এটা বাৰ্তা মাথোন

চমু বিৱৰণ

এটা বাৰ্তা মাথোন। এই পুস্তিকাত তাওহীদৰ অভিন্ন বাৰ্তা সম্পৰ্কে আলোচনা কৰা হৈছে, যিটো সকলো নবী আৰু ৰাছুলে প্ৰচাৰ কৰিছে, সেই আদম আলাইহিচ ছালামৰ পৰা আদি কৰি আমাৰ প্ৰিয় নবী মুহাম্মাদ চাল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম পৰ্যন্ত।
এই পুথিৰ বিশেষ এটা বৈশিষ্ট্য হৈছে, বৰ্তমান ইয়াহূদী আৰু খ্ৰীস্টানসকলৰ হাতত থকা বাইবেল (ৱল্ড টেস্টামেন্ট আৰু নিউ টেস্টামেন্ট)-ৰ আলোকত আল্লাহৰ তাওহীদ প্ৰমাণ কৰা হৈছে।

Download
ৱেব মাস্টাৰলৈ এটা বাৰ্তা প্ৰেৰণ কৰক

বিস্তাৰিত বিৱৰণী

দীনের ফিক্হ তথা জ্ঞানই ফিতনা থেকে বাঁচার সঠিক উপায়

الفقه في الدين عصمة من الفتن

< بنغالي >

শাইখ সালেহ ইবন ফাওযান আল-ফাওযান

—™

অনুবাদক: জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া


الفقه في الدين عصمة من الفتن

الشيخ صالح بن فوزان الفوزان

—™

ترجمة: ذاكرالله أبوالخير

مراجعة: د/ أبو بكر محمد زكريا


ভূমিকা

এ ছোট পুস্তিকাটি মূলত শেখ সালেহ ইবন ফাওযান আল-ফাওযান রহ. এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। এ ভাষণে তিনি দুনিয়াতে সংঘটিত হয় এ ধরনের বিভিন্ন ফিতনা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সাথে সাথে ফিতনা হতে বাঁচার উপায় সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরেছেন। বর্তমান ফিতনা ফ্যাসাদের যুগে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি বিবেচনা করে তা অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষীর জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করি। যাতে ফিতনার সময় করনীয় কি তা জানতে পারি এবং ফিতনা থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি। আল্লাহ আমার এ চেষ্টাকে কবুল করুন এবং পাঠকদের এ দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। তবে ভাষণটিতে একটি আয়াতকে একাধিক বার আনাতে বিভিন্নস্থানে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো স্থানে হুবহু অনুবাদ না করে ভাবানুবাদ করা হয়েছে। যাতে বিষয়টি বুঝতে সহজ হয়। আল্লাহ আমাদের বুঝা ও আমল করার তাওফিক দিন। আমীন

অনুবাদক

জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের


ইসলামী জ্ঞানই ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, যাকে প্রেরণ করা হয়েছে সৃষ্টিকুলের জন্য রহমতস্বরূপ। আর সালাত ও সালাম প্রেরিত হোক তার ওপর, তার পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম ও যারা কেয়ামত অবধি তার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরে এবং তার তরীকার ওপর চলে তাদের ওপর।

অতঃপর....

ইসলামের মতো মহান নি'আমত দিয়ে আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি দয়া ও ইহসান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٢﴾ [ال عمران: ١٠٢]

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর যথাযথ তাকওয়া অবলম্বন কর। আর তোমরা মুসলিম হওয়া ছাড়া মারা যেও না"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,

﴿وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ وَٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡ إِذۡ كُنتُمۡ أَعۡدَآءٗ فَأَلَّفَ بَيۡنَ قُلُوبِكُمۡ فَأَصۡبَحۡتُم بِنِعۡمَتِهِۦٓ إِخۡوَٰنٗا وَكُنتُمۡ عَلَىٰ شَفَا حُفۡرَةٖ مِّنَ ٱلنَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنۡهَاۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمۡ ءَايَٰتِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ ١٠٣﴾ [ال عمران: ١٠٣]

“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নি'আমতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বয়ান করেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]

আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٠٤﴾ [ال عمران: ١٠٤]

“আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪]

﴿وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ تَفَرَّقُواْ وَٱخۡتَلَفُواْ مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ ٱلۡبَيِّنَٰتُۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ١٠٥﴾ [ال عمران: ١٠٥]

“আর তোমরা তাদের মতো হইও না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৫]

আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ ٣﴾ [المائدة: ٣]

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নি'আমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে"[সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]

﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ وَمَا ٱخۡتَلَفَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ ٱلۡعِلۡمُ بَغۡيَۢا بَيۡنَهُمۡۗ وَمَن يَكۡفُرۡ بَِٔايَٰتِ ٱللَّهِ فَإِنَّ ٱللَّهَ سَرِيعُ ٱلۡحِسَابِ ١٩﴾ [ال عمران: ١٩]

“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট দীন হচ্ছে ইসলাম। আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের নিকট জ্ঞান আসার পরই তারা মতানৈক্য করেছে, পরস্পর বিদ্বেষ বশতঃ। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফুরি করে, নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে দ্রুত"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯]

﴿وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥﴾ [ال عمران: ٨٥]

“আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন চায়, তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫]

﴿وَجَٰهِدُواْ فِي ٱللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِۦۚ هُوَ ٱجۡتَبَىٰكُمۡ وَمَا جَعَلَ عَلَيۡكُمۡ فِي ٱلدِّينِ مِنۡ حَرَجٖۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٰهِيمَۚ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ مِن قَبۡلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ ٱلرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيۡكُمۡ وَتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِۚ فَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱعۡتَصِمُواْ بِٱللَّهِ هُوَ مَوۡلَىٰكُمۡۖ فَنِعۡمَ ٱلۡمَوۡلَىٰ وَنِعۡمَ ٱلنَّصِيرُ ٧٨﴾ [الحج : ٧٨]

“আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর যেভাবে জিহাদ করা উচিৎ। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের ওপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নি। এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দীন। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন 'মুসলিম' পূর্বে এবং এ কিতাবেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় আর তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও। অতএব, তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে ধর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। আর তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক এবং কতই না উত্তম সাহায্যকারী"! [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৭৮]

ইসলাম আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দাদের প্রতি এমন একটি মহান নি'আমত, দুনিয়াতে আর কোনো নি'আমত ইসলামের সমান হতে পারে না। যদিও আল্লাহ তা'আলার কোনো নি'আমতকেই অস্বীকার করা, ছোট মনে করা বা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তথাপিও ইসলামই হলো সবচেয়ে বড় ও মহান নি'আমত। ইসলামকে দুনিয়াতে কায়েম করা ও তার প্রতি দাওয়াত দেওয়ার জন্যই দুনিয়াতে আল্লাহ তা'আলা অসংখ্য নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও আল্লাহ তা'আলা ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্যই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। দুনিয়াতে ইসলামকে বিজয়ী করে দেখিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿لَقَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ بَعَثَ فِيهِمۡ رَسُولٗا مِّنۡ أَنفُسِهِمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ١٦٤﴾ [ال عمران: ١٦٤]

“অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতোপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৪]

ইসলাম এত বড় ও মহান নি'আমত হওয়া স্বত্বেও মানুষকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখা বা ইসলাম বিমুখ করার অসংখ্য অনুসর্গ ও কারণও দুনিয়াতে বিদ্যমান রয়েছে যা একজন মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় –যদিও সে ইসলামের যোগ্য- অথবা তার অন্তরে ইসলামকে দুর্বল করে দেয় বা তাকে ইসলাম গ্রহণ করা হতে বিরত রেখে কাফের মুশরিকে রূপান্তরিত করে- যদিও সে তার যোগ্য না হয়। এ সব অনুসর্গ ও কারণগুলো একজন মানুষের জন্য মহা পরীক্ষা- যার সম্মুখীন দুনিয়াতে তাকে হতেই হয়। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে, কোন কর্ম করলে ইসলাম থেকে বের হয়, সে বিষয়গুলো যেমন জানা জরুরি তেমনিভাবে যেগুলো ইসলামে প্রবেশের পথে বাধা বা ইসলামকে মানুষের অন্তরে দুর্বল করে দেয়, সে বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকাও জরুরি। যাতে এ বিষয়গুলো থেকে সতর্ক থাকা যায়।

এ কারণেই বিশিষ্ট সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ভালো ভালো আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত, আমি খারাপ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম, এভয়ে যে তা আমাকে পেয়ে বসবে।

প্রথমে ইসলাম জানা, ইসলামের বিধি-বিধান ও আহকাম জানা ওয়াজিব। তারপর যে বিষয়গুলো মানুষকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখে এবং বান্দার মাঝে ও ইসলামের মাঝে বাধা হয় বা মানুষের অন্তরে ইসলামকে দুর্বল করে দেয়, তা জানা ওয়াজিব। ইসলামের জন্য ক্ষতিকর বিষয় ও ইসলামের পথে বাধাগুলো নির্ণয় করা খুবই জরুরি, যাতে উপকারী বিষয়গুলোর ওপর আমল করা যায় এবং ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত থাকা যায়। কারণ, যখন কোনো বান্দা ক্ষতিকর, গোমরাহী বিষয়গুলো সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তা তাকে তার অজান্তে ধ্বংস করে ফেলতে এবং দীন ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অথচ আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদেরকে আমরণ ইসলামের ওপর অটুট ও অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٢﴾ [ال عمران: ١٠٢]

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর যথার্থ তাকওয়া অবলম্বন কর। আর তোমরা মুসলিম হওয়া ছাড়া মারা যেও না"[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২]

ইসলামের ওপর অটুট-অবিচল থাকা মানুষের শক্তি বা বাহুবল দ্বারা নয়, তা কেবলই আল্লাহর মহান কুদরত ও তাওফীক অনুযায়ীই হয়ে থাকে। আমরা নিজেরা আমরণ ইসলামের ওপর বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখি না। এ ক্ষমতা পুরোটাই আল্লাহর হাতে। এ কথার অর্থ, আমরা মৃত্যু পর্যন্ত ঐ সব কর্মগুলোই করব যেগুলো আমাদের ইসলামের ওপর আমরণ বেঁচে থাকাকে নিশ্চিত করে। আমরা যখন ঐ সব কর্মগুলো করব, তখন আল্লাহ তা'আলা তার স্বীয় রহমত, কুদরত ও দয়া দ্বারা তার নি'আমতকে পরিপূর্ণ করবেন, আমরণ ইসলামের ওপর বহাল রাখবেন এবং ইসলামের ওপর মৃত্যু দান করবেন। কারণ, আমরা মুক্তি বা নাজাতের জন্য চেষ্টা করছি, যাবতীয় সব উপায় ও অবলম্বন গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহ তা'আলা যখন কোনো বান্দার মধ্যে চেষ্টা, আগ্রহ ও ভালো কর্মের প্রতি আগ্রহ এবং অপকর্মের প্রতি অনীহা, ঘৃণা ও ভীতি দেখেন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে হেফাজত করেন, কুফর থেকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং তার জন্য দীন পালনকে সহজ করেন, যাবতীয় কল্যাণ নিশ্চিত করেন।

