রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের] গৃহে একদিন

বর্ণনা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রিসালা। এখানে পাঠকদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের বিভিন্ন দিকগুলো অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি বিষয় আলোচনা করার সাথে সাথে হাদিস থেকে তার উপর এক বা একাধিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। আশা করি একজন পাঠক রিসালাটি পড়ে উপকৃত হবেন এবং তার জীবনকে রাসূলের জীবন হিসেবে গ্রহণ করবেন।

Download
এ পেইজ এর দায়িত্বশীলের কাছে টীকা লিখুন

সম্পূর্ণ বিবরণ

রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের] গৃহে একদিন

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেন এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সমস্ত রাসূলের ইমামের উপর যিনি প্রেরিত হয়েছেন বিশ্ব জগতের জন্য রহমতস্বরূপ।

বর্তমান যুগের অধিকাংশ লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপার বাড়াবাড়ি ও অবাধ্যতায় দুভাগে বিভক্ত।

তাদের মধ্যে অনেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে এমন বাড়াবাড়ি করে যে, তাদের কার্যক্রম শির্কের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। [আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় চাই] যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রার্থনা করে ও তাঁর নিকট ফরিয়াদ করে।

পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে অনেকে রাসূলের তরীকার অনুসরণ ও তাঁর সীরাত-আদর্শ হতে উদাসীন। তারা তা নিজেদের জীবনে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে না, না তা তাদের নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচনা করে।

অতএব, ঐ সমস্ত লোককে তাঁর সীরাতের নিকটতম করার ও তাদের জীবনের ক্ষেত্রসমূহে তা ধারণ করবে এ আশায় অতি সহজ ও সরল ভাবে কয়েক পৃষ্ঠায় তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পেশ করছি যা তাঁর সকল দিকগুলির জন্য অবশ্যই যথেষ্ট নয়; বরং তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ, বৈশিষ্ট্য ও জীবন-চরিতের এক ঝলক বা কিছু ধারণা মাত্র। সুতরাং এগুলিই তাঁর সব কিছু নয় বরং আমি মানুষের জীবনে যা অতি জরুরী মনে করি অথচ তা তাদের মধ্যে অবর্তমান এমনই কিছু অতি সংক্ষেপে তুলে ধরেছি। তার প্রত্যেক চরিত্র বা গুণাবলীর ক্ষেত্রে দুটি বা তিনটি হাদিস বর্ণনা করেছি।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ-তো এক পরিপূর্ণ উম্মতের জীবনাদর্শ, দাওয়াতি জীবন, আদর্শ প্রতিষ্ঠার জীবন। আর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো হলেন যাবতীয় সৎকর্ম, ইবাদতসমূহ, উত্তম চরিত্র, শ্রেষ্ঠতম লেন-দেন, আচার-আচরণ ও শ্রেষ্ঠতম মর্যাদার অনুকরণীয় ইমাম। তাঁর ক্ষেত্রে তো আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাই যথেষ্ট:

﴿ وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤ ﴾ [القلم: ٤]

অর্থাৎ “আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।"[1]

প্রকৃত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ মর্যাদাই প্রদান করে থাকে যে মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাঁকে প্রদান করেছেন।

এ ভিত্তিতে তাদের বিশ্বাস হল, তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল ও অন্তরঙ্গ অকৃত্রিম বন্ধু। তারা তাঁকে তাদের সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এমনকি নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসে। কিন্তু তাঁর ব্যাপারে তারা কোন প্রকার বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন করে না। বরং আল্লাহ প্রদত্ত মান-মর্যাদাই তাঁর জন্য যথেষ্ট মনে করে।

আর আমরাও এ বিশ্বাসই পোষণ করে থাকি। সুতরাং আমরা মিলাদ মাহফিল আবিষ্কার করে তা উদযাপন করি না। বরং আমরা তাঁকে অনুরূপই ভালবাসি যেভাবে নির্দেশ রয়েছে এবং তাঁর সে ভাবে অনুসরণ করি যা নির্দেশ রয়েছে এবং যে সব কিছুর তিনি সংবাদ দিয়েছেন বিশ্বাস করি, ও যে বিষয়ে তিনি নিষেধ ও সতর্ক করেছেন তা হতে বেঁচে থাকি। আরবি কবি তাঁর ব্যাপারে বলেন:

فمبلغ العلم فيه أنه بشــــر أنــــه خير خلق الله كلهم

أغرُّ عليه للنبوة خاتـــــــم مـــن نــــــورٍ يلوحُ ويشهد

وضمَّ الإله اسم النبي إلى اسمه إذا قام في الخمس المؤذن أشهد

وشق له من اسمه ليُجلَّـــــه فذو العرشِ محمودٌ وهذا أحمد

“এ নবীর ব্যাপারে আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাস হল নিশ্চয়ই তিনি একজন মানুষ। নিশ্চয়ই তিনি সকল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম। তাঁর [কাঁধের] উপরে নবুওয়তের উজ্জ্বল মোহর, যা জ্যোতির্ময়, চমকিত ও সাক্ষ্যরত।

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নামের সাথে তাঁর নাম মিলিত করে নিয়েছেন যা সংঘটিত হয় যখন মুয়াজ্জিন পাঁচ ওয়াক্তে বলে “আশহাদু" এবং তিনি তাঁর সম্মান করার জন্য স্বীয় নাম হতে তাঁর নামের উৎপত্তি ঘটান। তাই আরশ ওয়ালা হলেন: 'মাহমূদ' আর ইনি হলেন: 'আহমাদ'।"

যদিও প্রিয় রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষাতের সৌভাগ্য আমরা হারিয়েছি, আমাদের ও তাঁর মধ্যে বহু দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে..। তা সত্ত্বেও আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই, যাদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«وددت أنا قد رأينا إخواننا» قالوا: ألسنا إخوانك يا رسول الله؟ قال: «أنتم أصحابي، وإخواننا الذين لم يأتوا بعد» فقالوا: كيف تعرف من لم يأت بعد من أمتك يا رسول الله؟ فقال: «أرأيت لو أن رجلاً له خيل غر محجلة بين ظهري خيل دهم بهم ألا يعرف خيله»؟ قالوا: بلى يا رسول الله، قال: «فإنهم يأتون غرًا محجلين من الوضوء، وأنا فرطهم على الحوض...».

“আমি চাই আমরা যেন আমাদের ভাইদেরকে দেখতে পাই। সাহাবীরা বলেন: আমরা কি আপনার ভাই নই, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বলেন: তোমরা তো আমার সাহাবী, আর যারা এখনও আগমন করেনি তারা হল আমাদের ভাই। অত:পর সাহাবীরা বলেন: আপনার উম্মতের মধ্যে যারা এখনও আগমন করেননি তাদেরকে কিভাবে চিনতে পারবেন হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? তিনি বলেন: তোমরা কি মনে কর! যদি কোন ব্যক্তির নিছক কাল মিশমিশে ঘোড়া সমূহের মধ্যে যদি উজ্জ্বল শুভ্র রং বিশিষ্ট ঘোড়া থাকে তবে কি সে তার উক্ত ঘোড়া চিনতে পারবে না? তারা বললেন: জী হাঁ, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অত:পর তিনি বলেন: সুতরাং তারা [আমার উম্মত] ওজুর উজ্জ্বল শুভ্র আলামত নিয়ে [কিয়ামতের দিন] উপস্থিত হবে, আর আমি তাদেরকে হাউজে কাউসারে অভ্যর্থনা জানাব"[2]

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি আমদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করত: তাঁর সীরাত আঁকড়ে ধরেছে ও তাঁর সুন্নাতের ঝর্ণা ধারায় তৃপ্ত হয়েছে। অনুরূপ আল্লাহর নিকট আরও দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর সাথে অনন্ত জান্নাতসমূহে একত্রিত করেন এবং তাঁকে যেন তাঁর খিদমতের পরিপূর্ণ প্রতিদান প্রদান করেন। আমীন

وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين

আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ আল কাসেম

যিয়ারত

আসুন আমরা চৌদ্দ-শত বছর পূর্বে একবার ফিরে যাই ও ইতিহাসের পাতা উল্টাই, তা পড়ে প্রতিটি পৃষ্ঠার লাইনগুলির বাস্তবতা অনুধাবন করি এবং প্রতি পৃষ্ঠায় ও লাইনে চিন্তা ফিকির করি। আর আমরা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে প্রবেশ করি। সরাসরি পর্যবেক্ষণ করি তাঁর অবস্থা ও ঘটনাবলি এবং শ্রবণ করি তাঁর বাণী। নবীর ঘরে শুধু একদিন অবস্থান করি। একদিনই আমাদের জন্য যথেষ্ট। সেখান থেকে আমরা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করি এবং তাঁর কথা ও কর্ম দ্বারা নিজের জীবন উজ্জ্বল করি।

মানুষের শিক্ষা- দীক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে এবং তাদের পাঠ অভ্যাসও বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তারা কিতাব, পত্র-পত্রিকা, ফিল্ম ও অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে তড়িৎ জিয়ারত করে থাকে। অথচ তাদের সে যিয়ারতের চেয়ে শরীয়ত সম্মত আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে যিয়ারত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, সেখানে আমরা যা দেখব ও যা জানব তার প্রতিটি ঘটনার শিক্ষাকে স্বীয় জীবনে বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবো। আমরা এ অল্প পরিসরে তাঁর ঘরের বিশেষ বিশেষ অবস্থারই অবতারণা করব। যেগুলি আমাদের অন্তরে লালন ও আমাদের ঘরে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।

হে মুসলিম ভাই!

বিগত ১৪টি শতাব্দীর ইতিহাসে যে সব ঘটনা ঘটেছে ও পূর্ববর্তী জাতিসমূহ কিভাবে অতিবাহিত হয়েছে তা জেনে ও শুনেই শুধুমাত্র মজা পাব এবং তারপর থেমে যাব, এমনটি আমরা করব না।বরং আমরা রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর সীরাত পাঠ করে ও তার সুন্নাতকে জীবনে বাস্তবায়ন করে ও তার আদর্শ ও পন্থানুযায়ী চলে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত ও নির্দেশ পালন করব। তিনি তাঁর রাসূলের ভালবাসাকে আমাদের জন্য ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসার প্রধান প্রধান আলামত হল: তাঁর নির্দেশের অনুসরণ ও তাঁর বারণকৃত ও সাবধান কৃত বিষয় হতে বিরত থাকা, ও তার আনিত বিষয়গুলিকে বিশ্বাস করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ওয়াজিব। তাঁর নির্দেশকে বাস্তবায়ন এবং তাঁকে অনুকরণীয় আদর্শ ও ইমাম ঘোষণা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٣١ ﴾ [ال عمران: ٣١]

অর্থাৎ: বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিবেন, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু[3]। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿ لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا ٢١ ﴾ [الاحزاب : ٢١]

অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ[4]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের অনুসরণ করার ব্যাপারে মহা গ্রন্থ আল-কুরআনে চল্লিশের অধিকবার উল্লেখ করেছেন।[5]

তাঁর রাসূলের অনুসরণ ছাড়া কোন বান্দার সুখ-শান্তি ও আখিরাতে নাজাতের কোন পথ নেই। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন:

﴿ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ ١٣ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَٰلِدٗا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٞ مُّهِينٞ ١٤ ﴾ [النساء : ١٣، ١٤]

অর্থাৎ: আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং তা মহা সাফল্য। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে তিনি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন, সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।[6]

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর ভালবাসাকে ঈমানের প্রকৃত সাধ অর্জনের কারণ বলে উল্লেখ করে বলেন:

ثلاث من كن فيه وجد حلاوة الإيمان: أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما... متفق عليه.

অর্থাৎ যার ভিতর তিনটি গুণ রয়েছে সে ঈমানের প্রকৃত সাধ পেয়েছে; যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সব চেয়ে প্রিয়।[7]

এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:

فوالذي نفسي بيده لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده ]متفق عليه[ . .

অর্থাৎ ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মাঝে কেউ পূর্ণ ঈমানদার ততক্ষণ পর্যন্ত হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার পিতা-মাতা ও সন্তানাদি হতে অধিক প্রিয় না হবো।[8]

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল পবিত্র ও মন মুগ্ধকর সীরাত, অতএব তা হতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করবো ও তার দেখানো পথেই চলবো।


এ এক আকর্ষণীয় ভ্রমণ

এ ভ্রমণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘর পানে ভ্রমণ ও তার জীবন চরিতের পানে কিছু অবস্থান। তাঁর আদর্শ, আচার-আচরণ ও ব্যবহারই তো একজন মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সর্বশেষ বস্তু। তবে এটি তখন হবে যখন আমরা এ হতে নেকী ও সওয়াবের প্রত্যাশা করতে পারি। এ ভ্রমণ তো হল এক অপূর্ব নসিহত, উপদেশ, জীবনাদর্শ, উত্তম নমুনা এবং অনুসরণ ও অনুকরণ।

আর এ ভ্রমণ কোন দৈহিক কোন ভ্রমণ নয়, এ ভ্রমণ হল, কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মুখনিঃসৃত বর্ণনা কেন্দ্রিক একটি ব্যতিক্রম ভ্রমণ। কেননা, শুধু তিনটি মসজিদ ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘর বা কবর যিয়ারত করা ইত্যাদির উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা বৈধ নয়। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

لا تشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد: المسجد الحرام، ومسجدي هذا، والمسجد الأقصى . متفق عليه.

অর্থাৎ: তিনটি মসজিদ ব্যতীত সওয়াবের প্রত্যাশায় ভ্রমণ করা বৈধ না; [আর তা হল:] মসজিদুল হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদুল আঁকশা।[9]

অতএব, আমাদের উচিৎ হল, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পালনার্থে উল্লেখিত তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনও দিকে সওয়াবের প্রত্যাশায় ভ্রমণ করবো না। আল্লাহ তা'আলাও বলেন:

﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ ٧ ﴾ [الحشر: ٧]

অর্থাৎ: রাসূল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক।[10]

অতএব,যে সব বিষয় আমাদের জন্য আদর্শ ও নমুনা তা ব্যতীত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিত্যক্ত চিহ্ন ও নির্দশনাবলী অন্বেষণ করব না। এ সম্পর্কে ইবনে ওজ্জাহ বলেন:

«أمر عمر بن الخطاب رضي الله عنه بقطع الشجرة التي بويع تحتها النبي - صلى الله عليه وسلم - فقطعها لأن الناس كانوا يذهبون فيصلون تحتها، فخاف عليهم الفتنة».

যে বৃক্ষের নিচে বাইয়াতে রিযওয়ান সংঘটিত হয়েছিল, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সে বৃক্ষ কর্তন করার নির্দেশ দেন ও তা কেটে ফেলা হয়। কেননা জনগণ সে গাছের নিচে গিয়ে সালাত আদায় করত। তাই তিনি জনগণের উপর ফিতনার আশঙ্কা করেছিলেন। [11]

ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহ গারে হেরা বা হেরা গুহা সম্পর্কে বলেন: নবুওয়তের প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গারে হেরাতে গিয়ে ইবাদাত করতেন এবং তাতেই সর্ব প্রথম অহি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অহি নাযিলের পর কখনও তিনি সেখানে উঠেননি, এমনকি তিনি তার নিকটবর্তীও হননি। তিনি তো কোন দিন যাননি, বরং তার কোন সাহাবিও কোন দিন যাননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওত প্রাপ্তির পর তেরটি বছর মক্কাতেই অবস্থান করেছেন কিন্তু তিনি কখনও সেখানে যাননি এমনকি সে পাহাড়েও তিনি উঠেন নি। হিজরতের পর তিনি মক্কাতে কয়েকবার এসেছেন, যেমন হুদাইবিয়া সন্ধির ওমরার সময়, মক্কা বিজয়ের বছর এবং সেখানে তিনি প্রায় ২০দিন অবস্থান করেছেন, জিরানা ওমরার সময়ও তিনি গারে হেরাতে যাননি।[12]

এই তো আমরা নবীর শহরে উপস্থিত হবো, এই তো আমাদের সামনে দেখা যাচ্ছে এ শহরের সর্ব বৃহৎ নিদর্শন, আর তা হল ওহুদ পাহাড়। যার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «هذا جبل يحبنا ونحبه»

এ পাহাড় আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও তাকে ভালবাসি।[13]

রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] ঘরে প্রবেশের পূর্বে তার ঘরের ভিত্তি ও কাঠামোর দিকে খেয়াল করি। আমরা তাঁর জীর্ণ কুটির ও সাধারণ বিছানা দেখে আশ্চর্য হবো না। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এ ধরার বিলাস ত্যাগীদের মাঝে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি দুনিয়ার চাকচিক্য ও সম্পদের দিকে কখনও দৃষ্টিপাত করতেন না। তার নয়ন শীতল হতো নামাযের মাধ্যমে তিনি বলেন: «بل جعلت قرة عينه في الصلاة». “বরং তার নয়ন শীতল হতো নামাযের মধ্যেই[14]।"

তিনি দুনিয়া সম্পর্কে বলেন:

«مالي وللدنيا، ما مثلي ومثل الدنيا إلا كراكب سار في يوم صائف، فاستظل تحت شجرة ساعة من نهار، ثم راح وتركها».

“আমার ধন-সম্পদ ও দুনিয়া বা আমার ও দুনিয়ার উদাহরণ হল: কোন মুসাফির গরমের দিনে চলতে চলতে কোন বৃক্ষের ছায়া তলে দিনের কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো, তারপর তা ছেড়ে চলে গেল।[15]

আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরের সামনে এসে পৌঁছেছি, আমরা মদিনার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি... এই তো আমাদের সামনে ভেসে উঠছে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর স্ত্রীদের কক্ষগুলি, যা খেজুর পাতা ও মাটি দ্বারা নির্মিত, আর কিছু পরস্পর মিলিত পাথর দ্বারা, আর তার ছাদগুলি সম্পূর্ণই খেজুর পাতার ছাউনি।

হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি ওসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের যুগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ করে দেখতাম, ঘরের ছাদ হাত দিয়ে নাগাল পেতাম।[16]

এতো অতি সাধারণ জীর্ণ-শীর্ণ কুটির এবং ছোট ছোট কক্ষ, তবে তা ঈমান ও আল্লাহর অনুসরণ, অহি ও রিসালাত দ্বারা সজ্জিত।


রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর গুণাবলী

আমরা এখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের নিকটবর্তী। অতএব, তাঁর দরজায় অনুমতি সূচক কড়া নাড়াবো। সব খেয়াল পরিত্যাগ করে সামান্যতম দৃষ্টি রাখব ওই সমস্ত সাহাবীদের বর্ণনার দিকে যারা স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে, তাতে যেন আমরাই তাঁকে দেখছি এবং যেন তাঁর কর্ম তৎপরতা মুবারক জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠে।

আল-বারা ইবনে আজেব [রা] হতে বর্ণিত তিনি বলেন:

«كان النبي - صلى الله عليه وسلم - أحسن الناس وجهًا، وأحسنهم خلقًا، ليس بالطويل البائن، ولا بالقصير».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম চেহারা ও সর্বোত্তম শারীরিক কাঠামোর অধিকারী ছিলেন, তিনি অতি লম্বা ছিলেন না বা খাটোও ছিলেন না।[17]

তিনি আরও বর্ণনা করেন:

«كان النبي - صلى الله عليه وسلم - مربوعًا بعيد ما بين المنكبين، له شعر يبلغ شحمة أذنيه، رأيته في حلة حمراء لم أر شيئًا قط أحسن منه».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী ছিলেন, তাঁর চুল ছিল কানের লতি পর্যন্ত, আমি তাঁকে লাল চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি, তাঁর চেয়ে সুন্দর কোন কিছু আর কখনও দেখিনি।[18]

আবু ইসহাক আস-সুবাইয়ি বলেন:

«سأل رجل البراء بن عازب: أكان وجه رسول الله - صلى الله عليه وسلم - مثل السيف؟ قال: لا بل مثل القمر».

এক ব্যক্তি বারা বিন আযেব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেছিল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা কি তলোয়ারের ন্যায় ছিল? তিনি উত্তর দিলেন, না, বরং চাঁদের ন্যায় ছিল।[19]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«ما مسست بيدي ديباجًا ولا حريرًا، ولا شيئًا ألين من كف رسول الله - صلى الله عليه وسلم -، ولا شممت رائحة أطيب من ريح رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ».

আমি রেশম কাপড় ও অন্যান্য জিনিস ধরে দেখেছি, কিন্তু কোন জিনিস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত থেকে মোলায়েম বা নরম ছিল না, এবং রাসূলের শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে উত্তম কোন ঘ্রাণ আমি কখনো পাইনি।[20]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম গুণাবলীর মধ্যে একটি হল লজ্জা। এমনকি এ সম্পর্কে আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

كان - صلى الله عليه وسلم - أشد حياء من العذراء في خدرها، فإذا رأى شيئًا يكرهه عرفناه في وجهه».

অন্ত:পুরে পর্দায় থাকা বালিকার চেয়েও তিনি বেশী লজ্জা করতেন। তবে তিনি যদি কোন কিছু অপছন্দ করতেন তা আমরা তার মুখমণ্ডল থেকেই বুঝতে পারতাম।[21]

এ হল রাসূল রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কতিপয় দৈহিক ও চারিত্রিক গুণাবলীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর দৈহিক ও চারিত্রিক উভয় প্রকারের আদর্শকে পরিপূর্ণ করেছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা-বার্তা

ইতি পূর্বে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কতিপয় গুণাবলী অবলোকন করলাম। এবার আমরা তাঁর কথা-বার্তা সম্পর্কে অবগত হব, তিনি কি ভাবে কোন ভঙ্গিতে কথা বলতেন! রাসূল রাদিয়াল্লাহু আনহু কথা বলার পূর্বে আমরা তার কথার কিছু বর্ণনা শুনব।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«ما كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يسرد سردكم هذا، ولكنه كان يتكلم بكلام بين، فصل، يحفظه من جلس إليه»

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত এমন তাড়াতাড়ি কথা বলতেন না, এক নাগাড়ে কথা বলে যেতেন না। বরং তিনি স্পষ্ট ও ধীর স্থিরভাবে কথা বলতেন, তার বৈঠকে যারা উপস্থিত থাকত, সবাই তার কথাগুলি মুখস্থ করে ফেলত।[22]

তাঁর কথা-বার্তা ছিল অতি সহজ ও নরম। তিনি চাইতেন যে, তাঁর কথা যেন বোধগম্য হয় এবং শ্রোতারা বুঝতে পারে। তার উম্মতের প্রতি এত খেয়াল ছিল যে, তারা কে কতটুকু বুঝতে সক্ষম সে শ্রেণী ভেদ বিবেচনা করে কথা বলতেন, শ্রোতাদের বুঝ শক্তির ব্যবধানের প্রতি লক্ষ্য করে কথা বলতেন, সবাই যাতে বুঝতে পারে তার প্রতি লক্ষ্য রেখে কথা বলতেন। একথা এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহনশীল।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان كلام رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كلامًا فصلاً يفهمه كل من يسمعه »

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বলার পদ্ধতি ছিল ধীর-স্থির, যারাই তার কথা শুনত সবাই তা বুঝতে পারত।[23]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয়, উদারতা ও প্রশস্ত হৃদয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন, তার কথাকে বুঝার জন্য একটি কথাকে তিনি বারবার- পুনরায়- বলতেন।

আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يعيد الكلمة ثلاثًا لتعقل عنه»

কথাকে ভালভাবে বুঝার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথাকে তিন বার করে পুনরাবৃত্তি করতেন।[24]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সাথে নরম ও কোমল ব্যবহার করতেন এবং তারা যেন তাতে ভয় না করে সে জন্য প্রবোধ দান করতেন। কেননা অনেকেই এমন ছিল যারা তাকে ভয় করত!।

ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

أتى النبي - صلى الله عليه وسلم - رجل فكلمه فجعل يرعد فرائصه فقال له - صلى الله عليه وسلم -: «هون عليك فإني لست بملك، إنما أنا ابن امرأة تأكل القديد».

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে তাঁর সাথে ভয়ে ভয়ে কথা বলতে লাগল, অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন: তুমি ভয় করো না, কেননা আমি কোন রাজা-বাদশাহ নই। আমি তো এক মহিলার সন্তান যিনি শুকনা মাংস খেয়েছেন।[25]


গৃহ অভ্যন্তর

আমাদেরকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে, এখন আমরা মুসলিম উম্মাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ীর ভিতর অবস্থান নিয়েছি, ভাল করে সব কিছু অবলোকন করার জন্য।

এখন আমাদের সামনে সাহাবায়ে কিরাম তাঁর বাড়ীর বিছানা, আসবাব পত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র সম্পর্কে অবহিত করবেন।

আমরা সাধারণত জানি যে, কারো ঘর ও কক্ষের দিকে তাকানো বাঞ্ছনীয় নয়, তবে আদর্শ শিক্ষার জন্য এ সম্মানিত ঘরের কিছু আমরা অবলোকন করব। এ ঘর যার ভিত্তি তো বিনয় এবং মূলধন হল ঈমান, আপনি কি দেখছেন না যে, এ ঘরের দেয়ালে কোন প্রকার জীবের ছবি নেই, যা আজকের দিনে অনেক লোক লটকিয়ে থাকে। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:

«لا تدخل الملائكة بيتًا فيه كلب ولا تصاوير»،

“যে বাড়ীতে কোন প্রকার জীবের ছবি ও কুকুর থাকে সে বাড়ীতে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না"[26]

এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত কিছুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।

সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন:

أخرج إلينا أنس بن مالك قدح خشب، غليظًا مضببًا بحديد فقال: يا ثابت هذا قدح رسول الله - صلى الله عليه وسلم -. وكان - صلى الله عليه وسلم - يشرب فيه الماء والنبيذ والعسل واللبن.

