চার ইমামের আকীদাহ

বর্ণনা

চার ইমামের আকীদাহ

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

 চার ইমামের আকীদাহ

 মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান

 ভূমিকা

নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্যই। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই, তাঁর কাছে সঠিক পথ চাই এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।আমরা আমাদের নফসের অনিষ্ট এবং আমাদের আমলসমূহের খারাবী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। আর যাকে আল্লাহ গোমরাহ করেন তাঁকে হিদায়াত দেওয়ার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলিম হওয়া ছাড়া মারা যেয়ো না।[সূরা আল-ইমরান,আয়াত: ১০২]হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সঠিক কথা বল।তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই এক মহা সাফল্য অর্জন করবে।[সূরা আল আহযাব, আয়াত: ৭০,৭১]অতঃপর ‘দীনের মৌলিক বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহুর আকীদাহ’ এর ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য আমি বিস্তারিত গবেষণা শুরু করলাম। আর ভূমিকায় তিন ইমাম : মালিক, শাফে‘ঈ ও আহমাদ রাহিমাহুমুল্লাহ এর আকীদাও সংক্ষেপে অর্ন্তভুক্ত করলাম।কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার কাছে এ তিনজন ইমামের আকীদাহ পৃথক করার দাবি করলেন। আর আমি নিজেও চার ইমামের আকীদার বর্ণনা পুরো করার জন্যে ইমাম আবূ হানীফার তাওহীদ, কাদার (তাকদীর), ঈমান ও সাহাবীদের ব্যাপারে আকীদাহ এবং তর্কশাস্ত্রের বিপরীতে তাঁর অবস্থানের যে বিস্তারিত গবেষণা পেশ করেছি তার সারসংক্ষেপ ভূমিকায় তা যুক্ত করা সঙ্গত দেখেছি।

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে, এ আমলটি যেন কেবল তার সন্তুষ্টির জন্য হয়। আর তিনি যেন আমাদের সবাইকে তার কিতাবের অনুসরণ এবং তার রাসূলের সুন্নাতের ওপর চলার তাওফীক দান করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই এ কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য, তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তিনি কতনা উত্তম অভিভাবক।

আমাদের শেষ দাবি হলো, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।

মুহাম্মাদ ইবন আব্দুর রাহমান আল-খামিস

 প্রথম অধ্যায়

 দীনের মৌলিক বিষয়ে চার ইমামের আকীদাহ এক

ঈমানের মাস’আলা ছাড়া।

চার ইমাম —আবূ হানীফা, মালিক, শাফে‘ঈ ও আহমাদ—এর আকীদাহ তাই যা কুরআন ও সূন্নাহ বলেছে এবং যার ওপর সাহাবীগণ ও উত্তমভাবে তাদের অনুসারী—তাবে‘ঈগণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আল্লাহর জন্যে যাবতীয় প্রশংসা যে দীনের মৌলিক বিষয়ে তাদের মধ্যে কোন বিবাদ নেই, বরং তারা রবের সিফাতের ঈমান ও কুরআন আল্লাহর কালাম মাখলুক নয় এবং ঈমানের জন্যে অবশ্যই অন্তর ও মুখের সত্যারোপ জরুরী মর্মে একমত ছিলেন। বরং তারা সবাই তর্কশাস্ত্রী জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় ও অন্যান্য যারা ইউনানী ফালসাফাহ (গ্রিক দর্শন) এবং কালামী মতাদর্শ (তর্কশাস্ত্র) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল তাদের প্রতিবাদ করতেন। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন,তবে আল্লাহর রহমত তার বান্দাদের প্রতি যে, উম্মতের ভেতর সুখ্যাতি সম্পন্ন ইমামগণ— যেমন চার ইমাম ও অন্যরা কুরআন, ঈমান ও রবের সিফাতের ক্ষেত্রে কালাম শাস্ত্রী—জাহমিয়্যাদের মতবাদের প্রতিবাদ করতেন। আর তারা সালাফগণ যার ওপর ছিলেন তার ওপর একমত ছিলেন, যেমন আখিরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে, কুরআন আল্লাহর কালাম মাখলুক নয় এবং ঈমানের জন্য অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের সত্যারোপ জরুরী।আর তিনি বলেন, প্রসিদ্ধ সব ইমাম আল্লাহ তাআলার জন্য সিফাত সাব্যস্ত করেন। এবং তারা বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম মাখলুক নয়। তারা আরো বলেন, আখিরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে। এটিই সাহাবী ও উত্তম-ভাবে তাদের অনুসারী আহলে বাইত ও অন্যদের মাযহাব। আর এটিই অনুসরণীয় ইমামগণের মাযহাব যেমন, মালিক ইবন আনাস, সাওরী, লাইস ইবন সা‘আদ, আওযা‘ঈ, আবূ হানীফা, শাফে‘ঈ ও আহমাদ ইবন হান্বাল...শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহকে ইমাম শাফ‘ঈর আকীদাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ বলে উত্তর দেন:ইমাম শাফে‘ঈ—রাদিয়াল্লাহু আনহু এর আকীদাহ এবং উম্মতের সালাফ যেমন মালেক, সাওরী, আওযা‘ঈ, ইবনুল মুবারক, আহমাদ ইবন হাম্বাল ও ইসহাক ইবন রাহওয়াই এর আকীদাই হচ্ছে অনুসরণীয় মাশায়েখদের আকিদা যেমন ফুযাইল ইবন ইয়ায, আবূ সুলাইমান আদ-দারানী, সাহাল ইবন আব্দুল্লাহ আত-তাসতরী প্রমূখ। কারণ, এসব ইমাম ও তাদের ন্যায় ইমামদের মাঝে দীনের মৌলিক বিষয়ে কোন মতভেদ নেই।

অনুরূপভাবে ইমাম আবূ হানীফা—রাহিমাহুল্লাহ— কারণ, তাওহীদ, তাকদীর ও এর মতো অন্যান্য বিষয়ে তার থেকে প্রমাণিত আকীদা এ সব ইমামের আকীদার মতোই। আর এ সব ইমামের আকিদা তাই ছিল যার ওপর ছিলেন সাহাবীগণ ও উত্তমভাবে তাদের অনুসারী তাবেঈগণ। আর এ আকীদাই কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণনা করেছে।

এই সেই আকীদাহ যা আল্লামা সিদ্দীক হাসান খান (ভূপালী) গ্রহণ করেছেন, যেমন তিনি বলেন,অতএব আমাদের মাযহাব সালাফদেরই মাযহাব; তুলনা ছাড়া (সিফাত) সাব্যস্ত করা এবং অকার্যকর সাব্যস্ত করা ছাড়া তাঁকে পবিত্র জানা। এটি ইসলামের ইমামগণ মালিক, শাফে‘ঈ, সাওরী, ইবনুল মুবারাক, ইমাম আহমাদ... ও তাদের ভিন্ন অন্যান্যদের মাযহাব। কারণ,ইমামগণের মাঝে দীনের মৌলিক বিষয়ে কোনো বিরোধ নেই। অনুরূপভাবে আবূ হানীফা—রাদিয়াল্লাহু আনহু— কারণ তার থেকে প্রমাণিত আকীদাহ এসব ইমামগণের আকীদারই মতো। আর এটা তাই যা কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণনা করেছে...

দীনের মৌলিক মাসআলায় অনুকরণীয় চার ইমাম- আবূ হানীফা, মালিক, শাফ‘ঈ ও আহমাদ যে আকীদা পোষণ করেন সে বিষয়ে তাদের কিছু উক্তি এবং ইলমুল কালাম বা তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে তাদের অবস্থানটি এখানে তুলে ধরা হলো।

 দ্বিতীয় অধ্যায়

 ইমাম আবূ হানীফার আকীদাহ:

 তাওহীদ বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফার বাণীসমূহ:

 প্রথমত: আল্লাহর তাওহীদ সম্পর্কে তার আকীদা এবং শরীয়ত সম্মত উসীলার বর্ণনা ও বিদআতী উসীলা বাতিল করণ:

ইমাম আবূ হানীফা রহ. বলেন, কারো জন্য উচিত নয় যে, সে আল্লাহকে তার নাম ছাড়া ডাকবে। আর আল্লাহকে ডাকার ক্ষেত্রে দো‘আর অনুমতি যেভাবে দেওয়া হয়েছে সেটিই নির্দেশিত যা তার বাণী থেকে গৃহিত:

আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর যারা তাঁর নামে বিকৃতি ঘটায়। তারা যা করত অচিরেই তাদেরকে তার প্রতিফল দেয়া হবে।আল আরাফ : ১৮০

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, দু‘আকারীর জন্য এ কথা বলা মাকরূহ যে, (হে আল্লাহ!) আমি তোমার নিকট অমুকের উসীলায় কিংবা তোমার নবীগণ ও তোমার রাসূলদের উসিলায় ও তোমার কাবা ঘর ও মাশআরে হারাম (অর্থাৎ পবিত্র নিদর্শনাবলী) এর উসীলায় প্রার্থনা করছি।

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, কারো জন্য উচিত নয় যে, সে আল্লাহকে তার নাম ছাড়া ডাকবে। আর আমি অপছন্দ করি তোমার ‘আরশের ইজ্জতের বন্ধনের উসিলায় অথবা তোমার সৃষ্টির অসীলায় বলা।

 দ্বিতীয়ত: সিফাত সাব্যস্ত এবং জাহমিয়্যাদের প্রতিবাদ তার বাণী:

তিনি বলেন, আল্লাহকে মাখলুকের গুণে গুণান্বিত করা যাবে না। আর তাঁর রাগ ও খুশি তাঁর সিফাতসমূহ থেকে দুটি সিফাত নির্দিষ্ট ধরন ব্যতীত। এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদাহ। তিনি রাগ করেন ও খুশি হন। এমন বলা যাবে না যে, তার রাগ মানে তাঁর শাস্তি এবং তাঁর খুশি মানে তাঁর সাওয়াব। আমরা তাঁকে সেভাবেই গুণান্বিত করব যেভাবে তিনি তার নিজের সত্তাকে গুণান্বিত করেছেন। তিনি এক, অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাকে কেউ জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, ক্ষমতাবান, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা এবং প্রজ্ঞাবান। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপরে। তাঁর হাত মাখলুকের হাতের মতো নয় এবং তাঁর চেহারা সৃষ্টির চেহারার মতো নয়।

তিনি আরো বলেন, তার রয়েছে হাত, রয়েছে চেহারা ও নাফ্স, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। অতএব কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা যা উল্লেখ করেছেন, যেমন তাঁর চেহারা, হাত ও নাফসের উল্লেখ তা সব তাঁর সিফাত নির্দিষ্ট ধরন ছাড়াই। এমন বলা যাবে না যে, তাঁর হাত হলো তার কুদরত বা তার নি‘আমত। কারণ এতে সিফাতকে বাতিল করা হয়। আর এটিই কাদারিয়া ও মু‘তাযিলাদের কথা।

তিনি আরো বলেন, কারো জন্য আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে কথা বলা উচিত নয়। বরং তিনি নিজেকে যে গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত করেছেন তাকে তা দ্বারাই গুণান্বিত করতে হবে নিজস্ব রায়ের উপর ভিত্তি করে তাঁর ব্যাপারে কিছু বলবে না। বিশ্বজাহানের রব আল্লাহ তা‘আলা সুমহান।

যখন তাকে নুযুলে ইলাহী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো তিনি বলেন, তিনি নাযিল হন কোনো ধরন ছাড়াই।

আবূ হানীফা বলেন, আল্লাহকে উপর থেকে ডাকা হবে নীচ থেকে নয়। কারণ, নীচ কোন ভাবেই রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের গুণ হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, তিনি রাগ করেন ও সন্তুষ্ট হন। এ কথা বলা যাবে না যে, তার রাগ তার শাস্তি এবং তার সন্তুষ্টি তার সাওয়াব।

তিনি আরো বলেন, তিনি তাঁর কোনো সৃষ্টির মতো নন এবং তাঁর কোন মাখলুক তাঁর মতো নয়। তিনি তাঁর নাম ও সিফাতসমূহ দ্বারা সর্বদা গুণান্বিত রয়েছেন এবং সর্বদা থাকবেন।

তিনি আরো বলেন, তাঁর সিফাতসমূহ মাখলুকের সিফাতসমূহের বিপরীত। তিনি জানেন, তবে আমাদের জানার মতো নয়। তিনি ক্ষমতা রাখেন, তবে আমাদের ক্ষমতার মতো নয়, তিনি দেখেন তবে আমাদের দেখার মতো নয়। তিনি শোনেন তবে আমাদের শোনার মতো নয়। তিনি কথা বলেন তবে আমাদের কথার মতো নয়।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলাকে মাখলুকের গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে মানুষের কোনো গুণ দ্বারা গুণান্বিত করবে সে কুফরী করল।

তিনি আরো বলেন, আর তার সিফাতসমূহ সত্তাগত ও কর্মগত। সত্তাগত সিফাতগুলো হচ্ছে হায়াত, কুদরাত, ইলম, কালাম, শ্রবন, দর্শন এবং ইচ্ছা। আর কর্মগত সিফাতগুলো হচ্ছে, সৃষ্টি করা, রিযিক দেওয়া, আবিষ্কার করা, উদ্ভাবন করা, তৈরী করাসহ অন্যান্য কর্মগত সিফাত। তিনি তাঁর নামসমূহ ও সিফাতসমূহ দ্বারা আদিতে বিশেষিত ছিলেন এবং অনন্তেও থাকবেন।