আর আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মধ্যে ভালো কর্মের প্রতি অনীহা ও অনাগ্রহ দেখেন, ভালো কর্মের প্রতি ঘৃণা লক্ষ্য করেন এবং অন্যায়-অনাচার ও খারাপ কর্মকে পছন্দ করার মানসিকতা দেখেন, তাকে শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ সেই পথে পরিচালনা করবেন যে পথ সে অবলম্বন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا ١١٥ ﴾ [النساء : ١١٥]

“আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফিরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ"[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫]

সুতরাং কারণটি বান্দার পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে। সে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করছে, মুমিনদের পথ বাদ দিয়ে অন্যদের পথের অনুসরণ করছে। ফলে শাস্তির কারণটি তার পক্ষ থেকে ছিল। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল শাস্তি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا﴾ [النساء : ١١٥]

“আমি তাকে ফিরাব সেদিকে যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ"[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫]

আর الفتن শব্দটি الفتنة শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হলো, পরীক্ষা। যাতে কারা সত্যিকার ঈমাদার আর কারা মুনাফেক, তা স্পষ্ট হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ فَإِذَآ أُوذِيَ فِي ٱللَّهِ جَعَلَ فِتۡنَةَ ٱلنَّاسِ كَعَذَابِ ٱللَّهِۖ وَلَئِن جَآءَ نَصۡرٞ مِّن رَّبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمۡۚ أَوَ لَيۡسَ ٱللَّهُ بِأَعۡلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٠﴾ [العنكبوت: ١٠]

“আর কিছু লোক আছে যারা বলে, 'আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি', অতঃপর যখন আল্লাহর ব্যাপারে তাদের কষ্ট দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের নিপীড়ন-পরীক্ষাকে আল্লাহর আযাবের মতো গণ্য করে। আর যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো বিজয় আসে, তখন অবশ্যই তারা বলে, 'নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে ছিলাম'। সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহে যা কিছু আছে আল্লাহ কি তা সম্পর্কে সম্যক অবগত নন"? [সূরা আল-আন'কাবুত, আয়াত: ১০]

দুনিয়াতে হকের ওপর অটুট থাকার ফলে দুনিয়াতে যে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় সে পরীক্ষায় মুনাফেকরা ধৈর্য ধারণ করে না; বরং তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হলে দীন থেকে পলায়ন করে এবং দীনের পথে যে সব প্রতিবন্ধক রয়েছে তার অনুসরণ করে। তারা ধারণা করে- এ দ্বারা নাজাত পাবে। না, নাজাত-তো তারা পাবেই না বরং তারা ছোট বিপদ থেকে পলায়ন করে আরও বড় বিপদকে ডেকে আনল। যেমন, এক ব্যক্তি কয়লার ভয়ে পলায়ন করে আগুনে ঝাঁপ দিল। তারা মানুষের দেওয়া কষ্ট ও যুলুম-নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মতোই ভয় করল। মানুষের কষ্ট বা যুলুম-নির্যাতন কি কখনো আল্লাহর আযাবের সমান হতে পারে?! যখন কোনো ব্যক্তি দীন ছেড়ে পলায়ন করে এবং ফিতনাকারীদের অনুসরণ করে, তখন সে আল্লাহর আযাবের দিকেই ধাবিত হয়। আর যদি লোকটি মানুষের কষ্ট ও যুলুম-নির্যাতনের ওপর ধৈর্য ধারণ করে এবং দীনের ওপর অটুট ও অবিচল থাকে, তখন তার এ কষ্ট হবে সাময়িক ও ক্ষণিকের জন্য। অচিরেই সে মুক্তি পাবে এবং পরিণতি হবে শুভ ও আরামদায়ক। কিন্তু যখন কোনো বান্দা উল্টো পথে হাঁটবে- মানুষের কষ্টের ওপর ধৈর্য ধরবে না এবং আল্লাহর হুকুমের অবাধ্যতায় ফিতনাকারীদের অনুকরণ করবে, তারা যে দিকে আহ্বান করে (কুফর ও শির্ক) সাড়া দেয়, তখন সে আল্লাহর কঠিন আযাবের দিকেই ধাবিত হয়।

মোটকথা, ফিতনা হলো, পরীক্ষা। ফিতনা দ্বারা পরীক্ষা করা হয়, কে সত্যিকার মুমিন এবং কে সত্যিকার মুমিন নয়? কে তার আকীদা-বিশ্বাসের ওপর অটুট ও অবিচল আর কে মুনাফেক? (দুই নৌকায় পা রাখে) প্রথম ধাক্কাতেই সে ঈমান ও বিশ্বাস থেকে ছিটকে পড়ে -তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

ফিকহ:

ফিকহ শব্দের আভিধানিক অর্থ, বুঝা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নতে যে সব শরী'আতের বিধান বর্ণিত, তা জানা ও বুঝাকে ফিকহ বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা মানব জাতির হিদায়াতের জন্য কুরআন নাযিল করেন। তাতে রয়েছে মানব জাতির জন্য হিদায়াত, দুনিয়ার জীবনে চলার জন্য যা দরকার তার সব কিছুর সমাধান ও বর্ণনা। একজন বান্দা তার দীনের বিষয়ে যত কিছুর মুখাপেক্ষী হয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে যা কিছু তার সাহায্যকারী, তার সব কিছুই রয়েছে এ কিতাব তথা কুরআনে। আল্লাহ তা'আলা এ কিতাবকে মানব জাতির হিদায়াতের গ্যারান্টিস্বরূপ নাযিল করেছেন। মানবজাতির হিদায়াতের জন্য এটিই যথেষ্ট। পবিত্র কুরআনের সাথে সাথে রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, যা কুরআনের ব্যাখ্যা বা তাফসীর। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ إِلَّا رِجَالٗا نُّوحِيٓ إِلَيۡهِمۡۖ فَسَۡٔلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ٤٣﴾ [النحل: ٤٣]

“আর আমরা তোমার পূর্বে কেবল পুরুষদেরকেই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাদের প্রতি আমরা অহী পাঠিয়েছি। সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো"[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩]

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের নিকট প্রেরিত দূত, বর্ণনাকারী, মুবাল্লিগ ও এ মহা গ্রন্থ আল-কুরআ- কিতাবের ব্যাখ্যাদানকারী। আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস একটি অপরটির সম্পূরক। এ দু'টির মধ্যেই রয়েছে মানবজাতির জন্য হিদায়াত, ভালো ও মন্দের সঠিক দিক নির্দেশনা, হিদায়াত ও গোমরাহীর পরিচয়।

দীনের বুঝ বা ফিকহ ফিদ-দীন হলো, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নত থেকে আমাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান জানা ও বুঝা। যাতে আমরা বাস্তব জীবনে যে সব ফিতনা ফ্যাসাদের সম্মুখীন হই, তা হতে বাঁচতে পারি এবং নাজাত বা মুক্তির পথ অবলম্বন করতে পারি। একেই বলা হয় ফিকহ ফিদ-দীন। আল্লাহ তা'আলা আমাদের ফিকহ ফিদ-দীন হাসিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর যাদের মধ্যে ফিকহ ফিদ-দীন নেই তাদের নিন্দা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمَا كَانَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لِيَنفِرُواْ كَآفَّةٗۚ فَلَوۡلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرۡقَةٖ مِّنۡهُمۡ طَآئِفَةٞ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِي ٱلدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوۡمَهُمۡ إِذَا رَجَعُوٓاْ إِلَيۡهِمۡ لَعَلَّهُمۡ يَحۡذَرُونَ ١٢٢﴾ [التَّوۡبَةِ:٢٢ ١]

“আর মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে অভিযানে বের হবে। অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে"[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২২]

মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তারা বুঝে না। অর্থাৎ তারা আল্লাহর আহকাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখে না। কারণ, তারা আল্লাহর কিতাবকে গুরুত্ব দেয় না, আল্লাহর কিতাবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না এবং আল্লাহর কিতাবের দিক ফিরে তাকায় না। ফলে তারা আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে অন্ধকারে থাকে।

মনে রাখবে, শেষ জামানায় দুনিয়াতে অনেক বড় বড় ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং নতুন নতুন ফিতনার আবির্ভাব ঘটবে। তখন মানুষ ফিতনার মধ্যেই জীবন যাপন করবে -ফিতনার বাইরে কেউ থাকতে পারবে না। কেউ হয়তো কম ফিতনার সম্মুখীন হবে আবার কেউ অধিক ফিতনার সম্মুখীন হবে; কিন্তু ফিতনা থেকে কেউ নিরাপদ থাকতে পারবে না।

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে করীমে বিভিন্ন ফিতনা সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা'আলা ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততিকে ফিতনা বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿إِنَّمَآ أَمۡوَٰلُكُمۡ وَأَوۡلَٰدُكُمۡ فِتۡنَةٞۚ وَٱللَّهُ عِندَهُۥٓ أَجۡرٌ عَظِيمٞ ١٥﴾ [التغابن: ١٥]

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান"[সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১৫]

ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ফিতনা বা পরীক্ষা। যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘর-বাড়ি, গোত্র ও মাতৃভূমির মহব্বতকে আল্লাহ ও তার রাসূলের মহব্বতের তুলনায় অধিক বেশি প্রাধান্য দেয়, সে আল্লাহর এ পরীক্ষায় ফেল করল। সে যেন তার পরিণতির প্রতীক্ষায় থাকে। অপর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُوٓاْ ءَابَآءَكُمۡ وَإِخۡوَٰنَكُمۡ أَوۡلِيَآءَ إِنِ ٱسۡتَحَبُّواْ ٱلۡكُفۡرَ عَلَى ٱلۡإِيمَٰنِۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٢٣﴾ [التَّوۡبَةِ: ٤ ٢]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজদের পিতা ও ভাইদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরিকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারাই যালিম"[সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৪]

আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীকেও ফিতনা বলে আখ্যায়িত করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ مِنۡ أَزۡوَٰجِكُمۡ وَأَوۡلَٰدِكُمۡ عَدُوّٗا لَّكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُمۡۚ وَإِن تَعۡفُواْ وَتَصۡفَحُواْ وَتَغۡفِرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٌ ١٤﴾ [التغابن : ١٤]

“হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন।[1] অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর যদি তোমরা মার্জনা কর, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু"। [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ৪]

তোমরা স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মহব্বতকে আল্লাহ ও তার রাসূলের মহব্বতের ওপর প্রাধান্য দেবে না। আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যর ওপর কারও আনুগত্য করাকে অগ্রাধিকার দেবে না। আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিপরীতে তাদের কোনো কর্মের পাবন্দী করবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّ مِنۡ أَزۡوَٰجِكُمۡ وَأَوۡلَٰدِكُمۡ عَدُوّٗا لَّكُمۡ فَٱحۡذَرُوهُمۡۚ﴾ [التغابن: ١٤]

“হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর"[সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১৪]