“একদা আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদের সামনে লোহার পাত দিয়ে বাঁধাই করা কাঠের তৈরি এক পাত্র নিয়ে উপস্থিত হয়ে বললেন: হে সাবেত! এ হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহৃত পাত্র"। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পাত্রে পানি, খেজুর সরবত, মধু ও দুধ পান করতেন[27]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كان يتنفس في الشراب ثلاثًا». يعني: يتنفس خارج الإناء.

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার সময় পাত্রের বাইরে তিনবার শাস ফেলতেন"[28]

ونهى عليه الصلاة والسلام «أن يتنفس في الإناء أو ينفخ فيه».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার সময় পাত্রের ভিতর শাস ফেলতে ও ফু দিতে নিষেধ করেন।[29]

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে লৌহ-বর্মটি জিহাদের ময়দানে, যুদ্ধাভিযান ও অন্যান্য কঠিন মূহুর্তে ব্যবহার করতেন তা হয়তো বর্তমানে তার ঘরে নেই। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন 'সা' জবের বিনিময় এক ইয়াহুদীর নিকট সেটি বন্ধক রেখেছিলেন। যেমন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন:

ومات الرسول - صلى الله عليه وسلم - والدرع عند اليهودي.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মৃত্যু বরণ করেন তখন তার লৌহ-বর্মটি ইয়াহুদীর নিকট বন্দক ছিল।[30]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারকে আতঙ্কে ফেলার জন্য কখনো হঠাৎ করে ঘরে প্রবেশ করতেন না। বরং তিনি পরিবারকে পূর্বে অবহিত করেই ঘরে প্রবেশ করতেন এবং প্রবেশ করার সময় তাদের প্রতি সালাম দিতেন।[31]

উজ্জ্বল দৃষ্টি ও উদার হৃদয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসটি অনুধাবন করুন তিনি বলেন,

«طوبى لمن هدي إلى الإسلام، وكان عيشه كفافًا وقنع»،

“সৌভাগ্য তো ইসলামের পথে হিদায়েত প্রাপ্তদের জন্য, এমতাবস্থায় তার জীবনোপকরণও যথেষ্ট ও তুষ্টি পূর্ণ"[32]

আরও একটি মহান হাদিসের দিকে কর্ণপাত করুন, যাতে তিনি বলেন:

«من أصبح آمنًا في سربه معافى في جسده، عنده قوت يومه، فكأنما حيزت له الدنيا بحذافيرها».

“যে ব্যক্তি স্বীয় গোত্রে নিরাপদে বসবাস করেছে, শারীরিক ভাবেও সে সুস্থ ও তার নিকট রয়েছে সে দিনটির পরিপূর্ণ খাবার, তাহলে লোকটি এমন যেন, সারা দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও তার মুঠোই রয়েছে"[33]


আত্মীয়-স্বজন

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মীয় সম্পর্ক অটুট রাখার ব্যাপারে কি পরিমাণ পরিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, যা বলে শেষ করা যাবে না। এমন কি মক্কার কাফের কুরাইশরা পর্যন্ত তাঁর প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং নবুয়তের পূর্বে তাঁকে মহা সত্যবাদী ও আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত করেছিল। আর তাঁর স্ত্রী খাদীজা তাকে এ কথাগুলি বলে প্রবোধ দিয়ে বর্ণনা করেন:

«إنك لتصل الرحم وتصدق...»

“আপনি তো আত্মীয়তা অটুট রাখেন ও সর্বদায় সত্য কথা বলেন...।"

এতো সেই ব্যক্তি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি শ্রেষ্ঠ অধিকার ও সর্ব বৃহৎ দায়িত্বসমূহ পালন করেন.. তিনি তাঁর সাত বছর বয়সে ইন্তেকাল করা মাতার কবর যিয়ারত করেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

زار النبي - صلى الله عليه وسلم - قبر أمه، فبكى وأبكى من حوله فقال: «استأذنت ربي في أن أستغفر لها فلم يأذن لي، واستأذنته في أن أزور قبرها فأذن لي، فزوروا القبور، فإنها تذكر الموت».

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাতার কবর যিয়ারত কালে কান্না করেন ও তার কান্নায় উপস্থিত সকলেই কাঁদেন। অত:পর তিনি বলেন: “আমি স্বীয় প্রভুর নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম কিন্তু তিনি অনুমতি দেননি, পরে আমি তাঁর সমীপে তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব, হে আমার উম্মত! তোমরা কবর যিয়ারত করো, কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।"[34]

লক্ষ্য করুন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক স্বীয় আত্মীয় স্বজনদের প্রতি ভালবাসা ও সৎ পথের দাওয়াত দেয়ার আগ্রহ ও তাদের হিদায়েত প্রাপ্তি ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল কত প্রবল। আর এ পথে তিনি কত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

لما نزلت هذه الآية: { وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ } ، دعا رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قريشًا فاجتمعوا فعمَّ وخصَّ، وقال: «يا بني عبد شمس، يا بني كعب بن لؤي أنقذوا أنفسكم من النار، يا بني مرة بن كعب أنقذوا أنفسكم من النار، يا بني عبد مناف أنقذوا أنفسكم من النار، يا بني هاشم أنقذوا أنفسكم من النار، يا بني عبد المطلب أنقذوا أنفسكم من النار، يا فاطمة أنقذي نفسك من النار، فإني لا أملك لكم من الله شيئًا غير أن لكم رحمًا سأبلها ببلالها».

যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল: “وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ" অর্থাৎ “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে ভয় প্রদর্শন করুন।"[সূরা শুয়ারা: ২১৪] তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সকল স্তরের লোকদেরকে আহ্বান করে একত্রিত করে বলেন: “হে বনী আবদে শামস, হে বনী কা'ব বিন লুয়িই তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। হে বনী আবদে মানাফ! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। হে বনী আব্দুল মুত্তালিব! তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো। হে ফাতেমা! তুমি নিজেকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো[35]

কেননা কিয়ামত দিবসে আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। তবে আমি এ ধরাতে তোমাদের সাথে আত্মীয়তা সম্পর্ক ঠিক রাখবো।

তিনি সেই প্রিয় নবী, যিনি তাঁর চাচা আবু তালিবকে দাওয়াত দিতে কোন বিরক্ত হননি ও কোন প্রকার ত্রুটি করেননি, বিভিন্ন পন্থায় তাকে একের পর এক দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি তিনি তার মৃত্যুর সময়ে তার নিকট এসেছেন:

«لما حضرت أبا طالب الوفاة دخل عليه النبي - صلى الله عليه وسلم - وعنده أبو جهل وعبد الله بن أبي أمية فقال: «أي عم، قل لا إله إلا الله كلمة أحاج لك بها عند الله عز وجل»، فقال أبو جهل وعبد الله بن أبي أمية: يا أبا طالب أترغب عن ملة عبد المطلب؟ قال: فلم يزالا يكلمانه حتى قال آخر شيء كلمهم به، على ملة عبد المطلب». فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «لأستغفرن لك مالم أنه عنك» فنزلت: { مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ } قال: ونزلت: { إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ } ».

“যখন আবু তালিব মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে তখন তার নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করেন, সে মুহূর্তে তার নিকট উপস্থিত ছিল আবু জেহেল, আবুল্লাহ বিন আবি ওমাইয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: হে আমার চাচা! আপনি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবূদ নেই' কালেমাটি পাঠ করুন, যাতে করে কিয়ামত দিবসে আমি আল্লাহর কাছে প্রমাণ পেশ করে সুপারিশ করতে পারি। এ সময় আবু জেহেল ও আব্দুল্লাহ বিন আবি ওমাইয়া বলল: ওহে আবু তালেব! শেষ পর্যন্ত কি তুমি আব্দুল মুত্তালিব এর ধর্মকে বিসর্জন দিতে যাচ্ছ? তারা বার বার এ কথাটি আবৃত্তি করতে লাগল, অবশেষে আবু তালিব সর্ব শেষ যে কথাটি বলল: তা হল: “আমি আব্দুল মুত্তালিব এর ধর্মের উপরেই।"

অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকব। পরে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়:

﴿ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَن يَسۡتَغۡفِرُواْ لِلۡمُشۡرِكِينَ وَلَوۡ كَانُوٓاْ أُوْلِي قُرۡبَىٰ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمۡ أَنَّهُمۡ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَحِيمِ ١١٣ ﴾ [التوبة: ١١٣]

অর্থাৎ: নবী ও অন্যান্য মু'মিনদের জন্য বৈধ নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা আত্মীয় হয়, একথা প্রকাশ হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।[36]

﴿ إِنَّكَ لَا تَهۡدِي مَنۡ أَحۡبَبۡتَ ٥٦ ﴾ [القصص: ٥٦]

অর্থাৎ: হে নবী [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম]! আপনি যাকে চাইবেন তাকেই হেদায়েত করতে পারবেন না।[37]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালিবের জীবদ্দশায় তাকে অনেক বার ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন এমনকি তার জীবনের শেষ মূহুর্ত গুলিতেও। অত:পর তার মৃত্যুর পর নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার প্রতি সদ্ব্যবহার ও দয়া পরবশ হয়ে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তারপর তিনি আল্লাহর নির্দেশ শ্রবণ ও অনুসরণের নিমিত্তে নিকটাত্মীয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হতে বিরত থাকেন। এ হল তাঁর উম্মতের প্রতি দয়ার চিত্রের মধ্য হতে কতিপয় মহৎ চিত্র। অত:পর পরিশেষে এ মহান দ্বীনে মিত্রতার ও কাফের-মুশরিকদের সাথে বৈরিতার চিত্রও প্রকাশিত হয়েছে যদিও তারা নিকটাত্মীয়ও হয়।

نبي أتانا بعد يأس وفترة من الرسل، والأوثان في الأرض تعبد

فأمسى سراجاً مستنيراً وهادياً يلوح كما لاح الصقيل المهند

وأنذرنا ناراً، وبشر جنة وعلمنا الإسلام فلله نحمد

আরবি কবি বলেন:

নবী-রাসূলদের আগমনের সাময়িক ধারা বিচ্ছিন্নতা উপেক্ষা ও সকল নিরাশা ভেদ করে আমাদের নিকট আগমন করেন একজন নবী যখন বিশ্বজগতে চলত ব্যাপক মূর্তি পূজা।

অত:পর তিনি আলোকময় উজ্জ্বল প্রদীপ ও দিশারীতে পরিণত হন এবং তিনি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেন যেমন উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল সেই বিখ্যাত হিন্দুস্তানি চকচকে তরবারি। তিনি আমাদেরকে জাহান্নাম হতে ভীতি প্রদর্শন করেন ও জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেন এবং আমাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা দেন। সুতরাং আল্লাহরই আমরা প্রশংসা করি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাসস্থান

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘর যেন প্রকৃতই সমস্ত আদর্শের প্রাণ কেন্দ্র। যেখান থেকে প্রকাশিত হয় উত্তম আদর্শ, পরিপূর্ণ আদব-শিষ্টাচার, মনোরম সমাজ ও স্বচ্ছ উপাদান। আর তা ছিল চার দেয়ালের অভ্যন্তর কক্ষে যা অন্যান্য মানুষের কেউ তা অবলোকন করেনি। তিনি তো তাঁর অধীনস্থ দাস, খাদেম বা স্ত্রীদের সাথে অবস্থান করতেন। তাদের সাথে উত্তম আচরণ ও অতি বিনয় মূলক ব্যবহার করতেন। যার মধ্যে থাকত না কোন কৃত্রিমতা ও সৌজন্যটা, অথচ তিনি ছিলেন সে ঘরের সরদার ও হুকুম-দাতা ও নিষেধকারী। যারা এ ঘরে অবস্থান করত সবাই তো ছিল তার অধীনস্থ ও দুর্বল। এ উম্মতের রাসূল, পথ নির্দেশক ও মহা নিদর্শনের এত মহত্ত্ব-পূর্ণ এত বড় মান-মর্যাদা ও শানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর বাসগৃহে কেমন ছিলেন কি তাঁর অবস্থা ছিল একটু চিন্তা করে দেখি আমরা!

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে কি কি কাজ করতেন? তিনি উত্তর দেন:

«كان بشرًا من البشر: يفلي ثوبه ويحلب شاته، ويخدم نفسه».

তিনি তো [রক্ত, মাংস ও চামড়ার] একজন মানুষই ছিলেন, তিনি তাঁর কাপড় সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন।[38]

তিনিই ছিলেন বিনয়ের মূর্ত প্রতীক যার ভিতর ছিল না কোন প্রকার অহংকার, যিনি দিতেন না কাউকে দিতেন না কষ্ট। তিনি ছিলেন প্রতিটি কাজে অংশ গ্রহণকারী মহান ব্যক্তিত্ব এবং সাহায্যকারীর অগ্রনায়ক। মানব জাতির সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি এগুলি তিনি নিজে আঞ্জাম দিতেন। তিনি এই মুবারক ঘরে বাস করতেন যেখান থেকে এ দ্বীনের হিদায়েতের আলোক বর্তিকা উদ্ভাসিত হয়ে দিক-বিদিকে ছড়িয়ে আলোকিত করেছে, অথচ সে মহান ঘরে এমন খাবার পর্যন্ত জুটত না যা দিয়ে তাঁর পেট পূর্ণ হবে।

নুমান ইবনু বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা বর্ণনা করতঃ বলেন:

«لقد رأيت نبيكم - صلى الله عليه وسلم - وما يجد من الدقل ما يملأ بطنه».

“আমি তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমনও দেখেছি যে, তিনি নিম্ন মানের খেজুরও পেতেন না যা দ্বারা তাঁর পেট পূর্ণ হবে।"[39] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«إن كنا آل محمد نمكث شهرًا ما نستوقد بنار إن هو إلا التمر والماء».

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারে আমরা এক মাস ব্যাপী কোন প্রকার চুলা জ্বালাতাম না, তবে আমরা শুধু খেজুর ও পানি দ্বারাই জীবন ধারণ করতাম।[40]

এর পরেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ইবাদাত ও তার অনুসরণ হতে কখনো বিরত হতেন না..। যখনই তিনি মসজিদ হতে আযান ধ্বনি শুনতে পেতেন সে আহ্বানের সাড়া দিয়ে, তখনই তিনি সর্ব প্রকার কাজ ছেড়ে মসজিদ পানে ছুটে যেতেন।

আসওয়াদ বিন ইয়াযিদ বলেন:

سألت عائشة رضي الله عنها، ما كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصنع في البيت؟ قالت: «كان يكون في مهن أهله، فإذا سمع بالأذان خرج».

“আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে কি কি ধরনের কাজ করতেন? উত্তরে তিনি বলেন: “তিনি তার পরিবারের সর্ব প্রকার কাজে নিয়োজিত থাকতেন, তবে আযান শুনার সাথে সাথেই বাড়ী হতে বের হয়ে যেতেন"[41]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে ফরয সালাত আদায় করেছেন এমন কোন প্রমাণ নেই, তবে তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে যখন রোগ অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং মসজিদে যেতে অপারগ হয়েছিলেন তখন তিনি বাড়ীতে আদায় করেছেন।

উম্মতের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত মেহেরবানী ও দয়া থাকার পরও যারা জামাতে উপস্থিত না হয়েছে তাদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, তিনি বলেন:

«لقد هممت أن آمر بالصلاة فتقام ثم آمر رجلاً أن يصلي بالناس ثم أنطلق معي برجال معهم حزم من حطب إلى قوم لا يشهدون الصلاة فأحرق عليهم بيوتهم».

“আমার ইচ্ছা হয় যে আমি কাউকে নামাযের ইমামতি করার আদেশ দেই আর আমি কাঠসহ কিছু লোককে সাথে নিয়ে ঐ সকল লোকদের বাড়ীতে যাই যারা জামাতের সাথে সালাত পড়ার জন্য উপস্থিত হয়নি। অত:পর তারাসহ তাদের বাড়ী-ঘরকে জালিয়ে দেই।[42]

এ সব তো জামাতের সাথে সালাত আদায়ের গুরুত্ব ও মহত্ত্বের প্রমাণই বহন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«من سمع النداء فلم يجب فلا صلاة له إلا من عذر»، والعذر خوف أو مرض.

“শরয়ী ওযর ব্যতীত যে ব্যক্তি আযান শুনার পর জামাতের সাথে সালাত আদায় করল না, তার সালাত কবূল হবে না"[43]

আর ওযর বলতে: শত্রুর ভয় অথবা রোগকে বুঝায়।

হায়রে কোথায় আজ নামাযীরা তারা তো মসজিদ ছেড়ে দিয়ে স্ত্রীকেই প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে!! কোথায় সেই রোগ বা ভয়ের ওযর!!


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য

মানুষের অঙ্গ ভঙ্গি চাল-চলন ও আচার আচরণ হল তার জ্ঞানের লক্ষণ ও তার মন-মানসিকতা বুঝার চাবি কাঠি।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কন্যা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সর্বাপেক্ষা বেশী জানতেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে, আর তিনিই নিখুঁত রূপে বর্ণনা দিতে পারবেন তাঁর অবস্থা সম্পর্কে। কেননা তিনি তাঁর ঘুমের অবস্থায়, জাগ্রতাবস্থায়, রোগে ও সুস্থতায়, রাগে ও সন্তুষ্ট অবস্থায় ছিলেন তাঁর নিকটতম।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«لم يكن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فاحشًا ولا متفحشًا، ولا صخابًا في الأسواق ولا يجزي بالسيئة السيئة ولكن يعفو ويصفح».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অশ্লীল বা অশ্লীলতা লালন-কারী ব্যক্তি ছিলেন না। হাট-বাজারে কখনো হৈচৈ করতেন না। আর মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা দিতেন না বরং তিনি ক্ষমা করে দিতেন।[44]

এ হল এই উম্মতের করুণা, হিদায়াত ও সততার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র, আমাদের জন্য তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর নাতী হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

سألت أبي عن سير النبي - صلى الله عليه وسلم - في جلسائه، فقال: «كان النبي - صلى الله عليه وسلم - دائم البشر، سهل الخلق، لين الجانب، ليس بفظ غليظ ولا صخاب، ولا عياب، ولا مشاح، يتغافل عما لا يشتهي، ولا يؤيس منه راجيه، ولا يخيب فيه، قد ترك نفسه من ثلاث: الرياء، والإكثار، وما لا يعنيه، وترك الناس من ثلاث: كان لا يذم أحدًا ولا يعيبه، ولا يطلب عورته، ولا يتكلم إلا فيما رجا ثوابه، وإذا تكلم أطرق جلساؤه، كأنما على رءوسهم الطير، فإذا سكت تكلموا، لا يتنازعون عنده الحديث، من تكلم عنده أنصتوا له حتى يفرغ حديثهم عنده حديث أولهم، يضحك مما يضحكون منه، ويتعجب مما يتعجبون منه، ويصبر للغريب على الجفوة في منطقه ومسألته حتى إن كان أصحابه ليستجلبونهم، ويقول: «إذا رأيتم طالب حاجة يطلبها فأرفدوه»، ولا يقبل الثناء إلا من مكافئ، ولا يقطع على أحد حديثه حتى يجوز فيقطعه بنهي أو قيام».

আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের সাথে আচরণ সম্পর্কে আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম: উত্তরে তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্যোজ্জল চেহারাসম্পন্ন, অমায়িক চরিত্রের অধিকারী ও বিনয়ী ছিলেন। কঠোর ছিলেন না, হৈচৈ-কারী ছিলেন না, ছিদ্রান্বেষী ও কৃপণ ছিলেন না, তাঁর নিকট আগত ব্যক্তি নিরাশ ও হতাশ হত না। তিনি নিজের মধ্য হতে তিনটি জিনিস পরিত্যাগ করেছিলেন: [১] রিয়া বা আত্মপ্রকাশ [২] অতিরঞ্জন এবং [৩] অনর্থক কার্যকলাপ। মানুষের জন্য তিনি তিনটি জিনিসকে পরিত্যাগ করেন: [১] তিনি কাউকে নিন্দা করতেন না [২] কাউকে দোষারোপও করতেন না [৩] সওয়াবের প্রত্যাশা ব্যতীত কোন কথাই বলতেন না। যখন তিনি কথা বলতেন, শ্রবণকারীরা এমনভাবে কান পেতে শুনত যেন তাদের মাথায় পাখী বসে আছে। অত:পর যখন তিনি কথা শেষ করতেন তখন তারা কথা বলত। তারা তাঁর সামনে কখনো ঝগড়া বা কথা কাটাকাটি করত না। তাঁর নিকট কেউ কথা বলা আরম্ভ করলে তারা তার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত চুপ থাকত। তাঁর উপস্থিতিতে তাদেরই কথা বলার অধিকার থাকত যারা প্রথম কথা বলা শুরু করত। লোকেরা যাতে হাসে তিনিও তাতে হাসতেন, মানুষ যাতে আশ্চর্য হয় তিনিও তাতে আশ্চর্য হতেন এবং তিনি বলতেন: “যখন তোমরা কোন অভাবীকে তার প্রয়োজনীয় কিছু প্রার্থনা করতে দেখ তার প্রার্থনায় তাকে সাহায্য করো।" তিনি মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা পছন্দ করতেন না, কারো কথা বলার সময় তার কথার মাঝে বাধা দিতেন না, হাঁ, তবে সীমা অতিক্রম করলে তাকে হয়ত আদেশ বা নিষেধ করতেন।[45]

মুসলিম জাতির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শগুলিকে অনুধাবন করুন! আর আপনি সেগুলিকে আঁকড়ে ধরুন এবং তা বাস্তবায়ন করায় সচেষ্ট হোন কেননা তা সর্ব প্রকার মঙ্গলের সমাহার।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছিল যে, তিনি সাহাবীদেরকে দ্বীনের বিধান শিক্ষা দিতেন। যেমন তিনি বলেন:

«من مات وهو يدعو من دون الله ندًا دخل النار».

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে মৃত্যু বরণ করল সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে"[46]

তিনি আরও বলেন:

: «المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده، والمهاجر من هجر ما نهى الله عنه».

“প্রকৃত মুসলিম তো সে ব্যক্তি যার হাত ও কথার অনিষ্ট হতে অন্য মুসলিম নিরাপদে থাকে, আর প্রকৃত মুহাজির তো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিষেধ কৃত বস্তুকে ছেড়ে দিয়েছে"[47]

তিনি আরও বলেন:

«بشروا المشائين في الظلم إلى المساجد بالنور التام يوم القيامة».

“অন্ধকারে মসজিদে গমনকারীদেরকে কিয়ামত দিবসে পূর্ণ আলোর সুসংবাদ দান কর।[48]

তিনি আরও বলেন:

«جاهدوا المشركين بأموالكم وأنفسكم وألسنتكم».

“তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে স্বীয় জান, মাল ও কথার দ্বারা যুদ্ধ কর"[আবু দাউদ]

তিনি আরও বলেন:

« إن العبد ليتكلم بالكلمة ما يتبين فيها يزل بها إلى النار أبعد مما بين المشرق والمغرب».

বান্দা এমনও কথা বলে, যার মাধ্যমে সে এমন কিছু প্রকাশ করে যে, তার ফলে সে জাহান্নামের এত দূরে ছিটকে পড়ে যা পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বেরও অধিক"।[49]

তিনি আরও বলেন:

«إني لم أبعث لعانًا، وإنما بعثت رحمة».

“আমি অভিশম্পাতকারী রূপে প্রেরিত হইনি বরং আমি দয়া স্বরূপ প্রেরিত হয়েছি"[50]

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم».

নিশ্চয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন: তোমরা আমাকে মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করো না যেমন খৃষ্টানরা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে করেছে।[51]

জুনদুব বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

سمعت النبي - صلى الله عليه وسلم - قبل أن يموت بخمس وهو يقول: «إني أبرأ إلى الله أن يكون لي منكم خليل فإن الله قد اتخذني خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً ولو كنت متخذًا من أمتي خليلاً لاتخذت أبا بكر خليلاً، ألا وإن من كان قبلكم كانوا يتخذون قبور أنبيائهم مساجد، ألا فلا تتخذوا القبور مساجد فإني أنهاكم عن ذلك».

আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে তাঁকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি আল্লাহর নিকট কামনা করি যে, আমার তোমাদের মধ্য হতে একজন খলিল-বন্ধু হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা আমাকে খলিল বানিয়েছেন, যেমন ভাবে তিনি ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে খলিল বানিয়েছিলেন, আর আমি যদি কাউকে খলিল বানাতাম তবে আবু বকরকে আমার খলিল বানাতাম। ওহে আমার উম্মত! তোমাদের পূর্বের উম্মত তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছিল, সাবধান হে আমার উম্মত! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদে রূপান্তরিত করো না, আমি এ কাজ হতে তোমাদেরকে নিষেধ করছি।[52]

এ হাদিসের ভিত্তিতে এটাই প্রতীয়মান হল: যে মসজিদে কবর রয়েছে সে মসজিদে সালাত বৈধ হবে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যাগণ

জাহেলিয়াতের যুগে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করা ছিল পিতা-মাতার জীবনের এক কাল অধ্যায়। আর এ কাল অধ্যায়ের গ্লানি পরিবার ও বংশের সবার উপর ছেয়ে যেত। পরিশেষে উক্ত সমাজের অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হল যে, লজ্জা ও গ্লানির ভয়ে জীবিত শিশু কন্যাকে কবরস্থ করতে দ্বিধাবোধ করত না। তাদেরকে এমন কদাকার নিষ্ঠুরতার সাথে কবরস্থ করা হতো যাতে না ছিল দয়ার কোন লেশ না ছিল ভালোবাসার কোন স্থান। আর এ কাজটি বিভিন্ন পন্থায় আঞ্জাম দিত। তন্মধ্যে একটি চিত্র ছিল এই যে, কারো কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত পালন করার পর, স্ত্রীকে বলত: তাকে ভাল করে সাজিয়ে দাও আমি তাকে নিয়ে তার চাচার বাড়ীতে যাব। তার পূর্বেই মরুভূমিতে গর্ত খনন করে রাখত, গর্তের নিকট গিয়ে কন্যাকে বলত: এ গর্তের দিকে তাকাও, কন্যা গর্তে নিকট যাওয়ার সাথে সাথে ধাক্কা দিয়ে তাতে ফেলে নির্দয় ও নির্মম ভাবে তার উপর মাটি চাপা দিত।

এ জাহেলী সমাজের মাঝেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মহান দ্বীন নিয়ে এসে নারীকে মা, স্ত্রী, মেয়ে, বোন ও চাচী-ফুফুর মর্যাদায় স্থান দেন। কন্যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালবাসায় ধন্য হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ীতে যখন তাঁর মেয়ে ফাতেমা প্রবেশ করত তখন তিনি তার হাত ধরে চুমা খেয়ে তার পার্শে বসাতেন এবং তিনি যখন তাঁর বাড়ীতে প্রবেশ করতেন, তিনিও তাঁর হাত ধরে চুমা খেয়ে তার স্বস্থানে বসাতেন।[53]

যখন تبت يدا أبي لهب অর্থাৎ আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক" আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াতি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলে এবং এ বলে হুমকি দেয় যে, বিরত না হলে তার মেয়েদ্বয়কে তালাক দেয়া হবে এবং তিনি তার দাওয়াতি কাজে অবিচল থাকায় তারা তাঁর কলিজার টুকরা যাদের প্রতি এত ভালবাসা ও সম্মান থাকা স্বত্বেও আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতায়বা কর্তৃক তাঁর দুইজন মেয়ে উম্মে কুলসুম ও রুকাইয়ার তালাককেও ধৈর্যের সাথে মেনে নিয়েছিলেন। এ দ্বীনের দাওয়াত হতে তিনি এতটুকুও সরে দাড়াননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁর মেয়েকে অভ্যর্থনা জানানো ও হাসি মুখে তাকে বরণ করার চিত্র আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করে বলেন: كن أزواج النبي - صلى الله عليه وسلم - عنده، فأقبلت فاطمة رضي الله عنها تمشي ما تخطيء مشيتها من مشية رسول الله - صلى الله عليه وسلم - شيئًا فلما رآها رحب بها وقال: «مرحبًا بابنتي» ثم أجلسها عن يمينه أو عن شماله. আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীরা তাঁর নিকট বসে থাকতাম, এমন সময় ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা হেঁটে আগমন করত, তার চলন ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলার মতই। তিনি তাকে দেখা মাত্রই এই বলে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলতেন “স্বাগত আমার মেয়েকে" অত:পর তিনি তাকে তার ডানে কিংবা বামে বসাতেন।[54]

কন্যাদের দেখতে যাওয়া ও তাদের সমস্যা দূর করাও প্রমাণ করে তাদের প্রতি তার দয়া ও ভালবাসা। একদা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে কাজ করতে করতে তার হাতে ফোস্কা পড়ার অভিযোগ করে একজন খাদেমের আবেদন করতে এসে তাকে না পেয়ে, আবেদনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জানালেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করায় তাঁকে আবেদনটি সম্পর্কে অবহিত করলেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমরা শুয়ে পড়েছিলাম, এমতাবস্থায় তিনি আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন, আমরা তাঁকে দেখে দাঁড়াতে গেলাম, তিনি বলেন: «مكانكما» তোমরা স্বীয় স্থানেই থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে আমাদের দুইজনের মাঝখানে বসলেন, তার পায়ের ঠাণ্ডা আমার সিনায় অনুধাবন করতে পারলাম। অত:পর তিনি বললেন:

«ألا أدلكما على ما هو خير لكما من خادم؟ إذا أويتما إلى فراشكما، أو أخذتما مضاجعكما، فكبرا أربعًا وثلاثين وسبحا ثلاثًا وثلاثين، واحمدا ثلاثًا وثلاثين فهذا خير لكما من خادم».

“আমি কি তোমাদেরকে এমন পন্থা শিখবো? যা তোমাদের জন্য একজন খাদেমের চেয়েও উত্তম হবে? আর তা হল: যখন তোমরা বিছানায় শুইতে যাবে, তখন [৩৪] বার আল্লাহু আকবার, [৩৩] বার সুবহানাল্লাহ, [৩৩] বার আল-হামদু লিল্লাহ পাঠ করবে, এগুলি পাঠ করা একজন খাদেম পাওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।[55]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্য ধারণ ও বিপদে অধৈর্য না হওয়ার ব্যাপারে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় ফাতেমা ব্যতীত সকল কন্যাগণ মৃত্যু বরণ করেন এর পরেও তিনি কখনও গাল চাপড়াননি, অথবা কাপড় ছিড়েননি বা কুরআন খানী, মিসকিন খানা বা চল্লিশা করে কাউকে এ উপলক্ষে দাওয়াত খাওয়ান নি, অথবা তিনি তাযিয়া বা শোকের কোন প্রকার অনুষ্ঠান করেননি। বরং তিনি সওয়াবের প্রত্যাশায় ও আল্লাহ কর্তৃক তাকদীরকে মেনে নিয়ে ধৈর্য ধারণ করেছেন।

চিন্তিত ও বিপদে পতিত অবস্থায় চিন্তা ও বিপদ হতে রক্ষার জন্য আমাদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসিয়তসমূহের মধ্যে তিনি যেমন বলতেন:

﴿ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦ ﴾ [البقرة: ١٥٦]

“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন অর্থাৎ আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী"[56]

"اللهم أجرني في مصيبتي، واخلف لي خيراً منها

“আল্লাহুম্মা আজিরনী ফি মুসীবাতী ওয়াখলুফ লী খায়রাম মিনহা অর্থাৎ হে আল্লাহ আপনি এ বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করুন এবং এর চেয়ে উত্তম বস্তু আমাকে দান করুন।"[57]

বিপদে পঠিত দোয়ার বাক্যগুলি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর তা হল:

﴿ قَالُوٓاْ إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّآ إِلَيۡهِ رَٰجِعُونَ ١٥٦ ﴾ [البقرة: ١٥٦]

“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজীউন অর্থাৎ আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা আল্লাহর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী"[58]

অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কষ্টে পতিত ব্যক্তির আশ্রয় স্থল, এবং ধৈর্য ধারণকারীদের মহা সওয়াব প্রদানকারী এবং তাদেরকে তাঁর নিকট তার প্রতিদানের সুসংবাদ দিয়ে বলেন:

﴿ إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ ١٠ ﴾ [الزمر: ١٠]

অর্থাৎ ধৈর্য ধারণকারীদের প্রতিদান দেয়া হবে হিসাব ছাড়া। [সূরা যুমার, আয়াত: ১০]

দাম্পত্য জীবন ও স্ত্রীদের সাথে আচরণ

ছোট সংসারে স্ত্রী অনেক বাধ্যবাধকতার ভিতর খেজুর বৃক্ষের শাখার মত স্বামীর সাথে অতি নিকটে অবস্থান করে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

«الدنيا كلها متاع، وخير متاع الدنيا الزوجة الصالحة».

দুনিয়ার পূর্ণটাই সম্পদ [স্বরূপ] তবে দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হল: সতী স্ত্রী"।[59]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ উত্তম আচরণ ও তিনি মনোরম দাম্পত্য জীবনের অধিকারী হওয়ার প্রমাণ বহন করে, উম্মুল মু'মেনীন আয়েশার রাদিয়াল্লাহু আনহার নামকে আদরাচ্ছলে সংক্ষিপ্ত করে আহ্বান করা এবং তাকে এমন খবর পরিবেশন করা যাতে তার হৃদয় যেন তাঁর দিকে উড়ে যায়।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

قال رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يومًا: «يا عائش! هذا جبريل يقرئك السلام».

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বলেন: হে আয়েশ! [সংক্ষিপ্তাকারে] জিব্রাঈল [আলাইহিস সালাম] এই মাত্র তোমাকে সালাম দিয়ে গেল"।[60]

মুসলিম উম্মতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিপূর্ণ চরিত্র, সর্বোত্তম আদর্শ ও সুমহান মর্যাদার অধিকারী। দাম্পত্য জীবনের সর্বোত্তম নমুনা এবং নরম প্রকৃতি স্ত্রীর প্রকৃত আবেগ, অনুভূতি ও চাহিদা সম্পর্কে সম্যক অভিহিত।

তিনি স্ত্রীদেরকে এমন অবস্থান প্রদান করেন যা প্রত্যেক নারীই পছন্দ করবে, যার ফলে স্বামীর নিকট সে তার অর্ধাঙ্গিনীতে পরিণত হতে পারে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«كنت أشرب وأنا حائض، فأناوله النبي - صلى الله عليه وسلم -، فيضع فاه على موضع في فيشرب، وأتعرق العرق فيتناوله ويضع فاه على موضع في».

আমি ঋতু স্রাবের অবস্থায় কিছু পান করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিতাম, আর তিনি আমার মুখ রাখার স্থানে মুখ রেখে পান করতেন এবং আমি হাড়ের মাংস খেয়ে শেষ করলে তিনি তা গ্রহণ করে আমার মুখ লাগানোর স্থানেই মুখ লাগাতেন"।[61]

তিনি কোন ক্রমেই তেমন ছিলেন না, যা মুনাফিকরা ধারণা পোষণ করে থাকে এবং প্রাচ্যবিদরা যে সমস্ত মিথ্যা, অলীক অপবাদ ও বাতিল দাবী করে থাকে। বরং তিনি দাম্পত্য জীবনে সর্বোত্তম ও সহজ-সরল পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

আয়েশ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«إن النبي - صلى الله عليه وسلم - قبل امرأة من نسائه ثم خرج إلى الصلاة ولم يتوضأ».

নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোন এক স্ত্রীকে চুমু দিয়ে অজু না করেই নামাযের জন্য মসজিদের দিকে বের হয়ে যেতেন"।[62]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর সুমহান মর্যাদা ও সসম্মান অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ করেছেন। এই যে দেখুন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর বিন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক প্রশ্নের উত্তর প্রদান করত: তাকে শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন: স্ত্রীর ভালবাসা, জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ ও সম্মানিত ব্যক্তিকে কোন ক্রমেই অপমানিত করবে না।

আমর বিন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, أنه قال لرسول الله - صلى الله عليه وسلم -: أي الناس أحب إليك؟ قال: «عائشة». তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার নিকট কোন ব্যক্তি সব চেয়ে প্রিয়? তিনি উত্তরে বলেন: আয়েশা।[63]

যে ব্যক্তি দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে চায় সে যেন মুমিন জননী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর এ হাদিসটি ভাল করে ভেবে দেখে: তাতে রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: «كنت أغتسل أنا ورسول الله - صلى الله عليه وسلم - من إناء واحد». আমি ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পাত্র হতে পানি নিয়ে গোসল করতাম।[64]

এ মুসলিম জাতির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোন ঘটনা অতিবাহিত হতে দেননি যার মাধ্যমে তিনি বৈধ পন্থায় তাঁর স্ত্রীর মধ্যে আনন্দ ও মজা জাগিয়ে তোলেননি। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

خرجت مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - في بعض أسفاره، وأنا جارية لم أحمل اللحم ولم أبدن، فقال للناس: «تقدموا» فتقدموا ثم قال: «تعالي حتى أسابقك» فسابقته فسبقته، فسكت عني حتى حملت اللحم، وبدنت وسمنت وخرجت معه في بعض أسفاره فقال للناس «تقدموا» ثم قال: «تعالي أسابقك» فسبقني، فجعل يضحك ويقول: «هذه بتلك».

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ"[65]

এ ছিল সুন্দর চিত্ত বিনোদন ও স্ত্রীর ব্যাপারে অসীম গুরুত্বারোপ। সাহাবিদেরকে আগে পাঠিয়ে স্বীয় স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহণ করে তার হৃদয় আনন্দিত করা। তারপর পূর্বের বিনোদনের ইতিহাস টেনে আজকের বিজয়ের তুলনা করে বলেন: আজকের বিজয় পূর্বের প্রতিশোধ।

আল্লাহর এই প্রশস্ত জমিনে আজ যারা ভ্রমণ করে এবং জাতির সরদারের অবস্থার প্রতি চিন্তা-ভাবনা করে; যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আচরণের দ্বারা আনন্দিত হয়। যিনি মহা সম্মানিত নবী, বিজয়ী নেতা, কুরাইশ ও বনি হাশেম সন্তান।

কোন এক বিজয়ের দিন, তিনি বিজয়ী বেশে এক মহা সেনা অভিযানের নেতৃত্ব প্রদান করত: প্রত্যাবর্তন করছেন। এমতাবস্থায়তেও তিনি ছিলেন স্বীয় স্ত্রী মু'মিন জননীদের সাথে মুহাব্বত ও নমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। অভিযানের নেতৃত্ব, দীর্ঘ সফর, যুদ্ধের মহা বিজয় তাঁকে ভুলিয়ে দেয়নি যে, তাঁর সাথে রয়েছে দুর্বল স্ত্রী জাতি, যাদের তাঁর সুকোমল পরশ ও আন্তরিক ফিস ফি-সানির অধিকার ও প্রয়োজন রয়েছে। যা তাদের দীর্ঘ রাস্তার কষ্ট ও সফরের ক্লান্তি দূর করবে।

ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বারের যুদ্ধ শেষে ফিরছিলেন তখন সাফিয়া বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন, এবার যে উটের পিঠে সাফিয়া আরোহণ করবেন তার চার দিকে ঘুরে পর্দার জন্য কাপড় লাগানোর পর তিনি উটের পার্শে বসে তাঁর হাটুকে খাড়া করে দিলেন। অত:পর সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বীয় পা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাঁটুতে রেখে উঠে আরোহণ করেন।

সে আকৃষ্ট-কারী দৃশ্যটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিনয়ের বহি:প্রকাশ।

অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিজয়ী কমান্ডার, ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে দূত বা রাসূল, তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, স্ত্রীকে সাহায্য করা, তার সাথে বিনয়ী হওয়া, তাদের কাজে সহায়তা এবং তাদেরকে সুখ ও মজা প্রদানে তাঁর সম্মান ও মর্যাদার কোন কমতি হবে না।

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতদেরকে যে সব অসীয়ত করেন তন্মধ্যে একটি হল: «ألا واستوصوا بالنساء خيرًا». ওহে আমার উম্মত! তোমরা নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে"।[66]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একাধিক বিবাহ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারজন মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন, তাদেরকে মুমীন জননী বলা হয়..। তিনি যখন ইন্তেকাল করেন তখন নয়জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। তারা মহা সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়স্কা, বৃদ্ধা, বিধবা, তালাক প্রাপ্তা ও দুর্বল মহিলাদের বিবাহ করেছিলেন, শুধু মাত্র আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাই ছিলেন কুমারী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন জননীদেরকে বিবাহ করে তাদেরকে ইনসাফের সাথে একত্রিত করেন। তিনি ছিলেন ইনসাফ ও তাদের হক বণ্টনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«كان رسول لله - صلى الله عليه وسلم - إذا أراد سفرًا أقرع بين نسائه فأيتهن خرج سهمها خرج بها معه، وكان يقسم لكل امرأة منهن يومها وليلتها».

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর করার ইচ্ছা পোষণ করতেন তখন সব স্ত্রীদের নামে লটারি করতেন, যার নাম উঠত তাকেই তিনি সফর সঙ্গী করতেন, আর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পালা ক্রমে দিন-রাত বণ্টন করতেন।[67]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসাফের এক বাস্তব নমুনা বর্ণনা করতে গিয়ে আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«كان للنبي - صلى الله عليه وسلم - تسع نسوة، فكان إذا قسم بينهن لا ينتمي إلى المرأة الأولى إلا في تسع فكن يجتمعن كل ليلة في بيت التي يأتيها، فكان في بيت عائشة فجاءت زينب فمد يده إليها فقالت عائشة: هذه زينب، فكف النبي - صلى الله عليه وسلم - يده».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয় জন স্ত্রী ছিলেন, তিনি যখন তাদের মাঝে দিন বণ্টন করতেন তখনও তিনি নয়জনকেই সমান চোখে দেখতেন। প্রতি নিশিতে তারা পালা প্রাপ্ত বাড়ীতে একত্রিত হতেন, এক রাত্রিতে আয়েশার বাড়ীর পালার দিনে যয়নাব রাদিয়াল্লাহু আনহা উপস্থিত হওয়াতে তিনি তাঁর হাত বাড়ালেন, এ দেখে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: তিনি তো যয়নাব, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাত ঘুরিয়ে নিলেন"।[68]

আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ওহী ও তাওফিক না থাকলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাড়ী এত সুন্দর ও সুচারু রূপে পরিচালিত হত না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাজ ও কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করতেন। তিনি স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাতের দিকে উৎসাহ প্রদান করতেন এবং আল্লাহর হুকুম পালনার্থে তাতে তিনি সহযোগিতা করতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ وَأۡمُرۡ أَهۡلَكَ بِٱلصَّلَوٰةِ وَٱصۡطَبِرۡ عَلَيۡهَاۖ لَا نَسَۡٔلُكَ رِزۡقٗاۖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكَۗ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلتَّقۡوَىٰ ١٣٢ ﴾ [طه: ١٣٢]

অর্থাৎ আর তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও ও তাতে অবিচলিত থাক, আমি তোমার নিকট কোন রুযী কামনা করি না, আমিই তোমাকে রুযী দেই এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।[69]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي وأنا راقدة معترضة على فراشه فإذا أراد أن يوتر أيقظني».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম [রাতে উঠে তাহাজ্জুদের] সালাত পড়তেন। আর আমি তাঁর বিছানায় গতিরোধ করে শুয়ে থাকতাম, যখন তিনি বিতর সালাত পড়তেন তখন আমাকে জাগাতেন"।[70]

তাহাজ্জুদ নামাযে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সাহায্য করার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ প্রদান করেছেন, এবং সুন্দর পন্থা শিক্ষা দিয়েছেন, আর তা হল: স্বামী স্ত্রীর চোখে বা স্ত্রী স্বামীর চোখে পানি ছিটিয়ে জাগাবে।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:

«رحم الله رجلاً قام من الليل فصلى وأيقظ امرأته فصلت فإن أبت نضح في وجهها الماء، ورحم الله امرأة قامت من الليل فصلت وأيقظت زوجها فصلى فإن أبى نضحت في وجهه الماء».

আল্লাহ তা'আলা সে ব্যক্তির উপর দয়া করুন যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদের সালাত পড়ল এবং স্বীয় স্ত্রীকেও জাগাল, স্ত্রী যদি উঠতে অলসতা করে তবে তার মুখে পানি ছিটা দিল। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা সে মহিলার উপর দয়া করুন, যে রাতে জাগ্রত হয়ে তাহাজ্জুদের সালাত পড়ল এবং স্বীয় স্বামীকেও জাগাল, সে উঠতে অলসতা করলে তার মুখে পানি ছিটা দিল।[71]

পরিপূর্ণ মুসলিম হওয়া ও তাঁর দ্বীনের প্রতি গুরুত্ব প্রদানের অন্তর্ভুক্ত হল: সে যেন তার আভ্যন্তরীণ পূত-পবিত্রতা পরিপূর্ণতার স্বরূপ বাহ্যিক দিকেরও গুরুত্ব বজায় রাখে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর যেমন পবিত্র, তেমনি ভাবে তার শরীর ছিল পরিষ্কার ও সুগন্ধিময়, তিনি বেশী বেশী মিসওয়াক করতে ভালবাসতেন এবং এ কাজে তিনি উম্মতকে আদেশ দিয়ে বলেন:

«لو لا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة».

আমি যদি আমার উম্মতের উপর কঠিন মনে না করতাম তবে প্রত্যেক নামাযের আগে তাদেরকে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।[72] হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

إذا قام من النوم يشوص فاه بالسواك.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন, তখন তিনি মিসওয়াক দ্বারা স্বীয় মুখ মেজে নিতেন।[73]

শুরাইহ বিন হানী বলেন:

قلت لعائشة رضي الله عنها: بأي شيء كان يبدأ النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا دخل بيته؟ قالت: بالسواك.

আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করলাম: যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীতে প্রবেশ করতেন, তখন সর্ব প্রথম কোন কাজটি করতেন? উত্তরে বলেন: মিসওয়াক করতেন।[74]

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে পরিবারের অভ্যর্থনার প্রস্তুতি কতই না সুন্দর কাজ!

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নের দোয়াটি পাঠ করে, বাড়ীর লোকদের সালাম জানিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন:

بسم الله ولجنا، وبسم الله خرجنا، وعلى ربنا توكلنا.

অর্থাৎ আল্লাহর নামে প্রবেশ করলাম এবং আল্লাহর নামেই বাহির হয়েছিলাম ও আমাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা করি।[75]

হে মুসলিম ভাই! আপনিও পরিষ্কার হয়ে ও বাড়ীর লোকদের সালাম জানিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করুন। যারা এ সুন্দর প্রথার পরিবর্তে পরিবারের লোকদেরকে গালি-গালাজ করতে করতে বাড়ীতে প্রবেশ করে আপনি তাদের মত হবেন না!!


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রসিকতা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মত, সৈন্যবাহিনী, সৈন্য পরিচালনা ও পরিবারের চিন্তায় রত। আবার কখনো ওহী, ইবাদাত ও অন্যান্য চিন্তা রয়েছেই। সাধারণত বড় বড় ব্যস্ততার মাঝে মানুষ জীবনের চাওয়া পাওয়া ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই ভুলে যায়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক হকদারের হক সঠিক ভাবে আদায় করেছেন, কারো অধিকারে তিনি কসুর করেননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত কাজ ও দায়িত্ব থাকা স্বত্ত্বেও তার হৃদয়ে বাচ্চাদেরও স্থান ছিল অম্লান। তিনি বাচ্চাদের সাথে রসিকতা করে তাদের অন্তরে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়ে তাদের মনকে জয় করে নিতেন। যেমন তিনি অনেক সময় বড়দের সাথেও রসিকতা করতেন।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,

قالوا يا رسول الله: إنك تداعبنا، قال: «نعم. غير أني لا أقول إلا حقًا». ومن مزاحه - صلى الله عليه وسلم - ما رواه أنس بن مالك قال: «إن النبي - صلى الله عليه وسلم - قال له: يا ذا الأذنين».

তিনি বলেন: সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কি আমাদের সাথে রসিকতা করেন? তিনি উত্তরে বলেন: হাঁ, তবে আমি শুধু সত্য দ্বারাই রসিকতা করে থাকি।[76]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রসিকতার একটি হল: এ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যা আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ বলে সম্বোধন করতেন: «يا أبا عمير، ما فعل النغير؟» হে দুই কান ওয়ালা।[77]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: উম্মে সুলাইমের এক ছেলেকে আবু ওমাইর বলে ডাকা হতো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসলে অনেক সময় রসিকতা করতেন। একদা রসিকতা করার জন্য তাদের বাড়ীতে প্রবেশ করে দেখলেন যে, সে চিন্তিত, তিনি বললেন, কি হয়েছে আবু ওমাইরকে চিন্তা মগ্ন দেখছি? উপস্থিত ব্যক্তিরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল! তার নুগাইর নামে পাখীটি মরে গেছে, যাকে নিয়ে সে খেলত। এরপর থেকেই তিনি তাকে বলতেন: হে আবু ওমাইর তোমার নুগাইর পাখীর কি খবর?[78]

বড়দের সাথেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রসিকতা করার ঘটনা রয়েছে, তন্মধ্য আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,

إن رجلاً من أهل البادية كان اسمه زاهر بن حرام، قال: وكان النبي - صلى الله عليه وسلم - يحبه وكان دميمًا، فأتاه النبي - صلى الله عليه وسلم - يومًا يبيع متاعه، فاحتضنه من خلفه وهو لا يبصر: فقال: أرسلني، من هذا؟ فالتفت فعرف النبي - صلى الله عليه وسلم - فجعل لا يألو ما ألزق ظهره بصدر النبي - صلى الله عليه وسلم - حين عرفه، وجعل النبي - صلى الله عليه وسلم - يقول: «من يشتري العبد» فقال: يا رسول الله إذا والله تجدني كاسدًا، فقال النبي: «لكن عند الله أنت غال».

গ্রাম্য এক ব্যক্তি ছিল, যার নাম ছিল যাহের বিন হারাম। নবী [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] তাকে খুব ভালবাসতেন। তার গায়ের রং ছিল কালো বর্ণের। একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকটে গেলেন সে তখন তার মালামাল বিক্রির কাজে ব্যস্ত ছিল। অত:পর তিনি তার অজান্তে পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। সে তখন বলতে লাগল: কে তুমি? আমাকে ছেড়ে দাও। পিছনের দিকে ফিরে জানতে পারল যে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চেনার পর তার পিঠকে রাসুলের সিনার সাথে ঘসতে কোন প্রকার কসুর করেনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন: এ দাসকে কে ক্রয় করবে? সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে এত সস্তা মনে করলেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: না, তুমি আল্লাহর নিকট অনেক মূল্যবান।[79]

তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্র, মহান বৈশিষ্ট্য ও ভদ্র ব্যবহারের অধিকারী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবার ও সাহাবীদের সাথে এমন উদার ও খোলা মেজাজের হওয়া সত্ত্বেও তার হাসির একটা সীমা ছিল। তিনি অট্ট হাসি হাসতেন না, বরং তিনি মুচকি হাসি দিতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما رأيت رسول الله مستجمعًا قط ضاحكًا حتى ترى منه لهواته، وإنما كان يَتَبَسَّمُ ».

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনো অট্টহাসি দিতে দেখিনি যার ফলে মুখের ভিতরের তালু প্রকাশ পায়, বরং তিনি মুচকি হাসি দিতেন।[80]

রাসূলের এরকম হাস্যোজ্জল চেহারা ও সুন্দর আচরণ হওয়া স্বত্ত্বেও তার সামনে কেউ আল্লাহর শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ করলে তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেত।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

قدم رسول الله - صلى الله عليه وسلم - من سفر، وقد سترت سهوة لي بقرام فيه تماثيل، فلما رآه رسول الله - صلى الله عليه وسلم - هتكه وتلون وجهه وقال: «يا عائشة: أشد الناس عذابًا عند الله يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله».

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন সফর থেকে ফিরে আসলেন, আর আমি আমার ঘরে ছবি যুক্ত কাপড় দ্বারা পর্দা লটকিয়ে ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে তাঁর মুখ মণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যায় এবং তা নষ্ট করে বলেন: হে আয়েশা! যারা কোন জীবের ছবি আঁকাবে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তাদের কঠিন আযাব হবে।[81]

এ হাদিস এটাই প্রমাণ করে যে, ঘর-বাড়ীতে ছবি রাখা হারাম যদি তা দেখা যায়। আর তার চেয়ে ভয়াবহ হল: যদি তা দেয়ালের সাথে লটকানো হয় অথবা ঘর-বাড়ীর কোণ, আলমারি ও শোকেসে যদি মূর্তি বা পুতুল রাখা হয়। এতে গোনাহ তো রয়েছেই তা সত্ত্বেও রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে এ বাড়ীর অধিবাসীরা।


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুম

উবাই রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

«إذا أوى أحدكم إلى فراشه، فليأخذ داخلة إزاره -أي طرفه- فلينفض بها فراشه وليسم الله، فإنه لا يعلم ما خلفه بعده على فراشه، فإذا أراد أن يضطجع فليضطجع على شقه الأيمن، وليقل: سبحانك اللهم ربي بك وضعت جنبي وبك أرفعه إن أمسكت نفس فاغفر لها وإن أرسلتها فاحفظها بما تحفظ به عبادك الصالحين».

তোমাদের কেউ যখন বিছানায় শয়ন করতে যাবে, তখন বিসমিল্লাহ বলে সে তার কাপড়ের এক পার্শ্ব দ্বারা বিছানা ঝাড়বে। কেননা সে জানে না তার বিছানায় তার অবর্তমানে কি হয়েছে। আর যখন শয়ন করার ইচ্ছা করবে তখন যেন ডান পার্শ্ব হয়ে শয়ন করে, আর বলে:

سبحانك اللهم ربي بك وضعت جنبي وبك أرفعه فإن أمسكت نفسي فارحمها وإن أرسلتها فاحفظها بما تحفظ به عبادك الصالحين .

অর্থ: হে আল্লাহ তোমার পবিত্রতম প্রশংসা। হে প্রভু! তোমার নামে আমি আমার পার্শ্বদেশকে শয্যায় স্থাপন করছি, [আমি শয়ন করছি] আর তোমরই নাম নিয়ে আমি তাকে উঠাব [শয্যা ত্যাগ করাব] যদি তুমি [আমার নিদ্রাবস্থায়] আমার প্রাণ কবজ করো, তবে তুমি তাকে রহম করো, আর যদি তুমি তাকে ছেড়ে দাও [বাঁচিয়ে রাখো] তবে সে অবস্থায় তুমি তার হেফাজত করো যেমন-ভাবে তুমি তোমার সৎ বান্দাদেরকে হেফাজত করে থাকো।[82]

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক নির্দেশনা হল: তিনি এরশাদ করেন: « إذا أتيت مضجعك فتوضأ وضوءك للصلاة ثم اضطجع على شقك الأيمن». তুমি যখন বিছানায় শয়ন করতে যাবে, তখন তুমি নামাযের অজুর ন্যায় অজু করে ডান পার্শ্ব হয়ে শয়ন করবে।[83]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إذا أوى إلى فراشه كل ليلة، جمع كفيه فنفث فيهما، وقرأ فيهما: { قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ } و { قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ } ، و { قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ } ثم مسح بهما ما استطاع من جسده يبدأ بهما رأسه ووجهه وما أقبل من جسده، يصنع ذلك ثلاث مرات».

প্রতি রাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শয়নের জন্য যেতেন, তখন তাঁর দুই হাতকে একত্র করে তাতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে তাতে ফু দিয়ে যতদূর সম্ভব তার শরীর মাসেহ করতেন। তিনি মাথা, মুখমণ্ডল ও সামনের অংশ দ্বারা মাসেহ শুরু করতেন এবং অনুরূপ তিনবার করতেন।[84]

আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানায় শয়ন করার সময় বলতেন:

الحمد لله الذي أطعمنا وسقانا وكفانا وآوانا، فكم ممن لا كافي له ولا مؤوي.

অর্থ: সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে আহার করিয়েছেন, পান করিয়েছেন, আমাদের প্রয়োজন পূর্ণ করিয়েছেন, এবং আমাদের শয়ন করার তাওফিক দিয়েছেন, অথচ এমন বহু লোক আছে, যাদের প্রয়োজন পূর্ণকারী নেই, যাদের আশ্রয় দানকারী কেউ নেই।[85]

আবু কাতাদাহ বলেন:

إن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان إذا عرس بليل اضطجع على شقه الأيمن، وإذا عرس قبيل الصبح نصب ذراعه ووضع رأسه على كفه».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের সময় রাতের শেষের দিকে কোথাও অবতরণ করে শয়ন করলে, ডান পার্শ্ব হয়ে শয়ন করতেন আর ফজরের কিছুক্ষণ পূর্বে শয়ন করলে হাত খাড়া করে তার উপর মাথা রেখে শুইতেন।[86]

আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কত প্রচুর নেয়ামত দান করেছেন..।

প্রিয় পাঠক! সৃষ্টির সেরা, সমস্ত নবীদের সরদার জমিনের বুকে যত মানুষের পদচারণ হয়েছে তার শ্রেষ্ঠতম শেষ নবীর বিছানা সম্পর্কে চিন্তা করুন!

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«إنما كان فراش رسول الله - صلى الله عليه وسلم - الذي ينام عليه من أدم حشوه ليف».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিছানায় ঘুমাতেন তা ছিল চামড়ার ও তার ভিতরের জিনিস ছিল খেজুর গাছের ছাল।[87]

একদা সাহাবীদের এক দল ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে প্রবেশ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় ঘুরে বসলেন, তাতে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পার্শ্বদেশ ও মাদুর বা চাটাইয়ের মাঝে কোন কাপড় দেখতে পাননি যার ফলে তাঁর পার্শ্বদেশে মাদুরের দাগ বসে গেছে তা দেখে ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে ফেললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে ওমার কেন কাঁদছ? তিনি উত্তরে বলেন: আমরা জানি আপনি রোম ও পারস্যের রাজার চেয়ে আল্লাহর নিকট অনেক সম্মানী। তারা এ ধরাতে কত প্রকার সুখ আর আনন্দ ফুর্তি করে যাচ্ছে আর আপনাকে আমরা এ অবস্থায় দেখছি! একথা শুনে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেন: “হে ওমার তুমি কি চাও না যে তাদের জন্য দুনিয়ায় হোক আর আমাদের জন্য হোক আখিরাতে? ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: হাঁ। তিনি বলেন: তবে এরূপই হবে।[88]


রাত্রি জাগরণ

মদিনার রাত সমাগত তার চারি দিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] তার চারি পার্শ্বে সালাত, যিকির ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আলোকিত করেছেন, রাত্রি জাগরণ করছেন..। তিনি ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের মালিক, যার হাতে সকল কিছুর চাবি-কাঠি স্বীয় স্রষ্টা মহান প্রভুর নির্দেশ পালনার্থে তাঁর সমীপে মুনাজাত করছেন। নির্দেশ হচ্ছে:

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُزَّمِّلُ ١ قُمِ ٱلَّيۡلَ إِلَّا قَلِيلٗا ٢ نِّصۡفَهُۥٓ أَوِ ٱنقُصۡ مِنۡهُ قَلِيلًا ٣ أَوۡ زِدۡ عَلَيۡهِ وَرَتِّلِ ٱلۡقُرۡءَانَ تَرۡتِيلًا ٤ ﴾ [المزمل: ١، ٤]

অর্থাৎ: হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রি জাগরণ করুন, কিছু অংশ ব্যতীত, অর্ধরাত্রি বা তা অপেক্ষা অল্প, অথবা তা অপেক্ষা বেশী। আর কুরআন আবৃত্তি করুন ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে।[89] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقوم يصلي حتى تنتفخ قدماه، فيقال له: يا رسول الله تفعل هذا وقد غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر؟ قال: «أفلا أكون عبدًا شكورًا؟».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এত নামাজ আদায় করতেন যে, তার দুই পা ফুলে যেত। তাকে বলা হল: হে আল্লাহর রাসূল আপনার আগের ও পরের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে তবুও কেন আপনি এত ইবাদাত করেন? তিনি উত্তরে বলেন: আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী বান্দা হবো না?।[90]

আসওয়াদ বিন ইয়াযিদ বলেন:

سألت عائشة رضي الله عنها عن صلاة رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بالليل فقالت: «كان ينام أول الليل ثم يقوم فإذا كان له حاجة ألم بأهله، فإذا سمع الأذان وثب، فإن كان جنبًا أفاض عليه من الماء وإلا توضأ وخرج إلى الصلاة».

আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাত্রি কালীন সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি উত্তরে বললেন: তিনি প্রথম রাত্রিতে ঘুমিয়ে যেতেন। অত:পর তিনি জাগ্রত হয়ে নামাজ আদায় করতেন, তারপর স্ত্রীর সাথে কোন প্রকার প্রয়োজন মনে করলে তা পূরণ করতেন। আর আযান শুনার সাথে সাথেই লাফিয়ে উঠে পড়তেন, গোসলের প্রয়োজন হলে তা সেরে নিতেন অথবা অজু করে নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন।[91]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত ছিল অনেক সুন্দর ও দীর্ঘ, আমরা একটু ভাল করে অনুধাবন করে স্বীয় জীবনে নমুনা হিসেবে বাস্তবায়ন করব!

আবু আব্দুল্লাহ হুযাইফা বিন আলইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«صليت مع النبي - صلى الله عليه وسلم - ليلة فافتتح البقرة، فقلت: يركع عند المائة، ثم مضى فقلت: يصلي بها في ركعة، فمضى، ثم افتتح آل عمران فقرأها، فقلت: يركع بها، ثم افتتح النساء فقرأها، يقرأ مترسلاً، إذا مر بآية فيها تسبيح سبح، وإذا مر بسؤال سأل، وإذا مر بتعوذ تعوذ، ثم ركع فجعل يقول: سبحان ربي العظيم، فكان ركوعه نحوًا من قيامه، ثم قال: سمع الله لمن حمده، ربنا لك الحمد، ثم قام طويلاً قريبًا مما ركع، ثم سجد فقال: سبحان ربي الأعلى، فكان سجوده قريبًا من قيامه».

আমি এক রাত্রিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায় করি, তিনি সূরা বাকারা পড়া শুরু করলেন, আমি ভাবলাম তিনি হয়তো একশ আয়াত শেষে রুকুতে যাবেন, তিনি পড়তেই থাকলেন, আমি মনে করলাম তিনি হয়তো সম্পূর্ণ সূরা শেষ করে রুকুতে যাবেন, তিনি সূরা বাকারা শেষ করে সূরা আলে ইমরান পড়া আরম্ভ করলেন, আমি মনে করলাম তিনি হয়তো এ সূরা শেষ করে রুকুতে যাবেন, তারপর তিনি সূরা নিসা পড়া আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তিনি ধীর-স্থির ভাবে তাজভীদের সাথে পড়েন। যদি এমন কোন আয়াত অতিবাহিত হত যাতে তাসবীহ রয়েছে, সেখানে তিনি তাসবীহ [সুবহানাল্লাহ] পড়তেন। আর প্রার্থনা বিষয়ক কোন আয়াত পাঠ করলে, তিনি আল্লাহর সমীপে প্রার্থনা করেন, আর আযাব বিষয়ক কোন আয়াত পাঠ করলে তিনি তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তারপর তিনি রুকু করেন। আর তাতে তিনি “সুবহানা রাব্বিয়ালা আযীম" পাঠ করেন। তার রুকুর পরিমাণও ছিল, প্রায় দাঁড়িয়ে থাকার সমপরিমাণ। রুকু থেকে উঠে “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ, রাব্বানা লাকাল হামদ" পাঠ করেন, তারপর প্রায় রুকু করার সমপরিমাণ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর সিজদা করে “সুবাহানা রাব্বিয়ালা আলা" পাঠ করেন, তার সিজদাও প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সময়ের সমপরিমাণই ছিল।[92]

ফজরের পর

মদিনায় রাত্রি অবসানের পর, পূর্বাকাশে ফজরের আভা উঁকি দেয়ার পর, মসজিদে ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায়ান্তে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যোদয় হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন, তারপর তিনি দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন।

জাবের বিন সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان إذا صلى الفجر جلس في مصلاه حتى تطلع الشمس حسنًا».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর নামাযান্তে উত্তমরূপে সূর্যোদয় পর্যন্ত নামাযের স্থানেই বসে থাকতেন।[93]

আর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুই রাকাত সুন্নাত সালাত পড়ার জন্য তার উম্মতকে উৎসাহ প্রদান করেন, এবং এতে যে সওয়াব রয়েছে তাও স্মরণ করিয়ে দেন।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«من صلى الفجر في جماعة،ثم قعد يذكر الله حتى تطلع الشمس ثم صلى ركعتين، كانت له كأجر حجة وعمرة، تامة، تامة، تامة».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজরের সালাত আদায়ান্তে বসে আল্লাহর যিকিরে মশগুল থেকে সূর্য উদয় হওয়ার পর দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করবে, সে পরিপূর্ণ এক হজ্জ ও ওমরার সওয়াব পাবে। পরিপূর্ণ এ কথাটি তিনি তিনবার বলেন।[94]

চাশতের সালাত

দ্বিপ্রহর হবে হবে ভাব, সূর্যের তাপের প্রখরতা বেড়ে চলছে, তাপে মুখ পুড়ে যাবার উপক্রম এ সময়টা হল চাশতের সময়, কাজের চাপ অনেক, জীবন যাপনের চাহিদা পূরণের কত ব্যস্ততা, রিসালাতের প্রচুর দায়িত্ব, প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাত, সাহাবীদের শিক্ষা প্রদান ও পরিবারের সবার অধিকার আদায়ের পরও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত করতে থাকেন।

মুয়াজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

قلت لعائشة رضي الله عنها: أكان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي الضحى؟ قالت: «نعم أربع ركعات ويزيد ما شاء الله عز وجل».

“আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললাম: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি চাশতের সালাত পড়তেন? তিনি উত্তরে বলেন: হাঁ, তিনি চার রাকাত পড়তেন অনেক সময় মা-শাআল্লাহ বেশীও পড়তেন।[95]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সালাত সম্পর্কে অসিয়তও করে গেছেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«أوصاني خليلي - صلى الله عليه وسلم - بصيام ثلاثة أيام من كل شهر، وركعتي الضحى، وأن أوتر قبل أن أرقد».

আমার বন্ধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখা, দুই রাকাত চাশতের সালাত পড়া ও ঘুমানোর পূর্বেই বিতর সালাত আদায় করার অসিয়ত করেছেন।[96]


ঘরে নফল সালাত আদায় করা

এ ঘরে তো ঈমানেরই আবাদ। ইবাদাত ও যিকিরে ভরপুর। আর আমাদের ঘরও যেন সেরকম হয় সে জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অসিয়ত করেছেন। তিনি বলেন:

«اجعلوا في بيوتكم من صلاتكم ولا تتخذوها قبورًا».

তোমাদের ঘরেও তোমরা কিছু সালাত আদায় করো, ঘরকে সালাত না পড়ে কবরে পরিণত করো না।[97]

ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত সুন্নত সালাতগুলি এবং ঐ নফল সালাত যা নির্ধারিত কারণে [যেমন, জানাযা, চন্দ্র গ্রহণ ইত্যাদি] পড়া হয় তা ঘরেই পড়তেন বিশেষ করে মাগরিবের সুন্নাত। তিনি মাগরিবের সুন্নাত মসজিদে পড়েছেন এমন কোন প্রমাণ নেই। ঘরে সুন্নাত ও নফল সালাত আদায় করার অনেক উপকার রয়েছে, তন্মধ্যে:

-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুকরণ।

-মহিলা ও শিশুদেরকে নামাযের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া।

-নামাযে কেরাত ও যিকির করার মাধ্যমে শয়তানকে ঘর থেকে বিতাড়িত করা।

- সালাত মসজিদে আদায় করার তুলনায় অধিক ইখলাস পূর্ণ হওয়া।

- লোক দেখানো তথা রিয়া বা ছোট শিরক থেকে বাঁচা।


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কান্না

অনেক পুরুষ ও নারী ক্রন্দন করে থাকে! কিন্তু কিভাবে কাঁদতে হয় ও কার জন্য কাঁদতে হয়?! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইলে তো এ ধরার সব কিছু তার হাতের মুঠোয় হতো, তবু তিনি কাঁদতেন, জান্নাত তো তাঁর সামনেই এবং সেথায় তাঁর জন্য সর্বোচ্চ স্থান! হাঁ, ভাই এরপরেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদতেন। কিন্তু সে কান্না ছিল একজন আবেদের কান্না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে তাঁর প্রভুর সাথে কথোপকথনের সময় ও কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণের সময় কাঁদতেন! তাঁর কান্নার কারণ কি ছিল? তা তো ছিল শুধু তাঁর নরম হৃদয় ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য এবং আল্লাহর মহত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও তাঁর প্রতি ভীতি থাকার করণে আল্লাহর শান ও তাঁর ভয়েই কাঁদতেন।

আবু আব্দুল্লাহ মুতরাফ বিন আশ শিখখীর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

«أتيت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وهو يصلي ولجوفه أزيز كأزيز المرجل من البكاء».

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলাম, সে সময় তিনি নামাযে রত ছিলেন, পাতিলে পানি গরম করলে যে শব্দ হয় তাঁর ভিতর থেকে সেরকম কান্নার আওয়াজ আসছিল।[98]

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«قال لي رسول الله - صلى الله عليه وسلم -: «اقرأ علي» فقلت: يا رسول الله أقرأ عليك وعليك أنزل؟ قال: «إني أحب أن أسمعه من غيري» فقرأت سورة النساء حتى بلغت { وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } قال: «فرأيت عيني رسول الله تهملان».

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন: তুমি আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আর আমি আপনাকে তা পড়ে শোনাব? তিনি বলেন: আমি অন্যের মুখে শুনতে পছন্দ করি। আমি সূরা নিসা পাঠ করতে করতে যখন “وجئنا بك على هؤلاء شهيدا" “আর আমি তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী স্বরূপ উপস্থিত করব।[সূরা নিসা: ৪১]" আয়াতে পৌঁছলাম, তখন দেখি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই নয়ন বয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।[99]

বরং আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথার মধ্য ভাগের কতিপয় পেকে যাওয়া চুল এবং তার দাড়ির দিকে লক্ষ করলে দেখবেন যে, প্রায় ১৮টি দাড়ি পেকে সাদা হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ সমস্ত চুল সাদা হওয়ার কারণ তাঁর পবিত্র মুখ থেকে শুনার জন্য হৃদয়টি নিবন্ধ করুন: আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা বললেন:

يا رسول الله قد شبت! قال - صلى الله عليه وسلم -: «شيبتني هود والواقعة والمرسلات، وعم يتساءلون، وإذا الشمس كورت.

হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন! তিনি বলেন: সূরা হুদ, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা ও সূরা কুব্বিরাতের ভয়াবহতায় আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে।[100]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয়- নম্রতা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র ও সুউচ্চ সম্মানের অধিকারী ছিলেন, কুরআনের শিক্ষাই ছিল তাঁর আদর্শ, যেমন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: «كان خلقه القرآن» তাঁর আদর্শ ছিল কুরআন।[101]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

«إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق».

উত্তম আদর্শের পূর্ণতা দান করার জন্যই আমাকে রাসূল করে পাঠানো হয়েছে।[102]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা পছন্দ করেতন না, যা তাঁর বিনয়ী হওয়ারই প্রমাণ।

ওমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

«لا تطروني كما أطرت النصارى عيسى ابن مريم، إنما أنا عبد، فقولوا: عبد الله ورسوله».

তোমরা আমার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করো না, যেমন মরিয়মের পুত্রর খৃষ্টানরা মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করেছে। আমি তো আল্লাহর একজন বান্দা মাত্র, তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূলই বলবে।[103]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: কতিপয় লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে বলল:

أن ناسًا قالوا: يا رسول الله يا خيرنا وابن خيرنا، وسيدنا وابن سيدنا، فقال: «يا أيها الناس، قولوا بقولكم، ولا يستهوينكم الشيطان، أنا محمد عبد الله ورسوله، ما أحب أن ترفعوني فوق منزلتي التي أنزلني الله عز وجل».

হে আমাদের মাঝের উত্তম ব্যক্তি ও উত্তম ব্যক্তির পুত্র, আমাদের সর্দার ও সর্দারের পুত্র। এ কথাগুলি শুনে তিনি বললেন: ওহে লোক সকল! তোমরা তোমাদের কথা বল, কিন্তু শয়তান যেন তোমাদের উপর বিজয়ী হতে না পারে। আমি তো আল্লাহর বান্দা মুহাম্মাদ ও তাঁর রাসূল। আল্লাহ তা'আলা আমাকে যে সম্মান দান করেছেন সে সম্মান থেকে বাড়িয়ে কেউ আমাকে বেশী সম্মান করবে তা আমি কখনো পছন্দ করি না।[104]

আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন প্রশংসা করে থাকে যা তাঁর ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় এমন কি অনেকে এমন ধারণা করে যে তিনি গায়েব বা অদৃশ্যের সংবাদ জানতেন এবং তার হাতে রয়েছে উপকার ও অপকারের চাবি-কাঠি এবং অভাব অনটন, ও সবার প্রয়োজন মিটানো ও রোগ মুক্তিও তাঁর হাতেই। তাদের সেই আক্বিদা বা বিশ্বাসকে অলীক ঘোষণা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِي نَفۡعٗا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَكۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِيَ ٱلسُّوٓءُۚ ١٨٨ ﴾ [الاعراف: ١٨٧]

অর্থাৎ বলুন! আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের উপকার-অপকারের উপরও অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তবে তো আমি অধিকাংশ কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না।[105]

এই সেই নবী যিনি এ ধুলির ধরায় আশ্রিত সবুজ-শ্যামলের ছায়া প্রাপ্ত সমস্ত সত্ত্বার শ্রেষ্ঠতম। সর্বদায় তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালনে সচেষ্ট ও সদা স্বীয় রবের প্রতি প্রত্যাবর্তিত। যিনি কখনো অহঙ্কারকে আশ্রয় দেননি বরং তিনি ছিলেন বিনয়ীর মূর্ত প্রতীক এবং আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণকারীদের অগ্রনায়ক।

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«لم يكن شخص أحب إليهم من رسول الله - صلى الله عليه وسلم - قال: وكانوا إذا رأوه لم يقوموا لما يعلمون من كراهته لذلك».

