জাহেলি যুগে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কি তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছিলেন?

বর্ণনা

উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জাহেলী যুগে তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছেন বলে যে ঘটনা উল্লেখ আছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনাটি যে অসত্য উক্ত প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

    জাহেলি যুগে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কি তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছিলেন?

    هل ثبت أن عمر بن الخطاب رضي الله عنه وأد ابنته في الجاهلية؟

    < بنغالي >

    ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব ওয়েবসাইট

    موقع الإسلام سؤال وجواب

    —™

    অনুবাদক: আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী

    সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

    ترجمة: عبد الله المأمون الأزهري

    مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا

    জাহেলী যুগে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কি তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছিলেন?

    প্রশ্ন: জাহেলী যুগে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নাকি তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছিলেন? এ ঘটনাটি কি সত্য? অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান জান্নাত দান করুন।

    জবাব: সব প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জাহেলী যুগে তাঁর কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দিয়েছেন বলে যে ঘটনা উল্লেখ আছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনাটি যে অসত্য নিম্নোক্ত কয়েকটি কারণ বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যায়:

    ১- ঘটনাটি হাদীস, আসার ও ইতিহাসের কোনো কিতাবে পাওয়া যায় না। মিথ্যাবাদী ও হিংসুক রাফেযিদের (শিয়াদের) বর্ণনা ছাড়া সহীহ বর্ণনায় এটি পাওয়া যায় না।

    ২- বনী ‘আদি গোত্রে যদি কন্যাসন্তান জীবন্ত কবরস্থ করা সাধারণ রীতি হতো তবে উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কন্যা হাফসা বিনতে উমার জাহেলী যুগে নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে কীভাবে জন্মগ্রহণ করে জীবিত ছিলেন? এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, জাহেলী যুগে কন্যা সন্তান জীবিত কবর দেওয়া উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর অভ্যাস ছিল না। হাফসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার জীবনী দেখুন: হাফেয ইবন হাজার, আল-ইসাবা: (৭/৫৮২)

    ৩- উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যে কন্যা সন্তান জীবিত কবরস্থ করেন নি তা নু‘মান ইবন বশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস থেকেই প্রমাণিত হয়।

    «سمعت عمر بن الخطاب يقول: وسئل عن قوله: ﴿وَإِذَا ٱلۡمَوۡءُۥدَةُ سُئِلَتۡ ٨﴾ [التكوير: ٨] قال: جاء قيس بن عاصم إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: إني وأدت ثماني بنات لي في الجاهلية .قال: أعتق عن كل واحدة منها رقبة: قلت: إني صاحب إبل. قال: أهد إن شئت عن كل واحدة منهن بدنة».

    “আমি উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতে শুনেছি,

    ﴿وَإِذَا ٱلۡمَوۡءُۥدَةُ سُئِلَتۡ ٨﴾ [التكوير: ٨]

    “আর যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।” [সূরা: আত-তাকওয়ীর, আয়াত:৮] কায়েস ইবন ‘আসিম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, আমি জাহেলী যুগে আটটি কন্যা সন্তান জীবিত কবর দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি তাদের পক্ষ থেকে আটটি গোলাম মুক্ত করে দাও। আমি বললাম, আমার উট আছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে যদি চাও প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একটি করে উট দান করে দাও।”[1]

    এ হাদীস জাহেলী যুগে কন্যা সন্তান জীবিত কবর দেওয়ার কাফফারার ইঙ্গিত বহন করে -এর বর্ণনাকারী হচ্ছেন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নিজেই। অথচ তিনি নিজে এ কাজ করেছেন বলে উল্লেখ নেই। তিনি কায়েস ইবন ‘আসিম রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। অতএব, এটা প্রমাণ করে যে, তিনি জাহেলী যুগে কন্যা সন্তান জীবিত কবরস্থ করেন নি।

    ৪- তাছাড়া ঘটনাটি যদি সত্যও ধরা হয় তবে বলব, ইসলাম জাহেলী যুগের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা যেখানে শির্ক ও মূর্তিপূজার মতো বড় গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, সেখানে কন্যা সন্তান জীবিত কবরস্থ করার অপরাধ কতটুকু?