আল্লাহ তা'আলার বাণী احذروهم কথার অর্থ এ নয়, তোমরা তাদের সাহায্য সহযোগিতা করো না, তাদের থেকে তোমরা দূরে থাক, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন কর এবং তাদের সাথে উঠ-বস থেকে বিরত থাক; বরং এর অর্থ, যখন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বতের সাথে তাদের মহব্বতের টক্কর লাগে, তখন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মহব্বতকে স্ত্রী-সন্তান, ধন-দৌলত ইত্যাদির মহব্বতের ওপর প্রাধান্য দেবে। তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি ইত্যাদিকে সঠিক পথে পরিচালনা করবেন এবং তোমাদের আমলকে সংশোধন করে দেবেন। এ ক্ষেত্রে একজন মুসলিমর জন্য ওয়াজিব হলো, সে যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করবে। যখন আল্লাহর মহব্বতের সাথে ছেলে-সন্তান, স্ত্রী ও ধন-সম্পদের মহব্বতের সাথে সংঘর্ষ হয়, তখন আল্লাহর মহব্বতের ওপর কারও মহব্বতকে প্রাধান্য দেবে না। আল্লাহর মহব্বতকেই প্রাধান্য দেবে।

কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরীক্ষা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿كُلُّ نَفۡسٖ ذَآئِقَةُ ٱلۡمَوۡتِۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٣٥[الانبياء: ٣٥]

“প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, আর ভালো-মন্দ দ্বারা আমরা তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমাদের কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে"[সূরা আল-আম্বিয়া আয়াত: ৩৫]

আয়াতে কল্যাণ বলতে ধন-সম্পদ, বৃষ্টি, ফসল ও যাবতীয় নি'আমত বুঝানো হয়েছে। আর অকল্যাণ বলতে অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ, অসুস্থতা ইত্যাদি বিপদ-আপদকে বুঝানো হয়েছে। উল্লিখিত কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়টিই মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষাস্বরূপ। মানুষ একদিন আল্লাহ কাছেই ফিরে যাবেন। তাদের কাউকে স্বাধীনভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।

অনুরূপভাবে আল্লাহর আনুগত্য করা, নাফরমানী করা উভয়টিই মানুষের জন্য ফিতনা-পরীক্ষা। মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য করার আদেশ দেওয়া ও নাফরমানি করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করা পরীক্ষা হওয়ার কারণ, যখন মসজিদে সালাতের আযান হয়, তখন একজন মানুষের সামনে বিভিন্ন ব্যস্ততা দেখা দেয়। যেমন, ভালো ভালো খাবার সামনে থাকে, খেলা-ধুলায় মগ্ন থাকে ও বিভিন্ন উপভোগ্য বিষয়াবলী তার সামনে উপস্থিত হয়, তখন সে কোনটিকে প্রাধান্য দেয়, সালাত নাকি সালাতের প্রতিবন্ধক বিষয়াবলী? এটি মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে একটি কঠিন পরীক্ষা। (যদি আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেয়, তবে সে পরীক্ষায় পাশ। আর যদি সাড়া না দেয় তবে সে পরীক্ষায় ফেল।)

মানুষ মানুষের জন্য ফিতনা:

অনুরূপভাবে মানুষ নিজেরা একে অপরের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا قَبۡلَكَ مِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ إِلَّآ إِنَّهُمۡ لَيَأۡكُلُونَ ٱلطَّعَامَ وَيَمۡشُونَ فِي ٱلۡأَسۡوَاقِۗ وَجَعَلۡنَا بَعۡضَكُمۡ لِبَعۡضٖ فِتۡنَةً أَتَصۡبِرُونَۗ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيرٗا ٢٠﴾ [الفرقان: ٢٠]

“আর তোমার পূর্বে যত নবী আমরা পাঠিয়েছি, তারা সবাই আহার করত এবং হাট-বাজারে চলাফেরা করত। আমরা তোমাদের একজনকে অপরজনের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ করেছি। তোমরা কি ধৈর্যধারণ করবে? আর তোমার রব সর্বদ্রষ্টা"[সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২০]

আল্লাহ তা'আলা কতক মানুষকে কতক মানুষ দ্বারা পরীক্ষা করেন। মুমিনকে কাফের দ্বারা পরীক্ষা করেন। আবার কখনো মুমিনকে মুমিন দ্বারাও পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱتَّبَعُواْ ٱلۡبَٰطِلَ وَأَنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّبَعُواْ ٱلۡحَقَّ مِن رَّبِّهِمۡۚ كَذَٰلِكَ يَضۡرِبُ ٱللَّهُ لِلنَّاسِ أَمۡثَٰلَهُمۡ ٣﴾ [محمد : ٣]

“তা এ জন্য যে, যারা কুফরি করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে, আর যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের প্রেরিত হকের অনুসরণ করে। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন"[সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ৩]

অনেক সময় মুমিন-মুসলিমকে তাদের শত্রু কাফের, মুশরিক, মুনাফেক ও অবাধ্যদের দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। কাফের, মুশরিক যারা আল্লাহর শত্রু তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, ভালো কাজের আদেশ ও অসৎ কর্ম হতে নিষেধ করা, তাদের বিপক্ষে জিহাদ করা অথবা তা না করে তাদের আনুগত্য করা, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ইত্যাদি দ্বারা মুমিনদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। যদি মুমিনরা তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কর্ম থেকে নিষেধ করে এবং তাদের বিপক্ষে জিহাদে অংশ গ্রহণ করে, তাহলে তারা কল্যাণের ওপর থাকবে এবং পরীক্ষায় সফল। আর যদি তাদের আনুগত্য স্বীকার করে, তাদের অনুকরণ করে, তাদের সাথে গা ভাসিয়ে দেয় এবং তাদের বিপক্ষে কোনো কথা বলে না, তাদের সৎ কর্মের আদেশ দেয় না, অসৎ কর্ম হতে নিষেধ করে না, তাহলে তারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য, তারা ক্ষতির মধ্যে রয়েছে এবং আল্লাহর পরীক্ষায় তারা ফেল করল। তাদের দাওয়াত না দেওয়া, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কর্ম থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ না দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জিহাদ না করা দ্বারা বুঝা গেল, তাদের ঈমান দুর্বল। তারা ঈমানী পরীক্ষায় ফেল।

ধনীকে গরীব দ্বারা পরীক্ষা:

অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা ধনীকে গরীব দ্বারা পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَكَذَٰلِكَ فَتَنَّا بَعۡضَهُم بِبَعۡضٖ لِّيَقُولُوٓاْ أَهَٰٓؤُلَآءِ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنۢ بَيۡنِنَآۗ أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِأَعۡلَمَ بِٱلشَّٰكِرِينَ ٥٣﴾ [الانعام: ٥٣]

“আর এভাবেই আমরা এককে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা বলে, 'এরাই কি, আমাদের মধ্যে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়"? [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৩]

কাফেররা গরীব অসহায় মুসলিমদের ঘৃণা করে। তারা বলে- أَهَٰٓؤُلَآءِ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنۢ بَيۡنِنَآ “আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের বাদ দিয়ে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন"? তারা গরীব-মিসকীন, তাদের হাতে ধন-সম্পদ, টাকা পয়সা কিছুই নেই। তারা কীভাবে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, আর আমরা গোমরাহ? আমরা হলাম সম্পদশালী, ধনাঢ্য, ক্ষমতাধর, বুদ্ধিমান ও সিদ্ধান্তদাতা। আর তারা ফকীর-মিসকীন ও গরীব। তা স্বত্বেও তারা কিভাবে বলে তারা আমাদের থেকে উত্তম- তাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলা দয়া করেছেন? আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার উত্তরে বলেন,

﴿أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِأَعۡلَمَ بِٱلشَّٰكِرِينَ ٥٣﴾ [الانعام: ٥٣]

“আল্লাহ তা'আলা কি যারা কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি পূর্ণ জ্ঞাত নয়"? [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৩]

আল্লাহ তা'আলা তোমাদের বাহ্যিক লক্ষ্য করেন না। অন্তর ও আমলের প্রতি লক্ষ্য করেন। ফকীর-মিসকিন কৃতজ্ঞ, আল্লাহতে বিশ্বাসকারী এবং কল্যাণকামীরাই আল্লাহর বন্ধু। আর অহংকারী ও হঠকারী, সত্য বিমুখ যে ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও পার্থিব ইজ্জত-সম্মান লাভে বিভোর হয়ে, হক তথা সত্যকে গ্রহণ করে না- ঐ লোক আল্লাহর নিকট কখনও তাদের মতো হতে পারে না, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং নেক আমল করে। যদিও সে মনে মনে নিজেকে অনেক কিছু মনে করে বা নিজেকে মুমিনদের চেয়ে বড় মনে করে। কিন্তু আল্লাহর নিকট সে মূল্যহীন- তার কোনো দাম নেই। কারণ, তাদের মানদণ্ড হলো, ধন-সম্পদ, মাল-দৌলত, ক্ষমতা ও পার্থিব বিষয়সমূহ। ঈমান ও নেক আমল তাদের নিকট গুরুত্বহীন তা কখনো তাদের নিকট মানদণ্ড নয়। আর আল্লাহ তা'আলার নিকট মানদণ্ড হলো, মানুষের ঈমান ও আমল। আল্লাহ তা'আলা কখনো মানুষের বাহ্যিক আকার আকৃতি দেখেন না। ولكن ينظر إلى قلوبكم وأعمالكم “তবে আল্লাহ তা'আলা মানুষের অন্তর ও আমলের দিকেই দেখেন"[2] আল্লাহ তা'আলা যাকে পছন্দ করেন তাকেও দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা দেন আবার যাকে অপছন্দ করেন তাকেও দেন। আর ঈমান ও আমলে সালেহের তাওফিক শুধু তাদেরই দেন, যাদের আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন।

দলাদলি ও মতবিরোধের ফিতনা:

অনুরূপভাবে আরও একটি বড় ধরনের ফিতনা হলো, দলাদলি, মতবিরোধ, বিভক্তি ও বিভাজন। বিভিন্ন দল উপদলে উম্মতের বিভক্তি, ফিরকা-বন্দী, দলাদলি ইত্যাদি বড় ধরনের একটি ফিতনা। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে সংবাদ দিয়েছেন এবং অধিক সতর্ক করেছেন। ইরবাদ্ব ইবন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিক নির্দেশনাও রয়েছে। ঐ হাদীসে বর্ণিত যে, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মাঝে ওয়াজ করেন, সে ওয়াজের বর্ণনায় সাহাবী ইরবাদ্ব ইবনে সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তিনি আমাদের এমন ভাষণ দিলেন যাতে আমাদের অন্তর বিগলিত এবং চক্ষু অশ্রূসজল হলো। আমরা ভাষণ শুনে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ, আপনি আমাদের উপদেশ দিন। তখন তিনি বললেন, أوصيكم بتقوى الله، والسمع والطاعة “আমি তোমাদের অসীয়ত করি- তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, মুসলিম আমীরের আনুগত্য কর এবং তার কথা শোন"। কারণ, এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মতের ঐক্য, শক্তি ও শৌর্যবীর্য। মুসলিম জাতি যখন আমীরের নেতৃত্ব মেনে নেবে এবং তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, তখন মুসলিম জাতির ঐক্য অটুট থাকবে, তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তখন আর কেউ তাদের পরাভূত করতে পারবে না। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وإن تأمر عليكم عبد “যদিও তোমাদের ওপর একজন গোলামকেও আমীর বানানো হয়"। তার কথা শোন এবং তার আনুগত্য কর। তাকে খাট করে দেখবে না, হেয় করবে না। বরং যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর আনুগত্য ও তার রাসূলের অনুকরণ করার নির্দেশ দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তার আনুগত্য করবে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বলে ভবিষ্যতবাণী করেন যে, فإنه من يعش منكم فسيرى اختلافاً كثيراً “তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে উম্মতে মুসলিমার মধ্যে অধিকহারে মতবিরোধ, বিভক্তি ও মত পার্থক্য দেখতে পাবে"। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থেকে কিছুই বলেন নি, তিনি যা বলেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলেছেন। যে সম্পর্কে খবর দিয়েছেন কিয়ামতের পূর্বে তা অবশ্যই জমীনে বাস্তবায়িত হবে। তারপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মতবিরোধের পরিণতি থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কেও দিক নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন,

«فعليكم بسنتي، وسنة الخلفاء الراشدين المهديين من بعدي، تمسكوا بها وعَضُّوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور؛ فإن كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة».