তিনি আরো বলেন, তিনি তাঁর কর্মগত বিশেষণের মাধ্যমে সর্বদা কর্মরত। কর্ম করা তাঁর অনাদি সিফাত। আর আল্লাহ তাআলা হলেন কর্তা। আর কর্ম তাঁর অনাদি সিফাত। আর কর্মের ফলাফল মাখলুক, তবে আল্লাহ তাআলার কর্ম মাখলুক নয়।

তিনি আরো বলেন, যে বলে আমার রব আসমানে না যমীনে, আমি তা জানি না, সে কুফরী করল। অনুরূপভাবে সে ব্যক্তিও (কুফরী করল) যে বলে, তিনি আরশে, তবে আরশ যমীনে না আসমানে তা জানি না।

আর তিনি ঐ মহিলাকে বলেন, যে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে,তোমার ইলাহ কোথায় যার তুমি এবাদত কর? তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা আসমানে যমীনে নয়। ফলে তাঁকে এক ব্যক্তি বলল, আল্লাহর বাণীটি দেখেছেন ?আর তিনি তোমাদের সাথেই।আল হাদীদ : ৪তিনি বললেন, তা হলো যেমন তুমি কোন ব্যক্তিকে লিখ, আমি তোমার সাথেই আছি, অথচ তুমি তার থেকে অদৃশ্যে।

তিনি বলেন, অনুরূপভাবে আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপরে, তবে তা তার মাখলুকের হাতসমূহের মতো নয়।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ আসমানে রয়েছেন যমীনে নয়। ফলে তাকে এক লোক বলল, আল্লাহ তাআলার বাণীটি দেখেছেন ?আর তিনি তোমাদের সাথেই।আল হাদীদ : ৪তিনি বললেন, তা হলো যেমন তুমি কোন ব্যক্তিকে লিখ, আমি তোমার সাথেই আছি অথচ তুমি তার থেকে অদৃশ্যে।

তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা (মুসার সাথে) কথা বলেছেন; মূসা আলাইহিস সালাম (আল্লাহর সাথে) কথা বলেননি।

তিনি বলেন, তিনি নিজে কথা বলার কারণেই কথক (মুতাকাল্লিম) আর কালাম হলো একটি অনাদি সিফাত।

তিনি বলেন, আর তিনি কথা বলেন তবে আমাদের কথার মতো নয়।

তিনি বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কথা শুনেছেন। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন।আন নিসা : ১৬৪

তিনি বলেন, কথা আল্লাহ তা‘আলাই বলেছেন; মূসা আলাইহিস সালাম কথা বলেননি।

তিনি বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম, মাসাহেফে লিপিবদ্ধ, অন্তরে সংরক্ষিত এবং যবানে পঠিত। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিলকৃত।

তিনি বলেন, কুরআন মাখলুক নয়।

 ইমাম আবূ হানীফার বাণীসমূহ:তাকদীরের বিষয়ে

এক লোক ইমাম আবূ হানীফার এর নিকট তাকদীর—বিষয়ে বিতর্ক করার জন্যে আসল। তিনি তাকে বললেন, তুমি কি জান না যে, তাকদীরে দৃষ্টি দানকারী সূর্যের দুই চোখে দৃষ্টি দানকারীর মতো। যত বেশি দৃষ্টি দিবে তত বেশী হয়রানি বাড়বে।

ইমাম আবূ হানিফা বলেন, আল্লাহ তা‘আলা সকল সৃষ্টি সম্পর্কে তার সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই অবগত ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা অস্তিত্বহীন বস্তুকে তার অস্তিত্বহীন অবস্থায় অস্তিত্বহীন হালতে জানেন। তিনি যখন তা সৃষ্টি করবেন কেমন হবে তাও তিনি জানেন। আল্লাহ তাআলা অস্তিত্বশীল বস্তুকে অস্তিত্বশীল অবস্থায় অস্তিত্বশীল হালতে জানেন এবং তার ধ্বংস কিভাবে হবে তাও তিনি জানেন।

ইমাম আবূ হানিফা বলেন, আর তার তাকদীর লাওহে মাহফুজে রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আর আমরা স্বীকার করি যে, আল্লাহ তাআলা কলমকে লিখার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন কলম বলল, হে আমার রব! আমি কি লিখবো? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে তা লিপিবদ্ধ করো। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন,আর তারা যা করেছে, সব কিছুই ‘আমলনামায়’ রয়েছে।আর ছোট বড় সব কিছুই লিখিত আছে।আল-কামার : ৫২,৫৩

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর চাওয়া ছাড়া কিছুই হয় না।

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, আল্লাহ সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করেছেন, তবে কোন বস্তু থেকে নয়।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করার আগেই স্রষ্টা ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা স্বীকার করি যে, বান্দা তার আমল, তার স্বীকারোক্তি ও তার জ্ঞানসহই মাখলুক। কর্তাই যখন মাখলুক তার কর্ম মাখলুক হওয়ার আরো বেশি উপযুক্ত।

তিনি বলেন, বান্দাদের সবকর্ম যেমন নড়চড় করা ও স্থীর থাকা তাদেরই উপার্জন, তবে আল্লাহ তাআলা তার স্রষ্টা। আর এ সবই তার চাওয়া, ইলম, ফায়সালা ও নির্ধারণ দ্বারা হয়।

ইমাম আবূ হানীফা আরো বলেন, বান্দাদের সবকর্ম যেমন নড়চড় করা ও স্থীর থাকা প্রকৃত পক্ষে তাদের উর্পাজন, আর তা সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। এ গুলো সবই তাঁর চাওয়া, ইলম, ফায়সালা ও নির্ধারণ অনুযায়ী হয়। নেক আমলসমূহ আল্লাহর আদেশ এবং তার মুহাব্বত, সন্তুষ্টি, ইলম, চাওয়া, ফয়সালা ও নির্ধারণ অনুযায়ী অবধারিত হয়েছে। আর পাপসমূহ তাঁর ইলম, ফায়সালা, নির্ধারণ ও চাওয়া অনুযায়ী হয়, তবে তাঁর মুহাব্বত, সন্তুষ্টি ও তাঁর নির্দেশে হয় না।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তাআলা মাখলুককে কুফর ও ঈমান থেকে মুক্তাবস্থায় সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি তাদেরকে সম্বোধন করেছেন, আদেশ দিয়েছেন ও নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কুফরী করলো আল্লাহ তাকে অপধস্থ করার কারণেই সে নিজের কর্ম, অস্বীকার ও তার সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার দ্বারা কুফরী করলো। আর যে ব্যক্তি ঈমান আনয়ন করলো সে আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্য প্রাপ্ত হয়েই নিজের কর্ম, স্বীকারোক্তি ও সত্যারোপ দ্বারা ঈমান আনয়ন করলো।

আর তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আদম সন্তানদের তার মেরুদণ্ড থেকে পরমাণুর আকৃতিতে বের করেছেন, তারপর তাদের জ্ঞানবান করেছেন। তারপর তাদের সম্বোধন করেছেন ও ঈমান আনার নির্দেশ দিযেছেন এবং কুফর থেকে নিষেধ করেছেন, ফলে তারা তার রুবুবিয়্যাত স্বীকার করে। এটি ছিল তাদের ঈমান। তারা এ ফিতরাতের ওপর জন্ম গ্রহণ করে। তারপর যে কুফরী করল সে (ফিতরাত) পরিবর্তন ও বিকৃতি করল। আর যে ঈমান আনল ও বিশ্বাস করল সে তার ওপর অটুট থাকল ও স্থায়ী হল।

তিনি আরো বলেন, তিনিই সবকিছু নির্ধারণ ও ফায়সালা করেছেন। দুনিয়া ও আখিরাতে কোনো কিছুই হয় না তার চাওয়া, ইলম, ফায়সালা, নির্ধারণ ও লাওহে মাহফুযে তার লিখনি ছাড়া।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তার সৃষ্টির কাউকে কুফরের ওপর বাধ্য করেন নি আর না ঈমানের ওপর, তবে তিনি তাদেরকে অসংখ্য ব্যক্তিরূপে সৃষ্টি করেছেন। ঈমান ও কুফর বান্দাদের কর্ম। যে কুফরী করে তার কুফরী করা অবস্থায় আল্লাহ তাকে কাফির বলেই জানেন। তারপর যখন সে ঈমান আনে তিনি তাকে মুমিন হিসেবে জানেন এবং তার ইলমের কোনো পরিবর্তন ছাড়া তিনি তাকে ভালো বাসেন।

 ইমাম আবূ হানীফা এর বাণীসমূহঈমান বিষয়ে

তিনি বলেন, ঈমান হলো স্বীকার করা ও বিশ্বাস করা

তিনি আরো বলেন, ঈমান হলো মুখে স্বীকার করা ও অন্তরে বিশ্বাস করা। শুধু মুখের স্বীকারোক্তির নাম ঈমান হয় না। এটিই বর্ণনা করেছেন ইমাম তাহাবী ইমাম আবূ হানীফা ও তার দু‘জন সাথী থেকে।

ঈমাম আবূ হানীফা বলেন, ঈমান বাড়ে না এবং কমেও না।

(সংকলক বলেন) আমি বলছি, ঈমান বৃদ্ধি না হওয়া ও না কমা মর্মে তার বাণী এবং ঈমানের নামকরণের ক্ষেত্রে তার আরেকটি বাণী যে, ঈমান হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাস ও মুখে স্বীকার করা আর আমল ঈমানের হাকীকত থেকে বাইরের জিনিস। বস্তুত ঈমানের ক্ষেত্রে এ দু’টি বিষয়ই ইসলামের অন্যান্য ইমাম যেমন মালিক, শাফে‘ঈ, আহমাদ, ইসহাক, বুখারী প্রমুখের আকীদাহ ও ইমাম আবূ হানীফার আকীদাহর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। তবে হক তাদের সাথেই রয়েছে।

ঈমাম আবূ হানীফার কথা সত্যকে পাশ কাটিয়ে গেছে, তবে তিনি উভয় অবস্থায় সাওয়াব প্রাপ্ত হবেন। ইবনু আব্দুল বারর ও ইবনু আবীল ইয্য এর আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, আবূ হানীফা তার এ মত থেকে ফিরে এসেছেন। আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।

 ইমাম আবূ হানীফা এর বাণীসাহাবীদের বিষয়ে

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সাহাবীর নাম সুনাম ছাড়া উল্লেখ করবো না।

তিনি আরো বলেন, রাসূলের সাহাবীদের কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো না এবং কাউকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বন্ধু বানাবো না।

এবং তিনি বলেন, রাসূলের সান্নিধ্যে তাদের সামান্য সময় অবস্থান করা আমাদের কারো সারা জীবনের আমল হতে উত্তম, যদিও তা দীর্ঘ হয়।

এবং তিনি বলেন, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর এ উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি হলো আবূ বকর সিদ্দীক, তারপর উমার, তারপর উসমান তারপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন।

এবং তিনি বলেন, রাসূলের পর সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি আবূ বকর, উমার, উসমান এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সাহাবীর ভালো আলোচনা ছাড়া সমালোচনা থেকে বিরত থাকবো।

 ইলমুল কালাম ও দীনের বিষয়ে তর্কবিতর্ক করা থেকে তার নিষেধ করা

ইমাম আবূ হানীফা বলেন, প্রবৃত্তির অনুসারীরা বাসরাতে অনেক। আমি ইলমে কালামকে সবচেয়ে সম্মানি ইলম ধারণা করে তাতে বিশেবারের অধিক প্রবেশ করি; কখনো তাতে একবছর বা তার চেয়ে বেশি আবার কখনো কম সময় অবস্থান করি।

তিনি আরো বলেন, আমি ইলমু কালাম (তর্কশাস্ত্র) শিখে-শিখে সে স্তরে পৌঁছলাম যে স্তরে পৌঁছার কারণে আমার দিকে আঙ্গুলসমূহ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়। আর আমি হাম্মাদ ইবন আবূ সুলাইমানের মজলিসের নিকটেই বসতাম। একদা এক মহিলা এসে বলল, এক ব্যক্তির একজন বাঁদী স্ত্রী আছে, সে তাকে সুন্নাহ পদ্ধতিতে তালাক দিতে চায়, তাকে কয় তালাক দিবে?