    ড. আব্দুস সালাম ইবন মুহসিন আলে ঈসা বলেন, জাহেলী যুগে কন্যা সন্তান জীবিত কবর দেওয়ার যে ঘটনাটি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর সম্পর্কে বর্ণিত আছে তা আমি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর থেকে যারা বর্ণনা করেছেন তাদের বর্ণনায় পাই নি। তবে উস্তাদ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ “আবকারিয়াতু উমার” বইয়ে (পৃষ্ঠা ২২১) বর্ণনা করেছেন:

    أنه رضي الله عنه كان جالساً مع بعض أصحابه ، إذ ضحك قليلاً، ثم بكى، فسأله مَن حضر، فقال: كنا في الجاهلية نصنع صنماً من العجوة، فنعبده، ثم نأكله، وهذا سبب ضحكي، أما بكائي، فلأنه كانت لي ابنة، فأردت وأدها، فأخذتها معي، وحفرت لها حفرة، فصارت تنفض التراب عن لحيتي، فدفنتها حية.

    “একদা উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সঙ্গীদের সাথে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি হেসে উঠলেন, কিছুক্ষণ পরে আবার কাঁদলেন। উপস্থিত লোকজন তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, জাহেলী যুগে আমরা পিষ্ট খেজুরের দ্বারা মূর্তি তৈরি করে সেগুলোর ইবাদত করতাম, তারপরে তা খেয়ে ফেলতাম। এটা আমার হাসার কারণ। আর কেঁদেছিলাম, আমার একটি কন্যাসন্তান ছিল, তাকে জীবন্ত কবর দিতে চাইলাম। তাকে সাথে নিয়ে গেলাম। আমি তার জন্য গর্ত খনন করছিলাম আর সে আমার দাঁড়ি থেকে ধুলা ময়লা ঝেড়ে দিচ্ছিলো। অতঃপর আমি তাকে জীবিত কবর দিয়েছিলাম।”[2]

    আব্বাস আল আক্কাদ নিজেই এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন। কেননা জীবিত কবর দেওয়া আরবদের সাধারণ অভ্যাস ছিল না। এছাড়া বনু আদি গোত্রে এটা প্রসিদ্ধ ছিল না। আর খাত্তাব পরিবারেও ছিল না। সে পরিবারে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর বোন ফাতিমা জাহেলী যুগে বাস করেছেন, তাছাড়া উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর বড় কন্যা হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবুওয়াতের পাঁচ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁকে তিনি জীবিত কবর দেন নি। তাহলে তার ছোট কন্যাকে কেন তিনি জীবিত কবর দিবেন? আর এ সম্পর্কিত সব তথ্যে বর্ণনাকারীদের সনদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এছাড়া তাঁর আত্মীয় স্বজন, ভাই বোন, চাচা বা মামাদের কেউ বর্ণনা করেন নি। (এ সম্পর্কে আরো দেখুন: দিরাসা নকদিয়া ফিল মারওয়িয়্যাতি ফী শাখসিয়্যাতি উমার ইবনুল খাত্তাব ওয়া সিয়াসাতুহুল ইদারিয়া: ১/১১১-১১২)

    (সূত্র: আল ইসলাম সুয়াল ওয়া জাওয়াব, তত্ত্ববধায়ক: শায়খ মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ, প্রশ্ন নং ১৩২৪৩৭)

    [1] ইবন বাজ্জার, (১/৬০), তাবরানী, মু‘জাম আল-ওয়াসীত: (১৮/৩৩৭), হাইসামী রহ. বলেন, বাজ্জারের সনদে হাসান ইবন মাহদি আল-আইলী ব্যতীত অন্যান্য সব রাবীগণ সহীহ, তিনি সিকাহ। দেখুন: মাজমাউয যাওয়ায়েদ: (৭/২৮৩), আলবানী রহ. সিলসিলাহ সহীহাতে (৩২৯৮) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

    [2] আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ “আবকারিয়াতু উমর”: (পৃষ্ঠা ২২১)

    উৎস:

    www.islamqa.info

    বিষয়ভিত্তিক ক্যাটাগরি:

    আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