সাহাবাদের নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে কোন ব্যক্তি অধিক ভালবাসার পাত্র ছিল না। তিনি আরো বলেন: সাহাবারা বসে থাকা অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলে তার সম্মানার্থে উঠে কখনো দাঁড়াত না। কেননা তারা জানতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পছন্দ করতেন না।[106]

মুসলিম উম্মার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্চার্যজনক নম্রতা এবং অতুলনীয় উত্তম চরিত্রের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন। তিনি কিভাবে এক অসহায় রমণীর প্রতি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করেন ও শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তার জন্য তাঁর মূল্যবান সময় প্রদান করেন।

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

إن امرأة جاءت إلى النبي - صلى الله عليه وسلم - فقالت له: إن لي إليك حاجة، فقال: «اجلسي في أي طريق المدينة شئت أجلس إليك».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জনৈক মহিলা এসে বলল, আপনার নিকট আমার কিছু আবেদন রয়েছে। একথা শুনে তিনি বললেন: তুমি মদীনার যে কোন রাস্তায় বসতে চাও আমি তোমার আবেদন শুনার জন্য সেই রাস্তায় বসতে রাজি।[107]

আরবী কবি সত্যই বলেছেন:

يروحُ بأرواح المحامِدِ حُسنها فيرقي بها في ساميات المفاخرِ

وإن فُضَّ في الأكوانِ مسك ختامها تَعطَّر منها كلُّ نجدٍ وغائرِ

প্রশংসাময় ব্যক্তিত্বের সাথে তার সৌন্দর্য বিকশিত হয়।

সুতরাং, তিনি তারই দ্বারা গর্বের উচ্চ শিখরে সমাসীন।

যখন তাঁর পরিসমাপ্তির মিসক ছড়িয়ে যায়, যার ফলে আরব অনারব সবই সুগন্ধময় হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়ীদের শিরোমনি ও মূর্ত প্রতীক। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

«لو دعيت إلى ذراع أو كراع لأجبت، ولو أهدي إلي ذراع أو كراع لقبلت».

যদি ছাগলের একটি খুর খাওয়ার জন্যও আমন্ত্রিত হই, তা আমি সাদরে গ্রহণ করব, আর আমাকে ছাগলের খুর উপহার দেয়া হলেও আমি তা সাদরে গ্রহণ করব।[108]

সর্ব কালের অহঙ্কারীদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী এক প্রতিবন্ধক হয়ে থাকবে এবং তাদের অহংকার ও বড়ত্বের জন্য থাকবে দাঁত ভাঙ্গা জবাব।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:

«لا يدخل الجنة من كان في قلبه مثقال ذرة من كبر».

যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।[109]

অহঙ্কার হল জাহান্নামের পথ -আল্লাহ তা'আলা এত্থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন- যদিও তা অণু পরিমাণ হয়!

প্রিয় পাঠক! অহঙ্কার করে বিচরণকারীর কি ভয়াবহ পরিণতি হয়েছিল! এবং তার প্রতি আল্লাহ তা'আলা রাগান্বিত হয়ে কেমন যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি দিয়েছিলেন! একটু ভেবে দেখুন!

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:

«بينما رجل يمشي في حلة تعجبه نفسه، مرجل رأسه يختال في مشيته، إذ خسف الله به، فهو يتجلجل في الأرض إلى يوم القيامة».

এক ব্যক্তি দামী পোষাক পরে আত্মঅহমিকতা নিয়ে ও মাথা আঁচড়িয়ে ফ্যাশন করে চলছিল, এ অবস্থায় আল্লাহ তাকে জমিনের ভিতর দাবিয়ে দিলেন। সে কিয়ামত পর্যন্ত নিচের দিকে দাবতেই থাকবে।[110]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম

অসহায় দুর্বল এ খাদেমকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপযুক্ত স্থানে মূল্যায়ন করেন, তাকে তার দ্বীনদারী ও পরহেযগারীর ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করেন, তার কর্ম ও দুর্বলতার ভিত্তিতে নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদেম ও মজুরদের ব্যাপারে বলেন:

«هم إخوانكم، جعلهم الله تحت أيديكم، فأطعموهم مما تأكلون، وألبسوهم مما تلبسون، ولا تكلفوهم ما يغلبهم فإن كلفتموهم فأعينوهم».

তারা তোমাদের ভাই, আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের কর্তৃত্বাধীন করে দিয়েছেন, তোমরা যা খাবে তা তাদেরকেও খাওয়াবে, তোমরা যা পরিধান করবে তা তাদেরকেও পরিধান করাবে, তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ দিবে না, আর যদি অনুরূপ দায়িত্ব দাও, তাতে তোমরাও সহযোগিতা করবে।[111]

প্রিয় পাঠক! দেখুন, এক খাদেম তার মুনিব সম্পর্কে আশ্চর্য জবান বন্দী দিচ্ছেন, এক গ্রহণ যোগ্য সাক্ষ্য প্রদান ও হৃদয় গ্রাহী প্রশংসা করছেন!!

আপনি কি কখনো কোন খাদেমকে তার মুনিবের ব্যাপারে এমন প্রশংসা করতে দেখেছেন? যেমন প্রশংসা করেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম তাঁর ব্যাপারে?

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«خدمت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - عشر سنين فما قال لي أف قط، وما قال لي لشيء صنعته [لم صنعته؟] ولا لشيء تركته لم تركته؟».

আমি দশ বছর যাবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করেছি, আমার কাজ কর্মে [বিরক্ত হয়ে ধমকের সূরে] তিনি কোন দিন উফ শব্দটি বলেননি, আর আমি কোন কাজ করলে তিনি কখনো বলেননি যে, তুমি এ কাজ কেন করেছ? আর কোন কাজ না করলে তিনি কখনো বলেননি যে, তুমি এ কাজ কেন করোনি।[112]

পুরা দশটি বছর.. কয়েক দিন বা কয়েক মাস নয়, অনেক সময় যেখানে দুঃখ বেদনা, সুখ-শান্তি, চিন্তা, রাগ, মানসিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা থেকে শুরু করে অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে তার মাঝে। যাতে সাচ্ছন্দ ও অসচ্ছলতার অনেক দিনই অতিবাহিত হয়েছে!! এত ঘটনা প্রবাহের মাঝেও তিনি তাকে কোন দিন ধমক দিয়ে কথা বললেন না, কোন প্রকার নির্দেশও তিনি দিলেন না তাকে। বরং তার স্বীয় ব্যক্তিত্বের উপর ছেড়ে দিয়েছেন তার সমগ্র কাজ কর্ম, বরং তাকে তার প্রতিদান দিতেন ও তার মনোভাবকে খুশী রাখতেন, তার ও তার পরিবারের প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন।!!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমার মা বলেন: হে আল্লাহ রাসূল! আপনার খাদেমের জন্য দোয়া করুন তিনি বলেন: «اللهم أكثر ماله وولده، وبارك له فيما أعطيته».

হে আল্লাহ তা'আলা আপনি তাকে প্রচুর সম্পদ ও অনেক সন্তানাদি দান করুন এবং তাকে যা দিয়েছেন তাতে প্রাচুর্যতা দান করুন।[113]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বড় সাহসী বাহাদুর হওয়ার পরেও তিনি কোন দিন কাউকে অপমান করেননি ইসলামের হক ব্যতীত কাউকে মারেননি এবং তার কর্তৃত্বাধীন স্ত্রী বা চাকর কোন অপরাধ করলেও তার প্রতিশোধ নেননি!!

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بيده شيئًا قط إلا أن يجاهد في سبيل الله ولا ضرب خادمًا ولا امرأة».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত তাঁর হাত দিয়ে কাউকে মারেননি এমনকি তার স্ত্রী ও খাদেমকেও না।[114]

এই তো মুমিন জননী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সৃষ্টির সর্বোত্তম ও সমস্ত মানুষের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির ব্যাপারে পূনরায় সাক্ষ্য প্রদান করছেন, এমনকি তাঁর পবিত্র আদর্শ, সূনাম ও সূখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দিক-দিগন্তর, এমনকি কুরাইশ বংশের কাফেররা পর্যন্ত তার সাক্ষ্য দিয়েছে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما رأيت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - منتصرًا من مظلمة ظلمها قط ما لم ينتهك من محارم الله تعالى شيء، فإذا انتهك من محارم الله تعالى شيء، كان من أشدهم في ذلك غضبًا، وما خير بين أمرين إلا اختار أيسرهما ما لم يكن مأثمًا».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনের ক্ষেত্র ব্যতীত নিজের প্রতি কোন জুলুম-অবিচারের প্রতিশোধ নিতে দেখিনি। কেউ আল্লাহর বিধানের অবমাননা করে থাকলে তিনি সে ক্ষেত্রে তাদের সবার চেয়ে বেশী রাগান্বিত হতেন। আর তাকে কোন দুটি বস্তুর একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেয়া হলে গোনাহের কাজ না হলে তিনি সহজটা গ্রহণ করতেন।[115]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহনশীলতা ও দয়ার প্রতি আহ্বান করতেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন:

«إن الله رفيق يحب الرفق في الأمر كله».

আল্লাহ তা'আলা সহনশীল এবং প্রত্যেক ব্যাপারে সহনশীলতাকে ভালবাসেন।[116]


হাদিয়া বিনিময় ও মেহমানদারী

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরের গভীরে স্বাভাবিক ও আবেগময় চাহিদা ও প্রয়োজনিয়তা মজ্জাগত ভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রতি নিয়তই তা সামাজিক, পারিবারিক ও ঘর কেন্দ্রিক প্রকাশ পেয়ে থাকে, সমস্ত জিনিসের মধ্য থেকে যে জিনিসটি অন্তরের নিকটতম করে দেয় ও হৃদয়কে জয় করে নেয় তা হল: হাদিয়া বা উপহার-উপঢৌকন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«أن النبي - صلى الله عليه وسلم - كان يقبل الهدية ويثيب عليها»

নিশ্চয়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপহার গ্রহণ করতেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন।[117]

আর এ উপহার প্রদান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হল: অন্তরাত্মার উদারতা, বদান্যতা ও পরিশুদ্ধিতার বহি:প্রকাশ। উদারতা ও মহানুভবতার চরিত্র হল নবীদের চরিত্র এবং রাসূলদের নীতি।

এ ক্ষেত্রে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অগ্রনায়ক। কেননা তিনিই তো বলেছেন:

«من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه جائزته يوم وليلة، والضيافة ثلاثة أيام فما بعد ذلك فهو صدقة ولا يحل له أن يثوي عنده حتى يحرجه؟».

যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা ও আখেরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন মেহমানদের সমাদর করে। তিন দিন মেহমানদারী, এর মাঝে এক দিন ও এক রাত্রি মেহমানদারী করা মেহমানের প্রাপ্য, এরপর খাওয়ানো সাদকা। মেজবান অতিষ্ট হওয়া অবধি মেহমানের অবস্থান করা বৈধ না।[118]

অতীতের কোন কাল, পৃথিবীর কোন ভূমি এমনকি আরবের হেজাজ বা আরব উপদ্বীপের কোন অঞ্চল বরং বিশ্ব জগত এমন অনুপম আদর্শ ও মহান চরিত্রের অধিকারী কাউকে দেখেনি। আপনার দুই নয়ন সেই দৃশ্যগুলি হতে কয়েকটি দৃশ্য দেখবে।

সাহাল বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

أن امرأة جاءت إلى رسول الله ببردة منسوجة فقالت: نسجتها بيدي لأكسوكها، فأخذها النبي - صلى الله عليه وسلم - محتاجًا إليها، فخرج إلينا وإنها لإزاره فقال فلان: اكسنيها ما أحسنها فقال: «نعم» فجلس النبي - صلى الله عليه وسلم - في المجلس، ثم رجع فطواها، ثم أرسل بها إليه فقال له القوم: ما أحسنت، لبسها النبي - صلى الله عليه وسلم - محتاجًا إليها، ثم سألته، وعلمت أنه لا يرد سائلاً، فقال: إني والله ما سألته لألبسها، إنما سألته لتكون كفني قال سهل: فكانت كفنه».

জনৈক মহিলা হাতে বুনানো সুন্দর একটি চাদর নিয়ে রাসূলের দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল: আমি এ চাদরটি নিজ হাতে বুনে আপনাকে পরানোর জন্য নিয়ে এসেছি। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা প্রয়োজনীয় মনে করে গ্রহণ করলেন। এরপর তিনি সেটিকে লুঙ্গির মত পরিধান করে আমাদের মাঝে বের হলেন। ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি বলল: কতই না সুন্দর এটি! এটি আমাকে দিবেন কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ দিব। তিনি আমাদের বৈঠকে কিছুক্ষণ বসার পর উঠে গিয়ে চাদরটি ভাঁজ করে তার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। লোকেরা তাকে বলতে লাগল, তুমি সুন্দর কাজই করেছ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন বশত সেটি পরিধান করেছিলেন তা সত্বেও তুমি তা চেয়েছ। আর তুমি জান যে, তিনি কোন আবেদনকারীকে নিরাশ করেন না। অত:পর সে বলল: আমি এটিকে পরিধান করার জন্য তার কাছে চাইনি, বরং আমি এটিকে কাফন বানানোর জন্য চেয়েছি। সাহাল বলেন: সেটি তার কাফনের কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে।[119]

যাকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা চয়ন করে তাঁর চোখের সামনে প্রতিপালন করেন এবং যাকে আদর্শ বানিয়েছেন তার অনুপম চরিত্র দেখে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দানশীলতায় ও বদান্যতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

হাকীম বিন হিযাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

سألت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فأعطاني ثم سألته فأعطاني، ثم سألته فأعطاني، ثم قال: «يا حكيم، إن هذا المال خضر حلو، فمن أخذه بسخاوة نفس بورك له فيه، ومن أخذه بإشراف نفس لم يبارك له فيه، وكان كالذي يأكل ولا يشبع واليد العليا خير من اليد السفلى».

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবেদন করায় তিনি আমাকে দিলেন, আমি আবার আবেদন জানালাম, তিনি পুনরায় আমাকে দিলেন, আবার আবেদন করায় তিনি আমাকে আবেদনানুযায়ী দিয়ে বললেন: হে হাকীম! এই যে সম্পদগুলি এগুলি সবুজ ও মিষ্টি, যে ব্যক্তি একে তৃপ্ত চিত্তে গ্রহণ করবে তাতে বরকত হবে, আর যে ব্যক্তি তা অতৃপ্ত চিত্তে গ্রহণ করবে তাতে বরকত হবে না। এর উদাহরণ ঐ ব্যক্তির মত যে খায় ঠিকই কিন্তু পরিতৃপ্ত হয় না। আর জেনে রেখো! উপরের হাত অর্থাৎ দানকারী, নিচের হাত অর্থাৎ দান গ্রহণকারী চেয়ে উত্তম।[120]

আরবী কবি ঠিকই বলেছেন:

وله كمالُ الدين أعلى همّة يعلو ويسمو أن يقاس بثاني

لمّا أضاء على البرية زانها وعلا بها فإذا هو الثقلان

فوجدت كل الصيد في جوف الفَرا

ولقيت كلَّ الناس في إنسان

তিনি ইসলামের পরিপূর্ণতায় উচ্চাভিলাষী, তিনি তো জগতে অদ্বিতীয় অতুলনীয় উচ্চাসীন। যেহেতু তাঁর সৌন্দর্য সারা সৃষ্টির উপর আলোকময়। যার মাধ্যমে তিনি জ্বিন ও ইনসানের শীর্ষে আসীন, সবাই তো নির্বুদ্ধিতা ও বর্বরতায় নিমজ্জিত ছিল, তারপর তো মানুষ মানুষে পরিণত হল।

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

ما سئل النبي - صلى الله عليه وسلم - عن شيء قط فقال، لا. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর নিকট কোন কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো তা না করতেন না।[121]

যতই দানশীলতা, বদান্যতা ও উত্তম চরিত্র হোক না কেন, তার বদান্যতা, দানশীলতা, উদারতা, উত্তম আচরণ ও প্রকৃত আন্তরিকতার কোন নজীর নেই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাসই ছিল যে তিনি সবার সাথেই হাস্যোজ্জল মুখে কথা বলতেন এমনকি তাঁর সকল সাহাবীই এ ধারনাই পোষণ করত যে, তাঁর নিকট সেই বেশী প্রিয় ব্যক্তি।

জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«ما حجبني رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ولا رآني منذ أسلمت إلا تبسم».

আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই আমার নিকট হতে আড়াল হতেন এবং যখনই আমাকে দেখতেন তখনই তিনি মুচকি হাসি দিতেন।[122]

এক ব্যক্তির সাক্ষ্য তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়াটাই আপনার জন্য যথেষ্ট ও উপদেশ মূলক হবে।

আব্দুল্লাহ বিন আলহারেস বলেন:

مارأيت أحدًا أكثر تبسمًا من رسول الله - صلى الله عليه وسلم -».

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মত হাস্যোজ্জল মুখ আর কারো দেখিনি।[123]

প্রিয় পাঠক! আপনি কি তাঁর মুখের হাসির বর্ণনা শুনে আশ্চর্য হচ্ছেন? আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তিনিই তো বলেছেন: «وتبسمك في وجه أخيك صدقة». “হাস্যোজ্জল মুখে তোমার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করাটাও সাদকাহ সমতূল্য"[124]

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর খাদেম আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর এমন গুণ বর্ণনা করেছেন যা স্বল্প লোকের মাঝেই বর্তমান রয়েছে, বা তাঁর কতিপয় গুণ অল্প সংখ্যক মানুষের মাঝেই কিছু রয়েছে। তিনি বলেন,

أشد الناس لطفًا فما سأله سائل قط إلا أصغى إليه فلا ينصرف رسول الله - صلى الله عليه وسلم - حتى يكون السائل هو الذي ينصرف وما تناول أحد يده قط إلا ناوله إياها فلا ينزع - صلى الله عليه وسلم - يده حتى يكون الرجل هو الذي ينزعها منها».

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা বিনয়ী ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে কেউ আবেদন করলে তিনি তার দিকে এমন মগ্ন হতেন, যতক্ষণ আবেদনকারী নিজেই না ফিরতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য মগ্ন থাকতেন, এবং কেউ তাঁর হাত ধারণ করলে, তিনি নিজে স্বীয় হাতকে, টেনে নিতেন না, যতক্ষণ না সে লোক স্বীয় হাত টেনে না নিয়েছে"[125]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত অতিথি পরায়ণ ও তার সাথে এত কোমল ব্যাবহার করতেন এমনকি তিনি তাঁর উম্মতের জন্যই ছিলেন অতীব দয়াশীল। এজন্যই তো তিনি কারো নিকট থেকে শরীয়াহ বিরোধী কোন কিছু প্রকাশ পাওয়া পছন্দ করতেন না।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুামা হতে বর্ণিত,

أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - رأى خاتمًا من ذهب في يد رجل فنزعه فطرحه، وقال: «يعمد أحدكم إلى جمرة من نار فيجعلها في يده».

তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তির হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি স্বর্ণের আংটি দেখে তা খুলে ফেলে দিয়ে বললেন: তোমাদের মাঝে কেউ কি এটা চায় যে তার হাতে আগুনের জ্বলন্ত আঙ্গার থাক?।[126]


শিশুদের প্রতি দয়া

কঠোর হৃদয়ের লোক দয়া কি জিনিস তা জানে না, আর তাদের অন্তরে দয়ার কোন ঠাঁই নাই! তারা যেন কঠিন পাথরের ন্যায়। আদান প্রদানের ব্যাপারে তারা রুক্ষ এবং হৃদয়ের অনুভুতি ও মানবীয় প্রেমেও তারা কৃপণ! কিন্তু আল্লাহ তা'আলা যাকে কোমল হৃদয় ও মায়া-ভালবাসায় উপচে পড়া দয়া দান করেছেন সেই আদর্শ ও দয়াময় হৃদয়ের অধিকারী। তাদের হৃদয় দয়া বেষ্টিত ও সাড়া জাগানো অনুভূতিময়!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«أن النبي - صلى الله عليه وسلم - أخذ ولده إبراهيم فقبله وشمه».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছেলে ইব্রাহীমকে কোলে নিয়ে চুমা দিলেন ও [আরবের রীতি অনুসারে] ঘ্রাণ নিলেন।[127]

তাঁর এ দয়া ও ভালবাসা শুধু আপন সন্তানের প্রতিই ছিল না বরং তা সকল মুসলিম সন্তানের জন্য উন্মুক্ত ছিল। জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর স্ত্রী আসমা বিনতে ওমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

دخل علي رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فدعا بني جعفر فرأيته شمهم، وذرفت عيناه، فقلت: يا رسول الله، أبلغك عن جعفر شيء؟ قال: «نعم، قتل اليوم» فقمنا نبكي ورجع فقال: «اصنعوا لآل جعفر طعامًا فإنه قد جاء ما يشغلهم».

একদা আমার বাড়ীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করে জাফরের সন্তানদেরকে ডাকলেন। আমি দেখলাম তিনি তাদেরকে চুমা দিয়ে ঘ্রাণ নিলেন, আর তাঁর দু নয়ন ঝরে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। অত:পর আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! জাফর সম্পর্কে আপনার নিকট কি কোন প্রকার সংবাদ এসেছে? তিনি উত্তরে বললেন: হাঁ, তিনি তো আজ নিহত হয়েছেন। তারপর আমরাও কাঁদতে লাগলাম। তিনি চলে গিয়ে বললেন: তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা পাকাও কেননা তারা শোকার্ত।[128]

তাদের মৃত্যুতে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদছিলেন ও তার দু নয়ন দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন সাআদ বিন উবাদাহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহ রাসূল! আপনি কাঁদছেন? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: «هذه رحمة جعلها الله في قلوب عباده، وإنما يرحم الله من عباده الرحماء». “এ তো দয়া যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের হৃদয়ে দান করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর দয়াশীল বান্দাদেরকেই দয়া করে থাকেন"[129]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছেলে ইব্রাহীমের মৃত্যুতে যখন তাঁর দু নয়ন দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল, এ দেখে আব্দুর রহমান বিন আউফ বলে উঠল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কাঁদছেন?

অত:পর তিনি বললেন:

«يا ابن عوف، إنها رحمة ثم أتبعها بأخرى» وقال: إن العين تدمع والقلب يحزن، ولا نقول إلا ما يرضي ربنا، وإنا لفراقك يا إبراهيم لمحزنون».

ওহে ইবনে আউফ! এ তো দয়া, অত:পর তিনি আবার অশ্রু ঝরালেন। তারপর তিনি বললেন: নিশ্চয়ই চোখের অশ্রু প্রবাহিত হবে, হৃদয় চিন্তিত হবে, আর আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট আমরা তাই বলব। তারপর বললেন: ওহে ইব্রাহীম! তোমার মৃত্যুতে আমরা সবাই চিন্তিত।[130]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শে আদর্শবান হওয়া ও সার্বিক জীবনে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা আমাদের একান্ত করণীয়। আমরা এমন যুগে উপনীত হয়েছি যখন ছোটদের স্নেহ করা ও তাদেরকে উপযুক্ত মূল্যায়ন করা একেবারে হয় না। তারাই তো হল আগামী দিনের জনক এবং জাতির কর্ণধার এবং ভবিষ্যতের ঊষার আলো!

মূর্খতা ও অহংকার, স্বল্প বিবেক ও আমাদের সীমিত দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে আমরা শিশুদের জন্য হৃদয়ের প্রশস্ততাকে তালাবদ্ধ করে উদারতাকে হারিয়ে ফেলেছি! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাতে ও মুখেই রেখেছিলেন সেই হৃদয়ের চাবি। ইনি সেই রাসূল যিনি শিশুদের অনেক ভালবাসতেন এবং তাদেরকে স্নেহ ও কদর করতেন এবং তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করতেন।

كان أنس رضي الله عنه إذا مر على صبيان سلم عليهم وقال: «كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يفعله».