আমি বুঝতে পারলাম না তাকে কি বলব, তাই আমি তাকে নির্দেশ দিলাম যেন হাম্মাদকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করে এবং ফিরে এসে যেন আমাকে জানায়। সে হাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, হায়েয এবং সহবাস থেকে মুক্ত পবিত্র অবস্থায় তাকে এক তালাক দেবে তারপর দুই হায়েয পর্যন্ত এ অবস্থায় রেখে দেবে। তারপর যখন সে গোসল করে পবিত্র হবে, তখন সে অন্যান্য স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যাবে। মহিলাটি ফিরে এসে আমাকে বিষয়টি অবহিত করল। তখন আমি বললাম, ইলমুল কালামে আমার আর কোনো দরকার নেই। আমি আমার জুতা দুটো নিলাম এবং হাম্মাদের নিকট এসে বসলাম।

এবং তিনি বলেন, আমর ইবন উবাইদকে আল্লাহ লা‘নত করুক। কারণ, সে মানুষের জন্য ইলমে কালাম যে বিষয়ে কথা বলাতে মানুষের কোন উপকার হয় না তার পথ খুলেছে।

এক লোক তাকে জিজ্ঞাসা করল, জিসিম ও আরায (আল্লাহর শরীর ও সিফাত) সম্পর্কে তর্কশাস্ত্রে মানুষ যা আবিষ্কার করেছে সে সস্পর্কে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, এগুলো হচ্ছে দার্শনিকদের কথাবার্তা। তুমি আসার ও সালাফদের পথ গ্রহণ কর। আর তুমি প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বস্তু থেকে বেঁচে থাকো। কারণ এ গুলো সবই বিদ‘আত।

হাম্মাদ ইবন আবি হানীফা বলেন, আমার পিতা একদিন আমার নিকট প্রবেশ করলেন। তখন আমার নিকট কালামবিদদের কতক লোক উপস্থিত ছিল। আমরা তখন কোনো একটি বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি করছিলাম। এতে আমাদের আওয়াজ উঁচা হলো। আমি যখন বাড়ির ভিতরে তার আগমন শুনতে পারলাম তার নিকট গেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে হাম্মাদ তোমার নিকট কারা? আমি বললাম অমুক অমুক। আমার নিকট যারা ছিল তাদের নাম উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, তোমরা কি নিয়ে আছো? আমি বললাম, (ইলমুল কালামের) অমুক অমুক অধ্যায়ে। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে হাম্মাদ! তুমি কালাম বর্জন করো।

তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে কখনো এলোমেলো পাইনি এবং এমন লোকদের মধ্যেও নয় যে কোন বিষয়ে আদেশ দিয়ে তা থেকে আবার নিষেধ করে। আমি তাকে বললাম, হে আমার পিতা, তুমিই কি আমাকে তা শেখার নির্দেশ দাও নি? তিনি বললেন, অবশ্যই, হে আমার ছেলে। তবে আমি আজকে তোমাকে তার থেকে নিষেধ করছি। আমি বললাম কেন? তিনি বললেন, হে আমার ছেলে কালামের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিতর্ককারী এরা সবাই যাদেরকে তুমি দেখেছো এক কথা ও একই দীনের ওপর ছিল, অবশেষে শয়তান তাদের সম্পর্ক নষ্ট করল এবং তাদের মাঝে দুশমণি ও মতবিরোধ সৃষ্টি করে দিল ফলে তারা বিপরীত মুখী হয়ে পড়ল।

এবং আবূ হানীফা আবূ ইউসূফকে বলেন, তুমি জন সাধারণকে দীনের মৌলিক বিষয়ে কালাম সম্পর্কে কথা বলা থেকে বিরত থাকবে। কারণ তারা এমন লোক যারা তোমার অন্ধ অনুকরণ করবে, ফলে সেটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যাবে।

এ হলো ইমাম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর কিছু বাণী এবং দীনের মৌলিক বিষয়ে তিনি যা বিশ্বাস করতেন তার বর্ণনা এবং ইলমুল কালাম ও মুতাকাল্লিমীনের বিপক্ষে তার অবস্থান।

 তৃতীয় অধ্যায়

 ইমাম মালেক ইবন আনাসের আকীদাহ

 তাওহীদ বিষয়ে তাঁর বাণী:

হারাভী শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : ইমাম মালেককে কালাম (তর্কশাস্ত্র) ও তাওহীদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, নবীর প্রতি এ ধারণা করা অসম্ভব যে, তিনি তার উম্মতকে এস্তেঞ্জা শিখিয়েছেন অথচ তাদের তাওহীদ শিখাননি। তাওহীদ হলো তাই যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যেমন : “আমাকে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা বলবে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। যার দ্বারা জান ও মাল নিরাপদ থাকে তাই প্রকৃত তাওহীদ।

দারাকুতনী ওয়ালীদ ইবন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালেক, সাওরী, আওযা‘ঈ ও লাইস ইবন সা‘আদকে সিফাত সংক্রান্ত হাদীসসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বললেন, এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দাও।

ইবন আবদুল বার বলেন, ইমাম মালেককে জিজ্ঞাসা করা হলো, কিয়ামতের দিন কি আল্লাহকে দেখা যাবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ । আল্লাহ আয্যা অজাল্লা বলেন,সেদিন কতক মুখমন্ডল হবে হাস্যোজ্জ্বল। তাদের রবের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপকারী।আল-কিয়ামাহ : ২২আর তিনি অপর সম্প্রদায়ের জন্য বলেন,কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।আল-মুতাফফিফীন : ১৫আর কাযী আয়ায ইবন নাফে ও আশহাব থেকে ‘তারতীবুল মাদারিক’ নামক গ্রন্থে বলেন, তারা উভয়ে বললো : হে আবূ আব্দুল্লাহ তাদের একদল কি অপর দলের চেয়ে বেশি হবে?সেদিন কতক মুখমন্ডল হবে হাস্যোজ্জ্বল। তাদের রবের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপকারী।তারা আল্লাহর দিকে দৃষ্টি দেবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদের এ দু’চোখ দ্বারা। আমি তাকে বললাম, কতক সম্প্রদায় বলে, আল্লাহর দিকে তাকানো যাবে না। এখানে দেখার অর্থ হলো, সাওয়াবের অপেক্ষা করা। তিনি বললেন, তারা মিথ্যা বলেছে, বরং আল্লাহর দিকেই তাকানো হবে। তুমি কি মূসা আলাইহিস সালাম এর কথা শোননি? তিনি বলেছেন, “হে আমার রব! আপনি আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখব”(আল-আরাফ : ১৪৩) তুমি কি মনো করো মূসা তার রবের নিকট অসম্ভব কিছু চেয়েছেন? আল্লাহ বলেন,তুমি আমাকে কখনো দেখবে না।আল-আরাফ : ১৪৩অর্থাৎ, দুনিয়াতে। কারণ, এটি হলো ক্ষণস্থায়ী ঘর। আর অস্থায়ী বস্তু দ্বারা চিরস্থায়ী বস্তু দেখা যায় না। যখন তারা স্থায়ী ঘরের দিকে যাবে তখন তারা স্থায়ী বস্তু দ্বারা স্থায়ী বস্তু দেখবে। আল্লাহ বলেন,কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।আল-মুতাফফিফীন : ১৫

আবূ নু‘আইম জা‘ফর ইবন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমরা মালেক ইবন আনাসের নিকট উপস্থিত ছিলাম এমতাবস্থায় এক লোক তার কাছে এসে বলল, হে আবূ আব্দুল্লাহ! “রহমান আরশের ওপর ওঠেছেন” কিভাবে ওঠেছেন ?

তার এ প্রশ্নের কারণে মালিক যে কষ্ট পেলেন অন্য কোনো কারণে তিনি এরূপ কষ্ট পাননি। তিনি যমীনের দিকে তাকালেন ও তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে ঠুকতে লাগলেন, এমনকি তার শরীরে ঘাম বেরিয়ে আসল। অতঃপর তিনি মাথা উঠালেন ও লাঠিটি নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, (আরশে ওঠার) ধরণ বোধগম্য নয়, তবে তার ওপরে ওঠা অজানা বিষয় নয়। আর তার প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং তার সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ‘আত। আর আমি তোমাকে একজন বিদ‘আতি মনে করি। আর তাকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন, ফলে তাকে বের করে দেওয়া হলো।

আবূ নু‘আইম ইয়াহইয়া ইবন রাবী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মালেক ইবন আনাসের নিকট উপস্থিত ছিলাম, এমতাবস্থায় তার কাছে এক লোক আসল ও বলল, হে আবূ আব্দুল্লাহ! যে বলে কুরআন মাখলুক আপনি তার সম্পর্কে কি বলেন?

মালিক বললেন, সে জিন্দিক—বদ্বীন, তাকে হত্যা করো। সে বলল, হে আবূ আব্দুল্লাহ! আমি একটি শোনা কথা বর্ণনা করছি। তিনি বললেন, আমি তা কারো হতে শুনিনি কেবল তোমার থেকেই শুনেছি। তিনি এ কথাকে মারাত্মক জানলেন।

ইবন আব্দুল বার আব্দুল্লাহ ইবন নাফে‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মালেক ইবন আনাস বলতেন, যে ব্যক্তি এ কথা বলে যে, কুরআন মাখলুক তাকে প্রহার করে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাওবা না করা পর্যন্ত বন্দী করে রাখা হবে।

আবূ দাউদ আব্দুল্লাহ ইবন নাফে‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক বলেছেন, আল্লাহ আসমানে আর তার ইলম সব জায়গায়।

 কাদর (তাকদীর) বিষয়ে তার বাণী

আবূ নু‘আইম ইবন ওহাব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মালেককে শুনেছি এক লোককে বলতেছেন: তুমি আমাকে গতকাল কাদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,আর যদি আমরা ইচ্ছা করতাম, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হিদায়াত দান করতাম। কিন্তু আমাদের কথাই সত্যে পরিণত হবে যে, নিশ্চয় আমরা জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব।আস-সাজদাহ: ১৩

সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যা বলেছেন, তা অবশ্যই হবে।

কাজী আয়ায বলেন, ইমাম মালেককে কাদারিয়্যাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো: তারা কারা? তিনি বললেন, যে বলে পাপসমূহ সৃষ্টি করা হয়নি। তাকে কাদারিয়্যাদের সম্পর্কে আরও জিজ্ঞাসা করা হলো? তিনি বললেন, কাদারিয়্যাহ যারা বলে সক্ষমতা বান্দার সাথেই রয়েছে, যদি তারা চায় আনুগত্য করে আর যদি চায় পাপ করে।

ইবন আবী আছেম সা‘ঈদ ইবন আব্দুল জাব্বার থেকে র্বণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালিক ইবন আনাসকে বলতে শুনেছি, তাদের বিষয়ে আমার মতামত হলো তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবা করে ভালো অন্যথায় তাদের—কাদারিয়্যাদের—হত্যা করা হবে।

ইবন আব্দুল বার বলেন, মালেক বলেছেন, আমি কোনো কাদারিকে নির্বোধ, আহমক ও মূর্খ ব্যতীত দেখিনি।

ইবন আবী আছেম মারওয়ান ইবন মুহাম্মাদ আত-তাতারী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালেক ইবন আনাসকে কাদারীকে বিবাহ করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি? তখন তিনি তিলাওয়াত করেন:একজন মু’মিন বান্দা একজন মুশরিক অপেক্ষা উত্তম।আল-বাকারাহ : ২২১

কাজী আয়ায বলেন, মালেক বলেছেন, কাদারীর সাক্ষ্য বৈধ নয়, আর না খারেজী ও রাফেযীর।

কাজী আয়ায বলেন, কাদারিয়্যাদের সম্পর্কে মালেককে জিজ্ঞাসা করা হলো, আমরা কি তাদের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থাকবো? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যখন সে নিশ্চিতভাবে তার আকীদাহ জানবে। অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছেন, তাদের পিছনে সালাত পড়বে না ও তাদের থেকে হাদীস গ্রহণ করবে না। আর যদি তোমরা তাদেরকে কোন ছিদ্রের মধ্যেও পাও তাহলে সেখান থেকে তাদেরকে বের করে দাও।

 ঈমান বিষয়ে তার বাণী:

ইবন আব্দুল বারর আব্দুর রায্যাক ইবন হুমাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন, আমি ইবন জুরাইজ, সুফিয়ান সাওরী, মা‘মার ইবন রাশেদ, সুফীয়ান ইবন উয়াইনাহ ও মালেক ইবন আনাসকে শুনেছি তারা বলেন, ঈমান হলো কথা ও আমল (উভয়ের সমষ্টি এবং) বাড়ে ও কমে।

আবূ নু‘আইম আব্দুল্লাহ ইবন নাফে‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক ইবন আনাস বলতেন, ঈমান হলো কথা ও আমল।

ইবন আব্দুর বারর আশহাব ইবন আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক বলেছেন, মানুষ যোল মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেন। তারপর তাদের বাইতুল্লাহর দিকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন আল্লাহ তা‘আলা বললেন, (অর্থ) “আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ঈমানকে বিনষ্টকারী নয়”। অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে আদায়কৃত সালাত। মালেক বলেন, এ আয়াত দ্বারা আমি মুরজি’আদের কথা “সালাত ঈমানের অংশ নয়” প্রত্যাখ্যান করি।

 সাহাবীদের বিষয়ে তাঁর বাণী:

আবূ নু‘আইম আব্দুল্লাহ আল-আম্বারী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক ইবন আনাস বলেন, যে ব্যক্তি রাসূলের কোনো সাহাবীকে খাট করল অথবা তার অন্তরে তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ থাকল তার জন্য মুসলিমদের গণীমতে কোন অংশ নেই। তারপর তিনি আল্লাহর বাণী তিলাওয়াত করলেন:যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না।আল-হাশর : ১০

অতএব যে ব্যক্তি তাদেরকে খাট করল অথবা তার অন্তরে তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ রাখল তার জন্য গণীমতে কোন অধিকার নেই।

আবূ নু‘আইম যুবাইরের সন্তানদের থেকে কোনো এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমরা একদা মালেকের নিকট ছিলাম। তখন তাঁরা এক ব্যক্তির আলোচনা করলেন যে রাসূলের সাহাবীগণের সমালোচনা করে। তখন মালেক এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন:মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর।অবশেষে পৌঁছলেনযা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন।আল-ফাতহ : ২৯

