব আল-বাগদাদী স্বীয় কিতাব তারীখে বাগদাদ: ৪৬৩/১৩। হাদীসটির সনদে ওহাব ইবন দাউদ ইবন সুলাইমান আদ-দ্বরীর নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন, ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, ‘খতীব রহ. তার সম্পর্কে বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য ছিলেন না’। তারপর তিনি তার বানানো একটি হাদীস হিসেবে উক্ত হাদীসটি দলীল হিসেবে উল্লেখ করেন।

    অনুরূপভাবে ইবনুল জাওযী রহ. উল্লিখিত হাদীসটিকে ‘আহাদীসে ওয়াহীয়াহ’-এর মধ্যে উল্লেখ করেন। দেখুন: ৭৯৬।

    আল্লামা আলবানী রহ. হাদীসটিকে বানোয়াট বলেছেন। তিনি বলেন হাদীস বানানোর বিষয়টি তার মধ্যে স্পষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরূদ পাঠ করার ফযীলত বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীসগুলো যথেষ্ট। এ ধরনের মাওদু‘ হাদীসের কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من صلى علي مرة واحدة صلى الله عليه بها عشراً “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দুরূদ পড়ে, আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর দশবার দুরূদ পড়েন”(সহীহ মুসলিম)

    দেখুন: ‘সিলসিলাতুল আহাদীস আদ্ব দ্ব‘য়ীফাহ ওয়াল মাওদু‘আহ’ ৩৮৩/১।

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