“তখন তোমরা আমার সুন্নতকে এবং আমার পর হিদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে আঁকড়ে ধর। সুন্নততে খুব মজবুত করে ধর এবং তার ওপর তোমরা অবিচল থাক। আর তোমরা নব আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ -বিদআত- হতে বেঁচে থাক। কারণ, প্রতিটি নব আবিষ্কৃত বস্তুই বিদ'আত আর প্রত্যেক বিদআতই হলো গোমরাহী"[3]

এ ভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মতের পার্থক্য, বিভেদ-বিভাজন, বিভিন্ন ফিরকা বন্দী ও দলাদলি সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেন। আল্লাহর রাসূল সা. এ ধরনের ফিতনার সময় করণীয় সম্পর্কে আমাদের এ বলে নির্দেশ দেন, তোমরা তখন আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে আঁকড়ে ধরবে। কারণ, তখন এটাই ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকার একমাত্র উপায়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত এবং এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ হতে হাত ঘুটিয়ে নেবে, সে অবশ্যই এ সব ফিরকা-বাজদের সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতিটি ভাষণ ও আলোচনায় উম্মতকে ফিতনা ও বিদ'আত সম্পর্কে সতর্ক করতেন এবং ফিতনা হতে মুক্তির উপায় ও মাধ্যমগুলো- আল্লাহর কিতাব ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে আঁকড়ে ধরা- বলে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

»إن خير الحديث كتاب الله، وخير الهدي هدي محمد صلى الله عليه وسلم، وشر الأمور محدثاتها».

“সর্ব উত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম আদর্শ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় নব আবিষ্কৃত বিষয়াবলী"[4]

তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وعليكم بالجماعة “তোমরা মুসলিম জামা'আতের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাক"[5]

এটিও নাজাতের একটি অন্যতম পথ। যখন দলাদলি, গ্রুপিং ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়, তখন একজন মুসলিমের জন্য করনীয় হলো, সে মুসলিম জামা'আতের সাথে থাকবে। যে জামা'আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নতের ওপর চলে, তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। মুতাকাল্লিমীন তথা কালামশাস্ত্রবিদ, বিদ'আতী ও গোমরাহদের সাথে থাকবে না। যদিও তারা তাদেরকে হক বলে দাবী করে। ঈমানদারগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উপদেশ দিয়েছে তাই পালন করবে। তাতেই তারা নাজাত পাবে। উম্মতের বিভক্তি বিষয়ে অপর একটি হাদীস- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«افترقت اليهود على إحدى وسبعين فرقة، وافترقت النصارى على اثنتين وسبعين فرقة، وستفترق هذه الأمة على ثلاث وسبعين فرقة، كلها في النار إلا واحدة قيل: من هي يارسول الله؟ قال من كان على مثل ما أنا عليه اليوم وأصحابي».

“ইয়াহূদীরা একাত্তর দলে বিভক্ত। আর খৃষ্টানরা বাহাত্তর দলে বিভক্ত। আর এ উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। এক দল ছাড়া বাকী সবাই জাহান্নামী হবে। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল তারা কারা? তিনি বললেন, তারা হলো, যারা বর্তমানে আমি যার ওপর আছি এবং আমার সাহাবায়ে কিরাম যার ওপর আছেন তার ওপর অটল থাকবেন"[6]

এ কথাটিই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, وعليكم بالجماعة، فإن يد الله على الجماعة “তোমরা মুসলিম জামা'আতের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাক। কারণ, আল্লাহর সাহায্য জামা'আতের ওপরই থাকে"[7] আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণের আদর্শের ওপর যারা থাকবে তাদেরই কেবল জামা'আত বলা হয়। যদিও সংখ্যায় তারা কম। জামা'আত হওয়ার জন্য সংখ্যায় বেশি হওয়া শর্ত নয়, হকের ওপর থাকা শর্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿مَّن يُصۡرَفۡ عَنۡهُ يَوۡمَئِذٖ فَقَدۡ رَحِمَهُۥۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡمُبِينُ ١٦﴾ [الانعام: ١٦]

“সেদিন যার থেকে আযাব সরিয়ে নেওয়া হবে তাকেই তিনি অনুগ্রহ করবেন, আর এটিই প্রকাশ্য সফলতা"[সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৬]

মনে রাখবে, যারা ধারণার বশবর্তী হয়, তারা আল্লাহর পথ -সত্য থেকে দূরে সরে যায়। যদিও তাদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং তারা কোটি কোটি মানুষ। তারা সেই জামা'আত নয় যাদের সাথে থাকার জন্য হাদীসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা হকের ওপর থাকে তাদেরকেই জামা'আত বলা হয়, তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত দল, সাহায্যপ্রাপ্ত দল। যদিও তাদের সংখ্যা একজন বা খুব নগণ্য হয়। তারাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামা'আত। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لا تزال طائفة من أمتي على الحق ظاهرين، لا يضرهم من خذلهم ولا من خالفهم، حتى يأتي أمر الله تبارك وتعالى».

“আমার উম্মতের মধ্যে একটি জামা'আত সব সময় হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যারা তাদের অপমান-অপদস্থ ও বিরোধিতা করবে, তারা আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) না আসা পর্যন্ত তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না"[8]

তবে এর জন্য প্রয়োজন কঠিন ধৈর্য। কারণ, শেষ জামানায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের ওপর অবিচল থাকা এবং মুসলিম জামা'আতের সাথে থাকা খুবই কঠিন কাজ। তখন যারা আল্লাহর রাসূলের সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে এবং মুসলিম জামা'আতের সাথে থাকবে, তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের মুসিবত নেমে আসবে। তারা অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের মুসিবতের সম্মুখীন হবে। যেমন, হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন -

«أنه يحصل في آخر الزمان فتن، يكون القابض على دينه كالقابض على الجمر، أو على خبط الشوك».

“শেষ জামানায় বিভিন্ন ধরনের ফিতনা প্রকাশ পাবে। দীনের ওপর অবিচল থাকা জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখা অথবা লোহার কাঁটার ওপর দণ্ডায়মান থাকার ন্যায় কঠিন হবে"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«المتمسك بسنتي, عند فساد أمتي، له أجر خمسين، قالوا: منا أو منهم يارسول الله؟ قال: بل منكم»

“আমার উম্মতের গোমরাহীর সময় যে আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য পঞ্চাশ জন লোকের সাওয়াব মিলবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের থেকে পঞ্চাশ নাকি তাদের থেকে? তিনি বললেন, বরং তোমাদের থেকে"

সাহাবীগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় রাসূলের সাথে ছিলেন। রাসূল তাদের সহযোগী ছিল। (তাই তাদের জন্য সুন্নতের ওপর অবিচল-অটুট থাকা সহজ) কিন্তু শেষ জামানা এবং ফিতনার সময় সুন্নতের ওপর যারা অবিচল থাকবেন তাদের কোন সহযোগী নেই; বরং অধিকাংশ মানুষই তখন তাদের প্রতিপক্ষ। এমনকি যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করবেন তারাও তাদের বিরোধী হবে, তারা তাদের বিভিন্নভাবে অপমান-অপদস্থ করবে, কলঙ্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করবে। তখন অবশ্যই তাদের ধৈর্য ধরতে হবে। এ সময় যারা ধৈর্য ধরবে, আল্লাহ তা'আলা তাদের মহা বিনিময় দান করবে। কারণ, তারা ফিতনা ফ্যাসাদের সময় আল্লাহর দীনের ওপর অবিচল রয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে তাদের গুরাবা বলে আখ্যায়িত করে বলেন, طوبى للغرباء “সু-সংবাদ গুরাবাদের জন্যই" জিজ্ঞাসা করা হলো, গুরাবা কারা হে আল্লাহর রাসূল? উত্তরে বললেন, الذين يُصْلِحُون إذا فسد الناس “যারা মানুষকে সংশোধন করেন যখন মানুষ গোমরাহীতে পতিত হয়"

অপর বর্ণনায় বর্ণিত তিনি বলেন, يُصْلِحُون ما أفسد الناس

এ হাদীসগুলোর মাধ্যমে শেষ জামানায় সংঘটিত হবে, এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের করণীয় হলো, আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের হকের ওপর অবিচল রাখেন এবং মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করেন। তা ছাড়াও আমাদের করণীয় হলো, আমরা যেন হক ও হক পন্থীদের জানতে চেষ্টা করি এবং বাতিল ও বাতিল পন্থীদের থেকে সতর্ক থাকি। যাতে হক ও হক পন্থীদের সাথে আমরা থাকতে পারি এবং বাতিল ও বাতিল পন্থীদের থেকে আমরা বাঁচতে পারি। আর এর জন্য প্রয়োজন দীনের জ্ঞান। দীনের জ্ঞান ছাড়া হক ও বাতিল জানা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। মূর্খ থেকে এটি আশা করা যায় না। এটি ঐ ব্যক্তি থেকে আশা করা যায় যাকে আল্লাহ তা'আলা দীনের জ্ঞান দিয়েছেন। উপকারী ইলম দ্বারা দূরদর্শিতা দিয়েছেন যা দ্বারা সে হিদায়াত ও গোমরাহীর মধ্যে এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম।