তারপর মালেক বললেন, যে ব্যক্তি নিজের অন্তরে রাসূলের কোনো সাহাবীর প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে ভোর করবে তাকে অবশ্যই এ আয়াত আক্রান্ত করবে।

কাজী আয়ায আশহাব ইবন আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: আমরা মালেকের নিকট ছিলাম এ সময় একজন আলাভী এসে তার নিকট অবস্থান নিল। আর তারা সচরাচর তার মজলিসে আসত। সে হে আবূ আব্দুল্লাহ বলে মালেককে ডাকল, তিনি তার জন্য মাথা তুললেন। আর কেউ তাকে ডাকলে তিনি মাথা তুলার চেয়ে বেশী উত্তর দিতেন না। তারপর লোকটি তাকে বলল, আমি তোমাকে আমার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে দলীল হিসেবে দাঁড় করাতে চাই, যখন আমি তাঁর সামনে আসবো এবং তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তখন আমি তাঁকে বলবো: মালেক আমাকে বলেছেন।তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি বলো।সে (আলাভী) বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর সর্বোত্তম মানুষ কে?তিনি বললেন, আবূ বকর, আলাবী বলল, তারপর কে? মালেক বললেন, তারপর উমার। আলাবী বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, নির্যাতিতভাবে নিহত খলীফা উসমান। আলাবী বলল, আল্লাহর কসম আমি আর কখনো তোমার মজলিসে বসবো না।মালেক তাকে বললেন, তোমার ইচ্ছা।

 ইলমুল কালাম এবং দীনের বিষয়ে ঝগড়া করা থেকে তার নিষেধ করা:

ইবন আব্দুল বারর মুস‘আব ইবন আব্দুল্লাহ আয-যুবাইরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক ইবন আনাস বলতেন, দীনের বিষয়ে বিতর্ক করাকে আমি অপছন্দ করি। মদীনাবাসীগণ সর্বদা তা অপছন্দ করতেন এবং তা থেকে নিষেধ করতেন। যেমন জাহামের মতামত নিয়ে কথা বলা, কাদার ও এ ধরনের বিষয়ে কথা বলা। তিনি যে বিষয়ে আমল আছে সে বিষয়েই কথা বলতে পছন্দ করতেন। কিন্তু আল্লাহর দীনের বিষয়ে বা আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলা অপেক্ষা চুপ থাকা আমার কাছে বেশি প্রিয়। কারণ, আমি আমার শহরবাসীকে দেখেছি তারা দীনের যে বিষয়ের অধীন আমল নেই সে বিষয়ে কথা বলতে নিধেধ করতেন।

আবূ নু‘আইম আব্দুল্লাহ ইবন নাফে‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালেককে বলতে শুনেছি: যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শির্ক করা ব্যতীত সব ধরনের কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়, অতঃপর সে এসব বিদ‘আত ও প্রবৃত্তি—কালাম শাস্ত্র—থেকে মুক্ত হয় সে জান্নাতে যাবে।

হারোভী ইসহাক ইবন ঈসা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মালেক বলেছেন, যে ব্যক্তি ইলমুল কালামের মাধ্যমে দীন তালাশ করবে সে নাস্তিকে পরিণত হবে, যে ব্যক্তি স্পর্শমণি দ্বারা সম্পদ তালাশ করবে সে সর্বহারা হবে, আর যে ব্যক্তি বিরল হাদীস তালাশ করবে সে মিথ্যা বলবে।

খতীব ইসহাক ইবন ঈসা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: আমি মালেক ইবন আনাসকে দীনের বিষয়ে ঝগড়ার নিন্দা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, যখনই এক ব্যক্তি থেকে অধিক ঝগড়াটে অপর ব্যক্তি আমাদের কাছে আসে তখন সে আমাদের কাছে চায় যেন, আমরা জীবরীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যা নিয়ে এসেছেন তা যেন আমরা প্রত্যাখ্যান করি।

হারাবী আব্দুর রহমান ইবন মাহদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালেকের নিকট প্রবেশ করলাম তখন তার নিকট এক লোক কিছু জিজ্ঞাসা করছিল। তিনি বললেন, সম্ভাবত তুমি আমর ইবন উবাইদের ছাত্র। তার উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। কারণ সেই ইলমুল কালামের বিদ‘আত আবিষ্কার করেছে। কালাম বা তর্কশাস্ত্র যদি ইলম হতো তাহলে সাহাবী, তাবে‘ঈগণ এ ব্যাপারে কথা বলতেন। যেমনভাবে তারা শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও বিধি-বিধান সম্পর্কে কথা বলেছেন।

হারাভী আশহাব ইবন আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি মালেককে বলতে শুনেছি, তোমরা বিদ‘আত থেকে বেঁচে থাকো। তাকে বলা হলো, হে আবূ আব্দুল্লাহ! বিদ‘আত কি? তিনি বললেন, বিদ‘আতী হলো যারা আল্লাহর নাম, তাঁর সিফাতসমূহ, তার কালাম, ইলম ও কুদরাত সম্পর্কে ইলমুল কালাম দ্বারা কথা বলে এবং সাহাবী ও উত্তমভাবে তাদের অনুসারী তাবে‘ঈগণ যে বিষয়ে চুপ ছিলেন সে বিষয়ে তারা চুপ থাকে না।

আবূ নু‘আইম শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, মালেক ইবন আনাসের নিকট যখন কোন প্রবৃত্তির পুজারী আসত তিনি বলতেন, আমি আমার রব ও দীনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর আছি। আর তুমি সন্দেহ পোষণকারী। তাই তুমি সন্দিহান লোকের কাছে যাও এবং তার সাথে বিতর্ক কর।

ইবন আব্দুল বার মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন খুয়াইয মিনদাদ আল-মাসরী আল-মালেকী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি তার কিতাব আল-খিলাফে ইজারা অধ্যায়ে লিখেছেন, ইমাম মালেক বলেছেন, প্রবৃত্তির পুজারী, বিদ‘আতী ও নজুমীদের কিতাবসমূহে বন্ধকী লেন-দেন করা বৈধ নয়। তিনি কিছু কিতাবের নাম উল্লেখ করেন। তারপর তিনি বলেন, আমাদের সাথীদের নিকট প্রবৃত্তির পুজারী ও বিদআতীদের কিতাব হলো কালামী সম্প্রদায় থেকে মু‘তাযিলা ও অন্যান্যদের কিতাব। এ বিষয়ে ইজারাহ বাতিল।

তাওহীদ, ঈমান, সাহাবীগণ এবং ইলমে কালাম ও অন্যান্য বিষয়ে ইমাম মালেকের মতামত ও অবস্থান এখানে তুলে ধরা হলো।

 চতুর্থ অধ্যায়

 ইমাম শাফে‘ইর আকীদাহ

 তাওহীদ বিষয়ে তার বাণী

ইমাম বাইহাহী রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে অথবা তার নামসমূহ হতে কোন নাম দ্বারা শপথ করে তারপর সে কসম ভঙ্গ করল, তার ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কিছুর শপথ করে যেমন কোন লোক বলল, কা‘বার কসম, আমার বাপের কসম ইত্যাদি তারপর সে কসম ভঙ্গ করল, তার ওপর কোন কাফফরাহ নেই। অনুরূপভাবে যদি কোন ব্যক্তি বলে, আমার জীবনের কসম, তার ওপর কোন কাফফরাহ নেই। গাইরুল্লাহর নামে শপথ করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী অনুযায়ী মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার কসম খেকে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি শপথ করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে।

ইমাম শাফে‘ঈ এর কারণ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর নামসমূহ মাখলুক নয়। সুতরাং যে আল্লাহর নামের দ্বারা শপথ করল তারপর ভঙ্গ করল, অবশ্যই তাঁর ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব।

ইবনুল কাইয়্যিম ‘ইজতিমাউল জুয়ুশ’ নামক গ্রন্থে শাফে‘ঈ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি যে সুন্নাতের ওপর আছি এবং আমার আহলে হাদীস ভাইদেরকে যে সুন্নাতের উপর দেখেছি ও যাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি যেমন সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যগণ, তাওহীদের বিষয়ে তাদের মত হলো এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর স্বীকার করা যে, আল্লাহ স্বীয় আসমানে তার আরশের উপর আছেন। তিনি যেভাবে চান তার মাখলুকের নিকটবর্তী হন। আর আল্লাহ যেভাবে চান দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন।

আর আয-যাহবী আল-মুযানী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছন: আমি বললাম: তাওহীদের বিষয়ে আমার অন্তরে যা রয়েছে এবং যার সাথে আমার অন্তর সম্পৃক্ত হয়েছে তা দূর করার যদি কেউ থাকে, তাহলে তিনি হলেন (ইমাম) শাফে‘ঈ। ফলে আমি তার নিকট গেলাম তখন তিনি মিসরের মসজিদে ছিলেন। যখন আমি তার সামনে বসলাম, বললাম : তাওহীদ বিষয়ে আমার অন্তরে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, আর আমি জানি যে, আপনার জানার মতো আর কেউ জানে না। অতএব (এ বিষয়ে) আপনার ইলম কি? তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। অতঃপর বললেন, তুমি কি জান তুমি কোথায়? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটিই সেই জায়গা যেখানে আল্লাহ ফিরআউনকে ডুবিয়েছেন। তোমার কাছে কি পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সাহাবীগণ এ বিষয়ে কথা বলেছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, আসমানে কতটি তারকা আছে তুমি জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন: যত নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়েছে তার কয়টির প্রকৃতি ও উদয়-অস্ত জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সৃষ্টির একটি জিনিস তুমি তোমার চোখে দেখ, অথচ তার সম্পর্কে তুমি জান না, অথচ তুমি তার স্রষ্টার ইলম সম্পর্কে কথা বলছো!?

অতঃপর তিনি আমাকে ওযূ সম্পর্কীয় একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে আমি তাতে ভুল করি। তিনি মাসআলাটি চারটি ভাগ করলেন। আমি তার একটিতেও সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তখন তিনি বললেন, যার প্রতি তুমি দৈনিক পাঁচবার মুখাপেক্ষি হও, তার ইলম রেখে স্রষ্টার ইলম নিয়ে টানাটানি করছ। যখন তোমার অন্তরে এর উদ্রেক হয়, তখন তুমি আল্লাহর বাণীর দিকে ফিরে যাও:আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু।নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির মধ্যেসূরা আল বাকারাহ : ১৬৩, ১৬৪ সুতরাং মাখলুক দ্বারা খালেকের অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ দাও। আর যেখান তোমার জ্ঞান পৌঁছেনি সে বিষয়ে নিজেকে কষ্টে ফেল না।

ইবনু আব্দুল বারর ইউনুস ইবন আব্দুল আ‘লা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইমাম শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে বলতে শুনবে নাম এক জিনিষ আর নাম দ্বারা নামকরণকৃত বস্তু আরেক জিনিষ অথবা বলে এ জিনিষটি এ জিনিষ হয় তাহলে তুমি জেনে রাখো যে, সে যিনদীক।

শাফে‘ঈ স্বীয় কিতাব আর-রিসালায় বলেছেন, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য...যিনি তেমনই যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। তার মাখলুক তার বিষয়ে যা বর্ণনা করে তিনি তার উর্ধ্বে।

যাহবী সীয়ার গ্রন্থে শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সিফাতগুলো আমরা সাব্যস্ত করব এবং তুলনাকে তার থেকে অসাব্যস্ত করব। যেমনিভাবে তিনি তা নিজের থেকে অসাব্যস্ত করেছেন।“তার মতো কোন কিছু নেই”।আশ-শূরা : ১১।ইবন আব্দুল বার রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফিঈকে আল্লারহ বাণী সম্পর্কে বলতে শুনেছি।কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।আল-মুতাফফিফীন : ১৫

এ দ্বারা আমাদের জানিয়ে দেন যে, সেখানো কতক সম্প্রদায় এমন থাকবে যাদের আড়াল করা হবে না, তারা তার দিকে দেখবেন। তাকে দেখাতে তাদের কোন অসুবিধা হবে না।

লালাকায়ী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন ইদ্রীস আশ-শাফে‘ঈর দরবারে হাযির হলাম। তখন তার কাছে একটি মাটির টুকরা আনা হলো যাতে ছিল: আপনি আল্লাহর বাণী সম্পর্কে কি বলেন?কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।

শাফে‘ঈ বললেন, নারাজির কারণে যেহেতু তাদের আড়াল করা হয়েছে, এতে প্রমাণিত হয় যে সন্তুষ্টির কারণে তারা তাকে দেখবে। রবী‘ বলেন, আমি বললাম, হে আবূ আব্দুল্লাহ আপনি কি এ মত পোষণ করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ এ দ্বারাই আমি আল্লাহর দীনদারি গ্রহণ করি।

ইবন আব্দুল বার হারুদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবরাহীম ইবন ইসমাঈল ইবন উলাইয়্যাহ সম্পর্কে ইমাম শাফে‘ঈর নিকট আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, আমি প্রতিটি বিষয়ে তার বিরোধি এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বিষয়েও। সে যা বলে আমি তা বলি না। আমি বলি আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি পর্দার আড়াল থেকে মূসার সাথে কথা বলেছেন। আর সে বলে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি কালাম সৃষ্টি করেছেন যা পর্দার আড়াল থেকে তিনি মূসাকে শুনিয়েছেন।