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু শিশু-কিশোরদের পার্শ দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার সময় সালাম দিতেন এবং বলতেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপই করতেন।[131]

শিশুদের শিক্ষা দেওয়া বা তাদের লালন-পালন চঞ্চল ও দুষ্টামী করাতে যেমন রয়েছে কষ্ট তেমনি রয়েছে ক্লান্তি... এরপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উপর রাগ করতেন না ও তাদেরকে ধমকি বা গালিও দিতেন না। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে কোমল ব্যবহার ও দয়া সূলভ আচরণ করতেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يؤتى بالصبيان فيدعو لهم فأتي بصبي فبال على ثوبه فدعا بماء فأتبعه إياه ولم يغسله».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আসা হতো, তিনি তাদের জন্য দোয়া করে দিতেন। একবার তার কাছে এক ছেলে বাচ্চা আনা হলে, [তিনি সে বাচ্চাকে কোলে নেওয়ায়] সে তাঁর কাপড়ে পেশাব করে দিল, তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন, কাপড় ধৌত না করে সে পানি পেশাবের জায়গায় ব্যবহার করলেন।[132]

প্রিয় পাঠক! আপনি নবীর ঘরে শুভাগমন করেও কি আপনার আগ্রহ সৃষ্টি হবে না যে, আপনি আপনার ছোটদের সাথে খেল-তামাশায় লিপ্ত হবেন, আপনার ছেলেদের সাথে রসিকতা করবেন? তাদের ফেটে পড়া হাসি ও চমৎকার চমৎকার ভাষা শুনবেন!? অথচ মুসলিম জাতির নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে এমনটি করতেন।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - ليدلع لسانه للحسن بن علي، فيرى الصبي حمرة لسانه، فيهش له».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান বিন আলীর জন্য স্বীয় জিহ্বাকে বের করে দিতেন, অত:পর ছোট ছেলে জিহ্বার লালিমা দেখে আনন্দ ভোগ করত।[133]

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يلاعب زينب بنت أم سلمة، وهو يقول: يا زوينب، يا زوينب، مرارًا».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সালামার ছোট কন্যা যায়নাবকে নিয়ে খেলা করতেন আর বার বার বলতেন: হে যুয়াইনাব, ওহে যূয়াইনাব!। [আহাদীসুস সহীহাহ ২৪১৪, সহীহুল জামে ৫০২৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাচ্চাদের প্রতি স্নেহ দীর্ঘায়িত হয়ে মহা ইবাদাতেও পৌঁছে যায়। তাঁর মেয়ে যায়নাবের কন্যা উমামাকে -আবি আলআস বিন আররবী' এর কন্যাকে বহন করা অবস্থায় সালাত পড়তেন, যখন তিনি দাঁড়াতেন তাকে বহন করতেন, আর সিজদার সময় নামিয়ে রেখে সিজদা করতেন। [বুখারী ও মুসলিম]

মাহমূদ বিন আররবী' রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«عقلت من رسول الله - صلى الله عليه وسلم - مجة مجها في وجهي من دلو، من بئر كانت في دارنا، وأنا ابن خمس سنين».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীর কুয়ার পানির বালতি থেকে মুখে নিয়ে, কুলি করে আমার মুখে পানি ছিটা দেয়ার ঘটনা এখনও মনে পড়ে, সে সময় আমার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।[134]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বড়দের শিক্ষা দিতেন, তেমনি ছোটদেরকেও শিক্ষা দিতেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন:

« يا غلام، إني أعلمك كلمات:احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، إذا سألت فاسأل الله وإذا استعنت فاستعن بالله».

একদা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে ছিলাম, অত:পর তিনি আমাকে ডেকে বললেন: হে বৎস! আমি তোমাকে কিছু উপদেশ দিব। আর তা হল: তুমি আল্লাহর অধিকার -ইবাদাত- রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাদের রক্ষা করবেন। তুমি যদি আল্লাহর অধিকারকে রক্ষা করো তবে বিপদে তাঁকে তোমার [সাহায্যকারী রূপে] সামনে পাবে। আর যখন তুমি কিছু চাইবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই করবে।[135]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র আদর্শ ও মহান সীরাত সম্পর্কে জানলাম, আমরা এগুলি দ্বারা আমাদের অন্তরকে উজ্জিবীত করে পরবর্তীদের জীবন চলার জন্য সে আদর্শ রেখে যাব। যার ফলে আমাদের ঘরগুলি শিশু ও কচি-কাচা দ্বারা প্রষ্ফুটিত হবে যাদের জন্য প্রয়োজন রয়েছে পিতার স্নেহ ও মাতার আদর এবং কচি হৃদয়কে আনন্দিত করা। যার ফলে এ ছোটরাই স্নেহ-আদর ও উত্তম চরিত্র নিয়ে জাতির নেতৃত্ব দেয়ার মহান ব্যক্তিতে পরিণত হবে। আল্লাহর তাওফীকে তারাই উত্তম জননী ও আদর্শ পিতা হিসেবে গড়ে উঠবে।


সহশীলতা, নম্রতা ও ধৈর্যশীলতা

কঠোরতা ও জোর-জবরদস্তি করে অধিকার আদায়, জালেম ও অত্যাচারীর চরিত্র। কিন্তু আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হকদারের ন্যায় সংগত হক আদায় ও তার সহায়তার নিমিত্তে ন্যায়ের মানদন্ড নির্ধারণ করেছেন। যেন তারা তাদের হক বুঝে পায় ও তা গ্রহণ করে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ন্যায় ও সত্যের পথে আদেশ ও নিষেধের যে আদর্শ দান করেছেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে কোন কঠোরতা, জবরদস্তি ও জুলুম-অত্যাচারের আশঙ্কা করি না। আশঙ্কা নেই সেখানে কোন সীমালঙ্ঘন ও লুটপাটের। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم -شيئًا قط بيده، ولا امرأة ولا خادمًا إلا أن يجاهد في سبيل الله، وما نيل منه شيء قط فينتقم من صاحبه إلا أن ينتهك شيء من محارم الله تعالى فينتقم لله تعالى».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জিহাদের ময়দান ব্যতীত তার হাত দিয়ে কাউকে মারেননি, এমনকি তার স্ত্রী ও খাদেমকেও না। তাঁকে কোন ব্যাপারে প্রতিশোধ নিতে দেখিনি, তবে কেউ আল্লাহর বিধানের অবমাননা করলে তিনি আল্লাহর হকের জন্যই প্রতিশোধ নিতেন।[136] আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

كنت أمشي مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - وعليه برد نجراني غليظ الحاشية، فأدركه أعرابي، فجبذه بردائه جبذة شديدة، فنظرت إلى صفحة عاتق النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد أثرت بها حاشية الرداء من شدة جبذته، ثم قال: «يا محمد، مر لي من مال الله الذي عندك فالتفت إليه، فضحك ثم أمر له بعطاء».

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে চলছিলাম, তাঁর গায়ে ছিল মোটা ঝালর যুক্ত নাজরানী চাদর। অত:পর এক বেদুইন তাকে ধরে সজোরে টানতে লাগল, আমি তাকিয়ে দেখি তার ঘাড়ে জোরে টানের চোটে চাদরের ঝালরের দাগ লেগে গেছে। তারপর বেদুইন বলে উঠল: হে মুহাম্মাদ! তোমার কাছে যে সম্পদ আছে, তা আমাকে দেয়ার আদেশ দাও। তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন ও তাকে দেয়ার আদেশ দিলেন।[137]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের যুদ্ধ শেষে ফিরছিলেন, এমতাবস্তায় কতিপয় বেদুইন তাঁর অনুসরণ করে তাঁর নিকট চাইতে থাকল। অত:পর তারা তাঁকে এক বৃক্ষের দিকে নিয়ে আসল, তারপর তিনি স্বীয় সওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায় তাঁর চাদর নিয়ে নেয়া হল। তিনি বলেন:

«ردوا علي ردائي، أتخشون علي البخل؟ فقال: فوالله لو كان لي عدد هذه العضاة نعمًا لقسمته بينكم، ثم لا تجدوني بخيلاً ولا جبانًا ولا كذابًا».

“আমাকে আমার চাদর ফিরিয়ে দাও, আমার উপর কি কৃপণতার ভয় কর? তিনি আবার বল্লেন: আল্লাহ শপথ! আমার নিকট যদি এ বৃক্ষসমূহ পরিমাণও পশু থাকত তবুও আমি তা তোমাদের মাঝে বিতরণ করে দিতাম। তারপর তোমরা আমাকে না কৃপণ পেতে, না কাপুরুষ, না মিথ্যাবাদী পেতে।[138]

কতই না সুন্দর তার আচরণ এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের চিত্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নমনিয়তা এবং উপকারী ও কল্যাণজনক বিষয়কে বুঝান ও অন্যায় অকল্যাণকে প্রতিকার করাই ছিল তাঁর কর্ম।

সাহাবারা যখন দেখল যে, মসজিদে পেশাবকারী ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, তারা রাগান্বিত হয়ে অতি তাড়াতাড়ি তাকে বারণ করার চেষ্টা করতে গেল, তাদের এ কাজ করার অধিকারও রয়েছে। কিন্তু দয়ার সাগর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বাধা দিলেন, কেননা বেদুইন ছিল অজ্ঞ ব্যক্তি, আর তা করলে তার ক্ষতি হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেছেন তা ছিল অনুপম উত্তম।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

بال أعرابي في المسجد فقام الناس إليه ليقعوا فيه، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «دعوه وأريقوا على بوله سجلاً من ماء، أو ذنوبًا من ماء، فإنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين».

এক বেদুইন মসজিদের ভিতর পেশাব করা আরম্ভ করলে, সাহাবীরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা তাকে বারণ করো না, ছেড়ে দাও এবং পেশাবের জায়গায় এক বালতি পানি ঢেলে দাও। নিশ্চয়ই তোমরা সহজতা আরোপকারী হিসাবেই প্রেরিত হয়েছ, কঠোর হয়ে প্রেরিত হওনি।[139]

দাওয়াতী কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে ধৈর্য, তার অনুসারী দাবীদারদের জন্য অপরিহার্য হল সে অনুযায়ী তার আদর্শ মত চলা এবং নিজিকে অধৈর্যের মুখে ঠেলে না দেয়া। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

هل أتى عليك يوم كان أشد من أحد؟ قال: «لقد لقيت من قومك، وكان أشد ما لقيت منهم يوم العقبة، إذ عرضت نفسي على ابن عبد ياليل بن عبد كلال، فلم يجبني إلى ما أردت، فانطلقت وأنا مهموم على وجهي، فلم أستفق إلا وأنا بقرن الثعالب، فرفعت رأسي، فإذا أنا بسحابة قد أظلتني فنظرت فإذا فيها جبريل عليه السلام فناداني فقال: إن الله تعالى قد سمع قول قومك لك، وما ردوا عليك وقد بعثت إليك ملك الجبال لتأمره بما شئت فيهم فناداني ملك الجبال فسلم علي ثم قال: يا محمد إن الله قد سمع قول قومك لك، وأنا ملك الجبال، وقد بعثني ربك إليك لتأمرني بأمرك، فما شئت؟ إن شئت أطبقت عليهم الأخشبين». فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «بل أرجو أن يخرج الله من أصلابهم من يعبد الله وحده لا يشرك شيئًا».

আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার উপর ওহুদ যুদ্ধের দিনের চেয়ে কঠিন কোন সময় কি অতিবাহিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেন: আমি তোমার সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যা পেয়েছি। আর তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা কঠিন ছিল, যা আমি তাদের পক্ষ থেকে 'আকাবার দিনে পেয়েছি। আমি যখন ইসলামের দাওয়াত দেওয়া জন্য নিজকে ইবনে আবদ য়ালীল বিন আবদে কিলালকে উপস্থাপন করেছিলাম, আমি যা চেয়েছিলাম সে ব্যাপারে তারা আমার ডাকে সাড়া দেয়নি। আমি সেখান থেকে বিষন্ন হৃদয়ে ফিরে এসেছিলাম। আমি কারনুস সায়ালেব [ছায়লুল কাবীর] এ আসার পর আমার পূর্ণ জ্ঞান ফিরেছিল। অত:পর আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, এক খণ্ড মেঘমালা আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি যে, সেখান থেকে জিবরীল [আলাইহিস সালাম] আমাকে ডেকে বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আপনার সম্প্রদায়ের কথা শুনেছেন ও তারা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন তাও অবগত হয়েছেন। অত:পর তিনি পাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্ত ফেরেস্তাকে প্রেরণ করেছেন, আপনি তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য তাকে যা ইচ্ছা নির্দেশ দিতে পারেন। এরপর পাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্ত ফেরেস্তা আমাকে সালাম দিয়ে বললেন: হে মুহাম্মাদ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আপনার সম্প্রদায় আপনার সাথে কিভাবে কথা বলেছে তা শুনেছেন। আর আমি পাহাড়ে নিযুক্ত ফেরেস্তা, আমাকে আমার প্রতিপালক আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন, আপনি যেন আমাকে যা ইচ্ছা নির্দেশ দেন। আপনি যদি চান, তবে মক্কা বেষ্টিত দুই বড় পাহাড়কে তাদের উপর সমন্বয় করে দেই। অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি চাই, আল্লাহ তা'আলা তাদের ঔরসে এমন সন্তান জন্ম দিবেন, যারা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই ইবাদাত করবে ও তার সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করবে না।[140]

বর্তমানে অনেকেই দাওয়াতী কাজে তাড়াহুড়া করে থাকে এবং অতি দ্রুত এ কাজের ফলাফল পেতে চায়। প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেয়া দাওয়াতী ক্ষেত্রে ও ইখলাসে একটি বড় দোষ। উক্ত দোষ দায়ীদের মাঝে বিস্তার হওয়ার কারণে অনেক দাওয়াতী কাজ নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কোথায় সে ধৈর্য ও কোথায় সে সহনশীলতা। অনেক বছর পর, অনেক কষ্ট সহ্য, অনেক ধৈর্য ধারণ এবং অনেক যুদ্ধ-জিহাদের পরই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা চেয়েছিলেন তা প্রতিফলিত হয়েছিল!!

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোন এক নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে দেখছি তিনি বলেন,

كأني أنظر إلى رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يحكي نبيًا من الأنبياء صلوات الله وسلامه عليه، ضربه قومه فأدموه وهو يمسح الدم عن وجهه ويقول: «اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون».

সে নবীর সম্প্রদায় তাঁকে মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছে, তিনি মুখমন্ডল থেকে রক্ত মুছা অবস্থায় বলছে: হে আল্লাহ! তুমি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও। কেননা তারা বুঝে না।[141]

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের সাথে কোন জানাজা নামাযে উপস্থিত ছিলেন, এমতাবস্থায় যায়েদ বিন সু'নাহ নামক জনৈক ইয়াহুদী তার প্রাপ্ত ঋণ চাওয়ার জন্য এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার কলার ও চাদর ধরে রাঙ্গা চোখে বলল: ওহে মুহাম্মাদ! তুমি আমার প্রাপ্ত ঋণ পরিশোধ করবে না? এবং সে অনেক শক্ত শক্ত কথা বলল। এ দৃশ্য দেখে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রেগে গেলেন ও যায়েদের দিকে তাকালেন এমতাবস্থায় তাঁর উভয় চুক্ষু যেন ঘুর্ণিয়মান তারকার মত স্বীয় কক্ষপথে ঘুরার মত ঘুরছে। অত:পর বললেন: ওহে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর সাথে এমন কথা বললে আমি যা শুনছি, আর এমন ব্যবহার করলে যা আমি দেখছি? যিনি তাঁকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার শপথ করে বলছি, আমি যদি তার তিরস্কারের ভয় না করতাম তবে আমার তলোয়ার দ্বারা এখনই তোমার মাথাকে আলাদা করে দিতাম। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্ত ভাবে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এর দিকে তাকাচ্ছিলেন, অত:পর বললেন:

«يا عمر، أنا وهو كنا أحوج إلى غير هذا، أن تأمرني بحسن الأداء، وتأمره بحسن التباعة، اذهب به يا عمر فأعطه حقه، وزده عشرين صاعًا من تمر». ওহে উমার! শুন, আমি ও সে ব্যক্তি তোমার নিকট থেকে এরকম আচরণ আশা করিনি। তোমার নিকট হতে এ আশা করি যে, তুমি আমাকে ঋণ পরিশোধ করার অনুরোধ করবে ও তাকে সুন্দর আচরণ করতে বলবে।

উমার তুমি তাকে নিয়ে গিয়ে তার অধিকার দিয়ে দাও ও অতিরিক্ত বিশ সা' খেজুর দিয়ে দাও।

যায়েদ [ইয়াহুদী] বলে, উমার যখন আমাকে বিশ সা' খেজুর বেশী দিল, তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে উমার! বেশী দিলে কেন? উমার বললেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার রাগের পরিবর্তে তিনি বেশী বলেছেন। যায়েদ বলে:? হে উমার! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছো? উমার বলেন: না, তবে তুমি কে? সে বলল: আমি যায়েদ বিন সু'নাহ।

তিনি বলেন: ও! তুমি ইয়াহুদী পাদ্রী? আমি বললাম: হাঁ,। তিনি বলেন: তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এরূপ আচরণ করলে কেন? এরূপ কথা বললে কেন? সে বলল: হে উমার! আমি যখন তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম, তখন তার চেহারার মাঝে নবূয়তের দুটি আলামত ব্যতীত সব বুঝতে পেরে ছিলাম, আর আমি তার নিকট থেকে এ দুটি আলামত সম্পর্কে অবহিত হইনি: আর তা হল: [১] তাঁর সহিষ্ণুতা অজ্ঞতার উপর অগ্রগামী কি না। [২] মুর্খতা বশত তাঁর সাথে কেউ যত বেশী অসদাচরণ করবে তার ধৈর্য আরো বৃদ্ধি পাবে। এ দুটি বিষয় পরীক্ষার জন্যই আমি এ আচরণ করেছি। ওহে উমার! তোমাকে সাক্ষী করে বলছি: আল্লাহ তা'আলা আমার রব্ব হওয়াতে, ইসলাম আমার দ্বীন হওয়াতে ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী হওয়াতে আমি সন্তুষ্ট। আমি তোমাকে এও সাক্ষী রাখছি যে, আমার অর্ধেক সম্পদ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের জন্য সাদকা করে দিলাম। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আপনি তাদের কতিপয়ের জন্য নির্ধারণ করুন, কেননা আপনি তাদের সবাইকে দিতে পারবেন না। যায়েদ বলল: তাদের কতিপয়ের জন্যই। এরপর যায়েদ [ইয়াহুদী] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমীপে হাজীর হয়ে বলল:

أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمداً عبده ورسوله.

অর্থাৎ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

সে তাঁর উপর ঈমান আনলো ও তাঁকে নবী রূপে বিশ্বাস স্থাপন করলো। [হাকেম মুসতাদরাকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন]

আমরা ঘটনাটিও দীর্ঘ কথোপকথনটি আদ্যপ্রান্ত চিন্তা করি, যাতে আমরা পেতে পারি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ, অনুসরণের একটি বড় শিক্ষণীয় অংশ। মানুষকে দয়া ও নমনিয়তার মাধ্যমে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে পাব ধৈর্যের শিক্ষা। আর যদি তারা সদ্ব্যবহার করে তবে তাতে তাদেরকে উৎসাহিত করা হবে ও তাদের হৃদয়ে শুভ আশাবাদ উজ্জীবিত হবে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«اعتمرت مع النبي - صلى الله عليه وسلم - من المدينة حتى إذا قدمت مكة، قلت: بأبي أنت وأمي يا رسول الله قصرت وأتممت، وأفطرت وصمت، قال: «أحسنت يا عائشة» وما عاب علي»

আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনা হতে উমরা করি, আমি মক্কায় যাওয়ার পর বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, সালাত কসরও করেছি, পরিপূর্ণও আদায় করেছি। রোযা বাদও দিয়েছি আবার রোযা রেখেছি। তিনি শুনে বলেন: “হে আয়েশা ভালই করেছো।" তিনি তাতে আমাকে কোন দোষারোপ করেননি।[142]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদ্যদ্রব্য

সমাজ পতি ও ধনীদের বাড়ীতে খাদ্যের জমজমাট লেগেই থাকে। আর আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আয়াত্তাধীন ছিল রাজ্য ও অসংখ্য জনগণ, তাঁর নিকট আসত উট ভর্তি খাদ্যদ্রব্য, তার সামনে স্বর্ণ-রৌপ্য বয়ে যেত! আপনি কি জানেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পানাহার কেমন ছিল?! রাষ্ট্র নায়ক বা রাজাদের মত আরাম আয়েশের ছিল কি? নাকি তাদের চেয়েও বিলাসী?! ভোগ বিলাসে বিভোর ব্যক্তিদের মত ছিল কি তার পানাহার? নাকি পরিপূর্ণ প্রয়োজনীয় ও পরিতৃপ্তপূর্ণ ছিল! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বল্প মাত্রার অভাবী পানাহারের কথা ভেবে আপনি আশ্চর্য হবেন না! আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে বর্ণনা করছেন, তিনি বলেন:

« إن النبي - صلى الله عليه وسلم - لم يجتمع عنده غداء ولا عشاء من خبز ولحم إلا على ضفف».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুপুর ও রাতের খাবারে কখনো রুটি মাংস একত্রে মিলত না, যদিও মিলত তা হত অতি সামান্য।[143]

অর্থাৎ তিনি পরিতৃপ্ত হতেন না, কোন রূপে চালিয়ে নিতেন। যদি মেহমান আসত তবেই তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ও তাদের আনন্দের জন্য তৃপ্ত হতেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما شبع آل محمد من خبز شعير يومين متتابعين حتى قبض رسول الله - صلى الله عليه وسلم -»

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত পরস্পর দুই দিন যবের রুটি পেট ভরে পূর্ণ করে খায়নি।[144]

অন্য বর্ণনায় এসেছে:

«ما شبع آل محمد منذ قام المدينة من طعام بر ثلاث ليال تباعًا حتى قبض».

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমণের পর থেকে মৃত্যু বরণ পর্যন্ত তাঁর পরিবার পরস্পর তিন দিন পেট পূর্ণ করে গমের রুটি খায়নি।[145]

বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার কিছু না পেয়ে ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমিয়ে যেতেন এক লোকমাও তার পেটে কিছু যেত না!

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يبيت الليالي المتتابعة طاويًا هو وأهله،لا يجدون عشاء، وكان أكثر خبزهم خبز الشعير».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার ক্ষুধার্তাবস্থায় পরস্পর কয়েক রাত অতিবাহিত করতেন। রাতের খাবার থাকত না তাদের কাছে, আর বেশীর ভাগ তাদের রুটি ছিল যবের রুটি।[146]

সম্পদ স্বল্পতার কারণে নয়, বরং তাঁর আয়ত্বধীন ছিল প্রচুর সম্পদ এবং খাদ্য ভর্তি কাফেলা তাঁর সমীপে উপস্থিত হত সচরাচর। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থাকে বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ হোক তা পছন্দ করেন।

উকবা বিন আল-হারেস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আমাদের আসরের সালাত পড়ালেন, অত:পর তিনি দ্রুত গতিতে ঘরে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসলেন। তারপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম অথবা কেউ তাকে জিজ্ঞাসা করল: প্রতি উত্তরে তিনি বলেন: «كنت خلفت في البيت تبرًا -أي ذهبًا- من الصدقة فكرهت أن أبيته فقسمته». ঘরে সাদকার কিছু স্বর্ণ ছিল, তা রেখে আমি এক রাত্রি অতিবাহিত করাটা সমীচিন মনে করলাম না, তাই সেটাকে বন্টন করে দিলাম।[147]

আশ্চার্যজনক বদান্যতা ও অবিচ্ছন্ন দানশীলতার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত তো এ উম্মতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত হতে যা বের হত।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

ما سئل رسول الله - صلى الله عليه وسلم - على الإسلام شيئًا إلا أعطاه، ولقد جاءه رجل، فأعطاه غنمًا بين جبلين، فرجع إلى قومه فقال: «يا قوم أسلموا، فإن محمدًا يعطي عطاء من لا يخشى الفقر».

কেউ যদি ইসলামের দোহাই দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কিছু চাইত, তবে অবশ্যই তাকে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি এসে তার নিকট চাইলে, তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এক পাল ছাগল দান করলেন। সে ব্যক্তি স্বজাতির নিকট গিয়ে বলল: ওহে আমার জাতি! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, কেননা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দান করেন যে, যাতে অভাবের আশঙ্কা নেই।[148]

এত বড় দানবীর ও দাতা হওয়ার পরেও আমাদের নবীর অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করুন!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

« لم يأكل النبي - صلى الله عليه وسلم - على خوان حتى مات، وما أكل خبزًا مرققًا حتى مات».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত বিলাসী দস্তরখানায় বসে খানা খাননি এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কোন নরম [চাপাতী] রুটি খাননি।[149]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: অনেক দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে বলতেন:

«أعندك غداء»؟ فتقول: لا، فيقول: «إني صائم».

তোমার নিকট খাবার কিছু আছে কি? উত্তরে বলতেন: না, অত:পর তিনি বলতেন: তবে আমি আজ রোযাই রাখলাম।[150]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এমনও প্রমাণিত আছে যে, أنه كان يقيم الشهر والشهرين، لا يعيشه هو وآل بيته إلا الأسودان: التمر والماء. তিনি এক দুই মাস কাটিয়ে দিয়েছেন কিন্তু তাঁর ও পরিবারের জন্য দুই কাল বস্তু খেজুর ও পানি ব্যতীত জীবন ধারনের জন্য কিছুই জুটত না।[151]

এত স্বল্প খাদ্য ও জীবনোপকরণেরও পরেও তাঁর চরিত্র ছিল মহান, আদর্শ ছিল ইসলামী, আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া করার আহ্বান জানাতেন ও যিনি এ খাদ্য প্রস্তুত করত তাকে ধন্যবাদ জানাতেন এবং এ খাদ্য বানাতে যদি কোন প্রকার ত্রুটি হত তবে তিনি তার প্রতি কঠোরতা করতেন না। সে তো প্রস্তুত করতে অনেক চেষ্টা করেছে, হয়তোবা কোন কারণ বশত তা ভাল হয়নি! এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদ্যের দোষ বর্ণনা করতেন না এবং কোন বাবুর্চীকেও ভর্ৎসনা করতেন না, যা উপস্থিত আছে তাই গ্রহণ করতেন, ফেরত দিতেন না। আর যা নেই তা কখনো চাইতেন না! ইনিই এ মুসলিম জাতির নবী যার ভূরিভোজনের টার্গেট ছিল না!।

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«ما عاب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - طعامًا قط، إن اشتهاه أكله، وإن كرهه تركه».

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদ্যের দোষ বর্ণনা করতেন না, ভাল লাগলে খেতেন আর না লাগলে খেতেন না।[152]

যাদেরকে পানাহারের ভোগ-বিলাসিতা পেয়ে বসেছে, সে প্রিয় ভ্রাতৃমন্ডলির জন্য শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার বাণীটি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করছি:

আর খাদ্য ও পোশাকের আদর্শ: সর্বোত্তম আদর্শ হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। আর খাদ্যের ব্যাপারে তাঁর আদর্শ হল: ভাল লাগলে পরিমিত খেতেন; উপস্থিত কোন খাদ্যকে ফেরত দিতেন না, এবং যা নেই তা কখনো অনুসন্ধান করতেন না, গোশ রুটি উপস্থিত হলে, তাই খেতেন অথবা ফল-মুল, গোশ ও রুটি উপস্থিত হলে, তাই খেতেন, শুধু রুটি বা শুধু খেজুর পেলে সেটাই খেতেন। তাঁর কাছে দুই প্রকার আনা হলে তিনি এ কথা বলতেন না যে, আমি দুই প্রকার খাদ্য গ্রহণ করব না। আর মজাদার ও মিষ্টি খাদ্য গ্রহণ করা থেকেও তিনি বিরত হতেন না। হাদীসে এসেছে: তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «لكني أصوم وأفطر، وأقوم وأنام، وأتزوج النساء وآكل اللحم فمن رغب عن سنتي فليس مني» কিন্তু আমি তো মাঝে মাঝে নফল রোযা রাখি, আবার মাঝে মাঝে রোযা ছেড়েও দেই। রাত্রে কিছু অংশ জেগে ইবাদাত করি ও কিছু অংশে ঘুমাই, আমি তো বিবাহ করেছি এবং গোশও ভক্ষণ করে থাকি। ওহে আমার উম্মত! তোমরা জেনে রেখো! যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অবজ্ঞা করে, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়।[153]

উত্তম ও পবিত্র খাদ্যসমূহ খাওয়ার ও আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করার জন্য আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি পবিত্র বা হালাল খাদ্যকে হারাম মনে করল সে সীমা লঙ্ঘনকারী আর যে ব্যক্তি আল্লাহর শুকরিয়া করে না সে আল্লাহর হক্ব আদায় করল না বস্তুত তা যেন সে নষ্ট করল। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ হল সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ। আর দুই পন্থায় লোকেরা সে আদর্শচ্যুত হয়ে থাকে:

১। অপচয়কারী যারা ইচ্ছামত গ্রহণ করে, আর তাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্বসমূহ হতে বিরত থাকে।

২। উত্তম ও পবিত্র বস্তুসমূহ হারাম সাব্যস্ত করে এবং এমন বৈরাগ্যের প্রচলন ঘটায় যা আল্লাহ তা'আলা প্রবর্তন করেননি, ইসলামে তো কোন বৈরাগ্য নেই।

তারপর তিনি [রাহেমাহুল্লাহ] বলেন: হালাল বস্তু সবই উত্তম ও পবিত্র, আর সব উত্তম ও পবিত্র বস্তুই হালাল। আল্লাহ তা'আলা আমাদের জন্য উত্তম ও পবিত্র বস্তুগুলিকেই হালাল করেছেন এবং ঘৃণিত ও অপবিত্র বস্তুগুলিকে আমাদের জন্য হারাম করেছেন। পবিত্র হওয়ার কারণ হল: এগুলি যেমন রুচি সম্মত তেমনি তা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

আর যে বস্তুগুলি আমাদের জন্য ক্ষতিকর আল্লাহ তা'আলা সেগুলিকে হারাম করেছেন। আর যা আমাদের জন্য উপকারী, আল্লাহ তা'আলা তাই আমাদের জন্য হালাল করেছেন।

তারপর তিনি [রাহেমাহুল্লাহ] বলেন: পানাহার, পরিধান, ক্ষুধা ও পরিতৃপ্ততায় মানুষের অনেক অবস্থা রয়েছে। আর একজন মানুষের অবস্থাও অনেক প্রকার হতে পারে কিন্তু সর্বোত্তম আদর্শ হল ওটাই যদ্বারা আল্লাহ তা'আলার অনুসরণ হয় ও যা গ্রহণকারীর পক্ষে উপকার হয় সেটাই।[154]


অন্যের সম্মান রক্ষা করা

ইসলামী শিক্ষা ও যিকিরের মজলিসই হল সর্ব শ্রেষ্ঠ মজলিস। আর সে মজলিসে যদি মানব জাতির সর্বোত্তম ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন যাতে তিনি তাঁর হাদীস ও যাবতীয় শিক্ষা ও নির্দেশিকা দিবেন তা কেমন হতে পারে? তাঁর মজলিসের বিশুদ্ধতা ও তাঁর আত্মীক নির্মলতার প্রমাণই হল, ভুলকারীকে সংশোধন করে দেয়া, অজ্ঞকে শিক্ষা দেয়া, উদাসিন-গাফেলকে সতর্ক করা। তাঁর মজলিসে উত্তম কথা ও কার্যক্রম ব্যতীত অন্য কোন কিছুই তিনি মেনে নিতেন না। কেউ কথা বলা আরম্ভ করলে যদিও চুপ থেকে তার কথাগুলি তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রবণ করতেন তবে তিনি কারো গীবত, পরনিন্দা ও অপবাদ দেয়া কোন ক্রমেই মেনে নিতেন না। এজন্যে তিনি অন্যের সম্মান রক্ষায় এ সব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতেন।

উতবান বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قام النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي فقال: «أين مالك بن الدخشم»؟ فقال رجل: ذلك منافق لا يحب الله ولا رسوله، فقال النبي - صلى الله عليه وسلم -: «لا تفعل ذلك، ألا تراه قد قال لا إله إلا الله يريد بذلك وجه الله، وإن الله قد حرم على النار من قال: لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله».

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে বললেন: মালেক বিন আদ্দাখশামকে দেখছিনা কেন? এক ব্যক্তি বলল: সে তো মুনাফিক। কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পছন্দ করে না। এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি এ কথা বলো না। তুমি কি জানো না, সে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবূদ নেই" পাঠ করেছে! আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে ঐ ব্যক্তির উপর হারাম করেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবূদ নেই" পাঠ করবে!।[155]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া থেকে নিষেধ করেছেন এবং তেমনিভাবে অন্যের অধিকার খর্ব করা থেকেও নিষেধ করেছেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন:

«ألا أنبئكم بأكبر الكبائر»؟ قلنا: بلى يا رسول الله، قال: «الإشراك بالله، وعقوق الوالدين» وكان متكئًا فجلس فقال: «ألا وقول الزور» فما زال يكررها حتى قلنا: ليته سكت».

আমি কি তোমাদের সর্বাধিক বড় গোনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? আমরা বললাম নিশ্চয়ই, হে আল্লাহর রাসূল! অবহিত করুন। তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসে ছিলেন, অত:পর তিনি উঠে বসে বললেন: সাবধান তোমরা মিথ্যা কথা হতে এবং তা বার বার বলছিলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা বলতে লাগলাম এখন যদি তিনি চুপ হতেন।[156]

মুমিন জননী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-র প্রতি অগাধ ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও তার কর্তৃক গীবত করাটা কঠোরভাবে দমন করে তার ভয়বহতা বর্ণনা করেছেন।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: قلت للنبي - صلى الله عليه وسلم - حسبك من صفية كذا وكذا، قال بعض الرواة: تعني قصرها، فقالت: «لقد قلت كلمة لو مزجت بماء البحر لمزجته». আমি বললাম: হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়েছে, হয়েছে ঐ সেই সাফিয়া। অন্য বর্ণনায় এসেছে- অর্থাৎ তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছিলেন ঐ বেঁটে সাফিয়া। এ কথা শুনে তিনি বলেন: তুমি এমন কথা বলেছ, তা যদি সাগরে মিশ্রণ করা হতো তবে সাগরের পানিকে পরিবর্তন করে দিতো।[157]

অন্য ভায়ের দোষ গোপনের মাধ্যমে সম্মান রক্ষাকারীকে সুসংবাদ দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«من ذب عن عرض أخيه بالغيبة كان حقًا على الله أن يعتقه من النار».

যে ব্যক্তি অন্য ভায়ের গীবত দমন করে তার সম্মান রক্ষা করল, আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।[158]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যিকিরের বর্ণনা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী বেশী আল্লাহ তা'আলার যিকির করতেন। মুসলিম জাতির প্রধান শিক্ষক তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাত ও আল্লাহ তা'আলার সাথে তাঁর অন্তরের যোগাযোগ ছিল সুদৃঢ়। তাঁর জীবনের পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল। এরপরও তিনি আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর শুকরিয়া জ্ঞাপন, এস্তেগফার ব্যতীত এক মূহুর্ত সময়ও অতিবাহিত করতেন না!। তিনি ছিলেন শুকর গুজার বান্দা এবং শুকরিয়া জ্ঞাপনকারী ও আল্লাহ তা'আলার প্রশংসাকারী রাসূল। তিনি তাঁর প্রভূর মর্যাদা সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান লাভ করেই তাঁর প্রশংসা করতেন, করতেন তাঁর সমীপে প্রার্থনা, তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন। তিনি স্বীয় সময়ের মূল্য সম্পর্কে বুঝতেন বলেই তিনি তা হতে উপকৃত হতে পারেছিলেন, আর সে সময়কে তিনি আল্লাহর অনুসরণ ও তাঁর ইবাদাতে কাটানোতেই ছিলেন সচেষ্ট।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يذكر الله تعالى على كل أحيانه».

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদায় আল্লাহ তা'আলার যিকির করতেন।[159]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক বৈঠকে একশত বার এ দোয়া পড়তে শুনেছি:

رَبِّ اغْفِرْلِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ

অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করো ও আমার তাওবাকে কবূল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি দয়ালু ও তাওবা কবূলকারী।[160]

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

سمعت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يقول: «والله إني لأستغفر الله وأتوب إليه في اليوم أكثر من سبعين مرة».

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: তিনি বলেন: আল্লাহর শপথ আমি প্রতি দিন সত্তরের অধিক বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করে থাকি।[161]

ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক বৈঠকে একশত বার এ দোয়া পড়তে শুনেছি:

رَبِّ اغْفِرْلِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ

অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করো ও আমার তাওবাকে কবূল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি দয়ালু ও তাওবা কবূলকারী।[162]

মুসলিম জননী উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকা কালিন এ দোয়াটি বেশী পাঠ করতেন:

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلَى دِيْنِكَ

অর্থাৎ হে অন্তর পরিবর্তনকারী! তুমি আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো।[163]


প্রতিবেশী সাথে আল্লাহর নবী

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিবেশী হওয়াটাই ছিল সম্মানের কারণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে প্রতিবেশীর মহা অবস্থান বিরাজ করত। তিনি বলেন:

«مازال جبريل يوصيني بالجار حتى ظننت أنه سيورثه».

জিব্রিল [আলাইহিস সালাম] আমাকে সর্বদায় প্রতিবেশী সম্পর্কে অসিয়ত করতেন এমন কি আমি এ আশঙ্কা করতাম যে, হয়তো তাকে তাঁর উত্তরাধিকার করে দিবে।[164]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ বলে অসিয়াত করেছেন:

«يا أبا ذر إذا طبخت مرقة فأكثر ماءها وتعاهد جيرانك»

হে আবু জার! তুমি যখন গোশ পাকাবে তাতে ঝোল একটু বাড়িয়ে দাও ও প্রতিবেশীর খোঁজ নাও।[165]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া থেকে সতর্ক করে বলেন:

«لا يدخل الجنة من لا يأمن جاره بوائقه»

যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।[166]

প্রতিবেশীর জন্য সৌভাগ্য যার সম্পর্কে তিনি বলেন:

«من كان يؤمن بالله واليوم الآخر، فليحسن إلى جاره»

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সাথে ভাল ব্যবহার করে।[167]


মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: «كان النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا بلغه عن الرجل الشيء لم يقل: ما بال فلان يقول؟ ولكن يقول: ما بال أقوام كذا وكذا؟». কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রকার ত্রুটির সংবাদ পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম উল্লেখ করে বলতেন না যে অমুকের কি হয়েছে? বরং তিনি এভাবে বলতেন: লোকদের কি হল যে, তারা এমন এমন কথা বলে?।[168]

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক ব্যক্তি এমন অবস্থায় প্রবেশ করল, যখন তার উপর হলুদ রং পরিলক্ষিত হচ্ছিল, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করেন, এমন কিছু নিয়ে কম লোকই তাঁর নিকট আসত। সে লোকটি যখন তাঁর নিকট থেকে বাহির হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন: «لو أمرتم هذا أن يغسل ذا عنه» তোমরা যদি এ ব্যক্তিকে তা ধৌত করতে বলতে, তবে ভাল হতো।[169]

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: -: «ألا أخبركم بمن يحرم على النار، أو بمن تحرم عليه النار؟ ترحم على كل قريب هين لين سهل». আমি কি তোমাদেরকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদ দিব না? যে ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য হারাম আর জাহান্নাম তার জন্য হারাম। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যই জাহান্নাম হারাম যে নিকটবর্তী, সহজ সরল ও নরম প্রবৃত্তির।[170]


মানুষের অধিকার বিষয়ে আল্লাহর নবী

মানুষের উপর অনেক অধিকার রয়েছে। তাতে রয়েছে: আল্লাহ তা'আলার হক বা অধিকার, অপরদিকে রয়েছে পরিবারের হক বা অধিকার আর তৃতীয়তে রয়েছে স্বীয় আত্মার অধিকার, তারপরও রয়েছে বান্দাদের অনেক অধিকার। তারপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সময়কে কিভাবে ভাগ করে দিনের প্রতিটি মূহুর্তকে কাজে লাগিয়েছেন?!

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন:

جاء ثلاثة رهط إلى بيوت النبي - صلى الله عليه وسلم - يسألون عن عبادته فلما أخبروا كأنهم تقالوها، وقالوا: أين نحن من النبي - صلى الله عليه وسلم - وقد غفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر، قال أحدهم: أما أنا فأصلي الليل أبدًا، وقال الآخر: وأنا أصوم الدهر ولا أفطر، وقال الآخر: وأنا أعتزل النساء فلا أتزوج أبدًا، فجاء رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إليهم فقال: «أنتم الذين قلتم كذا وكذا؟ أما والله إني لأخشاكم لله وأتقاكم له لكني أصوم وأفطر، وأصلي وأرقد وأتزوج النساء، فمن رغب عن سنتي فليس مني».

একদা তিন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, সে সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তারা তা অতি নগন্য মনে করল। তারা বলে উঠল, রাসূলের মর্যাদায় আমরা তো নগন্য, কেননা তাঁর জীবনের পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি বলল: আমি সারা রাত্রি ধরে সালাত আদায় করব। অন্যজন বলল: আমি সারা জীবন ধরে রোযা রাখব, কখনো ছাড়ব না। অন্যজন বলল: [আমি মহিলার ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকব], আমি বিবাহ করব না। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এসে বললেন: তোমরাই এসব কথা-বার্তা বলেছিলে? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি: আমিই সর্বাপেক্ষা আল্লাহকে বেশী ভয় করে থাকি, তারপরও আমি মাঝে মধ্যে রোযা রাখি আবার মাঝে মধ্যে রোযা রাখি না, রাত্রির কিছু অংশ সালাত আদায় করি আবার কিছু অংশে ঘুমাই, আর আমি বিবাহ করেছি। ওহে! তোমরা জেনে রেখো! যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অবজ্ঞা করল, সে আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়।[171]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্ব ও ধৈর্য

আল্লাহর দ্বীনের কালেমাকে বুলন্দ ও এ দ্বীন ইসলামকে সাহায্য করার নিমিত্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ ভূমিকা ও অংশ রয়েছে। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যে নিয়ামত দিয়েছিলেন তা তিনি সঠিকভাবে ব্যয় করেছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما ضرب رسول الله - صلى الله عليه وسلم - بيده شيئًا قط إلا أن يجاهد في سبيل الله ولا ضرب خادمًا ولا امرأة»

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের ময়দান ব্যতীত তাঁর হাত দিয়ে কাউকে মারেননি এমনকি তার স্ত্রী ও খাদেমকেও না।[172]

তিনি একাই কুরাইশ ও তাদের নেতাদের দাওয়াত দেয়া ও তাদের সাথে সত্যের আন্দোলনে মুখোমুখি হয়ে এ দ্বীন ইসলাম বিজয় লাভ করা অবধি টিকে থাকার পরও তিনি কখনো বলেননি যে, আমার সাহায্যে কেউ আসেনি অথবা সকল জাতির লোক আমার বিরোধী আমি একা। বরং তিনি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মহা বীরত্বের সাথে দাওয়াতী কাজ চালিয়ে গেছেন এবং লোকদেরকে উৎসাহ দান করেছেন এবং তাদেরকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠা থাকার জন্য আহ্বান করা সত্ত্বেও লোকেরা দূরে সরে যাওয়ার পরও তিনি স্থির থেকেছেন এসকল আদর্শই প্রমাণ করে তাঁর সাহসীকতা ও ধৈর্য।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক বছর ধরে হেরা গুহায় ইবদাত করতেন সে সময় তাকে কেউ কষ্ট দেয়নি, আর কুরাইশরাও তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার বিরোধিতা করেনি, অথবা কাফের গোষ্ঠীর কেউ তার বিরুদ্ধে একটি তীরও নিক্ষেপ করেনি, কিন্তু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জাতিকে তাওহীদের দিকে প্রাকাশ্যে আহ্বান, এবং ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিমিত্তেই হতে হবে এ আহ্বান জানালেন, তখনই কাফেররা আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল:

﴿ أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ ٥ ﴾ [ص : ٥]

অর্থাৎ সে কি বহু মাবূদকে এক মাবূদে পরিণত করছে।[173]

তারা মূর্তিকে তাদের ও আল্লাহর মাঝে মাধ্যম মনে করত, যা আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বর্ণনা করেছেন:

﴿ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ٣ ﴾ [الزمر: ٣]

অর্থাৎ আমরা তো তাদের ইবদাত এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করিয়ে দিবে।[174]

তারা কিন্তু তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহকে স্বীকার করত, যা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন:

﴿ قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ قُلِ ٱللَّهُۖ وَإِنَّآ أَوۡ إِيَّاكُمۡ لَعَلَىٰ هُدًى أَوۡ فِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢٤ ﴾ [سبا: ٢٤]

অর্থাৎ, বলুন: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী হতে কে তোমাদেরকে রিযিক প্রদান করে? বলুন: আল্লাহ! হয় আমরা, না হয় তোমরা সৎপথে স্থিত অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত।[175]

প্রিয় পাঠক! আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন, বর্তমানে মুসলিম দেশগুলি শিরকে সয়লাব হয়ে গেছে। মৃতের নিকট প্রার্থনা করা, তাদেরকে অসীলা মনে করা, তাদের জন্য মান্নত করা, তাদেরকে ভয় করা ও তাদের নিকট আকাঙ্খা করা! এমনকি আল্লাহর সাথে শিরক করার কারণে এবং মৃতদেরকে জীবতদের স্থানে আসন দেয়ার কারণে আল্লাহ সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ ٖ ٧٢ ﴾ [المائدة: ٧٢]

অর্থাৎ: নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।[176]

এবার আমরা তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে উত্তর দিকে এক পাহাড়ের দিকে ধাবিত হই, সে পাহাড়টি হল উহুদ পাহাড়। যেখানে মহা সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল। যেথায় প্রকাশ পায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বীরত্ব এবং প্রামাণিত হয় অসীম ধৈর্য, যে মহা যুদ্ধে তিনি ভীষণ আক্রান্ত ও যখম হন, এমনকি তার চেহারা মুবারক রক্তাক্ত হয়। সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় ও মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

সাহাল বিন সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহত হওয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন:

«أما والله إني لأعرف من كان يغسل جرح رسول الله - صلى الله عليه وسلم -، ومن كان يسكب الماء وبما دووي، قال: كانت فاطمة عليها السلام بنت رسول الله - صلى الله عليه وسلم - تغسله وعلي بن أبي طالب يسكب الماء بالمجن، فلما رأت فاطمة أن الماء لا يزيد الدم إلا كثرة أخذت قطعًا من حصير وأحرقتها وألصقتها فاستمسك الدم وكسرت رباعيته وجرح وجهه وكسرت البيضة على رأسه»

আমি আল্লাহ তা'আলার শপথ করে বলছি, আমি জানি: কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঘাত প্রাপ্ত জায়গা ধৌত করেছে এবং তাতে কে পানি ঢালছিল এবং কোন জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ধৌত করেছিল এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু লোটা থেকে পানি ঢালছিলেন। আর ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন দেখলেন যে, পানি ঢালায় রক্ত প্রবাহিত হওয়া আরো বৃদ্ধি হচ্ছে তখন তিনি চাটাই পুড়িয়ে লাগিয়ে দিলেন, তখন রক্ত প্রবাহিত হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গেছিল এবং তার মুখ মন্ডলে আঘাত লেগেছিল এবং লৌহ বর্ম ভেঙ্গে তাঁর মাথায় প্রবেশ করেছিল।[177]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুনাইন যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে অব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: হুনায়নের যুদ্ধের দিন মুসলিম বাহিনী যখন হটে যাচ্ছিল, তখন তিনি তার সওয়ারীকে লাথি মেরে কাফেরদের দিকে দৌড়ানো শুরু করেন; কিন্তু আমি এই নিয়তে সওয়ারীর লাগাম ধরে বাধা দেই যেন সে দ্রুত না যেতে পারে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমতাবস্থায় বলছিলেন: «أنا النبي لا كذب، أنا ابن عبد المطلب» আমি সত্য নবী, মিথ্যা নবী নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের উত্তরসূরী।[178]

বীর সেনানী অশ্বারোহী, বহু বহু প্রসিদ্ধ ঘটনা প্রবাহের নায়ক আলী বিন আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন: যখন একদল অন্য শত্রু দলের মুখামুখি হত ও যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করত, তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশ্রয় গ্রহণ করতাম, তিনিই সর্বাগ্রে শত্রুর নিকটবর্তী হতেন।[179]

দাওয়াতী কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের কারণেই উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় ও উত্তম আদর্শ রচিত হয় এমনকি যার ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা এ দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং মুসলিম বাহিনী সারা আরব উপদ্বীপ, শাম ও মা ওরাআন নাহার [সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগান সীমান্ত] পর্যন্তই ইসলামের ঘোড়া অবাধে বিচরণ করেছে, এমনকি পাকা ও কাঁচা সকল ঘরেই ইসলাম প্রবেশ করেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«لقد أخفت في الله وما يخاف أحد، ولقد أوذيت في الله وما يؤذى أحد، ولقد أتت علي ثلاثون من بين يوم وليل وما لي ولبلال طعام يأكله ذو كبد إلا شيء يواري إبط بلال»

আল্লাহর রাস্তায় আমাকে ভীত সন্ত্রস্থ করা হয়েছে কিন্তু এর প্রতিশোধ হিসেবে কাউকে ভীত সন্ত্রস্ত করা হয়নি। আল্লাহর রাস্তায় আমাকে অনেক কষ্ট দেয়া হয়েছে কিন্তু এর প্রতিশোধ হিসেবে কাউকে কষ্ট দেয়া হয়নি। আমার উপর ত্রিশ দিন ও রাত অতিবাহিত হয়ে গেছে কিন্তু আমার ও বেলালের জন্য এমন কোন খাদ্যও ছিল না যা কোন ব্যক্তি খেতে পারে, তবে শুধু বেলাল যা কিছু তার বগলের নিচে নিয়েছে।[180]

অথচ তাঁর নিকট অনেক সম্পদ এসেছে, অনেক গণিমতের মাল লাভ করেছেন তিনি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাতে অনেক বিজয় দান করেছেন। এরপরও তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কোন অর্থ-কড়ি রেখে যাননি। তবে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা হল: এলেম বা জ্ঞান। বস্তুত এটাই হল মীরাসুন্ নবুওয়াহ বা নবুওয়্যাতের উত্তরাধিকার। কেউ যদি সে উত্তরাধিকার গ্রহণ করতে চায়, সে যেন তা গ্রহণ করে এবং আনন্দ চিত্তে তা গ্রহণ করে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:

«ما ترك رسول الله - صلى الله عليه وسلم - دينارًا ولا درهمًا، ولا شاةً، ولا بعيرًا، ولا أوصى بشيء»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন প্রকার দিনার-দিরহাম, কোন প্রকার ছাগল বা উট রেখে যাননি এবং কোন প্রকার অসীয়তও করে যাননি।[181]


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রার্থনা

দোয়া-প্রার্থনা হল মহান এক ইবাদাত, যা আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট করা কোন ভাবেই বৈধ নয়। দোয়ার অর্থ হল: আল্লাহর সমীপেই মুখাপেক্ষীতা প্রকাশ ও সকল সামর্থ ও শক্তি আল্লাহর দিকে সোপর্দ করা। আর দোয়া বা প্রার্থনা করাই হল বান্দার আসল পরিচয় এবং মানবিক দুর্বলতা ও বশ্যতার বহি:প্রকাশ তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএরশাদ করেছেন: «الدعاء هو العبادة» দোয়াই হল ইবাদাত।[182]

তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদায় দোয়া, বিনয়-নম্রতা ও আল্লাহর সমীপে স্বীয় অভাব প্রকাশ করতেন এবং তিনি ব্যাপক ভাব সম্পন্ন কথা বলতে ও দোয়া- প্রার্থনা করতে পছন্দ করতেন।

তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর দোয়ার মধ্যে এগুলি ছিল অন্যতম:

اَللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِيْ دِيْنِيْ الَّذِيْ هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِيْ ، وَأَصْلِحْ لِيْ دُنْيَايَ الَّتِيْ فِيْهَا مَعَاشِيْ وَأَصْلِحْ لِيْ آخِرَتِيْ التَّيْ فِيْهَا مَعَادِيْ وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِّيْ فِيْ كُلِّ خَيْرٍ وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِيْ مِنْ كُلِّ شَرٍّ .

অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমার দ্বীনকে সুন্দর-সঠিক কর যা আমার সকল কর্মের হেফাযতকারী। আমার পার্থিব জীবনকে সুন্দর কর যাতে আমার জীবিকা রয়েছে। আমার পরকালকে সুন্দর কর যাতে আমার প্রত্যাবর্তন হবে। সৎ কর্মের মধ্যে আমার হায়াত বৃদ্ধি কর এবং মন্দ কর্ম হতে মওতকে আমার জন্য আরাম দায়ক কর।[183]

আর তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম দোয়ার অন্তর্ভুক্ত:

اَللَّهُمَّ عَالِمُ الْغَيْبَ وَالشَّهَادَةِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ، رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيْكَهُ أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِيْ وَشَرِّ الشَّيْطَانِ وَشَرِكِهَ وَأَنْ أَقْتَرِفَ عَلَى نَفْسِيْ سُوْءاً أَوْ أَجِرْهُ إِلىَ مُسْلِمٍ .

অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি উপস্থিত ও অনুপস্থিত সম্পর্কে জ্ঞাত, আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনকারী, হে প্রত্যেক বস্তুর প্রতিপালক ও অধিপতি, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। আমি আমার আত্মার মন্দ হতে এবং শয়তান ও তার শিরকের অনিষ্ট হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি নিজের অনিষ্ট হতে এবং কোন মুসলমানের অনিষ্ট করা হতে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।[184]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো পছন্দনীয় দোয়া হল:

اَللَّهُمَّ اكْفِنِيْ بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَاغْنِنِيْ بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ .

অর্থাৎ, হে আল্লাহ ! তুমি তোমার হারাম বস্তু হতে বাঁচিয়ে তোমার হালাল রিযিক দ্বারা আমাকে পরিতুষ্ট করে দাও। আর তোমার অনুগ্রহ অবদান দ্বারা তুমি ভিন্ন অন্য সব হতে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও।[185]

তিনি তাঁর প্রতিপালকের সমীপে এ প্রার্থনাও করতেন:

اَللَّهُمَّ اغْفِرْلِيْ وَارْحَمْنِيْ وَأَلْحِقْنِيْ بِالرَّفِيْقِ الأَعْلَى

হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি দয়া করো ও আমাকে আমার সর্বোচ্চ বন্ধুর সাথে মিলিত কর।[186]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাচ্ছন্দে ও দু:খ সর্বদায় আল্লাহর সমীপে প্রার্থনা করতেন, বদরের যুদ্ধের ময়দানে তিনি মুসলিম বাহিনীর বিজয় ও মুশরিক বাহিনীর পরাজয়ের জন্য দোয়া করতে করতে কাঁধ থেকে তাঁর চাদর পড়ে গিয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য, স্বপরিবারের জন্য, সাহাবীদের জন্য ও সমস্ত মুসলমানদের জন্য দোয়া করতেন।


যিয়ারতের সমাপ্তি

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, তাঁর পবিত্র জীবনী, তাঁর জিহাদ ও বিপদাপদের বর্ণনা শুনে আমাদের কর্ণকে সুরভিত করার পর এবার আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে হক রয়েছে, তা আদায় করা আমাদের উপর ওয়াজিব যাতে করে আমরা পূর্ণ মঙ্গলের অধিকারী হয়ে সঠিক পথ অবলম্বন করি। তাঁর উম্মতের উপর অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হল:

কথা ও কাজের মাধ্যমে তাঁর উপর পূর্ণ ঈমানের প্রকাশ ঘটানো ও তিনি যা নিয়ে এসেছেন সেগুলিকে বিশ্বাস করা এবং তাঁর অনুসরণ করা ও তার অবাধ্যতা করা হতে বেঁচে থাকা। আর জীবনের প্রতিটি দিক তার আদর্শ মতে ফয়সালা করা এবং তার দেয়া বিধানে সন্তুষ্ট থাকা ও বাড়াবাড়ি বা অবমাননা না করে তাঁর যথাযথ সম্মান প্রদান করা। আর জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করা ও তাঁকে আদর্শের মূর্ত প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা। স্বীয় পরিবার, সম্পদ, সন্তান ও সকল মানুষ থেকে তাঁকে বেশী ভালবাসা। তাঁকে সম্মান দেয়া, তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করা ও তাঁর সুন্নাতকে রক্ষা করা ও তা মুসলমানদের মাঝে বিস্তার করা, এবং তার সাহাবীদের ভালবাসা ও তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকা ও তাদের সম্মান রক্ষা করা ও তাদের জীবন চরিত পাঠ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুহাব্বতের অন্তর্ভুক্ত হল: যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦ ﴾ [الاحزاب : ٥٦]

অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর ফেরেস্তাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন, হে মু'মিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য সালাত ও যথাযথভাবে সালাম জানাও।[187]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

إن من أفضل أيامكم يوم الجمعة فيه: خلق آدم، وفيه النفخة، وفيه الصعقة، فأكثروا عليّ من الصلاة فيه فإن صلاتكم معروضة عليّ. فقال رجل: يا رسول الله! كيف تعرض صلاتنا عليك وقد أرمت؟ يعني بليت. قال: إن الله حرّم على الأرض أن تأكل أجساد الأنبياء.

অর্থাৎ সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে তোমাদের জন্য শুক্রবার হল সর্বোত্তম দিন। যাতে আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে দিনেই সিঙ্গায় ফু দেয়া হবে এবং সে দিনেই সকল জীবন মৃত্যবরণ করবে। সুতরাং তোমরা তাতে আমার উপর বেশী বেশী সালাত পাঠ করো, কেননা তোমাদের সালাত আমার সম্মানে উপস্থাপন করা হবে। এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো মৃত্যুর পর মাটির সাথে মিশে যাবেন, অতএব, আমাদের সালাত আপনার প্রতি কিভাবে পেশ করা হবে? তিনি বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা নবীদের দেহ হজম করাকে মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।[188]

উম্মতে মুহাম্মাদী যেন এ নবীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোন কৃপণতা না করে, সেক্ষেত্রে তিনি [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেন: «البخيل من ذكرت عنده فلم يصل عليَّ» “প্রকৃত কৃপণ তো সেই ব্যক্তি যার সামনে আমার আলোচনা হল, অথচ সে আমার প্রতি সালাত পড়ল না।"[189]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন:

«ما جلس قوم مجلسًا لم يذكروا الله فيه، ولم يصلوا على نبيهم إلا كان عليه ترة فإن شاء عذبهم وإن شاء غفر لهم»

“কোন জাতি এক মজলিসে বসল, অথচ তারা সেখানে না আল্লাহর কথা আলোচনা করল, না তারা তাদের নবীর প্রতি সালাত পড়ল। এতএব, এ হবে তাদের জন্য হতাশার কারণ, আল্লাহ চাইলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন, চাইলে তাদেরকে ক্ষমাও করতে পারেন।[190]


বিদায়

ঈমানের আবাদ ও সৎকর্ম প্রতিষ্ঠিত ঘর হতে আমরা এখন প্রস্থান করছি, অবশেষে আমরা যারা হিদায়েত চাই ও যারা মুক্তি চাই, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতই হবে নির্দশন, ও সুন্নাতই হবে তরীকা।

আমরা মহান উত্তরসূরীয় উলামাদের নিকট হতে এ মহা সুন্নাতী তরীকার অনুসরণের শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করি..। আশা করি আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর উত্তম অনুসরণ ও যথাযথ অনুকরণের তাওফীক দিবেন।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসরণীয় ইমাম আহমাদ বিন হান্বাল [রাহেমাহুল্লাহ] বলেন:

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন হাদীস লিখার পূর্বে তা নিজে আমল না করে লিখিনি। এমনকি আমার কাছে যখন এ হাদীসটি পৌঁছল: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিঙ্গা লাগিয়েছেন, এবং মজুরী স্বরূপ আবু তালহাকে এক দীনার দিয়েছেন।" অতএব, আমিও যখন সিঙ্গা লাগালাম তখন মজুরী স্বরূপ এক দীনার প্রদান করলাম।[191]

আব্দুর রহমান বিন মাহদী বলেন: আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি: আমার নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন কোন হাদীস পৌঁছেনি যার প্রতি আমি আমল করিনি, যদিও তা একবার হোক।

মুসলিম বিন ইয়াসার বলেন: আমি জুতা পরিহিত অবস্থায় সালাত আদায় করি। অথচ জুতা খুলা আমার জন্য খুব সহজ ছিল। এতে সুন্নাত বাস্তবায়ন করাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।[192]

পরিশেষে প্রিয় ভাইদেরকে মহান একটি হাদীস উপহার দিচ্ছি। আর তা হল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

«كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى» قالوا: يا رسول الله، ومن يأبى؟ قال: «من أطاعني دخل الجنة، ومن عصاني فقد أبى»

আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু তারা ব্যতীত যারা অস্বীকার করবে। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল! কারা অস্বীকারকারী? তিনি বল্লেন: যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যারা আমার আবাধ্য হবে তারাই অস্বীকারকারী।[193]

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে তোমার নবীর মুহাব্বাত দান করো এবং সরল ও সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণের তাওফীক দান করো। পথভ্রষ্ট ও পথভ্রষ্টকারীদের পথে নয়।

হে আল্লাহ! দিবা-নিশি সব সময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর রহমত বর্ষণ কর।

হে আল্লাহ! সমস্ত আবেদ ও সৎলোকে যত পরিমাণ রহমত কামনা করে, তার প্রতি সেই পরিমাণ রহমত বর্ষণ কর।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উচ্চ ফেরদাউসে একত্রিত করিও, এবং তাঁকে দেখিয়ে আমাদের চক্ষু শীতল করিও, এবং তাঁর হাউজ কাউসার থেকে পানি পান করাইও, যা এক বার পান করলে আর কখনো পিপাসিত হতে হবে না।

এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর রহমত বর্ষণ করো এবং তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর সাহাবা ও সকল মুসলিমের উপর।

সমাপ্ত




[1] সূরা কালাম, আয়াত:

[2] মুসলিম, হাদিস: ২৪৯

[3] আলে-ইমরান, আয়াত: ৩১

[4] আল-আহযাব, আয়াত: ২১

[5] দেখুন: ইবনে তাইমিয়া রাহেমাহুল্লাহ এর মাজমুউল ফাতাওয়া ১/৪

[6] সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩ ,১৪

[7] বুখারী, হাদিস: ১৬, ২১, মুসলিম, হাদিস: ৬৭, ৬৮

[8] বুখারী, হাদিস: ১৪ ও মুসলিম

[9] বুখারী ও মুসলিম

[10] সূরা হাশর, আয়াত:

[11] কিতাব আল-ইতিসাম লিল ইমাম সাতবী পৃ: ২৪৮

[12] মাজমুউ আল-ফাতাওয়া ২৭/২৫১।

[13] বুখারী, হাদিস: ২৮৯৩ ও মুসলিম, হাদিস: ১৩৬৫

[14] সহীহ ইবনে হাব্বান, হাদিস: ৬৩৫২ আবু দাউদ: ৩০৫৫।

[15] তিরমিযী

[16] ইবনে সায়াদ এর তাবাকাতুল কুবরা ১/৪৯৯,৫০১, এবং দেখুন: ইবনে কাসীরের সীরাতুন্নাবাবিয়্যায় ২/২৭৪

[17] বুখারী, হাদিস: ৩৫৪৯, মুসলিম, হাদিস: ২৩৩৭

[18] বুখারী, হাদিস: ৩৫৫১, মুসলিম হাদিস: ২৩৩৭

[19] বুখারী, হাদিস: ৩৫৫২

[20] বুখারী, হাদিসি: ৩৫৬১ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩০

[21] বুখারী, হাদিস: ৩৫৬২

[22] তিরমিযি, হাদিস: ৩৬৩৯

[23] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৯

[24] বুখারী, হাদিস: ৯৪, ৯৫, ৬২৪৪

[25] ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৩১২

[26] বুখারী, হাদিস: ৫৯৪৯

[27] তিরমিযী

[28] বুখারী, হাদিস: ৬৫৩১ মুসলিম, হাদিসি: ২০২৮

[29] তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭

[30] বুখারী ও মুসলিম

[31] যাদুল মা'আদ ২/৩৮১

[32] তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪৯

[33] তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪৬

[34] মুসলিম, হাদিস: ৯৭৬

[35] মুসলিম, হাদিস: ২০৪

[36] সূরা তাওবা, আয়াত: ১১৩

[37] সূরা কাসাস, আয়াত: ৫৬ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৪৭; বুখারী, হাদিস: ১৩৬০; মুসলিম, হাদিস: ২৪

[38] আহমাদ, হাদিস: ২৬১৯৪

[39] মুসলিম, হাদিস: ২৯৭৭

[40] মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২

[41] বুখারী, হাদিস: ৬৭৬

[42] বুখারী, হাদিস: ৬৪৪; মুসলিম, হাদিস: ৬৫১

[43] তিরমিযী, হাদিস: ২১৭

[44] আহমাদ, হাদিস: ২৫৪১৭

[45] তিরমিযী

[46] বুখারী, হাদিস: ৪৪৯৭

[47] বুখারী, হাদিস: ১০; মুসলিম, হাদিস: ৪২

[48] তিরমিযী, হাদিস: ২২৩; ইবনু মাযাহ, হাদিস: ৭৮১

[49] বুখারী, হাদিস: ৬৪৭৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৮

[50] মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৯

[51] বুখারী, হাদিস: ৩৪৪৫

[52] মুসলিম, হাদিস: ৫৩২

[53] আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী

[54] মুসলিম, হাদিস: ২৪৫০

[55] বুখারী, হাদিস: ৩৭০৫

[56] সূরা বাকারাহ: ১৫৬

[57] মুসলিম, হাদিস: ৯১৮

[58] সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫৬

[59] সহীহ আল-জামে আস-সাগীর, আহমদ, হাদিস: ৬৫৬৭ নাসায়ী, হাদিস: ৩২৩২

[60] বুখারী, হাদিস: ৩৭৬৮; মুসলিম, হাদিস: ৮৯৭৫

[61] মুসলিম, হাদিস: ৩০০

[62] আবু দাউদ, হাদিস: ১৭৯; আহমদ, হাদিস: ২৫৭৩২

[63] বুখারী, হাদিস: ৩৬৬২; মুসলিম, হাদিস: ২৩৮৪

[64] বুখারী, হাদিস: ২৬৩

[65] আহমাদ, হাদিস: ২৬২৭৭

[66] বুখারি, হাদিস: ৫১৮৬; মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৮

[67] বুখারি, হাদিস: ২৮৭৯; মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৩

[68] মুসলিম, হাদিস: ১৪৬২

[69] সূরা ত্বাহা, আয়াত: ১৩২

[70] বুখারী, হাদিস: ৯৯৭।

[71] আবুদাউদ, হাদিস: ১৩০৮ নাসায়ী, হাদিস: ১৬১০

[72] আহমাদ, হাদিস: ২৬৭৬৩

[73] মুসলিম, হাদিস: ২৫৫

[74] মুসলিম, হাদিস: ২৫৩

[75] আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৬

[76] আহমাদ, হাদিস: ৮৪৮১; তিরমিযি: ১৯৯০

[77] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৬৯

[78] বুখারী ও মুসলিম

[79] আহমাদ, হাদিস: ১২৬৪৮

[80] বুখারী, হাদিস: ৬০৯২; মুসলিম, হাদিস: ৮৯৯

[81] বুখারী, হাদিস: ৫৯৫৪; মুসলিম: ২১০৭

[82] মুসলিম, হাদিস: ২৭১৪

[83] বুখারী, হাদিস: ২৪৭ মুসলিম, হাদিস: ২৭১০

[84] আহমদ, হাদিস: ২৪৮৫৩

[85] মুসলিম, হাদিস: ২৭১৫ আহমদ, হাদিস: ১২৫৫২

[86] মুসলিম, হাদিস: ৬৮৩

[87] মুসলিম, হাদিস: ২০৮২

[88] আহমাদ, হাদিস:

[89] সূরা মুযাম্মিল, আয়াত: ১-৪

[90] বুখারি, হাদিস: ১১৩০; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪১৯

[91] বুখারী

[92] মুসলিম, হাদিস: ৭৭২; আহমদ, হাদিস: ২৩৩৬৭

[93] মুসলিম, হাদিস: ৬৭০

[94] তিরমিযী, হাদিস: ৫৮৬

[95] মুসলিম, হাদিস: ৭১৯

[96] বুখারী, হাদিস: ১৯৮১; মুসলিম, হাদিস: ৭২১

[97] বুখারী, হাদিস: ৪৩২

[98] আবু দাউদ, হাদিস: ৯০৪

[99] বুখারী, হাদিস: ৫০৫৬

[100] তিরমিযী, হাদিস: ৩২৯৭

[101] আহমদ, হাদিস: ২৫৮১৩

[102] আহমাদ, হাদিস: ৮৯৫২

[103] বুখারি, হাদিস: ৩৪৪৫; আহমদ: ১৫৪

[104] মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৩৫৯৬

[105] আল- আরাফ, আয়াত: ১৮৮

[106] তিরমিয, হাদিস: ২৭৫৪

[107] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮১৮

[108] বুখারী, হাদিস: ২৫৬৮

[109] মুসলিম, হাদিস: ৯১

[110] বুখারী, হাদিস: ৫৭৮৯: মুসলিম, হাদিস: ৬২২

[111] বুখারি, হাদিস: ৬০৫০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৬১

[112] মুসলিম, হাদিস: ২৩০৯

[113] বুখারী, হাদিস: ৬৩৪

[114] মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮

[115] আহমদ, হাদিস: ২৪৯৮৫

[116] বুখারী, হাদিস: ৬৯২৭; মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৩

[117] বুখারী, হাদিস: ২৫৮৫

[118] বুখারী, হাদিস: ৬১৩৫

[119] বুখারী, হাদিস: ১২৭৭

[120] বুখারী, হাদিস: ২৭৫০; মুসলিম, হাদিস: ১০৫২

[121] বুখারী, হাদিস: ৬০৩৪

[122] বুখারী, হাদিস: ৩০৩৫

[123] তিরমিযী, হাদিস: ৩৬৪১

[124] তিরমিযী, হাদিস: ১৯৫৬

[125] আবু নাঈম ফিদ দালায়েল

[126] মুসলিম, হাদিস: ২০৯০

[127] বুখারী, হাদিস: ১৩০৩

[128] ইবনে সাআদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ

[129] বুখারী, হাদিস: ১২৮৪

[130] বুখারী, হাদিস: ১৩০৩

[131] বুখারী, হাদিস: ৬২৪৭

[132] বুখারী, হাদিস: ৬৩৫৫

[133] সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদিস নং ৭০

[134] বুখারী, হাদিস: ৭৭

[135] তিরমিযী, হাদিস: ২৫১৬

[136] আহমাদ, হাদিস: ২৫৭১৫

[137] মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮

[138] হাদীসটি বাগবী তার শারহুস সুন্নায় বর্ণনা করেন, এবং আলবানী তা সহীহ বলেন

[139] বুখারী, হাদিস: ৬১২৮

[140] বুখারী, হাদিস:৩২৩১; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯৫

[141] বুখারী, হাদিস: ৬৯২৯; মুসলিম, হাদিস: ১৭৯২

[142] নাসায়ী, হাদিস: ১৪৫৬

[143] তিরমিযী, হাদিস: ২৩৫৬

[144] মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০

[145] মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০

[146] তিরমিযী, হাদিস: ২৩৬০

[147] বুখারি, হাদিস: ১৪৩০

[148] মুসলিম, হাদিস: ২৩১২

[149] বুখারী, হাদিস: ৬৪৫০

[150] তিরমিযি, হাদিস: ৭৩৪

[151] বুখারী, হাদিস: ২৫৬৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৭২

[152] বুখারী, হাদিস: ৩৫৩৬; মুসলিম, হাদিস: ২০৬৪

[153] মুসলিম, হাদিস: ১৪০১; নাসায়ী, হাদিস: ৩২১৭

[154] মাজমুউল ফাতাওয়া ২২/৩১০ সংক্ষেপিত

[155] বুখারী, হাদিস: ৫৪০১; মুসলিম, হাদিস: ৩৩

[156] বুখারী, হাদিস: ২৫৫৪

[157] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৭৫

[158] আহমাদ, হাদিস: ২৭৬০৯

[159] মুসলিম, হাদিস: ৩৭৩

[160] আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬

[161] বুখারী, হাদিস: ৬৩০৭

[162] আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৬

[163] তিরমিযী, হাদিস: ২১৪০

[164] বুখারী, ৬০১৪; মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫

[165] মুসলিম, হাদিস: ২৬২৫

[166] মুসলিম, হাদিস: ৪৬

[167] মুসলিম, হাদিস: ৪৭

[168] আবু দাউদ: হাদিস: ৪৭৮৮

[169] আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৯

[170] আহমদ, হাদিস: ৩৯৩৮

[171] বুখারী, হাদিস: ৫০৬৩; মুসলিম, হাদিস: ১৪০১

[172] মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮

[173] সূরা সাদ, আয়াত:

[174] যুমার, আয়াত:

[175] সূরা সাবা, আয়াত: ২৪

[176] সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৭২

[177] মুসলিম, হাদিস: ১৭৯০

[178] মুসলিম, হাদিস: ১৭৭৬; বুখারি, হাদিস: ২৮৭৪

[179] বাগাবী শরহে সুন্নাতে বর্ণনা করেছেন, এবং দেখুন: সহীহ মুসলিম ৩/১৪০১

[180] তিরমিযী, হাদিস: ২৪৭২; আহমাদ, হাদিস: ১৪০৫৫

[181] মুসলিম, হাদিস: ১৬৩৫

[182] তিরমিযী, হাদিস: ২৯৬৯

[183] মুসলিম, হাদিস: ২৭২০

[184] আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৩

[185] তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৬৩

[186] তিরমিযি, হাদিস: ৩৪৯৬; ইবনু মাযাহ, হাদিস: ১৬১৯

[187] সূরা আহযাব, আয়াত: ৫৬

[188] আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ এবং আলবানী সহীহ বলেছেন

[189] ইবনে মাযাহ, হাদিস: ১৬৩৭, ১৬৩৬

[190] তিরমিযী, হাদিস: ৩৩৮০

[191] আস সিয়ার: ১১/২১৩

[192] আস সিয়ার: ৭/২৪২ ও ইমাম আহমাদের কিতাবুয যহদ ৩৫৫ পৃষ্ঠা

[193] বুখারী, হাদিস: ৭২৮০

আপনার মতামত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