এ ধরনের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরি। বর্তমানে তোমরা দেখতে পাচ্ছ, পুরো দুনিয়াটা বড় বড় ফিতনার সাগরে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। একটি বড় ধরনের ফিতনা হলো, বর্তমানে পৃথিবীটা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ফলে পৃথিবী এক প্রান্তে কি ঘটছে, তা অপর প্রান্তের লোকেরা মুহূর্তেই জেনে ফেলছে। নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে যন্ত্রের মাধ্যমে খুব দ্রুত মানুষের কাছে সব খবর পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি গ্রাম, গঞ্জ ও ঘরের ভিতরে বেড রুমের খবরও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ এমন ভাবে খবরগুলো দেখতে পাচ্ছে যেন তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত। এটি মুসলিম জাতির জন্য বড় পরীক্ষা। বর্তমান দুনিয়ায় বিভিন্ন ধরনের ফিতনায় আক্রান্ত। অবৈধ যৌনাচার এক প্রকার মহামারির আকার ধারণ করছে। নাস্তিক্যবাদের ফিতনা, মুরতাদদের ফিতনা, ইসলামের ওপর বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক ও অবান্তর দোষ চাপানোর প্রবণতা ইত্যাদি যেন মুসলিম উম্মাহর লেজ টেনে ধরছে। এ ধরনের ঘটনা একের পর সংঘটিত হয়েই চলছে। কোন ক্রমেই এগুলো পিছু ছাড়ছে না। তারপর এ ঘটনাগুলো সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সারা দুনিয়ার মানুষ আজ আক্রান্ত। তবে যাকে আল্লাহ তা'আলা দয়া করেছেন। এ থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন মানুষের মধ্যে দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তা। এবং এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা। যাদের দূরদর্শিতা না থাকে, দীনের জ্ঞান না থাকে এবং সত্যিকার ইলম না থাকে, তারা অনেক সময় এ ধরনের প্রযুক্তিকে মনে করবে এটি তাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। আবার কেউ কেউ মনে করবে এ সব আল্লাহর নি'আমত, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। সে বুঝতেই পারবে না যে এ সবের কারণে তার কি ক্ষতি হচ্ছে এবং তাকে কত খারাবী বহন করতে হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, বিষয়টি খুবই মহান ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মানুষের সামনে হাজারো ফিতনা তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তা অনুধাবন করতে পারছে না। যেমনটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন

«تعرض الفتن على القلوب عوداً عوداً، فأي قلب أشربها نكتت فيه نكتة سوداء, حتى يصبح قلباً مجخياً, لا يعرف معروفاً ولا ينكر منكراً، إلا ما وافق هواه أو وما أشرب من هواه، وأي قلب أنكرها نكت فيه نكتة بيضاء، فهو قلب لا تضره فتنة مادامت السماوات والأرض».

“মানুষের অন্তর অবশ্যই এ সব ফিতনার সম্মুখীন হয়। যখন কোনো অন্তর তা চুষে নেয় তখন সে অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়, এমনকি সে অন্তর হয়ে যায় বদ্ধ। তখন সে অন্তর কোনো সৎকে চিনতে পারে না, অসৎকে অস্বীকার করতে সক্ষম হয় না। সেটাই কেবল গ্রহণ করে যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী হয়, অথবা প্রবৃত্তি যা চুষে নিয়েছে তা অনুযায়ী হয়। অপরপক্ষে যে অন্তর ফিতনাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে সে অন্তরে একটি সাদা-শুভ্র দাগ পড়ে, ফলে সে অন্তর হয়ে যায় এমন যাতে কোনো ফিতনাই আর কাজ করতে পারে না, যতক্ষণ আসমান ও যমীন আছে ততক্ষণ তা অনুরূপই থাকে"

কোন অন্তর ফিতনাকে উপেক্ষা করে? ঐ অন্তরই ফিতনাকে উপেক্ষা করে যার অন্তরে আল্লাহর কিতাবের ইলম রয়েছে এবং যে ব্যক্তি এ ধরনের পেক্ষাপটে করনীয় সম্পর্কে জানে। আর যে মূর্খ সে ফিতনা বিষয়ে নমনীয় থাকে। আবার অনেক সময় তাতে সে আনন্দও পায় এবং এ সব ফিতনাকে সে উন্নতি, অগ্রগতি ও সভ্যতা মনে করে। আর তা হতে দূরে থাকাকে পশ্চাৎপদ ও প্রগতির পরিপন্থী মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরণের ফিতনা হতে বাঁচার কোনো উপায় নেই একমাত্র আল্লাহ যে বস্তুকে উপায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তা ছাড়া। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿الٓرۚ كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ لِتُخۡرِجَ ٱلنَّاسَ مِنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذۡنِ رَبِّهِمۡ إِلَىٰ صِرَٰطِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَمِيدِ ١﴾ [ابراهيم: ١]

“আলিফ-লাম-রা। এ কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আন, পরাক্রমশালী সর্ব প্রশংসিতের পথের দিকে"[সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১]

﴿ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَۗ قَلِيلٗا مَّا تَذَكَّرُونَ ٣﴾ [الاعراف: ٣]

“তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর"[সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩]

﴿إِنَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ يَهۡدِي لِلَّتِي هِيَ أَقۡوَمُ وَيُبَشِّرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرٗا كَبِيرٗا ٩ وَأَنَّ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأٓخِرَةِ أَعۡتَدۡنَا لَهُمۡ عَذَابًا أَلِيمٗا ١٠﴾ [الاسراء: ٩ ، ١٠]

“নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব"[সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৯-১০]

﴿الٓمٓ ١ ذَٰلِكَ ٱلۡكِتَٰبُ لَا رَيۡبَۛ فِيهِۛ هُدٗى لِّلۡمُتَّقِينَ ٢ ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ ٣ وَٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ وَبِٱلۡأٓخِرَةِ هُمۡ يُوقِنُونَ ٤ أُوْلَٰٓئِكَ عَلَىٰ هُدٗى مِّن رَّبِّهِمۡۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ٥﴾ [البقرة: ١، ٥]

“আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা ইয়াকীন রাখে। তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম"[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১-৫]

আল্লাহ তা'আলা কুরআনের এ সূরার শুরুতেই উল্লেখ করেছেন যে, এ কুরআন বিশেষ করে মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। তারপর তিনি মুত্তাকী কারা তাদের পরিচয় তুলে ধরেন। অর্থাৎ মুত্তাকী হলো তারা যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা ইয়াকীন রাখে। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেন তারা কামিয়াব ও সফলকাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। তারপর আল্লাহ তা'আলা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ কাফেরদের বর্ণনা দেন। তারপর তৃতীয় শ্রেণির মানুষ অর্থাৎ, মুনাফিকদের বর্ণনা দেন।

আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর নিকট মানবজাতি তিন প্রকারে বিভক্ত।

প্রথম প্রকার:

যারা প্রকাশ্যে ও গোপনে এ কুরআনের প্রতি বিশ্বাস করে তারা হলেন মুমিন-মুত্তাকীন। উল্লেখিত আয়াতসমূহে তাদের গুণাগুণ তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকার:

যারা প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করে। তারা কাফের, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ سَوَآءٌ عَلَيۡهِمۡ ءَأَنذَرۡتَهُمۡ أَمۡ لَمۡ تُنذِرۡهُمۡ لَا يُؤۡمِنُونَ ٦ خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمۡ وَعَلَىٰ سَمۡعِهِمۡۖ وَعَلَىٰٓ أَبۡصَٰرِهِمۡ غِشَٰوَةٞۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ٧﴾ [البقرة: ٦، ٧]

“নিশ্চয় যারা কুফুরি করেছে, তুমি তাদেরকে সতর্ক কর কিংবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য বরাবর, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহা আযাব"[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৬-৭]

এরা প্রকাশ্যে ও গোপনে কুরআনকে অস্বীকার করার ফলে শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেন। ফলে তাদের অবস্থা এমন, তারপর থেকে তারা আর কখনো হককে গ্রহণ করবে না, ঈমান আনবে না।

তৃতীয় প্রকার:

যারা বাহ্যিক ভাবে কুরআনকে বিশ্বাস করে কিন্তু গোপনে তারা কুরআনকে অস্বীকার করে। এ শ্রেণির লোক মুনাফিক। আল্লাহ তা'আলা তাদের পরিচয় তুলে ধরার জন্য একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَمَا هُم بِمُؤۡمِنِينَ ٨ يُخَٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَمَا يَخۡدَعُونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمۡ وَمَا يَشۡعُرُونَ ٩ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ فَزَادَهُمُ ٱللَّهُ مَرَضٗاۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمُۢ بِمَا كَانُواْ يَكۡذِبُونَ ١٠ وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ لَا تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ قَالُوٓاْ إِنَّمَا نَحۡنُ مُصۡلِحُونَ ١١ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلۡمُفۡسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشۡعُرُونَ ١٢ وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓاْ أَنُؤۡمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُۗ أَلَآ إِنَّهُمۡ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَٰكِن لَّا يَعۡلَمُونَ ١٣ وَإِذَا لَقُواْ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قَالُوٓاْ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوۡاْ إِلَىٰ شَيَٰطِينِهِمۡ قَالُوٓاْ إِنَّا مَعَكُمۡ إِنَّمَا نَحۡنُ مُسۡتَهۡزِءُونَ ١٤ ٱللَّهُ يَسۡتَهۡزِئُ بِهِمۡ وَيَمُدُّهُمۡ فِي طُغۡيَٰنِهِمۡ يَعۡمَهُونَ ١٥ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱشۡتَرَوُاْ ٱلضَّلَٰلَةَ بِٱلۡهُدَىٰ فَمَا رَبِحَت تِّجَٰرَتُهُمۡ وَمَا كَانُواْ مُهۡتَدِينَ ١٦ مَثَلُهُمۡ كَمَثَلِ ٱلَّذِي ٱسۡتَوۡقَدَ نَارٗا فَلَمَّآ أَضَآءَتۡ مَا حَوۡلَهُۥ ذَهَبَ ٱللَّهُ بِنُورِهِمۡ وَتَرَكَهُمۡ فِي ظُلُمَٰتٖ لَّا يُبۡصِرُونَ ١٧ صُمُّۢ بُكۡمٌ عُمۡيٞ فَهُمۡ لَا يَرۡجِعُونَ ١٨ أَوۡ كَصَيِّبٖ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ فِيهِ ظُلُمَٰتٞ وَرَعۡدٞ وَبَرۡقٞ يَجۡعَلُونَ أَصَٰبِعَهُمۡ فِيٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَٰعِقِ حَذَرَ ٱلۡمَوۡتِۚ وَٱللَّهُ مُحِيطُۢ بِٱلۡكَٰفِرِينَ ١٩ يَكَادُ ٱلۡبَرۡقُ يَخۡطَفُ أَبۡصَٰرَهُمۡۖ كُلَّمَآ أَضَآءَ لَهُم مَّشَوۡاْ فِيهِ وَإِذَآ أَظۡلَمَ عَلَيۡهِمۡ قَامُواْۚ وَلَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمۡعِهِمۡ وَأَبۡصَٰرِهِمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ ٢٠﴾ [البقرة: ٨، ٢٠]

“আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, 'আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি', অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে। অথচ তারা নিজদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে এবং তারা তা অনুধাবন করে না। তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'তোমরা জমীনে ফ্যাসাদ করো না', তারা বলে, 'আমরা তো কেবল সংশোধনকারী'। জেনে রাখ, নিশ্চয় তারা ফাসাদকারী; কিন্তু তারা বুঝে না। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'তোমরা ঈমান আন যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে', তারা বলে, 'আমরা কি ঈমান আনব যেমন নির্বোধরা ঈমান এনেছে'? জেনে রাখ, নিশ্চয় তারাই নির্বোধ; কিন্তু তারা জানে না। আর যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে 'আমরা ঈমান এনেছি' এবং যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, 'নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে আছি। আমরা তো কেবল উপহাসকারী'। আল্লাহ তাদের প্রতি উপহাস করেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘোরার অবকাশ দেন। এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টটা ক্রয় করেছে। কিন্তু তাদের ব্যবসা লাভজনক হয় নি এবং তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল না। তাদের উপমা ঐ ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল। এরপর যখন আগুন তার চারপাশ আলোকিত করল, আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন এবং তাদেরকে ছেড়ে দিলেন এমন অন্ধকারে যে, তারা দেখছে না। তারা বধির-মূক-অন্ধ। তাই তারা ফিরে আসবে না। কিংবা আকাশের বর্ষণমুখর মেঘের ন্যায়, যাতে রয়েছে ঘন অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎচমক। বজ্রের গর্জনে তারা মৃত্যুর ভয়ে তাদের কানে আঙুল দিয়ে রাখে। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন। বিদ্যুৎ চমক তাদের দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার উপক্রম হয়। যখনই তা তাদের জন্য আলো দেয়, তারা তাতে চলতে থাকে। আর যখন তা তাদের ওপর অন্ধকার করে দেয়, তারা দাঁড়িয়ে পড়ে। আর আল্লাহ যদি চাইতেন, অবশ্যই তাদের শ্রবণ ও চোখসমূহ নিয়ে নিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান"[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮-২০]

মোটকথা, আল্লাহর কিতাবে রয়েছে নূর ও হিদায়েত। আল্লাহর কিতাবে চিন্তা-ফিকির করা গবেষণা করা খুবই জরুরি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ إِلَيۡكَ مُبَٰرَكٞ لِّيَدَّبَّرُوٓاْ ءَايَٰتِهِۦ وَلِيَتَذَكَّرَ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٢٩﴾ [ص : ٢٩]

“আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে"[সূরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯]

যে ব্যক্তি এ ধরনের ফিতনা হতে বাঁচতে চায়, তাকে অবশ্যই আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরতে হবে। আল্লাহর কিতাব দিয়ে কি করবে? নিজের কাছে একটি কুরআন বাজার থেকে কিনে নিজের কাছে সংরক্ষণ করবে!!? না তার দায়িত্ব হলো কুরআন পড়বে এবং কুরআন অনুযায়ী জীবন যাপন করবে। এ কুরআনই হলো দুনিয়াতে আখিরাতের যাবতীয় অনিষ্ঠটা ও খারাবী হতে মুক্তি লাভ ও হিদায়াত লাভের প্রথম সোপান। অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নত। কারণ, সুন্নত হলো কুরআনের ব্যাখ্যা, বর্ণনা ও তাফসীর। আল্লাহ তা'আলা বাণী তার প্রমাণ,

﴿وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [النجم : ٣، ٤]

“আর সে মনগড়া কথা বলে না। তাতো কেবল অহী, যা তার প্রতি অহী-রূপে প্রেরণ করা হয়"[সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إني تارك فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا بعدي: كتاب الله, وسنتي»

“আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে গেলাম। তোমরা যদি এ দু'টিকে মজবুত করে ধর, তবে তোমরা আমার পরে গোমরাহ হবে না। আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নত"[9]

ফিতনা থেকে এ ধরনের নিরাপত্তা ও দায়িত্বগ্রহণ তার জন্য যে উভয়টিকে আঁকড়ে ধরবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদীসে ফিতনার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। যেমন, তিনি আরও বলেছেন- অচিরেই গভীর অন্ধকার-আমবশ্যার রাতের মতো ফিতনার আবির্ভাব ঘটবে। তখন মানুষ সকালে মুমিন হিসেবে সকাল করবে সন্ধ্যায় কাফেরে পরিণত হবে। আবার মুমিন হিসেবে সন্ধ্যা অতিবাহিত করবে কিন্তু সকালে কাফেরে পরিণত হবে। সামান্য পার্থিব লাভের বিনিময়ে দীন কে বিক্রি করেবে। দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দেবে। ফলে মানুষ দুনিয়াদারিতে নিজেকে বিলীন করে দেবে। সালাত ছেড়ে দেবে, যাকাত আদায় করবে না আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী করবে, শয়তান ও শয়তানের সহযোগীদের অনুসরণ করবে। এমন মহান ফিতনা থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদীসে আমাদের সংবাদ দেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,

«إنها ستكون فتن كقطع الليل المظلم، يصبح الرجل فيها مؤمناً ويمسي كافراً، ويمسي مؤمناً ويصبح كافراً، يبيع دينه بِعَرَض من الدنيا».

“শেষ জামানায় আমবশ্যার রাতের মতো ফিতনা মানুষকে ঘ্রাস করবে। তখন একজন মানুষ সকালে মুমিন আর বিকালে কাফির এবং বিকালে মুমিন সকালে কাফির। সে দুনিয়ার বিনিময়ে তার দীনকে বিক্রি করবে"[10] দীন কে দুনিয়ার নগণ্য সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে বিক্রি করে দেবে। আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে মানুষ দুনিয়ার সাথে বিলীন হয়ে পড়বে। তখন সে সালাত আদায় করবে না, যাকাত দেবে না আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাফরমানী করে এবং শয়তান ও তার দোসরদের অনুসরণ করবে। আমরা আল্লাহর নিকট এ ধরনের ফিতনা হতে আশ্রয় চাই।

সময় যত পার হবে ফিতনার মহাপ্রলয় আরও বড় আকার ধারণ করবে। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত একটির পর একটি করে বড় বড় ফিতনা ধারাবাহিক ভাবে আসতে থাকবে। কিয়ামত কাছাকাছি হওয়া এবং পৃথিবী ধ্বংসের ধার প্রান্তে পৌছার কারণে বিশেষ করে আখেরি জামানার মানুষ সর্বাধিক বেশি ফিতনার সম্মুখীন হবে। মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফিতনার মধ্যে জীবন-যাপন ও বসবাস করবে। কখনো তার পরিণতি ভালো হবে আবার কখনো তার পরিণতি খারাপ হতে পারে।

কবরের ফিতনা:

কবরেও মানুষ ফিতনার সম্মুখীন হবে। যখন একজন মানুষকে কবরে রাখা হয়, তখন দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসাবে এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে- তোমার রব কে? তোমার দীন কি? তোমার নবী কে? এ তিনটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করবে লোকটির ভাগ্য। যদি লোকটি সঠিক উত্তর- আমার রব আল্লাহ, আমার দীন ইসলাম এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- দিতে পারে, তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে, আমার বান্দা উত্তর সঠিক দিয়েছে, তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দাও। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের শীতল বাতাস ও সুঘ্রাণ আসতে থাকবে। সে জান্নাতের বড় বড় প্রাসাদ দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম কর, যাতে আমি আমার পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যেতে পারি।

আর যখন লোকটি তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। তখন সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে, হায়! আমি কিছুই জানি না। আমি লোকদের এ ধরনের কথা বলতে শুনেছি। লোকটি দুনিয়াতে ঈমান আনে নি, দীনের আনুগত্য করে নি। সে দুনিয়াতে অন্ধ-অনুকরণ করত। অথবা দুনিয়ার ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ঈমান প্রকাশ করত আর অন্তরে কুফরকে লুকিয়ে রাখত। তখন কবরে লোকটি বলবে আমি দুনিয়াতে কতক লোককে এ ধরনের কিছু কথা বলতে শুনেছি তাই আমিও তা বলেছি। তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে- আমার বান্দা মিথ্যা কথা বলছে। তোমরা তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তখন জাহান্নামে তার অবস্থান দেখতে পাবে এবং বলবে হে রব! তুমি কিয়ামত কায়েম করো না।

এ হলো একজন মানুষের কবরের পরীক্ষা ও ফিতনা। আদম সন্তান তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতি নিয়তই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। হায়াত মাওত এবং কবর সব জায়গায় পরীক্ষা দিতে হবে। তবে উত্তম পরিণতি তাদের জন্য যারা ধৈর্য ধরে হকের ওপর অটল অবিচল থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿يُثَبِّتُ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱلۡقَوۡلِ ٱلثَّابِتِ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۖ وَيُضِلُّ ٱللَّهُ ٱلظَّٰلِمِينَۚ وَيَفۡعَلُ ٱللَّهُ مَا يَشَآءُ ٢٧﴾ [ابراهيم: ٢٧]

“আল্লাহ অবিচল রাখেন ঈমানদারদেরকে সুদৃঢ় বাণী দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। আর আল্লাহ যালিমদের পথভ্রষ্ট করেন এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন"[সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৭]

﴿جَنَّٰتُ عَدۡنٖ يَدۡخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنۡ ءَابَآئِهِمۡ وَأَزۡوَٰجِهِمۡ وَذُرِّيَّٰتِهِمۡۖ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَدۡخُلُونَ عَلَيۡهِم مِّن كُلِّ بَابٖ ٢٣ سَلَٰمٌ عَلَيۡكُم بِمَا صَبَرۡتُمۡۚ فَنِعۡمَ عُقۡبَى ٱلدَّارِ ٢٤﴾ [الرعد: ٢٣، ٢٤]

“স্থায়ী জান্নাতসমূহ, যাতে তারা এবং তাদের পিতৃপুরুষগণ, তাদের স্ত্রীগণ ও তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা সৎ ছিল তারা প্রবেশ করবে। আর ফিরিশতারা প্রতিটি দরজা দিয়ে তাদের নিকট প্রবেশ করবে। (আর বলবে) 'শান্তি তোমাদের ওপর, কারণ তোমরা সবর করেছ, আর আখিরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম"। [সূরা রা'দ, আয়াত: ২৩-২৪]

অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে দীনের ওপর অটল-অবিচল থাকা এবং ধৈর্য ধারণ করার কারণে এ সম্মানের অধিকারী হলে। তোমরা ধৈর্য ধারণ করছ বলেই তোমাদের ওপর শান্তি। তোমরা এ পুরস্কার বা বিনিময় এমনিতে পাও নি। তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনা, ধৈর্য ধারণ করা ও হকের ওপর অটুট থাকার কারণেই এ ধরনের সাওয়াব বা বিনিময় লাভ করবে। তাদের বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, سَلَٰمٌ عَلَيۡكُم بِمَا صَبَرۡتُمۡۚ فَنِعۡمَ عُقۡبَى ٱلدَّارِ 'শান্তি তোমাদের ওপর, কারণ তোমরা সবর করেছ, আর আখিরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম'।

আর যারা কাফির (আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন) তাদের বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَلَوۡ تَرَىٰٓ إِذۡ يَتَوَفَّى ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَضۡرِبُونَ وُجُوهَهُمۡ وَأَدۡبَٰرَهُمۡ وَذُوقُواْ عَذَابَ ٱلۡحَرِيقِ ٥٠ ذَٰلِكَ بِمَا قَدَّمَتۡ أَيۡدِيكُمۡ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَيۡسَ بِظَلَّٰمٖ لِّلۡعَبِيدِ ٥١﴾ [الانفال: ٥٠، ٥١]

“আর যদি তুমি দেখতে, যখন ফেরেশতারা কাফিরদের প্রাণ হরণ করছিল, তাদের চেহারায় ও পশ্চাতে আঘাত করে, আর (বলছিল) 'তোমরা জ্বলন্ত আগুনের আযাব আস্বাদন কর'। তোমাদের হাত আগে যা প্রেরণ করেছে সে কারণে এ পরিণাম। আর নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের প্রতি যুলুমকারী নন"[সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৫০-৫১]

একজন মানুষ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফিতনার মধ্যেই বাস করতে হয় এমনকি যখন তাকে কবরে রাখা হয় তখনও তাকে ফিতনার সম্মুখীন হতে হয়। সুতরাং যে কোন ফিতনাকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ ফিতনা থেকে নাজাত পাওয়ার একমাত্র উপায়, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা। কুরআন ও সন্নাহকে আঁকড়ে ধরার জন্য আল্লাহর দীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার কোনো বিকল্প নেই। দীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য চেষ্টা ও সাধনা দরাকার। শুধু আশা আর ধারণা-প্রসূত হলে আল্লাহর দীনের জ্ঞান লাভ করা যায় না। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُمۡ أُمِّيُّونَ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّآ أَمَانِيَّ وَإِنۡ هُمۡ إِلَّا يَظُنُّونَ ٧٨﴾ [البقرة: ٧٨]

“আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কিতাবের কোনো জ্ঞান রাখে না এবং তারা শুধুই ধারণা করে থাকে"[সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৭৮]

অধিক অধ্যয়ন করা, অনেক কিতাব পড়া ও বেশি বেশি লেখা পড়া দ্বারা দীনি ইলম লাভ করা সম্ভব নয়। দীন লাভ করতে হলে আলেম ও আহলে ইলমদের নিকট শিক্ষা লাভ করতে হবে। তবেই সত্যিকার ইলম শেখা হবে। ইলম আলেমদের থেকেই শিখতে হবে। নিজে নিজে পড়া-শুনা করে ইলম অর্জন করা যায় না। বর্তমানে অনেক মানুষ মনে করে বই পড়ে পড়ে আলেম হওয়া যায়। আবার অনেককে দেখা যায় অনেক কিতাব পড়ে হাদীসের 'জারহ ও তাদিল'-এর কিতাব পড়ে বা তাফসীর ইত্যাদির কিতাবাদি পড়েন। তারা এভাবে পড়া শুনা করে নিজেদের আলেম মনে করেন। না, এ ধরণের পড়া লেখা দ্বারা এলম অর্জন বা কোন বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জন নিয়মের আওতায় পড়ে না। কারণ, সে তো ইলম কোন জ্ঞানীদের কাছ থেকে শিখে নি। সুতরাং তাকে অবশ্যই আলেম ফকীহ ও শিক্ষকদের আলোচনায় ও দরসে বসতে হবে। ইলেম শিখার জন্য ত্যাগ শিকার করতে হবে।

ومــن لـم يــذق ذل التعلــم ســاعـــة * تجـــرع كـــأس الجهــل طول حيــاتــه

“যে ব্যক্তি কিছু সময় শেখার জন্য অপদস্থ হওয়ার স্বাদ গ্রহণ করেন নি, সে সারা জীবন অজ্ঞতার গ্লানিই পান করতে থাকবে"

ইলম দীনদার আলেম এবং ফকীহ যারা আল্লাহ কিতাব ও সুন্নতের গভীরতা সম্পর্কে অবগত তাদের থেকে শিখতে হবে। শুধু নিজে নিজে বই পড়া দ্বারা ইলম হাসিল করা সম্ভব নয়। শেখার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা থাকা খুবই জরুরি। শেখার জন্য শিক্ষার দরজাসমূহ দিয়ে প্রবেশ করতে এবং বের হতে হবে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمِنۡهُمۡ أُمِّيُّونَ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡكِتَٰبَ إِلَّآ أَمَانِيَّ وَإِنۡ هُمۡ إِلَّا يَظُنُّونَ ٧٨﴾ [البقرة: ٧٨]

“আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কিতাবের কোনো জ্ঞান রাখে না এবং তারা শুধুই ধারণা করে থাকে"[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৭৮]

শিক্ষার অনেক দরজা রয়েছে। ইলম বহনকারীর সংখ্যাও কম নয়। এ ছাড়াও রয়েছে অনেক শিক্ষক। তোমাদের অবশ্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাই মসজিদ হোক, মাদরাসা হোক এবং কলেজ, ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি হোক।

মোটকথা, যতদিন পর্যন্ত আলেমগণ থাকবেন, তাদের থেকে জ্ঞান আহরণ করার সুযোগ থাকবে, ততদিন আমরা তাদের থেকে দীনি ইলম হাসিল করব। আর যদি আমরা নিজ গৃহে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করি এবং তাতে কিতাবের লাইব্রেরি বানিয়ে বই পড়তে থাকি, তাতে ইলম শিক্ষা করা হবে না -এতে সময় নষ্ট হবে। আল্লাহর দীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ কেবলই ফকীহদের থেকে শিখতে হবে। আর একা একা ইলম অর্জন করা কোনো নিয়মের আওতায় পড়ে না।

অনুরূপভাবে নাজাতের উপায় হলো, মুসলিম জামা'আতের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং মতবিরোধ, মতানৈক্য, দলাদলি এবং সালফে সালেহীনের বিপক্ষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়া হতে বিরত থাকা। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাতপ্রাপ্ত দল সম্পর্কে বলেন, هم من كان على مثل ما أنا عليه اليوم وأصحابي তারা হলো, যারা আমি এবং আমার সাহাবীদের আদর্শের ওপর আছে তারা। তারপর যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুকরণ করেন। অর্থাৎ যারা পূর্বের মনিষী যারা অতিবাহিত হয়েছেন তাদের অনুসরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ جَآءُو مِنۢ بَعۡدِهِمۡ يَقُولُونَ رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لَنَا وَلِإِخۡوَٰنِنَا ٱلَّذِينَ سَبَقُونَا بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَا تَجۡعَلۡ فِي قُلُوبِنَا غِلّٗا لِّلَّذِينَ ءَامَنُواْ رَبَّنَآ إِنَّكَ رَءُوفٞ رَّحِيمٌ ١٠﴾ [الحشر: ١٠]

“যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: 'হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু"[সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০]

বিরুদ্ধ দলের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়া, সাহাবীগণকে গালি দেওয়া, উলামা, ইমাম ও মুজতাহিদদের ভুল ধরা তাদের মূর্খ-কাণ্ডজ্ঞানহীন ইত্যাদি বলে সম্বোধন করা একজন মানুষকে গোমরাহির দিকেই নিয়ে যায়। তবে যাকে আল্লাহর রহমত পেয়ে বসে বা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং মুসলিম জামা'আতের সাথে যোগদান করে তারা ছাড়া। আর মুক্তিপ্রাপ্ত দল এখানে একটিই। যাদের বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ উম্মতের মধ্যে তেহাত্তর ফিরকা হবে তাদের একটি ছাড়া আর বাকী সবাই জাহান্নামী হবে। জাহান্নামী হওয়া বিভিন্ন কারণ হবে। কেউ হবে কারণ সে কাফের। আবার কেউ হবে কারণ সে গোমরাহ, আর কেউ হবে কারণ সে ফাসেক। মোট কথা একমাত্র একটি দল ছাড়া বাকীরা সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করল, তারা কারা? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, من كان على مثل ما أنا عليه اليوم وأصحابي রাস্তা একটিই এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দলও একটি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسۡتَقِيمٗا فَٱتَّبِعُوهُۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمۡ عَن سَبِيلِهِۦۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٥٣﴾ [الانعام: ١٥٣]

“আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর"[সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৫৩]

গোমরাহীর পথ অসংখ্য অগণিত, যার কোনো নির্ধারিত সংখ্যা নেই। বর্তমানে ফিরকা ও দল এত বেশি যে এদের কোন নির্ধারিত সংখ্যা নেই। কিন্তু সঠিক ও হক দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত মাত্র একটি। যাদের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ كَذَلِكَ».

“আমার উম্মত হতে একদল সব সময় হকের ওপর অটল অবিচল থাকবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে বা তাদের অপদস্থ করবে কিয়ামত পর্যন্ত তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না"[11]

তবে তাদেরকে মানুষ হালকা ভাবে দেখবে তাদেরকে মানুষ মূর্খ বলে গালি দিবে, তাদের গাফেল বলবে। অথচ তারা সত্যকে জানে অন্যরা জানে না। এ সব ক্ষেত্রে মুসলিমের ওপর দায়িত্ব হলো সে কারও কথা শুনবে না। তাদের কথা শুনবে যারা রাসূলের বাণী অনুসারে 'এখন আমি এবং আমার সাহাবীরা যার ওপর আছে', তাদের অনুসরণ করে। এ ছাড়া নাজাতের কোনো উপায় নেই।

মুসলিম জামা'আতের সাথে থাকা:

আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«وعليكم بالجماعة، فإن يد الله على الجماعة».

“তোমরা জামা'আতের সাথে থাক। কারণ, আল্লাহর সাহায্য জামা'আতের ওপর"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদীসে আমাদেরকে সেই জামা'আতের সাথে থাকার নির্দেশ দেন, যে জামা'আত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালফে সালেহীনদের পথকে অবলম্বন করেন। কারণ, এ উম্মতের সালাফে সালেহীনগণ তাদের পরবর্তীদের তুলনায় অধিক হকের নিকটবর্তী এবং তারা হক সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম তিন যুগ বা চার যুগের প্রশংসা করেন। তারপর তিনি জানিয়ে দেন যে, এ তিন বা চার যুগের পরবর্তী যুগে এসে অবস্থার পরিবর্তন হবে, বিভিন্ন ধরনের ফিতনা ফ্যাসাদ দেখা যাবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন বাস্তবে তাই দেখা গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘোষিত উত্তম যুগগুলো অতিবাহিত হওয়ার পর উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ফিতনা ফ্যাসাদ, দলাদলি, ফিরকাবন্দি ও মতপার্থক্য দেখা দেয়। তখন মুসলিম জামা'আত যারা তাদের পূর্বপুরুষ তাদের পথকে আঁকড়ে ধরেন এবং এ উম্মতের মধ্যে যারা দীনকে মানুষের নিকট বিশুদ্ধরূপে তুলে ধরার দাওয়াত দেন, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন এবং তাদের আদর্শকে মেনে চলেন তারাই হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন। তারা ছাড়া আর কেউ হকের ওপর ছিলেন না। এটি আল্লাহ তা'আলার অনেক বড় নি'আমত তিনি যাকে চান তাকে সঠিক পথের সন্ধান দেন, যাতে আল্লাহর হুজ্জত তার মাখলুকের ওপর বিজয়ী হয়। ফিতনা ও খারাবী যতই বেশি হউক না কেন হক অবশ্যই উপস্থিত থাকবে।

বিভিন্ন খতীব ও লেখকদের মতো আমরা এমন কথা বলব না যে, মুসলিম জামা'আত বর্তমানে পাওয়া যায় না। আল-হামদুলিল্লাহ মুসলিম জামা'আত অবশ্যই মওজুদ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ كَذَلِكَ».