লালাকা’ঈ রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে যে, কুরআন মাখলুক সে কাফির।

বাইহাকী আবূ মুহাম্মাদ আয-যুবাইরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক লোক শাফে‘ঈকে বলল, আপনি আমাকে কুরআন সম্পর্কে বলুন তা কি স্রষ্টা? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। সে বলল, তাহলে কি সৃষ্টি? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। তাহলে কি গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট)? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা হ্যাঁ। কুরআন যে গাইরে মাখলুক তার ওপর প্রমাণ কি? এ কথা শোনে শাফে‘ঈ মাথা উঁচা করলেন এবং বললেন, তুমি কি স্বীকার কর কুরআন আল্লাহর কালাম, সে বলল, হ্যাঁ। শাফে‘ঈ বললেন, এ বাক্যের মধ্যে বিষয়টি অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে,আত-তাওবাহ : ৫।আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন।আন-নিসা : ১৬৪।

শাফে‘ই বললেন, তুমি কি স্বীকার করো যে, আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল? বা আল্লাহ ছিল কিন্তু তার কালাম ছিল না? লোকটি বলল, বরং আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল। তিনি বলেন, শাফে‘ই মুচকি হাঁসি দিলেন এবং বললেন, হে কূফীগণ, তোমরা আশ্চর্য ধরনের কথা বলো, কারণ তোমরা স্বীকার করো যে, আল্লাহ সবকিছুর পূর্বে ছিলেন এবং তার কথাও ছিল। তাহলে তোমরা এ জাতীয় কথা কোথায় পেলে : কালামই আল্লাহ, অথবা (কালাম) আল্লাহ নন, অথবা (কালাম) গাইরুল্লাহ অথবা (কালাম) আল্লাহকে বাদ দিয়ে? লোকটি চুপ হয়ে গেল এবং বের হয়ে পড়ল।

জুযউল ই‘তিকাদ গ্রন্থ যা শাফে‘ঈর দিকে নিসবত করা হয়ে থাকে—তাতে আবূ তালেব আল আশারী থেকে বর্ণিত—: যার নস হলো, তিনি বলেন: আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে এবং তার প্রতি ঈমান আনয়ন সম্পর্কে শাফে‘ঈকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ তাবারাকা ও তা‘আলার জন্য রয়েছে নামসমূহ ও সিফাতসমূহ, যা নিয়ে নাযিল হয়েছে তার কিতাব এবং যার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহর মাখলুকের মধ্য থেকে যার নিকট প্রমাণ পৌঁছেছে যে, কুরআন এর (অর্থাৎ সিফতা ও নামসমূহের) বর্ণনাসহ নাযিল হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা তার নিকট সহীহভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, যা ইনসাফগার বর্ণনাকারীগণ তার থেকে পরম্পরায় বর্ণনা করেছেন, তার জন্যে তার বিরোধিতা করার কোন সুযোগ নেই। দলীল প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি কেউ তার বিরোধিতা করে সে আল্লাহকে অস্বীকার করল। আর যদি সংবাদ পৌঁছানোর পূর্বে অস্বীকার করে, তাহলে সে না-জানার কারণে ক্ষমা যোগ্য, কারণ তার ইলম গবেষণা ও চিন্তা দ্বারা অর্জন করা সম্ভবপর নয়।

এ ধরনের আল্লাহর আরো সংবাদ দেওয়া যে, তিনি অবশ্যই সর্বশ্রোতা। আর তাঁর জন্য রয়েছে দুটি হাত। কারণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:বরং তাঁর দুই হাত প্রশস্ত।আল-মায়েদাহ : ৬৪এবং তার জন্য রয়েছে ডান হাত, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।আয-যুমার : ৬৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে চেহারা, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:প্রতিটি বস্তুই ধ্বংস হবে। তবে তার চেহারা ছাড়া।আল-কাসাস : ৮৮এবং তার বাণীআর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা।আর-রহমান : ২৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে পা, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:এমনকি রব তাতে তাঁর পা রাখবেন।অর্থাৎ জাহান্নাম (এর ওপর)। কারণ, যে আল্লাহর রাস্তায় মারা গিয়েছে তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনসে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করেছে যে, তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাঁসছেন।আর তিনি প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে সংবাদ দেন। আর তিনি কানা নন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাজ্জালের আলোচনা করেন তখন বলেন:নিশ্চয় সে কানা আর তোমাদের রব কানা নন।আর মু’মিনগণ কিয়ামতের তাদের রবকে স্বচোক্ষে দেখবেন যেমনটি তারা চাঁদকে চৌদ্দ তারিখের রাত্রিতে দেখতে পাবেন এবং তার জন্য রয়েছে আঙ্গুল। রাসূলের কথা দ্বারা প্রমাণিত:এমন কোনো অন্তর নেই যা রহমানের আঙ্গুলসমূহ থেকে দু’আঙ্গুলের মাঝে নেই।আর এসব অর্থ (তথা সিফাত) যদ্বারা আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা তার নিজের সত্তাকে গুণান্বিত করেছেন এবং যদ্বারা গুণান্বিত করেছেন তাঁকে তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা ও গবেষণা দ্বারা যথাযথভাবে তা অনুভব করা যায় না এবং এগুলো না-জানার কারণে কাউকে কাফিরও বলা যায় না। তবে তার কাছে সংবাদ পৌঁছার পর, যদি অস্বীকার করে তবে তাকে কাফির বলা যাবে। আর যদি এ বিষয়ে বর্ণিত সংবাদ এমন হয় যা বুঝার ক্ষেত্রে শোনাটাই প্রত্যক্ষ করার স্থলাভিষিক্ত হয় তখন শ্রোতার ওপর তার যথাযথ অর্থ মেনে নেওয়া ও তার ওপর সাক্ষ্য দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমনটি সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনল এবং প্রত্যক্ষ করল। তবে আমরা এসব সিফাত সাব্যস্ত করব এবং সাদৃশ্যকে নাকোচ করবো যেমনটি তিনি তার নিজের সত্তা থেকে নাকোচ করেছেন। তিনি বলেন,তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।আশ-শূরা : ১১সর্বশেষ বিশ্বাস

 কাদর বিষয়ে তার বাণী

বাইহাকী রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈকে কাদার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

(কবিতা) (হে আল্লাহ) তুমি যা চাও তা হবেই যদিও তা আমি না চাই। আর আমি যা চাই তা যদি তুমি না চাও হবে না।

(কবিতা) (হে আল্লাহ!) তোমার ইলম অনুযায়ী বান্দাদের সৃষ্টি করেছো। সুতরাং তোমার ইলম অনুযায়ী চলে যুবক ও বৃদ্ধ।

(কবিতা) তুমি তার ওপর দয়া করেছ ও একে লাঞ্ছিত করেছ এবং একে সাহায্য করেছ ও তাকে পরিত্যাগ করেছ।

(কবিতা) তাদের কেউ হতভাগা আর সৌভাগ্যবান। আর তাদের কেউ কুশ্রী আর কেউ সুন্দর।

বাইহাকী শাফে‘ঈর গুণাবলির আলোচনা করতে গিয়ে বর্ণনা করেন: শাফে‘ঈ বলেছেন, নিশ্চয় বান্দাদের ইচ্ছা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার অনুগামী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা না হলে তারা ইচ্ছা করে না। কারণ মানুষ তাদের কর্মের স্রষ্টা নয়। বান্দাদের কর্মসমূহ আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি করার কারণে সৃষ্টি বা মাখলুক হয়েছে। আর ভাগ্যের ভালো ও মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। কবরের শাস্তি সত্য, কবরবাসীদের প্রশ্ন করা সত্য, পুনরুত্থান সত্য, হিসাব সত্য, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য। এ ছাড়া আরও যা সুন্নাতে বর্ণিত আছে সবই সত্য।

লালাকায়ী মুযানী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, কাদারী কে তুমি কি তা জানো? যে বলে আল্লাহ কোনো আমলকে সৃষ্টি করেননি যতক্ষণ না তার ওপর আমল করা হয়েছে।

বাইহাকী শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, কাদারিয়া সম্প্রদায় তারাই যাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:তারা এ উম্মাতের অগ্নিপুজক।যারা বলে আল্লাহ গুণাহ সম্পর্কে জানেন না যতক্ষণ তা সংঘটিত হয়।

বাইহাকী রাবী‘ ইবন সুলাইমান সূত্রে শাফেঈ সম্পর্কে বর্ণনা করেন, তিনি কাদারীর পিছনে সালাত আদায় করতে অপছন্দ করতেন।

 ঈমান বিষয়ে তার বাণী

ইবন আব্দুল বারর রাবী‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,: আমি শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি: ঈমান হচ্ছে কথা, আমল ও অন্তরের বিশ্বাস। তোমরা কি আল্লাহর বাণী দেখ না:আল্লাহ তোমাদের সালাতকে নষ্ট করার নন।আল-বাকারাহ : ১৪৩অর্থাৎ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে পড়া তোমাদের সালাত। অতএব আয়াতে সালাতকে ঈমান নামকরণ করা হয়েছে। আর তা হলো কথা, আমল ও বিশ্বাস।

বাইহাকী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি, ঈমান হলো কথা ও আমল এবং তা বাড়ে ও কমে।

বাইহাকী আবূ মুহাম্মাদ আয-যুবাইরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক লোক শাফে‘ঈকে বলল, কোন্ আমল আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম? শাফে‘ঈ বললেন, যা ছাড়া আমল কবুল করা হয় না। লোকটি বলল, সেটি কী? তিনি বললেন, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস যিনি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই। এটি সর্বোচ্চ আমল, সর্বশ্রেষ্ঠ আমল এবং ছাওয়াবের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড়।

লোকটি বলল, আপনি কি আমাকে ঈমান সম্পর্কে জানাবেন না? তা কি কথা ও আমল? নাকি আমল ছাড়া শুধু কথার নাম?শাফে‘ঈ বললেন, ঈমান হলো আল্লাহর জন্য আমল করা, আর কথা হলো এ সব আমলের অংশ বিশেষ।লোকটি বলল, বিষয়টি আমার জন্য ব্যাখ্যা করুন। যাতে আমি বুঝতে পারি।শাফে‘ঈ বলেছেন, ঈমানের একাধিক অবস্থা, স্তর ও ভাগ রয়েছে। তার একটি হলো পরিপূর্ণ যার পর আর কোন পূর্ণতা নেই। (আরেকটি হলো) দুর্বল ঈমান যার দুর্বলতা স্পষ্ট। (আরেকটি হলো) প্রাধান্যপ্রাপ্ত যার প্রাধান্যের অংশ বেশী।লোকটি বলল, ঈমান কি পরিপূর্ণ না হয়ে বাড়ে ও কমে?শাফে‘ঈ বললেন, হ্যাঁলোকটি বলল, তার প্রমাণ কি?শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের অঙ্গসমূহের উপর ঈমানকে ফরয করেছেন। তার মধ্যে একে বন্টন করেছেন এবং তার বিভিন্ন অঙ্গে ভাগ করে দিয়েছেন। তার অঙ্গসমূহ হতে কোনো অঙ্গ নেই, তবে তাকে আল্লাহর নির্দেশে ঈমানের এমন অংশ অবশ্যই সোপর্দ করা হয়েছে যা তার ন্যায় অপর অঙ্গকে প্রদান করা হয়নি।তার একটি হলো অন্তর, যা দ্বারা সে জ্ঞান লাভ করে, ভাবে ও বুঝে। আর এই অন্তরই হচ্ছে তার দেহের আমীর। তার মতামত ও নির্দেশ ব্যতিত অঙ্গসমূহ নড়চড় করে না ও প্রকাশ পায় না।তার মধ্যে দুই চোখ, যা দ্বারা সে দেখে। দুই কান, যা দ্বারা সে শোনে। দুই হাত যা দ্বারা সে ধরে। দুই পা যা দ্বারা সে হাঁটে। লজ্জাস্থান যার থেকে যৌন শক্তি পায়। তার জবান, যার দ্বারা সে কথা বলে এবং তার মাথা যাতে রয়েছে তার চেহারা।অন্তরের ওপর এমন কিছু ফরয করা হয়েছে যা জবানের ওপর করা হয়নি। দুই হাতের ওপর যা ফরয করা হয়েছে দুই পায়ের ওপর তা ফরয করা হয়নি এবং লজ্জা স্থানের ওপর যা ফরয করা হয়ে তা চেহারার ওপর ফরয করা হয়নি।আর অন্তরের ওপর আল্লাহর ফরয করা ঈমান হলো, স্বীকার করা, জানা, বিশ্বাস করা, সন্তুষ্টি ও মেনে নেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। তিনি কোন সঙ্গীনি ও সন্তান গ্রহণ করেননি। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী বা কিতাব যা এসেছে তা স্বীকার করাকেই আল্লাহ অন্তরের ওপর ফরয করেছেন। আর তা হলো তার কর্ম বা আমল:“তবে ঐ ব্যক্তি ছাড়া যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরী করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত, তবে যে তার অন্তর কুফরী দ্বারা উন্মুক্ত করে নিয়েছে”।আর-রা‘আদ : ২৮, ( সঠিক হচ্ছে: আন-নাহাল : ১০৬)তিনি আরো বলেন,যারা তাদের মুখে বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু তাদের অন্তর ঈমান আনেনি।আল মায়েদাহ : ৪১তিনি আরো বলেন,আর তোমরা যদি প্রকাশ কর যা তোমাদের অন্তরে রয়েছে অথবা গোপন কর, আল্লাহ সে বিষয়ে তোমাদের হিসাব নেবেন।আল-বাকারাহ: ২৮৪এ ঈমানই আল্লাহ অন্তরের ওপর ফরয করেছেন। আর তাই অন্তরের আমল এবং তাই হলো ঈমানের মাথা বা মূল।মুখের ওপর আল্লাহ ফরয করেছেন কথা বলা এবং অন্তর যা বিশ্বাস করে ও স্বীকার করে তা ব্যক্ত করা। এ বিষয়ে তিনি বলেন,তোমরা বলো, আমরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করলাম।আল বাকারাহ : ১৩৬এবং তিনি বলেছেনআর তোমরা মানুষের জন্য সুন্দর কথা বলো।আল বাকারাহ: ৮৩এটিই তা যা মুখে বলা এবং অন্তরের অবস্থা ব্যক্ত করাকে আল্লাহ মুখের ওপর ফরয করেছেন। আর তাই অন্তরের আমল ও ঈমান বিষয়ে তার ওপর ফরয।আল্লাহ কানের ওপর ফরয করেছেন যেন, তা আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি কর্ণপাত করা থেকে বেঁচে থাকে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে অবনত থাকে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,আর তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে এবং সেগুলো নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, তাহলে তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় নিবিষ্ট হয়, তা না হলে তোমরাও তাদের মত হয়ে যাবে।আন-নিসা : ১৪০অতঃপর ভুলে যাওয়ার স্থানকে বাদ দেন এবং আল্লাহ জাল্লা ওয়াআযযা বলেন:আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়,অর্থাৎ ফলে তুমি তাদের সাথে বসে পড়েছতবে স্মরণের পর যালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসো না।আল-আন‘আম : ৬৮এবং তিনি বলেছেনঅতএব বান্দাদেরকে সুসংবাদ দাও।যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে অতঃপর তার মধ্যে যা উত্তম তা অনুসরণ করে তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দান করেন। আর তারাই বুদ্ধিমান।আয-যুমার : ১৭, ১৮এবং তিনি বলেছেনঅবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে।যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত।তার এ বাণী পর্যন্ত:যাকাত আদায়কারীআল-মু’মিনুন : ১, ৪এবং তিনি বলেছেনযখন তারা অনর্থক কথা শোনে তা থেকে তারা বিমুখ থাকে।আল-কাসাস : ৫৫এবং তিনি বলেছেনএবং যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে তখন সসম্মানে চলে যায়।আল-ফুরকান : ৭২এটি তাই যা আল্লাহ তা‘আলা কানের ওপর ফরয করেছেন, যেমন যা শোনা তার জন্য হালাল নয় তা থেকে বিরত থাকা। এটিই তার আমল এবং এটিই ঈমানের অংশ।আর দুই চোখের ওপর ফরয হলো, তা দ্বারা যা দেখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা দেখবে না এবং তা থেকে চক্ষুদ্বয়কে অবনত রাখবে। আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে বলেন,মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে।আন-নূর : ৩০ ও ৩১ দু’টি আয়াত।তাদের কেউ তার ভাইয়ের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকবে এবং তার নিজের লজ্জাস্থানকে অপরের দৃষ্টি থেকে হিফাযত করবে।

এবং তিনি বলেছেন

অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে।

যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত।

তার এ বাণী পর্যন্ত:

যাকাত আদায়কারী

আল-মু’মিনুন : ১, ৪

এবং তিনি বলেছেন

যখন তারা অনর্থক কথা শোনে তা থেকে তারা বিমুখ থাকে।

আল-কাসাস : ৫৫

এবং তিনি বলেছেন

এবং যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে তখন সসম্মানে চলে যায়।

আল-ফুরকান : ৭২

এটি তাই যা আল্লাহ তা‘আলা কানের ওপর ফরয করেছেন, যেমন যা শোনা তার জন্য হালাল নয় তা থেকে বিরত থাকা। এটিই তার আমল এবং এটিই ঈমানের অংশ।

আর দুই চোখের ওপর ফরয হলো, তা দ্বারা যা দেখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা দেখবে না এবং তা থেকে চক্ষুদ্বয়কে অবনত রাখবে। আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে বলেন,

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে।

আন-নূর : ৩০ ও ৩১ দু’টি আয়াত।

তাদের কেউ তার ভাইয়ের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকবে এবং তার নিজের লজ্জাস্থানকে অপরের দৃষ্টি থেকে হিফাযত করবে।

আর তিনি বলেছেন, লজ্জা স্থানের হিফাযত বিষয়ে আল্লাহর কিতাবে যা রয়েছে তার অর্থ হচ্ছে ব্যভিচার থেকে হিফাযত করা, তবে এ আয়াত ব্যতীত। কারণ এখানে তার (অর্থাৎ লজ্জাস্থানের হিফাযত) অর্থ দৃষ্টি থেকে হিফাযত করা।

এটি তাই যা আল্লাহ দুই চোখের ওপর দৃষ্টিকে অবনত রাখা বিষয়ে ফরয করেছেন। আর তা চোখের আমল এবং তা ঈমানের অংশ।

অতঃপর তিনি অন্তর, কান এবং চোখের ওপর যা ফরয করেছেন তা একটি আয়াতেই বলে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন,আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।আল-ইসরা : ৩৬তিনি বলেছেন: অর্থাৎ আর তিনি লজ্জাস্থানের ওপর ফরয করেছেন যে, সে তার লঙ্গন করবে না আল্লাহ যা তার ওপর হারাম করেছেন।“আর যারা তাদের নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী”।আল-মু‘মিনূন : ৫এবং তিনি বলেছেনতোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখসমূহ ও চামড়াসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না।ফুসসিলাত : ২২আয়াতটি।চামড়াসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: লজ্জাস্থান ও উরুসমূহ, যা লজ্জাস্থানের জন্য হালাল নয় তার থেকে তাকে হিফাযত করাই আল্লাহ লজ্জাস্থানের ওপর ফরয করেছেন। আর এটি তার আমল।আর দুই হাতের ওপর আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন যে, হাতদ্বয় দ্বারা বান্দা আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসগুলো ধরবে না এবং এর দ্বারা ঐ কাজগুলোই করবে, যা করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আদেশ দিয়েছেন। যেমন সাদকা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, সালাত আদায় করার জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ইত্যাদি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর”।আল-মায়েদাহ : ৬, আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তিনি আরো বলেন,অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়।মুহাম্মাদ : ৪কারণ আঘাত করা, যুদ্ধ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সাদকা করা হাতের আমল।আর দুই পায়ের ওপর তিনি ফরয করেছেন: তা দ্বারা আল্লাহ জাল্লা যিকরুহু যা হারাম করেছেন তার দিকে হাঁটবে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন,আর যমীনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো যমীনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।আল-ইসরা : ৩৭আর তিনি চেহারার ওপর ফরয করেছেন রাত ও দিনে এবং নামাযের সময়ে আল্লাহর জন্য সেজদা করাকে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,হে মুমিনগণ! তোমরা রুকূ কর, সিজদা কর, তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং ভাল কাজ কর, আশা করা যায় তোমরা সফল হতে পারবে।আল-হাজ্জ : ৭৭এবং তিনি বলেছেনআর মাসজিদসমূহ কেবলই আল্লাহর জন্য সুতরাং তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।আল-জিন : ১৮মাসজিদসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: আদম সন্তান স্বীয় সালাতে যার ওপর সেজদা করে তাই, যেমন, কপাল ইত্যাদিতিনি বলেন, এ হলো আল্লাহ তা‘আলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের ওপর যা ফরয করেছেন তার আলোচনা।আর পবিত্রতা এবং সালাতসমূহকে আল্লাহ স্বীয় কিতাবে ঈমান বলে নাম রেখেছেন যখন আল্লাহ তা‘আলা তার নবীর চেহারাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা থেকে ফিরিয়ে দেন এবং কা‘বার দিকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেন। মুসলিমগণ ষোল মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিল, ফলে তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে যে সালাত আদায় করেছি তার এবং আমাদের অবস্থা কি হবে?ফলে আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন,এবং আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।আল-বাকারাহ : ১৪৩

আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।

আল-ইসরা : ৩৬

তিনি বলেছেন: অর্থাৎ আর তিনি লজ্জাস্থানের ওপর ফরয করেছেন যে, সে তার লঙ্গন করবে না আল্লাহ যা তার ওপর হারাম করেছেন।

“আর যারা তাদের নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী”

আল-মু‘মিনূন :

এবং তিনি বলেছেন

তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখসমূহ ও চামড়াসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না।

ফুসসিলাত : ২২

আয়াতটি।

চামড়াসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: লজ্জাস্থান ও উরুসমূহ, যা লজ্জাস্থানের জন্য হালাল নয় তার থেকে তাকে হিফাযত করাই আল্লাহ লজ্জাস্থানের ওপর ফরয করেছেন। আর এটি তার আমল।

আর দুই হাতের ওপর আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন যে, হাতদ্বয় দ্বারা বান্দা আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসগুলো ধরবে না এবং এর দ্বারা ঐ কাজগুলোই করবে, যা করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আদেশ দিয়েছেন। যেমন সাদকা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, সালাত আদায় করার জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ইত্যাদি। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,

“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর”

আল-মায়েদাহ : ৬, আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তিনি আরো বলেন,

অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়।

মুহাম্মাদ : ৪

কারণ আঘাত করা, যুদ্ধ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সাদকা করা হাতের আমল।

আর দুই পায়ের ওপর তিনি ফরয করেছেন: তা দ্বারা আল্লাহ জাল্লা যিকরুহু যা হারাম করেছেন তার দিকে হাঁটবে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

আর যমীনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো যমীনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।

আল-ইসরা : ৩৭

আর তিনি চেহারার ওপর ফরয করেছেন রাত ও দিনে এবং নামাযের সময়ে আল্লাহর জন্য সেজদা করাকে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

হে মুমিনগণ! তোমরা রুকূ কর, সিজদা কর, তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং ভাল কাজ কর, আশা করা যায় তোমরা সফল হতে পারবে।

আল-হাজ্জ : ৭৭

এবং তিনি বলেছেন

আর মাসজিদসমূহ কেবলই আল্লাহর জন্য সুতরাং তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।

আল-জিন : ১৮

মাসজিদসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: আদম সন্তান স্বীয় সালাতে যার ওপর সেজদা করে তাই, যেমন, কপাল ইত্যাদি

তিনি বলেন, এ হলো আল্লাহ তা‘আলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের ওপর যা ফরয করেছেন তার আলোচনা।

আর পবিত্রতা এবং সালাতসমূহকে আল্লাহ স্বীয় কিতাবে ঈমান বলে নাম রেখেছেন যখন আল্লাহ তা‘আলা তার নবীর চেহারাকে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা থেকে ফিরিয়ে দেন এবং কা‘বার দিকে সালাত আদায় করার নির্দেশ দেন। মুসলিমগণ ষোল মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিল, ফলে তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে যে সালাত আদায় করেছি তার এবং আমাদের অবস্থা কি হবে?

ফলে আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন,

এবং আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।

আল-বাকারাহ : ১৪৩

তিনি সালাতকে ঈমান নামকরণ করেছেন, অতএব যে ব্যক্তি স্বীয় সালাত ও স্বীয় অঙ্গসমূহের হিফাযতকারী এবং তার অঙ্গসমূহের প্রত্যেক অঙ্গ দ্বারা আল্লাহ যার আদেশ করেছেন ও তার ওপর যা ফরয করেছেন তা পালনরত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সে পূর্ণ ঈমানদার এবং জান্নাতী হিসেবে সাক্ষাত করবে। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা ছেড়ে দিবে, সে আল্লাহর সাথে ত্রুটিপূর্ণ ঈমান অবস্থায় সাক্ষাত করবে।

লোকটি বলল, আমি ঈমান কমে যাওয়া ও পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি জানলাম। কিন্তু ঈমান বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি কোথা থেকে আসলো?শাফেঈ বললেন, আল্লাহ জাল্লা যিকরুহু বলেন,আর যখনই কোন সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, ‘এটি তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি করল’? অতএব যারা মুমিন, নিশ্চয় তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়।আর যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, এটি তাদের অপবিত্রতার সাথে অপবিত্রতা বৃদ্ধি করে এবং তারা মারা যায় কাফির অবস্থায়।আত-তাওবাহ : ১২৪, ১২৫এবং তিনি বলেছেননিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।আল-কাহাফ : ১৩

শাফেঈ বললেন, আল্লাহ জাল্লা যিকরুহু বলেন,

আর যখনই কোন সূরা নাযিল করা হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, ‘এটি তোমাদের কার ঈমান বৃদ্ধি করল’? অতএব যারা মুমিন, নিশ্চয় তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়।

আর যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, এটি তাদের অপবিত্রতার সাথে অপবিত্রতা বৃদ্ধি করে এবং তারা মারা যায় কাফির অবস্থায়।

আত-তাওবাহ : ১২৪, ১২৫

এবং তিনি বলেছেন

নিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

আল-কাহাফ : ১৩

শাফে‘ঈ বললেন, এ ঈমান যদি সবই এক হতো যাতে কোন কম বা বেশি নেই, তাহলে এতে কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব থাকতো না। মানুষ সবাই সমান হতো এবং শ্রেষ্ঠত্ব বাতিল হয়ে যেতো। তবে ঈমানের পূর্ণতা দ্বারা মু’মিনগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর ঈমান বেশি হওয়ার কারণে মুমিগণের স্তর আল্লাহর নিকট জান্নাতে বৃদ্ধি পাবে আর ঈমান কম হওয়ার কারণে বাড়াবাড়িকারীগণ জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহ জাল্লা ওয়া আযযা তার বান্দাদের মাঝে প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করেছেন যেমন ঘোড়ার মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিযোগিতার দিন। অতঃপর যে তাদেরকে ছাড়িয়ে যাবে তারা বিভিন্ন স্তরের হবে। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে তার প্রতিযোগীতার স্থানের ওপর রাখবেন। তাতে তার প্রাপ্য কমাবেন না। কোন পশ্চাতগামী লোক প্রতিযোগীতায় অগ্রগামীকে ডিঙ্গিয়ে যাবে না এবং কোন অনুত্তম ব্যক্তি উত্তম ব্যক্তির ওপর প্রাধান্য পাবে না। এ কারণেই উম্মতের প্রথম যুগের মানুষকে শেষ যুগের মানুষের ওপর ফযীলত দেওয়া হয়েছে। ঈমানে অগ্রগামী ব্যক্তির যদি তাতে পশ্চাতগামী লোকের উপর কোনো ফযীলত না হতো তাহলে এ উম্মতের শেষাংশ তার প্রথমাংশের সাথে মিলে যেতো।

 সাহাবীদের বিষয়ে তার মতামত

বাইহাকী শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা কুরআন, তাওরাত ও ইন্জিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের প্রশংসা করেছেন। আর রাসূলের জবানে তাদের জন্যে যে মর্যাদা অতিবাহিত হয়েছে তা তাদের পরে আর কারো জন্য হয়নি। যেমন আল্লাহ তাদেরকে সিদ্দীকীন, শুহাদা ও সালেহীনদের উচ্চ মাকাম দান করে তাদের প্রতি দয়া করেছেন ও তাদেরকে সৌভাগ্যবান বানিয়েছেন। তারা আমাদের নিকট রাসূলের সুন্নাতসমূহ পৌঁছে দিয়েছেন। এবং তারা তাকে তখন দেখেছেন যখন তার ওপর ওহী নাযিল হতেছিল। ফলে (অহী থেকে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপক, বিশেষ, আবশ্যক ও উপদেশ যাই উদ্দেশ্য করেছেন তারা তা (সরাসরি) জেনে নিয়েছেন। আর আমরা তার সুন্নত থেকে যা জানি ও যা জানি-না তারা তা জেনেছেন। তারা ইলম ও ইজতেহাদ, পরহেযগারী ও মেধাশক্তিতে এবং যার দ্বারা ইলম হাসিল ও জ্ঞান বের করা হয় সেসব ক্ষেত্রে আমাদের ওপরের আসনে। অতএব আমাদের জন্য তাদের মতামত আমাদের নিজেদের মতামত থেকে অধিক কল্যাণকর ও উত্তম।

বাইহাকী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফেঈকে ফযীলতের ক্ষেত্রে বলতে শুনেছি: আবূ বকর, উমার, উসমান ও আলী।

বাইহাকী মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল হাকাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর সবোর্ত্তম ব্যক্তি আবূ বকর, তারপর উমার তারপর উসমান তারপর আলী—রাদিয়াল্লাহু আনহুম।

হারাভী ইউসূফ ইবন ইয়াহইয়া আল-বুওয়াইতী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফে‘ঈকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি রাফেযীর পিছনে সালাত আদায় করব? তিনি বললেন, রাফেযী, কাদারী এবং মুরজিয়ার পিছনে তুমি সালাত আদায় করো না। আমি বললাম, আপনি আমাদের জন্য তাদের চেনার আলামত বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, যে বলে ঈমান শুধু কথার নাম, সে মুরজি। আর যে বলে, আবূ বকর ও উমার ইমাম ছিলেন না সে রাফেযী। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে সে কাদারী।

 কালাম (তর্কশাস্ত্র) ও দীনের বিষয়ে ঝগড়া করা থেকে তার নিষেধ করা

হারাভী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি: কোন ব্যক্তি যদি তার ইলমী কিতাবগুলো অন্য কাউকে দিয়ে দেয়ার অসিয়ত করে যায় এবং তাতে যদি কালাম শাস্ত্রের কোন বই থাকে, তাহলে তার কালাম শাস্ত্র সম্পর্কিত কিতাবগুলো অসিয়তের অর্ন্তভুক্ত হবে না। কারণ এগুলো ইলম নয়।

হারাভী হাসান আয-যা‘আফরানী থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেছেন: আমি শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি: আমি জীবনে একবারের বেশি কারো সাথে কালাম শাস্ত্র নিয়ে বিতর্ক করিনি। আর আমি এখন তা থেকে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি।

হারাভী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক বিরোধী লোকের প্রতিবাদে বড় একটি কিতাব রচনা করতে পারতাম। কিন্তু ইলমুল কালাম নিয়ে কথা বলা আমার জন্য শোভনীয় নয়। ইলমুল কালামের কোন কিছু আমার দিকে সম্বোধন করা হোক আমি তা পছন্দ করি না।

ইবন বাত্তাহ আবূ সাওর থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ আমাকে বললেন, কালামের কোন কিছুতে ঘুরপাক খেয়েছে এমন কাউকে সফল হতে আমি দেখিনি।

হারাভী ইউনুস আল-মাসরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন, তার মধ্য থেকে আল্লাহর সাথে শির্ক ছাড়া অন্য কিছুতে আক্রান্ত হওয়া ইলমুল কালামের ফিতনায় পড়া থেকে উত্তম।

দীনের মৌলিক বিষয়ে এ হলো ইমাম শাফে‘ঈ—রাহিমাহুল্লাহু— এর মতামত এবং ইলমে কালাম বিষয়ে তার অবস্থান।

 পঞ্চম অধ্যায়

 ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের আকীদাহ

 তাওহীদ বিষয়ে তার বাণী:

তাবকাতুল হানাবিলা গ্রন্থে এসেছে: ইমাম আহমাদকে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ফলে তিনি বললেন, মাখলুক থেকে আশাকে নিরাশের সাথে ছিন্ন করে দেওয়া।

হাম্বলের পরীক্ষার ওপর লিখিত “আল-মিহনাহ’ গ্রন্থে এসেছে, ইমাম আহমাদ বলেছেন: আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লা আদি থেকেই কথক (মুতাকাল্লিম)। আর কুরআন সব বিবেচনাতেই আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লার কালাম মাখলুক নয়। আল্লাহ তাঁর নিজের সত্তাকে যেসব গুণ দ্বারা বিশেষিত করেছেন তার চেয়ে বেশি কিছু দ্বারা তাঁকে বিশেষিত করা যাবে না।

ইবন আবী ইয়া‘লা আবূ বকর আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আহমদ ইবন হাম্বালকে সেসব হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, যেগুলো জাহমিয়ারা আল্লাহর সিফাত, দিদার, ইসরা ও আরশের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান করে, তিনি সেগুলোকে সহীহ বললেন। আর বলেছেন, উম্মত এগুলোকে কবুল করে নিয়েছে। আর হাদীসগুলো যেভাবে আসছে সেভাবেই থাকবে।

কিতাবুস সুন্নাহতে আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আহমাদ বলেছেন: যে এ ধারণা করে, আল্লাহ কথা বলেন না সে কাফির। তবে আমরা এ হাদীসসমূহ যেভাবে এসেছে সেভাবেই বর্ণনা করি।

লালাকায়ী হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি ইমাম আহমাদকে আল্লাহর দিদার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করেছেন, ফলে তিনি বললেন, হাদীসগুলো সহীহ। আমরা তার প্রতি ঈমান আনি ও তা স্বীকার করি। বস্তুত যেসব হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, আমরা তার প্রতি ঈমান আনি ও স্বীকার করি।

ইবনুল জাওযী তাঁর ‘মানাকিব’ গ্রন্থে মুসাদ্দাদ (ইবন মুসারহাদ) এর জন্যে রচিত আহমাদ ইবন হাম্বলের কিতাবটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তোমরা আল্লাহকে সেসব গুণে গুনান্বিত করো, যা দ্বারা তিনি নিজেকে গুনান্বিত করেছেন এবং আল্লাহ থেকে তোমরা সেসব দোষ-ত্রুটি নাকচ করো, যা তিনি তার নিজের থেকে নাকোচ করেছেন।

আহমাদ রচিত ‘আর-রদ আলাল জাহমিয়া’ কিতাবে তার বাণী এভাবে এসেছে: জাহাম ইবন সাফওয়ান বলে, আল্লাহ স্বীয় কিতাবে নিজেকে যা দ্বারা গুনান্বিত করেছেন অথবা (আল্লাহর কোনো গুণ) তাঁর রাসূল থেকে বর্ণনা করেছে, সে কাফির ও সাদৃশ্যবাদীদের অর্ন্তভুক্ত।

ইবনু তাইমিয়্যাহ “আদ-দারউ” কিতাবে ইমাম আহমাদের কথা বর্ণনা করেন: আমরা ঈমান আনি যে, আল্লাহ যেভাবে ও যেমন চেয়েছেন সেভাবে আরশের ওপর রয়েছেন কোনো ধরণ বর্ণনাকারীর ধরণ ও সংজ্ঞা বর্ণনাকারীর সংজ্ঞা ছাড়াই। আল্লাহর সিফাতসমূহ তার থেকেই এবং তাঁর জন্যেই। তিনি তেমনই যেমনটি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন। তাকে চক্ষুসমূহ আয়ত্ব করতে পারে না।

ইবনু ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহকে আখিরাতে দেখা যাবে সে কাফির কুরআনকে মিথ্যা সাব্যস্তকারী।

ইবন আবি ইয়া‘লা আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে এক সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যারা বলেন, আল্লাহ যখন মূসার সাথে কথা বলেছেন, তখন তিনি আওয়াজের সাথে কথা বলেননি। তখন আমার পিতা বললেন, আল্লাহ আওয়াজের সাথে কথা বলেছেন। আর এ সব হাদীস যেভাবে এসেছে সেভাবেই আমরা বর্ণনা করি।

লালাকাঈ’ আব্দূস ইবন মালিক আল-আত্তার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবন হাম্বলকে বলতে শুনেছি: কুরআন আল্লাহর কালাম, তা মাখলুক নয়। মাখলুক নয় বলতে দুর্বল হবে না। কারণ, আল্লাহর কালাম আল্লাহর থেকেই। আর তার থেকে কোন বস্তুই মাখলুক নয়।

 কাদর বিষয়ে তার বাণী

ইবনুল জাওযী তার ‘মানাকিব’ নামক গ্রন্থে মুসাদ্দাদের জন্যে লেখা আহমাদ ইবন হাম্বালের কিতাবটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তাকদীরের ভালো-মন্দ ও মিষ্ট-তিক্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে ঈমান আনবে।

আল-খাল্লাল আবু বকর আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আবু আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, (উত্তরে) তিনি বললেন: ভালো ও মন্দ সবকিছুই বান্দার ওপর নির্ধারিত। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো : আল্লাহই কি ভালো ও মন্দ সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহই তা নির্ধারণ করেছেন।

ইমাম আহমাদের আস-সুন্নাহ কিতাবে এসেছে, তিনি বলেছেন, তাকদীরের ভালো-মন্দ, কম-বেশি, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, মিষ্ট-তিক্ত, প্রিয়-অপ্রিয়, সুন্দর-অসুন্দর, শুরু-শেষ সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে। এগুলো আল্লাহর ফয়সালা। তিনি তাঁর বান্দাদের উপর ফয়সালা করেছেন এবং তাঁর নির্ধারণ, যা তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর নির্ধারণ করেছেন। তাদের কেউ আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধিতা করতে পারে না এবং তাঁর ফায়সালাকে অতিক্রম করতে পারে না।

খাল্লাল মুহাম্মাদ ইবন আবী হারুন থেকে তিনি আবী হারেস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা ইবাদাত ও গুনাহ নির্ধারণ করেছেন, ভালো ও মন্দ নির্ধারণ করেছেন। যাকে তিনি সৌভাগ্যবান লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি সৌভাগ্যবান আর যাকে তিনি দূর্ভাগ্যবান লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি দূর্ভাগ্যবান।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি তাকে আলী বিন জাহাম জিজ্ঞাসা করল, যে ব্যক্তি কাদার বা তাকদীর অস্বীকার করে সে কি কাফির হবে? তিনি বললেন, যদি আল্লাহ তা‘আলার ইলমকে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির হবে। সে যখন বলবে, আল্লাহ আলেম ছিলেন না। তারপর তিনি ইলম সৃষ্টি করেছেন অতঃপর জেনেছেন। যে এমন কথা বলবে, সে আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার করার কারণে কাফির হবে।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে আরেকবার কাদারীর পিছনে সালাত আদায় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, সে যদি এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করে এবং তার দিকে আহবান করে তাহলে, তুমি তার পিছনে সালাত আদায় করবে না।

 ঈমান বিষয়ে তার বাণী:

ইবন আবী ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ঈমানের চরিত্রসমূহ হতে উত্তম চরিত্র হলো আল্লাহর জন্য মুহাব্বত করা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা।

ইবনুল জাওযী আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ঈমান বাড়ে এবং কমে, যেমনটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।ঈমানের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ মু’মিন, তাদের মধ্যে যে চারিত্রের দিক দিয়ে সুন্দর।

ঈমানের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ মু’মিন, তাদের মধ্যে যে চারিত্রের দিক দিয়ে সুন্দর।

খাল্লাল সুলাইমান ইবন আশ‘আছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু আব্দুল্লাহ বলেছেন, সালাত, যাকাত, হজ্জ ও নেক আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আর পাপসমূহ ঈমানকে হ্রাস করে।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম যিনি বলেন, ঈমান কথা ও আমলের নাম এবং কমে ও বাড়ে তবে সে ইস্তেসনা করে না (ইনশাআল্লাহ বলে না) সে কি মুরজী? তিনি বলেন, আশা করি সে মুরজিইয়্যাহ হবে না। আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, ইস্তেসনা না করার বিপক্ষে প্রমাণ হচ্ছে কবরবাসীদের জন্য রাসূলের বাণী:যদি আল্লাহ চায় অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে অচীরেই সম্পৃক্ত হবো।

যদি আল্লাহ চায় অবশ্যই আমরা তোমাদের সাথে অচীরেই সম্পৃক্ত হবো।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতা—রাহিমাহুল্লাহু—কে ইরজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি। তখন তিনি বললেন, আমরা বলবো, ঈমান হচ্ছে কথা ও আমল এবং তা কমে ও বাড়ে। আর যখন ব্যভিচার ও মদ পান করে তখন তার ঈমান কমে।

 সাহাবীদের বিষয়ে তার মতামত:

ইমাম আহমাদের আস-সুন্নাহ কিতাবে নিম্নের লিখিত কথাগুলো এসেছে: সুন্নাত হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত সাহাবীর চারিত্রিক সৌন্দর্যগুলো তুলে ধরা। তাদের খারাপ দিকগুলো এবং তাদের মধ্যে সংঘটিত বিরোধের আলোচনা থেকে বিরত থাকা। যে ব্যক্তি রাসূলের সাহাবীগণকে বা তাদের কাউকে গালি দেয়, সে বিদ‘আতী, রাফেযী, দুষ্ট এবং অভদ্র। আল্লাহ তার কোন ফরয বা নফল আমল কবুল করবেন না। বরং সাহাবীগণকে ভালোবাসা সুন্নাত, তাদের জন্য দুআ করা সাওয়াবের কাজ, তাদের অনুসরণ করা নৈকট্য এবং তাদের কথা গ্রহণ করা ফযীলতের বিষয়।

তারপর তিনি বলেন, অতঃপর চার খলীফার পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ সর্বোত্তম মানুষ। কারো জন্য তাদের খারাপ দিকগুলো আলোচনা করা বৈধ নয় এবং তাদের কাউকে কোন দোষ-ত্রুটি দ্বারা আঘাত করা যাবে না। যে এ ধরনের কর্ম করে শাসকের ওপর ওয়াজিব হলো তাকে শাস্তি ও শিক্ষা দেওয়া। তাকে ক্ষমা করার কোন অধিকার শাসকের নাই।

ইবনুল জাওযী মুসাদ্দাদের নিকট ইমাম আহমাদের পত্রটি উল্লেখ করেছেন, তাতে রয়েছে: তুমি দশজন সাহাবীর বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা জান্নাতী। তারা হলেন, আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, তালহা, যুবাইর, সা‘আদ, সা‘ঈদ, আব্দুর রহমান ইবন আওফ, আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।আর যার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, আমরাও তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দেব।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে ইমামগণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আবূ বকর, তারপর উমার তারপর উসমান তারপর আলী।

আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ বলেন, আমি আমার পিতাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি যারা বলে, আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু খলীফা নয়। তিনি বলেন, এটি মন্দ ও নিম্নমানের কথা।

ইবনুল জূযূ আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আলীর খিলাফত মানে না সে তার পরিবারের গাধা থেকেও অধিক ভ্রষ্ট।

ইবনু আবী ইয়া‘লা আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি আলী ইবন আবু তালেবকে চতুর্থ খলীফা স্বীকার করে না তার সাথে তোমরা কথা বলো না এবং তাকে বিবাহ করাবে না।

 কালাম শাস্ত্র ও দীনের বিষয়ে ঝগড়া করা থেকে তার নিষেধ করা:

ইবন বাত্তাহ আবূ বকর আল মারওয়াযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: যে কালাম আদান-প্রদান করে সে কামিয়াব হবে না। আর যে কালাম আদান প্রদান করে সে জাহমিয়াহ হওয়া ছাড়া থাকবে না।

ইবনে আব্দুল বার ‘জামে বায়ানুল ইলম’ নামক কিতাবে আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইলমুল কালামের অধিকারী কখনোই সফলকাম হবে না। যে ব্যক্তি ইলমুল কালামের মধ্যে দৃষ্টি দিবে তার অন্তরে অবশ্যই তুমি কোন না কোনো বক্রতা দেখতে পাবে।

হারাভী আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ ইবন আম্বল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার পিতা উবাইদুল্লাহ ইবন ইয়াহয়া ইবন খাকানের নিকট লিখেন, আমি আহলে কালাম নই। আল্লাহর কিতাব বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে যা আছে তা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কালাম করাকে ভালো মনে করি না। কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কালাম করা প্রশংসনীয় নয়।

ইবনুল জাওযী মূসা ইবন আব্দুল্লাহ আত-তারসূসী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি আহমাদ বিন হাম্বালকে বলতে শুনেছি, তোমরা তর্কশাস্ত্রবিদদের সাথে উঠ-বস করো না। যদিও তারা সুন্নাতের পক্ষে প্রতিহত করে।

ইবন বাত্তাহ আবূল হারেস আস-সায়েগ‘ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: যে ব্যক্তি কালামকে মহব্বত করে তা তার অন্তর থেকে বের হবে না। আর তুমি কোন কালামীকে সফল হতে দেখবে না।

ইবন বত্তাহ উবাইদুল্লাহ ইবন হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা বলেছেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি: তোমরা সুন্নাত ও হাদীসকে আঁকড়ে ধরো। তার দ্বারাই আল্লাহ তোমাদের উপকার করবেন। আর তোমরা ঘাটাঘাটি, ঝগড়া ও অন্যায় বিতর্ক করা থেকে বিরত থাক। কারণ, কালাম পছন্দকারী কেউ সফল হয় না। আর যে কেউ কালাম শাস্ত্র চর্চা করে তার পরিণতি বিদ‘আত ভিন্ন কিছু হয় না। কেননা কালাম কোনো কল্যাণের দিকে আহ্বান করে না। আমি ঘাটাঘাটি, ঝগড়া ও অন্যায় বিতর্ক করা পছন্দ করি না। আর তোমরা সুন্নাত, সাহাবীগণের কথা ও ফিকাহ গ্রহণ করো যার দ্বারা তোমরা উপকৃত হবে। আর তোমরা ঝগড়া, বাঁকা পথের অনুসারীদের কথা ও অন্যায় বিতর্ক বর্জন করো। আমরা পূর্ববর্তী লোকদেরকে পেয়েছি তারা এসব জানতেন না, তারা কালাম পন্থীদেরকে এড়িয়ে চলতেন। বস্তুত কালাম শাস্ত্রের পরিণতি কখনো ভালোর দিকে যায় না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ও তোমাদেরকে ফিতনা থেকে সুরক্ষা দিন এবং আমাদের ও তোমাদেরকে সব ধরনের ধ্বংস থেকে নিরাপত্তা দিন।

আল ইবানাহ নামক কিতাবে ইবনু বাত্তাহ আহমাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, তুমি যখন কোন লোককে ইলমুল কালামকে মুহাব্বাত করতে দেখবে তখন তুমি তার থেকে সতর্ক থাকবে।

এ হলো দীনের মৌলিক বিষয়ে তার মতামত এবং ইলমে কালাম বিষয়ে তার অবস্থান

 পরিশিষ্ট:

উপরের আলোচনা দ্বারা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, আকীদার ক্ষেত্রে চার ইমামের বক্তব্য ছিল এক ও অভিন্ন। শুধু ঈমানের মাসআলা ছাড়া তাদের সকলের আকীদাহ এক। ইমানের মাসআলায় ইমাম আবূ হানীফা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এদত্ব সত্তেও বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ঈমান বিষয়ে তার মতামত থেকে ফিরে এসেছেন।

এই আকীদাহ মুসলিমগণকে এক কালিমার ওপর একত্র করা এবং দীনের ব্যাপারে তাদেরকে দলাদলি থেকে বাঁচানোর উপযুক্ত মাধ্যম। কারণ এসব আকীদাহ আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত থেকেই গৃহিত হয়েছে। খুব কম মানুষই এসব ইমামের আকীদাহ বুঝে এবং ভালোভাবে জানে ও ভালোভাবে শিখে। বরং এ কথা ছড়িয়ে গেছে যে, এসব ইমাম আকীদাহ সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোর জ্ঞান আল্লাহর নিকট সোপর্দ করতেন এবং তাঁরা কুরআন-সুন্নাহ শুধু পাঠ করা ব্যতীত আর কিছুই জানতেন না। যেন আল্লাহ অনর্থক অহী নাযিল করেছেন।

অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।সূরা সাদ : ২৯আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।আশ-শু‘আরা : ১৯২, ১৯৫আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,নিশ্চয় আমি একে আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।ইউছুফ :

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।

সূরা সাদ : ২৯

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

আর নিশ্চয় এ কুরআন সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।

আশ-শু‘আরা : ১৯২, ১৯৫

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

নিশ্চয় আমি একে আরবী কুরআনরূপে নাযিল করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।

ইউছুফ : ২

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন নাযিল করেছেন, যাতে তার আয়াতসমূহে চিন্তা করা হয় এবং তা দ্বারা উপদেশ গ্রহন করা যায়। তিনি সংবাদ দেন যে, তিনি কুরআনকে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন, যাতে মানুষ তার অর্থ জানে ও বুঝে। আল্লাহ যেহেতু তার আয়াতসমূহ চিন্তা করার জন্য স্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন, তাই যাদের প্রতি এটি নাযিল করা হয়েছে, সুস্পষ্ট আরবী ভাষার দাবি অনুযায়ী তাদের জন্য এর অর্থ জানা সহজ হওয়া আবশ্যক। কুরআন যদি এমন হতো যে, তার অর্থ জানা সম্ভব নয়, তাহলে তা নাযিল করা অনর্থক হতো। কারণ কোনো সম্প্রদায়ের নিকট এমন শব্দমালা নাযিল করে কোনো লাভ নেই, যা তাদের নিকট অর্থবিহীন শব্দের স্থলাভিষিক্ত; যার কোন অর্থ নেই।

এ ধরনের কথা বলা, সাহাবী, তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তী ইমামগণের আকিদার ওপর অপবাদ এবং এমন কিছু তাদের দিকে ছুড়ে মারা যার থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত। তারা নবুওয়তী যুগের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে ওহীর নসসমূহের অর্থ জানেন ও বুঝেন। বরং এ বিষয়ে সব মানুষের চেয়ে তাঁঁরাই বেশী হকদার। তারা এমন কতক ইবাদাত দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করেন যা তারা কুরআন ও সুন্নাহের প্রমাণ থেকে বুঝেছেন এবং তারা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সত্য ও বিধান বলে বিশ্বাস করেছেন। বস্তুত যে রাস্তা তাদেরকে তাদের মা‘বুদের নিকট পৌঁছে দেয় সে রাস্তাকে যখন তারা চিনেছেন তাহলে কীভাবে তারা তাদের মা‘বুদকে পরিপূর্ণ সিফাতের সাথে চিনবে না এবং নসসমূহের অর্থ জানবে না, যা আল্লাহ নিজেই তার বান্দাদের জানিয়েছেন?!

মোট কথা এ চার ইমামের আকীদা হলো বিশুদ্ধ আকীদা যা কুরআন ও সুন্নাহের পরিষ্কার ঝর্ণাধারা থেকে এসেছে, তার সাথে ব্যাখ্যা, অস্বীকার করা বা সাদৃশ্য বা তুলনার লেশও যুক্ত হয় না। সাদৃশবাদী ও মুয়াত্তীল আল্লাহর সিফাত থেকে তাই বুঝেছে যা মাখলুকের সাথে প্রযোজ্য হয়। আর এটি হচ্ছে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে যে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন তার সম্পূর্ণ পরীপন্থী। কারণ, (বান্দারা স্বভাগতভাবে জানে) আল্লাহর মতো কোন কিছুই হয় না, না তার সত্বার মতো হয়, না তার সিফাতের মতো হয়, না তার কর্মসমূহে মতো হয়।

আল্লাহর নিকট আমার প্রার্থনা যে, তিনি এই পুস্তিকা দ্বারা মুসলিমগণের উপকার করেন এবং তাদেরকে এক আকীদাহ ও এক পথের ওপর একত্র করেন, যা কুরআন ও সুন্নাহের আকীদাহ এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও তাঁর সুন্নাত। আল্লাহই ইচ্ছার পিছনে। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক।

আমাদের শেষ দাবি হলো, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।

আর আল্লাহ সালাত নাযিল করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদের ওপর।

বিষয়ভিত্তিক ক্যাটাগরি:

আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