“আমার উম্মত থেকে একদল সব সময় হকের ওপর অটল অবিচল থাকবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে বা তাদের অপদস্থ করবে কিয়ামত পর্যন্ত তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না"[12]

আমাদের কাজ হলো তাদের নিকট যাওয়া এবং তাদের সাথে থাকা। আল্লাহর নিকট আমাদের কামনা এই যে, আল্লাহ যেন আমাদের ও তোমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন যারা হককে জানে, হক অনুযায়ী আমল করে এবং হককে আঁকড়ে ধরে।

এ বিষয়ে সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা অবশিষ্ট রয়েছে যা বলেই কথা শেষ করব। তা হলো, ফিতনা থেকে মুক্তি আরেকটি উপায় হলো বেশি বেশি করে দো'আ করা। একজন মুসলিমের করণীয় হলো সে বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দো'আ করবে; যাতে আল্লাহ তা'আলা তাকে ফিতনা থেকে হিফাযত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ. اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ المَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَاسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنْ فِتْنَةِ المَحْيَا وَالمَمَاتِ».

“তোমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা কর। এক- জাহান্নামের আগুন থেকে। দুই- কবরের আযাব থেকে। তিন- জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে। চার- মসীহে দাজ্জালের ফিতনা থেকে"[13]

একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, সে বেশি বেশি করে আল্লাহর কাছে দো'আ করবে যাতে আল্লাহ তা'আলা তাকে প্রকাশ্য ফিতনার ও অপ্রকাশ্য ফিতনার অনিষ্টতা থেকে হিফাযত করেন। বার বার আল্লাহর কাছে চাইবে দো'আয় কোনো প্রকার কমতি করবে না। কারণ, আল্লাহ তোমাদের নিকটে, তিনি তোমাদের দো'আ কবুলকারী, যে আল্লাহ কাছে ফিরে যায় তিনি তাকে রক্ষা করেন। আর যে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায় আল্লাহ তাকে আশ্রয় দেন। যে ডাকে তার ডাকে সাড়া দেয়। আল্লাহ তা'আলা প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন,

«هل من سائل فأعطيه، هل من داع فأستجيب له، هل من مستغفر فأغفر له».

“তোমাদের মধ্যে কোনো প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে যা চায় তা দিব। কোন আহ্বানকারী আছে কি? আমি তার আহ্বানে সাড়া দেব। কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব"[14]

আল্লাহ তা'আলা প্রার্থনাকারীদের জন্য রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টাই আসমানের দরজাগুলো খোলা রাখেন, তবে শেষ রাত হলো অধিক গুরুত্বপূর্ণ তখন আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাদের প্রতি অধিক দৃষ্টি দিয়ে থাকেন। সুতরাং সব সময় আমরা আল্লাহর নিকট দো'আ করব। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে আমরা কাজে লাগাবো। যেমন, সাজদাহ অবস্থায় আমরা বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দো'আ করব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«وأما السجود فأكثروا فيه الدعاء، فَقَمِنٌ أن يستجاب لكم»

“সাজদাহয় তোমরা বেশি বেশি দো'আ কর। এটি তোমাদের দো'আ কবুল হওয়ার উপযুক্ত সময়"[15]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ، وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ».

“একজন বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে অবস্থান করে যখন সে সাজদাহ অবস্থায় থাকে। তোমরা সাজদাহয় বেশি করে দো'আ কর"[16]

এ ছাড়াও যে সময়গুলোতে দো'আ কবুল হয়। যেমন, শেষ রাত, জুমু'আর দিন, ফরজ সালাতের শেষাংশ ইত্যাদি। সুতরাং মানবের জন্য একটি মুহূর্তও আল্লাহর নিকট দো'আ করা হতে গাফেল হওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ফিতনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সব সময় দো'আ করা জরুরি। যখন কোনো মুসলিম ফিতনা থেকে মুক্তি পায় তখন সে সব ধরনের অনিষ্টতা থেকে মুক্তি পায়। তখন তার দীন থাকে। আর যখন একজন মানুষের দীন ঠিক হয়ে যায়, তখন তার পরিণতি ভালো হয়।

মোটকথা, দুনিয়াতে ফিতনার শেষ নেই। ফিতনার দিকে আহ্বানকারী লোকের সংখ্যাও অনেক বেশি। তারা নিজেরা প্রশিক্ষণ নেয় এবং অন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«قوم من جلدتنا ويتكلمون بألسنتنا».

“ঐ সম্প্রদায়ের লোক যারা আমাদের চামড়ার এবং আমাদের ভাষায় কথা বলে"[17] অর্থাৎ ফিতনার দিকে আহ্বানকারী আমাদের আরবী ভাষায় কথা বলে, তারা আমাদের চামড়ারই লোক এবং তারা আমাদের আত্মীয় স্বজন।

একজন মানুষের দায়িত্ব, যারা গোমরাহীর দিকে আহ্বান করে, আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতের বিরোধিতা করে, তাদের থেকে সতর্ক থাকা -তাদের দ্বারা কোনো প্রকার ধোঁকায় না পড়া। যদিও সে তোমার খুব কাছের আত্মীয় হয়। আল্লাহর পথের বিরুদ্ধ পথসমূহের প্রতিটি পথেই মানুষ শয়তান ও জিন্ন শয়তান অবস্থান করছে তারা সব সময় মানুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে এবং গোমরাহীর দিকে ডাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿أُوْلَٰٓئِكَ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلنَّارِۖ وَٱللَّهُ يَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱلۡجَنَّةِ ٢٢١﴾ [البقرة: ٢٢١]

“তারা জাহান্নামের দিকে ডাকে। আর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের দিকে আহ্বান করে"[সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২১]

শয়তান তার দলকে তার দিকে ডাকে যাতে সে তাদের তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারে। বর্তমানে কিছু দা'ঈ পাওয়া যায় তারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতের প্রতি মানুষকে ডাকে না, তাদের থেকে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করব। তারা বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ-সংশয় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়ায়। তা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

আমাদের দায়িত্ব- আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত ও আহলে ইলমদের দ্বারস্থ হওয়া। আমাদের কোনো কিছু বুঝে না আসলে যারা সত্যিকার অর্থে কুরআন ও সুন্নাহের ইলম রাখে তাদের কাছ থেকে সমাধান খুঁজে বের করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿فَسَۡٔلُوٓاْ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ ٤٣﴾ [النحل: ٤٣]

“যদি তোমরা না জান তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা কর"[সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩]

আমরা আমাদের সালাতে প্রতি রাকাতে প্রার্থনা করি, যখন সালাতের রোকনসমূহ থেকে অন্যতম রোকন সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿ٱهۡدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلۡمُسۡتَقِيمَ ٦ صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمۡتَ عَلَيۡهِمۡ غَيۡرِ ٱلۡمَغۡضُوبِ عَلَيۡهِمۡ وَلَا ٱلضَّآلِّينَ ٧﴾ [الفاتحة: ٦، ٧]

“আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদের ওপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন। যাদেরকে নি'আমত দিয়েছেন। যাদের ওপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয় নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়"[সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৬-৭]

আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদের সঠিক পথের প্রতি হিদায়াত দেন এবং আমাদের অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ অবলম্বন করা হতে হিফাযত করেন। المغضوب عليهم অভিশপ্ত হলো তারা যারা তাদের ইলম অনুযায়ী আমল করে না। আর الضالون পথভ্রষ্ট হলো, যারা ইলম ছাড়া আমল করে। আর পুরস্কারপ্রাপ্ত হলো তারা যারা আহলে ইলম ও ইলম অনুযায়ী আমলকারী। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُوْلَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُوْلَٰٓئِكَ رَفِيقٗا ٦٩﴾ [النساء : ٦٩]

“আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম"[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯]

যাকে আল্লাহ তা'আলা তার পথের তাওফীক দেন, ঐ সব লোকেরাই তাদের সাথী হবে। আর যারা আল্লাহর রাস্তা থেকে দূরে সরে যায় তাদের সাথী হবে গোমরাহ-পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত লোকেরা। আমরা আল্লাহর নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি।

এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা ইমাম মালেক ইবন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন। কথাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রতিটি মুসলিমের উচিত কথাটির মধ্যে চিন্তা, গবেষণা ও ফিকির করা। তিনি বলেন,

«لا يُصْلِح آخر هذه الأمة إلا ما أَصْلَح أولها».

“এ উম্মতের পরবর্তী প্রজন্মকে তা-ই সংশোধন করবে যা তাদের পূর্ববর্তীদের সংশোধন করেছিল।"

আমাদের পূর্বেকার প্রজন্মের লোকদের কোন জিনিসটি সংশোধন করেছিল? তাদের সংশোধনকারী ছিল আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ। অনুরূপভাবে আখেরি উম্মত যখন তাদের মধ্যে গোমরাহী, দলাদলি, বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা ও খারাবী বেড়ে যাবে তখন তারা কোনভাবেই সংশোধনে উপায় খুঁজে পাবে না। একমাত্র তাদের সংশোধনের উপায় হলো তাদের পূর্ব মনীষীর যে উপায়ে সংশোধন হয়েছে তা। আর তা আল-হামদুলিল্লাহ এখনো অবিশিষ্ট আছে। তা হলো, আল্লাহর কিতাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত এবং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতে রাসূল সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এ ধরনের আলেম যারা আমাদের সমস্যাগুলো কুরআন ও সূন্নাহের আলোকে সমাধান দিতে সক্ষম।

أقول قولي هذا، وأستغفر الله لي ولكم, وأسأل الله أن يهدينا وإياكم صراطه المستقيم، وأن يجنبنا وإياكم طريق المغضوب عليهم والضالين من أصحاب الجحيم. وصلى الله وسلم على نبينا محمد، وعلى آله وأصحابه أجمعين.




[1] অর্থাৎ তারা কখনো কখনো আল্লাহর পথে চলা, তাঁর আনুগত্য করা অথবা আল্লাহর যিকির ও আখিরাতের স্মরণ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে পারে। এ আয়াতে শত্রুতা ও দুশমনি বলতে এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৪

[3] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৭

[4] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮৬৭

[5] তিরমিযী, হাদীস নং ২১৬৫

[6] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৯২

[7] নাসাঈ, হাদীস নং ৪০২০

[8] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩৭

[9] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৭৮৮

[10] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮

[11] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯২০

[12] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯২০

[13] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬০৪

[14] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৫৮

[15] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৯

[16] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮২

[17] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৬০৬

ইল্মী বিভাগ: